ধারাবাহিক অভিযান অন্নপূর্ণা অভিযান মরিস হারজগ অনুবাদ তাপস মৌলিক শরৎ ২০১৭

  এই লেখার আগের পর্বগুলো     তাপস মৌলিকের সব লেখা

 ।। ত্রয়োদশ পর্ব ।।

 পরদিন সকালে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিলাম। একটা তাঁবু খুলে প্যাক করা হল, যতটা পারা যায় খাবারদাবারও প্যাক করে নেওয়া হল। চটজলদি প্রাতরাশের পর মালপত্র তিনজনে ভাগ করে নিয়ে রওনা দিলাম আমরা। প্রথমে অন্নপূর্ণার কেন্দ্রীয় বাহিকাটার দিকে কিছুটা এগোতে হল, তারপর যে বিশালাকৃতি বরফের চাঁইটা আমাদের তাঁবুকে ওপর থেকে আড়াল করে রেখেছিল সেটা বেড় দিয়ে খানিক উঠে একটা কঠিন বরফের ঢিবির মতো পাওয়া গেল। ঢিবিটার ওপর চড়া হল, শেরপারা অবশ্য ব্যাপারটা খুব উপভোগ করল না। এরপর দেখি সে পথে আর ওপরে ওঠার কোনও উপায়ই নেই। জায়গাটার একপাশে প্রচণ্ড তুষারধ্বসপ্রবণ বিপজ্জনক সেই নালা যেটা আমরা নিচে একবার পেরিয়ে এসেছি। বাধ্য হয়ে ঠিক করলাম ফের নালাটা পেরিয়ে ওপারে গিয়ে দেখা যাক ওপরে ওঠার কোনও রাস্তা মেলে কিনা। ওপরদিকে অর্থাৎ উৎসের কাছাকাছি হওয়ায় নালাটা এখানে অপেক্ষাকৃত সরু, শ’দুয়েক ফিটের কিছু বেশি হবে। মোটামুটি নিরাপদ বলে মনে হল আমার। তাড়াতাড়ি পেরিয়ে গেলে তুষারধ্বসের কবলে পড়ার সম্ভাবনা কম। তাছাড়া একজন যখন পেরোবে অন্যরা লক্ষ রাখতে পারবে ওপর থেকে ধ্বস নেমে আসছে কিনা, প্রয়োজনে সাবধান করতে পারবে। দাওয়াথোন্ডুপকে কিনারায় দাঁড়িয়ে বিলে করতে বলে আমি প্রথম পেরোতে শুরু করলাম। প্রচণ্ড খাড়াই নালাটা, সোজা একেবারে পাতালে নেমে গেছে যেন; আর অনবরত নেমে চলা তুষারধ্বসের ঘষায় নালার বুকের বরফ আয়নার মতো কঠিন মসৃণ হয়ে গেছে। এত নিরেট যে পা দিয়ে ঘা মেরে ক্র্যাম্পনের কাঁটা ফোটাতে পারলাম না। প্রথমে আইসঅ্যাক্সের ফলার ঘায়ে ক্র্যাম্পনের সামনের দুটো কাঁটা রেখে দাঁড়াবার মতো ছোট্ট ছোট্ট খোপ কাটতে হল, সেই খোপে পা রেখে এগোলাম। এরপর মাথার ওপর আইসঅ্যাক্সের ফলাটা বরফে গেঁথে দু’হাতে দন্ডটা ধরে ঝুলে পড়লাম, দু’পায়ে দমাদ্দম দেওয়ালে ঘা মেরে ফের একটু পাশে ক্র্যাম্পন গাঁথা, এভাবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এগোতে থাকলাম। মাঝে মাঝে ওপরে তাকিয়ে দেখছি কোনও ধ্বস নামছে কিনা, অবশ্য সত্যিই যদি নামে তাহলে যে কী করব ভগবান জানেন! তবে দেখতে হলে ওপরপানে দেখাই ভালো। নিচের দিকে তাকানো একেবারেই উচিত নয়, সে দৃশ্যে সবচেয়ে সাহসী এবং আত্মবিশ্বাসী পর্বতারোহীরও ভয়ে বুক কেঁপে উঠতে পারে।

বেশ তাড়াতাড়িই পেরিয়ে গেলাম নালাটা। কিছুক্ষণ দম নেবার পর শেরপাদের বিলে করার জন্য তৈরি হয়ে দাঁড়ালাম। এবার দাওয়াথোন্ডুপের পালা। খানিকটা এগোনোর পর সব ঠিক আছে কিনা জানতে ওর নাম ধরে চিৎকার করলাম, দাওয়া ভাবল নিশ্চয়ই ওপর থেকে ধ্বস নামছে! অভিজ্ঞ শেরপা সে। একমুহূর্ত নষ্ট না করে পিঠের বিশাল বোঝা সত্ত্বেও প্রায় ঘূর্ণিঝড়ের মতো এপারে পৌঁছে গেল দাওয়া। সবশেষে পার হল আংদাওয়া। তার বয়স অল্প, অভিজ্ঞতা কম, দাওয়াথোন্ডুপের মতো চলাফেরায় অত সাবলীল নয়, অনেক বেশি সময় নিল পেরোতে। যাই হোক, ভাগ্য ভালো তিনজনেই নিরাপদে ভয়ংকর নালাটা পেরিয়ে এসেছি!

এপারে দাঁড়িয়ে নালার ওপরদিকটা ভালোভাবে নজরে এল। এখান থেকে খাড়া প্রায় হাজার ফিট ওপরে উঠে নালাটা একটা খুব চড়াই বরফের ঢালের সঙ্গে মিশেছে, তার ওপরে একটা সটান খাড়া পাথুরে দেওয়াল, তারও ওপরে সেই কাস্তের মতো হিমবাহ। হিমবাহটার জিভের মতো অংশ বেয়ে ডজন ডজন টন বরফ পাথুরে দেওয়ালের কিনারায় এসে ভেঙে পড়ব-পড়ব করছে। ভেঙে পড়লে প্রথমে তা পড়বে চড়াই বরফের ঢালটায়, তারপর নেমে আসবে নালা বেয়ে।

জায়গাটা বেশ গোলমেলে। আমাদের সামনে প্রচণ্ড চড়াই আর ভাঙাচোরা একটা অঞ্চল। এক নম্বর শিবির থেকে দেখে যেরকম পরিকল্পনা ছকেছিলাম, প্রথমে আমাদের বাঁদিক ধরে উঠতে হবে, তারপর ফের ডানদিকে ঘুরে এগোনো। অন্নপূর্ণার ভয়ংকর কেন্দ্রীয় বাহিকার ওপরে সেই কাস্তের মতো দেখতে হিমবাহ। হিমবাহটি নামতে নামতে কেন্দ্রীয় বাহিকার কাছাকাছি এসে ঢালের আচমকা পরিবর্তনের ফলে লম্বা এক অনুভূমিক ফাটল সৃষ্টি করে ভেঙে গেছে। পর্বতারোহণের পরিভাষায় হিমবাহের ঢালের মাঝে এরকম ফাটলকে বলে bergschrund, ফাটলের নিচের অংশে ঢাল খুব খাড়াই, উপরাংশের ঢাল স্বাভাবিকভাবেই অপেক্ষাকৃত সহজ। ঐ ফাটলটা পেরিয়ে হিমবাহের ওপরের ঢালে পৌঁছতে হবে আমাদের। নিচ থেকে দেখেছি ফাটলের একটা অংশ তুষারপাতের ফলে পুরো বুজে আছে, একমাত্র সে জায়গা দিয়েই ফাটলটা পেরোনোর কিছু সম্ভাবনা আছে। পরিকল্পনামাফিক প্রথমে বাঁদিক তারপর ডানদিক ধরে উঠলে ঐ জায়গাতেই আমাদের পৌঁছনোর কথা।

কিন্তু আপাতত আমাদের সামনে বিশাল বিশাল বরফের চাঁই, রাস্তা পুরো বন্ধ। হয় আমাদের এগুলো এড়িয়ে ঘুরে ঘুরে যেতে হবে, নইলে যে নালাটা এইমাত্র পেরোলাম তার কিনারা ধরেই সোজা ওপরে উঠে দেখতে হবে বাঁদিকে কোনও সহজ রাস্তা মেলে কিনা। এই সাতসকালে ধ্বস নামার সম্ভাবনা খুবই কম, তাই শেষপর্যন্ত নালার কিনারা ধরে ওঠাই মনস্থ করলাম। খুব তাড়াতাড়ি সে রাস্তা ধরে কয়েকশো গজ উঠে পড়া গেল। তারপর বাঁদিকে ঘুরে বরফঢালে পা রাখতেই কোমর অবধি নরম তুষারে ডুবে গেলাম। ফের সেই তুষার ঠেলে ঠেলে পথ চলার প্রাণান্তকর পরিশ্রম! যাই হোক, বিপজ্জনক জায়গাটা ভালোয় ভালোয় পেরোনো গেছে ভেবে মনকে সান্ত্বনা দিলাম।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ফের রওনা দেওয়া গেল। বাঁদিকে এগোতে এগোতে সুযোগ পেলেই উচ্চতা বাড়িয়ে নিচ্ছিলাম আমরা। তবে ঢালটা বেশ চড়াই, আর শেরপাদের ওপর পুরোপুরি ভরসা করা যাচ্ছিল না। এত উচ্চতায় আর এরকম কঠিন রুটে ওরা অভ্যস্ত নয়। একজন যদি পিছলে পড়ে তার টানে তিনজনই কোথায় যে গড়িয়ে পড়ব খুঁজেও পাওয়া যাবে না! তাই কড়া নজর রাখতে হচ্ছিল ওদের ওপর। প্রথমদিকে বেশ খানিকটা রাস্তা নিরাপদেই কাটল, পায়ের ঘায়ে নরম তুষারে ধাপ বানাতে বানাতে এগোচ্ছিলাম যাতে শেরপাদের সুবিধে হয়। এরপর পড়ল শক্ত বরফের একটা অংশ। আইসঅ্যাক্সের ঘায়ে ছোট্ট ছোট্ট খোপ কেটে সেখানে ক্র্যাম্পনের শুধু সামনের দুটো কাঁটা গেঁথে গেঁথে পেরিয়ে গেলাম আমি। দাওয়াথোন্ডুপ সেভাবে পারল না, খোপগুলো কেটে বড়ো করতে করতে এল। অনেক সময় লাগিয়ে দিল। পৌঁছনোর পর তার কাছ থেকে দড়িটা নিয়ে আমিই আংদাওয়াকে বিলে করার জন্য তৈরি হলাম। আংদাওয়া রওনা দিল। মোটেই আত্মবিশ্বাসী লাগছিল না তাকে। বাঁ পা’টা তুলে কঠিন বরফে ক্র্যাম্পন গাঁথার চেষ্টা করল সে, পারল না, জুতোটা পিছলে গেল, হাঁটুটা ধাক্কা খেল বরফের দেওয়ালে, ভারসাম্য হারিয়ে গেল… সরসর করে আংদাওয়া নেমে চলল বরফের ঢাল বেয়ে। ভাগ্য ভালো ঈগলের মতো তীক্ষ্ণ চোখে তার ওপর নজর রাখছিলাম আমি। বরফে গাঁথা আইসঅ্যাক্সে বেড় দেওয়া বিলে করার দড়িটা টানটান হয়ে গেল, আটকে গেল আংদাওয়া, কোনওরকমে উঠে এল ওপরে, ভয়ে তার প্রাণপাখি উড়ে গেছিল প্রায়! তবে দড়ির ওপর তার ভরসা বাড়ল।

এরপরের অংশ ফের কঠিন বরফের ওপর নরম তুষারের আস্তরণে ঢাকা। দুর্দান্ত আবহাওয়া আজ, চারদিক হালকা নীল মায়াবী আলোয় ঝলমল করছে, এমনকি আমাদের ছায়াগুলোও কেমন নীলচে দেখাচ্ছে। একফোঁটা মেঘ নেই আকাশে। বাঁদিকে কাস্তে হিমবাহের কিনারাটা দেখা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন একদম হাতের কাছে। সূর্যের আলোয় হীরের মতো ঝকমক করছে হিমবাহটা।

শেরপা দু’জন খুবই ক্লান্ত। দাওয়াথোন্ডুপ বারবার আপশোশ করছিল কেন সে তুকুচা থেকে বেস ক্যাম্প আসার পথে মদ-টদ খেতে গেল! তার শাস্তি হিসেবেই নাকি অন্য নামজাদা শেরপারা থাকা সত্ত্বেও তাকেই প্রথম এত কঠিন রাস্তায় এত উঁচুতে উঠতে হল। ৮,০০০ ফিট উচ্চতার চোয়া গ্রাম থেকে সটান এই ২৩,০০০ ফিটে উঠে আসতে হয়েছে তাকে, একদিনও বিশ্রাম মেলেনি। কম কথা নয় কিন্তু!

একটা প্রকাণ্ড বরফের চাঁই পেরোতে বেশ ঝামেলা হল আমাদের। এবারে আতঙ্কিত হওয়ার পালা ছিল আমার। আইসঅ্যাক্স দিয়ে পা রাখার জন্য তিনটে ধাপ আর বাঁ হাতে ধরার মতো একটা খোপ কেটে এগোতেই চাঁইটার তলা থেকে গুড়গুড় করে ভোঁতা গম্ভীর একটা আওয়াজ হল, মনে হল পুরো বরফের স্তূপটাই বোধহয় এই ভেঙে পড়ল। রুদ্ধশ্বাসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, কিছুই হল না অবশ্য! মনে হয় অনেক নিচে বরফের স্তর নড়েচড়ে থিতু হচ্ছে, তারই আওয়াজ। ফের এগোতে শুরু করলাম। আধঘন্টা মতো ধাপ কেটে কেটে এগিয়ে স্তূপটা পেরিয়ে ওপরের বরফঢালে পৌঁছে গেলাম। এটাই bergschrund-এর নিম্নাংশের ঢাল, পরিষ্কার দেখতে পেলাম বিশাল গভীর সেই ফাটলটা হিমবাহের ঢাল ফাটিয়ে দু’ভাগ করে অনুভূমিকভাবে ডানদিক বাঁদিক যতদূর চোখ যায় চলে গেছে, আর ফাটলের ওপারেই কাস্তে হিমবাহের কিনারার খাড়া বরফপ্রাচীর।

“দাওয়াথোন্ডুপ, এবারে তুমি সামনে এসো,” এরপর কোন পথে এগোতে হবে দেখিয়ে দিয়ে বললাম আমি। এখানে রাস্তা অপেক্ষাকৃত সহজ। প্রথম কিছুটা অংশ বেশ চড়াই তুষারঢাকা ঢাল, তারপর হালকা চড়াই এক কঠিন বরফের ঢাল – ফের ধাপ কেটে কেটে এগোতে হবে সেখানে, শেষে আরেকটা তুষারঢাল… ব্যাস, তারপরই আমরা পৌঁছে যাব ফাটলটার কিনারায়।

এই অংশে তেমন দুশ্চিন্তার কিছু নেই, তাই শেরপা দু’জনকে সামনে রেখে দড়ির একেবারে শেষপ্রান্তে রইলাম আমি। কিন্তু এরকম রাস্তা বেয়ে ওঠার কায়দাকানুনে শেরপারা আমাদের মতো দক্ষ নয়। খুবই মন্থর গতিতে এগোচ্ছিল ওরা। দাওয়াথোন্ডুপ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক ধাপ কাটছিল, খুব কাছাকাছি আর বড়ো বড়ো ধাপ। যাই হোক, ধীরে ধীরে ওপরে উঠছিলাম আমরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিরাট হাঁ করে থাকা ফাটলটার কিনারায় পৌঁছে গেলাম। ফাটলটা বেশ গভীরই হবে, কতটা বোঝা যাচ্ছে না, কারণ আমাদের সামনের অংশে নিচটা দেখা যাচ্ছে না। ভাগ্যিস দেখা যাচ্ছে না! ডানদিক-বাঁদিকে আধ-মাইলের বেশি অংশ দেখা যাচ্ছে ফাটলটার, কোথাও কোনও ছেদ নেই, কেবল হিমবাহের ওপরের ঢাল বেয়ে তুষারধ্বস নেমে নেমে একটা জায়গাই বুজে আছে। জায়গাটা যে বেশ বিপজ্জনক সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু ওটা ছাড়া ফাটলটা পেরোনোর কোনও রাস্তাও নেই আর।

এবার ফের আমি সামনে এলাম। তুষারধ্বসে নেমে আসা বরফের একটা স্তূপ বেয়ে প্রথমে উঠতে শুরু করলাম, দাওয়াথোন্ডুপ নিচ থেকে দড়ি ধরে বিলে করতে লাগল। তুষার এতই নরম যে ফাটলের ঠিক মাঝবরাবর ভয় হচ্ছিল স্নো-ব্রিজটা ধ্বসে না যায়! কোমর অবধি নরম তুষারে ডুবে গেছি তখন আমি, গলিত তুষারের স্রোত যেন দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে বয়ে চলেছে। বারবার পিছলে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছিলাম, ফের হাঁকপাঁক করে ওপরে উঠতে হচ্ছিল। কোনওক্রমে স্তূপটার মাথায় পৌঁছে সামনে পড়ল হিমবাহের উপরাংশের কিনারার খাড়া বরফের দেওয়াল। হাত বাড়িয়ে যথাসম্ভব ওপরে আইসঅ্যাক্সের ফলাটা গেঁথে ফেললাম দেওয়ালে, তারপর অ্যাক্স ধরে ঝুলে পড়ে প্রাণপণ চেষ্টায় তুষার থেকে পা’দুটো ছাড়িয়ে নিয়ে কোনওরকমে দেওয়ালের শক্ত বরফে একটা ক্র্যাম্পন গেঁথে ফেলতে পারলাম। যাক, বাঁচা গেছে! তাড়াতাড়ি কতগুলো ধাপ কেটে খাড়া দেওয়ালটার মাথায় হিমবাহের ওপরের ঢালের অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এক জায়গায় উঠে পড়লাম আমি। এবার একে একে বিলে করে শেরপাদের তুলে আনার পালা। দড়ি ধরে তৈরি হয়ে দাঁড়ালাম। শেরপারা আমাদের মতো প্রথাগত শিক্ষায় প্রশিক্ষিত পর্বতারোহী নয়। পর্বতারোহণের নিয়ম অনুযায়ী বিলের দড়িটা হল স্রেফ নিরাপত্তার জন্য, হাত-পা-আইসঅ্যাক্স-ক্র্যাম্পনে ভর করে এগোতে তোমায় নিজেকেই হবে, পড়ে গেলে দড়ি তোমায় বাঁচাবে। এগোনোর জন্য সরাসরি দড়ির সাহায্য নেওয়াটা নিয়ম নয়। আমার শেরপারা সেসব নিয়মের তোয়াক্কাই করল না, ঝুলিয়ে দেওয়া দড়ি বেয়ে দোল খেতে খেতে সটান উঠে এল ওপরে। দড়ির প্রচণ্ড টানে কাঁধ থেকে হাতটা আমার প্রায় খুলে এসেছিল আর কী!

যাই হোক, আমাদের তিনজনের ছোট্ট দলটা এখন কাস্তে হিমবাহের ওপরের ঢালে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। বুক থেকে যেন একটা ভারী পাথর নেমে গেল! আরোহণ পর্বের কঠিন অংশগুলো পেরিয়ে এসেছি আমরা। ওপরের ঢালে রাস্তা কেমন পাব, নরম তুষারে ঢাকা না কঠিন বরফ, তা এখনও জানি না বটে; কিন্তু খাড়া খাড়া বরফের বা পাথরের দেওয়াল, ফাটলে ফাটলে আকীর্ণ বিপজ্জনক অঞ্চল কিম্বা নিচের নালাটার মতো তুষারধ্বসপ্রবণ ভয়ঙ্কর কোনও নালা যে আর নেই সে ব্যাপারে একশোভাগ নিশ্চিত।

“চলো, এগোনো যাক আবার। এখনও অনেক রাস্তা বাকি,” বললাম সঙ্গীদের।

এখান থেকে বাঁদিকে হিমবাহের মূল অংশটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, সরাসরি সেদিকে এগোতে শুরু করলাম আমরা। লালচে রঙের পাথুরে জমির ওপর দিয়ে হিমবাহটা নেমে আসছে। আমাদের সামনে, কিছু দূরে, নিচে পেরিয়ে আসা তুষারধ্বসপ্রবণ ভয়ংকর নালাটার ওপরের সেই খাড়া পাথুরে দেওয়াল, মাথার ওপর সোজা ৭০০ ফিট উঠে গেছে। দেওয়ালের ওপরের কিনারায় এসে হিমবাহটা যেন বিপুল বরফের সঞ্চয় নিয়ে মহাশূন্যে হঠাৎ থমকে আছে, নালা বেয়ে ভেঙে পড়ার অপেক্ষায়।

ভাগ্য ভালো আমাদের দিকে নেমে আসা হিমবাহের অংশটা তেমন দুর্গম নয়। ফের একবার কোমর অবধি তুষারে ডুবে গিয়ে প্রতি পদক্ষেপে দম নেবার জন্য থামতে থামতে আমরা দেওয়ালটার দিকে অগ্রসর হলাম। ঘন্টাখানেক এভাবে চলার পর দেওয়ালটার পাদদেশে পৌঁছনো গেল। সকাল থেকে প্রচুর রাস্তা হেঁটেছি, তিন আর চার নম্বর শিবিরের মধ্যে দূরত্বটা আরও বাড়ানো যুক্তিসঙ্গত কিনা সে নিয়ে আলোচনা করলাম। আমার মতে উচিত নয়, দূরত্বটা এমনই হওয়া উচিত যাতে ভবিষ্যতে মাত্রাতিরিক্ত ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত না হয়ে একদিনে রাস্তাটা পেরোতে পারি। তাই যেখানে ছিলাম সেখানেই তাঁবু ফেলার সিদ্ধান্ত নিলাম। ক্যাম্প বসানোর উপযুক্ত ভালো জায়গা পাওয়াই মুশকিল, পুরো অঞ্চলটা জুড়েই হিমবাহ বেয়ে নেমে আসা তুষারধ্বসের চিহ্ন। একটামাত্র মাঝারি মাপের বরফের ঢিবি পাওয়া গেল যার তলায় কয়েক বর্গগজ এলাকা বেশ সুরক্ষিত। ওখানে তাঁবু খাটালে হাওয়ার ঝাপটা আর তুষারধ্বস দুইয়ের কবল থেকেই বাঁচা যাবে। ক্যাম্পটা যাতে যথাসম্ভব আরামদায়ক হয় সে উদ্দেশ্যে জামিটা সমতল করার জন্য তিনজনই তুষার গাঁইতি নিয়ে বরফ কাটতে লেগে পড়লাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁবু ফেলা গেল, বয়ে নিয়ে আসা মালপত্র-খাবারদাবার ঠিকঠাক গুছিয়ে রাখা হল। এবারে বিশ্রাম নেওয়া যায়।

দু’জন শেরপারই প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। অল্টিমিটারে উচ্চতা দেখাচ্ছে ২৪,৬০০ ফিট। মনে হল নিশ্চয়ই বেশি দেখাচ্ছে। বাতাসের চাপের তারতম্য থেকে উচ্চতা পরিমাপ করার এই অ্যানেরয়েড অল্টিমিটারগুলোয় উচ্চতা একটু বেশি দেখায়। শৃঙ্গ আর অন্যান্য শিবিরগুলির অবস্থান থেকে আন্দাজ করলাম মোটামুটি ২৩,৫০০ ফিট উচ্চতায় আছি। দাওয়াথোন্ডুপ আর আংদাওয়াকে অ্যাসপিরিন দিলাম। খেতেও দিলাম অল্প, কিন্তু ওরা বলল কোনও খাবার ছুঁয়ে দেখারও নাকি ইচ্ছে নেই ওদের। বাধ্য হয়ে আমি একাই একটা সিল করা খাবারের ক্যান খুলে ওদের চোখের সামনে বসে টুনিমাছ খেলাম, সেই দৃশ্য দেখেই ওদের বমি আসছিল! আমার অবশ্য শারীরিক কোনও অসুবিধে হচ্ছিল না। সাফল্যের ব্যাপারে আমি এখন প্রায় নিশ্চিত। অন্নপূর্ণা পর্বতপুঞ্জের দৈত্যাকৃতি সেই তুষারপ্রাচীরের প্রায় সমান উচ্চতায় এখন আমি। এতদিন যা আমাদের ব্যঙ্গ করে এসেছে অন্নপূর্ণার সেই ভাঙাচোরা উত্তর-পশ্চিম গিরিশিরা এখন আমার পায়ের তলায়। অনেক দূরে, একেবারে নিচে, বিস্তীর্ণ তুষারাবৃত প্রান্তরের মাঝে ছোট্ট বিন্দুর মতো দেখা যাচ্ছে আমাদের দু’নম্বর শিবির।

“চলো, ফেরা যাক এবারে।”

শেরপাদের আর কিচ্ছু বলতে হল না। এই একবারই দেখেছিলাম ওরা মুহূর্তের মধ্যে তৈরি। তাঁবুটা ভালো করে বন্ধ করা হল, আশা করি বাইরে প্রচুর তুষারপাত হলেও ভেতরে সব ঠিকঠাকই থাকবে। অতঃপর নিচের দিকে রওনা দিলাম আমরা। ফেরার পথে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনও ঘটনা ঘটেনি। ওঠার তুলনায় অনেক তাড়াতাড়ি নেমে চললাম। বরফের খাড়া দেওয়ালগুলো পেছন ফিরে দেওয়ালের দিকে মুখ করে নামলাম, শেরপারা চমৎকার নেমে গেল। ঘন্টা দেড়েক পর তিন নম্বর ক্যাম্পে পৌঁছে দেখি আমাদের বন্ধুরা সেখানে এসে গেছে। অন্নপূর্ণা যে এখন প্রায় আমাদের হাতের মুঠোয় সে খবর বন্ধুদের দিতে আর তর সইছিল না। আসলে অত তাড়াতাড়ি নেমে আসতে পেরে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম! দুটো তাঁবুর ভেতর দু’জন করে শুয়ে আছে। আমার সমস্ত উৎসাহে একেবারে জল ঢেলে দিল তারা, পৌঁছনোর পর একবার উঠেও বসল না। ব্যাপারটা কী?

ল্যাচেনাল আর রেবুফত দু’নম্বর ক্যাম্পে ছিল। কোজি আর শ্যাজ গতকাল এক নম্বর ক্যাম্প থেকে দু’নম্বরে উঠে এসে রাতটা সেখানে বিশ্রাম নিয়েছে। আজ সকালে চারজনই উঠে এসেছে তিন নম্বরে। রাস্তায় জমে থাকা নরম তুষারের গভীর আস্তরণ ওদের ভুগিয়েছে খুব। তুষার ঠেলে ঠেলে পথ চলা প্রচণ্ড পরিশ্রমসাধ্যই বটে। কোজি এর আগে অতি উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেবার তেমন সুযোগ পায়নি, ভয়ানক মাথা ধরেছে ওর। শ্যাজ মনমরা হয়ে বসে আছে। রেবুফতের মনে হচ্ছে সে এখন শারীরিকভাবে আরও ওপরে যাবার মতো অবস্থায় নেই। ল্যাচেনালের একদম খিদে নেই, কিচ্ছু খেতে পারছে না। অন্নপূর্ণাকে যে প্রায় পকেটে পুরে ফেলেছি সে সব বলে ওদের চাঙ্গা করার চেষ্টা করলাম, কোনও ফল হল না। বুঝলাম কেউই নিজেদের মেজাজে নেই। ভাবলাম, আজ রাতটা বিশ্রাম নিলে নিশ্চয়ই ঠিক হয়ে যাবে সব আবার।

তিন নম্বর শিবিরে আমাদের তিনজনের থাকার জায়গা হবে না, তাই বেশি সময় নষ্ট করার মানে হয় না এখানে। তাছাড়া দু’নম্বর থেকে তিন নম্বর ক্যাম্পে আরও একবার লোড ফেরি করতে হবে। টেরের সঙ্গে মিলে আশা করি এবারে বাকি সব দরকারি মালপত্র ওপরে তুলে আনতে পারব, যাতে শৃঙ্গজয়ের আগে আর নিচে নামতে না হয়। কিন্তু মুশকিল হল, ঝড়ের মতো সময় বয়ে যাচ্ছে! একের পর এক দিন চলে যাচ্ছে। আজ মে মাসের ২৮ তারিখ হয়ে গেল। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী জুন মাসের ৫ তারিখ এখানে বর্ষা পৌঁছে যাবার কথা। তার মানে আর মাত্র এক সপ্তাহ রয়েছে হাতে। যা করার ওর মধ্যেই করতে হবে।

দু’নম্বর ক্যাম্পে ফেরার এই যাত্রায় শেরপারা খুবই তাড়াতাড়ি নেমেছিল। গত কয়েকদিনে পর্বতারোহণের বিভিন্ন কলাকৌশল সম্বন্ধে ওরা অনেককিছু জেনেছে; দেখা গেল তাতে ওদের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। ফিক্সড রোপ খাটানো সেই ওভারহ্যাং বরফের দেওয়ালটার কাছে এসে ওরা বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে দড়ি ধরে তরতর করে নেমে গেল, তারপর নিচে পৌঁছে হাত নেড়ে জানিয়ে দিল দড়ি ফাঁকা, পরেরজন এবার নামতে পারে। আমার খাটুনি অনেক কমে গেল। নামতে নামতে দেখলাম দু’নম্বর শিবির বুকে নিয়ে বিছিয়ে থাকা বিস্তীর্ণ সেই তুষারক্ষেত্র দ্রুত কাছে এগিয়ে আসছে।

নামার সময় বেশ কিছুক্ষণ ধরে দাওয়াথোন্ডুপ বলছিল ওর একটা ব্যথা হচ্ছে, কিন্তু ব্যথাটা শরীরের ঠিক কোথায় সেটা বুঝতে পারছে না। খুঁটিয়ে জিগ্যেস করায় বুক থেকে হাঁটু অবধি শরীরের পুরো সামনেটাই দেখিয়ে দিল। এটা কী তুকুচা থেকে আসার পথে সেই অতিরিক্ত মদ্যপানের কুফল, নাকি অতিউচ্চতাজনিত কোনও সমস্যা? অবশ্য স্রেফ নাটকও হতে পারে! ও জানে, সামনে আরও কঠিন পরিশ্রম অপেক্ষা করে রয়েছে। আর যাতে ওপরে উঠতে না হয় সে ব্যবস্থা করে রাখার জন্য অভিনয় করছে না তো? শেষদিকের পুরো রাস্তাটা ও আংদাওয়ার ওপর ভর করে গোঙাতে গোঙাতে নামল, কিন্তু ঠিক ধরতে পারলাম না ওর সমস্যাটা কোথায়! দু’নম্বর ক্যাম্পে পৌঁছনোর ঠিক মুখে তুষারপাত শুরু হল। নিচ থেকে চিৎকার করে টেরে আমাদের অভ্যর্থনা জানাল।

   

    পৌঁছনোমাত্র টেরে ফুটন্ত চা বানিয়ে দিল। কোনও কথাই বলতে দিল না প্রথমে, সবার আগে নাকি খেতে হবে! বাস্তবিক, মুখে খাবার গুঁজে গুঁজে খাইয়ে দিচ্ছিল সে আমায়। অন্য টেন্টে শেরপারা দাওয়াথোন্ডুপকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সে ব্যাটা হাত-পা ছড়িয়ে অচৈতন্যের মতো পড়ে আছে। পেট ভরে খাওয়াদাওয়ার পর ক্লান্তিটা অন্তত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললাম। শরীর তো ক্লান্ত হবেই, এত পরিশ্রমের পর সেটা খুবই স্বাভাবিক। অবশেষে টেরে আমায় মুখ খুলতে দিল। তাকে শিবিরগুলোর বর্তমান অবস্থান ও পরিস্থিতি বিস্তারিত বললাম।

    “বেশিরভাগ জিনিসপত্রই ওপরের শিবিরগুলোয় পৌঁছে গেছে। পাঁচ নম্বর ক্যাম্প স্থাপন করার জন্য আর একবার মাত্র আমাদের লোড ফেরি করতে হবে। পাঁচ নম্বর ক্যাম্প থেকেই আমরা চূড়ান্ত লক্ষ্যে অর্থাৎ শৃঙ্গের উদ্দেশে অভিযান চালাব। পুরো রুটটাই ছকে ফেলা গেছে, এবারে সফল না হওয়ার কোনও কারণ নেই।”

    দেখে মনে হল নিচে এক নম্বর ক্যাম্পে কাটিয়ে টেরে ফের পুরো চাঙ্গা হয়ে এসেছে। আজই এখানে উঠে এসেছে সে। তবে আমার কথা শুনে বেশ চিন্তিত দেখাল তাকে।

    “হুঁ, সবই ঠিক আছে, কেবল আবহাওয়াটা যদি ঠিকঠাক থাকে! রেডিওর আবহাওয়ার খবর কিন্তু ভালো নয়। বর্ষা কলকাতায় পৌঁছে গেছে, আর কয়েকদিনের মধ্যেই এখানেও চলে আসবে।”

    “যাই হোক না কেন, আমি কিন্তু পুরো ফর্মে আছি,” বললাম আমি, “এবারে ২৩,০০০ ফিট উচ্চতায় উঠেও আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধে হয়নি, পুরো ফিট ছিলাম। আমি নিশ্চিত ২৬,০০০ ফিটেও কোনও অসুবিধে হবে না। এমনকি অক্সিজেনও লাগবে না বলেই মনে হয়।”

    কিন্তু টেরেকে তেমন আশাবাদী দেখাল না।

    “বেশিরভাগ জায়গায় যেভাবে কোমর অবধি নরম তুষার ঠেলে ঠেলে এগোতে হচ্ছে আমাদের, ব্যাপারটা অমানুষিক পরিশ্রমের। সময়সাপেক্ষও বটে! শেষদিকে সমস্যা হয়ে যাবে।”

    টেরে জিজ্ঞাসা করল তিন নম্বর ক্যাম্পে আমাদের অন্য চারজনের হালত কী। স্বীকার করতেই হল তাদের অবস্থা খুব সুবিধের নয়। যা দেখে এলাম, শারীরিক এবং মানসিক দু’দিক থেকেই ওরা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

    বললাম, “কিন্তু টেরে… তোমার আর আমার ব্যাপারে আমার কণামাত্র সংশয়ও নেই। আরও বড়ো কথা হচ্ছে, একেবারে সেই কাস্তে হিমবাহ অবধি পুরো রাস্তাটা এখন আমাদের জানা হয়ে গেছে, ওই অবধি সমস্ত শিবিরে মালপত্র খাবারদাবার মজুত করা আছে। এখানে আমাদের সঙ্গে যে চারজন শেরপা আছে তাদের নিয়ে তুমি আর আমি ধীরে ধীরে একেবারে শৃঙ্গ অবধি পৌঁছে যেতে পারব।”

    “হুঁ, এবারে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে আমাদের,” বলল টেরে। ‘সর্বশক্তি’ কথাটা এমনভাবে উচ্চারণ করল যেন এইমাত্র শব্দটা সে আবিস্কার করেছে!

    “শোনো, আমাদের সাফল্যের ব্যাপারে আমি এখন একশো শতাংশ নিশ্চিত। তেমন কোনও প্রলয়ঙ্কর দুর্যোগে না পড়লে আমাদের আর কেউ ঠেকাতে পারবে না। তিন নম্বর ক্যাম্পের চারজনের কথা মাথায় রেখেই বলছি আমি। যদিও আমার মনে হয় একটু বিশ্রাম পেলেই ওরাও ফের চাঙ্গা হয়ে উঠবে, অন্তত যারা আগে অতিউচ্চতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেবার সুযোগ পেয়েছে তারা তো সামলে নেবেই। আমার প্রস্তাব হল, কাল সারাটা দিন এখানে থেকে আমরা দু’জন ভালো করে বিশ্রাম নিই চলো। গোছগাছ করার অনেক সময় পাওয়া যাবে। পরশু সকালে একেবারে ঝরঝরে তরতাজা অবস্থায় রওনা দিয়ে একের পর এক শিবিরে উঠতে উঠতে যাব। তিন নম্বর ক্যাম্পের চারজন কাল এখানে নেমে আসবে। পরশু বিশ্রাম নেবার পর তাদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে ফিট দু’জন পরদিন ফের ওপরে ওঠা শুরু করবে, দ্বিতীয় শৃঙ্গ অভিযাত্রী দল হিসেবে। বাকি দু’জন আরও একদিন এখানে বিশ্রাম করার সুযোগ পাবে, তারপর একটা ক্যাম্প পেছনে থেকে সামনের দুই দলকে অনুসরণ করবে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয়, দুটো দলই আরও সাজসরঞ্জাম ওপরে তুলে আনতে পারবে, সেই সঙ্গে প্রথম শৃঙ্গ অভিযাত্রী দলকে নামার সময় সাহায্যও করতে পারবে।”

    “তুমি বুঝছ না, আমাদের হাতে আর একমুহূর্ত সময় নেই!” টেরে অস্থিরভাবে বলল, “তোমার পরিকল্পনাটা বেশ ভালো, চমৎকার, কিন্তু ওতে অনেক সময় নষ্ট হচ্ছে। কাল সারাদিন এখানে বসে থেকে কোন রাজকার্যটা করব শুনি আমি? বিশ্রাম নেওয়া হয়ে গেছে আমার, প্রচুর বিশ্রাম নিয়েছি। তার থেকে ভালো হয় যদি কালই আমি ওপরে ওঠা শুরু করি। একদিন আমরা এগিয়ে থাকব তাহলে, কিছু মালপত্রও ওপরে বয়ে নিয়ে যেতে পারব। তাতে বরং সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়বে…”

    “অস্বীকার করছি না, কিন্তু তুমি কাল রওনা দিলে আমরা দু’জন একসঙ্গে যেতে পারব না আর। একটা ক্যাম্পের ব্যবধান থেকে যাবে আমাদের মধ্যে। এই মুহূর্তে তুমি-আমিই কেবল পুরোদস্তুর ফিট অবস্থায় আছি। আর ২৩,০০০ ফিটের ওপরে রাস্তা তৈরি করে এগোতে হলে কমপক্ষে দু’জন তো লাগবেই! একা কারও কম্ম নয় ওটা? বরং দু’জন একসঙ্গে গেলে কাজ হাসিল করে ফিরব আমরা।”

    “মরিস, বাস্তব পরিস্থিতিটা ভেবে দেখ একবার। যেভাবেই দেখ না কেন তোমার প্ল্যান অনুযায়ী চললে একদিন আমাদের নষ্ট হচ্ছেই। প্রথম শৃঙ্গ অভিযাত্রী দলে আমি থাকতে পারলাম কিনা সে নিয়ে আমার অত মাথাব্যথা নেই… প্রথম দলে না থাকি দ্বিতীয় দলে থাকব। কিন্তু কোনও একটা দল, আমাদের মধ্যে কোনও একজনও যদি শৃঙ্গে পৌঁছতে পারি, হয়তো দেখা যাবে আগামীকালের লোড ফেরিতে আমি যে আরও সাজসরঞ্জাম খাবারদাবার ওপরের ক্যাম্পে পৌঁছে দিতে চলেছি সেইজন্যেই সেটা সম্ভব হল। মোট কথা এখানে বসে বসে আরও একদিন ভ্যারেন্ডা ভাজতে আমি মোটেই রাজি নই। এখন কাজের সময়…”

    কী বলব বুঝে পেলাম না। টেরের নিঃস্বার্থ মনোভাবে আমি মোটেই অবাক হইনি, চিরকালই আমি তার কদর করে এসেছি। কিন্তু এখন মনে হল ল্যাচেনালের কথাই বোধহয় ঠিক, টেরের মধ্যে অনর্থক হিরোগিরির একটা প্রবণতা আছে। নিঃস্বার্থভাবে দলের জন্য প্রাণপণে কাজ করে যাও, নিজের আশাআকাঙ্ক্ষার কথা ভুলেও ভেবো না… এই শহীদসুলভ মনোবৃত্তির মধ্যেও একটা প্রচ্ছন্ন অহঙ্কার নেই কি? উপেক্ষিত বিস্মৃত নায়ক হওয়ার বাসনা? নাকি আমিই স্বার্থপরের মতো ভাবছি? টেরেকে সঙ্গী হিসেবে পেলে আমার সুবিধে হয় বলে? ওর সঙ্গে গেলে আমার শৃঙ্গজয়ের সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হবে বলে? দ্বিধান্বিত স্বরে বললাম, “হুম, রাজি হওয়া ছাড়া আমার উপায় নেই বুঝতেই পারছি! বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করে দেখলে তুমি ঠিকই বলছ। তবু একবার ভেবে দেখ, এরকম সুযোগ কিন্তু এ জীবনে আর আসবে না!”

    টেরেকেও দ্বিধান্বিত মনে হল। তখন আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। বললাম, “তুমি যদি একান্তই কাল ওপরে যেতে চাও তো এক কাজ করতে পারো। স্রেফ তিন নম্বর ক্যাম্প অবধি যাও। সঙ্গে একটা হাই অলটিচিউড ইউনিট নিয়ে যাও, যেটা অন্যরা আরও ওপরে বয়ে নিয়ে যেতে পারবে, তারপর সন্ধের মধ্যে ফের এখানে নেমে এসো। এখানে না হয় আরও একটা দিন থাকব আমরা যাতে তোমার ঠিকঠাক বিশ্রাম হয়, তারপর দু’জনে রওনা দেব। সঙ্গী শেরপাদের পিঠে এবারে খুব অল্প মালপত্র দেব যাতে তারা সামনে থেকে তুষার ঠেলে ঠেলে রাস্তা বানাতে পারে, পালা করে ছোটো ছোটো ভাগে এক একজন সামনে থাকবে তারা। আমরা দু’জন হালকা হয়ে চলব। চার নম্বর ক্যাম্পটা স্থায়ীভাবে বসাতে হবে। যদি দরকার মনে হয় তাহলে একটা পাঁচ নম্বর ক্যাম্পও ফেলব, তারপর সেখান থেকে একেবারে চূড়ায়।”

    উদ্বিগ্ন অধৈর্য টেরে বিশ্রামের পর চাঙ্গা হয়ে মাঠে নামার জন্য এমন ছটফট করছিল যে ওকে আগামীকাল তাঁবুতে বেঁধে রাখা মুশকিল, তাই এই পরিকল্পনাটা ছকলাম। মনে হল প্ল্যানটা ওর মনে ধরতে পারে। আমায় গভীর স্বস্তি দিয়ে টেরে বলল, “ঠিক আছে, তুমি যা চাইছ তাই হোক তবে!”

    সন্ধেটা খুব আনন্দে কাটল। আরামদায়ক দু’নম্বর ক্যাম্পের ব্যবস্থাপনা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলাম… বড়ো বড়ো তাঁবু, ব্যাটারিচালিত বিজলিবাতি, অঢেল খাবারদাবার আর পানীয় জল, নরম ক্যাম্প-শুয়ে পা গলিয়ে আধশোয়া হয়ে দেদার আড্ডা… আহ, কী আরাম! টেরে ক্যাম্পটা সম্পূর্ণ নতুন করে ঢেলে সাজিয়েছে। আগে যেখানে দু’নম্বর শিবির ছিল সেই তাঁবুগুলো এক তুষারধ্বসে ভাসিয়ে নিয়ে গেছিল। তারপর খুব সুরক্ষিত এক জায়গা বেছে ক্যাম্পটা নতুন করে বসানো হয়। জায়গাটা একটা বিশাল বরফের ফাটলের ঠিক পেছনে, ওপর থেকে এবার যত বড়ো তুষারধ্বসই নামুক না কেন, ওই ফাটল তা অনায়াসে গিলে খেয়ে নেবে।

    বাইরে প্রবল তুষারপাত চলছে। তাঁবুর ভেতর নাইট ল্যাম্পের নরম মায়াবী আলোয় গরম স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে আমার আর টেরের আড্ডা চলছিল। দু’জনের সিগারেট থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাক খেতে খেতে উঠে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছিল। টেরের মুখটা ছায়ায় ঢাকা, দেখা যাচ্ছে না ভালো। এ কথা সে কথার মাঝে বারবার আমরা চূড়ান্ত শৃঙ্গ অভিযানের পরিকল্পনায় ফিরে ফিরে আসছিলাম। ভাবছিলাম তুকুচা বেস ক্যাম্পে পড়ে থাকা আমাদের বাকি সব খাবারদাবার, জিনিসপত্র, সাজসরঞ্জাম নিয়ে নোয়েল কবে এখানে এসে পৌঁছবে! কিন্তু শরীর খুবই ক্লান্ত ছিল, আর চিরকালের হিসেবি টেরে কিছুক্ষণ পরেই বাতি নিভিয়ে দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম দু’জন।

    অন্ধকারে কেউ যেন একবার ঠেলা মারল আমায়। ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে যেন কেউ কথা বলছে। মুখের ওপর হঠাৎ একবার একটা হাতের থাবা এসে পড়ল। তাঁবুর আলোটা জ্বলে উঠল। ধড়মড় করে উঠে বসে টেরে বলল, “ওফ, বেরোনোর সময় হয়ে গেছে!”

    পায়ে জুতো গলিয়ে শেরপাদের ঘুম থেকে ডেকে তোলার জন্য তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেল সে। অভিযানের সম্পূর্ণ সময়কাল জুড়ে টেরে ওর এই ভোর রাত্রে রওনা হওয়ার কৌশল বজায় রেখে গেছে। ওর কৌশলটা একেবারে সঠিক, কারণ সূর্যের আলো পেয়ে তেতে ওঠার আগে ভোরবেলায় তুষার তুলনামূলকভাবে অনেক শক্ত থাকে, চলতে অনেক সুবিধে। তবে কৌশলটা নিয়মিত মেনে চলা বেশ শক্ত, মনের জোর লাগে। ওই ঠান্ডায় প্রতিদিন ভোর রাত্রে উঠে তৈরি হয়ে রওনা দেওয়া সহজ নাকি? আমাদের দলে একমাত্র টেরের মধ্যেই সেই মনের জোর আর নিয়মানুবর্তিতা দেখেছি।

    ফের চোখ বন্ধ করে স্লিপিং ব্যাগের ভেতর শুয়ে রইলাম আমি। আজ আমার মজা! অন্যরা ঘেমে নেয়ে হাঁপিয়ে তুষার ঠেলে ঠেলে পথ করে এগোক আজ, আমি সারাদিন আয়েশ করব। গরম স্লিপিং ব্যাগে সেঁধিয়ে শুয়ে থাকব, শেরপাদের তোয়াজ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করব। কিছুক্ষণ পর তাঁবুর দরজাটা একটু ফাঁক হল, সেই ফাঁক দিয়ে সদ্য ফোটা একফালি ভোরের আলোর সঙ্গে টেরের গভীর গলা ভেসে এল, “গুডবাই মরিস, বেরোচ্ছি আমি।”

    “গুড লাক। সাবধানে যেও।”

    যত্ন করে তাঁবুর দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে গেল টেরে। ওর কোনও তুলনা নেই! গোটা ফ্রান্সে এমন কাউকে আমি চিনি না যে কোনও পর্বতাভিযানের আদর্শ সদস্য হিসেবে টেরের ধারেকাছেও আসতে পারে।

    সময় বয়ে চলল। সূর্যের আলোয় তাঁবুর ভেতরটা উজ্জ্বল এবং উষ্ণ হয়ে উঠল। ক্যাম্প তখনও চুপচাপ, নিঝুম। কারও কোনও সাড়া নেই। আমার গত যাত্রার সঙ্গী দু’জন শেরপাও নিশ্চয়ই আমার মতোই বিশ্রাম করছে। অনেক বেলা হয়ে গেছে। স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে শুয়েই হাঁক পাড়লাম, “আং দাওয়া! খানা! খানা!”

    এবারে কিছু নড়াচড়ার আওয়াজ কানে এল। জড়ানো গলায় উত্তর এল, “জী সাব!” মনে হল অবশেষে কোনওরকমে জলখাবারের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। কষ্টেসৃষ্টে ধীরে ধীরে স্লিপিং ব্যাগের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলাম, ঠান্ডায় জমে যাওয়া জুতোজোড়া ঝেড়েঝুড়ে পায়ে গলালাম; তারপর উইন্ড চিটার, টুপি, সানগ্লাস ইত্যাদি চাপিয়ে অবশেষে তাঁবুর বাইরে বেরোলাম।

    অসাধারণ আবহাওয়া বাইরে, কিন্তু নিচের উপত্যকা মেঘের সমুদ্রে ঢেকে আছে। ওপরে সব ঝকঝকে পরিষ্কার। কাল রাতে ভারী তুষারপাত হয়েছে। ভাবলাম টেরের নিশ্চয় চলতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। দূরবীন চোখে লাগিয়ে পায়ের চিহ্ন অনুসরণ করে সহজেই খুঁজে পেলাম ওদের, সবে প্রথম বরফের প্রাচীরটার পাদদেশে পৌঁছেছে ওরা। মনে হল গভীর নরম তুষার ঠেলে পথ করে এগোতে খুবই পরিশ্রম হচ্ছে ওদের, নিশ্চয় হাঁপিয়ে পড়েছে সবাই। তিন নম্বর ক্যাম্পের আশপাশটা দূরবীন চোখে পরীক্ষা করলাম, দেখি ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে দুটো ছোট্ট ছোট্ট কালো বিন্দু নিচে নেমে আসছে।

    কিন্তু ওরা নেমে আসছে কেন? ওদের চারজনেরই তো ওপরে চার নম্বর ক্যাম্পের দিকে উঠে যাওয়ার কথা! ভয় হল, তবে কি শরীর আরও খারাপ হয়ে পড়েছে ওদের?

    নিচে মিরিস্তি খোলা নদীর উপত্যকায় ঘন মেঘ জমাট বেঁধেছে, সেই মেঘের অস্বাভাবিক ঘোর কৃষ্ণবর্ণ দেখে বুকটা অজানা আশঙ্কায় গুড়গুড় করে উঠল। এ কি তবে বর্ষার আগমনী? প্রাক-মৌসুমী বৃষ্টি কি তাহলে শুরু হয়ে গেল? আজ বেলা গড়ালে আবহাওয়া কেমন থাকে কে জানে!

    দাওয়াথোন্ডুপের অবস্থা ক্রমশ আরও খারাপ হচ্ছে। স্লিপিং ব্যাগের ভেতর শুয়ে দু’হাতে পেটটা চেপে ধরে অবিরাম গোঙাচ্ছে সে। ঠিক করলাম প্রথম যে দল এক নম্বর ক্যাম্পের দিকে নামবে তাদের সঙ্গেই ওকে নিচে পাঠিয়ে দেব।

    ফের তুষারপাত শুরু হয়ে গেল। তাঁবুর ভেতর ঢুকে পড়তে হল। বসে বসে আকাশপাতাল ভাবছিলাম। একটু পরেই কারও চিৎকার কানে এল। নিশ্চয়ই ল্যাচেনাল! আমিও চিৎকার করে প্রত্যুত্তর দিলাম। বাইরের তুষারক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দলের পায়ে চলা পথের চিহ্ন মিলেমিশে এমন জট পাকিয়ে গেছে যে চিৎকার করে দিকনির্দেশের বার্তাপ্রেরণ কুয়াশাঘেরা এই আবহাওয়ায় বেশ কাজের। একটু পরেই ল্যাচেনাল হাজির হল, সঙ্গে কোজি।

    “আমার পক্ষে আর ওপরে ওঠা সম্ভব ছিল না,” ঢুকেই বলল ল্যাচেনাল, “প্রচণ্ড পেটখারাপ। পেটে আর নেই কিছু, নাড়িভুঁড়ি সব বেরিয়ে গেছে!”

    “আর আমার মাথাব্যথা!” বলল কোজি, “উফ, কী ভয়ংকর মাথার যন্ত্রণা! অ্যাসপিরিন, ঘুমের ওষুধ সবকিছু খেয়েও একফোঁটা ঘুমোতে পারিনি!”

    “ওফ, তুমি যদি ওর গোঙানি শুনতে!” ল্যাচেনাল বলে চলে, “সারারাত বেচারা যন্ত্রণায় কাতরেছে! বলছে যন্ত্রণায় মনে হচ্ছে খুলিটা যেন ফেটে যাবে!”

    “সমস্যাটা স্রেফ অতি উচ্চতার জন্য। হাই অলটিচিউড সিকনেস,” বললাম আমি, “নিচে নেমে এসে একদম ঠিক কাজ করেছ। বাকিদের খবর কী? ওরা কি টেরের সঙ্গে ওপরে উঠতে পারবে?”

    “ওপরে ওঠার ব্যাপারে আমরা কেউই তেমন আশাবাদী ছিলাম না,” ল্যাচেনাল ব্যাখ্যা করে, “বিশেষ করে গতকাল সারারাত ওরকম ভারী তুষারপাতের পর! বাকি দু’জন কী করবে ঠিক বলতে পারছি না। মনে হয় ওরা টেরের জন্য অপেক্ষা করছে, টেরে পৌঁছলে তারপর সিদ্ধান্ত নেবে।”

    সবাই মিলে তাঁবুর মধ্যে এলাম। ভেতরের আরামদায়ক পরিবেশ ল্যাচেনাল যে বেশ উপভোগ করছে সেটা পরিষ্কার বোঝা গেল। নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে কোজির মাথাব্যথা উধাও হয়ে গেছে। সাধারণত এরকমই হয়। কয়েকশো গজ নিচে নেমে এলেই অতিউচ্চতাজনিত সমস্তরকম সমস্যা আপনাআপনি ভ্যানিশ হয়ে যায়। ওরা দু’জন যতক্ষণ ভেজা জামাকাপড় পালটে সাফসুতরো হচ্ছিল আমি বাইরে বেরিয়ে আংদাওয়ার কাছে গেলাম দুপুরের খাবার কী আছে জানতে। একটা ইয়াকের বাছুরকে এতদিন আমরা খাইয়ে-দাইয়ে মোটা করেছি, আজই ওটাকে কাটার সেরা সময়। বন্ধুদের ভেঙে পড়া মনোবল ফের চাঙ্গা করে তুলতে এ ছাড়া আর উপায় নেই। বেচারাদের ওপর দিয়ে প্রচুর ঝড়ঝঞ্ঝা বয়ে গেছে, অথচ সেই পরশু সকাল থেকে পেটে প্রায় কিছুই পড়েনি।

    প্রচুর খেলাম সবাই। ল্যাচেনাল আর কোজি মাংসটার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করল দেখে খুব তৃপ্তি পেলাম। তারপর তাঁবুর ভেতর শুয়ে শুয়ে যখন আড্ডা শুরু হল, দেখলাম ওদের মন অনেকটাই ভালো হয়ে এসেছে। নরম স্লিপিং ব্যাগের ওম আর আড্ডার আমেজে যখন আমরা ডুবে আছি, সেইসময় হঠাৎ তাঁবুর দরজার ফাঁক দিয়ে আংদাওয়া তার ছোট্ট উদ্বিগ্ন মুখটা গলিয়ে ভয় পাওয়া গলায় বলল, “সাহেব, অন্য সাহেবরাও নেমে আসছে!”

    কিছুক্ষণ সবাই চুপ। তারপর ফের আংদাওয়া বলল, “বড়া সাহিব, ওই যে শুনুন!”

    সত্যিই বাইরে দূর থেকে ভেসে আসা কারও চিৎকার শোনা গেল।

    তখনও অবিরাম তুষারপাত হয়ে চলেছে। তাড়াতাড়ি উইন্ডচিটারটা গায়ে চড়িয়ে জুতোর ওপর গেইটার চাপিয়ে বাইরে বেরোলাম। দশ গজের বাইরে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝেই পরিষ্কার কারও চিৎকার কানে আসছিল। গলা শুনে বুঝলাম এ কোনও সাহেবই বটে, অর্থাৎ আমাদের অভিযাত্রীদলেরই কোনও সদস্য, কারণ শেরপারা ওদের নিজস্ব সাংকেতিক ভাষায় বহুদূর থেকেও অন্য শেরপাদের নিজের বক্তব্য বোঝাতে পারে। কিন্তু চিৎকারটা তিন নম্বর ক্যাম্পের দিক থেকে আসছে না, বরং আসছে সেই ভাঙাচোরা উত্তর-পশ্চিম গিরিশিরাটার কাছাকাছি কোনও জায়গা থেকে। দুটো সম্ভাবনা আছে। এক হতে পারে তিন নম্বর ক্যাম্প থেকে নেমে আসার সময় কেউ ভুল করে বাঁদিকে চলে গেছে, আর এখন দেখছে চারদিকে মাকড়সার জালের মতো ছড়ানো কেবল বরফের ফাটল; নয়তো এক নম্বর ক্যাম্প থেকে আসার সময় কেউ এই দু’নম্বর ক্যাম্প ছাড়িয়ে আরও ওপরে উঠে গেছে। তবে যে বা যারাই হোক, স্বস্তির ব্যাপার হল চিৎকার শুনে বোঝা যাচ্ছিল তারা কোনও মারাত্মক বিপদে পড়েনি, স্রেফ রাস্তা খুঁজে পাচ্ছে না; কারণ পাহাড়ে বিপদে উদ্ধার পাওয়ার জন্য সাহায্যের আশায় আপৎকালীন ডাক বা এস ও এস কল শুনলে কারও বুঝতে ভুল হয় না। আমি চিৎকার করে উত্তর দিলাম, মাঝখানে এতটা ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও বুঝলাম লোকটা শুনেছে। ও যে রাস্তা থেকে অনেক বাঁদিকে সরে গেছে সেটা বুঝেছে। চিৎকারটা ধীরে ধীরে কাছে এল, তখন আমি তাকে রীতিমতো দিকনির্দেশ দিতে পারছিলাম।

    “বাঁদিকে, সবসময় বাঁদিকে থাকো, বড়ো ফাটলটার পাশ দিয়ে দিয়ে এসো।”

    বার বার আমি একই কথা বলে যেতে থাকলাম যতক্ষণ না লোকটা উত্তর দিল সে বুঝেছে।

    মিনিট পনেরো পরে গাঢ় কুয়াশা আর তুষারপাতের মধ্য থেকে সাদা ভূতের মতো একটা চেহারা ধুঁকতে ধুঁকতে এগিয়ে এল। কষ্ট করে চিনতে হল চেহারাটা শ্যাজের।

    “রেবুফত কোথায়?”

    “আমি একাই নেমে এলাম।”

    “একা! তুমি কি উন্মাদ? এই আবহাওয়ায় আর এই রাস্তায় একাই চলে এলে?” রাগে আমার মুখ লাল হয়ে গেল।

    “কী করব? তুমিই বলো মরিস। কিচ্ছু করার ছিল না আমার! তিন নম্বর ক্যাম্পে মনে হচ্ছিল আমার সমস্ত শক্তি নিঃশেষ। খুবই দুর্বল লাগছিল। ভাবলাম কাল যখন টেরের সঙ্গে কোনওমতেই ওপরে যেতে পারছি না তখন ক্যাম্পে বসে বসে অন্নধ্বংস করি কেন? তাই নেমে এলাম।”

    আমি সত্যিই প্রচণ্ড রেগে গেছিলাম। মনে হয় অভিযানের একেবারে শুরু থেকে ধরলে সেই প্রথম আমার এত রাগ হল।

    “তাই বলে এরকম একটা জায়গায় অসুস্থ শরীরে তুমি অনাবশ্যক এতবড়ো একটা ঝুঁকি নেবে? চিন্তা করে দেখ, সেদিনের মতো যদি স্রেফ একবার পা পিছলে পড়ে যেতে? কিম্বা ধরো আংদাওয়া যদি তোমার চিৎকার শুনতে না পেত?”

    যাক গে, যা হওয়ার তা হয়েছে! এখন শ্যাজের সাহায্য দরকার। একা এই আবহাওয়ায় এই দুঃসাহসিক যাত্রার প্রচণ্ড মানসিক চাপ থেকে ওকে বার করে আনতে হবে। গরম চায়ের পর জুতসই আহার ওর ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া মুখে স্বাভাবিক রঙ ফিরিয়ে আনল। তারপর সেও ক্যাম্পের ফুরফুরে ইতিবাচক হাওয়ায় সংক্রমিত হয়ে ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল আশার আলোয় রাঙিয়ে দেখতে শুরু করল।

    জিগ্যেস করলাম, “টেরে ঠিকঠাক তিন নম্বর ক্যাম্পে পৌঁছেছিল তো?”

    “রাস্তায় জমে থাকা পুরু তুষারের জন্য ওর অনেক দেরি হয়েছে। আমি আর রেবুফত দুজনেই তো নেমে আসছিলাম প্রথমে! তখন ঘন কুয়াশার মধ্যে টেরের সঙ্গে দেখা। ও এমন দুর্দান্ত ফর্মে আছে, এমন টগবগ করে ফুটছিল যে উৎসাহিত হয়ে আমরা দু’জন ওর সঙ্গে ফের তিন নম্বর ক্যাম্পে ফিরে গেলাম।”

    “তাহলে পরে রেবুফত তোমার সঙ্গে নেমে এল না কেন?”

    “বলছি। অনেক আলোচনা করেই আমরা সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম। রাস্তায় যখন দেখা হল তখন টেরে বলল গত রাত্রে যে চারজন সদস্য তিন নম্বর ক্যাম্পে কাটিয়েছে তাদেরই দায়িত্ব হল চার নম্বর ক্যাম্পটা ঠিকঠাক স্থায়ীভাবে স্থাপন করা। এখন, গত রাত্রে তিন নম্বর ক্যাম্পে ছিলাম আমি, রেবুফত, ল্যাচেনাল আর কোজি – এই চারজন। তার মধ্যে ল্যাচেনাল আর কোজি তো আগেই নেমে এসেছে! সেই শুনে টেরে বলল তাহলে বাকি দু’জনকেই ওই দায়িত্ব নিতে হয়।”

    “আর তাই তুমি এবং রেবুফত টেরের সঙ্গে ফের তিন নম্বর ক্যাম্পে ফিরে গেলে?”

    “একদম তাই।”

    সত্যি! টেরেকে নিয়ে আর পারা যায় না! ও সবাইকেই নিজের মতো দানব ভাবে। শারীরিক অবস্থা যার যেমনই হোক না কেন পর্বতারোহণের প্রোটোকল বা রীতিনীতি ওর কাছে সবার আগে!

    শ্যাজ বলে চলল, “আমার ওখানে প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগছিল। টেরেকে বললাম আগামীকাল ওর সঙ্গে গিয়ে রাস্তায় অসুস্থ হয়ে পড়ে ঝামেলা বাড়ানোর চেয়ে আমি বরং নিচে নেমে দু’নম্বর শিবিরে বিশ্রাম নিই। পরে কোজির সঙ্গে জুড়ি বেঁধে ফের ওপরে উঠব।”

    “তাহলে কাল সকালে টেরে আর রেবুফত চার নম্বর শিবিরের দিকে রওনা দিচ্ছে?”

    “হ্যাঁ, যদি আবহাওয়া ভালো থাকে।”

    পারবে কি ওরা ঠিকঠাক এগিয়ে যেতে? কাল চার নম্বর ক্যাম্প… পরশু পাঁচ নম্বর… তারপর সোজা শৃঙ্গের দিকে? ঘটনাচক্রে প্রথম শৃঙ্গ অভিযাত্রী দলে পরিণত টেরে আর রেবুফত জুটির সামনে এখন সুবর্ণ সুযোগ!

(এরপর আগামী সংখ্যায়)

     জয়ঢাকের খেলা লাইব্রেরিতে এমন অনেক অভিযানের সংগ্রহ

Advertisements

One Response to ধারাবাহিক অভিযান অন্নপূর্ণা অভিযান মরিস হারজগ অনুবাদ তাপস মৌলিক শরৎ ২০১৭

  1. Sudeep says:

    Eta ekta anobadyo lekha..dharabahik uponyas bole jara donamona kore ekhono poreni…tader sokolke bolbo konomotei miss na korte…khali apekkha karatai koster…asha kori sesh howar por eta boi hocchei..

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s