ধারাবাহিক অভিযান কনটিকি অভিযান থর হেয়ারডাল অনুবাদ ইন্দ্রনাথ বসন্ত ২০১৯

কন-টিকি অভিযান-আগের পর্বগুলো

(১১)

থর হেয়ারডাল। (অনুবাদঃ ইন্দ্রনাথ)

আগের কথা

আঠাশে এপ্রিল সকাল থেকেই কাল্লাও বন্দরে ভিড়। ‘গার্ডিয়ান রিও’ নামের টাগ বোট কনটিকিকে বেঁধে নিয়ে মাঝ সমুদ্রে ছেড়ে আসার জন্য ভেসেও পড়ল। এদিকে বিপত্তি, ডাঁই করা জিনিসপত্রের স্তূপে একা থর হেয়ারডাল বসে। বাকিরা কেউই পৌঁছয়নি। সেটা বারবার বোঝাতে চেয়ে ব্যর্থ হয়ে থর হাল ছেড়ে দিলেন। অবশেষে অনেক পরে একটা ছোটো নৌকো করে বাকিরা এলেন ভেলাতে। সাগর অভিযান শুরু হল। হামবোল্ট স্রোতে পৌঁছনোর পর টাগবোট বিদায় নিলে পালা করে ভেলা চালানোর ব্যাপারটা বুঝে নিল সকলে। আর দক্ষিণ-পূর্বের বাতাস ক্রমে জোর হলে ভেলাটাও এগোতে শুরু করল। একদিনের মধ্যেই বাণিজ্যবায়ুর প্রভাবে সমুদ্র অশান্ত হয়ে উঠল, ভেলার অভিমুখ ঠিক রাখতে অভিযাত্রীরা হিমশিম খেয়ে গেল। একেকটা ঢেউ, কয়েকতলা বাড়ির সমান উঁচু, ভয়াল তার রূপ। একের পর এক আছড়ে পড়তে লাগল ভেলার ওপরে। মুহুর্মুহু। পালা করে দাঁড় সামলাতে লাগল সকলে। হাল ধরল। পাল নামিয়ে, পাল উঠিয়ে ভেলার দিক ঠিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকল সকলে। ভেলাটাও আশ্চর্যরকমভাবে প্রতিটা উঁচু ঢেউয়ের মাথায় অবলীলায় চড়ে যাচ্ছিল আর নেমেও আসছিল ঠিক; ঢেউ আছড়ে পড়ে ভেলার দু-পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল। প্রাচীন ইনকাদের ভেলা বাওয়ার পদ্ধতি হয়তো একটু একটু করে শিখতে শুরু করেছিল অভিযাত্রীরা। দু-তিনদিন বাদে সমুদ্র শান্ত হয়ে এল। প্রায় ৫৫-৬০ সামুদ্রিক মাইল গতিবেগ নিয়ে জোর গতিতে এগিয়ে চলল ভেলা। এবারে সন্দেহ হল, কনটিকি গ্যালাপাগোসের দিকে চলে যাচ্ছে না তো?       

সাগর পাড়ি

সমুদ্রের ঢেউয়ের দুলুনিতে এমন অভ্যস্ত হয়ে গেছি আমরা যে সেটা নিয়ে আর মাথা ঘামাচ্ছি না। যতক্ষণ আমরা ভেলাশুদ্ধু সবসময় ঢেউয়ের ওপরেই আছি, ততক্ষণ হাজার হাজার মিটার গভীর জলের ওপর ঢেউয়ের দোলায় নাচতে থাকলে কীই বা আসে যায়? এখানেই, অবশ্য, পরবর্তী প্রশ্নটা উঁকি দেয়। কতক্ষণ এমনি জলের ওপরেই থাকতে পারব? পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি বালসা কাঠ জল টানছে। পেছনের আড়াআড়ি ফেলা কাঠটার সবচেয়ে খারাপ অবস্থা। ভেজা কাঠে আঙুলের মাথাটা ঠেসে দিলে ফচ করে জল বেরিয়ে আসছে। কাউকে কিচ্ছু না বলে আমি একটুকরো ভেজা কাঠ ভেঙে নিয়ে সমুদ্রে ছুঁড়ে দিলাম। ওটা টুপ করে ডুবে গেল আর অচিরেই গভীর জলে অদৃশ্য হয়ে গেল। পরে দেখলাম আমার দু-তিনজন সঙ্গী ঠিক একই কান্ড করল, ভাবছিল কেউ দেখছে না ওদের। ভেজা কাঠটা যখন ধীরে ধীরে সবুজ জলে ডুবে যাচ্ছে, ওরা স্থির হয়ে একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়েছিল।

আমরা যখন রওনা হয়েছিলাম, ভেলায় জলের তল কদ্দুর উঠে আছে দেখে নিয়েছিলাম। কিন্তু বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে কতখানি ঠিক ডুবে আছি সেটা দেখা খুবই কঠিন কাজ। এক মূহুর্তে কাঠগুলো জলের ওপরে উঠে আসছে, পরমূহুর্তেই আবার জলের নীচে ডুবে যাচ্ছে। কিন্তু কাঠে একটা ছুরি বিঁধিয়ে একটু উল্লসিতই হলাম, দেখা গেল জলতলের এক ইঞ্চি অবধি নীচে কাঠ বেশ শুকনোই আছে, জল ঢোকেনি। আমরা হিসেব করলাম, এই হারে জল শোষণ করলে, আমাদের ডাঙায় পৌঁছনো অবধি কাঠগুলো মাত্রই জলতলের ঠিক নীচে ডুবে ভাসতে থাকবে। কিন্তু আশা করছিলাম যে কান্ডের একেবারে ভেতরকার রস জল ঢোকা রোধ করবে, শোষণটাও থামাতে পারবে।

আরেকটা বিপত্তি ছিল, প্রথম ক’সপ্তাহে সেটা নিয়ে খুব ঝামেলায়ও ছিলাম, দড়িদড়া। দিনের বেলা ব্যস্ততার সময়ে আমরা ওটা নিয়ে প্রায় ভাবিই না। যখন অন্ধকার নেমে আসে আর আমরা গুটিসুটি মেরে আমাদের কেবিনে শুতে যাই, তখন খানিকটা ভাবার সময় পাই, অনুভব করতে পারি, শুনতে পারি। নিজের নিজের খড়ের মাদুরে শুয়ে শুয়ে টের পাই পিঠের তলায় পাতায় বোনা কার্পেটটা কাঠের সঙ্গে উঠছে নামছে। ভেলার নিজের দুলুনি ছাড়াও, ন’টা কাঠের লগ বিপ্রতীপভাবে নড়ছে। একটা যখন ওপরে উঠছে আরেকটা তখন ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে। নড়াচড়াটা খুব বেশি না হলেও আমাদের কাছে যথেষ্ট, যেন মনে হচ্ছিল এক অতিকায় প্রাণীর ওপরে শুয়ে আছি আর সেটা আস্তে আস্তে শ্বাসপ্রশ্বাস নিচ্ছে। কাঠের দৈর্ঘ্য বরাবর শোয়াই ঠিক হয়েছিল। প্রথম দু’রাত্তির সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হয়েছিল, তারপর আমরা এত ক্লান্ত থাকতাম যে ও নিয়ে আর ভাবতাম না। পরের দিকে দড়িগুলো জলে ফুলে গিয়ে ন’টা কাঠের লগের নড়াচড়াই প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল।

সবমিলিয়ে অবশ্য ভেলার ওপরে সমতল বলে কিছু ছিল না, যেটা আশপাশের তুলনায় খানিকটা সুস্থির থাকতে পারে। মূল কাঠামোটা জোড়ের জায়গাগুলোতে সর্বক্ষণ ওঠানামা করতে থাকায় সবকিছুই ওর সঙ্গে নড়াচড়া করত। বাঁশের ডেক, জোড়া-মাস্তুল, কেবিনের চারটে বেড়ার-দেয়াল, ছাত, ছাতের ওপরকার পাতার-ছাউনি – সবই কেবলমাত্র দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল আর বেঁকেচুরে পর্যায়ক্রমে উঠত নামত। যদিও খুবই সামান্য, কিন্তু সেটা পরিষ্কার বোঝা যেত। একটা কোনা ওপরে উঠল তো অন্য কোণ নীচে নামল, আধখানা ছাতের সরু সরু কাঠের বাতাগুলো সামনের দিকে ঝুঁকে গেল তো বাকি আধখানা পেছনদিকে ঝুঁকে গেল। আর খোলা দেয়ালের বাইরে তাকালে, সেখানে চলাচল আরেকটু বেশি, কেননা সেদিকে আকাশ গোল হয়ে ঘুরছে আস্তে আস্তে আর সমুদ্রও সেদিকেই ফুঁসে উঠছে।   

দড়িগুলোই পুরো চাপটা নিয়েছিল। সারারাত শুনতাম, দড়িগুলো ক্যাঁচকোঁচ করে আর্তনাদ করছে, ঘষা খেয়ে কিড়কিড় করে আওয়াজ করছে। যেন একটা সমস্বরে অভিযোগ উঠছে চারপাশ থেকে, অন্ধকারে; প্রতিটা দড়ি তার পুরুতা আর বাঁধনের টান অনুযায়ী নিজস্ব স্বরে আওয়াজ করছে।

প্রতিদিন সকালে আমরা দড়ির বাঁধনগুলো খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতাম। এমনকি ভেলার ওপরে শুয়ে কিনারা থেকে জলে মুখ ডুবিয়ে দিতাম, দুজন গোড়ালি ধরে থাকত শক্ত করে; দেখে নিতাম ভেলার নীচের দড়ির বাঁধনগুলো ঠিক আছে কি না। দড়িগুলো ঠিক ধরে রাখবে, কিন্তু এক পক্ষকাল, জাহাজিরা বলেছিল, তারপরেই ওগুলো পচে যাবে। একযোগে সকলের এই মন্তব্য সত্ত্বেও কিন্তু আমরা দড়িগুলোতে সামান্যতম ক্ষয়ের চিহ্নও দেখতে পেলাম না। সমুদ্রে বহুদূর চলে যাবার আগে আমরা এর সমাধানও খুঁজে পাইনি অবশ্য। বালসাকাঠ এতটা নরম ছিল যে দড়িগুলোই ক্রমে কেটে বসে গেছিল ওর মধ্যে আর তাতেই রক্ষা পেয়েছিল, লগগুলোয় ঘসে দড়ি ক্ষয়ে যায়নি।

সপ্তাহখানেক বাদে সমুদ্রও শান্ত হয়ে এল আর আমরা খেয়াল করলাম জলটা সবুজের বদলে নীল। সরাসরি উত্তর-পশ্চিমে যাবার বদলে, এবারে আরেকটু পশ্চিম ঘেঁষে চলেছি। তার মানে একটা ক্ষীণ ধারণা হল যে তীরবর্তী স্রোতের বাইরে এসে পড়েছি আর সমুদ্রের আরো ভেতরের দিকেই ভেসে চলেছি।

বাইরের সমুদ্রে ছেড়ে দেবার প্রথম দিন থেকে আমরা ভেলার চারপাশেই মাছ দেখেছিলাম। কিন্তু হাল ধরে রাখতে তখন এত ব্যস্ত ছিলাম যে মাছ ধরবার কথা ভাবিইনি। দ্বিতীয় দিন একঝাঁক সার্ডিনের মধ্যে গিয়ে পড়লাম আর তার পরেই একটা আট-ফুট নীল হাঙর, আমাদের ভেলার কাছে এসে ভেলার পেছনদিকটাতে ডিগবাজি খেয়ে সাদা পেটটা ঘসে দিয়ে গেল। ওখানে হারম্যান আর বেঙ্গট জলে পা ডুবিয়ে হাল ধরেছিল। ওটা চারপাশে খানিকক্ষণ ঘুরঘুর করল, তারপর আমরা হারপুন তৈরি করতে করতেই ভেগে গেল।

পরদিন টুনা, বনিটো আর ডলফিনের দেখা পেলাম, আর একটা বড় উড়ুক্কু মাছ যখন এসে ভেলার ওপর আছড়ে পড়ল আমরা সেটাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দুটো বড়ো ডলফিন (ডোরাডো) ধরলাম, কুড়ি থেকে পঁচিশ পাউন্ড একেকটা। ক’দিনের খাবার সংস্থান হয়ে গেল। স্টিয়ারিং-এর আশেপাশে বহু মাছ দেখলাম, সব মাছ চিনিও না, আর একদিন একঝাঁক শুশুক দেখলাম, সংখ্যায় অগুন্তি। ওদের কালো পিঠগুলো গায়ে গায়ে গাদাগাদি করে ভেলার পাশে পাশে ভাসছিল আর এদিক-সেদিক লাফিয়ে উঠছিল। মাস্তুল থেকে যতদূর চোখ যায়, চতুর্দিকে ওরা ছড়িয়ে ছিল। যত তীর থেকে দূরে যাচ্ছি আর বিষুবরেখার কাছাকাছি আসছি, সবচেয়ে বেশি যে মাছটা দেখা গেল, সেটা উড়ুক্কু মাছ। অবশেষে যখন আমরা নীল সমুদ্রে এসে পড়লাম, সমুদ্রের ঢেউ অসাধারণ সুন্দর লাগছে, সূর্যের আলোয় শান্ত, সাগর হালকা হাওয়ায় কাঁপছে, মাছগুলোকে বৃষ্টির ফোঁটার মতো চকচকে লাগছিল। জল থেকে লাফিয়ে উঠে সোজা সরলরেখায় খানিকটা উড়ে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে আর উড়তে না পেরে জলের নীচে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

রাতে আমাদের ছোট্ট প্যারাফিন ল্যাম্পটা জ্বালালে ছোটো বড়ো উড়ুক্কু মাছগুলো আলোয় আকৃষ্ট হয়ে আমাদের ভেলাতে আছড়ে পড়ত। বাঁশের কেবিনে বা পালে বাধা পেয়ে অসহায়ভাবে ভেলার পাটাতনের ওপর এসে পড়ত। জলে সাঁতরে চলে যেতে না পেরে পড়ে পড়ে বুকের লম্বা পাখনা দিয়ে আছড়াত, ঠিক বড়ো-চোখের হেরিং মাছগুলোর মতো। এমন হয়েছে, একটা বেশ ঠান্ডা মাছ তীব্র বেগে উড়ে এসে বাইরের ডেকে থাকা কারো মুখের ওপর সপাটে এসে পড়ল আর সে খুব জোর গালাগাল দিয়ে উঠল। ওগুলো বেশ জোরেই আসত সামনের দিকে মুখ করে আর তেমন তেমন মুখোমুখি লাগলে জায়গাটা জ্বলে যেত আর ঝনঝন করে উঠত। প্ররোচনাহীন এমন আক্রমন কিন্তু আহত ব্যক্তিটি খুব শিগগিরই ক্ষমা করে দিত, কেননা যত বিপত্তিই হোক আমরা তখন অথৈ সমুদ্রের জাদুর ঘেরে আর বাতাসে ভেসে সোজা সুস্বাদু মাছেরা এসে পড়ছে পাতে। আমরা ব্রেকফাস্টে ওগুলো ভেজে খেতাম, আর মাছের কারণে নাকি রাঁধুনি নাকি আমাদের খিদের কারণে জানি না, আঁশ ছাড়ানোর পর ওগুলো ছোটো ট্রাউট-ভাজার মতোই লাগত।

রাঁধুনির প্রথম দায়িত্ব ছিল সক্কালবেলা ঘুম থেকে উঠেই ডেকে গিয়ে সারারাতে যত উড়ুক্কু মাছ এসে পড়েছে সেগুলো জড়ো করা। সাধারণত আধডজন কি তার বেশিই মাছ থাকত, একবার তো ছাব্বিশটা মোটাসোটা উড়ুক্কুমাছ পেয়েছিলাম ভেলার ওপর। একদিন সকালে দেখি ন্যুট খুব বিমর্ষ হয়ে পড়েছে, কী – না ও যখন মাছ ভাজছিল, একটা উড়ুক্কু মাছ সোজা ফ্রাইংপ্যানের তেলে এসে না পড়ে ওর হাতে এসে পড়েছিল।

সমুদ্রের সঙ্গে আমাদের এই ঘনিষ্ঠ সহাবস্থানটা টরস্টাইন পুরোপুরি বোঝেনি, একদিন ঘুম ভেঙে বালিশের ওপর একটা সার্ডিন দেখে তবে বুঝল। কেবিনের ভেতরে এত কম জায়গা, যে টরস্টাইনকে দরজার কাছে মাথা করে শুতে হত আর কেউ রাত্তিরে বাইরে গেলে অনবধানে মুখে পা লেগে গেলে ও তাকে পায়ে মারত। ও সার্ডিনের লেজটা খপ করে ধরেছিল এমনভাবে যেন বোঝাচ্ছিল, সার্ডিন মাত্রেই ওর খুবই বিশ্বস্ত। আমরা পা-টা যথাসম্ভব গুটিয়ে রাখতাম যাতে পরের রাতগুলোয় টরস্টাইন খানিকটা বেশি জায়গা পায় কিন্তু এমন একটা ঘটনা ঘটল যে টরস্টাইনকে তারপর থেকে কেবিনের রেডিও কর্নারে বাসনকোসনের ওপর শোবার জায়গা করতে হল।

কয়েক রাত পরের ঘটনা। আকাশ মেঘলা, কুপকুপে অন্ধকার, টরস্টাইন ওর মাথার পাশেই প্যারাফিন ল্যাম্পটা রেখেছিল যাতে রাত-পাহারার লোকেরা ওর মাথার ওপর দিয়ে বাইরে যাবার সময় খেয়াল করতে পারে কোথা দিয়ে যাচ্ছে আসছে। চারটে নাগাদ বাতিটা উলটে যেতে টরস্টাইন জেগে গেল, ওর কানের ওপর কিছু একটা ঠান্ডা ভেজা জিনিস ঝাপটা মারছিল। “উড়ুক্কু মাছ,” ও ভাবল, আর বাইরে ফেলবে বলে অন্ধকারেই ওটা হাতড়ে হাতড়ে ধরতে গেল। যেটা হাতে এল সেটা লম্বা এবং ভেজা, আর সাপের মতো বেঁকেচুরেও যাচ্ছিল বলে ও ঝট করে ছেড়ে দিল সেটা, যেন ছ্যাঁকা খেয়েছে। অজানা আগন্তুকটি ছিটকে হারম্যানের দিকে চলে এল আর টরস্টাইন বাতিটাকে আবার জ্বালানোর চেষ্টা করতে লাগল। হারম্যানও উঠে পড়েছিল, আর আমিও জেগে গিয়েছিলাম, ভাবছিলাম অক্টোপাস হবে হয়তো, রাতে জলে ভেসে চলে এসেছে। 

আলোটা জ্বালতে দেখি হারম্যান একটা লম্বা মাছের ঘাড় চেপে ধরে বসে আছে আর সেটা ইল মাছের মতো গা পাকাচ্ছে। মাছটা তিন ফুটের ওপর লম্বা, সাপের মতো সরু, ঘোলাটে কালো চোখ আর লম্বা নাক; ওর হাঁ-করা চোয়ালে সারিসারি লম্বা ধারালো দাঁত। দাঁতগুলো ছুরির মতো ধারালো আর ওপরের চোয়ালে উলটোদিকে ভাঁজ হয় যাতে গিলে নেওয়া খাদ্যবস্তুটা সহজে পেছনের দিকে চলে যায়। হারম্যানের হাতে-ধরা অবস্থাতেই একটা আট-ইঞ্চি মতো বড়ো বড়ো চোখের সাদা রঙের মাছ রাক্ষুসে মাছটার পেট থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এল আর তার পরে পরেই আরো একটা। পরিষ্কার এ-দুটোই গভীর জলের মাছ, সাপের মতো মাছটার দাঁতে ছিন্নভিন্ন। সাপের মতো মাছটার পাতলা চামড়াটা পিঠের দিকে নীলচে-বেগুনী রঙের, পেটের দিকে ইস্পাত-নীল, ধরা অবস্থায় ওটার গা থেকে হাতে আঁশ উঠে আসছিল।

চেঁচামেচিতে বেঙ্গটেরও শেষে ঘুম ভেঙে গেছিল, আমরা বাতিটা আর লম্বা মাছটা ওর মুখের কাছে ধরলাম। ঘুম ঘুম চোখে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে উঠে বসে ও গম্ভীরভাবে বলল, “না, এ-রকম মাছ আর জীবিত নেই।” বলে ও পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

বেঙ্গট খুব ভুল বলেনি। মোদ্দা ব্যাপারটা দাঁড়াল, আমরা ছ’জন বাতির আলোতে বাঁশের কেবিনের মধ্যে গোল হয়ে বসে এরকম মাছ জীবন্ত সর্বপ্রথম চাক্ষুষ করলাম। কেবলমাত্র এ-রকম মাছের কঙ্কাল দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল আর গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জে কয়েকবার দেখা গেছে। মৎস্যবিজ্ঞানীরা একে বলেন জেমপিলাস বা স্নেক ম্যাকারেল। ওরা মনে করেন মাছগুলো গভীর সমুদ্রের একেবারে তলায় বিচরণ করে কেননা কেউই জীবিত ওটাকে দেখেনি। কিন্তু অত গভীরে নিশ্চিত দিনের বেলাতেই থাকবে কারণ বড়ো চোখগুলোতে সূর্যের আলো পড়লে ওরা নিশ্চই অন্ধকার দেখে। ঘন অন্ধকার রাতে জেমপিলাস সমুদ্রের ওপরের দিকে ভেসে ওঠে; ভেলায় আমাদের সে অভিজ্ঞতা হয়েছে।

টরস্টাইনের স্লিপিং ব্যাগে ওই বিরল মাছটা এসে পড়ার এক সপ্তাহ বাদে, আরেক অতিথি এসে হাজির। আবার সেই সকাল চারটে, অমাবস্যার চাঁদ ডুবে গেছে, অন্ধকার, তবে তারারা জ্বলজ্বল করছে। ভেলা নিরুপদ্রবে ভেসে যাচ্ছিল। আমার পাহারার পালা শেষ হলে, পরের লোকটার জন্যে ভেলার চারপাশটা দেখে নিচ্ছিলাম সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না। আমার কোমরে একটা দড়ি বাঁধা ছিল, পাহারার সময় যেটা থাকেই; আমি খুব সাবধানে হাতে প্যারাফিনের বাতিটা নিয়ে একদম বাইরের লগটা ধরে ঘুরে মাস্তুলের ওপাশে যাচ্ছিলাম। কাঠটা ভিজে আর খুব পেছল হয়েছিল, আচমকা কেউ দড়িটা ধরে হ্যাঁচকা টান দিতে খুব খেপে গেলাম আমি, প্রায় ভারসাম্য হারিয়ে ফেললাম আরকি। রাগের চোটে বাতিটা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম, কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। দড়িতে নতুন করে  হ্যাঁচকা লাগাতে দেখি ডেকের ওপর একটা চকচকে কিছু পড়ে মোচড়াচ্ছে। একটা নয়া জেমপিলাস, দড়িটাতে এমন জোর কামড় দিয়েছে যে ছাড়াতে ছাড়াতে ওটার কয়েকটা দাঁত ভেঙে গেল। লন্ঠনের আলোটা সাদা রঙের দড়িতে এমনভাবে পড়েছিল যে আমাদের অতিথি ভেবেছিল জলের তলা থেকে লাফ দিয়ে উঠে এসে একটা বেশ লম্বা মতো মুখরোচক শিকার ধরবে। শেষে একটা ফর্মালিনের জারে ওটার ঠাঁই হল।

সমুদ্রের ঠিক ওপরের তলে কেউ যদি হৈ চৈ না করে আস্তে আস্তে ভেসে ভেসে চলে, তার জন্য সমুদ্রের অনেক বিস্ময় জমা থাকে। একজন শিকারী জঙ্গল-টঙ্গল ভেঙে মাথায় করে ফিরে এসে হয়ত বলল কোনো জানোয়ারেরই দেখা পায়নি। আরেকজন হয়তো চুপ করে গাছের আড়ালে বসে রইল, তার চারপাশেই যত খচমচ কিচকিচ শুরু হয়ে যাবে, কৌতূহলী চোখেরাও বেরিয়ে আসবে ঝোপঝাড় থেকে। সমুদ্রেও তাই-ই। আমরা সাধারণত ইঞ্জিনের গর্জন আর বিরাট বিরাট পিস্টনের আঘাতে চারদিকে সমুদ্রের জলে ফেনা টেনা উঠিয়ে জল কেটে কেটে এগোই। তারপর ফিরে এসে বলি দূরের সমুদ্রে দেখার কিচ্ছুটি নেই।

অথচ সমুদ্রের ওপরে ভেসে ভেসে চলার সময় এমন একটা দিনও যায়নি, কোনো না কোনো কৌতূহলী অতিথি এসে ঠিক ভেলার চারপাশে পাক খেয়েছে বা পাখা ঝাপটেছে; তার মধ্যে কয়েকটা তো, যেমন ডলফিন বা পাইলট ফিশ, এতই অভ্যস্ত হয়ে গেল, যে দিন-রাত আমাদের চারপাশে পাক দিতে দিতে ভেলার সঙ্গে সঙ্গেই চলল।   

যখন রাত নামে, আর ক্রান্তীয় রাতের আকাশে তারা ফুটে ওঠে, আমাদের চারপাশে তারাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনুপ্রভা ফোটে। একেকটা উজ্জ্বল প্ল্যাঙ্কটন এমন জীবন্ত গোল গোল প্রবালের মতো লাগে যে ঢেউয়ের ধাক্কায় ভেলার পেছনটায় আমাদের পায়ের কাছাকাছি এলেই আমরা আপনা থেকেই পা গুটিয়ে নিই। ধরে দেখেছি ওগুলো খুব উজ্জ্বল একধরনের ছোটো পোকার মতো। এরকম রাতে কখনো হঠাৎ আমাদের চমকে দিয়ে ভেলার পাশে জ্বলজ্বলে দুটো গোল গোল চোখ ভেসে উঠে অপলক সম্মোহিত দৃষ্টিতে আমাদের দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থেকেছে। মাঝে মাঝে বড়ো বড়ো অক্টোপাস জলের ওপরে ভেসে উঠত, ওদের শয়তানের মতো সবুজ চোখগুলো অন্ধকারে জুলজুল করে চেয়ে ফসফরাসের মতো জ্বলত। মাঝে মাঝে চোখগুলো হত গভীর জলের মাছেদের যারা কেবল রাতেই জলের ওপরে উঠে আসে, আর চোখের সামনে মিটমিটে আলো জ্বলতে দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত। অনেকসময় সমুদ্র যখন শান্ত, ভেলার চারপাশের কালো জল দু তিন ফুট ব্যাসের গোল গোল মাথাতে ভরে যেত। ওরা চুপচাপ বড়ো বড়ো উজ্জ্বল চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকত কেবল। অন্য কোনো কোনো রাতে তিন ফুট বা তার চেয়ে বড়ো আলোর গোলা জলের নীচে হঠাৎ হঠাৎ জ্বলতে দেখা যেত, যেন একমুহূর্তের জন্য ইলেক্ট্রিক বাতি জ্বালাচ্ছে কেউ।

ক্রমশ ভেলার মেঝের নীচ দিয়ে সমুদ্রের তলার বা ডুব-সমুদ্রের এই প্রাণীগুলির ঘোরাফেরায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেলাম, তা সত্ত্বেও নতুন কোনো প্রজাতির উদয় হলে একইরকম বিস্মিতও হয়েছি। একদিন, মেঘলা আকাশ, রাত দুটো বাজে, হালে যে বসেছিল সে মিশকালো আকাশ আর জলের তফাৎ করতে পারছে না, এমন সময় সে জলের তলায় খুব হালকা আলোর আভাস দেখতে পেল। ক্রমশ সেটা একটা বড়ো প্রাণীর আকার নিল। বলা কঠিন যে ওটা ওর গায়ে লেগে থাকা প্ল্যাঙ্কটনের আভা নাকি প্রাণীটার নিজের গায়েরই ফসফরাসের আলো, কিন্তু অন্ধকার জলের তলায় ওই আভা প্রাণীটার আবছা, অস্থির অবয়ব ফুটিয়ে তুলেছিল। কখনো সেটা গোলাকার, কখনো ডিম্বাকৃতি, কখনো ত্রিকোন আর হঠাৎই সেটা দুভাগে ভাগ হয়ে ভেলার তলায় আলাদা আলাদা আসা যাওয়া শুরু করে দিল। শেষে ভেলার নীচে ছোটো ছোটো বৃত্তে এ-রকম তিনটে আভাযুক্ত ছায়ামূর্তি ঘুরতে লাগল।

ওগুলো সত্যিই দানো, কেননা ওদের শরীরের যতটুকু দেখা যাচ্ছিল সেটাই পাঁচ ফ্যাদমের ওপর লম্বা। আমরা ডেকের ওপর জড়ো হয়ে এসে ওই ভূতের নেত্য দেখছিলাম। ভেলার গতির সঙ্গে সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা চলেছিল সেটা। নিঃশব্দ ও রহস্যময়, আমাদের উজ্জ্বল সাথীরা জলের যথেষ্ট গভীরেই ছিল, বিশেষত ভেলার পেছনের দিকটায়, যেদিকে আলোটা রাখা ছিল। কিন্তু সামনের দিকে কখনো কখনো ভেলার ঠিক নীচেই এসে উপস্থিত হচ্ছিল। ওদের পিঠের আলো থেকে আন্দাজ করা গিয়েছিল, প্রাণীগুলো হাতির চেয়েও বড়ো, কিন্তু তিমি নয়, কেননা শ্বাস নিতে ওপরে ওঠেনি একবারও। ওগুলো কি দৈত্যাকার রে-ফিশ ছিল যে পাশ ফিরে গেলেই অন্য চেহারা হচ্ছিল? কী সেটা দেখার জন্য একেবারে জলের ভেতরে আলো ফেলে ওটাকে আকর্ষণ করার চেষ্টা চালিয়েও দেখেছি, ওগুলো পাত্তাও দেয়নি। ভোর হয়ে আসার মুখেই অপদেবতা বা ভূতের মতোই ওরা জলের আরো গভীরে ডুবে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

রাত্তিরের ওই ঘটনার ব্যাখ্যা আমরা কিছুতেই পেতাম না যদি-না দিন দেড়েক বাদে ঝকঝকে দিনের আলোয় আবার তাদের দেখা যেত। মে মাসের চব্বিশ তারিখ, আমরা সেদিন ধীরে সুস্থে ভেসে চলেছিলাম আর আমাদের সঠিক অবস্থান তখন ৯৫°পশ্চিম ৭°দক্ষিণে। প্রায় বারোটা নাগাদ, আমরা সকালে ধরা বড়ো দু’খানা ডলফিনের নাড়িভুঁড়ি জলে ছুঁড়ে ফেলেছিলাম। ভেলার সামনের দিকে, চারপাশটায় নজর রাখতে রাখতে আমি একটা দড়ি ধরে জলের মধ্যে নেমে গুছিয়ে স্নান করছিলাম, এমন সময় দেখি একটা ছ’ফুট লম্বা বাদামি রঙের মোটাসোটা মাছ স্বচ্ছ জলের মধ্যে দিয়ে খুব কৌতূহলে সাঁতরে আমার দিকে আসছে। আমি চট করে ভেলার কিনারে উঠে রোদ্দুরের মধ্যে বসে দেখছি, মাছটা চুপচাপ সাঁতরে গেল, এমন সময় ন্যুট বিকট গলায় চেঁচিয়ে উঠল; ও বাঁশের কেবিনের পেছনদিকে বসেছিল। ও চেঁচিয়ে উঠল, “হাঙর হাঙর!” চেঁচাতে চেঁচাতে ওর গলা ভেঙে গেল। আমরা রোজই ভেলার পাশ দিয়ে হাঙরদের সাঁতরাতে দেখেছি, কোনোদিনই এত উত্তেজনার কারণ ঘটেনি, নিশ্চই অতিরিক্ত অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে, ভেবে আমরা ন্যুটের কাছে এসে জড়ো হলাম। ন্যুট বসে বসে ওর প্যান্টটা কাচছিল, হঠাৎ একবার চোখ তুলতেই সরাসরি ওর চোখ পড়ে বিরাট আর কুৎসিততম একটা মুখের ওপর, তেমনটা আমরা হয়তো সারাজীবনেও দেখিনি। প্রকৃতই একটা সাগর-দানো, এত বড়ো আর ভয়ঙ্কর, যে, সমুদ্র-দেবতাও যদি জল থেকে উঠে আসতেন আমাদের এমনি অবস্থা হত না। মাথাটা চওড়া আর ব্যাঙের মতো চ্যাপটা, দুপাশে ছোটো ছোটো দুটো চোখ, চার থেকে পাঁচ ফুট চওড়া কুনো ব্যাঙের মতো চোয়াল, মুখের দুপাশ থেকে লম্বা লম্বা শুঁয়ো ঝুলছে। মাথার পেছনে বিশাল দেহটার শেষদিকটা লম্বাটে আর সরু হয়ে শেষে একটা শ্রোণীপাখনা। পাখনাটা খাড়া হয়ে ছিল যাতে বোঝা যায় সাগর-দানোটা কোনো তিমির প্রজাতি নয়। জলের নীচে দেহটা বাদামি রঙের দেখাচ্ছিল, কিন্তু মাথা আর সারাটা দেহ ছোটো ছোটো সাদা বিন্দু বিন্দু দাগে ঢাকা।    দানোটা চুপচাপ এসে আমাদের পেছন পেছন অলসভাবে সাঁতরাতে লাগল। বুলডগের মতো তাকিয়ে শান্তভাবে লেজ আছড়াচ্ছিল। গোলাকার পিঠের পাখনাটা জলের ওপরে উঠেছিল, কখনো কখনো শ্রোণী-পাখনাটাও। যখন ঢেউয়ের নীচে পড়ে যাচ্ছে ওটার চওড়া পিঠের ওপর দিয়ে জল বয়ে যাচ্ছিল যেন ডুবে থাকা প্রবালপ্রাচীরের ওপর দিয়ে বইছে। চওড়া চোয়ালের ঠিক সামনেটায় ছড়ানো পাখার মতো একঝাঁক জেব্রার মতো ডোরাকাটা পাইলট-ফিশ সাঁতার দিচ্ছিল আর বড়ো রেমোরা মাছ ও অন্যান্য পরজীবীগুলো দানোটার গায়ে সেঁটে ওর সঙ্গেই সাঁতার কাটছিল। পুরো ব্যাপারটা দেখাচ্ছিল যেন একটা আস্ত ভাসমান গভীর প্রবাল-প্রাচীরের গায়ে লেগে থাকা অদ্ভুত প্রাণী-বৈচিত্রের স্তূপ।

পঁচিশ পাউন্ডের একটা ডলফিন আমাদের সবচেয়ে বড়ো ছ’খানা মাছধরার হুকে হাঙরদের টোপ হিসেবে ভেলার পেছনদিকে জলে ফেলা ছিল। একঝাঁক পাইলট-ফিশ সোজা নাক বরাবর ডলফিনটার কাছ অবধি এসে ওটাকে না ছুঁয়েই দ্রুত তাদের মনিব ও প্রভু, মহারাজের কাছে ফিরে ফিরে যাচ্ছিল। একটা যান্ত্রিক দৈত্যের মতোই ওটা ওর সাকরেদদের ডলফিনটা অবধি ক্রমান্বয়ে সাঁতার দিয়ে গিয়ে ফিরে ফিরে আসার জন্য লাগিয়ে রেখেছিল। বেচারা ডলফিনটা ওর চোয়ালের সামনে অসহায় তুচ্ছ জিনিসের মতো ভাসছিল। আমরা ডলফিনটাকে টেনে আনলেই দানোটা আস্তে আস্তে ওকে অনুসরণ করে ভেলার কাছাকাছি চলে আসছিল। ডলফিনটা ধাক্কা খাচ্ছিল ওর মুখে কিন্তু ওটা মুখ খুলছিল না, যেন এই সামান্য বস্তুটার জন্য হাঁ করার কোনো মানেই হয় না। দৈত্যটা যখন ভেলার কাছাকাছি এল ওর পিঠটা আমাদের দাঁড়ে ঘসে গেল খানিক, একটু আগেই দাঁড়টা জল থেকে উঠিয়ে নিয়েছিলাম আমরা; এবারে দানোটাকে খুব কাছ থেকে দেখার সু্যোগ ঘটল। এতটাই কাছে যে এরকম অসাধারণ দৃশ্য দেখে আমরা উত্তেজিত হয়ে বেশিই হৈ চৈ চিৎকার করে উঠেছিলাম আর আমার মনে হল আমাদের সবার মাথাটা বুঝি খারাপ হয়ে গেছে। সমস্ত কল্পনাশক্তি নিয়ে ওয়াল্ট ডিজনির মতো লোকও এরকম লোম খাড়া করে দেবার মতো সাগর-দানোর কল্পনা করতে পারবেন না, যেটা সে মুহূর্তে আমাদের ভেলার পাশে ভয়ানক মুখ নিয়ে ভেসেছিল।

দানোটা ছিল একটা তিমি-হাঙর, সবচেয়ে বড়ো প্রজাতির হাঙর এবং আজ অবধি জানা পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো মাছ। উত্তরোত্তর বিরল হয়ে আসছে এগুলো তবু ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে এখানে-ওখানে ছড়ানো ছেটানো কিছু নমুনা দেখা যায়। তিমি-হাঙরদের গড় দৈর্ঘ্য পঞ্চাশ ফুট আর প্রাণীতত্ববিদদের মতে এদের ওজন পঞ্চাশ টনের মতো। বলা হয় বড়োসড়ো একটা হাঙর প্রায় ষাটফুট অবধি লম্বা হয়; একটা শিশু হাঙর হারপুনে শিকার করে দেখা গেছে লিভারটা ছ’শো পাউন্ড আর প্রতিটা চওড়া চোয়ালে হাজার তিনেক দাঁত আছে।

আমাদের দানোটা এত বড়ো ছিল যে ওটা যখন আমাদের চারপাশে আর ভেলার তলা দিয়ে সাঁতরাচ্ছিল তখন ওর মাথাটা ভেলার একদিকে আর লম্বা লেজটা আরেকদিকে দেখা যাচ্ছিল। আর পুরোটা যখন দেখা যাচ্ছিল, এমন বিদঘুটে, মন্থর ও নিরেট লাগছিল যে আমরা হো হো করে না হেসে থাকতে পারিনি, যদিও জানতাম ওর এত শক্তি যে আমাদের আক্রমণ করলে লেজের এক আঘাতেই বালসা লগ দড়িদড়াসুদ্ধ কুটিকুটি করে দিতে পারে। ভেলার নীচে ক্রমাগত চক্করটা ছোটো করে আনছিল ও; বসে বসে কী হয় দেখা ছাড়া আমাদের আর কীই বা করণীয় ছিল! দাঁড়ের নীচ দিয়ে সাঁতরে অন্যপাশে বাতাসে ভেসে ওঠার সময় ওর পিঠে দাঁড়ের চওড়া অংশটা পিছলে যাচ্ছিল।

ভেলার চারপাশে আমরা হারপুন হাতে নিয়ে তৈরি হয়েই দাঁড়িয়েছিলাম, কিন্তু সেগুলো ওই বিশাল জানোয়ারটার কাছে খড়কে কাঠির মতো লাগছিল। মনে হচ্ছিল না তিমি-হাঙরটা আদৌ আমাদের ছেড়ে চলে যাবার কথা ভাবছে; চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে ভেলার খুব কাছাকাছি থেকেই প্রভুভক্ত কুকুরের মতো অনুসরণ করছিল আমাদের। আমাদের কারোরই এমন অভিজ্ঞতা আগে হয়নি বা কেউ ভাবেওনি যে এমন একটা অভিজ্ঞতা হবে। আমাদের পেছনে বা ভেলার তলা দিয়ে সাগর-দানোর এই সাঁতারের গোটা ঘটনাটা এতটাই অবিশ্বাস্য আর অস্বাভাবিক যে কেউই এটাকে সত্যি সত্যি ততখানি গুরুত্বও দিতে পারিনি।

প্রকৃতপক্ষে তিমি-হাঙরটা আমাদের চারপাশে ঘুরেছিল একঘন্টা মতো, কিন্তু আমাদের মনে হচ্ছিল যেন গোটা দিন জুড়ে ঘটেছে। অবশেষে এরিকের কাছে ব্যাপারটা চরম উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়াল; ও ভেলার কোণায় একটা আটফুটি হাতে-ছোঁড়া-হারপুন নিয়ে দাঁড়িয়েছিল; ভুলভাল চিৎকারের চোটে বেশি উৎসাহিত হয়ে ও হারপুনটা মাথার ওপরে তুলে ধরল। তিমি হাঙরটা ধীরে ধীরে ওর দিকে আসতেই, ওর মাথাটা যেই ভেলার একটা কোণায় জলের নীচে এসেছে এরিক সর্বশক্তি জড়ো করে প্রাণীটার মাথার নরম হাড়ের মধ্যে হারপুনটা গেঁথে দিল। কী ঘটছে সেটা বুঝতে  দানোটা এক দু’সেকেন্ড সময় নিল। এক লহমায় ধীর-স্থির বোকাসোকাটা একটা ইস্পাত-কঠিন পেশির পাহাড়ে পরিণত হল।

ভেলার ধার ঘেঁষে ছুটে যাওয়া হারপুনের দড়ির হিসহিসে শব্দ শুনতে পেলাম, দানোটা মাথা উঁচু করেই সোজা গভীরে ডুব দিল আর একরাশ জল ছিটকে উঠল। কাছাকাছি যে তিনজন দাঁড়িয়েছিল ভেলায়, তারা উলটে পড়ল, দড়ির টানে তাদের দুজনের চামড়া জ্বলে এবং ছড়েও গেল। অত শক্তপোক্ত দড়ি, নৌকো বাঁধার জন্য যা যথেষ্ট, ভেলার একদিকে গিয়ে আটকালো আর সঙ্গে সঙ্গেই পাতলা সুতোর মতো ছিঁড়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড বাদে ভাঙা হারপুনের হাতলটা দু’শো গজ দূরে ভেসে উঠল। তটস্থ পাইলট মাছের দলটা তড়িঘড়ি ছুটল ওদের প্রভু ও মনিবের দিকে। আমরা অপেক্ষা করে রইলাম কখন ক্ষিপ্ত দানোটা সাবমেরিনের মতো ধেয়ে আসে, কিন্তু পরে আর কখনোই ওটাকে আমরা দেখিনি।

তখন দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতে পড়ে গেছি, পশ্চিমদিকে ভেসে চলেছি, গ্যালাপ্যাগোসের ৪০০ সামুদ্রিক মাইল দক্ষিণে। গ্যালাপ্যাগোস-স্রোতে ভেসে চলে যাবার ভয়টা আর নেই, ওই দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে এখন যোগসূত্র কেবল ভেসে আসা বিশাল বিশাল কচ্ছপরা, এবং সন্দেহ নেই ওগুলো দ্বীপ থেকে বহুদূর সমুদ্রে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভেসে এসেছে। একদিন দেখি একটা বেশ বড়ো কাছিম, ওর মাথাটা আর বড় পাখনাটা জলের ওপর তুলে খাবি খাচ্ছে। ওটা ঢেউয়ের মাথায় উঠতেই খেয়াল করলাম নীচে জলের মধ্যে সবুজ নীল আর সোনালি রঙ ঝিলিক দিল। আবিষ্কার করলাম কাছিমটা ডলফিনের সঙ্গে মরণ-বাঁচন যুদ্ধে রয়েছে। লড়াইটা আপাতভাবে একতরফা লাগছিল; বারো থেকে পনেরোটা বড়ো-মাথার চমৎকার রঙের ডলফিন কাছিমটার ঘাড় আর পাখনা লক্ষ করে আক্রমণ করছিল আর মনে হচ্ছিল ওটাকে ক্লান্ত করে দিতে চাইছে যেন ও বহুদিন খোলের মধ্যে গুটিয়ে চুপচাপ পড়ে থাকতে পারেনি।

ভেলাটাকে দেখতে পেয়ে, কাছিমটা, রঙিন ডলফিনের তাড়ায়, জলে ডুব দিয়ে সোজা আমাদের দিকেই এল। কাছাকাছি এসে ভেলার পাশ দিয়ে যেই কাঠের ওপরে ওঠার চেষ্টা করছিল, দেখতে পেয়ে গেল আমরা ঠিক ওখানেই দাঁড়িয়ে আছি। বিশাল কাছিমটা যখন ভেলার পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে সাঁতরে যাচ্ছিল, অভ্যাসে থাকলে আমরা সহজেই ওটাকে দড়ি দিয়ে ধরে ফেলতে পারতাম। কিন্তু ওটাকে দেখতেই এত ব্যস্ত ছিলাম যে ল্যাসো তৈরি হতে হতে বিশাল কাছিমটা আমাদের ভেলা পেরিয়ে সামনের দিকে চলে গেল। রাবারের ডিঙিটা তড়িঘড়ি জলে নামিয়ে, হারম্যান, বেঙ্গট, আর টরস্টাইন তাতে চড়ে বসল ওটাকে ধরার জন্য। ডিঙিটা একটা গোলাকার বাদামের খোলার মতো আর ওদের সামনে সাঁতার কেটে চলা প্রাণীটার চেয়ে খুব একটা বড়োও নয়। স্টুয়ার্ড বেঙ্গট মানসচক্ষে প্রভূত মাংসের পদ আর সবচেয়ে সুস্বাদু টার্টল-সুপ দেখতেও পাচ্ছিল।

কিন্তু ওরা যত দ্রুত ডিঙি চালায়, কাছিমটা আরো দ্রুত জলের নীচে এগিয়ে যায়। ওরা ভেলা থেকে একশ গজ যেতে না যেতেই, কাছিমটা হঠাৎ জলের তলায় মিলিয়ে গেল, কোনো চিহ্নই পাওয়া গেল না আর। কিন্তু ওরা একটা দারুণ কাজ করেছিল, যাহোক তাহোক। ডিঙিটা যখন ঢেউয়ের ওপর দিয়ে নাচতে নাচতে ফিরছে, পেছন পেছন পুরো ঝকঝকে ডলফিনের ঝাঁকটাও। ডলফিনেরা এবারে এই নয়া কাছিমটার চারপাশে চক্কর দিচ্ছিল, আর দাঁড়ের চওড়া যে অংশটা পাখনার মতো জলে পড়ছিল, ওদের মধ্যে সবচেয়ে সাহসীটা এসে সেটায় ঢুঁ দিল। ইতিমধ্যে অবশ্য নির্বিবাদী কচ্ছপটা সমস্ত ইতর নিগ্রহকারীদের হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে যেতে পেরেছিল।      

                             ক্রমশ

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s