ধারাবাহিক উপন্যাস অন্তিম অভিযান পিটার বিশ্বাস শরৎ ২০১৬

ধারাবাহিকের আগের এপিসোডগুলো

dharaontim01 (Small) (2)“যানে স্বাগত জুনিয়র পোন,” টাইকো ফের একবার কথা বলে উঠেছে।

“জবাব দে ক্রিস্টোফার। তোকে বলছে।” কা পোন ছেলেটার মাথায় মৃদু হাত বুলিয়ে দিলেন একবার। দুর্ভাগা ছেলেটা জানে না যে আজ ও সত্যিই অনাথ হয়েছে। প্রফেসর বোসের ধুলো হয়ে যাওয়া শরীরটা এখন মিশে আছে কয়েক মাইল দূরের ওই পাহাড়ের মাটিপাথরের গায়ে।

কথাটা মনে হতে বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল কা পোনের। ছেলেটা জানে না, কত কঠিন কাজ রয়েছে তার সামনে। ওই কিশোর মানুষটার ওপরেই পৃথিবীকে রক্ষা করবার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছেন প্রফেসর। আর তাকে দিয়ে গিয়েছেন ওকে বড়ো করে তুলে নির্দিষ্ট সময়ে তার দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেবার কাজ প্রফেসর তার হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছেন। ওর পকেট থেকে পাওয়া কাগজের টুকরোটায় প্রফেসরের চিঠির  শেষ লাইনগুলো তার চোখের সামনে ভাসছিল-

“—মহাকাশবিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষা যেন পায় ও। তারপর নির্দিষ্ট সময় এসে হাজির হলে ওর গলার তাবিজে সংরক্ষিত প্রতিষেধক খাইয়ে ওর স্মৃতি ফিরিয়ে দেবে তুমি। মনে রেখো তারপর ওকে যে গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে তার ওপরে পৃথিবীর ভবিষ্যত নির্ভর করছে। জিষ্ণু আমাদের শেষ অস্ত্র। তাকে রক্ষা করবার, গড়ে তোলবার সমস্ত দায়িত্ব আমি তোমাকে দিয়ে গেলাম—

“আ-আমাকে?”

“হ্যাঁ রে ব্যাটা। তোকে। কোন দুর্ঘটনায় কীভাবে তুই নিজের পরিচয় খুইয়েছিস কে জানে। আজ থেকে তুই আমার ছেলে ক্রিস্টোফার। এই পরিচয়েই তোকে সবাই জানবে এখন থেকে।”

ছেলেটা চুপ করে বসে রইল। ওর মনের মধ্যে কী চলছে তার আন্দাজ করতে পারছিলেন কা পোন। হঠাৎ খোলা গলায় ফের হেসেউঠে তার পিঠে একটা চাপড় মেরে তিনি বললেন, “আরে এত গোমড়া মুখে বসে থাকলে হবে? জীবনটা তো একটা খেলা রে! নতুন জীবন, নতুন কাজ! তবে হ্যাঁ। বসে থাকা চলবে না তোর। সব তো ভুলে বসেছিস। তাহলে চলবে কী করে? পড়াশোনা করতে হবে তোকে নতুন করে। আয় দেখা যাক কতটুকু কী জানিস তুই। টাইকো কিন্তু কুকুর হলেও খুব ভালো শিক্ষক। ওর হাতেই শুরু হোক তবে। টাইকো—”

২১২৪ খ্রিস্টাব্দ

টেবিলের ওপরে ছোটো বাক্সটা মৃদু সিঁ-ই-ই করে একটা আওয়াজ করে উঠল একবার।  বাবার কল নিশ্চয়। সেই কলেজে যাবার পর থেকে এতগুলো বছর কেটে গেল, কিন্তু আজও সকালবেলা এই ঘুম ভাঙানোর কাজটা বাবা করবেই। পৃথিবীর যেখানে থাকুক না কেন, এ ফোনের বিরতি নেই। একবার সকালে ডাকল, তখন ক্রিস্টোফার দেখে কমিউনিকেটরের পর্দায় গভীর জঙ্গল। জিজ্ঞাস করতে বাবা বলে, “আমাজনে ক্র্যাশল্যান্ড করেছি আজ ভোরে।” তবু ভোরবেলা তাকে ডাকার রুটিনে অদলবদল হয়নি। 

ঘুম চোখে হাত বাড়িয়ে সেটাকে কাছে টেনে আনতেআনতেই ক্রিস্টোফার সটান উঠে বসল এবারে। মৃদু বিকর্ষণক্ষেত্রের অদৃশ্য গদিটা নিজের অবস্থান বদলে তার পিঠের কাছে হেলে উঠেছে।

আরাম করে তাতে হেলান দিয়ে বসে চারপাশে একবার ভালো করে চেয়ে দেখল সে। সুনীলের ঘুমন্ত শরীরটা বাতাসে ভাসতে ভাসতে এদিকওদিক দুলছে। সেদিকে তাকিয়ে একটু হাসল ক্রিস্টোফার। ঘুমের মধ্যে দোল খাওয়াটা সুনীলের অনেককালের অভ্যাস। কলেজের হস্টেল থেকেই তারা চিরকালের রুমমেট। সেখানেও সেই একই অভ্যাস দেখেছে। তারপর, এতটা বড়ো হয়ে, যশপাল মহাকাশগবেষণাকেন্দ্রের একজন নামি বিজ্ঞানি হয়েও সে অভ্যেসটা গেল না তার। যেখানে যাবে, সবার আগে নিজের বিকর্ষণ শক্তিক্ষেত্রের গদিটাকে আগে রিপ্রোগ্রাম করবে ঘুমের মধ্যে দোল খাবার জন্য।

আওয়াজটা পেয়ে সুনীলও জেগে উঠেছিল। ভাসতে ভাসতে তার কাছে এসে বলে, “মাঝরাত্তিরে অ্যালার্ম বাজাচ্ছিস কেন রে?”

“মাঝরাত? মানে?” বলতেবলতেই কমিউনিকেটরের এক কোণে জ্বলতে থাকা ঘড়িটার দিকে চোখ গিয়েছে ক্রিস্টোফারের। সেখানে দেখাচ্ছিল রাত দুটো। বাবার আজ হল কী? কোন অ্যাক্সিডেন্ট টেন্ট-

একটু বিরক্ত হয়েই বাক্সের গায়ের বোতামটা টিপে ধরল জিষ্ণু, “কী হল বাবা? এত রাতে-” পর্দায় ততক্ষণে টাইকোর কুকুরের মুখটা ভেসে উঠেছে। গম্ভীর হয়ে তাকিয়েছিল সে জিষ্ণুর দিকে।

“নে। তোর মাস্টারমশাই এসেছেন। কথা বলতে থাক। আমি ঘুমুই গিয়ে-”

মুচকি হেসে হাতের একটা ইশারা করতেই বিছানাটা সুনীলকে নিয়ে ভেসে গিয়ে একেবারে ছাদের কাছাকাছি ঝুলে রইল। সেদিকে তাকিয়ে একটু হাসল ক্রিস্টোফার। ছোটোবেলায় সে যে কোন স্কুলে যায়নি সেকথা সকলেই জানে। বছরচারেক আগে,বর্ধমানের মহাকাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাবার সময় ফর্মে এ তথ্যটা দেবার পর তার বাবাকে ডাকাও হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের তরফে। কোনদিন স্কুলের শিক্ষা না পাওয়া কোন ছাত্র নিজের চেষ্টায় পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন প্রবেশিকা পরীক্ষাটায় একশো শতাংশ নম্বর পেয়েছে তা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। মিস্টার কা পোন নিজে এসেও সে তথ্যের সত্যতা স্বীকার করে গিয়েছেন।

তার পড়াশোনাটা যে ঠিক কার কাছে হয়েছে সে খবরটা জিষ্ণু শুধু সুনীলকেই জানিয়েছে। সুনীল তার প্রাণের বন্ধু। কিন্তু তবু খবরটা শুনে সে অনেকক্ষণ হো হো করে হেসেছিল। বলে, “একটা যন্ত্রকুকুরের প্রোগ্রাম তোকে পড়িয়েছে? ধুস!”

তবে তার পর এতগুলো বছর ধরে আস্তে আস্তে টাইকোর কাছ থেকে বেশ কিছু মুশকিল আসান হবার পর সে-ও টাইকোকে একটু সমীহই করে চলে। বিশেষ করে পরীক্ষাগুলোর আগে তার কাছে টাইকোর  খাতির যথেষ্টই বেড়ে ওঠে। তবে মজাটা সে এখনো করতে ছাড়ে না।

“এত রাত্রে আমায় ডাকলে কেন টাইকো?”

পর্দায় টাইকো মৃদু গরগর করে উঠল একবার, “কয়েকটা জরুরি কথা তোমাকে জানানো দরকার জুনিয়র পোন। তোমার কালকের ইনটারভিউয়ের ব্যাপারে। মালিকের একটা ইচ্ছে তিনি তোমাকে জানাতে বলেছেন।”

“বাবার? কী ইচ্ছে?”

“তুমি সুইফট টাটল ধূমকেতুর বিষয়ে কী জান?”

ক্রিস্টোফার মৃদু হাসল। গত বছরদুয়েক ধরেই এই গুজবটা চলছে। সুইফট টাটল নাকি পৃথিবীর সঙ্গে সরাসরি ধাক্কার গতিপথে রয়েছে। ব্যাপারটা অবশ্য গুজব, কারণ—”

“তুমি কী ভাবছ আমি জানি ক্রিস। তব জেনে রাখো, বিষয়টা গুজব নয়।”

ক্রিস্টোফার একটু অবাক হচ্ছিল। কা পোন নিজের ব্যাবসাবাণিজ্য নিয়ে থাকেন। মহাকাশবিদ্যা তাঁর এলাকা নয়। তবুও তিনি তাকে একরকম জোর করেই বর্ধমানে পাঠিয়েছিলেন বিষয়টা নিয়ে পড়াশোনার জন্য। হয়ত কোন অধরা স্বপ্ন ছিল তাঁর, তাই পূরণের চেষ্টা করছেন পালিত ছেলেটিকে দিয়ে। কথাটা ভেবে ক্রিস্টোফার তাঁর ইচ্ছেয় কোন বাধা দেয়নি। সেখান থেকে এই যশপালে পিএইচ ডি করতে আসাটা অবশ্য খুব স্বাভাবিকভাবেই ঘটেছিল। তার আর সুনীলের রেজাল্ট দেখে এখান থেকেই অফারটা যায়।

কিন্তু আজ হঠাৎ একটা গুজব নিয়ে কী ইচ্ছে জানাতে বসলেন তিনি? সে মাথা নেড়ে বলল, “ভুল করছ টাইকো। গ্লোবাল কমপিউটার বুদ্ধকে দিয়ে সমস্ত তথ্য বারেবারে পরীক্ষা করা হয়েছে। ওটা গুজব। পৃথিবীর এক মিলিয়ান মাইল দূর দিয়ে ভেসে যাবে সুইফট টাটল।

টাইকো কোন কথা বলল না। পৃথিবীর প্রধান গণকযন্ত্রগুলোর নেটওয়ার্কে ক্রমাগত গোয়েন্দাগিরি করে চলা তার একটা প্রধান কাজ। তথ্যের চোরাচালান  আজকাল কা পোনের প্রধান রোজগার হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো সে তথ্য যথেষ্টই দাম দিয়ে কেনে। সে কাজটা করতে গিয়েই বুদ্ধর নেটওয়ার্কে কিছু সন্দেহজনক প্রোগ্রাম প্যাচ এর সন্ধান পেয়েছিল টাইকো।

dharaontim01 (Medium)কা পোনের প্রথমে সন্দেহ হয়েছিল সেগুলো সরকারী গুপ্তচর প্রোগ্রাম কি না। কিন্তু সেগুলোকে নিয়ে অনুসন্ধান করে যখন সে টের পায় প্রোগ্রামগুলো নিয়মিত মঙ্গল উপনিবেশের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রেখে চলেছে তখন সে বিষয়টা নিয়ে উৎসাহিত হয়ে ওঠে, এবং বুদ্ধ-র স্মৃতিতে সুইফট টাটল সংক্রান্ত গণনামডিউলটিকে পরীক্ষা করে সে। উচ্চ নিরাপত্তার এই  মডিউলে গোপনে ঢোকবার জন্য যথেষ্ট খরচ করতে হয়েছে তাকে। তবে কা পোন তার পরোয়া করেনি, এবং ফলও এসেছে হাতেনাতে। সুইফট টাটল নিয়ে পাওয়া তথ্যগুলোকে বুদ্ধ প্রসেসিং করবার আগেই তাদের মধ্যে সামান্য, প্রায় অদৃশ্য কিছু বদল ঘটানো হচ্ছে নিয়মিত।

তবে এত কথা এই ছেলেটিকে খুলে বলা এ মুহূর্তে উচিত নয়। ওকে নিজেকে বিষয়টা বের করতে দিতে হবে।

“কী হল টাইকো? চুপ করে গেলে যে!” ক্রিস্টোফার তার দিকে কৌতুহলী দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রয়েছে।

 টাইকো গম্ভীর গলায় বলল, “আমি শুধু তোমার বাবার ইচ্ছের কথাটুকু জানাতে এসেছি। আগামীকাল তুমি ডিফেন্স মিসাইল রিসার্চ অর্গানাইজেশনে ইন্টারভ্যু দিতে চলেছ।  কাজটা যে তুমি পাবে তার ব্যাপারে তোমার শিক্ষক হিসেবে আমার কোন সন্দেহ নেই। আমার ছাত্রকে আমি চিনি। তোমার বাবার ইচ্ছা, সেখানে তুমি আন্তর্গ্রহ ক্ষেপণাস্ত্র বিভাগে যোগ দেবার চেষ্টা করবে। সফল হলে, বুদ্ধর স্মৃতিতে জমা থাকা সুইফট টাটলের গতিপথের তথ্য ও পূর্বাভাষের সঙ্গে নজরদার উপগ্রহের থেকে পাওয়া মূল তথ্যগুলো কোন যন্ত্রের সাহায্য ছাড়া নিজেহাতে মিলিয়ে দেখবে।”

“হাতে? কাগজকলম দিয়ে?”

“হ্যাঁ। সেটাই তোমার বাবার ইচ্ছা। বুদ্ধর কেন্দ্রিয় নেটওয়ার্কে থাকা কোন যন্ত্রগণক ব্যবহার করলে চলবে না।”

“এরকম পাগলামোর কারণ?”

“ক্রিস, তিনি আমার মালিক। তোমার পালকপিতা। তাঁর বিষয়ে এমন অসম্মানকর মন্তব্য করাটা আমি ভালোভাবে নিচ্ছি না। এ-ও জেনে নাও, তোমার শিক্ষক হিসেবে আমারও ইচ্ছা তুমি এ কাজটা করে দেখ। আমার বিশ্বাস তুমি চমকে উঠবে।”

ক্রিস্টোফার একটু অবিশ্বাসের গলায় বলল, “কিন্তু বাবা এসব বিষয়ে কী করে–”

dharaontim02 (Medium)“একসময়ে তুমি সবই জানবে ক্রিস। তবে আজ নয়। উপস্থিত আমার কাজ ছিল তোমাকে এই কথাগুলো জানানো। আমার কাজ শেষ। তুমি তা মানবে কি মানবে না তা তোমার ইচ্ছে।”

ক্রিস্টোফার মাথা নাড়ল। সুইফট টাটলের বিষয়টা পণ্ডিতমহলে গুজবের জায়গাই নিয়ে রেখেছে এখন। এমন কিছু গোপন বিষয় নয় তার গতিপথের তথ্যগুলো। এ কাজটুকু সহজেই করে ফেলতে পারবে সে।

ক্রমশ

ছবিঃ ইন্দ্রশেখর