ধারাবাহিক উপন্যাস অন্তিম অভিযান পিটার বিশ্বাস বসন্ত ২০১৭

এই উপন্যাসের আগের পর্বগুলো

dharaontim01 (Small) (2)

যদি কা পোনের সন্দেহ মিথ্যে হয়—তাহলে গত এক বছরের সব চেষ্টা বিফল হবে তার। হয়ত এ প্রতিষ্ঠান  থেকে  সরে যেতে হবে তাকে অক্ষমতার বোঝা মাথায় নিয়ে। আর যদি সত্যি হয়?  তাহলে যে এই সমস্ত গবেষণা, এই গোটা প্রতিষ্ঠানটার অস্তিত্বই অর্থহীন হয়ে উঠবে? হাতে থাকবে মাত্রই একটা বছর। না না। সে নিজেকে ব্যর্থ দেখতে চায় এবারে।–

      “এই যে বার্থ ডে বয় এসে গেছে। হ্যাপি বার্থ ডে ক্রিস।” চারপাশ থেকে নানা ভাষায় নানারঙের মুখগুলো এগিয়ে এসে চমকটা ভেঙে দিল ক্রিস্টোফারের। কমিউনিটি হলের মাঝখানে একটা টেবিলে একটা ছোটো কেক রাখা। দেয়ালে হলোগ্রাফিক ছবিতে ক্রিস্টোফারের মুখের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল প্রতিষ্ঠানের ব্যানার—“যশপাল পরিবারের সদস্য ক্রিস্টোফারের জন্মদিনে আমাদের শুভেচ্ছা—”

********

            হঠাৎ কমিউনিকেটরের মৃদু কাঁপুনি তাকে সতর্ক করে তুলল। ঘরজোড়া রামধনুর রঙ ছড়াচ্ছে প্রজেকটরগুলো। চঞ্চল , উদ্দাম একটা গানের সুরে পা মিলিয়েছে সবাই। কেউ তাকে এ মুহূর্তে খেয়াল করছে না।

     হইহইয়ের মধ্যেই নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে একটা কোণায় গিয়ে হাতের কমিউনিকেটরটা বের করে আনল সে। বুদ্ধর কেন্দ্রিয় প্রসেসরের সঙ্গে জুড়ে রাখা যন্ত্র সংকেত দিয়েছে, তার দিয়ে আসা গণনার কাজ শেষ করেছে বুদ্ধ। সেখানে ছোট্টো পর্দার গায়ে লাল ও নীল রঙের দুটো রেখা। লাল রেখাটা সরাসরি এসে বিঁধে রয়েছে পৃথিবীর বিষুব অঞ্চলের বুকে। তার কিছুদূর দিয়ে মহাকাশে হারিয়ে গিয়েছে  এতদিন ধরে দেখানো সুইফট টাটলের গতিপথ বলে দেখানো নীল রঙের রেখাটা।

     এদিকওদিক একবার তাকিয়ে দেখল সে। কেউ খেয়াল করছে না তাকে। তারপর কমিউনিকেটোরে একটা সংখ্যা টাইপ অরে মৃদু গলায় ডাকল , “টাইকো?”

         তার যন্ত্র থেকে রেখাদুটোর ছবিটা তখন ভেসে গিয়েছে বহুদূরের কোন আকাশে উড়তে থাকা একটা চোরাচালানকারি যানের কমপিউটারে। কয়েক মুহূর্ত বাদে সেখানে ছবিটা মুছে গিয়ে টাইকোর মুখটা ভেসে উঠল, “এবার তুমি নিশ্চিত তো ক্রিস?”

          ফ্যাকাশে মুখে মাথা নাড়াল ক্রিস্টোফার। টাইকোর কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। আস্তে আস্তে তার মুখটা মিলিয়ে গিয়ে সেখানে তখন কা পোনের মুখ ভেসে উঠছে। স্থির চোখে ক্রিস্টোফারের দিকে তাকিয়ে রইল সে কিছুক্ষণ। তারপর  যখন কথা বলল, তখন তার গলায় উত্তেজনার ছিটেফোঁটাও ছিল না, “আমরা আগে থেকেই এটা জানতাম ক্রিস। শুধু তোমার প্রমাণটা খুঁজে বের করা দরকার ছিল, যাতে সবাই বিশ্বাস করে।”

        “কিন্তু—কী লাভ? মাত্র এক বছর সময় বাকি আছে আর। এর মধ্যে—”

        “চেষ্টা কর। আপ্রাণ চেষ্টা কর এবার। আমি জানি এইবার পৃথিবীর সেরা মস্তিষ্কেরা এ নিয়ে চেষ্টা করবেন। হয়ত তাতে ফল হবে। যদি না হয় তাহলে একটা আরো পথ থাকবে ক্রিস। একটা অস্ত্র আছে। একেবারেই অপরীক্ষিত। তাই তার ওপর ভরসা রাখবার সাহস আমার নেই। আমি তোমার এবং দুনিয়াজোড়া বৈজ্ঞানিকদের প্রতিভার ওপর ভরসা রাখব তাই। তাতে ব্যর্থ হলে শেষ চেষ্টা হিসেবে–”  আপনমনে কথাগুলো বলতেবলতেই হঠাৎ নিজেকে সামলে নিলেন কা পোন, “তোমার কমিউনিকেটরের ফায়ার ওয়াল সরিয়ে নাও। একটা স্নিফার প্রোগ্রাম ইসস্টল করে দেব এতে। ঠিক কোন প্রোগ্রামটা নজরদার উপগ্রহদের পাঠানো তথ্যে বদল এনে বুদ্ধর বিশ্লেষকের কাছে সুইফট টাটলের গতিমুখের বিষয়ে ভুল খবর দিচ্ছিল সেটাকে খুঁজে বের করতে হবে তোমায়। একমাত্র তাহলেই এ রহস্যের সঠিক ব্যাখ্যা তুমি তুলে দিতে পারবে  প্রতিরক্ষাবিভাগের হাতে।”

          উৎসবরত মানুষজনের নজর এড়িয়ে ততক্ষণে কমিউনিটি হলের বাইরে বের হয়ে এসেছে ক্রিস্টোফার। বড়ো বড়ো পায়ে স্কাইওয়াকের এসকালেটরে উঠে দাঁড়াতেদাঁড়াতেই তার আঙুল খুলে দিয়েছে তার কমিউনিকেটরের দরজা। সেখান দিয়ে ইথার বেয়ে ভেসে এসে একটা ছোট্টো কিন্তু শক্তিশালী প্রোগ্রাম ফের ভেসে যাচ্ছিল বুদ্ধের প্রসেসিং কোরের ভেতরে। একটা বৈদ্যুতিন জীবাণু সংক্রমণের মতই সে তখন ছড়িয়ে পড়ছে অমিত শক্তিধর পার্থিব সেন্ট্রাল প্রসেসর ‘বুদ্ধ’র মস্তিষ্কে, তার সমস্ত প্রোগ্রামের সাবরুটিনের ভেতরে। খুঁজে চলেছে কোন লুকিয়ে থাকা নিয়মভাঙা ম্যালওয়ারের সংকেত—

********

           এখন এখানে রাত। কাচের ডোমের বাইরে অন্ধকার আকাশে মৃদু সঞ্চরমাণ ফোবসের আলোর বিন্দুটা আস্তে আস্তে মাথার ওপরে উঠে আসছিল।  সেদিকে তাকিয়ে থাকতেথাকতেই হঠাৎ প্যানেল থেকে জেগে ওঠা তীক্ষ্ণ শব্দটা চমক ভাঙিয়ে দিল নজরদার মানুষটার। মুখ ঘুরিয়ে পর্দার দিকে একনজর তাকিয়ে সে বুঝে নিতে চাইল ব্যাপারটা। আর তারপরেই বিপদজ্ঞাপক বোতামটার গায়ে আঙুল ছুঁইয়ে সে ডাকল, “ডঃ গ্রোভার।”

         প্রায় মিনিটখানেক পর পল গ্রোভারের আধাঘুমন্ত মুখটা বেসে উঠল কমিউনিকেটরের পর্দায়, “কী হয়েছে জালাল?”

“বুঝতে পারছি না। বুদ্ধের সঙ্গে আমাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে হঠাৎ। কী করে—”

          “আমরা আসছি। কোন কিছুতে হাত ছোঁয়াবে না। আশা করব তোমার কোন ভুলে—”

          ফ্যাকাশে মুখে মাথা নাড়াল জালাল নামের বিজ্ঞানিটি। সর্বাধিনায়িকা লালপিওতের এই টাট্‌ল্‌ ব্লাস্টার প্রজেক্টে কাজ করবার সম্মান যেমন আছে তেমনই আছে সামান্যতম ত্রুটিতবিচ্যূতিতে কঠোর শাস্তির ভয়।

          দু ঘন্টা বাদে, নিয়ন্ত্রণকক্ষের প্রধান প্যানেলের সামনে থেকে যখন মাথা তুললেন পল গ্রোভার, তখন চোখদুটো জ্বলছে  তাঁর। পাশে সদ্য এসে বসা লালপিওতে উদ্বিগ্নমুখে তার দিকে দেখছিলেন। সেদিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন পল, “একটা স্নিফার প্রোগ্রাম। বুদ্ধের ভেতরে ইনস্টল করা হয়েছে এখন থেকে তিন ঘন্টা আগে। আমাদের ম্যালওয়ার চিহ্নিত হয়েছে অ্যাডমিরাল। আমাদের এতদিনের সমস্ত চেষ্টা—” বলতেবলতেই হঠাৎ  লালপিওতের মুখের দিকে তাকিয়ে একটু বিস্মিত হলেন তিনি। সেখানে প্রত্যাশিত রাগের বদলে একটা অদ্ভুত হাসি ছড়িয়ে পড়েছে।

dharaontim-medium       

         “একটু আগেই ব্যাপারটা ঘটল তাহলে পল। আমার নিজের পরিকল্পনা ছিল আর এক মাস বাদে আমরা নিজেরাই নিঃশব্দে, সবার চোখের আড়ালে ম্যালওয়ারটাকে সরিয়ে নেব।”

          “তার মানে?”

          “তুমি বৈজ্ঞানিক, গ্রোভার। অসামান্য প্রতিভাধর বৈজ্ঞানিক। কিন্তু রাজনীতির তুমি কিছু বোঝ না। যেটা বোঝ সেই বিষয়ের একটা প্রশ্ন করি তোমায়। আজ যদি তুমি হঠাৎ জানতে পারতে, ওই ধূমকেতুটা এই মঙ্গলের সঙ্গে ধাক্কা খাবে ঠিক এক বছর বাদে তাহলে এক বছরের মধ্যে, আমাদের সমস্ত শক্তিকে কাজে লাগিয়েও তুমি তাকে রোখবার মত অস্ত্র বানাতে পারতে কি?”

          মাথা নাড়লেন গ্রোভার, “সেটা সম্ভব নয়। এ ধরণের গবেষণায় অনেক বেশি সময় লাগে। অন্তত চার পাঁচ বছরের প্রজেক্ট হতে হবে সমস্ত, তত্ত্ব, রূপরেখা ও বাস্তবায়ন শেষ করতে।”

          “ঠিক। তাহলে এখন পার্থিব সরকার খবরটা পাবার পর কী হবে বুঝতে পারছ? আতঙ্ক ছড়াবে গ্রোভার। নিশ্চিত ধ্বংসের আতঙ্ক। কুড়ি বিলিয়ন মানুষ। কোথায় পালাবে? আনন্দ কর গ্রোভার। এতদিনে—এক স্বৈরাচারি গ্রহ বুঝবে, মৃত্যুর অসহায় আতঙ্ক কাকে বলে।”

          “কিন্তু অ্যাডমিরাল, আপনার পরিকল্পনার থেকে একটাই তফাৎ হয়ে গেছে এখানে। এরা নিজে থেকে, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই আমাদের ম্যালওয়ারটাকে খুঁজে পেয়েছে। ওরা প্রতিশোধ নেবে অ্যাডমিরাল। আমরা আর নিরাপদ নই।”

          তাঁর কথাটা শেষ হবার আগেই পর্দায় একটা মুখ ভেসে উঠল হঠাৎ। লালপিওতের দিকে মুখ ঘুরিয়ে কপালে হাত ঠেকালেন সামরিক পোশাক পরা মানুষটি, “আপনাদের পরিবহন তৈরি আছে অ্যাডমিরাল। আশ্রয়ঘাঁটিতে খবর পাঠানো হয়েছে।”

          “ধন্যবাদ হোমাজ। ওভার অ্যান্ড আউট,” বলতেবলতেই গ্রোভারের কাঁধ ছুঁয়ে কাচের ডোমের বাইরের দিকে ইশারা করলেন একবার লালপিওতে। সেখানে তখন ফ্লাডলাইটের আলোয় দুটো বিশাল মালপরিবহনযান এসে দাঁড়িয়েছে।

         “এ আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে আমি বহুদিন আগেই তৈরি হয়েছি পল। মঙ্গলের ওপর পার্থিব সামরিক হানা হলেও আমার প্রশাসণকে ছুঁতে পারবে না তারা। কিছু সাধারণ মানুষই মরবে কেবল। আক্রমণের অনেক আগেই গ্রহপৃষ্ঠ থেকে সরে যাবার জন্য আমি তৈরি। এখন সময়টা এগিয়ে এসেছে শুধু।”

“আমাকে এই প্রস্তুতির খবর আগে জানানো হয়নি কেন?” পল গ্রোভারের মুখে একইসাথে অনেকগুলো অনুভূতি খেলা করে যাচ্ছিল। সেদিকে তাকিয়ে মুখের হাসিটি একরিকম রেখে লালপিওতে বললেন, “আমাকে প্রশ্ন করবার সাহস আমি একবারের বেশি ক্ষমা করি না পল। তোমাকে আমি হারাতে চাই না। তোমার জন্য একটা কাজ আছে আমার। সুইফট টাটল্‌এর উড়ানপথ সংক্রান্ত অন্তর্ঘাতে আমাদের ভূমিকার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পার্থিব সরকারের নজরে আসা এখন মাত্রই কয়েকটা দিনের ব্যাপার। এই সময়টুকুর মধ্যে, কে এ কাজটা করতে সক্ষম হয়েছে তার হদিশ আমার চাই।”

“কিন্তু এত তাড়াতাড়ি –কীকরে—”

“যে প্রোগ্রামটা আমাদের ম্যালওয়ার খুঁজে বের করল তা আকাশ থেকে আসেনি। কোন পথে তা এল, সেটা খুঁজে বের করবার চেষ্টা কর পল। যদি তা বাইরে থেকে কেউ পাঠিয়ে থাকে তবে তা সরাসরি বুদ্ধের নিরাপত্তাকে ভেঙে ঢুকবে না। ওখানে কাজ করেন এমন কারো যন্ত্র বেয়ে তা আসবে। তার চিহ্ন থাকবে কোথাও না কোথাও। খোঁজো পল, খোঁজ। সে মানুষটাকে আমার চাই। আমাকে চ্যালেঞ্জ করেছে সে। আমি তো তাকে ছেড়ে দেব না—”

ক্রমশ

জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক একত্রে

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s