ধারাবাহিক উপন্যাস জাদু রাজ্য মুরাদুল ইসলাম বর্ষা ২০১৭

আগের পর্বগুলো

রাতুল আকাশকে নিয়ে সিংহের পিঠে চেপে বসল। সিংহ বলল, “চেপে ধরে বসো।” তারপর ডানা ঝাপটে শূন্যে ডিগবাজির মত খেয়ে উড়তে শুরু করল। রাতুল একদিকে ধরে রেখেছিল আকাশকে। আরেকদিকে সিংহের ঘাড়। যখন সিংহ মাটি থেকে শূন্যে ওঠে তখন ভয়ে তার নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

রাতুল প্রথমে ভয়ে চোখ বন্ধ করে থাকলেও পরে যখন সে চোখ খুলল তখন বিস্ময়ে তার ভয় দূর হয়ে গেল। এক জায়গায় কয়েকটি মায়া হরিণ উড়ে বেড়াচ্ছে। তার পাশেই নাম না জানা সাদা, নীল ও হলুদ বর্ণের কয়েকটি প্রাণী খেলছে উড়ে উড়ে। নিচে দেখা গেল এক জায়গায় নামছে ঝরনা তাতে পানির রঙ গাঢ় নীল।

রাতুল বিস্ময়াভিভূত হয়ে দেখছিল তখন হঠাৎ করেই সিংহ খুব দ্রুতবেগে নেমে যেতে লাগল। আবার রাতুল চোখ বন্ধ করল ভয়ে। একটি হলুদ বনের ঝোঁপের পাশে এসে নামল সিংহ। নেমে বলল, “সামনে একটু গেলেই পাবে পীযূষ নদ। ইচ্ছে হচ্ছে তোমাদের নিয়ে যাই সেখানে। কিন্তু মেছো কুমিরকে আমি বড্ড ভয় পাই।”

রাতুল সিংহের পিঠ থেকে নেমে বলল, “তুমি আমাদের জন্য যা করেছ তাই অনেক। আমরা এখন একাই যেতে পারব। তোমাকে ধন্যবাদ।”

সিংহ হাসিমুখে বলল, ‘তোমাদেরও ধন্যবাদ। বিদায়।”

সে বাতাসে একটি ডিগবাজি খেয়ে উড়ে চলে গেল। রাতুল তখন হাতের লাঠিটা নিয়ে আকাশকে ধরে হাটতে লাগল সামনে। প্রায় দশ পনের পা যাওয়ার পর সে দেখতে পেল ছোট একটি নদী একেবেকে চলে গেছে। নদীর স্বচ্ছ জলরাশি দেখে রাতুল দ্রুত এগোতে লাগল। নদীতে পৌছে সে দেখতে পেল পাড়ে বসে আছে এক বিশাল কুমির।

এর আকার এত বড় যে সিংহটাকেও একবারে খেয়ে ফেলতে পারবে মনে হচ্ছে। রাতুল ভয় পেল কারণ তার সাথে লাঠিটা ছাড়া আর কোন অস্ত্রও নেই।

কুমির হয়ত তাদের দেখেছিল। তাই বিকট স্বরে “হালুম! হালুম!” করে গর্জন করে উঠল। হালুম বাঘের ডাক কিন্তু এখানে মনে হচ্ছে এই মেছো কুমিরের বুলি হালুম। রাতুল জাদুর বইটি বের করল। প্রথম পাতা উল্টাতেই দেখল সেখানে এখন লেখা আছেঃ

 সৎ সাহস সব অজেয়কে জয় করার ক্ষমতা রাখে।

আর কিছু নেই। রাতুল আরেক পেজে যেতে চাইল কিন্তু আর কোন পেজ খুলল না। অগত্যা সে তার হাতের লাঠিটি নিয়েই অগ্রসর হল। এসময় আরেকটু হলে কুমির তার উপরেই লাফিয়ে পড়েছিল প্রায়। রাতুল খুব দ্রুত সরে যাওয়াতে বেঁচে গেল। লাফিয়ে পড়ে কুমির একটু ধাতস্থ হচ্ছিল। কারণ সে হয়ত ভাবেনি রাতুল এত তাড়াতাড়ি সরে যেতে পারবে। এই সুযোগে রাতুল তার হাতের লাঠিটি দিয়ে দিল কুমিরের মাথায় এক ঘা।

অবাক কান্ড! এতেই কুমিরের মাথা চ্যাপ্টা হয়ে গেল। বিস্ময়ে রাতুল তাকাল তার লাঠির দিকে। তখন তার মনে পড়ে গেল এ তো সাধারণ কোন লাঠি না। জাদুর লাঠি।

কুমির যখন ছটফট করছে মাথায় আঘাত খেয়ে তখন অন্যদিকে আকাশ প্রায় অজ্ঞান হয়ে বালিতে পড়ে গেছে। রাতুলের চোখ গেল আকাশের দিকে। সে দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে পীযূষ নদের একেবারে কাছে নিয়ে এল। তারপর দু হাত দিয়ে আঁজলা ভরে পানি নিয়ে আকাশের মুখে ছিটিয়ে দিল প্রথমে। তারপর আবার একইভাবে পানি তুলে খাইয়ে দিল আকাশকে। এই পানি পান করার মিনিটখানেকের মধ্যে আকাশ সতেজ হয়ে উঠল।

রাতুল যে কুমিরটাকে মেরেছে তা দেখেছিল এক মোচওয়ালা হাতি। সে অবাক হয়ে এগিয়ে এল। কারণ শক্তিধর মেছো কুমিরটার জ্বালায় সবাই অস্থির ছিল।

এগিয়ে এসে বলল, “শাবাস! তুমি দেখি মেছোটাকে মেরে ফেলেছ! দারুণ করেছ!”

রাতুল এবং আকাশ দুজনই অবাক হয়েছিল হাতির মোচ দেখে এবং তার কথা শুনে। এখানে বোধহয় সবাই কথা বলতে পারে। মোচওয়ালা হাতি বলল, “এর জ্বালায় আমরা এই নদে পানি খেতে পারতাম না। যেতে হত অনেকদূর। আজ থেকে তোমার জন্য আমরা এখান থেকেই পানি খেতে পারব। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। আমরা হাতিদের পক্ষ থেকে তোমাকে সংবর্ধনা দেব। তোমরা চলো আমার সাথে।”

রাতুল জিজ্ঞেস করল, “কোথায়?”

মোচওয়ালা হাতি বলল, “আমাদের এলাকায়। তোমাদের খুব ভালো লাগবে। মেয়র ইলেকশনের কারণে এখন আমাদের এলাকা খুব গরম।”

মিনিট দুয়েক হাতির সাথে হেটে রাতুল ও আকাশ হাতিদের এলাকায় পৌছে গেল। সেখানে নানা সাইজের ও রঙের হাতি। তবে হাতিরা মূলত এখানে তিন প্রকার। মোচওয়ালা, শূঁড়হীন ও লেজহীন।

মোচওয়ালা হাতিদের সবার মোচ। বাচ্চা থেকে বুড়ো এমনকী মহিলা হাতিদেরও মোচ।

শুঁড়হীন হাতিদের শুঁড় নেই। শুঁড়ের জায়গায় খাড়া নাক। আর লেজহীন হাতিদের লেজ নেই। তারা মশা মাছি তাড়ায় কী দিয়ে কে জানে! অথবা হয়ত এখানে কোন মশা মাছি নেই।

রাতুলদের সাথে প্রথম পরিচিত হওয়া মোচওয়ালা হাতিটি হাতিদের সবাইকে বলল, “এই মানুষ মেছোটাকে মেরে ফেলেছে। আমাদের এখন ওর ভয়ে থাকতে হবে না।” তারপর সে বর্ণনা দিল রাতুল কীভাবে বীরের মত মেছো কুমিরটাকে মেরেছে। সমস্ত হাতিপাড়া মেছো কুমিরের মৃত্যুতে আনন্দে নেচে উঠল।

হাতিদের মেয়র ইলেকশনে তিনজন প্রার্থী দাড়িয়েছেন। একজন মোচওয়ালাদের পক্ষ থেকে, একজন শুঁড়হীনদের পক্ষ থেকে এবং আরেকজন লেজহীনদের পক্ষ থেকে। এরা তিনজনই ভোট পাবেন। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।

রাতুল শুনল কয়েকজন মুরুব্বি হাতি গল্প করছেন। একজন মোচওয়ালা, একজন শুঁড়হীন এবং আরেকজন লেজহীন। লেজহীন মুরুব্বী হাতি বলছেন মোচওয়ালাকে, “এই যে তোমাদের একজন দাঁড়াল, এ কী আর কোন প্রতীক পেল না? মানুষ প্রতীকে ওকে কেউ ভোট দেবে? এই প্রতীকই ওকে ডুবাবে। এই আমি বলে দিলাম।”

মোচওয়ালা বললেন, “তা যা বলেছ। মানুষ প্রতীকে ইলেকশন করা খুব রিস্কি। এই সেবার মনে নেই আমরা যখন ইস্কুলে পড়ি তখন শুঁড়হীনদের একজন দাঁড়াল মানুষের বাচ্চা প্রতীকে। কী বেইজ্জ্বতিই না হয়েছিল সেবার। মোটে তিনটা ভোট পড়েছিল তার বাক্সে। লজ্জা লজ্জা!”

শুঁড়হীন বললেন, “আমি এই ব্যাপারটা বুঝি না। মানুষ প্রতীকে দাঁড়ালে কী হয়? আমরা তো হাতি দেখে ভোট দেব, প্রতীক দেখে ভোট দেয়া কি ঠিক? ভোটের আগে যে বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে তা হল যাকে ভোট দিচ্ছি সে কেমন হাতি। ব্যস।”

মোচওয়ালা বললেন, “কিন্তু ভাই শুঁড়হীন আম পাবলিক তো আর তা বুঝবে না। তারা প্রতীক কি সেটা খুব গুরুত্ব দেয়।”

রাতুল দেখল হাতিপাড়ার চারপাশে উৎসব উৎসব ভাব। এখানে সেখানে হাতিদের জটলা। সেখানে নির্বাচনী প্রচার চলছে।

রাতুলদের সাথে প্রথম পরিচিত হওয়া মোচওয়ালা হাতিটি রাতুলকে বলল, “ওই যে দেখতে পাচ্ছ একদল হাতি একজন গাট্টাগোট্টা হাতিকে ঘিরে দাড়িয়ে কথা শুনছে। উনি মোচওয়ালাদের পক্ষে এবার মেয়র ইলেকশন লড়ছেন। তার প্রতীক মানুষ বলে বেশ সমালোচনা হয়েছে। কারণ মানুষদের পলিটিশিয়ানগুলো খুব ভালো হয় না। তবে তুমি যেভাবে বীরের মত মেছোটাকে মেরেছ তাতে মানুষদের ভাবমূর্তি অনেক উন্নত হয়েছে হাতিপাড়ায়। তাতে মানুষ প্রতীক নিয়ে লাভই হয়ে গেল ওঁর।”

নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন মোচওয়ালা মেয়র প্রার্থী। কিন্তু তবুও তিনি রাতুলদের সাথে দেখা করলেন। মেছোটাকে মারার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, “তোমরা আমাদের অনেক উপকার করেছ। মানুষদের প্রতি সব সময়ই আমার বিশ্বাস ছিল। প্রয়োজনীয় মুহুর্তে সে বিশ্বাসের দাম দিলে তুমি। তোমার এই কাজের জন্য আমার ভোট অনেক বেড়ে গেল। তোমার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। আমাদের হাতিপাড়ায় তুমি যতদিন ইচ্ছা থাকো। হাতিপাড়ার যে উপকার তুমি করেছ তাতে হাতিদের তুমি সব বিপদে আপদে পাশে পাবে।”

শুঁড়হীনদের মেয়র প্রার্থী এবং লেজহীনদের মেয়র প্রার্থীও একই রকম কথা বললেন। হাতিপাড়ায় বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়িয়ে আজব আজব জিনিস এবং হাতিদের কর্মকান্ড দেখার পর রাতুলের মনে হল সেই জাদুর বইয়ের কথা। এজন্য অবশ্য কৃতিত্ব দেয়া যায় আকাশকে। হাতিপাড়ায় এসে সে নিশ্চুপে রাতুলের সাথে ছিল। অবাক বিস্ময়ে দেখছিল বিভিন্ন রঙ ও ধরনের হাতি এবং তাদের অদ্ভুত ক্রিয়াকলাপ। হাতিদের একটা পুরনো বইয়ের দোকানের পাশ দিয়ে যাবার সময় সে রাতুলকে বলল, “ঐ দেখো, মোচওয়ালা এক হাতির বাচ্চা বই পড়ে হু হু করে হাসছে!”

এই বইয়ের কথাতেই রাতুলের মনে পড়ল জাদুর বইয়ের কথা। সে তখন দ্রুত ব্যাগ থেকে জাদুর বইটি বের করল। বইয়ের কভারের রঙ তখন বদলে হয়ে গেছে গোলাপি এবং সোনালী হলুদ মিশ্রিত। প্রথম পাতা খুলতেই সেখানে লেখা দেখা গেলঃ

 কালো জাদুকর কোবিলাই জাদু রাজ্যে জনপ্রিয় কোন ব্যক্তি না হলেও তাকে প্রায় সবাই ভয় পায়। কোবিলাই জাদু সম্রাট নিকোলাই পুত্র হারিরিকে কোথায় বন্দি করে রেখেছে তা খুঁজে বের করো।

আর কিছু লেখা নেই। রাতুল বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। কীভাবে বের করা যায় কোথায় হারিরিকে বন্দি করে রাখা হয়েছে?  তাদের সাথে প্রথম পরিচিত হওয়া সেই মোচওয়ালা হাতিটি খুঁজতে খুঁজতে একসময় তাদের দেখতে পেয়ে বলল, “তোমরা এখানে! আর আমি খুঁজে খুঁজে অস্থির। আমাদের মহান জাদুকর তোমাদের দেখতে চেয়েছেন। তিনি হাতিপাড়ার সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। আধ্যাত্মিক ধ্যানের মাধ্যমে বেঁচে আছেন শত শত বছর ধরে। চলো, তোমাদের তার গুহায় নিয়ে যাবার আদেশ দেয়া হয়েছে আমাকে।”

আকাশ প্রশ্ন করে বসল, “এই জাদুকর কি কালো জাদুকর কোবিলাই?”

মোচওয়ালা হাতি যেন কিছুটা অবাক হল। সে তার মোচ নেড়ে বলল, “কোবিলাই! তার কথা তোমরা কীভাবে জানলে? আর ইনি কোবিলাই হবেন কীভাবে! ইনি তো আমাদের মতোই হাতি। আর কোবিলাই হল ভয়ংকর এক জাদুমানব।”

আকাশ জিজ্ঞেস করল, “জাদুমানব! সেটা আবার কী?”

মোচওয়ালা বলল, “এই জাদুরাজ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী আছে। তবে সবচেয়ে শক্তিশালী জাদুমানবেরা। তারাই মূলত বেশিরভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। এরা মানুষের মত দেখতে হলেও মানুষ না।”

রাতুল জিজ্ঞেস করল, “আর কোবিলাই?”

মোচওয়ালা বলল, “সে অনেক কথা। কোবিলাই এর ভাই নিকোলাই ছিলেন জাদুসম্রাট। তিনি এই জাদু রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করেছেন অনেকদিন। তারপর তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। ধারণা করা হয় এতে তার ভাই কোবিলাই এর হাত আছে। নিয়ম অনুযায়ী এখন নিকোলাই এর পুত্র হারিরি সম্রাট হবার কথা। কিন্তু কোবিলাই কালো জাদুর প্রভাবে মন্ত্রীপরিষদকে বশ করে নিজেই সম্রাট হতে চাচ্ছে। জাদু রাজ্যের প্রাণীরা তাকে পছন্দ না করলেও ভয় পায়। সুতরাং প্রতিবাদ করার সাহস নেই কারো। সজারুরা বিদ্রোহ করতে চেয়েছিল। তাই তাদের কাটা তুলে নিয়ে কালো জাদুর মাধ্যমে পাথরে পরিণত করে রেখেছে কোবিলাই। সেই সজারুদের কাটা দিয়ে এখন দাঁত খিলাল করে গন্ডারেরা।”

একটু থেমে মোচওয়ালা বলল, “সেসব নিয়ে আর কথা বলে লাভ নেই। সব জায়গায় কোবিলাই এর গুপ্তচরেরা ওঁত পেতে আছে। এসব বাদ দিয়ে চলো জাদুকরের সাথে দেখা করবে। ওঁর মত জ্ঞানী ব্যক্তি জাদু রাজ্যে খুব কমই আছেন।”

রাতুল এবং আকাশ মোচওয়ালার সাথে উজ্জ্বল নীল রঙের পানিতে পূর্ণ একটি ডোবার পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে চলল সেই মহান জ্ঞানী জাদুকর হাতির গুহায়। তারা দেখতে পেল কয়েকটি বেগুনি ও হলুদ ডোরাকাটা মাছ ডাঙায় বসে রোদ পোহাচ্ছে। তাদের চারটি ঠ্যাঙের মধ্যে দুটি ভাঁজ করে রাখা। মাছগুলোর মুখ গম্ভীর এবং বাদামী চোখদুটিতে ব্যাপক কৌতুহল। তারা কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল রাতুল এবং আকাশকে।

 দশম অধ্যায়

রাতুল এবং আকাশ মোচওয়ালা হাতিটার সাথে গুহায় প্রবেশ করল। গুহাটি ছিল সামান্য অন্ধকার। গুহার ভেতর একটু যাওয়ার পর দেখা গেল জ্বলন্ত আগুনের সামনে খয়েরি দাড়িযুক্ত বৃদ্ধ একটি হাতি বসে আছে। সে হাতির মোচ, শুঁড় এবং লেজও আছে। বাড়তি হিসেবে লম্বা খয়েরি দাড়ি।

রাতুল এবং আকাশকে দেখেই বৃদ্ধ হাতি মুখ তুলে তাকালেন। তার চোখ দুটো গভীর কালো। মোচওয়ালা হাতি রাতুলকে দেখিয়ে বলল, “এই ছেলেটাই মেছোটাকে মেরেছে।”

বৃদ্ধ হাতি শুঁড় দিয়ে বসার ইশারা করলেন। তারা অগ্নিকুন্ডের সামনে বসে পড়ল। অগ্নিকুন্ডের অন্যপাশে বৃদ্ধ হাতি এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ রাতুলের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “আমি তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম। কোবিলাইকে ধ্বংসের যুদ্ধ শুরু করার জন্য তোমাকেই দরকার ছিল। জাদুরাজ্যের ভাগ্যে এমনি লেখা আছে। তবে কোবিলাইকে ধ্বংস করা সহজ হবে না। সে প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী। কালো জাদুর জাল বিস্তার করে সে সমগ্র জাদু রাজ্যকে গ্রাস করার স্বপ্ন দেখছে। তোমার সাথে কি নিকোলাই পুত্র হারিরির দেখা হয়েছে?”

রাতুল বলল, “হ্যা। সে আমাকে তার সম্পর্কে বলেছে। কিন্তু আমি জানি না তাকে কোথায় বন্দি করে রাখা হয়েছে।”

বৃদ্ধ শুঁড় দিয়ে তার দাড়ি নেড়ে বললেন, “তুমি জানতে চাও?”

রাতুল বলল, “হ্যাঁ। তাহলে আমি তাকে উদ্ধার করতে যেতে পারব।”

বৃদ্ধ হাতি একটু হাসলেন। তাতে তার দাড়ি ঢাকা মুখ একটু নড়ে উঠল। তিনি চোখ বন্ধ করে কীসব দুর্বোধ্য বাক্য কয়েকবার বলে ফুঁ দিলেন আগুনে। তাতে আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সে আগুনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বৃদ্ধ হাতি শুঁড় দিয়ে দাড়ি নাড়তে নাড়তে বললেন, “আজ সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কোবিলাই তার জাদুর জাল বিস্তার করে ফেলেছে সমস্ত জাদু রাজ্যে। সন্ধ্যার পর কালো জাদুর জাদুকরদের শক্তি বেড়ে যায়। তাই আমি হারিরিকে কোথায় রাখা হয়েছে দেখতে পাচ্ছি না। ইদানীং সন্ধ্যার পর পর আমার জাদুশক্তি কালো জাদুর প্রভাবে কমে আসে। তুমি কাল সকালে এখানে চলে এস।”

এই কথায় রাতুল কিছুটা নিরাশ হল। আকাশ জিজ্ঞেস করল, “কোবিলাই কি আমাদের দেখতে পাবে?”

বৃদ্ধ হাতি শুঁড় নেড়ে বললেন, “সে এতক্ষণে নিশ্চিত তোমাদের জাদুরাজ্যে আসার খবর পেয়ে গেছে। সন্ধ্যার পর হয়ত খুঁজতে বের হবে। তাই সাবধানে থেকো।”

তিনি মোচওয়ালা হাতির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এদের নিয়ে চলে যাও। দেখো কোন অসুবিধা যেন না হয়।”

মোচওয়ালা হাতি বলল, “ঠিক আছে। কাল সকালে আমি আবার নিয়ে আসব। আপনার কিছু কি লাগবে?”

বৃদ্ধ হাতি বললেন, “না। আমি এখন ধ্যানে বসব।”

তিনি চোখ বন্ধ করলেন। রাতুল দেখতে পেল তার মুখে হাসি হাসি ভাব। হয়ত এই হাতির মুখই এরকম। দেখলেই মনে হয় হেসে ফেলবে এখন।

রাতুল ও আকাশকে নিয়ে যখন মোচওয়ালা গুহা থেকে বের হল তখন বাইরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। সন্ধ্যায় এখানে আলো কমে আসে এবং পাতলা নীল বর্ণের আলো ছড়িয়ে পড়ে। গুহায় প্রবেশের সময়কালের সেই ঝকঝকে আলো আর এখন নেই। আকাশের রঙও এখন কালচে নীল।

আকাশ উপরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এখানে আকাশের রঙ কি রাতে এরকম হয়ে যায়?”

মোচওয়ালা হাতি হাঁটতে হাঁটতে বলল, “প্রথমে থাকে কালচে নীল, তারপর হয় কালচে বেগুনী, তারপর কালচে হলুদ। একেকটা রঙ দেখে বোঝা যায় রাত্রির গভীরতা। কালচে বেগুনি হলে বুঝতে হবে গভীর রাত। কালচে কমলা হলে শেষরাত। ভোরের দিকে হয় লালচে আভাযুক্ত। আর সকালে হয় টকটকে লাল।”

রাতুল বলে উঠল, “দারুন তো!”

তারা কথা বলতে বলতে চলে এসেছিল হাতিপাড়ায়। হাতিপাড়ার তখন বাদ্যের তালে তালে নাচছে কয়েকটা হাতি। তারা একটা বড় অগ্নিকুন্ড ঘিরে নাচছে। কয়েকজন হাতি বসে গান গাইছে-

জাদুতে জাদুতে মাখামাখি সখা

জাদুতে আমার বাস

জাদুর পরশ মাখিয়া শরীরে

গহীন সর্বনাশ

জাদুর আঁখিতে পরশ তোমারি

রইল পড়িয়া জল

জাদুতে জাদুতে মিলেমিশে হল

তোমার অমৃত গরল

মুরুব্বি হাতিরা দূরে বসে দুলে দুলে গান শুনছে এবং নাচ দেখছে। গান এবং নাচের সাথে খাবার দাবারও চলছে বেশ। সতেজ কলাগাছের স্তূপ রাখা স্থানে স্থানে। যার ইচ্ছে দু’একটি কলাগাছ নিয়ে যাচ্ছে। মুখ দিয়ে সটান চালান করে দিচ্ছে পেটে। কেউ কেউ গান শুনতে শুনতে এবং নাচ দেখতে দেখতে আপন মনে গুনগুনিয়ে আস্তে আস্তে কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে কলাগাছ।

মোচওয়ালা হাতিটা বলল, “রাতে আমাদের এখানে নিয়মিত নাচ গান হয়। তোমরা বসে দেখতে পারো। আর ঘুম পেলে ঘুমাতে পারবে ঐ গুহায়। ওখানে তোমাদের জন্য জায়গা করে রাখা আছে।”

মোচওয়ালা তার শুঁড় দিয়ে একটি গুহা দেখিয়ে দিল। রাতুল এবং আকাশ এগিয়ে গিয়ে দেখল গুহাটা ঝকঝকে পরিষ্কার। সুন্দর আগুনের মশাল জ্বলছে একপাশে। দুটি বিছানাও পাতা আছে। আর আরেকটি দারুণ কাপড়ের উপর রাখা আছে নানা বর্ণ, রঙ ও আকার-আকৃতির ফল। ফলগুলো এতই পাকা যে সুমিষ্ট গন্ধ নাকে আসছে যেন।

রাতুল কিছু বলার আগেই আকাশ ফলগুলোর উপর হামলে পড়ল। প্রথমবারের সেই ফলের ঘটনার পর রাতুল ঠিক করেছিল কোন কিছু কাউকে না জিজ্ঞেস করে খাবে না। কিন্তু আকাশ জিজ্ঞেসের তোয়াক্কা না করেই একটি আপেলাকৃতির ফলে দুটি কামড় বসিয়ে বলল, “দারুণ!”

রাতুল মোচওয়ালা হাতিকে বলল, “এগুলো খাওয়া যাবে?”

মোচওয়ালা হাতি বলল, “অবশ্যই। এগুলো তোমাদের জন্য বিশেষভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে। আমরা ফল খাই না।”

রাতুলেরও ক্ষুধা পেয়েছিল। তাই সে আর কিছু না বলে বসে পড়ল এবং খেতে শুরু করল। আকাশ ঠিকই বলেছে। ফলগুলোর স্বাদ দারুণ। একটার চেয়ে যেন অন্যটা আরো দারুণ। প্রায় সবকটিই চেখে দেখল তারা দুজন। ততক্ষণে পেট ভর্তি হয়ে গেছে। সারাদিনের ক্লান্তিতে এবং অত্যধিক ফলাহারের কারণে দুজনেরই হাই উঠল। মোচওয়ালা হাতি বলল, “তোমরা এখন বিশ্রাম করো। আমি যাই। কোন দরকার পড়লে আমাদের ডাকলেই পাবে। আর আমরা খুব ভোরে উঠে যাই। এখন আবার নির্বাচনের সময় বলে আরো তাড়াতাড়ি উঠতে হয়। সুতরাং, সকালে তোমাদের ঘুম ভাঙলে দেখা হবে।”

মোচওয়ালা চলে যাবার পর রাতুল আকাশকে বলল, “কী রে সবগুলো তো খেয়ে ফেললি। এরা তো আমাদের পেটুক ভাববে।”

আকাশ বলল, “আমি কি একা খেয়েছি? মাত্র তো কয়েকটা খেলাম। তাতেই পেট ভরে গেল।”

সে আবার হাই তুলে তার জন্য করা বিছানায় গিয়ে বলল, “কালকের প্ল্যান কী?”

রাতুল নিজের বিছানায় গিয়ে বলল, “কাল জাদুকর হাতির কাছে গিয়ে দেখব হারিরি কোথায় আছে। তারপর ভেবে দেখব কী করা যায়।”

তাদের দুজনেরই খুব ঘুম পাচ্ছিল। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যে এমন অবস্থা হল যে রাতুলের মনে হচ্ছিল চোখের পাতা দুটো পাহাড়ের সমান ভারী। সে ঘুমিয়ে পড়ল। তার এক মিনিট আগে অবশ্য আকাশ ঘুমিয়ে গেছে। রাতুল যখন ঘুমায় আকাশ তখন ঘুমে নাক ডাকছে।

তারা কতক্ষণ ঘুমাল ঠিক নেই। রাতুলের ঘুম ভাঙল একটা ফিসফিস শব্দে। ঘুম থেকে উঠে সে শুনতে পেল কে যেন বলছে, “এই ছেলে, এই”

রাতুল চারিদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। গুহার মুখ দিয়ে বেগুনী আলো আসছে। অর্থাৎ এখন গভীর রাত।

রাতুল আবার শুনল ফিসফিস কন্ঠ, “এই ছেলে, এই যে আমি।”

রাতুল এবার শব্দ লক্ষ করে তাকাল। গুহার মেঝেতে একটা ইঁদুরের মত প্রাণী। তার মুখের আকৃতি মানুষের মুখের মত। চোখ দুটি মুখের তুলনায় অনেক বড়। কানদুটি গোলাকৃতির। পিছনে বাদুড়ের ডানার মত ডানা। সে দু পায়ে ভর দিয়ে এবং বাকি দু পা সামনে নিয়ে দাড়িয়ে রাতুলকে ডাকছে।

রাতুল দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করল, “কে তুমি?”

সেই কিম্ভুতকিমাকার ছোট প্রাণী বলল, “আমি কে তা দিয়ে তোমার কাজ নেই। কতক্ষণ ধরে ডাকছি। এমন মোষের মত ঘুমালে হবে? এটা কী তোমার মানুষের দেশ পেয়েছ?”     

রাতুল জিজ্ঞেস করল, “কে তুমি?”

ছোট প্রাণী বলল, “আবার সেই প্রশ্ন! বলি তোমার ঘটে কি বুদ্ধি নেই? এভাবে নিশ্চিন্তে যে ঘুমিয়ে পড়লে, এটা জানো না জাদুরাজ্যে কাউকে বিশ্বাস করতে নেই? এটা তোমাকে নিকোলাই এর ছেলে বলে দেয়নি?”

রাতুল ভয় পেয়ে বলল, “কী হয়েছে?”

ছোট প্রাণী খসখসে কন্ঠে বলল, “কী আর হবে। হতে যাচ্ছিল আর কী! এই যে হাতিরা কোবিলাই এর হয়ে কাজ করে। তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে ধরিয়ে দেয়ার জন্য জাদুর ফল খাইয়ে দিয়েছে। আমি সব দেখেছি। কিন্তু এসে তোমাকে বলার সাহস পাচ্ছিলাম না। হাতিরা ঘুমিয়েছে তাই বলতে এলাম। পালাও এখান থেকে। নাহলে কোবিলাই এর হাতে ধরা পড়বে। আর কোবিলাই তোমাদের  মেরে রাস্তায় ঝুলিয়ে শুঁটকি বানাবে।”

রাতুল তাকাল আকাশের দিকে। আকাশ তখন আরেক কোণে তার বিছানায় নাক ডাকছে। ছোট প্রাণীটি বলল, “ওদিকে তাকিয়ে কী দেখছ? তোমার সাথের ঐ ছেলেটাও তো হাতির মত। এদের বরং হাতিদের সাথেই রেখে যাও। হাতিতে হাতিতে হাতাহাতি হোক। দেখ কীরকম নাক ডাকছে!”

রাতুল প্রাণীটিকে অগ্রাহ্য করে আকাশকে ডেকে তুলল। আকাশ চোখ কচলে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”

রাতুল বলল, “বিপদ। আমাদের পালাতে হবে।”

সে তার ব্যাগ এবং জাদুর লাঠিটা হাতে নিল। ছোট প্রাণীটা ততক্ষণে দৌড়ে বাইরে চলে গেছে। রাতুল এবং আকাশ বাইরে বের হল।

আকাশ জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু হাতিরা…?”

সে প্রশ্ন শেষ করার আগেই রাতুল বলল, “ওরা আমাদের কোবিলাই এর হাতে ধরিয়ে দিতে চায়। এখান থেকে তাই আমাদের পালাতে হবে।”

আকাশ তখন কালচে বেগুনী। আবছা বেগুনী আলো আছে চারপাশে। সে আলোতে রাতুল এবং আকাশ চলল হাতিপাড়াকে পিছনে ফেলে। হাতিরা তখন ঘুমোচ্ছে। সমস্ত হাতিপাড়ায় তখন রাতের নির্জনতা ভেদ করে কোরাসে চলছে নাকডাকার শব্দ।

অধ্যায় এগারো

গুহা থেকে বেরিয়ে আঁকা বাঁকা রাস্তা ধরে এগুতে লাগল রাতুল ও আকাশ। আবছা আলোতে চারপাশটা অল্প অল্প দেখা যাচ্ছে। উত্তেজনার বশে সে তার জাদুর বইটি খুলে দেখতে ভুলে গেল। তার মনে ছিল তখন একটাই চিন্তা, তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যেতে হবে। তা না হলে হাতিদের কাছে ধরা পড়তে হবে এবং হাতিরা পাঠিয়ে দেবে কালো জাদুকর কোবিলাই এর কাছে। কিছুদূর যাওয়ার পর কান্নার শব্দ এল রাতুলের কানে। যেন কাছেই কেউ কাঁদছে। সে কান্নার শব্দ লক্ষ করে তাকিয়ে দেখতে পেল একটি গাছের নিচে বসে অদ্ভুত সুরে কাঁদছে বিড়ালের মত একটি প্রাণী। প্রাণীটির সবকিছুই বিড়ালের মত। তবে পিঠের ডানা দুটি এবং মাথার উপরে আঁকা বাঁকা শিংগুলোই শুধু আলাদা।

আকাশ রাতুলের কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “এটা মায়াবিড়াল। এরা রাতে মায়াবী সুরে কাঁদে।”

রাতুল জিজ্ঞেস করল, “তুই জানলি কীভাবে?”

আকাশ বলল, “আমার বাবা বলেছেন।”

রাতুল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোর বাবা? তিনি কী করে জানলেন?”

তখনই আকাশ তার বাবা সম্পর্কে প্রথম কিছু বলল রাতুলকে। সে বলল, “আমি যখন ছোট ছিলাম তখন বাবা আমাকে অদ্ভুত অদ্ভুত সব গল্প বলতেন। এখানে এসে অদ্ভুত জিনিসগুলো দেখে তাই আমার বেশি অবাক লেগেছিল। কারণ বাবা এগুলোর গল্পই করেছিলেন। যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি তখন বাবা হারিয়ে যান। তার কী হয়েছিল তা কেউ আমাকে বলেননি। শুধু একজন চাচার কাছ থেকে জেনেছিলাম তিনি ছিলেন এক জাদুকর।”

রাতুল অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আকাশের দিকে। তাহলে এই জাদু রাজ্যে আকাশের আগমনের ব্যাপারটিও পূর্বপরিকল্পিত!

ইতিমধ্যে মায়াবিড়ালের কান্না আরো বেড়েছে। এমন মায়াবী কান্নার শব্দ রাতুল বা আকাশ দুজনের কেউই এর আগে কখনো শোনেনি।

রাতুল জিজ্ঞেস করল, “এই মায়াবিড়াল কী করে জানিস?”

আকাশ বলল, “সেটা ভুলে গেছি। খুব ছোটকালে শোনা গল্প। তবে এটা মনে আছে মায়া বিড়াল রাতে মায়াবী সুরে কাঁদে।”

রাতুল মায়াবিড়ালের দিকে এগিয়ে গেল। বিড়াল তখনো আপনমনে কেঁদে চলেছে।

রাতুল জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? কাঁদছ কেন?”

মায়াবিড়াল তার মায়াময় চোখ মেলে রাতুলের দিকে তাকাল। তারপর কিন্নরকন্ঠে বলল, “আমি কাঁদি জাদু জগতের দুঃখে। আমি কাঁদি নিয়ত পরিবর্তিত হতে থাকা সময়ের দিকে দৃষ্টি দিয়ে। আমার কান্নার হেতু তুমি কি বুঝিবে? আমার কান্না আমার একান্ত কিছু বিষাদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। আমার কান্নাই এই উদ্ভ্রান্ত উচ্ছৃঙ্খল সময়ের মধ্যে আমার বিষণ্ণ বসবাস।”

রাতুল আকাশের দিকে তাকাল। তারা দুজনের কেউই এই কথাটির অর্থ বুঝতে পারল না। আকাশ জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি আমাদের সাহায্য করতে পারবে?”

মায়াবিড়াল বলল, “আমি জানি তোমরা কী বলতে চাইছ। এই হাতিপাড়া থেকে কীভাবে বের হবে এইতো? ঐ সোজা পথ ধরে চলতে থাকো। জীবন থেকে মুক্তি পেতে হাতিরা এ পথেই যায়।”

মায়াবিড়াল ইশারায় পথ দেখাল। তারপর সে আগের মতই কান্না শুরু করল। মায়াবী সুরে করুণ কান্না। যে কান্না শুনলে মনে হয়, বহু দিনের, বহু বেদনার স্মৃতিতে জরাজীর্ণ হৃদয় থেকে উৎসারিত শৈল্পিক বিষাদের গান।

রাতুল এবং আকাশ মায়া বিড়ালের দেখানো পথে হাটতে শুরু করল। মাথার উপরে আকাশের রঙ বদলে যেতে শুরু করেছে। কালচে হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে আকাশ। চারিদিকে আবছা আলোর রঙ বদলে গেল। এ এক অদ্ভুত, বিস্ময়কর সৌন্দর্য। রাতুল এবং আকাশ রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল। একটু পর হাতিপাড়ার হাতিরা হয়ত জেগে উঠবে।

আকাশের রঙ যখন হালকা কমলা হতে শুরু করেছে তখন তারা পৌঁছে গেল এক বিশাল উপত্যকায়। সারি সারি ছোট পাহাড়ের নিচে বিস্তীর্ণ মাঠ। আলো অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল হয়ে ওঠায় দেখা গেল সে বিস্তীর্ণ মাঠের স্থানে স্থানে পড়ে আছে বিরাট বিরাট কী সব বস্তু।

আকাশ জিজ্ঞেস করল, “এগুলো কী?”

রাতুলও ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। যদিও আকার আকৃতিতে মনে হচ্ছিল খুব চেনা চেনা।

তারা যে জায়গায় দাঁড়িয়েছিল তার ঠিক পাশ থেকেই একটা গম্ভীর কন্ঠ শ্লেষ্মা জড়ানো কন্ঠে বলে উঠল, “এরা  হাতি।”

ভয়ে পেয়ে লাফিয়ে সরে গেল তারা দুজন। এখানে যে কেউ আছে তা তারা লক্ষই করেনি। একটা হাতি বসে আছে। শুঁড়হীন হাতি।

রাতুল তার হাতের জাদুর লাঠিটি সাবধানতার জন্য সামনে ধরে বলল, “ঐ জায়গায় ওসব বস্তু হাতি?”

শুঁড়হীন হাতিটি আগের মতই বলল, “হ্যাঁ। এটা হাতিদের শ্মশান। জান না হাতিরা মৃত্যুর আগে বুঝতে পারে? এবং তারপর নিজে নিজেই হেঁটে আসে এখানে। এসে নীরবে অপেক্ষা করে মহান মৃত্যুর।”

আকাশ বলল, “তুমি কি মৃত্যুর অপেক্ষা করছ?”

হাতিটি বলল, “হ্যাঁ। তা বলতে পার। তবে আমার মৃত্যুর সময় আসেনি। কিন্তু আমি মরতে চাই। তাই এখানে এসে বসে থাকি। শশ্মানের নিস্তব্ধতা আমাকে বড় টানে।”

হাতিটি একটু থেমে গিয়ে বলল, “কিন্তু তোমরা এখানে কেন? কাল তো দেখলাম তোমাদের হাতিপাড়ায়।”

রাতুল বলল, “আমরা জানতে পেরেছি হাতিরা আমাদেরকে কালো জাদুকর কোবিলাই এর কাছে ধরিয়ে দেবে। তাই পালিয়ে এসেছি।”

এই কথা শুনে হাতিটির চোখ যেন দপ করে জ্বলে উঠল। সে উত্তেজিত কন্ঠে বলল, “সব মিথ্যে কথা। হাতিরা কখনো প্রতারণা করে না। কে তোমাদের এই কথা বলেছে?”

রাতুল বলল সেই অদ্ভুত ছোট প্রাণীটার কথা।

হাতি বলল, “এ তো সেই মিথ্যেবাদী প্রতারক। তোমরা কি তঞ্চকের নাম শোনোনি? এই প্রাণী হল সেই তঞ্চক। যে মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতারণা করে মজা পায়। সে তোমাদের মিথ্যা বলেছে।”

রাতুল বিভ্রান্তিতে পড়ে গেল। হাতিটার কথা কি বিশ্বাস করা যায়? তখন তার মনে পড়ল জাদুর বইটির কথা। সে দ্রুত ব্যাগ থেকে বই বের করল। বইয়ের রঙ তখন কমলা রঙের। প্রথম পাতা খুলতেই লেখা দেখা গেলঃ

 তঞ্চক থেকে সাবধান। এরা মজা করার জন্য মিথ্যা বলে সবাইকে বিপদে ফেলে।

এই লেখার উপরে সেই ছোট প্রাণীটির ছবি। এবার আর হাতিটিকে বিশ্বাস করতে কোন বাধা রইল না। হাতিটি বলল, “তোমরা চলো আমার সাথে হাতিপাড়ায়। হাতিরা সকালে তোমাদের দেখতে না পেলে হুলস্থুল বেধে যাবে। অতিথিদের ব্যাপারে হাতিরা খুব সচেতন। এছাড়া যে কোবিলাই এর ভয়ে এখানে এসেছ, সেই কোবিলাই এর ড্রাগনেরা তোমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। হাতিপাড়ায় ড্রাগনেরা ঢুকতে সাহস করবে না।”

রাতুল কিছুটা লজ্জিত হল। এভাবে হাতিদের অবিশ্বাস করা ঠিক হয়নি। অন্তত জাদুর বইটা একবার দেখা উচিত ছিল।

হাতিটি বলতে লাগল, “চলো, আর জাদুর লাঠিটা সাবধানে ধরে রেখো। পথে কোবিলাই এর ড্রাগনদের সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে।”

হাতির সাথে আবার রাতুল এবং আকাশ ফিরতে লাগল হাতিপাড়ায়। তখন আকাশ লাল হতে শুরু করেছে। যেতে যেতে হাতিটা বলতে লাগল, “আজ ভেবেছিলাম লাফ দিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করব। কিন্তু তোমাদের জন্য পারলাম না।”

তারা যখন হাতিপাড়ায় পৌছল ততক্ষণে হাতিরা ঘুম থেকে উঠেছে। এই বিষণ্ণ হাতির সাথে রাতুলদের দেখে অন্য হাতিরা বেশ অবাক হল। বিষণ্ণ হাতি তখন বলল, “আমি আগেই বলেছিলাম সব তঞ্চক শালাদের মেরে ফেলতে। আজ এরা এই তঞ্চকের কারণে হাতিদের ভুল বুঝে চলে যেত। আমি শশ্মান থেকে তাদের নিয়ে এসেছি।”

তঞ্চকের এই ঘটনায় হাতিরা ক্ষুব্ধ হল। রাতুল যখন মেছো কুমিরটাকে মেরেছিল তখন যে মোচওয়ালা হাতি দেখেছিল অর্থাৎ তাদের সেই প্রথম হাতি বন্ধু সে এসে বলল, “তঞ্চকটাকে আমি ধরেছি। শুঁড়ওয়ালা মেয়র প্রার্থীর হাতে তুলে দিয়েছি বিচারের জন্য।”

বিষণ্ণ হাতিটা যেন বিরক্ত হল।  “এসবে কিছু হবে না, আমার কথা যতদিন শোনা না হবে ততদিন কিছুই হবে না” এইসব বিড়বিড় করতে করতে সে চলে গেল। রাতুল তখন মোচওয়ালা হাতিটাকে বলল, “এই হাতির ব্যাপারটা কী?”

মোচওয়ালা বলল, “তঞ্চক জাদু রাজ্যের এক প্রতারক প্রাণী। কিন্তু কথিত আছে বড় এক জাদুকরকে একদিন বাঁচিয়েছিল এক তঞ্চক। তাই সে জাদুকর বলে গেছেন কেউ যেন কোন তঞ্চক হত্যা না করে। তঞ্চক যারা হত্যা করবে তাদের উপর নেমে আসবে ভয়ংকর বিপদ। এই গল্প প্রচলিত আছে জাদু রাজ্যে। ফলে কখনো কোন তঞ্চক হত্যা করা হয় না। কিন্তু এই হাতি বলে এসব গালগল্পে বিশ্বাস করে লাভ নেই। তঞ্চক একটি বিষাক্ত প্রাণী যারা মিথ্যার মাধ্যমে সমস্ত জাদু রাজ্যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে।”

মোচওয়ালা বলে চলল, “কিন্তু তার কথা এলাকার নেতারা শোনেননি। তঞ্চক হত্যা করে এলাকায় বিপদ ডেকে আনার ঝুঁকি তারা নিতে চাননি। এছাড়া আরো ভিন্ন ভিন্ন কারণে এলাকার নেতাদের সাথে তার মতের বিরোধ ছিল। সে নিজেকে মনে করে দার্শনিক। মতবিরোধের কারণে সে একা একা থাকে।”

এই সময়ে আরেকটি মোচওয়ালা হাতি এসে জানাল, “তঞ্চক পালিয়েছে। শুঁড়ওয়ালা মেয়রপ্রার্থীকে মিথ্যা বলে বিভ্রান্ত করে সে চলে গেছে।”

অন্যকে মিথ্যা বলে বিভ্রান্ত করার এক জাদুকরী ক্ষমতা যেন আছে এই প্রাণীটির। কিছুক্ষণ হাতিপাড়ায় চলল তঞ্চক খোঁজাখোঁজি। তারপর পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে রাতুল মোচওয়ালা হাতিটিকে বলল, “তাহলে এবার আমাদের জাদুকরের গুহায় নিয়ে চলো। জাদুকরের সাথে কথা বলে হারিরির অবস্থান জানাটা সবচেয়ে জরুরি।”

মোচওয়ালা হাতি রাতুল এবং আকাশকে নিয়ে চলল জাদুকরের গুহার দিকে। যেতে খুব বেশি সময় লাগল না। তারা পৌছে দেখতে পেল গুহার অবস্থা অন্যদিনের মতই। গুহার ভেতরে বৃদ্ধ জাদুকর হাতি আগুনের সামনে ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। রাতুল, আকাশ এবং মোচওয়ালা হাতিটা প্রবেশ করে তার সামনে আসার পর তিনি চোখ খুলে তাকালেন। তার গভীর চাউনি দিয়ে রাতুলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শুঁড় দিয়ে দাড়ি নাড়তে নাড়তে বললেন, “আজ হবে। একটু আগে আমি নিজেই দেখেছি। বস তোমরা।”

রাতুলরা বসে পড়ার পর তিনি বিড়বিড় করে কীসব মন্ত্র পড়ে ফুঁ দিলেন আগুনে। আগুন লাফিয়ে জ্বলে উঠল। বৃদ্ধ হাতি রাতুলকে বললেন, “এবার তোমার জাদুর বইটি এ আগুনে ফেলে দাও!”

রাতুল এ কথায় চমকে উঠল। জাদুর বই আগুনে ফেলে দিতে হবে কেন? সে ইতস্তত করছিল। তখন বৃদ্ধ হাতি বলে উঠলেন, “ভয় পেও না। বইটি তুমি ফেরত পাবে। তবে এই জাদুর আগুনে পুড়ে যাবার পর সে পুস্তক অন্য পুস্তকে পরিণত হবে। তখন সেখানে তুমি দেখতে পাবে হারিরি কোথায়। এটাই নিয়ম।”

রাতুল বিশ্বাস করল বৃদ্ধ জাদুকর হাতিটির কথা। সে তার ব্যাগ থেকে জাদুর বইটি বের করে ফেলে দিল আগুনে। দাউ দাউ করে জ্বলল আগুন। সে আগুনে জাদুর বই পুড়ে অন্য আরেকটি বইয়ে পরিণত হল এর ছাই থেকে। আগুন নিভে গেল।

বৃদ্ধ হাতি বললেন, “এবার তুমি বইটি নিয়ে খুলে দেখ। হারিরির অবস্থান জানতে পারবে। তবে মনে রেখো এই বই স্পর্শ করার সাথে সাথে কোবিলাই তোমার অবস্থান জেনে যাবে। সুতরাং, বইটি খুলে হারিরির অবস্থান জেনে যত শীঘ্র সম্ভব তাকে উদ্ধার করতে হবে। যত দেরি হবে বিপদ তত বাড়বে।”

রাতুল কাঁপা কাঁপা হাতে বইটি হাতে নিল। ছাইরঙা বই।  বইটি স্পর্শ করার সাথে সাথেই কাছে কোথাও গুহার বাইরে বজ্রপাতের বিকট শব্দ হল।

বৃদ্ধ হাতি বললেন, “ড্রাগনেরা চলে আসছে। তোমরা পালাও।”

রাতুল বইটি ব্যাগে ভরে নিল। হাতের জাদুর লাঠিটি শক্ত করে ধরে সে আকাশ এবং মোচওয়ালা হাতির সাথে বের হল বাইরে। বের হয়েই দেখল আকাশে কালো কালো মেঘের সারি। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।

তারা দৌড়ে কিছুদূর যাওয়ার পরেই প্রথম ড্রাগনের দেখা পেল। মুখে লেলিহান আগুনের শিখাযুক্ত ড্রাগন। ড্রাগনেরা বিকট ডানায় ভর করে উন্মত্ত অসুরের মত শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের উপর।

রাতুলের উপরেই এল প্রথম আঘাত। তবে সে নিজেকে সামলে নিয়ে জাদুর লাঠিটি দিয়ে ড্রাগনের পা বরাবর আঘাত করতে পেরেছিল। জাদুর লাঠির শক্তি অনেক। ড্রাগনের পা পুড়ে গিয়েছিল সে আঘাতে।

মোচওয়ালা হাতির উপর আঘাত করেছিল একটি ড্রাগন। হাতি তাকে শুঁড় দিয়ে পেঁচিয়ে এমন জোরের সাথে ছুঁড়ে ফেলেছিল যে একটা ছোট টিলার মাথাটা উড়ে গেল। রাতুলের প্রথম আঘাত খেয়ে পা হারিয়েছিল যে ড্রাগন সে আবার আক্রমন করল রাতুলকে। এবার রাতুল ড্রাগনটার মাথা বরাবর জাদুর লাঠি দিয়ে আঘাত করতে পেরেছিল। লেলিহান দপদপে আগুনের শিখাযুক্ত মুখসহ ড্রাগনের মাথাটি সে আঘাতে বিচূর্ণ হয়ে যায়।

রাতুল এবং মোচওয়ালা হাতি যখন দুটি ড্রাগন মেরে ফেলল তখন তৃতীয় ড্রাগনটি আকাশকে দু পায়ে ধরে নিয়ে উড়াল দিল। রাতুল এবং হাতি দেখতে পেল আকাশকে নিয়ে যাচ্ছে ড্রাগন। রাতুল অসহায়ের মত হাতিকে জিজ্ঞেস করল, “এখন কী হবে?”

হাতি তখন খুব দ্রুত চিন্তা করে বলল, “বিজলী মাছের পিঠের চড়ে এর পিছু নাও।”

পাশের ডোবার পাশে হলুদ নীল খয়েরি ডোরাকাটা কয়েকটি মাছ তাদের লড়াই দেখছিল। সে মাছগুলো চার পা এবং পিঠে দুই ডানা। রাতুল এদের কাছে গিয়ে বলল, “তোমাদের কেউ আমাকে সাহায্য করবে ড্রাগনটার হাত থেকে আমার বন্ধুকে বাঁচাতে?”

একটি মাছ এগিয়ে এল। রাতুল চেপে বসল এর পিঠে। তারপর প্রচন্ড দ্রুতগতিতে সে মাছ ছুটল ড্রাগনকে ধাওয়া করে। জাদু রাজ্যে বিজলী মাছের উড়ার গতির অনেক সুনাম। মাছ রাতুলকে নিয়ে উড়ে চলল। প্রচন্ড বাতাসের তোড় উপেক্ষা করে। এদিকে ড্রাগন দেখতে পেল রাতুল আসছে বিজলী মাছের পিঠে চড়ে। সে তখন তার মুখ থেকে আগুনের গোলা ছুঁড়ে দিতে লাগল রাতুল ও বিজলী মাছের দিকে। কিন্তু বিজলী মাছ যেমন দ্রুতগতিতে উড়তে পারে তেমন রাখতে জানে ভারসাম্য। তাই আগুনের গোলাগুলোকে পাশ কাটিয়ে চলল ড্রাগনটার দিকে। একটা আগুনের গোলা প্রায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে গিয়েছিল তাদের।

ড্রাগনের লেজের কাছাকাছি পৌছে বিজলী মাছ দারুণ এক ডাইভ দিল আর তার সাথে সাথে রাতুল তার হাতের জাদুর লাঠিটি দিয়ে এক ঘা বসিয়ে দিল ড্রাগনটার লেজে। বিস্ফোরিত আগুনের সাথে খসে গেল ড্রাগনের লেজ। বিদঘুটে এক চিৎকার করে উঠল ড্রাগন। সে তার ভয়াবহ লাল চোখ মেলে ফিরে তাকাল রাতুলের দিকে। কিন্তু রাতুল তখন জাদুর লাঠি হাতে গতিশীল বিজলী মাছের পিঠে চেপে অসীম সাহসী। মাছ তখন আরেকটি ডাইভ দিয়ে এগিয়ে গেল। রাতুল দ্বিতীয়বার আঘাত করল ড্রাগনটিকে। এবার মাথায়। মাথা চূর্ণ বিচূর্ণ হবার সাথে সাথে ড্রাগন তার পা দিয়ে ধরা আকাশকেও ছেড়ে দিল।

দ্রুতবেগে নিচে পতিত হচ্ছিল আকাশ। বিজলী মাছ আরেকটি বিরাট ডাইভ দিয়ে ছুটল নিচে আকাশকে ধরে ফেলতে। সে হয়ত ধরে ফেলত। কিন্তু তার আর দরকার হল না। আরেকটি বিজলী মাছ যে লড়াই দেখতে এসেছিল সে তার আগেই আকাশকে লুফে নিয়েছিল। আকাশও নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে পেরে চেপে বসল বিজলী মাছের পিঠে।

দুটি বিজলী মাছ আকাশ এবং রাতুলকে পিঠে নিয়ে উপরে উঠে কয়েকটি ডাইভ দিল এমনিতেই। এ মনে হয় তাদের আনন্দ উদযাপন। তারপর নেমে গেল মাটিতে। সেখানে অপেক্ষায় ছিল মোচওয়ালা হাতি। মেছো কুমিরটাকে মারতে দেখেই সে রাতুলকে বীর ধরে নিয়েছিল। ড্রাগনদের বিরুদ্ধে জেতার পর এবার সে রাতুলকে মহাবীরের আসনে বসিয়ে দিল। রাতুলেরও আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল বহুগুণে।

 অধ্যায় বারো

রাতুল, আকাশ এবং মোচওয়ালা হাতি ড্রাগনদের সাথে যুদ্ধের পর হাতিপাড়ার দিকে পা বাড়াতে যাচ্ছিল এমন সময় সাঁই সাঁই করে ছুটে এল এক ঈগলটানা রথ। চারটা বিরাটাকার ঈগল পাখি রথ টেনে নিয়ে এসেছে। তাদের মুখে লাগাম। লাগামের অন্য প্রান্ত হাতে চালকের আসনে বসে আছেন রাতুলদের হেডস্যার তোবারক আলী।

ঈগলগুলো এসে মাটিতে দাঁড়াল। তোবারক আলী তার মাথার হ্যাট বা হাতে খুলে রাতুল, আকাশ এবং হাতির দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী খবর তোমাদের?”

রাতুল এবং আকাশ অবাক হয়ে গিয়েছিল। হেডস্যারকে এখানে এভাবে দেখবে তারা কখনো ভাবেনি। তোবারক আলী রথ থেকে নেমে রাতুলদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা জাদু সম্রাট নিকোলাই পুত্র হারিরির খোঁজ পেয়েছ?”

রাতুল বলল, “জি স্যার। জাদুর বইয়ে আছে।”

তোবারক আলী বললেন, “তাহলে আর দেরি কেন? বই থেকে ওর অবস্থান জেনে নাও। এরপর উঠে এস রথে। নষ্ট করার মত সময় নেই।”

রাতুল তার ব্যাগ থেকে বইটি বের করল। ছাই রঙা বই। প্রথম পৃষ্ঠা খুলতেই দেখা গেল একটি ম্যাপ। ম্যাপের একদিকে লাল রঙের তীর চিহ্ন দেয়া। সেখানে একটা পাহাড়ের ছবি। নাম দেয়া আছে বিন্ধ্র পর্বত।

জাদু রাজ্যের জায়গাগুলোর সাথে রাতুল পরিচিত না। তাই সে তোবারক আলীকে ম্যাপটি দেখাল। তিনি দেখে বললেন, ‘হুম! বিন্ধ্র পর্বত এর গুহায় লুকিয়ে রেখেছে। সেখানে যাওয়া এক ভয়ংকর ব্যাপার। কিন্তু তবুও আমাদের সেখানে যেতে হবে।”

ক্রমশ

ছবিঃ অতনু দেব

জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক একত্রে

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s