ধারাবাহিক উপন্যাস জাদু রাজ্য মুরাদুল ইসলাম শরৎ ২০১৭

আগের পর্বগুলো

তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তবে এর আগে জাদুকর মাহমুদের সাথে একবার দেখা করতে হবে তুরণ পাহাড়ে। জাদুকর মাহমুদ আমাদের অপেক্ষায় আছেন সেখানে। আর তার সাথে আছে তার পোষা জাদুর হীরামন পাখি।”

তোবারক আলী রথে উঠে ঈগলের লাগাম হাতে নিয়ে তাগাদা দিলেন, “উঠে এসো, উঠে এসো।”

রাতুল এবং আকাশ মোচওয়ালা হাতিকে বিদায় জানাচ্ছিল। ঠিক তখন আরেকটি মোচওয়ালা হাতি এসে খবর দিল হাতিপাড়ায় কালো জাদুকর কোবিলাইয়ের গুন্ডাবাহিনী গন্ডারলিগ হামলা করেছে। এই গন্ডারদের দলকে নাম দেয়া হয়েছে গন্ডারলিগ। এরা দুধর্ষ এবং ভয়ানক। কিন্তু এর আগে কখনো হাতিপাড়ায় আক্রমণ করেনি। হাতিদেরও শক্তিমত্তা কম না। সুতরাং, প্রবল প্রতিরোধ শুরু হয়েছে। হাতিপাড়ায় আক্রমণের খবর শুনে মোচওয়ালা হাতি রাতুলদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ছুটল হাতিপাড়ায় দিকে। রাতুলরা উঠে পড়ল তোবারক আলীর ঈগলটানা রথে। তোবারক আলী লাগাম টানতেই ঈগলগুলো রথ নিয়ে ছুটল তুরণ পাহাড়ের দিকে। 

কয়েকটি নীল রঙের পাহাড় এবং উজ্জ্বল গোলাপী রঙের হ্রদ পেরিয়ে রথ চলতে শুরু করল। আকাশের রঙ তখন হালকা বাদামী এবং নীলের মিশেলে অদ্ভুত এক রঙ ধারণ করে আছে।

তোবারক আলী রথ চালনা করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা এই কোবিলাই সম্পর্কে কিছু জানতে পেরেছ?’

রাতুল বলল, “শুধু জেনেছি সে কালো জাদুকর এবং ভয়ংকর।”

তোবারক আলী দাঁত দিয়ে ঠোট কামড়ে বেশ কসরত করে লাগাম টেনে রথকে নির্দিষ্ট কোণে ঘুরিয়ে নিতে নিতে বললেন, “তা ঠিক আছে। কোবিলাই এর মত ভয়ংকর আর কিছু আছে আমি ভাবতে পারি না। তবে তার সম্পর্কে আরো কিছু জানা উচিত তোমাদের। যেমন সে কে, কেমন করে জাদু রাজ্যের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হতে যাচ্ছে এসব।”

তারপর তিনি বলতে শুরু করলেন কোবিলাই এর কাহিনী। সে কাহিনী তাঁর ভাষাতেই হুবহু তুলে ধরা হলঃ

নিকোলাই এর পিতা সম্রাট আজানিস এর ছিল দুই পুত্র। নিকোলাই এবং কোবিলাই। নিকোলাই সাধারণ জাদুবিদ্যায় শিক্ষিত হলেন। তিনি ছিলেন বেশ সুঠাম দেহের অধিকারী। তাঁর কাঁধ পর্যন্ত লম্বা কোঁকড়ানো চুল। মুখভর্তি দাড়ি, নীল চোখ এবং উজ্জ্বল শ্যামলা গাত্রবর্ণ যেন তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রতিনিধিত্ব করত। তাঁর গলার স্বর ছিল কিছুটা গম্ভীর।

আর কোবিলাই ছিল অপেক্ষাকৃত খাটো। সে কালো জাদুকর ইজাকার সান্নিধ্য পেয়ে হয়ে গেল প্রচন্ড ক্ষমতালোভী। কালো জাদুকর ইজাকা ছিল সম্রাট আজানিসের একজন জাদুকর। জাদু রাজ্যে কোন কোন ক্ষেত্রে কালো জাদুরও দরকার পড়ত। সেই ইজাকার কাছ থেকে কালো জাদু শিখতে লাগল কোবিলাই।

সাধারণত জাদু রাজ্যে সামান্য কিছু লোক ছাড়া কালো জাদুর চর্চা সবাই করতে পারত না। তাই কোবিলাই লুকিয়ে ইজাকার কাছ থেকে কালো জাদু শিখছিল। আর ইজাকারও সম্রাট আজানিসকে বেশ পছন্দ ছিল না। তাই সে আজানিসের পুত্র কোবিলাইকে কালো জাদু শিখিয়ে তৈরি করতে লাগল। তার ইচ্ছা ছিল কোবিলাইকে কালো জাদুশক্তির বলে ক্ষমতায় বসাবে। তারপর সে নিজেই হয়ে যাবে জাদু রাজ্যের সর্বময় কর্তা। তখন পুরো জাদু রাজ্যে বিস্তার ঘটাবে কালো জাদুর।

এখানে উল্লেখ্য যে কালো জাদুকররা শয়তানের কাছে সাহায্য চায় বলে জাদু রাজ্যে কালো জাদু ছিল ঘৃণ্য। কোবিলাই কালো জাদু শিখতে শিখতে নিজের মুখ বিকৃত করে ফেলল। কালো জাদুর প্রভাবে কালো জাদুকরদের মুখ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকৃত হয়ে যায়। কোবিলাই এর একটা চোখের জায়গায় কালো গর্ত হয়ে গিয়েছিল। এরপরেই জানাজানি হয়ে যায় সে কালো জাদুর সাথে যুক্ত।

সম্রাট আজানিস প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি কোবিলাইকে ডেকে পাঠালেন।

ইজাকা তখন কোবিলাইকে গিয়ে বলল, “তোমার বাবা নিশ্চয়ই তোমাকে রাজপ্রাসাদ থেকে বের করে দেবেন। তুমি বঞ্চিত হবে সিংহাসন থেকে। তাই আমি বলি, বিষ খাইয়ে সম্রাট আজানিসকে মেরে ফেল। অতঃপর নিকোলাইকে বন্দি করে তুমি হবে সম্রাট।”

কোবিলাই তখন ভয় পেয়েছিল। সে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? অনেক বড় বড় জাদুকর আছেন রাজপ্রাসাদে। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাজাকে বিষ দেয়া তো অসম্ভব!”

ইজাকা বলল, “সম্ভব করার দায়িত্ব আমার। আমি জাদুবলে কিছুক্ষণের জন্য সবাইকে মোহগ্রস্ত করে রাখতে পারব। সেই সুযোগে তুমি জাদুর সাহায্যে লুকিয়ে সাথে নিয়ে যাবে বিষের কৌটা। তারপর ঢেলে দেবে রাজার পানপাত্রে।”

তারপর সেই দিন এল। ইজাকা শয়তান লুসিফারের কাছ থেকে চেয়ে নিল তীব্র কিছু বিষ। সে রাজপ্রাসাদের সবাইকে তার জাদুমন্ত্রবলে সামান্য সময়ের জন্য মোহগ্রস্ত করে রাখল।

প্ল্যানমত প্রাসাদে ঢুকল কোবিলাই। রাজার পানপাত্রে সে বিষ মিশিয়ে দিতে পেরেছিল।

রাজপ্রাসাদে তখন সবাই জাদুমানব হলেও মাত্র একজন ছিলেন পৃথিবীর মানুষ। তিনি হলেন জাদুকর মাহমুদ। নিকোলাই এর প্রিয় বন্ধু। অদ্ভুত উপায়ে তিনি ছোটবেলা থেকে জাদু রাজ্যে প্রবেশের অধিকার পেয়েছিলেন। জাদুতে তার দখল ছিল অনেক। মহান জাদু দেবতা শিয়াংহোর কাছ থেকে তিনি উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন প্রচন্ড ক্ষমতাধর এক হীরামন পাখি। সে পাখিটাও সেদিন তার সাথে ছিল।

ইজাকার মন্ত্রে পাখিটা মোহগ্রস্থ হয় নি। জাদুর হীরামন পাখির উপর কোন ধরণের জাদুই কাজ করে না। পাখিটা সমস্ত ঘটনা বুঝে ফেলল। জাদুকর মাহমুদের উপর কালো জাদুর মায়া কাটিয়ে দিল পাখিটি। জাদুকর মাহমুদ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে হীরামন পাখির কাছ থেকে সব শুনলেন। তিনি বুঝতে পারলেন রাজার বিপদ আসন্ন। তাই খুব দ্রুত তিনি তার বন্ধু এবং রাজপুত্র নিকোলাই এর উপর প্রযুক্ত ইজাকার জাদু মায়াজাল কাটালেন। নিকোলাই কালো জাদুর মোহগ্রস্থতা থেকে বের হয়ে বন্ধু মাহমুদের কাছ থেকে পিতা আজানিসের আসন্ন বিপদ সম্পর্কে অবহিত হলেন।

তিনি বন্ধুকে বললেন, “বন্ধু, তুমি রাজপ্রাসাদের অন্য জাদুকরদের উপর ইজাকার জাদুর প্রভাব নষ্ট করে দাও। আর আমি রাজার কক্ষে গিয়ে তাকে রক্ষা করছি।”

কালো জাদুর প্রভাবান্বিত হয়ে রাজা আজানিস হয়ত বিষ দেয়া পানীয় খেয়েই ফেলতেন। কিন্তু তার আগে গিয়ে উপস্থিত হন নিকোলাই। তিনি রাজাকে পানীয় পান থেকে বিরত রাখেন।

রাজপ্রাসাদের অন্য জাদুকরদের উপর থেকে ইজাকার প্রভাব একে একে দূর করে দিচ্ছিলেন জাদুকর মাহমুদ এবং তার হীরামন পাখি। প্রভাবমুক্ত হয়ে এসব জাদুকররা ইজাকার ষড়যন্ত্র বুঝতে পারলেন। তাদের কালো জাদু দিয়ে মোহগ্রস্থ করে রাখার মত দূঃসাহস দেখে অবাক হয়ে গেলেন তারা। এ যেন কল্পনাও করা যায় না। এমনকী স্বয়ং রাজা আজানিসকে কালো জাদু দিয়ে মোহগ্রস্থ করা হয়েছে!

ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে গেল। ইজাকাকে একটি খয়েরি কাচের বোতলে বন্দি করে সাথে সাথে গভীরতম অন্ধকার কুয়ায় নিঃক্ষেপ করলেন রাজপ্রাসাদের প্রধান জাদুকর। আর কোবিলাইকে রাসপ্রাসাদ থেকে চিরতরে বহিঃষ্কার করেছিলেন রাজা আজানিস।

রাজাদের পুত্র হত্যা করতে নেই বলে তিনি তাকে মৃত্যুদন্ড দিতে পারেননি।

এর কিছুদিন পর বৃদ্ধ রাজা আজানিস নিকোলাইকে জাদু রাজ্যের সম্রাট বানিয়ে স্বেচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল কয়েকশ বছর। এরপর নিকোলাই সম্রাট হয়ে অনেকদিন জাদু রাজ্য পরিচালনা করেন। সেসময় কোবিলাই অজ্ঞাতে থেকে কালো জাদুর জগতে আরো শক্তিশালী হতে থাকে।

তারপর একদিন হঠাৎ সে আবির্ভূত হয় রাজপ্রাসাদে। রাজপ্রাসাদের সব জাদুকরদের কব্জা করে হত্যা করে তার ভাই কোবিলাইকে। কোবিলাই এর পুত্র হারিরিকেও হত্যা করত। কিন্তু হারিরিকে নিয়ে পালিয়ে যান কোবিলাই এর এক বিশ্বস্ত জাদুকর সহচর। তার বন্ধু মাহমুদ তখন তুরণ পাহাড়ে জাদুবিদ্যার স্কুল খুলে শিক্ষা দিচ্ছিলেন।  তিনি রাজার বিপদ শুনে চলে আসতে চেয়েছিলেন কিন্তু তার আগেই পুরো তুরণ পাহাড়কে বন্দিশালায় পরিণত করে দিয়েছিল কোবিলাই। তিনি সেখান থেকে বেরোতে পারলেন না।

রাজা নিকোলাই এর বিশ্বস্ত সেই সহচর তার পুত্র হারিরিকে বাঁচাতে নিয়ে গেলেন পৃথিবীতে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরলেন। শেষ পর্যন্ত হারিরির তোমাদের সাথে দেখা হল। অবশ্য সে দেখা হবার পিছনেও কারণ ছিল। জাদু রাজ্যের ভাগ্য মন্দিরের দেবতা ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন হারিরিকে উদ্ধার অভিযানে তোমরা দুজন অংশগ্রহণ করবে। অর্থাৎ নিজের অজান্তেই হারিরি এবং তোমাদের ভাগ্য একসাথে জড়িয়ে গেছে। এই উদ্ধার অভিযানের ফল কী হবে, হারিরিকে উদ্ধার করা যাবে কি যাবে না তা স্পষ্ট করে বলেন নি জাদুরাজ্যের ভাগ্যদেবতা। তবে কালো জাদুকর কোবিলাই যাতে জাদু রাজ্যের সব ক্ষমতার অধিকারী হতে না পারে এটা জাদু রাজ্যের প্রায় সবাই চায়। সে প্রচন্ড ক্ষমতালোভী ও নৃশংস। ফলে সে জাদু রাজ্যের সম্রাট হলে জাদুর জগত এবং পৃথিবীর মানুষের জগতের জন্য ডেকে নিয়ে আসবে অমঙ্গল।

কোবিলাই সম্পর্কে বলা শেষ করলেন তোবারক আলী। শেষ হলে রাতুল জিজ্ঞেস করল, “আমরা কীভাবে এই শক্তিশালী কোবিলাই এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব?”

তোবারক আলী গম্ভীর হয়ে বললেন, “তা আমিও জানি না সঠিক।আমরা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি ভাগ্য দ্বারা। তুরন পাহাড়ে জাদুকর মাহমুদ এর কাছ থেকে হয়ত কিছু জানা যাবে।”

আকাশ জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু তিনি তো বন্দি?”

তোবারক আলী বললেন, “বন্দি বলতে তিনি ঐ পাহাড় থেকে বের হতে পারেন না। কিন্তু তাঁর জাদুর স্কুল এখনো আছে। ছাত্ররা সেখানে জাদু শেখে। তার সাথে তার হীরামন পাখিটাও আছে। তার নিজের জাদুক্ষমতাও অনেক। আশা করছি তিনি হারিরিকে উদ্ধারের ব্যাপারে আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করতে পারবেন।”

রথ উড়ে চলল। ভয়ংকর সুন্দর জাদুরাজ্যের উপর দিয়ে তুরন পাহাড়ের দিকে। হালকা বাতাসের ভেতর দিয়ে, বিচিত্র ধরনের প্রাণী এবং উড়ন্ত যানবাহন পেছনে ফেলে। কয়েকটি বিশালাকার ইঁদুরমুখো বাজপাখি রথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে একটি বিরাট তেলরঙা ভাল্লুককে। ভাল্লুকের নাকটা আবার খুব লম্বা। সে রথের পাশে পাশেই আরেকটি বিরাটাকার চড়ুই পাখির পিঠে চেপে উড়ে যাচ্ছে হলুদ রঙের প্রায় সাড়ে ছ’ফুট উচ্চতার এক তেলাপোকা। রাতুল এবং আকাশ অবাক হয়ে দেখছিল এসব আর রথ এগিয়ে যাচ্ছিল তুরন পাহাড়ের দিকে।

অধ্যায় তেরো

তুরন পাহাড় একটি বিরাট পাহাড়। পাহাড়ের গা ছোট ছোট সবুজ ঘাসে আবৃত। ঠিক যেন ছবির মত সুন্দর। পাহাড়ের বিভিন্ন গুহায় জাদু রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে জাদু শেখার জন্য ছাত্ররা এসে থাকে। তাদের জাদু শেখান জাদুকর মাহমুদ। তিনি পাহাড়ের প্রায় মধ্যেখানের একটি গভীর গুহায় জাদুবিদ্যার বিভিন্ন নিগূঢ় তথ্য নিয়ে চিন্তায় থাকেন প্রায়ই। কোবিলাই এর কালো জাদুর প্রভাবে তিনি এই পাহাড়ের বাইরে যেতে পারেন না। তাঁর পোষা হীরামন পাখিটি আছে তাঁর সঙ্গে।

তোবারক আলী জাদুকর মাহমুদের গুহার সামনে গিয়ে রথ থামিয়ে বললেন, “এটাই জাদুকর মাহমুদের গুহা। আমার সাথে তার যোগাযোগ হয়েছিল তার পোষা হীরামন পাখির মাধ্যমে। চল, আমরা এর ভেতরে যাব।”

তিনি রথ থেকে নেমে হেঁটে গুহায় প্রবেশ করলেন। তার পিছু পিছু গেল রাতুল এবং আকাশ। কিছুদূর যাওয়ার পর রাতুল দেখতে পেল একজন মধ্যবয়স্ক লোক কয়েকটি কাছিমকে কী যেন বুঝাচ্ছেন। কাছিমগুলোর ঠ্যাঙ মাত্র দুইটি এবং সেগুলো বকের ঠ্যাঙের মত লম্বা।

তারা যাওয়াতে তিনি তাদের দিকে ফিরে তাকালেন। তার মুখ হাসিতে ভরে উঠল।

তোবারক আলী হাসিমুখে বললেন, “কেমন আছেন মাহমুদ সাহেব? এই দেখেন আমি কাদের নিয়ে এসেছি?”

জাদুকর মাহমুদ রাতুল এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাহ! বেশ তো! তোমরা দেখছি এসে গেছ। আকাশ, তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ?”

আকাশ কিছু বলার আগেই তিনি এগিয়ে এলেন। তারপর আকাশের সামনে হাঁটুগেড়ে বসে বললেন, “আমি তোমার বাবা। এখানে বন্দি হয়ে যাবার পর তোমাকে আর দেখতে যেতে পারিনি। আমার মাথার চুল সাদা হয়ে গেছে এই পাহাড়ের পরিবেশে।”

আকাশ তার বাবাকে চিনতে পেরেছিল। এতদিন পর সম্পূর্ণ আকস্মিকভাবে বাবাকে দেখার পর তার চোখে জল চলে এল। বাবা প্রত্যেক সন্তানের জন্য ছায়ার মত। বাবা নিরুদ্দেশ হবার পর আকাশ তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল। সে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

পিতাপুত্রের এই অপূর্ব মিলনদৃশ্য প্রত্যক্ষ করে রাতুলের মন ভালো হয়ে গেল। সে একবার তোবারক আলীর দিকে তাকিয়ে দেখল তিনিও হাসি হাসি মুখ নিয়ে পিতা ও পুত্রকে দেখছেন।

তোবারক আলী আকাশকে লক্ষ করে বললেন, “তোমার বাবা এখানে জাদুকর মাহমুদ নামে পরিচিত। তিনি সম্রাট নিকোলাই এর খুব কাছের লোক ছিলেন। হারিরিকে উদ্ধারে তিনিই আমাদের সাহায্য করবেন।”

জাদুকর মাহমুদ উঠে দাঁড়িয়ে তোবারক আলীকে বললেন, “হারিরিকে কোথায় রাখা হয়েছে এর কোন হদিশ পেলেন?”

তোবারক আলী বললেন, “হ্যাঁ, পেয়েছি। বিন্ধ্রপর্বতেই রেখেছে মনে হল।”

তারপর রাতুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “রাতুল, ম্যাপটা ওঁকে দেখাও তো?”

রাতুল জাদুর বই খুলে ম্যাপটা জাদুকর মাহমুদকে দেখাল। জাদুকর মাহমুদ দেখে বললেন, “হ্যা, বিন্ধ্রপর্বতেই আছে হারিরি। কিন্তু এ তো পর্বতের দক্ষিণ অংশে। অর্থাৎ অগ্নিসমুদ্রের উপর দিয়ে যেতে হবে।”

তোবারক আলী জিজ্ঞেস করলেন, “কিন্তু অগ্নিসমুদ্রের উপর দিয়ে কোন রথ নিয়ে যাওয়া যায় না শুনেছি। আগুনের উত্তাপে নাকি গলে যায়।”

জাদুকর মাহমুদ বললেন, “ঠিক শুনেছেন। অগ্নিসমুদ্রের উপর দিয়ে রথ নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।  এর উপর দিয়ে যাওয়া যাবে একমাত্র জাদুর গালিচায় চড়ে।”

তোবারক আলী জিজ্ঞেস করলেন, “কোন গালিচার কথা বলছেন? বাদশাহ সুলেমানের জাদুর গালিচা?”

জাদুকর মাহমুদ বললেন, “হ্যাঁ, সেই গালিচাই। এছাড়া যাওয়া যায় কালো জাদু ব্যবহার করে লুসিফারের ভেলায় চড়ে। কিন্তু আমাদের পক্ষে তো লুসিফারের ভেলায় চড়া অসম্ভব। সুতরাং, এখানে শুধু সুলেমানের জাদুর গালিচাই ভরসা।”

চিন্তিত মুখে তোবারক আলী বললেন, “কিন্তু সে গালিচা তো শুনেছি দহরমপুরে। দুখী দোপেয়ে দৈত্যের প্রাসাদে। তা কীভাবে আনা সম্ভব?”

জাদুকর মাহমুদ বললেন, “সে গালিচা আনতে হলে দুখী দোপেয়ে দৈত্যের প্রাসাদে হানা দিতে হবে। সে যখন প্রাসাদে থাকে না তখন প্রবেশ করে আনতে হবে গালিচা। তবে ঠান্ডার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ দুখী দৈত্যের প্রাসাদ এবং প্রাসাদ সংশ্লিষ্ট বাগানে কখনো বসন্ত আসে না। সব সময় সেখানে কনকনে ঠান্ডা বাতাস বয়। প্রায়ই বরফ পড়ে।”

তোবারক আলী বললেন, “কিন্তু তার প্রাসাদটা কোথায়?”

জাদুকর মাহমুদ বললেন, “এখান থেকে বেশ দূরে না। আমরা ছাত্ররা আপনাদের সেখানে পৌঁছে দিতে পারবে।”

তোবারক আলী বললেন, “তাহলে ডাকুন আপনার ছাত্রদের। নষ্ট করার মত সময় একেবারেই নেই। দেরি হয়ে গেলে কোবিলাই হারিরিকে হত্যা করে জাদু রাজ্যের সম্রাটের শপথ নিয়ে ফেলতে পারে।”

জাদুকর মাহমুদ বললেন, “তা ঠিক বলেছেন। তবে হারিরিকে হত্যা না করা পর্যন্ত জাদু রাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী শপথ গ্রহণ হবে না। সুতরাং, রাজপ্রাসাদের জাদুকররা যদি হারিরির মৃত্যুর ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হন তবেই তারা শপথ পড়াবেন।”

মাহমুদ হাততালি দিলেন। তাতে বিশালাকায় তিনটি ডানাওয়ালা খরগোশ এসে হাজির হল।

জাদুকর মাহমুদ বললেন, “এরাই আপনাদের দুখী দৈত্যের প্রাসাদে পৌঁছে দেবে।”

রাতুল বলল, “দৈত্যটা কি ভয়ংকর?”

জাদুকর মাহমুদ বললেন, “ভয়ংকর বলা যায়। তার মাত্র একটি চোখ এবং সেটি ঠিক কপালের মাঝখানে। মাথায় লম্বা একটি শিং।”

আকাশ জিজ্ঞেস করল, “তাকে দুখী দৈত্য বলা হয় কেন?”

জাদুকর মাহমুদ বললেন, “সে আনন্দ, সুখ, হাসি ইত্যাদি সহ্য পারে না। সে দুঃখ পছন্দ করে। সব কিছু দুখী দেখতে চায়। এজন্যই তার এই নাম।”

তোবারক আলী, রাতুল এবং আকাশ খরগোশ তিনটির পিঠে চেপে বসল। জাদুকর মাহমুদ বললেন, “সাবধানে যাবেন। গালিচা নিয়ে পিছনে ফিরে তাকাবেন না। সোজা ফিরে আসবেন।”

তোবারক আলী ‘ঠিক আছে’ বলে তাঁর খরগোশকে ওড়ার নির্দেশ দিলেন। জাদুকর মাহমুদ রাতুল এবং আকাশকেও বললেন, “সাবধানে যাবে। স্যারের কথা শুনে কাজ করবে। ভুল করলেই বিপদ। দুখী দৈত্য ধরতে পারলে পাথরের মূর্তি বানিয়ে রেখে দেবে তার প্রাসাদে।”

রাতুল এবং আকাশের খরগোশটিও উড়ল। তিনটি খরগোশ তুরন পাহাড় থেকে বের হয়ে ছুটল দুখী দৈত্যের প্রাসাদের দিকে। নীল এবং হলুদ রঙের আলো তখন চারিদিকে। খরগোশ তিনটি দুখী দৈত্যের প্রাসাদে আসতে বেশি সময় নিল না। উপর থেকেই দেখা যাচ্ছিল দুখী দৈত্যের প্রাসাদে এবং বাগানে তুষার জমেছে।

খরগোশেরা প্রাসাদের সামনে এসে থামল।

একজন খরগোশ বলল, “এর সামনে যাওয়ার অনুমতি নেই আমাদের।”

তোবারক আলী, রাতুল এবং আকাশ নেমে পড়ল। তোবারক আলী চারদিকটা ভালোমত দেখে বললেন, “তোমরা দুজন দুদিকের দেয়াল টপকে বাগানে ঢুকে যাও। আমি প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকছি। দৈত্যের সাথে দেখা হলে বলব গুরুত্বপূর্ণ আলাপ করতে এসেছি। সে অল্পবিস্তর আমাকে চেনে হয়ত। পরিচয় দিলে হয়ত চিনবে। সুতরাং, খপ করে ধরে কট করে ঘাড় ভেঙে দেবে না। কথাবার্তা বলতে পারে। আর এই সুযোগে তোমরা ওর প্রাসাদে ঢুকে যাবে। ওর রুমেই আছে বাদশা সুলেমানের জাদুর গালিচা। ব্যাটা গালিচাটি সাথে সাথে রাখে।”

তোবারক আলীর কথামত রাতুল উত্তর দিকের দেয়াল টপকে বাগানে ঢুকল। আকাশ ঢুকল দক্ষিণ দিকের দেয়াল টপকে। বাগানে বিস্তর জমেছে তুষার। গাছপালাগুলো শীতের প্রকোপে প্রায় মরে গেছে যেন। বিশাল বাগানে কোন সাড়াশব্দ নেই। পাখির ডাক নেই। বিরাজ করছে অনন্ত শব্দহীনতা।

রাতুল ঠান্ডায় জমে যাচ্ছিল। কোনক্রমে তুষার পায়ে ঠেলে সে দৈত্যের প্রাসাদের কাছাকাছি গিয়ে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে প্রাসাদের দিকে তাকাল। কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

আর এদিকে প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করেছেন তোবারক আলী। তিনি কিছুটা এগিয়ে অতিথি বসার জন্য ছাউনি ছিল সেখানে গেলেন। তুষারের স্তূপ জমেছিল চেয়ারগুলোর উপর। তোবারক আলী তার পাশে দাঁড়িয়ে বিকট কন্ঠে শুরু করলেন ছড়া-

বিরাট সে একখান দৈত্যের নানা

যেন তার চোখ নেই, একেবারে কানা

ভাঙা এক প্রাসাদের ঘুণ ধরা কোনে

একা একা শুয়ে বসে, ভুল গান শুনে

যেই তার চোখ উঠে মাঝখানে কপালের

ওমনি সে উঠে পড়ে হাই তুলে সকালের

মেলে বলে তার সেই অতি গোল আঁখি

ওরে বাবা! এত কিছু দেখা ছিল বাকি!

তার এই অদ্ভুত ছড়া শুনে দৈত্য বেরিয়ে এল ঘর থেকে। রাতুল গাছের আড়ালে লুকিয়ে থেকে দেখল বিরাটাকার দৈত্য থপ থপ পায়ে এগিয়ে চলেছে। মাথায় বিরাট শিং। কপালের ঠিক মাঝখানে বড় গোল চোখ।

দৈত্য কাছাকাছি পৌছে গেলে তোবারক আলী ছড়া বন্ধ করে বললেন, “আমি আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। আপনার কাছেই এসেছি। তুরন পাহাড় থেকে।”

দৈত্য ছড়া শুনে কিছুটা রেগে গিয়েছিল। কিন্তু তুরন পাহাড়ের কথা শুনে সে খানিকটা অবাক হল। কারন তুরন পাহাড় যে একটা ভালো জাদু শেখার বিদ্যালয় তা জাদু রাজ্যের সবাই জানে।

দৈত্য জিজ্ঞেস করল, “তুরন পাহাড় থেকে! কেন?”

রাতুল আর দেরি করল না। সে শুনতে পেল তোবারক আলী বলছেন, “আমার দুটি ছাত্র বুঝলেন, এই জাদু বিদ্যার উপরে বিশেষ পড়ালেখা করছে। তাদের আপনার একটু সাহায্য বড়ই প্রয়োজন……”

আরো কী কী যেন বলছিলেন তোবারক আলী। রাতুল উত্তেজনায় আর সেসব শুনতে পেল না। সে দৈত্যের প্রাসাদে প্রবেশ করে দেখল বাহিরটা যতটা মনমরা দেখা যায় ভেতরটা তার চেয়ে অনেক বেশি দুখী দুখী দেখতে। তেমন কোন জিনিসই নেই বলতে গেলে। কয়েকটা পান পাত্র মেঝেতে পড়ে আছে। কয়েকটা ভাঙা টব জড়ো করে রাখা আছে এক কোনে।

রাতুল ভেতরের রুমে প্রবেশ করল। এটাই সম্ভবত দৈত্যের রুম। সেখানে একটি খাট ছিল। এবং খাটের একপাশে ভাঁজ করা ঝকঝকে গালিচা। এরকম একটি মনমরা কক্ষে সম্পূর্ণরূপে বেমানান। যে কেউ একবার দেখেই বুঝতে পারবে এটা এই প্রাসাদের অন্য সব বস্তু থেকে আলাদা।

রাতুল তাড়াতাড়ি গিয়ে গালিচা হাতে নিল। ঠিক তখনি দৌড়ে প্রবেশ করল আকাশ। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “দৈত্য হেডস্যারের টুঁটি চেপে ধরেছে।”

রাতুল গালিচাটি ব্যাগে ভরে তার পিঠে বাঁধা জাদুর লাঠিটা হাতে নিল। তারপর ব্যাগ কাঁধে চাপিয়ে তড়িৎবেগে বের হয়ে গেল আকাশের সাথে। তারা দুজন দৈত্য এবং তোবারক আলীর কাছে পৌঁছোল। দৈত্য তখন তোবারক আলীকে গলা চেপে ধরে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। তোবারক আলী পা ছুঁড়ছেন বেশুমার।

রাতুল আর দেরি করল না। সে তার হাতের লাঠিটি দিয়ে এক ঘা বসিয়ে দিল শিংওয়ালা দৈত্যের মাথায়। জাদুর লাঠির শক্তি অনেক। এছাড়া সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় দৈত্য আঘাত পেয়েছে তার সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গায়। সুতরাং, সে মাথা ঘুরে পড়ে গেল।

তোবারক আলী কাশতে কাশতে উঠে দাঁড়ালেন। মাথায় ঘা খেয়ে দৈত্যের তখন আর ওঠার শক্তি নেই। সে পড়ে আছে। তোবারক আলী কেশে রাতুলকে বললেন, “গালিচা বিছাও মাটিতে।”

রাতুল ব্যাগ থেকে গালিচা বের করে মাটিতে বিছাল। তোবারক আলী এর উপর উঠে বললেন, “হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছ কী? উঠে পড়ো। দৈত্য জেগে উঠলে রক্ষা নেই।”

রাতুল ও আকাশ গালিচায় উঠে দাঁড়াল। তোবারক আলী বললেন, “যাও গালিচা, তুরন পাহাড়ে যাও।”

বলে তিনি চোখ বন্ধ করে রইলেন। কিন্তু গালিচা নড়ল না।

বিষয় কী! এটা কী ঠিক সুলেমান বাদশাহর গালিচা? নাকী অন্য কিছু!

তোবারক আলী আবার বললেন, “যাও গালিচা, তুরন পাহাড়ে যাও।”

ইতিমধ্যে দৈত্য নড়তে শুরু করেছে। মাথার আঘাত সামলে নিয়ে সে ধীরে ধীরে মাথা তুলতে চেষ্টা করছে।

তোবারক আলী দৈত্যের নড়াচড়া দেখে আবার খুব তাড়াতাড়ি বললেন, “যাও গালিচা, তুরন পাহাড়ে জাদুকর মাহমুদের কাছে যাও।”

গালিচা নড়ল না এবারও। এদিকে দৈত্য উঠে বসেছে। তার সুলেমান বাদশাহর গালিচা চুরি হয়ে যাচ্ছে দেখে সে গরিলার মত বুক চাপড়ে ভয়ংকর এক হুংকার দিয়ে উঠল। তাতে কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়।

তোবারক আলী রাতুলের কাছ থেকে জাদুর লাঠিটা নিয়ে তরবারির মত দোলাতে লাগলেন যাতে দৈত্য এগিয়ে আসতে ভয় পায়। কিন্তু দৈত্যকে দেখে মনে হল না এতে সে সামান্যতম ভয় পেয়েছে। সে আরেকটি মাঝারি সাইজের হুংকার দিয়ে মুখ থেকে অগ্নিগোলক ছুঁড়ে দিল তোবারক আলী এবং রাতুলদের দিকে। তোবারক আলী নিচু হয়ে নিজের মাথা বাঁচালেন।

দৈত্য উঠে দাঁড়াল। তার কাছ থেকে গালিচায় দাঁড়ানো রাতুলদের দূরত্ব হবে মাত্র দশফুটের মত। তিন পা ফেলে দৈত্য এ দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলতে পারে। তবে মাথায় আঘাত পাওয়ার কারণে কিছুটা আস্তে হাঁটছে। এক পা এগিয়ে এসেই সে আবার ছুঁড়ে দিল আগুনের গোলা। এবার তোবারক আলীর জাদু দন্ডে লেগে তা অর্ধেক পুড়ে গেল।

দৈত্য এগিয়ে এল আরেক পা। এখন দূরত্ব হয়ে গেল পাঁচ ফুটের মত। রাতুলের মাথায় তখন দারুণ এক বুদ্ধি চলে এল। সে খুব দ্রুত তার ব্যাগ খুলে জাদুর বইটা বের করল। জাদুর বই খুলতেই দেখা গেল সেখানে লেখাঃ

“সুলেমান বাদশার গালিচা, যাও”

দৈত্য আরো এক পা চলে এসেছে। অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে আছেন তোবারক আলী। দৈত্য এবার আরেক পা এগুলেই হাত বাড়িয়েই ধরতে পারবে তাদের।

রাতুল তখন বলে উঠল আদেশের সুরে, “সুলেমান বাদশার গালিচা, যাও; তুরন পাহাড়ে যাও।”

গালিচা সাথে সাথেই নড়ে উঠল এবং মুহুর্তের মধ্যে তাদের তিনজনকে নিয়ে উপরে উঠে গেল। গালিচাকে ধরার শেষ চেষ্টা করেছিল দৈত্য হাত বাড়িয়ে। হয়ত সে মাথায় আঘাতটা না পেলে একটু লাফিয়ে ধরে ফেলত। কিন্তু এবার নাগাল পেল না। গালিচা সাঁই সাঁই করে উড়ে চলল তুরন পাহাড়ের দিকে।

অধ্যায় চৌদ্দ

 তুরন পাহাড়ে তাদের অপেক্ষায় ছিলেন জাদুকর মাহমুদ। তিনি কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন কারণ সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। রাতুলরা গালিচায় চড়ে গুহায় জাদুকর মাহমুদের সামনে গিয়ে থামল।

জাদুকর মাহমুদ বললেন, “কোন অসুবিধা হয়নি তো?”

তোবারক আলী সামান্য হেসে রাতুল ও আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে বললেন, “সে তেমন কিছু না। এখন কি আমরা বিন্ধ্রপর্বতে যেতে পারব? না আরো কিছু প্রয়োজন হবে?”

জাদুকর মাহমুদ বললেন, “আর কোন কিছুর দরকার পড়বে না। তবে সেখানে গিয়ে বুদ্ধি খাটিয়ে হারিরিকে উদ্ধার করতে হবে। সময় খুব বেশি নেই। আজ রাতে খুব বড় চাঁদ উঠবে। আজকেই হারিরিকে হত্যা করার প্ল্যান করেছে কোবিলাই।  আর সাবধান। ওখানে পাহারায় আছে পিশাচেরা।”

রাতুল দৃঢ়ভাবে বলল, “আমরা অবশ্যই তাকে উদ্ধার করতে পারব। এবং আপনাকেও এই বন্দিদশা থেকে মুক্ত করব।”

জাদুকর মাহমুদ অপ্রস্তুতের হাসি দিয়ে বললেন, “আমার কথা ভেব না। হারিরিকে উদ্ধার করতে যাও। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর সময় দিয়ে বিচার করলে আর বাকি আছে দুই ঘন্টা বারো মিনিট।”

তোবারক আলী বললেন, “তাহলে চলি মাহমুদ সাহেব। আবার দেখা হবে।”

অতঃপর তিনি বললেন, “সোলেমান বাদশাহর গালিচা; যাও, বিন্ধ্রপর্বতে যাও।”

তাদের তিনজনকে নিয়ে গালিচা উড়ে গুহা থেকে বের হল। চলল বিন্ধ্রপর্বতের দিকে। পাহাড়, সমতল উপত্যকা, নদী এবং বিস্তৃর্ন রঙ বেড়ঙেড় ঘাষযুক্ত মাঠ পেরিয়ে গালিচা উড়ে চলল।

রাতুলের মনে তখন দৃঢ় প্রত্যয়। হারিরিকে উদ্ধার করবেই। এছাড়া জাদুকর মাহমুদ অর্থাৎ আকাশের বাবাকেও উদ্ধার করতে হবে বন্দিদশা থেকে। জাদু রাজ্যে বিভিন্ন ঘটনার মুখোমুখি হয়ে রাতুল এবং আকাশ দুজনেরই আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে। তারা বুঝতে পেরেছে সাহস এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে কাজ করলে অনেক কিছুই করা সম্ভব। ভয় হল কোন অর্জনের পথে প্রধান বাঁধা। কোন কিছু জয় করতে হলে প্রথমেই জয় করতে হয় ভয়কে। উড়ে যাওয়া কিংবা অদ্ভুত প্রাণীদের দেখে এখন আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এমনকী বিন্ধ্রপর্বতে কী আছে, পিশাচেরা কেমন তা ভেবেও চিন্তিত হল না কিংবা ভয় পেল না রাতুল ও আকাশ।

একসময় গালিচা উড়ে চলল অগ্নিসমুদ্রের উপর দিয়ে। রাতুল নিচে তাকিয়ে দেখল দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। টগবগ করছে গলিত আগুনের স্রোত। এমন আগুন সে আর কখনো দেখেনি। কখনো কল্পনাও করেনি।

তোবারক আলী নিচের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললেন, “ভয়ানক সব অপরাধীদের এখানে নিক্ষেপ করা হত। কিন্তু গত কিছুদিন আগে কয়েকজন সাধু জাদুকরকে এখানে নিক্ষেপ করেছে কোবিলাই। সে জাদুকররা তার বিরোধীতা করেছিলেন।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তোবারক আলী গম্ভীর হয়ে গেলেন। গালিচা উড়ে চলল। অগ্নি সমুদ্রের উপরে খাঁ খাঁ শূণ্যতা। কোন প্রাণী নেই। শুধুমাত্র একটানা আগুনের ঢেউয়ের শোঁ শোঁ শব্দ।

একসময় অগ্নি সমুদ্র শেষ হল। দেখা গেল বিন্ধ্রপর্বতের চূড়া। বিন্ধ্রপর্বতের রঙ হালকা মেটে লাল। পর্বতের সামনে একটি দুর্গ। সেই দুর্গেই রাখা হয়েছে হারিরিকে। গালিচা দুর্গের সামনে গিয়ে থামল।

দুর্গের প্রবেশপথের পাশে ঘুমিয়ে আছে এক লালমুখো ড্রাগন। তোবারক আলী সেদিকে তাকিয়ে তার পকেট থেকে বালিঘড়ি বের করে দেখলেন এবং বললেন, “সময় নেই খুব বেশি। তাড়াতাড়ি কাজ করতে হবে।”

আকাশ বলল, “কিন্তু আমরা ঢুকব কীভাবে?”

রাতুল এ সময় বুদ্ধিমানের মত একটা কাজ করল। সে তার ব্যাগ থেকে জাদু বইটা বের করে খুলল। তাতে ফুটে উঠল দুর্গের ম্যাপ। সে ম্যাপে লাল রঙ এবং টানা তীর চিহ্ন দিয়ে নির্দিষ্ট করা একটি পথ। এই পথেই এগুতে হবে।

তোবারক আলী ম্যাপটা দেখে বললেন, “এখানে তো দেখাচ্ছে বা দিকে আরেকটি পথ আছে। ওদিকে চলো।”

ম্যাপে দেখানো রাস্তা মিলিয়ে দুর্গের প্রবেশপথ বের করতে তারা বা দিকে গেল। সেখানে আরেকটি পথ ছিল। রাতুল এবং আকাশ সে পথ দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ম্যাপে দেখানো পথ ধরে গেলে কোন বিপদ হওয়ার আশংকা নেই। তবে দুর্গের ভেতরে বেশ আলো নেই। আবছা অন্ধকার। তাই পথ ভূল হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। তাই ঢোকার আগে তোবারক আলী বার বার বলে দিয়েছেন, “সাবধানে ম্যাপ দেখে দেখে যাবে। কোন ভয় নেই। সম্ভবত ভেতরে কোন পাহাড়া নেই। পাহাড়া আছে বাইরে। তারা যদি বুঝতে পারে ভেতরে কেউ ঢুকেছে তাহলে সামনে দিয়েই আসবে। আমি এদের রুখব। আর এর মধ্যে তোমরা হারিরিকে খুঁজে বের করে উদ্ধার করবে।”

রাতুল এবং আকাশ এগিয়ে যাচ্ছিল। ম্যাপের দেখানো পথের শেষমাথায় গিয়ে তারা দেখতে পেল একটি সুড়ঙ্গ। সেই সুড়ঙ্গে প্রবেশ করল রাতুল। সুড়ঙ্গের মাথার অংশ বেশ বড়। সেখানে একটি পাথরের বেদীর উপর ত্রিকোনাকার ক্রুশে বাঁধা আছে হারিরি।

রাতুল উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল না। জাদুরাজ্যের বিভিন্ন ঘটনা তাকে স্থির হতে শিখিয়েছে। সব অবস্থাতেই স্থির থাকতে হয়। উচ্ছ্বাস অনেক সময় অমনোযোগী করে বিপদের দ্বার খুলে দেয়।

রাতুল জাদুর বইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখল বইটিতে হারিরি এবং সেই ত্রিকোনাকার ক্রুশের ছবি। রাতুল এগিয়ে গিয়ে দেখল হারিরির হাত পা বেশ ভালো করে বাঁধা। শুধু হাত দিয়ে এ বাঁধন মুক্ত করা সম্ভব না। চারিদিকে তেমন কোন বস্তুও নেই যা দিয়ে খোলা যায়।

আকাশ এই সময় বলে উঠল তার “বৈজ্ঞানিক বক্সের” কথা। বৈজ্ঞানিক বক্সটি ব্যাগেই ছিল। রাতুল তড়িঘড়ি করে বক্সটি বের করল। তাতে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির মধ্যে ছিল ছোট ধরনের এক ছুরি।

এই ছুরিটা দিয়ে রাতুল কেটে ফেলল হারিরির হাত বাঁধা দড়িটি। পুরোপুরি বাঁধনমুক্ত করার পর দেখা গেল হারিরি অজ্ঞান। আকাশ সুড়ঙ্গের পাশ থেকে ছুঁয়ে পড়া ঝরনার জল এনে ছিটিয়ে দিল মুখে। তাতে জ্ঞাণ ফিরে পেল হারিরি। সে চোখ খুলে হাসিমুখে বলল, “জানতাম তোমরা আসবে। আমি অপেক্ষায় ছিলাম।”

রাতুল বলল, “বাইরে হেডস্যার অপেক্ষায় আছেন বাদশাহ সুলেমানের গালিচা নিয়ে। চলো ফেরা যাক এখন।”

হারিরি বলল, তার আগে একটা কাজ আছে বন্ধু। এই দুর্গের ভেতরে আছে রত্ন দীঘি। কাকের চোখের মত স্বচ্ছ জল সেখানে। তার মাঝখানে ফুটে আছে নীলপদ্ম। আমাদের এই পদ্মটি নিয়ে যেতে হবে জাদুকর মাহমুদকে তুরন পাহাড়ের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে।

আকাশ বলল, “সেটা কোথায়?”

হারিরি বলল, “আমার সাথে চলো।”

হারিরি উঠে সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়ে ডানদিকের একটা সরু রাস্তা ধরে চলে গেল এক বিশাল দীঘির সামনে। দুর্গের ভেতরে এমন বিরাট দীঘি কী করে হল তা বুঝার উপায় নেই। উপরে দুর্গের ছাঁদ আর নিচে রত্নদীঘির স্বচ্ছ জল টলমল করছে। দীঘির ঠিক মাঝখানে অপূর্ব সুন্দর এক নীলপদ্ম ফুটে আছে। ফুল এতই উজ্জ্বল বর্নের যে মনে হচ্ছে যেন আলো বিকিরণ করছে। আর একটি ভয়ংকর ব্যাপারও আছে। দীঘিতে কাঠের গুঁড়ির মত ভেসে বেড়াচ্ছে বিশালকায় কিছু কুমির।

রাতুল জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু আমরা দীঘির মাঝখানে পৌঁছাব কী করে?”

হারিরি বলল, “পানকৌড়ির পিঠে চড়ে।”

আকাশ জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু কুমিরেরা আক্রমণ করবে না?”

হারিরি বলল, “জাদু রাজ্যে সবচেয়ে ভালোভাবে জলের উপর দিয়ে ভ্রমণ করা যায় পানকৌড়ির সাহায্যে। পানকৌড়ির পিঠে চেপে গেলে খুব সম্ভবত কুমিরেরা টের পাবে না। তারা টের না পেলে আমরা বিনা বিপদে নীলপদ্ম নিয়ে আসতে পারব।”

আকাশ আবার জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু তারা যদি টের পেয়ে যায়?”

হারিরি আকাশের দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে বলল, “তাহলে বিপদ হবে। সাংঘাতিক বিপদ। এই কুমিরেরা শত শত বছর ধরে রক্ত পায়নি। রক্তের ক্ষুধায় এরা কাতর। এক ফোঁটা রক্তের গন্ধেই এখানে কুমিরদের মধ্যে হুলস্থুল লেগে যাবে।”

আকাশ হতাশ মুখে তাকাল রাতুলের দিকে। রাতুল তখন মনযোগের সাথে একটা কুমিরের ভেসে যাওয়া দেখছে। খুব শান্ত শিষ্ট ভালোমানুষের মত কুমির ভেসে যাচ্ছে।

হারিরি দীঘির এক কোণে জলকেলী করতে থাকা একটি পানকৌড়ির পিঠে চেপে বসল। তার মত রাতুল এবং আকাশও পানকৌড়ির পিঠে চাপল। জাদু রাজ্যে পানকৌড়িরা জানে কেউ জল ভ্রমণ করতে হলে তাদের পিঠে চড়বে। সুতরাং তারা কোন আপত্তি করে না। পিঠে চড়িয়ে ভ্রমণ করায়। এতেই তাদের আনন্দ। সুতরাং রাতুলরা পানকৌড়িদের পিঠে চড়তে চাইলে তারা খুশি হল।

সন্তপর্নে হারিরি, রাতুল এবং আকাশ পানকৌড়িদের নিয়ে যেতে লাগল নীলপদ্মের কাছে। তিনজনই গিয়েছিল যাতে বিপদ এলে একে অপরকে সাহায্য করতে পারে। পানকৌড়িরা অবিশ্বাস্য সাতার কুশলতায় ভাসমান কুমিরদের পাশ দিয়ে চলল নিঃশব্দে। রাতুলের পানকৌড়ি একটি ভাসমান কুমিরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাতুল নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ করে রাখল ভয়ে। এসময় সে তার বুকের ভেতরের ঢিবঢিব শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল।

নীলপদ্মের কাছে গিয়ে রাতুল ও আকাশ দু পাশে তাদের পানকৌড়ি নিয়ে অবস্থান করল। আর হারিরি নীলপদ্মের কাছে গিয়ে পদ্মটি এক নিঃশ্বাসে ছিঁড়ে ফেলল। তারপর পানকৌড়ি ঘুরিয়ে দ্রুত ফিরতে শুরু করল। রাতুল এবং আকাশও তাদের পানকৌড়ি ছুটাল দ্রুত। তিনটি পানকৌড়ির একই দিকে দ্রুত চলে যাওয়ার শব্দে একটা কুমির ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তার জ্বলজ্বলে লাল দুটি চোখ থেকে যেন তরল আগুন বেরোচ্ছে।

কুমিরটা যেন রক্তের গন্ধ পেয়েছে। সে বুঝতে পেরেছে পানকৌড়ির উপরে আছে অন্যকিছু। আরো কয়েকটা কুমিরের মধ্যেও সাড়া পড়ে গেল। হারিরি বলল, “কুমিরেরা টের পেয়ে গেছে। দ্রুত পানকৌড়ি ছুটাও।”

কুমির তিনটা তাদের বিশাল শরীর নিয়ে পানকৌড়িদের পিছন ধাওয়া করল। পানকৌড়িরাও ছুটতে লাগল খুব দ্রুত। তিনটা কুমির আস্ফালন করে এগুতে লাগল। ফলশ্রুতে আরো কয়েকটি কুমিরের দৃষ্টি গেল এদিকে। এরাও পানকৌড়িদের দিকে ফিরল।

পানিতে পানকৌড়িকে কেউ আঘাত করে না। তাই কুমিরদের লক্ষ্য পানকৌড়ির পিঠে চড়া বস্তুদের প্রতি।

হারিরি অবিশ্বাস্য গতিতে পানকৌড়ি ছুটিয়ে তীরে পৌছাতে পারল। ঠিক তখনি প্রথম আঘাত আসল কুমিরদের পক্ষ থেকে। পানির নিচ থেকে লাফিয়ে ঠিক আধহাত সামনে দিয়ে চলে গেল একটা আস্ত কুমির। আরেকটু হলে কুমিরের ধারালো দাঁতে বিদ্ধ হত রাতুল। পানকৌড়ির পিঠ থেকে পড়তে পড়তে রাতুল নিজেকে সামলে নিল।

তারপর সে লাফিয়ে পানিতে পড়ে কয়েক হাত সাঁতরে চলে এল পাড়ে। সে পানিতে পড়ায় সরাসরি রক্তের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল পানিতে। আর রত্ন দীঘিতে শুরু হল কুমিরদের আস্ফালন। ভয়ংকর সে দৃশ্য। কুমিরেরা হুংকার ছুঁড়ছে, লাফিয়ে উঠছে, ভুস ভুস করে পানি ছাড়ছে। পুরোপুরি অভাবনীয় দৃশ্য।

রাতুল এবং হারিরি ভয় জড়ানো চোখে তাকিয়ে ছিল দীঘির দিকে। কারন পাড় থেকে কয়েকহাত দূরে কুমিরদের আস্ফালনের মাঝখানে নিশ্চুপে অবাক হয়ে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করছে পানকৌড়ি এবং তার উপরে আতংকিত আকাশ। রক্তের গন্ধে কুমিরদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তারা কী করছে কিছুই ঠিক নেই।

হারিরি আকাশের ফেরার ব্যাপারে আশা হারিয়ে ফেলেছিল। কারণ এই দীঘির কুমিরদের হিংস্রতার ব্যাপারে জাদুরাজ্যের সবাই জানে। রক্তের নেশায় উন্মত্ত একদল কুমির ঘিরে আছে পানকৌড়ির উপরে বসা ভয়ার্ত আকাশকে। এ অবস্থায় তার বেঁচে ফেরার আশা করা যেন দুঃসাহস।

কুমিরদের অস্থিরতা আরো বাড়ল। এরই মধ্যে ভয়ার্ত অবস্থায় হলেও রাতুল একটা ব্যাপার লক্ষ করে চমকে উঠল। কয়েক মিনিট চলে গেছে কিন্তু কুমিরেরা এখনো আকাশকে আক্রমণ করেনি। নিজেরাই শুধু উন্মত্তের মত্ত আস্ফালন করছে।

রাতুল তখন ভয়ার্ত কন্ঠে ফিসফিস করে হাত দিয়ে ইশারা করে আকাশকে বলল, “চলে আয়। ভয় পাবি না। আস্তে আস্তে চলে আয়।”

সম্বিৎ ফিরে পেল আকাশ। চারদিকে কুমিরদের চাপা গর্জন এবং ক্ষুধার্ত আন্দোলনের ভেতর দিয়ে পানকৌড়ি নিয়ে এগুতে লাগল সে। স্বচ্ছ রত্নদীঘিতে উত্তাল পানির উপর পানকৌড়ি ধীর গতিতে এগুচ্ছিল পাড়ের দিকে।

অদ্ভুত হলেও সত্য উন্মত্ত কুমিরেরা সেদিকে লক্ষ দিচ্ছিল না। হয়ত তারা অত্যধিক পানির আন্দোলনের জন্য কোনদিক থেকে আসছে রক্তের গন্ধ দিশা পাচ্ছিল না। কুমিরদের দৃষ্টি শক্তি খুব ক্ষীন হয়। আর এই লালচোখো কুমিরেরা আদৌ দেখতে পায় কি না সন্দেহ। দেখতে পেলে রাতুল আকাশ কিংবা হারিরি কারোরই বেঁচে থাকার উপায় ছিল না।

ভয় প্রকাশে একটা কথা আছে “মেরুদন্ড দিয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে গেল”, আকাশের অবস্থাটা প্রকাশে বলা যায় তার শুধু মেরুদন্ড না সমস্ত শরীর দিয়েই শীতল স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। নিশ্চিত মৃত্যু চারিদিকে ওঁত পেতে আছে। হা করে আছে। আক্রোশে গর্জন করতে করতে ডাকছে। এর মাঝে রাতুলের ডাকে কিছুটা সাহস ফিরে পেয়ে আকাশ পানকৌড়ি নিয়ে এগুতে লাগল। নিঃশ্বাস বন্ধ করে রয়েছিল সে যাতে কোন শব্দ না হয়। পানকৌড়ি সন্তপর্নে কিন্তু ধীরে ধীরে গতি বাড়িয়ে দিল। ভয়ংকর সব কুমিরদের পাশ দিয়ে ফিরে এল পাড়ে।

পাড়ে এসেই আকাশ লাফিয়ে ছিঁটকে পড়ল। খুব জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিল কয়েকবার। রাতুল এবং হারিরিও আকাশের তীরে আসার মধ্যকার এই সময়টাতে প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে উদ্বিগ্ন অবস্থায় তাকিয়েছিল।

তিনজন প্রায় নিরাপদেই ফিরে আসতে পারল শেষপর্যন্ত। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসা আকাশকে জড়িয়ে ধরে সাহস দিল রাতুল। বলল, “বেশ ভালো করেছিস। ভয় পেয়ে যদি আশা ছেড়ে দিতি তাহলে এতক্ষনে কুমিরের পেটে হজম হয়ে যেতি।”

আকাশ মুখ কাচুমাচু করে বলল, “ভয় পেয়ে পেশাব করে দিয়েছিলাম। তারপরই গরমে হঠাৎ সাহস ফিরে পেলাম।”

হারিরি বলল, “পানকৌড়িদের ধন্যবাদ। আজ আমি বুঝতে পারলাম কেন এদের বলা হয় জলে ভ্রমণ করার জন্য জাদু রাজ্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন। এখন চলো আমাদের যেতে হবে। নীলপদ্ম উদ্ধার হয়েছে। এটা তুরন পাহাড়ে নিয়ে গেলেই তুরন পাহাড়ের উপর কালো জাদুর মায়া কেটে যাবে। জাদুকর মাহমুদ বন্দি দশা থেকে মুক্ত হবেন।”

রাতুল বলল, “তাহলে যাওয়া যাক। হেডস্যার তো দুর্গের বাইরে আছেন অপেক্ষায়।”

হারিরি বলল, “বাইরে বোধহয় পিশাচেরা চলে এসেছে ইতিমধ্যে। রক্তবীজ পিশাচেরা এই কুমিরদের থেকেও ভয়ংকর।”

রাতুল, হারিরি এবং আকাশ রত্মদীঘির পাড় থেকে হেটে আবছা অন্ধকার পথ পেরিয়ে দুর্গের বাইরে গেল। দুর্গের বাইরে তখন অবস্থা ধুন্ধুমার। তোবারক আলী গালিচার উপরে শূন্যে উঠে আছেন। আর নিচে পাঁচ ছয়টা অদ্ভুত প্রাণী উপরে গালিচার উপর দাঁড়িয়ে থাকা তোবারক আলীর দিকে তাকিয়ে ফোঁসফোঁস করছে। বাদুরের মত মুখ, দুই হাত, দু পা। গোলাটে দুই চোখ, মুখের পাশ দিয়ে বেরিয়ে আছে ধারালো দাঁত। প্রাণীটির গায়ের রঙ মিশমিশে কালো।

দুর্গের পাশে রাখা ছিল বর্শা। রাতুল এবং আকাশ দুটি বর্শা হাতে নিল। হারিরি ছিল একটু পেছনে। রাতুল, আকাশ এবং হারিরিকে দেখে এগিয়ে এল পিশাচেরা।

তোবারক আলী চিৎকার করে বললেন, “সাবধান! এই পিশাচদের থেকে দূরে থাক।”

একটি পিশাচ দ্রুত এগিয়ে এসেছিল রাতুলের সামনে। রাতুল তার বর্শাটা পিশাচের গলায় বিদ্ধ করে দিল। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরল পিশাচের গলা থেকে। টকটকে লাল রক্ত।

হারিরি চিৎকার করে উঠল, “পিছনে সরে এসো। এদের মেরো না।”

উপর থেকে তোবারক আলী বললেন একই রকম কথা, “এদের রক্ত ঝরিয়ো না।”

রাতুল অবাক হয়ে গিয়েছিল। সে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, কেনো। কিন্তু তার আগেই দেখতে পেল গলায় বর্শার আঘাত খেয়ে মৃত পিশাচের রক্তের ফোঁটা থেকে নতুন তিনটিও পিশাচ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।

রাতুল পিছনে সরে এল।

হারিরি বলল, “এজন্যই এদের বলে রক্তবীজ। এদের রক্ত থেকে নতুন পিশাচের জন্ম হয়।”

ছবিঃ ইন্দ্রশেখর

জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক একত্রে

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s