ধারাবাহিক উপন্যাস জাদু রাজ্য মুরাদুল ইসলাম শরৎ ২০১৮

আগের পর্বগুলো

গালিচা সমুদ্রের নিচ থেকে উপরে ভেসে উঠল। হঠাৎ আলোতে রাতুল, আকাশ এবং হারিরি তিনজনেরই চোখ ধাঁধিয়ে গেল।  অল্প আলো থেকে হঠাৎ করে বেশি আলোতে আসায় এই সমস্যা। তবে অল্পক্ষণের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে গেল।

নীলাভ এক ধরনের আলো ছড়িয়ে আছে জাদুরাজ্যে। বিচিত্র রঙ, বর্ণ আর আকৃতির অদ্ভুত প্রাণীরা উড়ে বেড়াচ্ছে আপন মনে। কেউ কেউ নিচে মাটিতে তাদের কাজ করে যাচ্ছে। হলুদ লতানো একটা গাছে দেখা কয়েকটি চারপেয়ে চড়ুই পাখি।

গালিচা খুব দ্রুত উড়তে শুরু করল। একসময় তারা এল চিরহরিৎ মহা অরণ্যের সামনে। এই বন এতই গভীর এবং এত প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর যে জাদুরাজ্যে একে নিয়ে ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার গল্প।

হারিরি রাতুল এবং আকাশকে বলল, “এই যে বন দেখতে পাচ্ছ এটাকে বলে চিরহরিৎ মহা অরণ্য। এর কত গল্প শুনেছি। আজ দেখতে পেলাম। আমরা এর ভেতর দিয়ে যাব।”

রাতুল বলল, “কিন্তু ভেতর দিয়ে যেতে কোন বিপদ হবে না তো?”

হারিরি বলল, “এই মহা অরণ্য সৌভাগ্যের প্রতীক। এখানে বিপদের কোন সম্ভাবনা নেই। তবে এর ভেতরে বিচিত্র জিনিস আছে। বলা হয়ে থাকে জাদুরাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর হল এই বন।”

আকাশ উৎসাহিত হয়ে বলল, “তাহলে তো যাওয়া দরকার।”

হারিরি গালিচাকে নির্দেশ দিতেই গালিচা চিরহরিৎ মহা অরণ্যের ভেতর দিয়ে চলতে শুরু করল। তারা যে এই মহা অরণ্যের ভেতর দিয়ে যাবে এটাও হয়ত কোন ভবিষ্যৎবাণীতে ছিল। জাদুরাজ্যের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন ধরনের জাদুকর ও ভবিষ্যত বক্তাদের বাস। একেকটা কাজ কতজনের ভাগ্যের সঙ্গে যে জড়িয়ে পড়ে তার ইয়ত্তা নেই।

বনের গাছগুলো মনে শান্তি আনা সবুজ। অর্থাৎ এগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলে এক ধরনের শীতল পরশ যেন ছুঁয়ে যায়। তবে বন অনেকটাই নীরব। কোন পাখি কিংবা প্রাণীর শব্দ শোনা যাচ্ছে না। এতে রাতুল এবং আকাশ বেশ অবাকই হল। বনে শব্দ থাকবে না এটা কেমন কথা!

তাদের মনে হালকা ভয়েরও আগমন ঘটেছিল। সে ভয় যে অমূলক ছিল না এর প্রমাণ পাওয়া গেল একটু পরে।

হঠাৎ করেই একটা জায়গায় এসে গালিচা থমকে দাঁড়াল। ডানে, বামে, সামনে বা পিছনে কোন দিকেই নড়ে না। গালিচা একেবারে মাটিতে বসে পড়ল। যেন সে একটা হাতি এবং মাহুত তাকে নির্দেশ দিয়েছে বসে পড়ার জন্য। আর সেও বাধ্য হাতির মত বসে পড়েছে।

হারিরিও বেশ অবাক হয়েছে। চারিদিকে তাকিয়ে তারা কাউকে দেখতে পেল না। একেবারে শুনশান নীরবতা।

আকাশ জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? এটা থেমে গেল কেন?”

হারিরি বলল, “এখানে কেউ আছে যে জাদুর সাহায্যে আমাদের গালিচা আটকে দিয়েছে।”

“ঠিক বলেছেন জাদুসম্রাট নিকোলাই পুত্র হারিরি। আমাদের নতুন জাদুসম্রাট।” এই কথা বলে একটা ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল প্রায় তিনফুট লম্বা একটি ক্ষুদে মানুষ।

হারিরি জিজ্ঞেস করল, “তুমি কে? কী চাও?”

ক্ষুদে মানুষ বলল, “আমি এক ভাগ্যাহত লোক সম্রাট। আমি অনেক অনেক দিন ধরে আপনার এবং আপনার বন্ধুদের অপেক্ষায় বসে আছি। আপনি এবং আপনার বন্ধুরা আমাদের বাঁচাবেন।”

হারিরি বলল, “আমি তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।”

ক্ষুদে মানুষ বলল, “আমাকে ক্ষমা করুন সম্রাট। আমি আপনার গালিচাকে আটকে দিয়েছি। কিন্তু এ ছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিল না। আপনি আমার কথা বুঝতে পারবেন যদি আমার সব কথা শোনেন। আমি সব কথা শোনানোর জন্যই আপনাদের থামিয়েছি।”

হারিরি জিজ্ঞেস করল, “কী তোমার কথা?”

ক্ষুদে মানুষ বলল, “সম্রাট হারিরি, আমার গল্প অনেক হৃদয়বিদারক। অনেক লম্বা। আপনারা গালিচায় বসে পড়ুন।”

ক্ষুদে মানুষ গালিচার সামনে এগিয়ে এল। তার পরনে অদ্ভুত পোশাক আর হাতে বর্শা। তার চোখদুটো মায়াময়। হারিরি তাকে বিশ্বাস করল।  ক্ষুদে মানুষ গালিচার সামনে এসে বসে পড়ল নরম ঘাসে। হারিরি, রাতুল এবং আকাশও বসল।

হারিরি বলল, “বলো এবার।”

ক্ষুদে মানুষ বলতে শুরু করল, “আমার নাম লি। জ্যোতিষী কিরা আমার পিতা। আমরা লেমুরিয়া রাজ্যে বসবাস করতাম। আমার বাবা জ্যোতিষী কিরা বৃদ্ধ মানুষ। তার ইচ্ছা ছিল আমিও তার মত জ্যোতিষী হই। কিন্তু তাতে আমার কোন আগ্রহ ছিল না। যদিও কিছুদিন আমি জ্যোতিষশাস্ত্র সম্পর্কে পড়েছি। তাছাড়া ভবিষ্যৎ অতি ক্ষীণভাবে অনুমান করার একটি ক্ষমতা আমার মধ্যে আছে। এটি আমার বাবার কাছ থেকে পাওয়া হয়ত। আমার বাবা কিরা ভবিষ্যত আরো স্পষ্টভাবে দেখতে পান এটা আমি জানি। তিনি এ জন্য ব্যবহার করেন গোপন জাদুবিদ্যা।

“আমার বাবা লেমুরিয়ায় মহামতি কিরা নামে পরিচিত। কিন্তু তিনি কোন পুরোহিত নন। রাজাদের বিভিন্ন কাজে তিনি ভবিষ্যতের ব্যাপারে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন। অতীতে রাজদরবারে এই ছিল তার কাজ। আমাদের সভ্যতা নির্মাণে আমার বাবা কিরার অবদান অনেক। কিন্তু আমরা একসময় নির্বাসিত হলাম।

“রাজা চু ক্ষমতায় আসার পর নিজের অসাধুতা এবং অপকর্মকে আইনসিদ্ধ করতে বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কাজ শুরু করল। সে পুরোহিতদের হাত করে প্রধান স্বর্ণমন্দিরের কর্তৃত্ব নিতে চাইল। আমার বাবা মহামতি কিরা এতে প্রতিবাদ জানান। তাঁদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছিল। এক পর্যায়ে বাবার ধৈর্যচ্যূতি ঘটে। তিনি বলে ফেলেন অদূর ভবিষ্যতে তার রাজত্বের অবসান হবে এক ভীনদেশীর মাধ্যমে।

“এতে ভয়ানক চটে যায় রাজা চু। সে আমার পিতাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। তখন তাদের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে বাধা দেন হাসিয়াহ। যিনি আমার বাবার বাল্যবন্ধু এবং রাজ্যের প্রধান পুরোহিত ছিলেন।

“সেদিনই রাজপ্রাসাদ থেকে আমাদের বের করে দেয়া হয়। আমাদের স্থান হয় রাজ্যের একপ্রান্তে জঙ্গলের ধারে একটি ছোট কাঠের বাড়িতে। রাজা চু বাবাকে হত্যা করেনি। কিন্তু বলেছিল যে কথা তিনি একবার উচ্চারণ করেছেন দ্বিতীয়বার তা উচ্চারণ করলে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে তাঁর মৃত্যুদন্ড হবে।

“পুরোহিত হাসিয়াহ সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। তিনি আমাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু ছিলেন তখন। তাঁর কাজ ছিল ঈশ্বরের ইচ্ছাকে সকলের মাঝে স্পষ্ট করে দেয়া। স্বয়ং ঈশ্বরের বিধি বিধান নিয়ে সরাসরি কথা বলার ক্ষমতা ছিল তাঁর। আমাদের প্রধান মন্দিরের সর্বোচ্চ পুরোহিতের পদে আসীন ছিলেন তিনি। সেই স্বর্ণমন্দিরে ছিলেন আরো অনেক পুরোহিত। যেকোন সিদ্ধান্ত প্রধান পুরোহিত একা কখনো নিতে পারতেন না। বেশিরভাগ পুরোহিতদের সম্মতির প্রয়োজন হত।

“হাসিয়াহ জ্ঞানী ব্যক্তি। আমাদের সভ্যতার ভালোমন্দের ব্যাপারে তিনি ওয়াকিবহাল ছিলেন। রাজার ইচ্ছায় স্বর্ণমন্দির নিয়ন্ত্রিত হোক তা তিনি চাইতেন না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে রাজা চু সব পুরোহিতকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেজন্য রাজার ইচ্ছাতেই স্বর্ণমন্দির পরিচালিত হত। ফলে হাসিয়াহর ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন দাম ছিল না।

“রাজা এবং তার নিয়ন্ত্রিত পুরোহিতরা মন্দিরকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল। যা ছিল ঈশ্বরের জন্য অবমাননাকর। এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের অনেক শৌর্য বীর্য এবং ত্যাগের ইতিহাস। হাসিয়াহ প্রায়ই আসতেন আমাদের বাড়িতে। একদিন আমি পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে তাঁর এবং বাবার কথাবার্তা শুনলাম। প্রফেট হাসিয়াহ বলছেন, ‘তোমার ছেলে লি’র কী খবর? সে কী করতে চায়?’ বাবা বললেন, ‘সে এখনো পড়ালেখা করছে। আমি ওসব নিয়ে এখনো তার সঙ্গে কথা বলিনি। ওকে আমি ঠিক বুঝতে পারি না।’

“প্রফেট হাসিয়াহ গম্ভীরভাবে বললেন, ‘ওর উপরই তো নির্ভর করছে লেমুরিয়ার ভবিষ্যৎ!’ তারপর কিছুটা থেমে বললেন, ‘আমার মনে হয় সময় চলে এসেছে।’

“বাবা সামান্য হেসে বললেন, ‘তাই নালি?! কিন্তু আমি যে কিছু বুঝতে পারছি না। বুড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব ক্ষমতা চলে গেল নাকি?’

“প্রফেট হাসিয়াহ গম্ভীর মুখেই বললেন, ‘রাজা চু সমস্ত রাজ্যটাকে নরকে পরিণত না করে থামবে বলে মনে হচ্ছে না।’

“বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘নতুন কিছু কি হয়েছে?’

“প্রফেট হাসিয়াহ জানালেন, রাজা চু স্বর্ণমন্দিরের বেদীতে শিশু বলি দেয়ার প্রথা চালুর ব্যাপারে কথাবার্তা বলছে। খুব শীঘ্রই তা মন্দিরের পুরোহিতদের সভায় তোলা হবে। যদি সভায় তোলা হয় তাহলে রাজার ইচ্ছা অনুযায়ী তার অনুগত পুরোহিতরা এতে সায় দেবে। সুতরাং, পবিত্র স্বর্ণমন্দিরের বেদীতে চালু হবে শিশুবলির মত নৃশংস প্রথা।’

“এরপর বাবা এবং প্রফেট হাসিয়াহ নিচু স্বরে কিছু কথাবার্তা বলতে লাগলেন। আমি আর কিছুই শুনতে পাইনি। তবে বুঝতে পেরেছিলাম সামনে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। এবং তাতে হয়ত আমার কোন ভুমিকা থাকবে।                                                                                 

রাজা চু-এর বিভিন্ন কাজকর্মে আমি অসন্তুষ্ট ছিলাম। এর মধ্যে প্রধান কাজটি হল চু আমার বাবাকে রাজপ্রাসাদ থেকে বের করে দিয়েছেন। তবে এর চেয়েও বেশি যে জিনিসটা আমাকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল তা হল রাজার স্বেচ্ছাচারীতা, একগুঁয়েমী এবং অত্যাচারী মনোভাব। আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমাদের লোকদের কোন অধিকার নেই। সব ক্ষমতা কুক্ষিগত আছে স্বর্ণমন্দিরের লোভী দুর্নীতিগ্রস্ত পুরোহিত এবং রাজা চু-এর হাতে।

“রাজার অপরিণামদর্শী আচরণের আরেকটি সংযোজন ছিল এই শিশু বলি প্রথা। কোন এক পুরোহিত রাজার এক স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বলেছিল শিশু বলি না দিলে রাজা ক্ষমতাচ্যূত হবেন। এই কারণে রাজা চু শিশু বলি প্রথা চালু করতে চান। কিন্তু এরকম প্রথা আমাদের পবিত্র ঈশ্বরের আদেশ পরিপন্থি। আমাদের ঈশ্বর রক্তপাত পছন্দ করেন না।

“রাজা চু এর পিতা ইন এই স্বর্ণমন্দির নির্মাণ করেছিলেন। এটি আমাদের পবিত্রতা ও শ্রেষ্টত্বের প্রতীক। সবাই ঈশ্বরের জন্য মন্দির নির্মাণ করতে পারে না। রাজা চু এর দাদা রাজা উল, যিনি আমাদের মহান সভ্যতার প্রতিষ্ঠাতা, তিনি প্রথম এই স্বর্ণমন্দির নির্মাণে হাত দিয়েছিলেন। কিন্তু দেখা গেল নির্মাণ কাজ শেষ হতেই মন্দির ধ্বসে পড়ে। বিভিন্ন জায়গা থেকে কারিগর আনা হল। কিন্তু কেউই মন্দির নির্মাণ করতে সমর্থ হল না। আমার বাবা কিরা তখন সদ্য যুবক। ভবিষ্যৎ বলতে পারায় তার খুব নামডাক হয়েছিল তখন। রাজা উল তাকে রাজপ্রাসাদে ডেকে পাঠান। মন্দিরের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি গণনা করে বলেছিলেন, ‘এই মন্দির নির্মাণ করতে সমর্থ হবেন রাজা উল এর ছেলে ইন।’ রাজা উল তখন তৎকালীন প্রধান পুরোহিত ইজাকীর সাহায্যে সরাসরি ঈশ্বরের আদেশ জানতে চান। ইজাকী পবিত্র পাহাড়ের গুহায় দৈববানীর পাথরে চলে যান।

“পুরোহিত ইজাকী ঈশ্বরকে জিজ্ঞেস করেন, ‘হে মহান ঈশ্বর! হে আমাদের ত্রাণকর্তা! আমাদের মহান রাজা উল আপনার জন্য একটি উত্তম গৃহ নির্মাণ করতে চান।  আপনার সম্মানার্থে নির্মিত এই গৃহ নির্মাণের পর বার বার ধ্বসে পড়ছে।  আমরা জানি প্রভু, আপনার ইচ্ছাতেই তা হচ্ছে। কিন্তু আমরা বুঝতে পারছি না কী কারণে আপনি ঈশ্বর আমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট।’ পাথর থেকে উত্তর আসে, ‘ইজাকী! ইলের ইচ্ছা পবিত্র। কিন্তু সে নিজে অপবিত্র। তার দ্বারা এ কাজ হবে না।’দৈববানী নিয়ে পবিত্র পাহাড় থেকে ফিরে আসেন ইজাকী। রাজা ইল মুষড়ে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন তাঁর সারাজীবনের যুদ্ধবিগ্রহের জন্য ঈশ্বর তার প্রতি অসন্তুষ্ট। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তাঁর মনে হয় জ্যোতিষী কিরার কথা। সে বলেছিল ইলের ছেলে ইন মন্দির বানাতে পারবে। রাজা তাই কিছুদিন পর তার যুবক পুত্র ইনকে রাজ আসনে বসান।  রাজা ইলের জীবদ্দশায় ইনের নিয়ন্ত্রণে মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এই মন্দির আর ধ্বসে পড়ে নি।

“অপূর্ব কারুকাজ করা হয় মূল্যবান পাথর দিয়ে। চারদিক দিয়ে সিঁড়ি নির্মাণ করে প্রধান কক্ষটি রাখা হয় চূড়াতে। সিঁড়িতে দেয়া হয় মূল্যবান ধাতুর প্রলেপ। অংকিত হয় বিভিন্ন ধরনের চাঁদ তারকার চিত্র। রাজা ইল এরপর থেকে আর কোন যুদ্ধে জড়াননি। অবশ্য তার প্রয়োজনও ছিল না। আমাদের সভ্যতা তখন প্রতিষ্ঠিত। রাজ্যে তিনি হত্যা নিষিদ্ধ করেন। মূলত রক্তপাতবিরোধী একটা ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের স্বর্ণমন্দির। কিন্তু রাজা চু এই মন্দিদের বেদীতেই শিশু হত্যার মত জঘন্য কাজ করতে চান! এতে ঈশ্বর নিশ্চয়ই ক্ষুব্ধ হবেন। আর তিনি ক্ষুব্ধ হলে শাস্তি নেমে আসবে পুরো সভ্যতার প্রতি।

“সভ্যতাকে বাঁচাতে রাজা চু এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে আমি ভেতর থেকে তাগিদ অনুভব করছিলাম। কে যেন আমাকে অস্ফুট স্বরে বলছে এটা আমার প্রধান কাজ। এর জন্যই জন্ম আমার।                                    

“শিশুবলি দেবার প্রস্তাব তখনো রাজা চু মন্দিরের পুরোহিতদের সভায় তোলেননি। একদিন রাতে বাবা আমাকে তার কক্ষে ডাকলেন। তিনি সেদিন পড়েছিলেন শুভ্র পোশাক। তার সাদা চুলদাড়ির কারণে মনে হচ্ছিল এক পবিত্র আবহ তাঁকে ঘিরে ধরে আছে। আমি তার সামনে গেলে তিনি বললেন, ‘তুমি নিশ্চয়ই শুনেছ রাজা চু শিশু হত্যার এক ঘৃণ্য প্রথা চালু করতে চায়। কিছুদিনের মধ্যেই এই প্রস্তাব স্বর্ণমন্দিরের পুরোহিতদের সামনে পেশ করবে। পুরোহিতদের অবস্থা তো জানোই। একমাত্র হাসিয়াহ ছাড়া বাকী সবাই রাজার আজ্ঞাবহ।’ আমি মাথা নিচু করে বললাম, ‘জি আমি শুনেছি।’

“বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ ব্যাপারে কী ভেবেছ?’ আমি প্রশ্নে বেশ অবাক হলাম। বললাম, ‘এ তো অন্যায়। কিন্তু আমি তেমন কিছু ভাবিনি।’ বাবা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘কিন্তু তোমাকে অনেক বড় দায়িত্ব পালন করতে হবে। ভবিষ্যতে তোমার হাত ধরেই লেমুরিয়া পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে।’ আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার হাত ধরে! কীভাবে?’

“বাবা বললেন, ‘পুরোহিত হাসিয়াহ এবং আমি একবার পবিত্র গুহায় গিয়েছিলাম লেমুরিয়ার ভবিষ্যৎ জানতে। কারণ কিছু জিনিস আমাদের কাছে অদ্ভুত লেগেছিল। তখন পবিত্র পাথরের মাধ্যমে ভবিষ্যৎবাণী আসে যে শীঘ্রই লেমুরিয়া এক ভয়ংকর শাসকের হাতে পড়বে। সে লেমুরিয়াকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে। আর তুমি কয়েকজন বিদেশীর সাহায্যে লেমুরিয়ার সুখ শান্তি পুনরুদ্ধার করবে।’

“আমি বললাম, ‘কিন্তু আমি তো কোন বিদেশীকে চিনি না।’ বাবা বললেন, ‘অস্থির হয়ো না। সব কিছু যিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি সব কিছু ঠিক করে দেবেন। তবে তোমাকে আজ ব্যাপারটা বললাম কারণ আমাদের ধারণা রাজা চু ই সেই ভয়ংকর শাসক। সুতরাং, তোমাকে তৈরি থাকতে হবে।’ এরপর থেকে আমি চেষ্টা করেছিলাম রাজ্যের ভেতরে যেতে। কিন্তু ওদিকে যাওয়া আমার জন্য নিষিদ্ধ। স্থানে স্থানে রাজার লোকজন। তাই সম্ভব হচ্ছিল না। এর মাঝে একদিন মন্দিরে পুরোহিতদের সভা বসল। সেদিন আমি গেলাম মন্দিরে।

“ঈশ্বর আহউকটিকাব দূর থেকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। দূর থেকে সবকিছু দেখার চেয়ে মজা আর কিছুতে হতে পারে না। আমরা কত কিছু করি, কত দিকে ছুটে যাই। ঈশ্বর সবকিছু দেখেন দূর গ্রহে বসে থেকে। আমাদের প্রধান মন্দির বানানো হয়েছে নক্ষত্র ও গ্রহাদির কক্ষপথের উপর নির্ভর করে। যাতে পবিত্র দেবতারা এখানে দ্রুত চলে আসতে পারেন। দেবতারা আকাশে থাকেন। কিন্তু যখন ভূমি থেকে তাদের আন্তরিকভাবে ডাকা হয় তখন তারা সাড়া দেন। প্রার্থনা উৎসবের সময়  পুরোহিতদের সঙ্গে সমস্ত মানুষেরা স্বর্ণ মন্দিরে ঈশ্বরের কাছে আসে। ঈশ্বরের নাম ধরে প্রার্থনা করে, প্রশস্তি গায়। তখন পাহাড়, জঙ্গল ও সমুদ্র ঘেরা এই উপত্যকা স্বর্গীয় হাসিতে যেন ঝলমল করে ওঠে।

“অনেকে অনেক ধরনের প্রার্থনা নিয়ে আসে। তাদের আলাদা আলাদা প্রার্থনার জন্য আলাদা দেবতারা আছেন। টিলার মত প্রশস্ত ও উঁচু আমাদের প্রধান মন্দির। চারদিক দিয়ে প্রশস্ত সিঁড়ি। একেবারে চূড়ায় মন্দিরের প্রধান কক্ষ। সেখানে দেবতাদের মূর্তি রাখা আছে। প্রার্থনা উৎসবের দিনে পবিত্র আত্মারা এইসব মূর্তির ভেতরে আসেন। মূর্তিগুলো হচ্ছে তাদের আসন। তখন মূর্তিগুলো যেন প্রাণ ফিরে পায়। প্রধান পুরোহিতরা মন্ত্র জপ করতে থাকেন তখন।

“এই পবিত্র মন্দিরেই পুরোহিতদের সভা বসল। প্রধান পুরোহিত হাসিয়াহ সহ আঠারোজন পুরোহিত উপস্থিত ছিলেন। এরা সবাই বিজ্ঞ। একেকজন একেক বিষয়ে জ্ঞানী। কিছুদিন আগে হলে এই সভায় আমার পিতা মহামতি কিরা উপস্থিত থাকতেন। কিন্তু তখন তিনি রাজ্যে অপাংক্তেয়। সভা শুরু হল। সভায় রাজ্যের অভিজাতদের প্রায় সবাই ছিল। সাধারণ মানুষদের অনেকেও ছিল। এ ধরনের সভা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকত। আমি দর্শকদের সারির এক কোনে বসে রইলাম। আমাদের সামনে বিশাল টেবিলের উপরে সাজানো ছিল কারুকার্যখচিত দেবী আকনার মূর্তি। দেবী আকনা আমাদের মাতা। তিনি উর্বরতার দেবী। সেই টেবিল ঘিরে বসেছিলেন পুরোহিতরা এবং রাজা চু।

“রাজা চু এর জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিচ্ছদ সত্বেও তাঁকে আমার কুৎসিত মনে হচ্ছিল। তাঁর দিকে তাকাতে তাকাতে আমার মনে হচ্ছিল এই লোকটা আমাদের সবাইকে নরকের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সেদিনের সভা ছিল নরকের দিকে টেনে নেয়ার আরেক প্রস্তুতি। সভা শুরু করলেন প্রধান পুরোহিত হাসিয়াহ। পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ , উপর, নিচ ও কেন্দ্রকে লক্ষ করে তিনি প্রার্থনা শুরু করলেন।

পূর্ব থেকে,
হে মহান জ্ঞানপ্রদীপের আলো
এসো এবং এসে আমাদের অন্ধকারকে দূরীভুত করে আলোতে ভরিয়ে দাও।
হে উত্তর, রাতের স্বর্গ
সমোদয় জ্ঞান যেন আমাদের পরিপক্ষ করে তোলে
যাতে আমরা বুঝতে পারি নিজেকে।
হে পশ্চিম, রূপান্তরক
আমাদের জ্ঞানকে সঠিক কর্মে রুপান্তর করে দাও।
হে দক্ষিণ, পবিত্র সূর্যের বাসস্থান
আমাদের সঠিক কাজ যেন ভালো ফল বয়ে আনে।
হে উর্দ্ধ, তুমি স্বর্গের আবাস
যেখানে তারকারাজি এবং আমাদের পূর্বপুরুষেরা
বসে আছেন সৌম্য ভঙ্গিমায়
তাদের আশীর্বাদ যেন বর্ষিত হয় আমাদের উপর।
হে নিম্নভূমি, ধরণীর ধারক
পৃথিবীর  আত্মার হৃদস্পন্দন যেন সব যুদ্ধ থামায়।
আর, কেন্দ্র থেকে, নাক্ষত্রিক শক্তি যেন বিকশিত হয়
যাতে আমরা জানতে পারি যা আমরা জানি না
আমাদের অন্তরাত্মায় আবির্ভূত হোন আদিম মহাজ্ঞানী
এবং দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ুক ভালোবাসার বাণী।

“হাসিয়াহর কন্ঠ গম্ভীর। তার গলায় চামড়ার ভাঁজ পড়েছে। শ্লেষ্মা জড়ানো কন্ঠে তিনি মন্ত্র উচ্চারণ করলেন। তখন আবেগে তাঁর চোখ ছলছল করছিল। সমস্ত কক্ষ জুড়ে নেমে এসেছিল পবিত্র নিরবতা। আমার চোখ যাচ্ছিল পাশে রাখা মূর্তিদের দিকে। বাহলাম, চাবরাকান, হবনিল, চিজিন, ইটজামনা সহ আরো অনেক দেব-দেবীর মূর্তি।  দেব-দেবীর মূর্তি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। তারা কি জানেন রাজা চু এক ভয়ংকর প্রস্তাব আজ উত্থাপন করবে এই পবিত্র মন্দিরের সভায়।  তারা কি এই গর্হিত কাজে বাধা দেবেন? নাকি দাঁড়িয়ে রইবেন নিশ্চুপ? তারা কি শুধুই ধাতব মূর্তি?

“আমি অস্বস্থির সঙ্গে অপেক্ষা করছিলাম। দেবতাদের নিয়ে অবিশ্বাসমূলক চিন্তা করলে শাস্তি পেতে হয়। তাই আমার ভয় হল নিজের মনে জন্ম নেয়া ক্ষুদ্র অবিশ্বাসের জন্য। খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হল না। রাজা চু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘মহান ঈশ্বরের নামে এবং মন্দিরের পবিত্রতা বজায় রেখে শুরু করছি। দেবদেবীরা আমাদের প্রতিপালক। তাঁদের খুশি রাখা আমাদের সর্বপ্রধান কর্তব্য। আমি আপনাদের সামনে আজ এমন এক প্রস্তাব করব তা কিছুটা কঠোর মনে হলেও তাই দেবতাদের ইচ্ছা। দেবতাদের খুশির জন্য আমাদের যে-কোন কিছু করার জন্য সদা সর্বদা প্রস্তুত থাকাই নিয়ম।  মহান ঈশ্বর মৃত্যুর দেবতা হুনহাউ এর উদ্দেশ্যে শিশু উৎসর্গ করার নির্দেশ দিয়েছেন আমাকে। ঈশ্বরের নির্দেশ মানা অবশ্য কর্তব্য বলে আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি। তাই এই বছর থেকে আমি মহান মৃত্যু দেবতা হুনহাউ এর উদ্দেশ্যে শিশুদের মস্তক ও যকৃত উৎসর্গ করার বিধান চালু করতে চাই।’

“রাজার পাশে বসা বয়োবৃদ্ধ পুরোহিত উঠে রাজার কানে কী যেন বললেন।

“রাজা চু তখন মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ। আমার একটা জিনিস ভুল হয়েছে। শুধু যকৃত ও মস্তক না, রক্তও উৎসর্গ করতে হবে। আমি এই প্রস্তাব মন্দিরে পেশ করছি। মাননীয় পুরোহিতদের মন্তব্য আশা করছি আমি।’ থমথমে পরিস্থিতি ছিল মন্দিরের কক্ষে। আমি দেখলাম অস্বস্তিতে প্রধান পুরোহিত হাসিয়াহর মুখ কুঁচকে গেছে। তিনি একটু গলা পরিষ্কার করে বললেন, ‘কিন্তু মহামান্য রাজা, ঈশ্বর রক্তপাত অপছন্দ করেন। রক্তপাত আমাদের ধর্মীয় নিয়মে নিষিদ্ধ।’

“রাজা হাসিমুখে উত্তর দিলেন, ‘আমি তা জানি, মহান হাসিয়াহ। তাই যখন ঈশ্বর আমাকে এ নির্দেশ দিলেন তখন অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু ঈশ্বরকে তো আর প্রশ্ন করতে পারি না!’

“দর্শক সারিতে তখন মৃদু গুঞ্জন উঠল। প্রধান পুরোহিত থাকতে ঈশ্বর কেন রাজাকে নির্দেশ দিতে গেলেন। গুঞ্জন রাজার কানেও গেল। তাঁর মুখে অস্বস্তি ফুটে উঠতে দেখলাম। আমি যেন একটা ভরসা খুঁজে পেলাম। বুঝতে পারছিলাম এই কথা পুরোহিতদের কেউ বলবে না। দর্শক সারি থেকে কেউ এই প্রশ্ন না করলে ধূর্ত রাজা তা এড়িয়ে যাবে।

“আমি তাই কোন কিছু না ভেবেই দাঁড়িয়ে পড়লাম এবং কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললাম, ‘প্রধান পুরোহিত বেঁচে থাকতে ঈশ্বরের তো তার সঙ্গেই যোগাযোগ করার কথা। প্রধান পুরোহিতের কাজই তো ঈশ্বরের ইচ্ছাকে প্রকাশ করা।’

“আমার প্রশ্নে গুঞ্জন আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেল। দেখলাম রাজা এবং তার পুরোহিতরা মুখ বিব্রত ভঙ্গিতে ফুঁসছে। অপরদিকে হাসিয়াহর মুখ কালো হয়ে গেছে অজানা শঙ্কায়।

“কক্ষে কথাবার্তা বাড়ছিল। এর মাঝে এক বৃদ্ধ পুরোহিতের সঙ্গে কী যেন আলোচনা করে রাজা উঠে দাড়ালেন। তিনি বললেন, ‘ঈশ্বর সম্পূর্ণ স্বাধীন স্বত্তা। তিনি সর্বশক্তির আধার। তিনি সবার সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারেন। কিন্তু আমাদের যে প্রধান পুরোহিত আছেন বা অতীতে যেসব  ছিলেন তারা তাদের জন্মসূত্রে প্রাপ্ত ক্ষমতা ও নিজস্ব সাধনার দ্বারা নিজের আত্মাকে পবিত্র করে ওলেন। তাই সচরাচর  ঈশ্বর সরাসরি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকেন। কিংবা আমাদের কোন প্রয়োজন হলে আমরা তাদের মাধ্যমে ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগ করি। কিন্তু এর মানে এই না যে সর্বশক্তিমান সাধারণ মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। আমাদের সবার আত্মাই তার মহান আত্মার অংশ।’

“রাজা দেবী আকনার মূর্তির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মহান দেবী আকনা মা আমাদের। আমরা তার সন্তান। তবে আমি আপনাদের বলছি ঈশ্বর আমাকে সরাসরি নির্দেশ দেননি। তিনি স্বপ্ন দেখিয়েছেন। ঈশ্বর আমাকে স্বপ্নে নির্দেশ দিয়েছেন। আমি দেখেছি মৃত্যুদেবতা হুনহাউ বিশাল এক সর্পে পরিণত হয়ে আমাকে বলছেন তিনি ক্ষুধার্ত। তার খাদ্য দরকার। তা নাহলে আমাদের উপর নেমে আসবে খরা, দুর্ভিক্ষ।’ উপস্থিত সবাই আবার নীরব হল। সমস্ত কক্ষজুড়ে নেমে এল পিনপতন নীরবতা। একজন পুরোহিত বললেন, ‘তাহলে তো মহান রাজা, আপনার প্রস্তাব যুক্তিযুক্ত। দেবতা হুনহাউকে খুশি করতে হবে আমাদের। এটাই ঈশ্বরের ইচ্ছা।’ অন্যসব পুরোহিতদের কেউ মাথা নেড়ে, কেউ মুখে বলে সম্মতি জানালেন। শুধু হাসিয়াহ চুপ করে রইলেন গম্ভীর মুখ করে। সভায় বেশিরভাগ পুরোহিতের মত থাকায় নতুন রীতি প্রবর্তিত হল।

“সভা যখন প্রায় শেষ তখন রাজা চু বললেন, ‘আজকে মন্দিরের এই পবিত্র সভায় শৃঙ্খলাভঙ্গের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। সভায় বিধিমোতাবেক আলোচনা হবে মাননীয় পুরোহিতদের মধ্যে। কিন্তু আজ প্রশ্ন এসেছে দর্শকসারি থেকে। মহান ঈশ্বর শৃঙ্খলাভঙ্গ পছন্দ করেন না। তারই পবিত্র কক্ষে বসে, তাঁরই সামনে শৃঙ্খলাভঙ্গ বিদ্রোহের সামিল। এর একটাই শাস্তি এবং তা হল মৃত্যু। আমি আদেশ দিচ্ছি, দর্শকসারির সেই ধর্মচ্যূতকে ঈশ্বর অবমাননা ও ঈশ্বরের প্রতি বিদ্রোহের অপরাধে বন্দি করা হোক।’

“কেউ কোন কথা বলল না। রাজা দ্রুত সভা ভেঙে বেরিয়ে গেলেন। আমাকেও বের হতে হল। মন্দির থেকে বের হতেই রাজার সৈন্যরা ঘিরে ধরল আমাকে। আমার বন্দি করে রাখা হয়েছিল অন্ধকার প্রকোষ্ঠে।  রাজা চু মৃত্যুদন্ডই দিতে চেয়েছিল। কিন্তু পুরোহিত হাসিয়াহর অনুরোধে হত্যা না করতে সম্মত হয় এবং আমাকে নির্বাসন দেয়। এরপর থেকে আমি এই বনে আছি।

“আমার বিশ্বাস ছিল বাবার বলা সেই বিদেশী বন্ধুদের দেখা পাব একদিন। তারপর তাদের সঙ্গে নিয়ে গিয়ে লেমুরিয়াকে উদ্ধার করবো রাজা চু এর কাছ থেকে। লেমুরিয়ায় ফিরে আসবে শান্তি। জাদুজগতের মহান সম্রাট নিকোলাই এর পুত্র হারিরি, প্রথামত আপনিই এখন সমগ্র জাদুরাজ্যের সম্রাট। সে হিসেবে আমি এবং লেমুরিয়ার সব অধিবাসী আপনার প্রজা। এক ভয়ানক অবস্থায় আছে লেমুরিয়া। আপনি কী আপনার এই প্রজাদের দুর্দশায় তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবেন না? আপনি কী জানেন না একজন প্রকৃত সম্রাটের প্রধান কাজ তার প্রজাদের নিরাপত্তা এবং শান্তি নিশ্চিত করা?”

অধ্যায় সতের

হারিরি এটা জানত যে প্রজাদের সুখ শান্তির দিকে লক্ষ্য রাখাই জাদুরাজ্যের সম্রাটের প্রধান দায়িত্ব। নিয়ম মতে সে এখন জাদুরাজ্যের সম্রাট। তাই সে কিছুক্ষণ ভাবার পর বলল, “ঠিক আছে। তোমার রাজ্যকে রাজা চু এর হাত থেকে আমরা রক্ষা করব। কিন্তু এ ব্যাপারেও যে ভবিষ্যৎবাণী ছিল তা আমাদের জানা ছিল না।”

বামনাকৃতির লি খুব খুশি হল। সে বলল, “অসংখ্য ধন্যবাদ সম্রাট। লেমুরিয়ার অধিবাসীরা আপনার অপেক্ষায় আছে।”

লি রাতুল, হারিরি এবং আকাশকে সঙ্গে নিয়ে চলল লেমুরিয়ার দিকে। তারা চিরহরিৎ মহা অরণ্য থেকে বের হয়ে সবুজ উপত্যকা ধরে চলছিল। লি বলল, “সাবধান সম্রাট। আমাদের চোখ কান খোলা রেখে চলতে হবে। পাহাড়ের অন্যপাশেই লেমুরিয়া। আর এখানে আছে একচক্ষু জলদস্যুরা।”

আকাশ বেশ অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল, “এখানে জল কোথায় যে জলদস্যু আসবে?”

লি বলল, “এখানে এক সময় জল ছিল। ছিল সমুদ্রের অসীম জলরাশি। আর সেই জলে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল একচক্ষু জলদস্যুদের। এখন পানি শুকিয়ে গেছে। কিন্তু জলদস্যুরা রয়ে গেছে ঠিকই। তারা এখন স্থলেই আতঙ্ক ছড়ায়। তবে জলে তারা যেমন ভয়ংকর ছিল, স্থলে ততটা নয়।”

রাতুল জিজ্ঞেস করল, “এদের নাম একচক্ষু জলদস্যু কেন?”

লি বলল, “এক ভয়ংকর জলদস্যু সর্দারকে একবার বাঁচিয়েছিল এক অন্ধ ছেলে। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ জলদস্যু সর্দার তার এক চোখ ছেলেটাকে দিয়ে দেয়। এবং ছেলেটাকে তার ধর্ম ভাই বানিয়ে ফেলে। তারপর একচক্ষু দুই ভাই শুরু করে ত্রাসের রাজত্ব। তাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। শেষে তাদের দলে কেউ যোগ দিতে হলে এক চোখ অন্ধ করতে হত। পুরো দলটার সব জলদস্যুই হয়ে যায় একচক্ষু। সাধারণত এরা মানুষের দুটি চোখ উপড়ে ফেলত। শোনা যায় এরা এখনো আছে এই অঞ্চলে। তাদের কেউ দেখেনি। কিন্তু একা কিংবা নিরস্ত্র অবস্থায় কেউ এদিকে এলে প্রায়ই নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। সবার ধারণা এই দুর্ভাগারা ধরা পড়ে একচক্ষু জলদস্যুদের হাতে।”

রাতুল এবং আকাশ আতঙ্ক অনুভব করল। জলদস্যুদের সম্পর্কে অনেক গল্প তারা শুনেছে। এখন শেষ পর্যন্ত কী জলদস্যুদের হাতে প্রাণ হারাতে হবে?

খুব সাবধানতার সঙ্গে তারা পাহাড়ের ওপাশে এল। অর্থাৎ লেমুরিয়ায়। লেমুরিয়া অসাধারণ এক রাজ্য। তার মাথার উপরে গোলাপী রঙের আকাশ। কিছুটা এগিয়ে দেখা গেল ব্যস্ত হাট বাজার। বামনাকৃতির মানুষেরা ব্যস্তভাবে বাজার সদাই করছে। একে অন্যের সঙ্গে গল্প করছে। হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠছে। সরাইখানায় মদের ফোয়ারা ছুটছে যেন। নাচ গানের শব্দ আসছে কানে।

রাতুল বেশ অবাক হয়ে গেল। এমন উৎসব মুখর লেমুরিয়া সে প্রত্যাশা করেনি। তার ধারনা ছিল শুনশান নীরব কোন অঞ্চলে দেখতে পাবে। অথবা দেখতে পাবে রাজা চু এর অত্যাচারের চিহ্ন।

বাজারের বেশ ভিতরে তারা ঢুকে পড়েছিল। একসময় রাতুল বুঝতে পারল বামনাকৃতির লি তাদের সঙ্গে নেই। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই একদল অস্ত্রধারী বামনাকৃতির সৈন্য এসে তাদের ঘিরে ধরল।

তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের হাত পিছন দিকে নিয়ে বেঁধে ফেলা হলো। মুখ বেঁধে ফেলা হল কাপড় দিয়ে। তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হল সুলেমানি জাদুর গালিচা। এরপর অস্ত্রধারী সৈন্যদের মধ্যে নেতাগোছের একটি লোক সামনে এসে বলল, “মহান বিশাখার নির্দেশে তোমাদের গ্রেফতার করা হল।”

প্রায় একরকম টেনে হিঁচড়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হলো প্রাসাদে। সেখানে তাদের অপেক্ষায় ছিল বিশালাকৃতির এক লোক। রাতুলদের দেখে সে অট্টহাসি দিয়ে বলল, “আমাকে ফাঁকি দিবে ভেবেছিলে তোমরা। তুচ্ছ পৃথিবীর মানুষ আর নিকোলাইয়ের সন্তান। চিরহরিৎ অরণ্যে তাই ফাঁদ পেতে রেখেছিলাম। তোমাদের তিনজনকে হত্যা করে দেব দেবীদের ভবিষ্যৎবাণীকে উড়িয়ে দেবেন মহান কোবিলাই।”

বামনাকৃতির লি হেঁটে এসে দাঁড়াল বিশাখার কাছে। বিশাখা তার দিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “সাব্বাশ গল্পকার লি। এই কাজের জন্য তোমাকে বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করবেন রাজাধিরাজ, মহান সম্রাট কোবিলাই।”

যারা রাতুলদের ধরে নিয়ে এসেছিল এদের নেতা বিশাখাকে জিজ্ঞেস করল, “এদের এখন কী করব, মহামান্য বিশাখা?”

বিশাখা বলল, “এদের আপাতত পশ্চিমের দুর্গে বন্দি করে রাখো। মহান কোবিলাইয়ের ইচ্ছা অনুযায়ী এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমি যাচ্ছি তার সঙ্গে দেখা করতে।”

প্রাসাদে তখন বেশ জাকজমকপূর্ন পোশাক পরা আরেকটি বামন এসে প্রবেশ করল। সে বিশাখাকে কুর্নিশ করল। বিশাখা জিজ্ঞেস করল, “আগার্থার কী খবর বল?”

বামনাকৃতির লোকটি বলল, “মহান বিশাখা, আগার্থাতে বিদ্রোহের চেষ্টা করছে অধিবাসীরা। তারা চায় না সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করে মহান কোবিলাইয়ের প্রাসাদ নির্মাণ হোক।”

এই কথা শুনে রাগে যেন ফেটে পড়ল বিশাখা। সে বলল, “আমি এদের গুঁড়িয়ে দেব। এখনই আগার্থায় যেতে হবে। বাহনকে তৈরি হতে বলো।”

বিশাখা হেটে ভেতরে চলে গেল। সৈন্যরা রাতুলদের নিয়ে চলল পশ্চিমের দুর্গে। রাতুল, আকাশ ও হারিরি ছিল পালকির মত খাঁচায়। ভেতর থেকে বাইরেটা দেখা যায়। এর নিচে বড় বড় চাকা লাগানো। বামন সৈন্যরা টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

রাতুলদের নিয়ে যখন বামনাকৃতির সৈন্যরা যাচ্ছিল পশ্চিমের দুর্গে তখন মাঝপথে শুরু অতর্কিত আক্রমণ। কালো ঘোড়াতে করে একদল দুধর্ষ অশ্বারোহী হানা দিল। বামন সৈন্যরা প্রতিরোধ করতে গিয়েছিল। কিন্তু মারা পড়ল বেঘোরে। অশ্বারোহীদের রণনৈপুণ্য চোখে পড়ার মতো।

জীবিত বামন সৈন্যরা রণে ভঙ্গ দিয়ে একসময় জান নিয়ে পালাল।

আর অশ্বারোহীরা তাদের কালো ঘোড়া ছুটিয়ে এল রাতুলদের পালকির কাছে। একজন এগিয়ে এসে ভালো করে তাকিয়ে দেখল। রাতুল, আকাশ এবং হারিরির তখন হাত, মুখ বাঁধা। তারা দেখলো একচক্ষু এক অদ্ভুত লোক তাদের দিকে তাকাচ্ছে। লোকটার ঘোড়ারও একটি চোখ।

লোকটা রাতুলদের দেখে আবার ফিরে গেল। তার সঙ্গীদের নির্দেশ দিল কিছু একটা। সৈন্যরা রাতুলদের পালকীসহ টেনে নিয়ে যেতে লাগল তাদের সঙ্গে। একচোখা অশ্বারোহীরা তাদের একচোখা কালো ঘোড়া ছুটিয়ে, ধুলো উড়িয়ে চলল পাহাড়ের দিকে।

অধ্যায় আঠারো

রাতুল, আকাশ এবং হারিরি তিনজনই বুঝতে পারছিল তারা একচক্ষু জলদস্যুদের কবলে পড়েছে। লি-এর গল্পটাতে এই জলদস্যুদের কথা ছিল। সে যা বলেছিল এগুলো যদি সত্যি হয় তাহলে আজ নিশ্চিত চোখ হারাতে হবে। আর এই জাদুরাজ্যে চোখহীনভাবে বেঁচে থাকা নিশ্চয়ই সহজ কিছু হবে না। কিন্তু করার কিছু নেই। শক্ত করে বাঁধা আছে হাত, মুখ। আর ঘোড়া খাঁচা টেনে নিয়ে চলেছে দ্রুতগতিতে। ঘামে ভিজে যাচ্ছিল রাতুলের মুখ। জাদুরাজ্যে আগমনের পর এই প্রথম সে পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়ল।

একসময় ঘোড়াগুলো থামল। জলদস্যুরা এসে থামলো তাদের ডেরায়। রাতুল, আকাশ এবং হারিরিকে নামানো হল। তাদের হাতের বাঁধন এবং মুখের বাঁধন খুলে দেয়া হল। রাতুল দেখতে পেল অন্ধকার হয়ে গেছে। একটা কাঠের অগ্নিকুন্ড জ্বলছে দাঊদাঊ করে। তার সামনে বসে আছে দুটি লোক। তাদের দুজনেরই চুল, দাড়ি সাদা। দুজনেরই একটা করে চোখ অন্ধ।

অশ্বারোহীরা এদের কেন্দ্র করে গোল হয়ে হাটু গেড়ে বসল। রাতুল, আকাশ এবং হারিরিকেও বসতে বাধ্য করল।

আগুনের সামনে থাকা বৃদ্ধ প্রথম লোকটি বলল, “জাদুসম্রাট নিকোলাই পুত্র কে?”

হারিরি বলল, “আমি।”

লোকটি বলল, “তুমি লেমুরিয়ায় গিয়ে ভুল করেছিলে। আর একটুর জন্য নিশ্চিত মারা পড়তে। আর তোমার এই ভুলের জন্য জাদুরাজ্যের অপূরনীয় ক্ষতি হয়ে যেত। ঠিক সময়মত আমার লোকেরা পৌছাতে পেরেছিল। আর একটু দেরী হলে দুর্গে বন্দি হয়ে যেতে। তখন আর উদ্ধার করা সম্ভব হত না।”

লোকটার কথাবার্তা শুনে তাকে ভালো মনে হল। হারিরি বলল, “আমরা বামনটার কথা বিশ্বাস করে গিয়েছিলাম।”

লোকটি বলল, “এখন তোমাদের যেতে হবে পবিত্র পাহাড়ে।”

আকাশ বলল, “আমার সমুদ্রের তলদেশে গিয়ে ব্যাঙদের দেবীর কাছ থেকে শুনেছি। পবিত্র পাহাড়েই আমরা যেতে চাই। এজন্য পিঁপড়াদের……”

লোকটি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “এসব গতানুগতিক কথাবার্তা। এগুলো করতে গেলে আরো বিপদে পড়বে। তোমরা কি মনে কর কোবিলাই এগুলো জানে না? সে পিঁপড়াদের কাছেও তার লোক ঠিক করে রেখেছে। একবার বেঁচে গেছ বলে ভেবো না বার বার বেঁচে যাবে।”

রাতুল জিজ্ঞেস করল, “তাহলে এখন আমাদের কী করা উচিত?”

লোকটি বলল, “পবিত্র পাহাড়ে পৌঁছাবোর অন্য আরেকটা উপায় আছে। সে উপায়টার নাম তীর্থক।”

তারপর কিছুক্ষণ লঘরব থেকে তিনি বললেন, “তীর্থক হচ্ছে তিন মাথাওয়ালা সাদা ঘোড়া। খুবই

দুর্লভ বাহন। তবে যেহেতু তোমাদের কাজের সঙ্গে জাদুরাজ্যের ভাগ্য জড়িত তাই আমরা তিনটি তীর্থকের ব্যবস্থা করে দেব। সেগুলোতে চড়ে তোমরা চলে যাবে পবিত্র পাহাড়ে। সময় খুব বেশি নেই।”

রাতুল জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু আমাদের অপেক্ষায় আছেন কয়েকজন। তাদের সঙ্গে আমাদের দেখা করতে হবে।”

লোকটি বলল, “জাদুকর মাহমুদ, তোবারক মাস্টার এবং জাদুকর হাতির কথা বলছ? তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে জাদুকর মাহমুদের হীরামন পাখির মাধ্যমে। তোমরা পবিত্র পাহাড়ে যাও। সেখান থেকে চলে যাবে আগার্থায়। জাদুকর মাহমুদ অন্যদের নিয়ে সেখানে থাকবেন। নষ্ট করার মত সময় আর নেই।”

রাতুল, হারিরি এবং আকাশ তিনজনই ঠিক বিশ্বাস করতে পারল না। একবার ধোঁকা খেয়ে তাদের মধ্যে অবিশ্বাস ঢুকে গিয়েছিল। কিন্তু এখানে অন্যথা করার উপায় নেই। সঙ্গে জাদুর বই, গালিচা কিছুই নেই। শুধু একটা জিনিসই লুকিয়ে রাখতে পেরেছে রাতুল। সেটা হল বীর আয়ুধের দেয়া ছোট ব্রোঞ্জের পাত্র। পকেটে ছিল তাই রয়ে গেছে। সব রেখে দিয়েছে বিশাখার লোকেরা। আর একচক্ষু দস্যুরা যে চোখ তুলে নেয়নি এটাই তো বড় কথা।

হারিরি বলল, “ঠিক আছে। আপনি আয়োজন করুন। আমরা এখান থেকেই যাবো পবিত্র পাহাড়ে।”

আগুনের সামনে বসা লোকটি তার পাশের জনের কানের কাছে আস্তে করে কিছু বলল। দ্বিতীয় লোকটি ইশারায় ডাকল এক দস্যুকে। দস্যু এগিয়ে আসলে তাকে কিছু একটা নির্দেশ দিল। কয়েকজন দস্যু সে নির্দেশ পালনে বেরিয়ে গেল।

কিছু সময় পর তারা ফিরে আসল তিনটি সাদা ঘোড়াকে সঙ্গে নিয়ে। প্রতিটি ঘোড়ার মুখ তিনটি করে। তাদের গায়ের রঙ ধবধবে সাদা। ঘোড়াগুলো এসে বাধ্য পোষা প্রাণীর মত রাতুল, আকাশ এবং হারিরির সামনে বসে পড়ল।

বৃদ্ধ লোকটি বলল, “এরা তীর্থক। আজ পর্যন্ত এদের পিঠে কেউ চড়তে পারেনি। জাদুরাজ্যের স্বার্থে আজ তারা তোমাদের নিয়ে যাবে পবিত্র পাহাড়ে। এদের উপর চড়ে বস। এদের উপর উঠে বসা মাত্র তোমরা হয়ে যাবে সবচেয়ে নিরাপদ।”

রাতুল, আকাশ এবং হারিরি চড়ে বসল। তীর্থক তিনটি তাদের নয় মুখ দিয়ে ডেকে উঠল অদ্ভুত সুরে। তারপর ছুটল দ্রুতবেগে।

রাতুলের মনে হচ্ছিল সে মেঘের পিঠে চড়ে যাচ্ছে কোথাও। এমন অনুভূতি যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। পাহাড়, মাঠ ডিঙিয়ে চলল তীর্থক। পবিত্র পাহাড় লক্ষ্ করে।

অধ্যায় উনিশ

রাতুল, আকাশ এবং হারিরি তীর্থকের পিঠে চড়ে খুব তাড়াতাড়িই পৌছে গেল পবিত্র পাহাড়ের সামনে। জাদুরাজ্যে সময় বড় অদ্ভুত জিনিস। কখনো দেখা যায় খুব দীর্ঘ। আবার কখনো শেষ হয়ে যায় চোখের পলকে। তীর্থকের পিঠ থেকে তারা তিনজন নামল।

পবিত্র পাহাড়ের উপরে ঝকঝকে নীল আকাশ। পাহাড়ের সবুজ সৌন্দর্যে চোখ জুড়িয়ে যায়।

পাহাড়ে উঠার আগে হারিরি বলল, “পাহাড়ে তুলার মতো যদি কোন বস্তু দেখতে পাও তাহলে এর কাছে যেও না।”

আকাশ জিজ্ঞেস করল, “কেনো?”

হারিরি বলল, “পাহাড়ে এক অদ্ভুত প্রাণী থাকে গল্প শুনেছি। এদের নাম রো ল্যাংস। তারা নিচু হতে পারে না কিংবা কথা বলতে পারে না। শুধু জিহবা নাড়িয়ে অদ্ভুত শব্দ করে। সে শব্দ শুনে কেউ যদি আকৃষ্ট হয়ে তাদের কাছে যায় তাহলে তারাও এরকম হয়ে যায়। সুতরাং, সাবধানে পথ চলবে।”

তারা পাহাড়ে কিছুদূর উঠে একটা গুহার দেখা পেল। গুহায় নিঃশব্দে বসেছিলেন একজন বৃদ্ধ বামন। তার সাদা দাঁড়ি এবং চুল। হাতে লাঠি। তিনি বসেছিলেন একটি লোহার বাক্সের উপরে। গুহার একপাশে জ্বলছে মোমবাতি।

রাতুলরা প্রথমে মনে করল ইনিই হয়ত দেবী আইসিস। তারা কিছুটা এগিয়ে গেল। তাদের পায়ের শব্দে ধ্যান ভেঙে গেল বৃদ্ধ। বৃদ্ধ শান্ত ভঙ্গিতে তাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী চাও তোমরা?”

হারিরি বলল, “আমরা দেবী আইসিসের কাকড়ামানবদের কাছে এসেছি। আপনি কী দেবী আইসিস?”

বৃদ্ধ বামন হো হো করে শব্দ করে হেসে উঠল। তারপর বলল, “না। আইসিস থাকেন পাহাড়ের উপরে। আমি কারজালেখ। এখানে বসে পাহাড়া দেই।”

রাতুল জিজ্ঞেস করল, “কী পাহাড়া দেন?”

কারজালেখ বললেন, “এই পাহাড়ের মণি মুক্তা মূল্যবান অব পাথর। সব আছে আমি বসে আছি যে লোহার বাক্সে তার ভেতর।”

আকাশ বলল, “আমরা দেবী আইসিসের কাছে যেতে চাই। আপনি কি আমাদের সাহায্য করবেন?”

কারজালেখ বললেন, “তোমরা সোজা উপরে উঠতে থাক। অনেক পথ বাকি আছে। তোমরা যে এখানে আসবে এমন ভবিষ্যৎবাণী অনেক আগে আমি শুনেছিলাম। এতদূর যখন এসে পড়েছ তাহলে তোমরা সফল হবেই। তবে লক্ষ্যে স্থির থেকো। তোমাদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে এমন অনেক কিছুই আছে এ পাহাড়ে। কোনদিকে না তাকিয়ে তাই সোজা উঠে যাবে। উঠতে উঠতেই একসময় দেখা পাবে কাকড়া মানবদের।”

হারিরি, আকাশ এবং রাতুল তিনজনই ধন্যবাদ জানাল সদালাপী ও উপকারী কারজালেখকে। কারজালেখ তার শান্ত সৌম্য চেহারায় হাসি ফুটিয়ে ধন্যবাদ গ্রহণ করলেন।

রাতুলরা কারজালেখের গুহা থেকে বের হয়ে সোজা উপরে উঠতে লাগলো। এভাবে প্রায় আধ ঘন্টা উঠার পর তারা হাঁপিয়ে উঠেছিল বলে এক জায়গায় বসে পড়ল বিশ্রাম নেয়ার জন্য। ঠিক তখনই তারা শুনতে পেল এক মানবশিশুর কান্না।

কান্না লক্ষ্য করে এগিয়ে গিয়ে দেখা গেল একটি চমৎকার শিশু কাঁদছে। আকাশ একেবারে তার কাছে গিয়ে বসল। শিশুটি এতে কান্না আরো বাড়িয়ে দিল।

রাতুল বলল, “এই শিশু পাহাড়ে এল কোথা থেকে?”

আকাশ শিশুটির মুখের সামনে হাত নাচিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করল। কিন্তু শিশুটির কান্না আর থামে না। সে খুব জোরে চেঁচাতে লাগল। এদিকে তাড়া দিয়ে হারিরি বলল, “আমাদের তো যেতে হবে।”

আকাশ বলল, “কিন্তু এই বাচ্চা ছেলেটাকে এখানে ফেলে রেখে তো আমরা চলে যেতে পারি না। এখানে একা একা থাকলে নির্ঘাত মারা পড়বে।”

হারিরি বলল, “তাহলে তুমি কী করতে চাও?”

আকাশ শিশুটিকে কোলে নিতে নিতে বলল, “একে নিয়েই আমরা যাবো।”  

শিশুটি খুব হালকা ছিল। কোলে উঠে সে কান্না থামিয়ে দিল। তাকে কোলে নিয়ে উঠতে আকাশে বিশেষ অসুবিধা হচ্ছিল না। তবে প্রায় মিনিট দশেক যাবার পর আকাশ অনুভব করতে লাগলো শিশুটির ওজন যেন বাড়ছে। একসময় এত ভারী হলো যে আকাশ নড়তে পারলো না। সে শিশুটিকে নিয়ে বসে পড়ল এবং তাকে পাশে রাখতে চাইল। কিন্তু দেখা গেল সে যেন আটার মত লেগে আছে। কিছুতেই ছাড়ানো যাচ্ছে না।

হারিরি এবং রাতুলও চেষ্টা করল শিশুটিকে ছাড়াতে। কিন্তু শিশুটি আকাশকে ছাড়ল না। হো হো করে হাসতে লাগল শিশুটি। বিস্ময়ে গোল হয়ে গেল রাতুল এবং হারিরির চোখ। আর এদিকে ভয়ে চুপসে গেছে আকাশ। তার শরীর দূর্বল লাগছিল।

টানাটানি করে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ল রাতুল এবং হারিরি তখন আকাশের কোলের বাচ্চা ছেলেটি স্পষ্ট স্বরে বলল, “আমাকে উপরে নিয়ে যাবি। তাহলে তোকে অনেক জাদুক্ষমতা দেব। কিন্তু যদি নিতে না পারিস তাহলে তোর শরীরের সব রক্ত শুষে নেবো। হাঃ হাঃ হাঃ।”    

তারা যেখানে ছিল তার উপর থেকে বানরের মত দেখতে কয়েকটি প্রানী উঁকি দিল। তাদের মাথার উপরে একটি গর্ত এবং সে গর্তে কিছু পানি। এদের একটি নিচে এসে বলল, “তোমরা কারা?”

হারিরি নিজের এবং তার বন্ধু দুজনের পরিচয় দিলো।

বানরের মতো প্রানীটি বলল, “তোমর বন্ধু তো কোনাক জিজির খপ্পরে পড়েছে। এবার মরা ছাড়া কোন উপায় নেই। রক্ত খেয়ে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কোনাক জিজি ছাড়বে না। ”

আকাশের শরীর দূর্বল লাগছিল। সে বুঝতে পারল কোলের বাচ্চা প্রাণীটি তার রক্ত শুষে নিচ্ছে। রাতুল এবং হারিরির করার কিছু ছিল না। তারা প্রায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল পবিত্র পাহাড়ে বন্ধুর মরে যাওয়ার দৃশ্য।

আকাশ মারা গেল। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর কোনাক জিজি তাকে ছেড়ে লাফিয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় হাসছিল হিঃ হিঃ করে। সে হাসি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে।

আর রাতুলের চোখের সামনে ভেসে উঠছিল আকাশের তার রুমমেট হয়ে আসা, জাদুর গাছ এবং জাদুরাজ্যে আগমন ইত্যাদি সব ঘটনা। সে মুষড়ে পড়ল। মাটিতে বসে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করল। প্রথমবারের মত সে অনুভব করল এই নির্জন পাহাড়ে যেন সে একা।

হারিরিও স্তব্দ হয়ে গিয়েছিল। একটি বানরের মত প্রানী লাফিয়ে চলে গেল তাদের পাশ কাটিয়ে।

হারিরি রাতুলকে বলল, “কেঁদে কিছু হবে না। চলো আমরা দেবী আইসিসের গুহায় যাই। তিনি মৃতকে জীবিত করতে পারেন শুনেছি।”

একথা রাতুলের বিশ্বাস হল না। সে বলল, “তুমি যাও। আমি তোমার সঙ্গে কোথাও যাবো না।”

“তাহলে কী করবে? এখানে থাকবে?”

“হ্যা, এখানে বসে থাকব।”

“কিন্তু দেখো আমাদের উপর জাদুরাজ্যের ভবিষ্যত নির্ভর করছে।”

“আমি এসবের কিছুই জানি না। জাদুরাজ্য তোমার, আমার কিছুই না। আমি এখানে বসে থাকবো।”

রাতুল স্থির হয়ে বসে রইল। হারিরিও আর কিছু বলল না। সেও বসে পড়ল। পাহাড়ের মধ্যে মৃত আকাশকে নিয়ে তারা দুজন নিঃশব্দে বসে রইল অনেকক্ষণ।

হঠাৎ একটা পরিচিত কন্ঠস্বর শুনে চমকে উঠল রাতুল এবং হারিরি।

বৃদ্ধ কারজালেখ এসেছেন। সঙ্গে সেই বানরের মত প্রাণীদের একটি।

কারজালেখ বললেন, “তোমাদের আমি মানা করেছিলাম কোনদিকে লক্ষ্য না দিতে। তোমরা আমার কথা শুনলে না। এখন দেখো পরিণতি।”

তিনি বললেন, “বীর আয়ুধের কাছে গিয়েছিলে তোমরা? সে একটা ব্রোঞ্জের ছোট পাত্র দিয়েছে?”

রাতুল আশান্বিত হয়ে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যা, আমরা গিয়েছিলাম। তিনি ব্রোঞ্জের পাত্র দিয়েছেন।”

কারজালেখ বললেন, “সেটা কোথায়?”

রাতুল উঠে গিয়ে মৃত আকাশ তার প্যান্টের পকেট হাতড়ে বের করে আনল ব্রোঞ্জের পাত্রটি। কারজালেখের হাতে দিল। কারজালেখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পাত্রটি দেখলেন।

তারপর বললেন, “এই পাত্রে পানি রেখে তা মৃত ব্যক্তিকে খাওয়ালে তার প্রাণ ফিরে আসে। সুতরাং, তোমরা চিন্তা কর না।”

হারিরি জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু পানি কোথায় পাওয়া যাবে এখানে?”

কারজালেখ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। পবিত্র পাহাড়ে পানির উৎস নেই।

শেষে বানরের মত প্রাণীটি বলল, “জাদুরাজ্যের স্বার্থে আমি আমার মাথার জাদুর পানি দিয়ে দেব।”

কারজালেখ তাকে বললেন, “কিন্তু কাপ্পা তাতে তো তুমি জাদুক্ষমতা হারিয়ে সাধারণ এক বানরে পরিণত হবে।”

কাপ্পা বলল, “মহান কারজালেখ, আমার জাদুক্ষমতার চেয়ে জাদুরাজ্য আমার কাছে গুরুত্বপূর্ন। আপনি বাঁধা দেবেন না।”

কারজালেখ বাঁধা দিলেন না। কাপ্পা তার মাথার পানি ব্রোঞ্জের পাত্রে ঢালল। এই পানি কারজালেখ অল্প ঢেলে দিলেন আকাশের মুখে। ধীরে ধীরে তার হাত পা নড়ে উঠল। সে চোখ মেলে তাকাল।

এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। রাতুল আনন্দে প্রায় আত্মহারা হয়ে গেল। অনেক ধন্যবাদ জানাল উপকারী কারজালেখকে।

তবে আকাশ কিছুটা অবাক হয়েছে। সে মানতেই চাইল না সে মারা গিয়েছিল। তার লম্বা ঘুম থেকে উঠার পর যে অনুভূতি হয় সেরকম অনুভূতি হচ্ছিল।

তাদের এই আনন্দময় সময়ে কারজালেখ বিদায় নিলেন। এবং রাতুল, আকাশ এবং হারিরি তিনজন মিলে আবার উঠতে শুরু। এবার আর অন্য কোনদিকে লক্ষ্য দিল না তারা।

একপর্যায়ে তারা পৌছে গেল দেবী আইসিসের গুহায়। গুহার মুখে আলকাতরার মত কালো অন্ধকার। দু পাশে দুজন কাকড়ামানব পাহাড়ারত।

রাতুলদের দেখে একজন এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের মধ্যে নিকোলাই পুত্র কে?”

হারিরি এগিয়ে গিয়ে বলল, “আমি।”

কাকড়ামানব হারিরির হাতে একটি তীর ধনুক দিয়ে বলল, “ধনুকের গায়ে বিষ মাখানো আছে। বিশাখার গায়ে বিদ্ধ হলে সে মারা যাবে। এটা নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে যাও। আগার্থায় যুদ্ধ লেগেছে।”

তীর ধনুক নিয়ে তারা তিনজন নেমে এল পবিত্র পাহাড় থেকে। সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষায় ছিল তীর্থকেরা। এদের পিঠে চড়ে আবার তারা গেল একচক্ষু জলদস্যুদের আস্তানায়।

সেখানে গিয়ে দেখা গেল তোবারক আলী, জাদুকর মাহমুদও চলে এসেছেন। জাদুকর মাহমুদের সঙ্গে এসেছে তার হীরামন পাখি।

আগার্থায় যুদ্ধ শুরু হয়েছে। আগার্থার অধিবাসীরা বিশাখার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। বিশাখার সৈন্যরা উপজাতি মানবদের মারছে নির্বিচারে। তাই সেখানেই যেতে হবে।

জাদুকর মাহমুদ, তোবারক আলী এবং জলদস্যুরা একচোখা কালো ঘোড়াতে চড়ে রওনা দিলেন। আর রাতুল, হারিরি এবং আকাশ চড়ল তীর্থকদের পিঠে।

আগার্থাতে পৌছে দেখা গেল অবস্থা ভয়াবহ। যুদ্ধ চলছে মারাত্মক। বিশাখার বিকট দর্শন গন্ডার সৈন্যরা আগার্থার মানুষদের মারছে নৃশংসভাবে। একটি বড় শুওর টানা রথে বসে বিরাট তরবারির সাহায্যে বিশাখাও কাটছে মানুষ।

একচক্ষু জলদস্যুরা যুদ্ধে নেমে পড়ল। আর এদিকে হারিরি বের করল তার তীরধনুক। একটা মাত্র ধনুক। মিস হলেই সব শেষ। তাই বুক কাঁপছিল রাতুলের। বিশাখার বুক লক্ষ্য করে নিঁখুত নিশানায় তীর ছুঁড়ল হারিরি। বিদ্যুৎ বেগে তীর ছুটে গিয়ে বিদ্ধ হলে বিশাখার বুকে। বিশাখা বিস্ফোরিত নেত্রে তাকাল এদিকে।

তারপর টলতে টলতে পড়ে গেল রথ থেকে।

এই অবিশ্বাস্য ঘটনায় যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল। বিশাখার সৈন্যরা যুদ্ধ ছেড়ে পালাতে শুরু করল। আর একচক্ষু জলদস্যুরা তাদের যাকে যেখানে পেল তাকেই মারতে লাগল। একেবারে কচুকাটা যাকে বলে।

হারিরি, রাতুল, আকাশ, জাদুকর মাহমুদ এবং তোবারক আলী এরপর ছুটলেন বিশাখার প্রাসাদে। সেখানে গিয়ে খুঁজে বের করা হলো জাদুর পুস্তক গায়েত আল হাকিম।

জাদুর বই হাতে নিয়ে এবার তারা চললেন কোবিলাইয়ের প্রাসাদে। তারা যখন আগার্থা ছাড়ছিলেন তখন শোনা যাচ্ছিল আগার্থার উপজাতি মানবদের জয়ধ্বনি।

গায়েত আল হাকিম হাতছাড়া হয়ে গেছে, বিশাখা মারা গেছে এই দু খবর পৌছে গিয়েছিল কোবিলাইয়ের কানে। সে পালাতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সভাসদ জাদুকরেরা যারা তার ভয়ে এতদিন কোন কথা বলতে পারেন নি তারা বুঝতে পেরে তাকে বন্দি করেন। গায়েত আল হাকিম জাদুকর মাহমুদের হাতে চলে যাওয়ায় কোবিলাইয়ের কালো জাদুক্ষমতা কমে নেমে এসেছিল প্রায় অর্ধেকে।

হারিরি বাকী সবাইকে নিয়ে প্রাসাদে পৌছে গেলে সভাসদ জাদুকরেরা খুশি হলেন। জাদুকর মাহমুদ তার জাদুশক্তির সাহায্যে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে চিরদিনের জন্য বন্দি করে ফেললেন কোবিলাইকে।

গায়েত আল হাকিম গ্রহণ করতে দেবতা থথ আসেন প্রাসাদে। এই প্রথম কোন দেবতা এলেন জাদুরাজ্যের সম্রাটের প্রাসাদে। তিনি গায়েত আল হাকিম হারিরির হাত থেকে গ্রহণ করেন এবং সম্রাট হিসেবে তাকে আশীর্বাদ করে যান।

হারিরি জাদুরাজ্যের সম্রাট হয়ে যায়। জাদুকর মাহমুদ হন তার প্রধান উপদেষ্টা।

যখন বিদায় নেবার সময় আসল, তখন জাদুকর মাহমুদ বললেন, “রাতুল এবং আকাশ। জাদুরাজ্যে তোমাদের কাজ শেষ হয়েছে। এখন তোমাদের ফিরিয়ে দেয়া হবে তোমাদের পৃথিবীতে। কিন্তু প্রয়োজনে আবার তোমরা এখানে আসতে পারবে।”

আকাশ বলল, “কিন্তু বাবা আপনি কী যাবেন না?”

জাদুকর মাহমুদ বললেন, “আমি দীর্ঘদিন এখানে বন্দি ছিলাম। যাওয়া আসা করার শক্তি আমার শেষ হয়ে গেছে। তাই আমি আর যেতে পারবো না। তবে আমি এখানে আছি।”

হারিরি অনেক ধন্যবাদ জানাল রাতুল এবং আকাশকে। সভাসদ জাদুকরদের সবাই রাতুল, আকাশ এবং তাদের নতুন সম্রাট হারিরির প্রশংসায় হলেন পঞ্চমুখ।

বাবাকে সঙ্গে নিতে না পারায় কিছুটা মন খারাপ হয়েছিল আকাশের।তোবারক আলী সেটা বুঝতে পেরে বললেন, “মন খারাপ করো না আকাশ। এখন তুমি মাঝে মাঝেই এখানে আসতে পারবে। আগামী সামার ভ্যাকেশনে ড্রাগনের পিঠে চড়ে হাওয়া খেতে চলে এসো।”

বিদায় পর্ব শেষ হলে হঠাৎ একটা আলোর ঝলকানি হলো। আকাশ এবং রাতুলের মাথা প্রায় ঘুরে উঠল। তারা শুনতে পেল হারিরি বলছে, “বিদায় বন্ধুরা।”

দূর থেকে যেন রিকশার টুং টাং শব্দ শোনা গেল। আর চারদিক অন্ধকার হয়ে উঠল।

এর কিছুক্ষণ আলোর ঝাঁপটা এসে লাগল রাতুলের চোখে। সে চোখ খুলে তাকাল। সকাল হয়েছে। বিছানায় উঠে বসে পাশের খাটের দিকে তাকাল সে। বেঘোরে ঘুমাচ্ছে আকাশ। রাতুল উঠে গিয়ে ডাকল তাকে, “এই আকাশ…আকাশ…”

আকাশ চোখ খুলে তাকাল। তাকানোর পর দেখা গেল তার চোখেও ভর করেছে বিস্ময়।

রাতুল কিছু বলার আগেই সে বলল, “হারিরি, জাদুরাজ্য কতকিছু দেখলাম। কোথায় সব?”

রাতুল বলল, “আমিও দেখলাম। তুইও একই স্বপ্ন দেখেছিস?”

আকাশ এবং রাতুল স্বপ্ন না বাস্তব ছিল পুরো ঘটনা ভেবে বিভ্রান্ত হয়ে উঠল।

এক পর্যায়ে রাতুল তার প্যান্টের পকেটে কিছু একটা অনুভব করল। পকেটে হাত দিয়ে বের করে আনল যে বস্তু তাতে আকাশের সঙ্গে তার চোখও বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে উঠল। বীর আয়োধের দেয়া সেই ব্রোঞ্জের পাত্র।

রাতুলের স্কুল ব্যাগ এবং আকাশের বৈজ্ঞানিক বক্সটাও আর পাওয়া গেল না। তবে এগুলোর জন্য সামান্যতম দুঃখও হয়নি রাতুল কিংবা আকাশের।

সমাপ্ত

ছবিঃ ইন্দ্রশেখর

জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s