ধারাবাহিক উপন্যাস জাদু রাজ্য মুরাদুল ইসলাম বর্ষা ২০১৬

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস

dharabahikjadurajyotitle (Medium)

 প্রথম অধ্যায়

 এই কিছুকাল আগের কথা। রাতুলদের স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথি হয়ে এলেন এক জাদুকর। সাধারণত এরকম ঘটনা কোথাও দেখা যায় না। আজকালকার লোকেরা জাদুতে বিশ্বাসই করতে চায় না। কিন্তু নিশিকান্তপুর মডেল হাইস্কুলের হেডস্যার তোবারক আলীর কথা ভিন্ন। তিনি জাদুতে বিশ্বাস করেন। ভূতে বিশ্বাস করেন। প্রেতেও বিশ্বাস করেন। মাঝে মাঝে ক্লাসে পড়াতে এসে অন্যমনস্কভাবে বলেন জাদুরাজ্যের কথা। সে নাকি এক জগত আছে যেখানে সব কিছুই জাদুময়। উড়ন্ত ডানাওয়ালা কচ্ছপটানা রথ থেকে শুরু করে বিরাট সব ড্রাগন, কী নেই সেখানে! এমন সব বস্তু আছে যা কল্পনাকেও হার মানায়। এমনভাবে তিনি গল্প করেন যেন মনে হয় তিনি ওসব কিছু নিজের চোখে দেখে এসেছেন। তাই ছাত্রছাত্রীরা তাঁর ক্লাসে খুব মজা পায়।

একবার ক্লাসে একজন পড়া বলতে গিয়ে মাঝপথে আটকে গেল। তোবারক আলী তখন গল্পে গল্পে বলেছিলেন জাদু রাজ্যের বোকা ড্রাগনের কথা। বোকা ড্রাগন নাকি উড়তে উড়তে আকাশে খুব উচুঁতে উঠে গিয়ে হঠাৎ ভুলে গিয়েছিল কীভাবে উড়তে হয়। তারপর ধপাস করে পড়ে যায় মাটিতে। খুব উঁচু থেকে পড়ায় তার সামনের পাটির কয়েকটি দাঁত খুলে এসেছিল। আর দাঁতহীন ড্রাগনকে কে ভয় পাবে? তাই জাদুরাজ্যের সবাই তাকে নিয়ে খুব হাসাহাসি করে।

তোবারক আলী বলেন, “তোমরা ভূত প্রেত নিয়ে যা বল তার বেশিরভাগই কল্পনা থেকে। এগুলোর সাথে সত্যিকার ভূতপ্রেতের কোন মিলই নেই। আসলে ভূতপ্রেত তাদের নামও নয়। জাদুরাজ্যের জাদুমানব এবং অন্য অদ্ভুত সব প্রাণীদেরই পৃথিবীর মানুষ না বুঝে নাম দিয়েছে ভূতপ্রেত।”

তাঁকে একবার এক ছাত্র জিজ্ঞেস করেছিল, “স্যার, আপনি কীভাবে জাদুরাজ্য সম্পর্কে জানতে পারলেন?”

উত্তরে তিনি রহস্যময় হেসে বলেছিলেন, “পৃথিবীর অল্প কিছু মানুষই জাদুরাজ্য সম্পর্কে জানেন। সৌভাগ্যক্রমে আমি তাদের একজন।”

তিনি যে এসব কথা বলে বেড়াতেন, মানে এই জাদুরাজ্যের কথা, রূপকথার গল্পের মত গল্প তা স্কুলের অন্য সব মাস্টারমশাইরাও জানতেন। তবে তাঁরা কেউ বিশ্বাস করতেন না। প্রকাশ্যেই তোবারক আলীর সাথে তাঁরা এ নিয়ে মজা করতেন। তোবারক আলী এতে কিছু মনে করতেন না। যেমন একবার ক্লাস টেনের কেমিস্ট্রি স্যার তৌহিদ আহমেদ বললেন, “স্যার, আপনার জাদুরাজ্যের কয়েকটা ড্রাগনকে আমাদের স্কুলে নিয়ে আসা গেলে বেশ হত। খাঁচায় বন্দি করে মাঠের এককোণে রেখে দিতাম। ছাত্রছাত্রীরা মজা পেত। আর আপনার গল্পের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে থাকত ড্রাগনটি। কী বলেন স্যার, একটা ড্রাগন আনা যায়?”

এই কথায় অন্যসব শিক্ষক-শিক্ষিকারা নিঃশব্দে হাসছিলেন। তোবারক আলী কিন্তু দমে যাবার পাত্র নন। তিনি স্বাভাবিক মুখেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উত্তর দিলেন, “তৌহিদ, তোমার কান্ডজ্ঞান কম তা আমার আগেই জানা ছিল কিছুটা। কিন্তু আজ বুঝলাম ও বস্তু তোমার মাঝে একেবারেই নেই। ড্রাগন কি চাট্টিখানি কথা যে তুমি খাঁচায় আটকে রাখবে? অমন খাঁচাই বা পাবে কোথায়?”

dharajadu02 (Medium)

তৌহিদ আহমেদ জবাব দেন, “কেন স্যার? ড্রাগন কী খাঁচায় রাখা যাবে না?”

তোবারক আলী বললেন, “ওসব তোমার ফিল্মের ড্রাগন নয়। খাঁচাফাচা নিয়ে উড়ে যাবে। সত্যিকার ড্রাগন তো দেখ নি তাই খাঁচা খাঁচা করছ। ছোটখাটো একটা বাচ্চা ড্রাগন একটা শহর লন্ডভন্ড করে দিতে পারে।”এরকম হঠাৎ হঠাৎ স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা তোবারক আলীর সাথে জাদুরাজ্য নিয়ে মজার সব প্রশ্ন করতেন, আর তারপর উপযুক্ত জবাব পেয়ে চুপ হতেন।

কেউ যে তাঁর কথায় বিশ্বাস করছে না তাও বুঝতেন তোবারক আলী। মাঝে মাঝে বলতেন, “তোমরা আমার কথা বুঝলে না। কথায় আছে না, তোমার ভিতরে অসাধারণ কোন সম্পদ থাকলে তা যদি সবাইকে বলে বেড়াও তাহলে কেউই বিশ্বাস করবে না।” তোমাদের দেখে বুঝলাম কথাটা সত্যি।” উঁচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরাও জাদু রাজ্যের গল্পগুলো বিশ্বাস করত না। শুধু নিচু ক্লাসের কেউ কেউ বিশ্বাস করত। তারা রাতে জাদুরাজ্য নিয়ে, ড্রাগন নিয়ে, বিষাক্ত বড় মাথাওয়ালা সাপ নিয়ে অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখত।

তোবারক আলী যে সবসময় জাদুরাজ্যের গল্প বলে যেতেন এমন নয়। হঠাৎ হঠাৎ বলতেন তিনি। গল্পগুলো রাতুল কোনদিনই বিশ্বাস করে নি। তবে সেগুলো শুনতে মজা লাগত তার।

এবারের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার প্রধান অতিথি হিসেবে অদ্ভুত এক লোককে খুঁজে বের করেছেন তোবারক আলী। হ্যাংলা পাতলা লম্বা চেহারা। দেখলে মনে হয় কুঁজো হয়ে আছে। পড়নে কালো আলখেল্লা, মাথায় কালো বাঁকানো হ্যাট। হাতে বাঁকানো একটা লাঠি। লোকটার সামনের পাটির তিনটি দাঁতই নেই। কথা বলার সময় ফ্যাস ফ্যাস শব্দ হয়। তোবারক আলীর ভাষ্যমতে, এই লোক নাকি ভয়ংকর এক জাদুকর। অন্যান্য শিক্ষকেরা এবং ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকেরা মুখ টিপে হাসলেন। কিন্তু কেউ কিছু বলতে সাহস করলেন না। প্রধান শিক্ষক তোবারক আলী রেগে গেলে পুরো অনুষ্ঠানটাই পন্ড হয়ে যাবে।

প্রতিযোগিতা শুরু হল। বিভিন্ন ইভেন্টে ছাত্রছাত্রীরা অংশগ্রহণ করল। শিক্ষক শিক্ষিকা ও ভলান্টিয়ার ছাত্র ছাত্রীরা নিয়ম শৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন করতে লাগলেন। রাতুল হাই জাম্প, লং জাম্প, দৌড় আরো কি কি যেন খেলায় অংশ নিয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় সবকটিতেই সে শেষের দিক থেকে প্রথম হল। দৌড়ে মাঝপথে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল, হাইজাম্পে ছিঁড়ে গেল প্যান্ট আর লংজাম্পে পা’টা সামান্য মচকে গেল। এই অ্যানুয়াল স্পোর্টস নিয়ে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ ছিলো তার। কিন্তু সে কোন খেলাতেই ভালো করতে পারল না। তার অবস্থা এমন হয়েছিল যে, তার মনে হচ্ছিল সবাই যেন তার দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।

যখন পুরস্কার ঘোষণা হচ্ছিল, সে এক কোণে বসে রইল। একে একে তার বন্ধুরা পুরস্কার নিয়ে এল। জাদুকর অতিথি খুব অদ্ভুতভাবে পুরস্কার দিচ্ছিলেন। জাদুর বাক্সে হাত ঢুকিয়ে কাউকে খেলনার পুতুল, কাউকে খেলনা গাড়ি, কাউকে ক্রিকেট ব্যাট। একই সাথে যেন পুরস্কার প্রদান এবং ম্যাজিক চলছিল। এমন অদ্ভুত পুরস্কারপ্রদান কেউ দেখেনি এর আগে। প্রতিটি পুরস্কার দেয়ার সাথে সাথে চলছিল হাততালি। জাদুকরের পুরস্কার দেয়ার অভিনব জাদুকরী পদ্ধতি দেখে অভিভূত সবাই। অভিভাবক এবং শিক্ষক-শিক্ষিকারা বুঝতে পারলেন হেডমাস্টার তোবারক আলী কেন এই লোকটিকে প্রধান অতিথি হিসেবে নিয়ে এসেছেন। তোবারক আলীর বুদ্ধি ভালো। একসাথে পুরস্কার প্রদান এবং সবাইকে ম্যাজিক দেখানোর আইডিয়াটা মন্দ না কোনমতেই।

পুরস্কার প্রাপ্তরা পুরস্কার নিয়ে ছবি তুলছে। তার মা বাবারা হাসিহাসি মুখে ছেলেদের সাথে গ্রুপ ছবি তুলছেন। রাতুলের এই সময় তার মা বাবার কথা মনে হল। চারপাশে তাকিয়ে দেখল তার মা কিংবা বাবা কেউই আসেননি। তাঁরা আলাদা থাকেন। দুজনের আলাদা সংসার। রাতুলের নিজেকে মনে হয় তাঁদের মধ্যেখানের এক উদ্ভট সমস্যার মত। রাতুল যখন খুব ছোটো- ক্লাস ফোরে পড়ে- তখন এক রাতে কী একটা কারণে তার মা রাগ করে বাড়ি থেকে চলে যান। আর ফিরে আসেননি।

সে স্কুলের হোস্টেলেই থাকে। বছরে একবার মায়ের পরিবারে, একবার বাবার পরিবারে থাকতে যায়। এক সপ্তাহের মত দুই পরিবারেই থাকে। কিন্তু তার ভালো লাগে না। একসময় তার এসব ব্যাপারে খারাপ লাগত। সবাই তাদের মা বাবার সাথে থাকতে পারে, সে কেন পারে না ইত্যাদি ভেবে তার মন খারাপ হত। কিন্তু ধীরে ধীরে সে মেনে নিয়েছে। তার বয়স এ বছর তেরো হবে। সে এখন অনেক কিছুই বুঝতে পারে।

পুরস্কার বিতরণ শেষ হয়ে গেছে। লোকজন চলে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। রাতুল মনমরা হয়ে এককোণে বসেছিল। বাসায় যাওয়ার তাড়া নেই তার। তাই মাটিতে বসে মাথা নিচু করে জুতো খুলে জুতোর ফিতে ধরে বসেছিল সে। তখনই খুব দুর্বল একটা গলার আওয়াজ সে শুনতে পেল। কে যেন জিজ্ঞেস করছে, “তুমি এখানে বসে আছ কেন?” সে সামনে তাকিয়ে দেখল জিজ্ঞেস করছেন সেই জাদুকর। তাঁর কালো আলখেল্লা, কালো বাঁকানো হ্যাট এবং রোগা শরীর এত কাছ থেকে দেখে অদ্ভুত লাগছিল। লোকটির চোয়াল ভাঙা হলেও তার চোখদুটি নীল মার্বেল পাথরের মত।

রাতুল বলল, “এমনিই বসে আছি।”

জাদুকর হাসলেন। হাসার ফলে তাঁর সামনের পাটির তিনটে দাঁত নেই তা দেখা গেল। দেখে রাতুলের কিছুটা হাসি পেল।

জাদুকর বললেন, “চকলেট নেবে?”

রাতুল বলল, “না, অপরিচিতদের কাছ থেকে আমি কিছু খাই না।”

জাদুকর হাসিমুখে বললেন, “আমি কি খেতে বলেছি। নেবে কি না বল? এ কিন্তু সাধারণ চকলেট না, জাদু চকলেট।”

জাদুর চকলেট! রাতুলের আগ্রহ হল। বলল, “জাদুর চকলেটে কী হয়?”

জাদুকর বললেন, “অনেক কিছুই হয়। যেমন, চকলেটের গাছ হয়, সে গাছে চকলেট ধরে।”

রাতুল অবিশ্বাসী সুরে বলল, “চকলেট গাছে ধরে না আমি জানি। আপনি আমাকে বোকা বানাতে চাইছেন। আমি আপনার চকলেট নেব না।”

জাদুকর বললেন, “শোন রাতুল, তুমি বা আমি কিছুই জানি না। এই যে পৃথিবী দেখছ এর বাইরে ঐ মহাশূন্যে আরো অনেক অনেক গ্রহ আছে। সেখানে তোমার আমার চেয়েও বুদ্ধিমান প্রাণীরা আছে। তার কতটুকুই বা আমরা জানি বল? আমি বা তুমি জানিনা বলেই কি তাদের অস্তিত্ব নেই হয়ে যাবে? চকলেটেরও গাছ হতে পারে তা তুমি জানো না। এজন্যই তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না। কিন্তু তাই বলে চকলেট গাছের গল্প তো আর মিথ্যে হয়ে যায় না! তবে যাইহোক, তোমাকে আমি চকলেট এমনি এমনি দিচ্ছি না। পুরস্কার হিসেবে দিচ্ছি।”

রাতুল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কীসের পুরস্কার?”

জাদুকর তাঁর বাঁকানো লাঠিটা শূন্যে একবার ঘুরিয়ে বললেন, “আমি দেখেছি তুমি প্রায় সবকটা খেলাতেই অংশ নিয়েছ। যদিও জিততে পারোনি। তবে তুমি চেষ্টা করার আগেই হেরে যাওনি। জেতার জন্য চেষ্টা করেছ, অংশ নিয়েছ। এজন্য তোমার পুরস্কার পাওয়া উচিত।”

এই প্রথম রাতুল কিছুটা খুশি অনুভব করল। কেউ একজন তাহলে বুঝতে পেরেছে তাকে। সে কৃতজ্ঞ স্বরে বলল, “তাহলে আমি চকলেট নিতে পারি।”

জাদুকর শূন্যে কয়েকবার তাঁর বাঁকানো লাঠিটা ঘুরালেন। তারপর যেন বাতাস থেকেই বের করে আনলেন চকচকে কাগজে মোড়ানো একটি ক্যান্ডিবার। রাতুলের হাতে চকলেট দিতে দিতে তিনি বললেন, “এটা কিন্তু জাদুর চকলেট। খেয়ে তুমি এর ভিতরে একটি বীজ পাবে। সে বীজ পূর্ণিমা রাতে চাদের আলোয় মাটিতে পুঁতে দিলে হয়ত চকলেটের গাছ হতে পারে। পৃথিবীতে এর আগে এই গাছ হয় নি। তাই আমি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না।”

রাতুল চকলেট নিতে নিতে বলল, “আপনি কোথায় থাকেন?”

জাদুকর সামান্য হেসে বললেন, “আমি কোথায় থাকি তা এখন তোমাকে বলতে পারছি না। নিষেধ আছে। তবে একসময় তুমি সব জানতে পারবে। আমাদের সবার জগতই খুব রহস্যময়। সব রহস্যের সমাধান হয় না। তবে কেউ কেউ এসব রহস্যের মূল কিছুটা দেখতে পায়। প্রকৃতি বা মহাবিশ্ব তার নিজের প্রয়োজনেই কাউকে কাউকে তার রহস্যের কিছুটা জানতে দেয়।”

রাতুল জাদুকরের কথা ভালোমত বুঝতে পারল না। সে চকলেট হাতে নিয়ে ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখতে লাগল। এত দারুণ কাগজে মোড়ানো চকলেট সে জীবনে কখনো দেখে নি। দেখে এত লোভ হল যে সে তখনই প্যাকেট খুলে চকলেট বারটি বের করে ফেলল। তারপর  সামনে তাকিয়ে তার হতবাক হওয়ার মত অবস্থা! সেখানে কেউ নেই!

হাতের চকোলেটে কামড় বসাতে বসাতে, চকচকে প্যাকেটটা পকেটে নিয়ে, আরেক হাতে জুতাজোড়া নিয়ে রাতুল চলল তার হোস্টেলের দিকে। তখন বিকেল হয়ে আসছে। হোস্টেল চারতলা ভবন দেয়ালঘেরা স্কুলের ভেতরেই।

হোস্টেলে পৌছানোর আগেই পুরো চকলেট শেষ। যেহেতু জাদুর চকলেট তাই এর স্বাদও অনন্য। এমন চকলেট সে আর কখনো খায়নি। খেতে খেতে এতই ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল যে মুখে লোহার মত শক্ত কী একটা ঠেকল বুঝতে পারল না। তাতে মহাজোরে কামড় বসিয়ে বেজায় ব্যথা লাগতে তার ঘোর ভাঙল। মুখ থেকে বস্তুটা ফেলে দেখল প্রায় এক ইঞ্চি লম্বা এক পাথরের মত জিনিস। রঙ কুচকুচে কালো। একেই জাদুকর তাহলে বলেছিল চকলেট বীজ!

নিচু হয়ে বীজটা তুলে নিয়ে পকেটে ঢোকাবে এমন সময় কোরেশি ম্যাডামের বাজখাঁই গলার আওয়াজে সে কেঁপে উঠল, “এই রাতুল! কোথায় ছিলে তুমি? পুরো স্কুলে তোমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!”

“ম্যাম, এই মাঠের দিকে ছিলাম…”

“তোমার হাতে ওটা কী? পাথর? রুম নোংরা করার জন্য ইট পাথর লতাপাতা নিয়ে আস কেন! এসব ফেলে দিয়ে গোসল করে ফ্রেশ হও।”

কোরেশি ম্যাডাম হোস্টেলের দুই নাম্বার ফ্লোর অর্থাৎ ক্লাস সেভেনের দায়িত্বে আছেন। রাতুল শুনেছে তাঁর শুচিবায়ু আছে। ময়লা আবর্জনা দেখতে পারেন না। তাছাড়া ম্যাডামের রাগ স্কুলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ছাত্রছাত্রীদের সবাই তাঁকে ভয় পায়। তিনি বেশি রেগে গেলে যেকোন ক্লাসের ছাত্র বা ছাত্রীকে চড় মারতে দ্বিধাবোধ করেন না। প্রতিটি স্কুলেই অবশ্য এরকম মেজাজি দু-একজন শিক্ষক-শিক্ষিকা থাকেন। 

dharajadu01 (Medium)

কোরেশি ম্যাডাম রাতুলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। এই মুহুর্তে হাতের বস্তুটি না ফেলে দিলে আর রক্ষা নেই। রাতুল অসহায় বোধ করল। তার মনে হল জাদুকরের কথা। এ চকলেটের বীজ থেকে জাদুর চকলেট গাছ হবে। কিন্তু ফেলে দিলেই তো শেষ। এভাবেই কি জাদুর গাছ হাতে এসে চলে যাবে?

ম্যাডাম গর্জে উঠলেন, “কথা কানে যায় না? যা বলেছি, করো। তাড়াতাড়ি গোসল করে পরিষ্কার হও। সন্ধ্যায় গোসল করলে ঠান্ডা লাগবে। তখন ডাক্তার দেখাও, ওষুধ খাওয়ায়, আরেক হ্যাপা!”

রাতুল বুঝল চকলেটের বীজটা ধরে রাখার আর কোন উপায় নেই। আরেকটু দেরি হলে ম্যাডাম কী করবেন বলা যায় না। কিন্তু সে-ও হাল ছেড়ে দেবার মত ছেলে না। তাই বুদ্ধি করে শেষ চেষ্টা করল। জানালার কাছে গিয়ে বাঁ পকেটে হাত দিয়ে চকচকে কাগজটা নিয়ে তাতে চকলেটের বীজটা ঢুকিয়ে খুব দ্রুত ভাঁজ করল। এখন প্রায় প্যাকেটের মত হয়ে গেছে। খুঁজলে চকচকে পকেটের কারণে ঘাসের মধ্যেও পাওয়া যাবে।

পিছন থেকে ম্যাডাম গর্জে উঠলেন, “কী হল? ফেলতে এত দেরি কেন?”

চিৎকার শুনে রাতুল কেঁপে উঠল। কাগজসহ বীজটি জানালা দিয়ে ফেলে দিল। তাকিয়ে দেখল জানালা দিয়ে কাগজসহ বীজটা নিচে গিয়ে সবুজ ঘাসের মধ্যে পড়ছে। ম্যাডাম বললেন, “যাও, গোসল করে রেস্ট নাও। সন্ধ্যার নাশতার পর পড়তে বসবে। আর তোমার রুমেই তো একটা নতুন ছেলে এসেছে গতকাল?”

রাতুলের রুমে আরেকটি ছেলে ছিল। আবির। ক্লাস সিক্স থেকে তারা রুমমেট হিসেবে ছিল। কিন্তু গতকাল খুব অদ্ভুতভাবে আবিরকে অন্য রুমে সরিয়ে নতুন একটা ছেলেকে রাতুলের রুমে নিয়ে এসেছেন হেডমাস্টার তোবারক আলী। এ ব্যাপারে রাতুল যথেষ্ট অবাক হয়েছে। নতুন ছেলেটার ব্যাপারে রাতুল তেমন বেশি কিছু জানে না। কোন একটা স্কুলে বেশ ভালো ছাত্র ছিল নাকি। এই স্কুলে নতুন ভর্তি হয়েছে। হেডমাস্টার স্যার বলেছেন, “রাতুলের সাথে থাকলে ও পড়ালেখায় মনযোগ দিতে পারবে।”

রাতুল ম্যাডামকে বলল, “জি ম্যাডাম।”

ম্যাডাম বললেন, “আচ্ছা, কোন অসুবিধা হলে আমাকে জানাবে। ছেলেটাকে একটু দেখে রেখো। হেডস্যারের কীভাবে যেন পরিচিত হয়।”

রাতুল আবার বলল, “জি ম্যাডাম।”

ম্যাডাম বললেন, “এবার যাও। গিয়ে গোসল করো।”

রাতুল তৃতীয়বারের মত বলল, “জি ম্যাডাম।” তারপর সে সিঁড়ি ভেঙে চলে যেতে লাগল তার রুমে।

দ্বিতীয় অধ্যায়

রাতুলের হোস্টেলের বর্ণনা দি একটু। তার নতুন রুমমেটের নামে আকাশ। ছেলেটা এসেছে আজ দ্বিতীয় দিন চলছে। স্বাস্থ্যবান চেহারা। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। চেহারায় ব্রিলিয়ান্ট ছাপ আছে।

হোস্টেলের সব রুমেই দুজন করে থাকে। নিচের ফ্লোরে ক্লাস সিক্স। তার ওপরের ফ্লোরগুলোতে পরপর এইট নাইন আর টেন। প্রতিটি রুমে দুটো করে  স্টিলের ছোটো আলমারি,  টেবিল আর খাট। রুমের সাথে লাগোয়া একটা ছোটো বাথরুম। খাওয়ার জন্য প্রতি ফ্লোরেই একতা বড়ো হলরুম। সেখানে প্রায় পঞ্চাশজন একসাথে বসে খাওয়া যায়। সকালে নাশ্‌তার সময়, দুপুর আর রাতের খাবার সময় সবাইকে সেই খাওয়ার ঘরে যেতে হয়। শুধু সন্ধ্যার নাশ্‌তা  রুমে দিয়ে যায় স্টাফরা। প্রতি ফ্লোরেই কিছু রুম খালি পড়ে আছে। সেগুলো বাইরে থেকে তালাবন্ধ থাকে। হোস্টেলে ছাত্রদের মধ্যে চালু কথা, সেগুলোতে ভূত থাকে। যদিও এতে যে সবাই বিশ্বাস করে এমন নয়।

রাতুল রুমে এসে দেখল আকাশ তার টেবিলে বসে খাতায় কী যেন লিখছে। রাতুলের মন খারাপ ছিল। তাই সে কিছু না বলে বাথরুমে ঢুকে গোসল করল। গোসল শেষ হল প্রায় মিনিটদশেকের মধ্যে। বের হয়ে দেখে তখনো আকাশ খুব গম্ভীরভাবে খাতায় লিখে চলেছে।

রাতুল কৌতুহল দমিয়ে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, “কী লিখছো?”

আকাশ মুখ তুলে বলল, “একটা জটিল হিসেব।”

রাতুল তোয়াল দিয়ে শরীর মুছতে মুছতে খাটে বসে বলল, “কীসের হিসাব?” আকাশ এবার ঘুরে বসল। চিন্তিত মুখে বলল, “ভূতের হিসাব। আমাদের হোস্টেলে যেসব ভূত আছে তাদের ভূতুসংখ্যা বৃদ্ধির হার বের করছি। ভূতুসংখ্যা কী জানো তো?”

“না, জানিনা। এর আগে কখনো শুনি নি।”

“ভূতুসংখ্যা হচ্ছে মোট ভূতদের সংখ্যা। মানুষের যেমন জনসংখ্যা, ভূতদের তেমনি ভূতুসংখ্যা। কোন জায়গায় কতটা ভূত আছে তা জানতে ভূতুসংখ্যার হার জানা খুব প্রয়োজন।”

রাতুল জিজ্ঞেস করল, “এসব করতে তোমাকে কে বলেছে?”

আকাশ আমতা আমতা করে বলল, “কে বলবে আবার? সামাজিক বিজ্ঞানের জনসংখ্যা চ্যাপ্টার পড়তে গিয়ে প্রথম ব্যাপারটা আমার মাথায় আসে। তখন থেকেই ভাবছি। ভূতুসংখ্যার হারটা বের করতে পারলেই একটা মহা আবিষ্কার হয়ে যেত।”

রাতুল ততক্ষণে টি শার্ট পরে নিয়েছে। সে বিছানায় বসে থেকেই বলল, “আমাকে সত্যি করে বল। আমি কাউকে বলব না। এসব তোমাকে কে করতে বলেছে?”

আকাশের মুখটা অসহায়ের মত হয়ে গেল।একটু ঝুঁকে এসে আস্তে আস্তে বলল, “রিমন, সিয়ামি আর মুস্তাফিজ। তারা বলেছে এই হোস্টেলের সব খালি রুমে ভূত থাকে। তাদের সংখ্যা জানার জন্য ভূতুসংখ্যার হার জানা দরকার। আমি যদি আজ রাতের মধ্যে বের করতে না পারি তাহলে তারা আমাকে একটা খালি রুমে আটক করে রাখবে।”

এই ফ্লোরে সব ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রজাতির তিন ছেলে হল রিমন, সিয়ামি ও মুস্তাফিজ। এরা সবসময় একসাথে থাকে। হোস্টেলে নতুন কেউ এলে তার জীবন অতিষ্ট করে তোলার জন্য এমন কোন দুষ্টুমি নেই যা তারা করে না। ভয় দেখানো, নাম বিকৃত করা, গায়ে পড়ে ঝগড়া লাগানো এইসব করে করে তারা নতুন আসা ছেলেদের প্রথম কয়েকটা দিন দুর্বিসহ করে তোলে। একবার হাসিব নামে একটা ছেলে এসেছিল। তখন তারা ক্লাস সিক্সে পড়ে। ছেলেটা ছিল একেবারে ভিতু প্রকৃতির। তায় বাড়ি ছেড়ে নতুন হোস্টেলে এসেছে। এমনিতেই নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে বেশ অসুবিধা হয়।

রিমন প্রথম দিনই ছেলেটার নাম দিল “হিসু’’! ডাক দিল, “এই হিসু এদিকে আয়।”

হাসিব ভয়ে ভয়ে সামনে যেতেই সিয়ামি বলল, “বল তর নাম কী?”

হাসিব বলল, “হাসিবুর রহমান।”

সিয়ামি বলল, “পুরো নাম বল।”

হাসিব ভয়ে ভয়ে বলল, “এটাই পুরো নাম।”

তখন রিমন এগিয়ে এসে বলল, “না, তোর বাবা যখন তোকে ভর্তি করিয়ে দিয়ে যান তখন আমি রেজিস্টার অফিসের কাছে ছিলাম। আমি শুনেছি তিনি বলছেন, আমার ছেলের নাম হাসিবুর রহমান হিসু। সে বিছানায় হিসু করে দেয় তো, তাই এই নাম।”

হোস্টেলের অন্য ছেলেরাও নতুন ছেলেদের সাথে মজা করতেই পছন্দ করে। কয়েকজন অবশ্য ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু বেশিরভাগেরই মনোভাব রিমনদের মত। তবে অন্য সবাই রিমনদের মত এগিয়ে এসে মজা করার সাহস পায় না স্যার ম্যাডামদের ভয়ে। কিন্তু মজা করা হলে দাঁত বের করে ঠিকই হাসে।

যখন হাসিবের নাম হিসু করা হলো তখন সবাই হো হো করে হাসল। হাসিব যতই বলে এটা তার নাম না ততই তারা আরো বেশি বলে ‘হিসু হিসু’!

পরদিন সকালে হাসিবের রুমে সবাই উৎসুক হয়ে ছুটে যায়। রিমন তাদের বলে দিয়েছে, “যারা আমার কথা বিশ্বাস করিস নি, যা গিয়ে দেখে আয়। হিসু বিছানায় হিসু করে বসে আছে। এই রিমন ভাই মিথ্যা বলে না।”

হাসিবের রুমে এসে সবাই দেখতে পেল তার বিছানা ভেজা। কারো বুঝতে বাকি রইল না কাজটা রিমনের কারসাজিতে হাসিবের রুমমেটই করেছে। বিছানায় পানি ঢেলে। কিন্তু তবুও হাসির রোল বয়ে গেল।

হিসু হিসু ডেকে ছেলেটাকে অতিষ্ট করে তোলা হয়েছিল। এক পর্যায়ে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাসিব এখনো আছে। ক্লাস সেভেনে পড়ে। হোস্টেলেই থাকে। সবাই মাঝেমধ্যে তাকে হিসু ডাকলেও সে মানিয়ে নিয়েছে। আরেকটি ছেলেকে একবার ভূতের ভয় দেখিয়েছিল রিমনরা কয়েকজন। ছেলেটা ভয়েই অজ্ঞান হয়ে যায়। তারপর মুখে পানি টানি ঢেলে জ্ঞান ফেরাতে হয়েছিল।  এসব ব্যাপারে স্যারদের নালিশ জানায় না কেউ ভয়ে। এই হোস্টেলের প্রথম কয়েকদিন যে বিভীষিকার সৃষ্টি করে রিমন, মুস্তাফিজ ও সিয়ামি তা আসলে বর্ণনা করে বোঝানো যাবে না। যে এখানে থেকেছে সেই কেবল বুঝতে পারবে পুরোপুরি।

তবে রাতুল এসব একেবারেই পছন্দ করে না। রিমন, সিয়ামি, মুস্তাফিজের এসব কর্মকান্ডে সবাই মজা নিলেও সে কয়েকবার নতুন ছেলেদের সাহায্য করেছিল। এ নিয়ে রিমনদের সাথে তার বিরোধ। কয়েকবার হালকা হাতাহাতি হবারও উপক্রম হয়েছিল। সুতরাং, তার রুমে আসা নতুন ছেলেটাকে রিমনরা ভয় দেখাতে সাহস পাবে না এমনই ধারণা ছিল রাতুলের। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তার অজান্তেই ছেলেটাকে ভূতের অংক দিয়ে রেখেছে তারা। হোস্টেলে ছাত্ররা ঢোকে বোকা হয়ে আর বের হয়ে যায় তার বিপরীত কিছু হয়ে। আকাশ ছেলেটাও একেবারেই সাদাসিদে, দেখেই বোঝা যায়।

রাতুল আকাশকে বলল, “তুমি এসব অংক করা বাদ দাও। ওরা তোমার কিছুই করতে পারবে না। আমি দেখব। তুমি ক্লাসের পড়া পড়ো।”

*****

সন্ধ্যার নাশ্‌তার পর রাতুল যখন বিছানায় শুয়ে ভাবছিল সেই চকলেটের কথা ঠিক তখন রুমের মধ্যে প্রায় হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল রিমন, সিয়ামি, মুস্তাফিজ ও আরো কয়েকজন।

রিমন নতুন ছেলে আকাশের টেবিলের কাছে গিয়ে বলল, “দেখি আকাশ, তুমি ভূতুসংখ্যার হার বের করতে কতদূর এগিয়েছ?”

খাতা হাতে নিয়ে তারা দেখল সেখানে ক্লাসের অংক করা। রিমন খাতাটা টেবিলে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “এসব কী? তোকে বললাম কী করতে? জানিস না তুই ভূতের উৎপাতে আমরা থাকতে পারছি না? একটা কাজ করতে বললাম, তাও করছিস না। এর পরিণতির কথা কি ভুলে গিয়েছিস?”

রাতুল বিছানায় উঠে বসে বলল, “এখানে কী হচ্ছে?”

সিয়ামি বলল, “দেখ রাতুল, তোর সাথে আমাদের কোন কথা নেই। তুই চুপচাপ শুয়ে থাক।”

পাশ থেকে মুস্তাফিজ বলল, “না হলে পড়তে বস। আমরা এখন ভূতুসংখ্যার হিসেব নিয়ে আছি। আমাদের হোস্টেলে আসা ইয়েলো বার্ড স্কুলের সাবেক ফার্স্ট বয় আকাশ ভূতুসংখ্যার বৃদ্ধির হার বের করবেন।”

সবাই হেসে উঠল। আকাশ ভয়ে চুপসে গেছে। কোন কথাই বলতে পারছে না। সম্ভবত তার জীবনে সে এমন অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি এর আগে কখনো হয়নি। রিমন আকাশের মাথার পিছনের দিকে এক হালকা চড় দিয়ে বলল, “ভূতের অংক না করলে তোকে আজ রাতেই ভূত দিয়ে খাওয়াব। ভূত এমন গাঁট্টাগোঁট্টা মানুষ পেলে খুশি হয়ে খাবে।”

সিয়ামি আকাশের মাথায় চাটি দিয়ে বলল, “বুঝেছ মাথামোটা সায়েন্টিস্ট? এটা ভূতের হোস্টেল। এখানে নিয়মকানুন আছে। সব মেনে চলতে হবে।”

মুস্তাফিজ বলল, “আমাদের কবি বন্ধু শফিকুর একটি ভূত ও সায়েন্টিস্ট আকাশকে নিয়ে কবিতা লিখেছে। আমি তাকে কবিতাটি পড়ে শোনাতে আহ্বান করছি।”

dharajadu03 (Medium)

পেছন থেকে চশমাওয়ালা ছেলে শফিকুর এগিয়ে এল। সে ক্লাসে কবি হিসেবে পরিচিত। কবি বলে সে নিজের ছদ্মনাম রেখেছে শান্ত শফিকুর। কবিদের নাকি ছদ্মনাম থাকতে হয়। শান্ত শফিকুরের হাতের কাগজে লেখা কবিতা। সে পড়তে লাগলঃ

কবি শান্ত শফিকুর। ক্লাস সেভেন। কবিতার নাম, ভূতকাব্য-১

 

কবিতা শেষ হতেই সবাই হাততালি দিতে শুরু করল। রাতুল তাকিয়ে দেখল এদের অদ্ভুত কার্যকলাপে আকাশ ছেলেটা ভয় ও অস্বস্তিতে কুঁকড়ে যাচ্ছে। সে আর থাকতে পারল না। উঠে চিৎকার করে বলল, “তোরা সবাই আমার রুম থেকে বেরিয়ে যা।”

হাততালি থেমে গেল। সিয়ামি বলল, “চ্যাঁচাচ্চিস কেন? আস্তে বললেই তো হয়।”

ঝামেলা বাঁধার উপক্রম দেখে ইতিমধ্যেই পেছনের দুয়েকজন নিজের রুমের দিকে হাঁটা দিয়েছে। রাতুল বলল, “আমি এক থেকে তিন গুণব। এর মধ্যে তোদের একজনও যদি রুমে থাকিস তাহলে যা যা করেছিস সব বলে ম্যাডামের কাছে নালিশ দেব। সব ক’টা টিসি খাবি।”

টিসি হচ্ছে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট। কয়েকজন স্যার কথায় কথায় টিসি দেয়ার হুমকি দেন। টিসি নিয়ে এত গল্প প্রচলিত আছে যে বস্তুটি যে খুব ভয়াবহ সে ব্যাপারে স্কুলের সবারই কমবেশি ধারণা আছে।

মুস্তাফিজ বলল, “আমরা কী করেছি যে টিসি খাবো? বন্ধু শফিকুর একটা কবিতা বলেছে শুধু।”

রাতুল বিছানা থেকে উঠে গিয়ে কবি শান্ত শফিকুরকে ধরতে চাইল। কবি শান্ত শফিকুর আগেই বুঝতে পেরেছিল। সে দৌড়ে পালাল। রাতুল উঠেছে দেখে আরো কয়েকজনও রুম থেকে চলে গেছে।

মারামারি রাতুলের ভালোই রপ্ত আছে এটা ক্লাসের সবারই জানা। সে আবার বলল, “এই ছেলে হেডস্যারের পরিচিত। ম্যাডাম আমাকে বলেছেন একে দেখে রাখতে। কেউ কিছু করবি তো সোজা নালিশ যাবে।”

রাতুলের বলার ভঙ্গি এমন ছিল যে কেউ আর থাকতে সাহস পেল না। শুধু যাওয়ার আগে রিমন বলল, “নতুন ছেলেটার সামনে আমাদের অপমান করলি! এর প্রতিশোধ নেব।”

রাতুল বলল, “যা যা, দূর হ।”

ওরা চলে যাবার পর দরজা ভেজিয়ে এসে রাতুল দেখল আকাশ ভয়ার্ত মুখে তাকিয়ে আছে। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে সে বলল, “ভয় পেও না। হোস্টেলে নতুন কেউ এলে এরা কিছুদিন এরকম করে। ভূত বলতে কিছু নেই। বুঝলে?”

আকাশ মাথা নেড়ে বলল, “আমার মামা বলেছে ন্যাড়া ভূত আছে।”

রাতুল বলল, “ঠিক আছে। তবে এখানে এসে সে ভূত তোমার পেছনে লাগবে না। আর তোমাকে এখন থেকে আমি তুই করে বলব। তুমিও আমাকে তুই বলতে পারো। এখানে একই ক্লাসের কেউ কাউকে তুমি করে বলে না।”

আকাশ বলল, “ঠিক আছে। কিন্তু ওরা যদি আবার আসে?”

রাতুল বলল, “আসবে না। ওরা ভয় দেখিয়ে মজা করতে আসে। ভয় না পেলেই মজা করতে পারবে না। এছাড়া আমি ম্যাডামের কথা বলেছি। সুতরাং, আর কখনো আমার সামনে রুমে এসে তোর সাথে লাগবে না। আর আমি না থাকলেও যদি কোথাও এরকম করে তাহলে ভয় পাবি না। একই ক্লাসের ছাত্রকে আবার ভয় কীসের?”

আকাশ কিছুটা সন্তুষ্ট হয়ে পড়তে বসল। রাতুল তার টেবিলে গিয়ে বসে আবার ভাবতে লাগল সেই চকলেটের কথা। এই একটি চিন্তাই আজ তার মাথায়। সত্যিই কি চকলেটের বীজ থেকে গাছ হয়? কাল কি বীজটা সে খুঁজে পাবে?

রাতুল পেন্সিল দিয়ে কাগজে একটি গাছের ছবি আঁকতে লাগল। চকলেটের গাছ। ডালপালা সমেত এক ঝাঁকড়া গাছের ছবি আঁকল সে। সেই গাছের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে কয়েকটা পাখি। গাছের পাশে সে আঁকল একটি নদী। নদীটি এঁকেবেঁকে চলে গেছে।

ক্রমশ

অলংকরণঃ অতনু দেব

জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিকের সমস্ত পর্ব একসঙ্গে এইখানে