ধারাবাহিক উপন্যাস তথাগত নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তী শরৎ ২০১৯

প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব

নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তী

পর্ব – ৪

গৃহত্যাগ

মধ্য রাত্রি। দুধ সাদা জ্যোৎস্নায় পথঘাট যেন আলোকিত হয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। মেঘ মুক্ত আষাঢ়ের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ এক অপূর্ব দীপ্তিতে উদ্ভাসিত। শাল ও মুচকুন্দ চাঁপা ফুলের সুগন্ধে সুরভিত হয়ে আছে রাতের বাতাস। প্রকৃতিতে এই রাতে যেন এক মহান উৎসব পালিত হচ্ছে। চাঁদের আলোর উজ্জ্বল দীপ্তিতে, ফুলের সৌরভে যেন আজ তারই ঈঙ্গিত। দিনটি আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথির উত্তরাষাঢ়া নক্ষত্র। রাজপুত্র সিদ্ধার্থ কপিলাবস্তুর রাজবাড়ি ছেড়ে, অনেকটা পথ তাঁর ঘোড়া কন্থককে নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। তাঁর সঙ্গে আছে তাঁর সারথী ছন্ন। ছন্ন সিদ্ধার্থের সমবয়স্ক। দুজনের জন্মই একইদিনে বৈশাখী পূর্ণিমায়। সিদ্ধার্থের সঙ্গে কপিলাবস্তুর রাজবাড়িতে সেদিন জন্মেছিল এই কন্থক অশ্ব এবং সারথি ছন্ন। সিদ্ধার্থের বয়স এখন ঊনতিরিশ।

এই তরুণ সিদ্ধার্থ সুঠাম ও দীর্ঘদেহী। তাঁর গায়ের রঙ স্বর্ণাভ, উন্নত নাক আর অপূর্ব সুন্দর দুটি চোখ। সংসারে মানুষের প্রতিদিনের দিনযাপনের কালিমা তাঁকে চিন্তিত ও দুঃখময় করে তুলেছে। আজ তিনি রাজপরিবারের ভোগ সুখের মধ্যে থেকে চিরদিনের মতো মুক্তি চান।

রাতে কপিলাবস্তু নগরের দরজা বন্ধ থাকে। আঠেরো হাত উঁচু নগরের পাঁচিল ঘোড়ার পিঠে চেপে লাফ দিয়েই পার হবেন ঠিক করলেন রাজপুত্র। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে তিনি দেখলেন, নগরের দরজা কোন এক অজ্ঞাত কারণে খোলা আছে। এমন হওয়ার কথা নয়, এ নিশ্চয় দৈব কৃপা লাভ করেছেন তিনি! একথা মনে করে, সিদ্ধার্থ সন্তুষ্ট মনে দ্রুত বেগে ঘোড়া ছোটালেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁকে কপিলাবস্তু ছেড়ে এগিয়ে যেতে হবে। ছন্ন ঘোড়ার পিঠে তাঁর পেছনে সওয়ার হয়েছে। ছন্নর মন আজ বড় বিষণ্ণ। সিদ্ধার্থর সঙ্গে এতদিনে তার বিচ্ছেদ হতে চলেছে। জন্মের পর থেকে সে ছায়ার মতো সর্বক্ষণ সিদ্ধার্থের সঙ্গে সঙ্গে থেকেছে। আজ সকালে সে যখন রাজপুত্রকে সংবাদ দেয়, তাঁর একটি শিশু পুত্র জন্মেছে। তা শুনেই সিদ্ধার্থ বলে ওঠেন, ‘রাহুল!’ পালিতে রাহুল শব্দের অর্থ হলো বিঘ্ন। নতুন মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে সিদ্ধার্থ এমন কথা বলেছিলেন। তবে পুত্রের জন্মের এই শুভদিনে, অর্থাৎ আজই যে তিনি ঘর ছেড়ে চিরকালের জন্য চলে যাবেন, এমনটা ভাবতেই পারেনি ছন্ন।

সিদ্ধার্থ কিছুদিন হল রাজবাড়ির বাইরে একটি সুন্দর বাগানে এসে আছেন। এখানে তাঁকে থাকার আদেশ দিয়েছেন সিদ্ধার্থের পিতা স্বয়ং মহারাজ শুদ্ধোদন। রাজার আদেশ মানতে বাধ্য হয়ে দিন কয়েক হয়েছে সিদ্ধার্থ এই আরাম উদ্যানে এসে আছেন। নগরের শ্রেষ্ঠ সুন্দরীরা সেখানে নাচ ও গানের মাধ্যমে দিনরাত তাঁর মন ভালো রাখার চেষ্টা করে চলেছেন। সিদ্ধার্থকে নিয়ে শুদ্ধোধনের চিন্তার অন্ত নেই। রাজপুত্রের জন্মের পর প্রাজ্ঞ জ্যোতিষীরা ঘোষনা করেছিলেন, তিনি গৃহত্যাগ করবেন এবং সন্ন্যাস নেবেন। ছেলেকে সংসারী করতে তিনি অল্প বয়সেই তাঁর বিয়ে দেন। তবুও জ্যোতিষীদের কথাগুলো মনে রেখে তিনি সর্বদা শঙ্কিত থাকেন, ছেলেকে নিয়ে।

ছন্ন শুনেছে, রাজা শুদ্ধোধন মাত্র কিছুদিন আগে কয়েকবার সিদ্ধার্থকে নিয়ে কিছু স্বপ্ন দেখেছিলেন। তারপর থেকে তিনি রাজপুত্রকে নিয়ে আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তিনি একরাতে ঘুমিয়ে দেখেন, রাজপুত্র সিদ্ধার্থ কপিলাবস্তুর মাঝ বরাবর একটি সুউচ্চ দুর্গের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। নীচে দাঁড়িয়ে থাকা প্রজাদের উদ্দেশ্যে তিনি অসংখ্য মণি ও রত্ন ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তারপর রাজপুত্র তাঁর হাতে থাকা বিশাল দণ্ড দিয়ে এক সুবিশাল ঢাক বাজাতে থাকেন। সেই শব্দে শত শত মানুষ এসে একত্রিত হয়। সিদ্ধার্থ এরপর এক বিশাল পতাকা হাতে নিয়ে কপিলাবস্তু নগরের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যান। বহু মানুষ তাঁর অনুগামী হয়। এরপর তিনি নগরের পূর্ব দ্বার দিয়ে বেরিয়ে যান। সবশেষে রাজা দেখেন, ছয়জন ব্যক্তি তাঁদের মাথার চুল উপরে ফেলছেন এবং তাঁরা ভীষণভাবে বিলাপ করছেন ও কাঁদছেন।

স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারীর বলেন, “রাজপুত্র কিছুদিনের মধ্যেই গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাসী হবেন। তখন বহু মানুষ তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করবেন। তিনি জগতে নতুন ধর্ম প্রচার করবেন। তাঁর নতুন ধর্মের প্রভাবে প্রচলিত ছয় ধরনের তির্থিকরা বা ধর্ম প্রচারকরা পরাজিত হয়ে বিলাপ করবেন।”

এই স্বপ্ন দেখার পরই রাজা শুদ্ধোধন আদেশ করেন, সিদ্ধার্থকে রাজপ্রাসাদের বাইরে এই নিভৃত প্রমোদ উদ্যানে এসে থাকতে হবে। রাজা দিবারাত্রি সেখানে আমোদ প্রমোদ এবং নাচ গানের আয়োজন করেন। ছন্ন দেখেছে, সুন্দরী নর্তকীদের নাচ বা গানে রাজপুত্র মনোনিবেশ করেন না। তাঁর উদাসী দুচোখ তখন যেন কোন অজানা জগতে বিচরণ করে। নিয়তিকে খণ্ডন করতে শুদ্ধোধন চেষ্টার ত্রুটি করেননি। তবুও তাঁর অনিচ্ছায় অনভিপ্রেত ঘটনাটি সেই ঘটেই গেল।

রাজপুত্র সিদ্ধার্থ কয়েকদিন আগে তাঁর প্রমোদ উদ্যান থেকে নগর পরিদর্শনে বেরিয়েছিলেন। ছন্ন তাঁকে নিয়ে রথ চালিয়ে পথ চলতে লাগল। এমন সময় কোথা থেকে এক লোলচর্ম বৃদ্ধ হাতে একটি লাঠি নিয়ে তাঁর যাত্রাপথের সামনে এসে পড়লেন। বয়সের ভারে সেই বৃদ্ধ সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও হারিয়েছেন। তিনি বার্ধক্যের প্রভাবে কাঁপতে কাঁপতে কোনোক্রমে পথ চলেছেন।

সিদ্ধার্থ জানতে চাইলেন, “এই মানুষটির কী হয়েছে? ইনি এমন কুৎসিত দর্শন কেন?” ছন্ন বলল, “ইনি বৃদ্ধ। বয়সের ভারে চলতে অক্ষম হয়েছেন। ওঁর মৃত্যু আসন্ন।”

“তাহলে আমরাও নিশ্চয় একদিন ওঁর অবস্থায় এসে পৌঁছাব? এমন বয়সের ভারে ন্যুব্জ আর বলহীন?”

“হ্যাঁ দেব, আমরা সবাই জরাধর্ম বিশিষ্ট। এমন অবস্থা একদিন আমাদের সবারই হবে।”

“তাহলে আজ আর অন্য কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। রথ ফিরিয়ে নিয়ে চলো।”

এরপর পরপর তিনি দেখলেন রোগগ্রস্ত মানুষ এবং মৃত মানবদেহ। অসুস্থ মানুষটি নির্জীব আর মৃতদেহটি কাপড় দিয়ে ঢাকা। যেন কাঠের খণ্ডের মতো স্থির হয়ে পড়ে আছে। তাঁর আত্মীয়রা আকূল কান্নায় এবং শোকে মুহ্যমান দেখে সিদ্ধার্থ বলে ওঠেন,  

“ধিগ্ যৌবনেন জরয়া সমভিদ্রুতেন
আরোগ্য ধিগ‌্ বিবিধব্যাধিপরাহতেন
ধিগ্ জীবিতেনপুরুষো নচিরস্থিতেন
ধিগ্ পণ্ডিতস্য পুরুষস্য রতিপ্রসঙ্গৈঃ”

“ধিক! সেই তারুণ্যকে যা বয়সের সঙ্গে লোপ পায়। যে আরোগ্য রোগের প্রভাবে থাকেনা তাকে ধিক! যে জীবন চিরস্থায়ী নয়, সেই জীবনকে ধিক! সেই বিজ্ঞ পুরুষকে ধিক! যিনি অলীক সুখের আশায় আমোদ প্রমোদে মত্ত থাকেন।”

সিদ্ধার্থর মন মানুষের অনিত্য জীবন সম্পর্কে এইসব দৃশ্য দেখে আরও বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠল। তখন তিনি একদিন এক তরুণ সন্ন্যাসীকে দেখলেন। তাঁর মনে নবীন সন্ন্যাসীকে দেখে আশা জেগে উঠল। তিনি ছন্নকে বললেন,

“কে এই সৌম্য পুরুষ? গৌরিক বস্ত্রধারী, হাতে ভিক্ষাপাত্র?”
ছন্ন বলল, ‘ইনি সংসারত্যাগী প্রব্রজিত পুরুষ। ইনি আশ্রমিক এবং ভোগসুখ ত্যাগপরায়ণ।”
শুনে সিদ্ধার্থ বললেন,

“সাধু সুভাষিতমিদং মম রোচতে চ
প্রবজ্যা নাম বিদুভিঃ সততং প্রশস্তা।
হিতমাত্মনশ্চ পরসত্ত্বহিতং চ যত্র
সুখজীবিতং সুমধুরমমৃতং ফলং চ” (ললিতবিস্তার)

“এই প্রব্রজিত আশ্রমিককে দেখে আমার অতি সুন্দর ও সৎ মনে হচ্ছে। প্রব্রজ্যা আশ্রমে থেকে অবশ্যই নিজের ও অপরের হিতসাধন করা যায়। অমৃতফলের মতো সুস্বাদু মুক্তিই ওই আশ্রমের ফল।”

তিনি মনের গভীরে তখনই গৃহত্যাগের স্থির সিদ্ধান্ত নিলেন। এতদিন তিনি গৃহত্যাগ বিষয়ে দ্বিধান্বিত ছিলেন। এবার মানুষের মানবদেহ লাভের প্রকৃত উদ্দেশ্য তিনি নির্ণয় করতে বদ্ধপরিকর হলেন। সংসারের ভোগ উপকরণ থেকে তিনি যে কোনও শর্তে মুক্তি চাইলেন।

সন্তান জন্মেছে খবর পেয়ে তিনি, তাঁর প্রমোদ উদ্যান থেকে রাজবাড়ির দিকে রওনা হলেন। পথে রথে দাঁড়ানো সিদ্ধার্থকে দেখতে পেলেন কিসা গৌতমী। কিসা অর্থাৎ কৃশ বা রোগা। কিসা গোতমী বড় জীর্ণ শীর্ণ চেহারার একজন তরুণী। তিনি সন্তানহীনা হওয়ায় তার স্বামী তাকে পরিত্যাগ করেছেন। কিসা গৌতমী তখন ঝাড়ু হাতে রাস্তা ঝাঁট দিচ্ছিলেন। সিদ্ধার্থের অপরূপ সৌন্দর্য দেখে তিনি দাঁড়িয়ে পড়েন। তপ্ত কাঞ্চন বর্ণ এবং সুঠাম ও দীর্ঘকায় এক পুরুষ রথে চড়ে এগিয়ে আসছেন দেখতে পেল কিসা। পুরুষটির চোখ দুটি যেন পবিত্রতার মূর্ত প্রতীক। কে এই অসামান্য পুরুষ? কিসা সিদ্ধার্থকে চিনতেন না। তিনি বলে বসেন,

“নিব্বুতা নূন সা মাতা, নিব্বুতো নূন সো পিতা।

নিব্বুতা নূন সা নারী, যস্যায়ং ঈদিসো পতী তি।”

‘যে মায়ের এমন সন্তান, যে পিতার এমন পুত্র আর যে নারীর এমন স্বামী তাঁরা নিশ্চয়ই প্রশান্ত (নিব্বুতে)।’

কিসার কথা সিদ্ধার্থ ঠিক মতো শুনতে পাননি। তিনি তখন নির্বাণ লাভ বা মুক্তির কথাই ভাবছিলেন। তিনি মনে করলেন, কিসা বলেছেন, “তাঁরা সকলেই নির্বাণ লাভ করবেন।” তিনি খুশি হয়ে কিসার দিকে এগিয়ে এসে, তার গলার বহুমূল্য মুক্তাহারটি কিসাকে উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দিলেন। তারপর দ্রুত রথ ছুটিয়ে রাজপুরীর দিকে চলে গেলেন। কিসা অবাক ও মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার যাত্রাপথের দিকে চেয়ে রইল।

রাত হয়েছে। একটু আগেই সিদ্ধার্থ তার স্ত্রী যশোধরাকে অনেক কষ্টে বুঝিয়ে তাঁর ঘরে ঘুমাতে পাঠিয়েছেন। যশোধরা দুঃস্বপ্ন দেখার পর, গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে উঠে এসেছিলেন জানলার কাছে, যেখানে সিদ্ধার্থ দাঁড়িয়ে দূর আকাশের দিকে তাকিয়েছিলেন। সিদ্ধার্থ দেখছিলেন, সমস্ত চরাচর মায়বী জ্যোৎস্নায় আলোকিত হয়ে আছে। আশ্চর্য সুন্দর পূর্ণিমার রাত্রি। সমস্ত প্রকৃতি যেন তাঁকে আহ্বান জানাচ্ছে, পথে বেরিয়ে পড়তে। সে মহান ডাক উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। যশোধরা তাঁকে বললেন, “আমি এইমাত্র স্বপ্নে বড় অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখলাম। আমার গলার মুক্তাহারটি যেন ছিন্ন হয়ে গেছে, আর তার মুক্তগুলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। হঠাৎ ছুটে এসে, আমার মাথার উপর থেকে রাজকীয় ছাতা কেড়ে নিচ্ছে রাজবাড়ির দাসীপুত্র ছন্ন। সেইসঙ্গে আমার পালঙ্কের চার পা ভেঙে গিয়ে পালঙ্কটা হঠাৎ মাটিতে উল্টে পড়েছে। কেন এমন স্বপ্ন দেখলাম দেব? কী এর অর্থ? আপনি বিদ্বান, দয়া করে বলে দিন! আমার বড় দুশ্চিন্তা হচ্ছে।”

সিদ্ধার্থ শান্ত স্বরে বললেন, “এর তেমন কোনও অর্থ নেই রাজকুমারী। তুমি উদ্বিগ্ন না হয়ে শান্ত হও। রাতটুকু ঘুমিয়ে নাও। আমি জেগে আছি কোনও ভয় নেই। তাঁর কথায় আশ্বস্ত হয়ে যশোধরা আবার শয্যায় ফিরে গেলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলেন। সিদ্ধার্থ দেখলেন মা ও সদ্যোজাত শিশুপুত্র গভীর সুষুপ্তিতে নিমগ্ন হয়ে আছে। তাঁর তখন একবার, শেষবারের মতো নিজের ছেলেকে কোলে নিতে ইচ্ছে করল। তিনি কঠোরভাবে সে ইচ্ছে সংবরণ করলেন, কারণ এতে যশোধরার ঘুম ভেঙে যেতে পারে। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই ছন্নকে দেখতে পেলেন। ছায়ার মতোই সে সবসময় রাজপুত্রকে অনুসরণ করে। তাঁকে তিনি এড়িয়ে যেতে পারলেন না। ছন্ন তাঁর সঙ্গে সঙ্গে রাজপুরীর বাইরে এল।

সিদ্ধার্থ রথ ছুটিয়ে অনেকটা পথ অতিক্রম করে নগরের সীমানা ছাড়িয়ে গেলেন। তখন একবার ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের চেনা পথ ঘাট আর নগরকে দেখে নিলেন। এক মূহুর্তের মানসিক দুর্বলতাকে কাটিয়ে উঠে আবার ঘোড়া ছোটালেন তিনি। জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর শক্তিকে জয় করার কৌশল না জানা পর্যন্ত এ নগরে তিনি আর পদার্পণ করবেন না, প্রতিজ্ঞা করলেন। সিদ্ধার্থ আরও খানিক এগিয়ে একটি নদীর তীরে এসে পৌঁছালেন।

ছন্ন বলল, “নদীটির নাম অনোমা” অর্থাৎ অগভীর নয়।

সিদ্ধার্থ বললেন, “আমার এই নিশীথ যাত্রাও অগভীর নয়।”

মৃদু হেসে সিদ্ধার্থ আট উসভ চওড়া নদীটি ঘোড়ায় চড়ে লাফ দিয়ে পার হলেন। নদীর অপর তীরে অদূরে ঘন জঙ্গল দেখা যাচ্ছে। নদীর তীরের শুকনো বালির চর পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় রূপার মতো চকচক করছে। চারিদিকে এক অপূর্ব নৈশব্দ্য। সিদ্ধার্থ বললেন, “বন্ধু ছন্ন, তুমি এখনই আমার অলঙ্কার ও কন্থককে নিয়ে রাজবাড়িতে ফিরে যাও। আমি আর ফিরে যাব না।”

শোক

সিদ্ধার্থ চলে গেলেন। চোখের জল ফেলতে ফেলতে ছন্ন অবসন্ন দেহে মাটিতে সেখানেই বসে পড়ল। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সিদ্ধার্থের প্রিয় অশ্ব কন্থক। আজ তার প্রভু তাকেও বর্জন করে কোন অজানা পথে চলে গেছেন। কন্থক দূরের দিকে তাকিয়ে কেবলই হ্রেষারব করতে লাগল। তার যেন সামনে চলার কোনও ইচ্ছেই নেই। ছন্নও রাজবাড়িতে ফিরে যেতে চায় না। কোন মুখে সে মহারাজের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে? সেখানে গিয়ে কী বলবে সে তাঁকে? এই ভয়ানক আশঙ্কা বহু বছর ধরেই যে মহারাজ নিজের অন্তরে বহন করে নিয়ে চলেছেন। আজ সত্যিই সেই আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত হল। কন্থক ফেরার পথে ঘাস জল কিছুই খেল না। দুর্বল শোকার্ত অশ্বটিকে নিয়ে কোনওক্রমে পায়ে হেঁটে নগরে ফিরে এল ছন্ন। বিনা স্নানে তার দেহ মলিন, কেশ রুক্ষ। এরমধ্যেই সাতটি দিন কেটে গেছে।

নগরে এরই মধ্যে কোথা থেকে সর্বত্র সিদ্ধার্থের অন্তর্ধানের বার্তা রটে গেছে। সকলে ছন্নকে দেখে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে লাগলেন, “আমাদের প্রিয় কুমারকে কোথায় রেখে এলে? সিদ্ধার্থ কোথায় চলে গেছেন? নগরের সবার প্রিয় আমাদের রাজকুমার এখন কোথায় আছেন?”

নগরের নারীরা সকলে জানলা খুলে দেখতে লাগলেন, কুমার ফিরেছেন কিনা। যেই তাঁরা দেখলেন কন্থকের পিঠে কুমার নেই, অমনি তাঁরা হতাশ হয়ে বিলাপ করতে লাগলেন।

“হায় হায়! ইন্দ্রের অভাবে স্বর্গ যেমন শ্রীহীন হয়, আজ এই নগরও তেমন শোভাহীন হয়েছে। কুমার থাকলে বনই নগর হয়, না থাকলে নগর হয়ে যায় বন!”

শুদ্ধোদন এই সাতদিন ধরে পুত্রের ফেরার অপেক্ষায় উদগ্রীব হয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন। তিনি এই কয়েকদিন সারাদিন কোনও প্রকার অন্ন গ্রহন না করে, শুধু দিনে একবার সামান্য ফলাহার করেছেন এবং পুত্রের ফেরার জন্য দেবালয়ে বিশেষ পূজার আয়োজন করেছেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস তাঁর এই বিশেষ যজ্ঞ কখনও ব্যর্থ হবে না। সিদ্ধার্থ ঠিক ফিরে আসবে। ছন্ন যখন নগরে এসেছিল, তখনও রাজা মন্দিরে সকালের বিশেষ পূজায় ও যজ্ঞে ব্যস্ত ছিলেন। ছন্ন চোখে জল নিয়ে যেভাবে রাজপুরীতে প্রবেশ করল, যেন সিদ্ধার্থ কোনও শত্রু রাজাদের হাতে নিহত হয়েছেন।

রাজবাড়ির অন্তঃপুর থেকে কন্থকের হ্রেষা ধ্বনি শুনে শোকাকুল নারীরা সিদ্ধার্থ ফিরে এসেছেন ভেবে ছুটে এলেন। এমন সময় মহারানী গৌতমী ছন্নকে একাকী দেখে প্রবল শব্দে চীৎকার করে কেঁদে উঠলেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি মাটিতে গড়িয়ে পড়ে গেলেন। পাশাপাশি সকলেও এই দৃশ্য দেখে উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগল।

এমন সময় সেখানে যশোধরা এসে উপস্থিত হলেন। তাঁর শরীরে একটিও অলঙ্কার নেই। তাঁর পায়েও আলতার কোনো চিহ্ন নেই, এমনকী নুপূরও নেই। তিনি ছন্নকে দেখে কাঁদলেন না। শুকনো চোখে ছন্নকে দেখতে লাগলেন। ছন্ন যশোধরাকে দেখে আরও জোরে কাঁদতে লাগল।

যশোধরা বিকৃত স্বরে ছন্নকে বললেন, ছন্দক! কাঁদছ কেন? আমি যখন ঘুমিয়ে ছিলাম, তখন তুমিই তো আমার অভিলাষ, আমার সুখ, আমার সর্বস্ব নিয়ে চুপিচুপি চলে গিয়েছিলে! তোমরা তিনজন গিয়েছিলে। কন্থক, তিনি আর তুমি। এখন তোমরা দুজনে দেখছি ফিরে এসেছ, তোমাকে কাঁদতে দেখে আমার শরীর কাঁপছে। তিনি কোথায়? কেন তুমি তাঁকে নিয়ে গেলে? নৃশংস এই কাজটি করে কাঁদতে তোমার এতটুকু লজ্জা হচ্ছে না? তোমার এই চোখের জলের সঙ্গে তোমার কাজের কোনও মিল নেই। এখনই বলো তিনি কোথায়?”

ছন্ন কোনও রকমে বলল, “রাজকুমারী আমি তাঁর সঙ্গে না গেলে, বা কাউকে কিছু বললে বা জানালে তিনি আমাকে প্রবল কশাঘাত করতেন।”

“কশাঘাত? কেবল নিজের প্রতি কশাঘাত ঠেকাতে আমার সৌভাগ্য আর হৃদয়কে এমন করে টুকরো টুকরো করে দিলে তুমি? আর এই আমাদের প্রিয় অশ্ব কন্থক? আজ এমন করে এ হ্রেষাধ্বনি কেন করছে? তাঁকে নিয়ে চলে যাওয়ার সময় তো একবারও এমন করে হ্রেষারব করেনি! আমাকে খবর দেয়নি! এতটুকু শব্দ না করে তোমরা নিঃশব্দে পলাতকের মতো চলে গিয়েছিল। বিশ্বাসঘাতক এই অশ্বকে আমার সামনে থেকে এখনই সরিয়ে নাও।”

“বিশ্বাস করুন রাজকুমারী, আমরা দুজনেই নিরপরাধ। তিনি একজন দেবতার মতই নিষ্ক্রান্ত হয়েছেন। আমি নিজেও যেন এক ঘোরের মধ্যে রাজার আদেশ জানা সত্বেও তাঁকে নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম। এই কন্থকও যাবার সময় এমন নিঃশব্দে বের হল যেন ওর খুরগুলি মাটিও স্পর্শ করেনি, কেউ যেন সেগুলি শূন্যে তুলে রেখেছিল। এমনকি ও কোনও হ্রেষারবও করেনি। যেন কোনও দেবতা এসে ওর মুখও বন্ধ করে দিয়েছিল। আরও আশ্চর্য এই যে অশ্বপৃষ্ঠে রাজকুমার নগর দ্বারে এসে দাঁড়ানোমাত্রই নগরের দরজা আপনা আপনি খুলে গিয়েছিল এবং নিষ্ক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তা দেখে রাজকুমার বলেছিলেন, তাঁর দৈব আজ তাঁর প্রতি সহায় হয়েছেন। রাজকুমারী! দৈবের প্রেরণাতেই তিনি প্রস্থান করেছেন।”

শুনতে শুনতে যশোধরা মাটিতে বসে পড়লেন। তাঁর দু চোখ বেয়ে অনর্গল জল পড়তে লাগল।

“আজ আমি তাঁর এতদিনের সহধর্মচারিণী হয়েও অনাথা হলাম। তিনি আমাকে ত্যাগ করে ধর্ম আচরণ করতে চান, কিন্তু এঁর পূর্বপুরুষগণ তো পত্নীদের সঙ্গেই বনবাসী হয়েছিলেন! তিনি নিশ্চয়ই গোপনে সর্বদা মনে মনে আমাকে ঈর্ষাময় ও কলহপ্রিয় নারী মনে করতেন, তাই আমাকে এমন করে একাকী ত্যাগ করেছেন! তিনি ছাড়া আমার স্বর্গসুখেরও অভিলাষ নেই। আমি না হয়, মন্দভাগ্য, কিন্তু শিশু রাহুলও কি তাঁর পিতার স্নেহ পাবে না, ছন্ন? এমন অনিন্দ্যসুন্দর এই শিশুপুত্রটিকে দেখলে শত্রুর মনেও মায়া হবে, অথচ তার পিতাই তাকে ত্যাগ করে চলে গেলেন? হায়! এখনও আমার হৃদয় কেন বিদীর্ণ হচ্ছে না!” বলতে বলতে যশোধরা জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন।

জপ ও মঙ্গলহোম শেষ করে শুদ্ধোদন মন্দির থেকে বের হলেন। বাইরে প্রবল আর্তরব শুনে রাজা বিস্মিত ও বিচলিত হয়ে তাড়াতাড়ি বাইরে প্রাঙ্গনে এসে একাকী ছন্ন ও কন্থককে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তখন যশোধরাকে মাটিতে সংজ্ঞাহীন দেখতে পেয়ে রাজা নিজেও সহসা প্রবল শোকে বজ্রাহতের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তাঁর মুখ থেকে একটি শব্দও বের হল না।

রাজার সেবাদাসেরা ছুটে এসে তাঁর চোখে মুখে জল দিয়ে তাঁকে তুলে ধরল। রাজা কন্থকের দিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বললেন, “কন্থক! কত যুদ্ধে তোমার কল্যাণে আমি জয়লাভ করেছিলাম, আজ সেই তুমি আমার প্রিয় পুত্রকে বনের মধ্যে একাকি ত্যাগ করে এসেছ! তুমি অতি গুরুতর অপ্রিয়কর্ম করেছ। এখনই বলো, আমার প্রাণের ধনকে তুমি কোথায় ছেড়ে এসেছ! পুত্র বিনা আমার পিপাসু প্রাণ আমি এখনই ত্যাগ করতে চাই।”

রাজাকে তখন মন্ত্রী ও বৃদ্ধ পুরোহিতগণ বহু প্রবোধবাক্য বলতে লাগলেন। রাজা তবুও অধীর হয়ে শোকসাগরে ভাসতে লাগলেন দেখে, রাজপুরোহিত বললেন, “মহারাজ! ধৈর্যধারণ করুন। আপনি প্রাজ্ঞ ও ধীর। আপনি শুভবুদ্ধি সম্পন্ন, আপনি অধীরের মতো অশ্রুমোচন বন্ধ করুন। এর আগে বহু নৃপতিগণ এমন করে ভোগসুখ ত্যাগ করে সংসার ত্যাগ করেছেন। তাছাড়া সিদ্ধার্থের এমন আচরণ তো পূর্ব নির্দিষ্ট। অতীতে ঋষি অসিত দেবলের বাক্য স্মরণ করুন মহারাজ! তবে আপনি যদি রাজপুত্রকে ফিরিয়ে আনতে চান তবে এখনই ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। আমরা সকলে গিয়ে কুমারকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনব। আমি নিজে সেই বনাঞ্চলের প্রতিটি আশ্রমে গিয়ে খোঁজ নেব। আমি শাস্ত্রবিধি দেখিয়ে তাঁর সঙ্গে বাকযুদ্ধ আহ্বান করব এবং তাঁকে শাস্ত্রবিধান ব্যক্ত করে, তর্কযুদ্ধে পরাজিত করে আবার আপনার সামনে এনে উপস্থিত করব। আপনি চিন্তা ত্যাগ করুন।”

“বেশ তবে তাই করুন! আপনারা তবে আর বিন্দুমাত্র বিলম্ব করবেন না। মন্ত্রী শীঘ্র দ্রুতগামী রথে বনপথের দিকে যাত্রা করুন। রাজপুরোহিত আপনিও যান। যতক্ষণ না কুমারকে দেখতে পাচ্ছি, আমার মনে শান্তি আসবে না।”

তারপর রাজা সিদ্ধার্থকে যা যা বলতে চান, তা রুদ্ধকন্ঠে রাজপুরোহিতকে বললেন। কথার মাঝখানে বারবার শুদ্ধোদনের কন্ঠস্বর চোখের জলে বিকৃত হয়ে যাচ্ছিল। তবুও মহারাজ নিজেকে সংবরণ করে কথাগুলি বললেন।

সেই মুহূর্তেই মন্ত্রী ও পুরোহিত সিদ্ধার্থের খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। তাদের সঙ্গে গেলেন বহু সংখ্যক দাস ও অনুচরগণ। রথে বেশ কিছুদূর পথ যাওয়ার পর বনের কাচা মাটির রাস্তায় রথ থেকে নেমে মন্ত্রী ও রাজপুরোহিত পায়ে হেঁটে পথ চলতে লাগলেন। দুজন রাজপুরুষের সঙ্গে অন্য রথে আরোহন করে এসেছেন অনুচরগণ। বনের যে অংশে তাঁরা প্রবেশ করেছেন তা বেশ গভীর বন। লতা ও গুল্ম ছাড়াও আছে বিরাট বিরাট মহীরুহ। বনের ছায়ায় সূর্যের আলোর তেজ এখানে কিছুটা কম। সকলে নিঃশব্দে এবং দ্রুত পথ চলেছেন। কখন দেখতে পাবেন সিদ্ধার্থকে সেই উৎকন্ঠায় সকলেরই মুখে কথা নেই। প্রায় মাইল দুয়েক চলার পর একটি আশ্রম তাদের চোখে পড়ল। আশ্রমটি ঘিরে বহু সংখ্যক কুটির। এটি ঋষি ভার্গবের আশ্রম। আশ্রমের মূল প্রাঙ্গনের সামনে একজন পরিব্রাজক তাদের পাদ্য ও অর্ঘ্য দিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন। পুরোহিত ও মন্ত্রী আসনে বসলেন।

পুরোহিত বললেন, “আমরা এক অতি গুরুতর রাজকার্য সম্পাদনে বের হয়েছি। দয়া করে আশ্রম অধ্যক্ষ ভার্গবকে একবার ডেকে দিন।”

ভার্গব এলে পুরোহিত ও মন্ত্রী তাঁকে প্রণাম জানালেন। পুরোহিত বললেন, “আমাদের ইন্দ্রের মতো তেজস্বী রাজা শাস্ত্র ও মন্ত্রণা বিশারদ। ইক্ষাকু বংশীয় রাজা শুদ্ধোদনের  নির্দেশে আমরা এখানে আজ একটি বিশেষ প্রয়োজনে এসেছি। আমাদের রাজপুত্র সিদ্ধার্থ জরা ও মৃত্যু ভয় থেকে উদ্ধার পেতে শুনেছি কিছুদিন আগে এখানে এসেছিলেন। আমরা তাঁরই খোঁজে এখানে এসেছি।”

“আপনারা ঠিকই শুনেছেন, একজন দীর্ঘবাহু কুমার কয়েকদিন আগে আমার আশ্রমের অতিথি হয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি অবোধ নন, যে তাঁকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে নিতে আপনারা এখানে এসেছেন! তিনি আমার কাছ থেকে জানতে চান, আমি যে ধর্মাচারণ করি, তা পুনর্জন্ম রোধে সমর্থ কিনা। আমি তাঁকে নিশ্চিত করে তা বলতে সক্ষম না হওয়ায়, তিনি সেই মুহূর্তে আমার আশ্রম ত্যাগ করে আরাড় কালামের আশ্রমের দিকে চলে গেছেন। এখান থেকে তা প্রায় বিশ যোজন পথ। আরাড়ের আশ্রম সুবৃহত, এই আশ্রম তো সেই তুলনায় নিছকই ছোট। আরাড়ের শিষ্য সংখ্যাও প্রায় পাঁচশত। শুনেছি তিনি বেদ দর্শন এবং বৈয়াকরণ বিশেষক। সাধনারও বহু সোপান অনায়াসে উত্তীর্ণ। আপনারা দ্রুত আরাড়ের আশ্রমে চলে যান। হয়তো সেখানে গেলে কুমারের খোঁজ পেতে পারেন।”

“আরাড়ের আশ্রমের কথা আমরাও শুনেছি। মহারাজ শুদ্ধোদনও তাঁকে চেনেন। তিনি একজন সুবিখ্যাত মহান ব্যক্তি। তবে তাঁর আশ্রমে যাওয়ার এই পথ বড় বিপদ সংকুল, কারণ পথে দু দুটি ঘন বনাঞ্চল আছে, সেখানে দিবসেও হিংস্র জন্তুর ভয় আছে। এছাড়া আছে দস্যু তস্করের ভয়ও।”

“আপনাদের যাত্রা শুভ ও মঙ্গলময় হোক।”

“আমরা নিজেদের চেয়েও কুমারকে নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন দেব!”

কুমারকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। তিনি এখন কাষায় বস্ত্রধারী, তস্করেরা তাঁকে আক্রমণই করবে না। বাকি রইল হিংস্র জন্তুর ভয়, আমার মনে হয়, বুদ্ধিমান ও বলশালী কুমারের কোনও বিপদ হবে না। আপনারা এগিয়ে যান।”

গভীর বনের ভেতর প্রতিটি বৃক্ষতল ও পর্বত কন্দর দেখতে দেখতে পথ চলেছেন দুই রাজপুরুষ। এই ভীষণ বনে চলতে চলতে তাঁরা ভয়ানক ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। বনের পথ গোলকধাঁধার মতো জটিল। এক এক জায়গায় সূর্যালোক পর্যন্ত পড়েনি। সেখানকার মাটি ভেজা। সেই ভেজা মাটির পথে সন্তর্পণে চলতে চলতে মন্ত্রী ভাবতে লাগলেন, কী ভয়ানক এক জীবনকে কুমার স্বেচ্ছায় বরণ করে নিয়েছেন! এখানে না আছে খাদ্যের প্রতিশ্রুতি! না আছে পরিশ্রুত জল! রাজপরিবারের আদরে বেড়ে ওঠা কুমার কেমন করে এই কঠিন জীবন কাটাবেন? তাছাড়া লোকালয়ে নিজের আভিজাত্য ও লজ্জা বিসর্জন দিয়ে ভিক্ষাও বা কী করে সংগ্রহ করবেন? তীব্র শীতে উষ্ণ বস্ত্র ছাড়া তিনি কেমন করে থাকবেন? গ্রীষ্মের প্রখর উষ্ণতাও বা গৃহছাড়া হয়ে কেমন করে সহ্য করবেন? তখন তাঁর মনে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস প্রতীত হল যে কুমার ঠিকই তাঁর গৃহে ফিরে আসবেন। কুমারের ফেরা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। সাময়িক মানসিক বিক্ষেপে তিনি গৃহত্যাগ করেছেন ঠিকই, তবে এত কষ্ট তিনি কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারবেন না। কুমারকে যে করে হোক এখনই বুঝিয়ে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

একটি বিরাট ফলন্ত পাকুড় গাছের তলায় সিদ্ধার্থকে দেখতে পাওয়া গেল। তিনি নিবিষ্ট হয়ে কী যেন চিন্তা করে চলেছেন। সিদ্ধার্থ অস্নাত এবং অভুক্ত। তবুও গৈরিক বস্ত্রে তাঁর রূপ অপরূপ পবিত্র এবং নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল। পুরোহিত ও মন্ত্রী কুমারের কাছে ছুটে গেলেন।

“কুমার আপনার খাওয়া হয়েছে? এই ভীষণ বনে একটিও ফলদায়ী বৃক্ষ আমাদের চোখে পড়েনি। আমাদের কাছে পানীয়জল এবং আহার্য ফল আছে। দয়া করে গ্রহন করুন!”

সিদ্ধার্থ সে কথার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাঁদের দিকে তাকালেন। পুরোহিত বললেন, “কুমার আপনি প্রব্রজ্যা নিয়ে চলে গেছেন শোনার পর, মহারাজ শোকের গভীরতায় সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি আপনাকে কয়েকটি কথা বলতে আমাকে আজ্ঞা করেছেন। কুমার আমি আপনাকে এখন তা বলছি, শ্রবন করুন।

“ ‘ধর্মের প্রতি তোমার সংকল্প আমি জানি। এমনকী তোমার ভবিষ্যতের বিষয়েও আমি শুনেছি। কিন্তু অকালে তোমার এমন বনে আশ্রয় নেওয়া পিতা হিসেবে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। আমি দিবারাত্রি শোকের অনলে জ্বলছি। বর্ধিত নদীর বেগ যেমন কূলকেই আঘাত করে ধ্বংস করে দেয়, তোমার শোক আমাকে তেমনভাবেই আঘাত করছে। আমাকে রক্ষা করাও তোমার পরম ধর্ম, সুতরাং হে ধর্মপ্রিয়! আমি তোমার পিতা! আমার প্রিয়সাধনের জন্য অন্ততঃ গৃহে ফিরে এসো! এখন পৃথিবীর আধিপত্য ভোগ করো, শাস্ত্রনির্দিষ্টকালে পরে বনে গমন কোরো। আমার মৃত্যু তোমার অভাবে এক প্রকার নিশ্চিত। আমার কথা বিবেচনা কোরো। দয়াই পরম ধর্ম। আমাকে দয়া কোরো। তাছাড়া বনেই যে ধর্মপালন হয়, এমন কোনও কথা সিদ্ধ নয়। কারণ বুদ্ধি এবং যত্নই হল সিদ্ধির হেতু। বনে বাস এবং ভিক্ষুবেশ দুটিই ভীরুতার চিহ্ন। বহু রাজাগণ গৃহেই সিদ্ধিলাভ করেছেন। রন্তিদেব, বলি, ব্রজবাহু এবং ধ্রুব ছাড়াও বিদেহরাজ জনক এবং রাম এই সমস্ত গৃহস্থ রাজাগণও ধর্মাচারী ছিলেন এবং এঁরা মোক্ষপ্রাপ্তও হয়েছিলেন। সুতরাং আমি চাই তুমি মোক্ষজ্ঞান ও রাজ্যশ্রী দুইই লাভ করো। তুমি ফিরে এলেই এখানে তোমার রাজ্যাভিষেক হবে। অভিষেকের পুণ্য জলে সিক্ত তোমাকে, আলিঙ্গন করে সেইদণ্ডে আমি রাজছত্রের তলায় প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। তারপর আনন্দসহকারে আমি বনবাসী হয়ে ধর্মচর্চায় দিন কাটাব। আমি তোমার অপেক্ষায় আছি পুত্র!’”

কথাগুলি বলা শেষ করে পুরোহিত সিদ্ধার্থের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সমগ্র শাক্যরাজ্য এখন শোকসাগরে ডুবে আছে কুমার! এই অবস্থায় আপনি আমাদের রক্ষা করুন। ভীষ্ম ও পরশুরামকে মনে করুন কুমার! এরা তাঁদের পিতার জন্য কতই না অসাধ্য সাধন করেছিলেন। আপনারও তেমন পিতার অভিলাষ পালন করা উচিৎ। গৃহে আপনার পালকমাতা আপনার জন্য সর্বক্ষণ কাঁদছেন। বধূমাতাও আপনার অভাবে আর্ত ও অসহায়া, তাঁকে রক্ষা করাও আপনার বিশেষ কর্তব্য। আপনার শিশু পুত্রের প্রতি পিতার কর্তব্য পালন করাও আবশ্যিক। শোকের আগুনে রাজপুরীর অন্দরমহল সর্বক্ষণ জ্বলছে, আপনি হলেন সেই অগ্নি নির্বাপনের শীতল জল। সেইসঙ্গে আপনার অভাবে সমগ্র কপিলাবস্তু নগরে নেমে এসেছে শ্মশানের স্তব্ধতা। আপনাকে এখন সকলেই প্রবলভাবে কামনা করছে কুমার!”

কয়েক মুহূর্তের জন্য সিদ্ধার্থের মুখ ম্লান হয়ে গেল। তাঁর যেন মনে পড়ে গেল শোকাকুল তাঁর পরিবার ও পরিজনদের কথা। কিন্তু পরমুহূর্তেই তিনি নিজেকে সংবরণ করে নিলেন। তিনি ছায়াময় সেই বৃক্ষের তলা থেকে উঠে পড়লেন। তারপর একটুদূরে দাঁড়িয়ে যেন আপন মনে কথা বলে যেতে লাগলেন।

“সেই কবে থেকে মানুষ জন্ম মৃত্যুর চক্রে ভ্রাম্যমান। এই জগতের সবকিছু অনিত্য। পিতা কেন সন্তপ্ত হচ্ছেন? জগতের এই বিচিত্র গতি দেখে, কামনা করি তাঁর মন এই বলে সান্ত্বনা পাক যে, দুঃখের কারণ পুত্র নয়, বন্ধু নয়, পরিজন নয়, সন্তাপের কারণ তাঁর নিজের অজ্ঞানতা। কে কাকে রক্ষা করতে পারে? এক মুহূর্ত পরে কী হবে আমরা কেউ তা জানি না, কারণ আমরা কেউ কালজয়ী নই।

আমি গৃহবাসী হলেই যে আমার পিতার প্রাণরক্ষা হবে, তার কী নিশ্চয়তা আছে? তাছাড়া আমার এবং পিতার এই জাগতিক মিলনও তো সাময়িক। কালের গ্রাস স্বরূপ জরা, ব্যাধি ও মৃত্যু থেকে জীবের কারুর রেহাই নেই। আমার বিগত জন্মের পরিজনদেরও তো আমাকে মৃত্যুর পর ত্যাগ করতে হয়েছে! রাজা আমাকে রাজ্য ছেড়ে দিতে চান। এ তো যোগ্য পিতারই কথা, কিন্তু আমি যদি রাজ্য গ্রহণ করি, তাহলে তা হবে অসুস্থ ব্যক্তির লোভবশত অপথ্য গ্রহণ। রাজত্ব হল মোহের ভাণ্ডার স্বরূপ। এতে কেবল বাড়ে আত্ম-অহঙ্কার ও উদ্বেগ। রাজ্য হল বিষমিশ্রিত একপ্রকার সুখাদ্য। তাই জ্ঞানী ব্যক্তিরা জীবনের শেষে এসে তা সম্যকভাবে উপলব্ধি করে, রাজ্য ছেড়ে দিয়ে বনবাসী হন। আমি মনে করি অরণ্যে তৃণভোজনও ভাল, কিন্তু কালসর্পের মতো ভয়ঙ্কর রাজ্যসুখ কখনও নয়। তাছাড়া এই কাষায় বস্ত্র পড়েছি, তা বিসর্জন দিয়ে আবার রাজ্যে ফিরে যাওয়ার জন্য নয়। কোথায় শম প্রধান মোক্ষধর্ম! আর কোথায় দণ্ডপ্রধান রাজধর্ম। যেমন শীতল জল ও অগ্নির একত্রে থাকা চলে না, তেমনি মোক্ষ আর রাজসুখ একত্রে থাকতে পারে না। আমি সিদ্ধান্ত না করে আসিনি। গৃহ ও পরিজনরূপী বন্ধুদের জাল ছিন্ন করে আমি এখন মুক্ত। সেই বন্ধনে আমি আর পুনঃপ্রবেশ করতে চাই না।”

সিদ্ধার্থের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এবার মন্ত্রী বলে উঠলেন, “কুমার পরজন্ম যে আছে তার কোনও স্থিরতা নেই। আপনি অলীক কল্পনা করে মিছিমিছি নিজের বাস্তবকে অস্বীকার করছেন। অনর্থক পিতার মনেও দুঃখ দিচ্ছেন। আপনি সাধন মার্গে যে সিদ্ধিলাভ করবেনই, তারও তো কোনও নিশ্চয়তা নেই! সুতরাং আপনার গৃহে ফিরে যাওয়াই সবদিক থেকে শ্রেয়। কেউ কেউ বলেন, যে পুনর্জন্ম আছে। আবার অনেক দৃঢ় প্রতিজ্ঞ পুরুষেরা বললেন, পুনর্জন্ম নেই। যেহেতু এই বিষয়ে সকলের মনে সংশয় আছে, তাই বিচক্ষণতা হল, উপস্থিত ঐশ্বর্য উপভোগ করা। আগুনের যেমন উষ্ণতা ধর্ম এবং জলের ধর্ম শীতলতা, তেমন শুভ এবং অশুভ জন্ম ও মৃত্যুও স্বাভাবিক ধর্ম। ভিন্ন ভিন্ন ভূত একীভূত হয়ে এই সমগ্র জগৎ গঠন করেছে। কাঁটাযুক্ত গাছ এবং বিচিত্র জীবজগৎ সবই স্বভাব থেকে উৎপন্ন হয়েছে। এর জন্য প্রযত্ন করে কী হবে? অনেকে বলেন সৃষ্টি ঈশ্বরের থেকে সংঘটিত। তাহলে চেষ্টার প্রয়োজন কী? আপনি সম্ভবত কাষায় বস্ত্রধারণ করার পর পুনরায় গৃহে ফিরতে দ্বিধাবোধ করছেন, কিন্তু আপনার পূর্বে বহু নৃপতিগণ অরণ্য থেকে প্রজাদের অনুরোধে রাজ্যে ফিরে গিয়েছিলেন। তপোবন থেকে রাজা অম্বরীষ নগরে ফিরে গিয়েছিলেন। বন থেকে রাজ্যে এসেছিলেন রাম। তেমন এসেছেন ব্রহ্মর্ষি অন্তিদেব। শাল্বগণের অধিপতি তাঁর পুত্রের জন্য পুনরায় অরণ্য থেকে রাজ্যে ফিরে গিয়েছিলেন। তাই বন থেকে রাজ্যে ফেরায় কোনও দোষ নেই কুমার।”

মন্ত্রীর কথা শুনতে শুনতে সিদ্ধার্থ অন্তরে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। তবুও শালীনতা রক্ষার জন্য তিনি কথার মাঝখানে উঠে পড়েননি। পুরোহিতের কথায় একপ্রকার মমত্ব প্রকাশিত ছিল, কিন্তু মন্ত্রীর বাক্য যেন এক অধার্মিক দুর্বিনীত ব্যক্তির ভোগ চরিতার্থ করার অজুহাত।

সিদ্ধার্থ মন্ত্রীর প্রতি নিজের মনোভাব প্রকাশ করলেন না। তিনি ধীর এবং স্থিরভাবে তাঁকে প্রত্যুত্তর দিলেন,  “পরলোক আছে কিংবা নেই, ইহলোকে সকল মানুষের এই যে সংশয়, এই বিষয়ে আমি কারুর বাক্যে বিশ্বাস করি না। আমি স্বয়ং তপস্যা ও শমের দ্বারা যা অর্জন করব, তাতেই আমার একমাত্র সআস্থা। আমি তত্ত্ব জেনেই সিদ্ধান্ত করব। এখনও আমার তত্ত্ব দর্শন হয়নি, তবে সংশয় যুক্ত শুভ এবং অশুভের মধ্যে আমার শুভের প্রতিই দৃষ্টি থাকবে। আপনি আমার গৃহে প্রবেশ করার জন্য বিভিন্ন নৃপতিদের দৃষ্টান্ত এনেছেন, কিন্তু তাঁরা প্রমাণ নন। কারণ ধর্মের নির্ণয়ে ব্রতভঙ্গকারিগণ যোগ্য প্রমাণ বলে বিবেচিত হন না…”

কথা বলার মাঝখানে সিদ্ধার্থ হঠাৎ থেমে গিয়ে গাছতলা থেকে উঠে সামনের দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেলেন। তারপর সহসা মন্ত্রী ও পুরোহিতের দিকে তাকালেন এবং দৃপ্তকন্ঠে বলে উঠলেন, “শুনে রাখুন আপনারা! এই অবস্থায় যদি সূর্য আকাশ থেকে খসে পড়ে কিংবা হিমালয় পর্বতের চূড়া ভেঙে মাটিতে এসে পড়ে, তবুও আমি ধর্মের প্রকৃত তত্ত্ব না দর্শন করে, বিষয়ভোগে ইন্দ্রিয় উন্মুখ রেখে মূর্খের মতো গৃহের আশ্রয়ে ফিরে যাব না। আমি প্রজ্জলিত অগ্নিতে প্রবেশ করব কিন্তু অসফল হয়ে গৃহে প্রবেশ করব না।”

কথা বলতে বলতে দারুণ আবেগে সিদ্ধার্থের গলা কেঁপে উঠল। তিনি পিছন ফিরে দ্রুত এগিয়ে চললেন। তাঁর অভিপ্রায় এবং সঙ্কল্প যে অত্যন্ত দৃঢ় তা এবার দুই রাজপুরুষই ভাল করে বুঝলেন। তাঁরা তবুও বেশ কিছুটা পথ বিষণ্ণ মুখে রাজপুত্রকে অনুসরণ করলেন। দুজনেই বিবশ হয়ে ভাবতে লাগলেন, এখন কপিলাবস্তুতে ফিরে গিয়ে রাজপরিবারের সকলকে তাঁরা কী জবাব দেবেন? তাঁরা ফেরার পথে কিছু বিশ্বস্ত চরদের সিদ্ধার্থর খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য নিযুক্ত করলেন। নগরে রাজা পুত্রকে ফিরে পাবার আশায় দিন কাটাচ্ছেন, এই কথা ভাবতে ভাবতে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন মনে তাঁরা দুজন নগরের দিকে ফিরে গেলেন।

পর্ব- ৫

সাধন জীবন

রাজগৃহ ছেড়ে সিদ্ধার্থ এগিয়ে যেতে শুরু করলেন। আরও অনেকটা পথ অতিক্রম করলেন সিদ্ধার্থ। অবশেষে তিনি একটি আশ্রমে এসে উপস্থিত হলেন। আশ্রমটি আরাড় কালামের। তাঁর আশ্রমে তখন প্রায় তিনশো শিষ্য থাকেন। সিদ্ধার্থকে দেখে আরাড় কালামের ভাই কপিলাবস্তুর রাজপুত্র হিসাবে তাঁকে চিনতে পারলেন। তিনি আশ্রমের ভেতর গিয়ে সংবাদ দিলেন।

আরাড় কালাম সিদ্ধার্থকে বসতে আসন দিলেন। অবাক হয়ে তিনি বললেন, “রাজপুত্র গৌতম আমি আপনার কথা আগেই শুনেছি। ভোগবাসনাপূর্ণ রাজকীয় জীবন ত্যাগ করে আপনি যে প্রব্রজ্যা নিতে চান সে সম্পর্কে আমি আগেই শুনেছিলাম। এখন দেখছি আপনি, সেই পথে অনেক দূর এগিয়ে এসেছেন। অন্যান্য রাজাদের দেখেছি শেষ বয়সে এসে তাঁরা ধর্মে মন দেন। আপনি অতি অল্প বয়সেই তা পালন করতে এগিয়ে এসেছেন দেখে খুশি হলাম।” সিদ্ধার্থ বললেন, “পার্থিব সমস্ত বিষয়ে আমি নিস্পৃহ হয়েছি। এখন আমি প্রকৃত সুখের পথ খুঁজছি।”

“গৌতম, আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি আপনার জন্য মহান ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। যে মহৎ ত্যাগের মাধ্যমে আপনি এই পথে এগিয়ে এসেছেন, তা কিছুতেই ব্যর্থ হতে পারে না। রাজপুত্র আপনি কীসের খোঁজ করছেন? কেন গৃহত্যাগ করে এসেছেন?”

“মহর্ষি আমি একান্তভাবে মুক্তিপথের খোঁজ করছি। আমি দেখেছি, সব মানুষ জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর শৃঙ্খলে আবদ্ধ এবং নিজেদের তার হাত থেকে মুক্ত করতে অক্ষম। তাই আমি আপনার মতো বন্ধুর অধীনে থেকে উচ্চতর ধর্মীয় জীবন নির্বাহ করতে চাই।”

“বন্ধু আপনি এখানে স্বচ্ছন্দে থাকুন। আমার ধর্ম যে কোনও মেধাবী ব্যক্তি অতি অল্প সময়ে শিখে নিতে পারে।”

সিদ্ধার্থ এরপর সেই আশ্রমে আবাসিক হিসেবে থাকতে লাগলেন তাঁর সঙ্গে সেখানে কৌণ্ডণ্যর দেখা হল। কৌণ্ডণ্য বেশ কিছুদিন ধরে কালামের আশ্রমের অধিবাসী। তিনি আরাড় কালামের শিষ্যত্ব গ্রহন করেছেন।

কৌণ্ডণ্য সিদ্ধার্থকে দেখে খুব খুশি হলেন, “রাজপুত্র! আমি জানতাম তুমি এই পথে অবশ্যই আসবে। তোমাকে এত অল্প বয়সে ধর্মের পথ বেছে নেওয়ার জন্য অনেক অভিনন্দন!”

“মান্যবর! আমি এখন আর রাজপুত্র নই। একজন সাধারণ পরিব্রাজক। ধর্মের পথের একজন পথিক মাত্র।”

প্রতিদিন খুব ভোরে যখন দিনমণি উদিত হয় না, তখন থেকেই সিদ্ধার্থ ধ্যানাভ্যাস করেন। আশ্রমের পরিবেশ বড় শান্ত। পাখির কূজন ছাড়া অন্য কোনও শব্দ নেই। আশ্রমের আবাসিক শিষ্যরা যার যার দায়িত্ব অনুসারে কাজ করেন। প্রত্যেকের কাজ ও দায়িত্ব এবং সময় পৃথক। এই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা দেখে সিদ্ধার্থ মুগ্ধ। শিষ্যদের প্রতি আরাড় কালামের ব্যবহারও সিদ্ধার্থ পর্যবেক্ষণ করে অবাক হয়েছেন। কালাম এক অসামান্য দক্ষতায় এক অপরূপ নিয়ন্ত্রিত আচরণ প্রকাশ করেন। তিনি একদিকে স্নেহময় পিতা হয়ে সকলকে রক্ষা করেন, অন্যদিকে কঠোর শিক্ষকের মত আশ্রমের নিয়ম নীতি রক্ষা করেন। আরাড়ের প্রদর্শিত পথে ধ্যান করে সিদ্ধার্থ দেহ মনে এক অপূর্ব শান্তির পরশ পেয়েছেন। জপ, যজ্ঞ, দান, উপবাস এতদিন তিনি রাজপুত্র থাকাকালিন যা যা অভ্যাস করে এসেছেন, তার থেকে এ সম্পূর্ণ অন্য ধরণের। এমন অনুভূতি তিনি আগে লাভ করেননি।

কালামকে তাঁর মনের এই অবস্থা জানালেন তিনি। শুনে স্মিত হেসে কালাম বললেন, “সিদ্ধার্থ একে বলে পরাশান্তি। এই শান্তির অতল শীতলতায় যার প্রাণ শান্ত হয়, আর তৃপ্তিলাভ করে, সে আর কখনও সংসারে ফিরে যায় না। আমি এখন নিশ্চিন্ত হলাম, কুমার! আপনি আধ্যাত্মিকতার জগতে আপনার দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে যান।”

সিদ্ধার্থ আরাড় কালামের নির্দেশিত পথে ধ্যান অভ্যাস করতে লাগলেন। তিনি খুব অল্প সময়ে আরাড় কালামের ধর্ম আয়ত্ত করে নিলেন। একদিন তিনি ধ্যানে বসে সমাধিস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি অনুভব করলেন তাঁর শরীর যেন অত্যন্ত হালকা হয়ে গেছে। তিনি বাতাসে ভেসে উপরে উঠে যাচ্ছেন। মাথার উপর শত শত গ্রহ তারা ভরা আকাশ সেখানে তিনি নক্ষত্রের বেগে যেন কোন অজানা লোকে ভেসে যেতে লাগলেন। তিনি নিজের শরীরের উপর সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন।

এক অপূর্ব দিব্য অনুভবে তাঁর চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে গেল। তারপর ধ্যানের মাঝেই তিনি অনুভব করলেন, তাঁর শরীরটি যেন ধীরে ধীরে পৃথিবীর বুকে নেমে এল। তিনি অনুভব করলেন তিনি যেন একটি বৃক্ষের মতো মাটিতে প্রোথিত হয়েছেন। তাঁর নড়াচড়া করার একবিন্দু শক্তি রইল না। সহসা তিনি উপলব্ধি করলেন তাঁর শরীরটি যেন এবার ধীরে ধীরে বিশাল আকার ধারণ করেছে। তার একটি প্রান্ত অনন্ত আকাশে এবং অপর প্রান্তটি মাটিতে প্রোথিত। এরপর ধীরে ধীরে তাঁর ধ্যান ভঙ্গ হল।

সিদ্ধার্থ ধ্যান ভঙ্গ হতে তাঁর এই সমস্ত অনুভবের কথা আরাড় কালামকে জানালেন।

আরাড় কালাম অবাক হয়ে বললেন, “সিদ্ধার্থ আপনি একটানা দুই দিন ধ্যানে নিমগ্ন ছিলেন। যে সাধন বিভূতি লাভ করতে আমার জীবনের সত্তর বছর কেটে গেছে, তা আপনি মাত্র কয়েক মাসেই আয়ত্ব করে ফেলেছেন। এখন সাধন মার্গে আপনি আমার সমকক্ষ হয়েছেন। আমার একান্ত অনুরোধ, আপনি এই আশ্রমেই থেকে যান। আমরা দুজনে একত্রে শিষ্যদের জ্ঞান মার্গের পথ দেখাব। আমার বয়স হয়েছে। আমার অবর্তমানে আপনিই হবেন আমার আশ্রমের জন্য উপযুক্ত আচার্য।”

সিদ্ধার্থ দেখলেন আরাড় কালামের ধ্যান সাধনায় মুক্তি মার্গে পৌঁছান যায় না, কারণ ধ্যান যতক্ষণ ততক্ষণই এই সুখানুভূতির অনুভব। এই ধ্যানের পরবর্তী পদক্ষেপ আর আরাড় কালামের জানা নেই।

সিদ্ধার্থ তাই আরাড় কালামের কাছে তাঁর আশ্রম ত্যাগ করে চলে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। গভীর দুঃখে আরাড় কালাম তাঁকে সেই অনুমতি দিলেন। তিনিই সিদ্ধার্থকে বললেন, তাঁকে পরবর্তী মুক্তি মার্গের পথ দেখাতে পারবেন, একমাত্র একজনই আর তিনি হলেন রুদ্রক। সিদ্ধার্থ আরাড় কালামের আশ্রম ছেড়ে এরপর রুদ্রকের আশ্রমে এসে উপস্থিত হলেন। রুদ্রক ছিলেন রামের শিষ্য। তাঁর আশ্রমটি রাজগৃহের কাছে অবস্থিত ছিল।

বহুকাল রাজপুত্র সিদ্ধার্থের আর কোনও খবর না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে রাজা শুদ্ধোধন সিদ্ধার্থের খোঁজে  চারিদিকে দূত পাঠালেন। যশোধরার পিতা এবং সুপ্রবুদ্ধও নানা রাজ্যে দূত নিয়োগ করেছেন। দূতেরা এসে জানাল, সিদ্ধার্থ রাজগৃহ নগরে রুদ্রকের আশ্রমে শিষ্য হিসেবে আছেন। এরপর নিয়মিত দূতের মাধ্যমে পুত্রের খবর সংগ্রহ করতে লাগলেন শুদ্ধোধন।

সিদ্ধার্থ এরপর নির্বাণলাভের উপযোগী নয় মনে করে, রুদ্রকের আশ্রমও ছেড়ে চলে গেলেন। রুদ্রক তাঁকে নিবিড় ধ্যানের উপায় শেখালেন, সহজে মনোনিবেশের পদ্ধতিও তাঁর কাছ থেকে শিখলেন তিনি। তবুও যেন তিনি যা চাইছেন তা এ নয়। রুদ্রকের কাছ থেকে খানিকটা শ্বাসের ক্রিয়া, প্রাণায়াম ও কুম্ভকযোগ শিখলেন সিদ্ধার্থ। তবুও এইসময় ধ্যানভঙ্গের পর শান্তিময় উপলব্ধি ও অনুভব হারিয়ে যাচ্ছে তাঁর। সিদ্ধার্থের মন বলছে তাঁকে আরও পথ এগিয়ে যেতে হবে। তিনি তীব্র আকূতি নিয়ে পথ খুঁজতে লাগলেন। রুদ্রকের আশ্রম ছেড়ে তিনি আবার পথে বেরিয়ে পড়লেন।

পথে মক্ষলি গোশালের শিষ্যগণের তীব্র তপঃকৃচ্ছ চোখে পড়ল তার। এরা আজীবক সম্প্রদায়ের পরিব্রাজক। আরাড় কালামের শিষ্য হওয়ায় সিদ্ধার্থ হলেন শ্রমণ সম্প্রদায়ের পরিব্রাজক। আজীবকগণ এক একজন এক একভাবে আত্মপীড়ন করে চলেছেন। তাদের মুখে একধরণের প্রশান্তির বিভা! তপঃকৃচ্ছ? তবে কি এই পথেই মিলবে চির শান্তির আশ্রয়? ভাবতে থাকেন সিদ্ধার্থ।

কঠোর সাধনা

মগধ রাজ্যের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় উরুবেলা প্রদেশের সেনানী নামের গ্রামটি সিদ্ধার্থর খুব পছন্দ হল। গ্রামটির পরিবেশ অত্যন্ত শান্ত ও নিরিবিলি। তাছাড়া এই উরুবেলা নামের একটি অপূর্ব ইতিহাস আছে। উরুবেলার স্থান মাহাত্মও তাই অসাধারণ। উরু অর্থাৎ বালুকা এবং বেলা অর্থাৎ সীমা। অর্থাৎ বেলা অতিক্রম করে স্তূপাকৃতি বালুকা। বুদ্ধের জন্মের বহুশত বছর আগে এই স্থানে দশ হাজার একবার কুলপুত্র তাপস গৃহত্যাগ করে প্রব্রজ্যা অবলম্বনে করে তপস্যা করেছিলেন। সেইময় তাঁরা একদিন সমবেত হয়ে প্রত্যেকে এক সত্য আচরণের প্রতিজ্ঞা করেন।

তাঁরা বলেছিলেন, “কায়িক এবং বাচনীক অপরাধগুলি দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু মানসিক অপরাধ সবার অগোচরে থাকে। কারণ তা প্রকাশ পায় না। মানসিক অপরাধ অন্যের কাছে দুর্জ্ঞেয়ই থাকে এবং তা বিভিন্ন রকমের হতে পারে। যেমন কাম বা ইন্দ্রিয় চরিতার্থ বিষয়ক চিন্তা, ব্যাপাদ বিষয়ক চিন্তা বা পরের অহিত চিন্তা এবং বিহিংসা বিষয়ক বা প্রাণী বা পরের পীড়ন-ইচ্ছা। যিনি এই ধরণের পাপ চিন্তা মানসিকভাবেও করবেন, তিনি একপাত্র বালুকা নদীর তীর থেকে সংগ্রহ করে এনে সকলের অগোচরে এই স্থানে এসে ফেলে যাবেন। এটি হল তাঁর প্রতি দণ্ডকর্ম। প্রত্যেকে এটি পালন করবেন তাহলে সবাই সেই মানসিক পাপকর্ম থেকে মুক্তি পাবেন।”

এইভাবে প্রতিদিন অনতিক্রম্য রাশি রাশি বালুকা বা উরু জমা হতে লাগল, উপাসকদের মধ্যে কে বা কারা তা জমা করছেন, কেউই জানতে পারলেন না। বহুকাল পরে সেই বালুকনার উপর একটি চৈত্য নির্মাণ হল। স্থানটি একটি উল্লেখযোগ্য তীর্থক্ষেত্রের রূপ পেল। তারপর আবার বহুশত বছর কেটে গেল। স্থানটি জঙ্গলাকীর্ণ এবং জনহীন হয়ে গেলেও সেই থেকে জায়গাটির নাম হয়ে গেল উরুবেলা। অনেক পরে কিছু উপজাতীয় মানুষ এসে সেখানে কিছুটা জঙ্গল পরিষ্কার করে কয়েকটি বসতি গড়ে তোলেন, ধীরে ধীরে সেখানে কয়েকটি গ্রাম গড়ে ওঠে। সেনানী উরুবেলা প্রদেশের তেমনই একটি উল্লেখযোগ্য গ্রাম। জায়গাটি একটি প্রাচীন সাধনক্ষেত্র ছাড়াও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যেরও আকর।

একটু দূরে দূরে মনোরম কুঞ্জ ও তরুছায়া। গ্রামের প্রান্তে নৈরঞ্জনা নামের একটি ছোট নদী আছে, যা হেঁটেই পার হওয়া যায়। জলধারাটি অত্যন্ত স্বচ্ছ, দেখলে মনে হয়, ঠিক যেন একটি দর্পণের মত। এতে আনায়াসেই নদীর পাথুরে বুকের নিচ পর্যন্ত দেখা যায়। গ্রামের মানুষেরাও ধর্মপরায়ণ। এই গ্রামটিকেই তাঁর সাধনা করার উপযুক্ত স্থান মনে করে এখানেই থাকতে শুরু করলেন সিদ্ধার্থ। গ্রামের পাশেই আছে একটি গভীর বন। এই বনে আছে একটি প্রাচীন বিষ্ণু মন্দির। এখন পরিত্যক্ত হলেও সেই স্থান নাকি অতি পবিত্র। একজন যজ্ঞকারী ধার্মিক রাজা নাকি এখানে সাধনা করতেন, প্রায়োপবেশনে তাঁর মৃত্যু হয়েছে এখানেই। এই নৈরঞ্জনার তীরে বেশ কিছু বছর আগে গ্রামবাসীরা তাঁর শেষকৃত্য করেছিলেন।

এখানে আসার পর সিদ্ধার্থর অনুগামী হলেন পাঁচজন ভিক্ষু। এরা সকলেই আরাড় কালামের আশ্রমে সিদ্ধার্থের সঙ্গে একত্রে সাধনা করতেন। সিদ্ধার্থর অনুকরণে তাঁরাও মহৎ পথের সন্ধান করে আরাড় কালামের আশ্রম ছেড়ে চলে এসেছেন। তাঁরা রুদ্রকের আশ্রমে গিয়ে রাজপুত্রের খোঁজ করেছিলেন, সেখানে না পেয়ে, চারিদিক থেকে খবর সংগ্রহ করে, অবশেষে তাঁরা সেনানী গ্রামে এসে সিদ্ধার্থের খোঁজ পেয়েছেন। তাঁরা সিদ্ধার্থের সেবা পরিচর্যা করতে লাগলেন ও নানা ভাবে তাঁকে সাধনায়  সাহায্য করতে লাগলেন। আরাড় কালাম সিদ্ধার্থ সম্পর্কে তাঁর অত্যন্ত উচ্চ ধারণার কথা সকল শিষ্যদের বলেছিলেন। তারপর থেকেই এঁরা পাঁচজন, সিদ্ধার্থের অনুগামী হবেন বলে ঠিক করেন। কৌণ্ডণ্য বললেন,

“মিত্র সিদ্ধার্থ! তুমি রাজপুত্র! তবুও বয়সে তুমি আমার থেকে অনেক নবীন এবং যেহেতু আমরা এখন সতীর্থ, তাই তোমাকে তুমি সম্বোধন করলাম। আমরা আমাদের কৃতবিদ্য গুরুর মুখে শুনেছি, তুমি একজন মহাশক্তিধর সাধক। এমনকী তুমি আরাঢ়ের চেয়েও শক্তিশালী একজন ক্ষণজন্মা সাধক। যে সাধন বিভূতি তুমি মাত্র কয়েকদিনে লাভ করেছো, তা লাভ করতে আরাঢ়ের সত্তর বছর সময় লেগেছে। তাই আমরা তোমার অনুগামী হয়েছি। ধর্মপথের সন্ধান তুমি নিশ্চয় পাবে, এই আমাদের বিশ্বাস। এখন আমাদের অনুরোধ হল, এই পথের সন্ধান পেলে দয়া করে আমাদেরও সেই পথের সন্ধান দিও।”  

সিদ্ধার্থ হাসলেন। বললেন, “এসো বন্ধু! সকলে মিলে আমরা আজ থেকে একত্রে সাধন-অভ্যাস করি। যে বা যারা আগে পথের সন্ধান পাবে, সে উদ্যোগী হয়ে বাকিদের সাহায্য করবে। আজ থেকে এই আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক। আমি এবং তোমরা পাঁচজন, আজ থেকে- এখানে একই পথের পথিক হলাম!”

এই পাঁচজন হলেন বপ্প, অশ্বজিৎ, কৌণ্ডণ্য, ভদ্রক ও মহানাম। তাঁরা সিদ্ধার্থের থাকার জায়গা ঝাড়ু দিতেন এবং তাঁর জন্য প্রায়ই বন থেকে ফলমূল ও গ্রাম থেকে ভিক্ষান্ন সংগ্রহ করতেন।

সেনানী গ্রাম থেকে মাঝে মাঝেই একা গভীর বনের দিকে চলে যান সিদ্ধার্থ। তাঁর সঙ্গে একদিন বনের ভেতর এক অদ্ভুত লোকের দেখা হল। লোকটি আজীবক সম্প্রদায়ের। বনের উঁইপোকার ঢিবি থেকে মাটি তুলে তুলে গোগ্রাসে খাচ্ছিল সে। নাম জিজ্ঞাসা করতে সে বলল, তার নাম উপতিষ্য।

“একে বলে উৎকট আহার।” এই বলে লোকটা সেই মাটি তুলে মহানন্দে খেতে লাগল।

“মাটি কেন খাচ্ছেন? আমার কাছে কয়েকটি পাকা বেল আছে, যদি গ্রহন করেন খুব আনন্দ পাব। তাছাড়া এই বেলের গাছ এই অরণ্যে প্রচুর। এখানে অন্ততঃ ক্ষুধার্তকে না খেয়ে থাকতে হবে না। এমনকী বুনো আমড়া, আমলকী, জাম কোনও কিছুরই অভাব নেই।”

“না না আমি কোনও সুখাদ্য খাই না। এখন আমি উৎকট ভোজনের ব্রত পালন করছি। এই আমার ঈশ্বরের প্রতি প্রেম! তুমিও তো একজন পরিব্রাজক মনে হচ্ছে! যদি তাঁকে সত্যিই ভলোবেসে থাকো, তবে তাঁর জন্য কুৎসিত খাদ্যও খেয়ে দেখ! আশ্রমে না থেকে বনে আর পরিত্যক্ত মন্দিরে একাকি রাত্রে থেকে দেখো! তবে বুঝবে তিনি তোমার কত প্রিয়!”

এদিকে দিন চলে যেতে লাগল। কপিলাবস্তুর রাজবাড়িতে যশোধরা সিদ্ধার্থ চলে যাওয়ার পর থেকে অত্যন্ত ভেঙে পড়েছেন। একমাত্র শিশু রাহুলকে দেখে সে শোক ভুলতে চেষ্টা করছেন তিনি। প্রতিটি দিন তাঁর কাটছে তীব্র উদ্বেগ ও উত্তেজনায়। পারিবারিক রীতি অনুযায়ী সিদ্ধার্থ তাঁকে বিয়ের আগে নিজের নানা শক্তি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তার মধ্যে আছে ধনুর্বিদ্যা, অসি যুদ্ধ, মল্ল যুদ্ধ এইসব। সেই ধনুর্বাণ ছোঁড়ার চিহ্ন আজও বিদ্যমান। কেবল মানুষটিই আর তাঁর সামনে নেই। যশোধরাও নিজের জীবন থেকে সমস্ত ভোগ উপকরণ ত্যাগ করেছেন। ইতিমধ্যে বহুবার তাঁর বিবাহের প্রস্তাবও এসেছে  তখন পরাশর সংহিতা মতে একটি রীতি প্রচলিত ছিল,

“নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ

পঞ্চস্বাপৎসু নারীণাং পতিরন্যো বিধিয়তে।” 

দেবদত্ত বহুবার নানা রকম উপহার ও উপঢৌকন পাঠিয়ে, যশোধরাকে বিবাহ প্রস্তাব দিলেন। যশোধরা চরম উদাসীনতায় সবই প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি প্রাণান্তেও রাজপুত্র সিদ্ধার্থকে এ জীবনে আর ভুলতে পারবেন না। এক একসময় যশোধরা ভাবেন, তার স্বামী নিশ্চয়ই দুঃখ থেকে মুক্তিলাভের উপায় সন্ধান করে আবার এই সংসারে ফিরে আসবেন, কারণ সিদ্ধার্থ অত্যন্ত দায়িত্বশীল। তিনি কিছুতেই তাঁর কর্তব্য পালনে কোনও ত্রুটি রাখবেন না। পুত্র রাহুল এখন নিতান্ত শিশু, সন্তানের প্রতি পিতার কর্তব্য তিনি নিশ্চয় পালন করবেন। এদিকে শুদ্ধোদনের দূত সর্বত্র সিদ্ধার্থের খোঁজ করে চলেছে। শুদ্ধোদনও আশা করে আছেন সিদ্ধার্থ নিশ্চয় গৃহে ফিরে আসবে। পুত্রের এই দুঃখ কষ্টময় জীবন তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না।

অলঙ্করণঃ শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য

 

জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক একত্রে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s