ধারাবাহিক উপন্যাস-তথাগত-নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তী-শরৎ ২০২০

প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব , চতুর্থ পর্ব, পঞ্চম পর্ব, ষষ্ঠ পর্ব, সপ্তম পর্ব

নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তী

আগের পর্বের পর

অষ্টম পর্ব

হেমবত ও সাতগিরি যক্ষের বুদ্ধের কৃপালাভ

বুদ্ধ যখন মৃগদাবে তাঁর ধর্মচক্রে পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুদের ধর্মদেশনা করছিলেন, তখন ভূমিকম্পের মত অলৌকিক কিছু ঘটনা ঘটেছিল। সমগ্র জগত জুড়ে বহু মঙ্গলময় ঘটনা ঘটেছিল। সবার আগে সেই প্রভাব পড়েছিল গাছেদের উপর। কৃষকেরা বিনা চেষ্টায় মাঠভরা ফসল পেয়েছিল, পাহাড়ে, নদীতে ও প্রপাতে অনাহত নাদ ধ্বনিত হয়েছিল। বনভূমির গাছে গাছে অলৌকিকভাবে ফুল এসেছিল। শুধু তাই নয়, হিমালয়ের প্রত্যন্ত পাহাড়ের সমস্ত গাছেরা হঠাৎ করে ফুলের ভারে অবনত হয়েছিল।

যক্ষ সাতগিরি ও হেমবত হিমালয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রকৃত গুরুর অনুসন্ধান করে বেড়াচ্ছিল বহু দীর্ঘ বছর ধরে। তারা তবুও তেমন কোনো গুরুর সন্ধান পায়নি। একমাত্র সেই মহাত্মার কাছে ধর্মকথা শুনলে তারা তাদের এই মানবেতর যক্ষ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পারে।

হেমবত ও সাতগিরি দুজন হল যক্ষ। তারা দুই অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। বহু বছর ধরে কোনো ধর্মাত্মা মহান ব্যক্তির খোঁজ পায়নি বলে তারা ঠিক করেছিল, দুজন বন্ধু একদিকে না গিয়ে এবার হিমালয়ের দুই প্রান্তে দুজন পৃথকভাবে গুরুর অনুসন্ধান করবে। কারণ তারা শুনেছিল, হিমালয় হল সাধু ও মহাত্মাদের স্থান। সেখানে শত শত মহাত্মারা পর্বত কন্দরে নির্জনে সাধন অভ্যাস করেন। অনুসন্ধান করতে করতে সাতগিরি একদিন ভূমিকম্পের উৎসস্থান খুঁজে বের করল। তারপর মৃগদাবের বনে এসে অনাহত দুন্দুভী ধ্বনি শুনে সে বিস্মিত হয়ে সেই ধ্বনির উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। সেখানে সে দেখতে পেল জ্যোতির্ময় বুদ্ধকে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে সে বুদ্ধের অমৃতবচন আড়াল থেকে শুনতে লাগল। কিন্তু তাতে সে মনোনিবেশ করতে পারছিল না। সাতগিরি বুঝেছিল এই ধর্মমত শুনে সে যক্ষদেহ থেকে মুক্তিলাভ করবে, কিন্তু তা তো সে চায় না। কারণ তার বন্ধু হেমবত তখন সেখানে উপস্থিত ছিল না। সে বন্ধুকে ছাড়া একা মুক্ত হতে চায় না। বন্ধু হেমবতের চিন্তায় তার মন বিক্ষিপ্ত ছিল বলে সে বুদ্ধের বাণী শুনেও বিমুক্তি পথের কোনো ফল উপলব্ধি করতে পারল না।

সাতগিরি কিছুক্ষণ শুনেই বন্ধু হেমবতকে খুঁজতে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ল। এদিকে হেমবত তখন ছিল হিমালয় পর্বতের বনভূমিতে। সেখানে অকালে অপরূপ সুন্দর ফুল ফুটতে দেখে সে-ও তার বন্ধু সাতগিরিকে সেই বিস্ময়কর ঘটনা দেখাতে হিমালয় থেকে বন্ধু সাতগিরির উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। সাতগিরিও হেমবতকে খুঁজতে হিমালয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দিকেই যাচ্ছিল। পথে রাজগৃহের কাছে দুজনের দেখা হল। হেমবত সাতগিরিকে হিমালয়ে অকালে গাছে গাছে অসাধারণ ফুল ফোটার কথা বলতেই সাতগিরি বললেন,

”সমস্ত জগতেই এখন অলৌকিক ঘটনা ঘটছে, কারণ বুদ্ধ তাঁর ধর্ম উপদেশ দিচ্ছেন। আজ পূর্ণিমা রাত্রি। ওই দেখ বনভূমি কেমন জ্যোৎস্না প্লাবিত হয়েছে। আজ এক স্বর্গীয় রাত! চলো আমরা তাড়াতাড়ি সেই মহান শাস্তা তথা জগতের দেব ও মানুষের শিক্ষকের কাছে যাই, এবং তাঁকে দর্শন করি।”

হেমবত জিজ্ঞাসা করলেন, ”বন্ধু তুমি বুদ্ধের সম্পর্কে যা যা জানো, আমাকে বলো!”

সাতগিরি বুদ্ধকে দেখেই মোহিত হয়েছিল। সে তখন বুদ্ধের মহিমা হেমবতকে বলতে লাগল। এরপর তারা মৃগদাব বনে পৌঁছাল। তখন রাত হয়ে গেছে। উপদেশ দান শেষে বুদ্ধ একা বনের ভেতর চংক্রমণ করছেন। দূর থেকে বুদ্ধকে দেখেই হেমবত মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়ে তাঁকে বারবার প্রণাম জানালো। সে সামনে এসে বুদ্ধকে জিজ্ঞাসা করল,

”প্রভু জগতের উৎপত্তি কোথা থেকে? জগতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কীসের সাথে? কী থেকে জগত আসক্ত হয়? কীসে জগত ক্লিষ্ট হয়?”

বুদ্ধ হেমবতকে বললেন,

”ছয় বস্তুতে জগতের উৎপত্তি। ছয় বস্তুর সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ এবং ছয় বস্তুতে জগত আসক্ত, তাতেই জগত ক্লিষ্ট হয়। জগতে জীবের পাঁচ প্রকারের কামগুণ এবং অপরটি হল তার মন যা সেই কাম্য বস্তু পেলে আনন্দিত ও না পেলে ক্রুদ্ধ ও দুঃখিত হয়। এই হল ছয় বস্তু। এ থেকে বীতরাগ হলে তবে মানুষ দুঃখমুক্ত হয়। আমি বলি এটাই জগত থেকে মুক্তির পথ।”

হেমবত বললেন, ”প্রভু! কে জগতের প্লাবনরূপী এই কামনাকে অতিক্রম করে সংসার সমুদ্র থেকে উত্তীর্ণ হন? কে বিজয়ী হয়ে এই ভবসাগর অতিক্রম করেন? নিমজ্জিত হন না?”

উত্তরে বুদ্ধ বললেন, ”সর্বদা শীলসম্পন্ন, প্রজ্ঞাবান, সুসমাহিত, আধ্যাত্মচিন্তাকারী, স্মৃতিমানই কেবল এই দুস্তর প্লাবন অতিক্রম করতে পারেন। সর্ব বন্ধনমুক্ত, জন্মে বীততৃষ্ণ যিনি, তিনি নিমজ্জিত হন না।”

হেমবত ও সাতগিরি বুদ্ধের উপদেশ শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে তাঁর প্রশংসা করতে লাগলেন। দুজনেই বললেন, ”আজ আমাদের সুপ্রভাত! আজ আমাদের শুভ প্রাতুরুত্থান! কারণ আজ আমরা স্রোতউত্তীর্ণ মহর্ষি বুদ্ধের দর্শন লাভ করলাম। আজ থেকে আমরা দুই বন্ধু ও আমাদের একশো অনুচর মহাশক্তি সম্পন্ন বুদ্ধের শরণাগত হলাম। এখন আমরা সম্বুদ্ধ ও ধর্মের পূজা করতে করতে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, পর্বতের গিরি ও গুহায় বিচরণ করব।”

বুদ্ধের কৃপায় তাঁরা সকলে ধ্যানের প্রথমমার্গ উত্তীর্ণ হলেন, অর্থাৎ স্রোতাপন্ন হলেন।

যশ ও তাঁর বন্ধুদের প্রব্রজ্যা লাভ

সেই সময় বারাণসীতে সুকুমার শ্রেষ্ঠী ছিলেন সুবিখ্যাত এবং ধনী। তাঁর একমাত্র পুত্রের নাম ছিল যশ। অল্প বয়সে শ্রেষ্ঠী যশের বিবাহ দেন। যশের জন্য শীত গ্রীষ্ম ও বর্ষার উপযোগী তিনটি প্রাসাদ তৈরি করিয়েছিলেন তিনি। সেইসব অতি বিলাসবহুল প্রাসাদে যশ বহু নারী পরিবৃত হয়ে নৃত্যগীত চর্চায় ও সুরাপানে মত্ত হয়ে সময় কাটাতেন। যশ সর্বদা ভোগসুখে নিরত থেকে এমনকী কখনও প্রাসাদের নীচেও নামতেন না। সারা রাত নেশায় আচ্ছন্ন থাকতেন এবং সকালবেলায় ঘুমিয়ে থাকতেন। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে তাঁর কোনো সংস্রব ছিল না।

এক সন্ধ্যায় নারী পরিবৃত হয়ে আলম্বর, ও বীণা শুনতে শুনতে যশ নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়লেন। হঠাৎ মাঝরাতে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি দেখলেন তাঁর নারী সহচরীরা সকলেই ঘুমিয়ে আছে। ঘরের দিকে চোখ পড়ে চমকে উঠলেন যশ। তাঁর নিজের এতদিনের বাস করা এই শোবার ঘরটিকে তাঁর ভীষণ অচেনা মনে হল। যেন এক শ্মশানভূমি হয়ে উঠেছে তাঁর ঘরটি! চারিদিকে কুৎসিত মৃত মানুষের দেহ পড়ে আছে। যশের মস্তিষ্ক আর নেশায় আচ্ছন্ন নেই। তিনি খোলা জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন। অপূর্ব জ্যোৎস্না রাত্রি। তিনি আকাশের দিকে চাইলেন। কতদিন পর তিনি চাঁদের অপরূপ রূপ দেখলেন! সেই মুহূর্তে তাঁর প্রাসাদের বাইরে যেতে ইচ্ছে করল। নিজের বিছানা ও তার উপর নাচ গানের সরঞ্জাম, বাদ্যযন্ত্র এই সবই অসহ্য লাগল তাঁর। তাকিয়ে দেখলেন তাঁর বিছানায় নিদ্রিত নারীদের মুখ থেকে লালা গড়িয়ে পড়ছে। তিনি ঘৃণাভরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর পায়ে সোনার জরি বসানো নাগরা জুতোটি গলিয়ে প্রাসাদ থেকে নীচে নামলেন।

যশ দেখলেন তাঁর বাড়ির বাইরে বের হবার প্রধান দরজা যেন দৈবকৃপায় আজ খোলা রয়েছে। তিনি খোলা দরজা দিয়ে বহুদিন পরে মধ্যরাত্রে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। সেই অভিনব জ্যোৎস্না প্লাবিত নিশীথে তাঁর নিজের বাড়ি ও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত সমস্ত ভোগ উপকরণগুলিকে উপদ্রব বলে মনে হতে লাগল। তিনি দ্রুত পায়ে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলেন। কোথায় যাচ্ছেন? জানেন না। যেন কোন এক অদৃশ্য সুতোর টানে তিনি কেবল এগিয়ে চলেছেন। যশ হাঁটতে হাঁটতে নিজের নেশাচ্ছন্ন দিনগুলির কথা মনে করে বারবার বলতে লাগলেন বড়ো উপদ্রব! বড়ো উৎপাত!

যশ হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন নগরের প্রান্তে মৃগদাব বনে এসে পৌঁছেছেন। রাত কেটে গেছে। সবে ভোর হচ্ছে। সূর্যোদয়ের আগেকার মুহূর্ত। সমস্ত আকাশ জুড়ে শুরু হয়েছে রংয়ের খেলা। যশ মুগ্ধ হয়ে বনভূমির বুকে সূর্যোদয় দেখতে লাগলেন। সূর্যোদয় দেখে যেন তাঁর দেহমন শুদ্ধ হল। নিজের বিগত জীবন মনে করে তিনি আবার বলে উঠলেন,

”কী উৎপাত! কী ভয়ানক উপদ্রব!”

কে যেন তাঁর সেই কথা শুনে উত্তর দিল,

”কোথায় উৎপাত যশ? কোথায় উপদ্রব? এসো! এখানে এসো। এখানে কোনো উপদ্রব নেই, এখানে কোনো উৎপাতও নেই।”

চমকে তাকালেন যশ। তাঁর থেকে কয়েক হাত দূরে একজন সৌম্যদর্শন শ্রমণ পায়চারী করছেন। যশ ভাবতে লাগলেন,

”ইনি কে? ইনি তো আমার পরিচিত নন! কই আগে কখনও তো এঁকে দেখিনি। তবে? ইনি কী করে আমার নাম জানলেন?

যশ শ্রমণকে ভালো করে দেখলেন। তিনি শান্ত, ধীর। তাঁর দেহকান্তি সোনার মত উজ্জ্বল। আগে কখনও না দেখলেও শ্রমণকে ভীষণ পরিচিত মনে হচ্ছে তাঁর। যশ আবিষ্টের মত শ্রমণের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন।

শ্রমণ আর কেউ নন, স্বয়ং বুদ্ধ। তিনি যশকে উদ্যানের একাংশে যেখানে তিনি এবং পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুরা বিশ্রাম করেন সেখানে নিয়ে গেলেন। বুদ্ধকে দেখে যশের মনে হল এতদিন যেন তিনি তাঁরই প্রতীক্ষায় ছিলেন। যশ তাঁর সোনার পাদুকা জোড়া খুলে বুদ্ধের কুটীর প্রাঙ্গনে প্রবেশ করলেন এবং মাটিতে মাথা রেখে বুদ্ধকে প্রণাম করলেন। বুদ্ধ জানেন, যশ আজই দীর্ঘ সুষুপ্তির পর চোখ মেলেছেন। তিনি যশের এই বৈরাগ্যকে স্থায়ী করতে চাইলেন। সেইমত তিনি যশকে দান, শীল, নৈষ্ক্রম্য প্রভৃতির ফল ও কামসংবাসের কুফলগুলি ব্যাখ্যা করতে লাগলেন।

বুদ্ধের উপদেশ শুনে যশের মন শান্ত ও সমাহিত হল। তখন বুদ্ধ তাঁকে দুঃখ সমুদয়, দুঃখের নিরোধ এবং দুঃখ থেকে মুক্তির উপায় বললেন। সেই আসনে বসেই যশের বিরজ বিমল চক্ষু উৎপন্ন হল। যশ বুদ্ধের উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করে বললেন,

”ভগবান! আমি প্রব্রজ্যা প্রার্থী। আমাকে দয়া করে প্রব্রজ্যা দান করুন।”

এদিকে যশকে প্রাসাদে দেখতে না পেয়ে পরিচারিকারা সেই খবর সবাইকে এসে বলল। যশের পিতা মাতা উদ্বিগ্ন হয়ে চারিদিকে যশের খোঁজ করতে লাগলেন। মাত্র কয়েক ঘন্টা কেটেছে, তারই মধ্যে যশকে খুঁজতে যশের পিতা সুকুমার শ্রেষ্ঠী বহু লোকজনকে দূর দূরান্তে পাঠালেন। তারা ঘোড়ায় চড়ে বারাণসী নগরেরর সর্বত্র যশের খোঁজ করে বেড়াতে‌ লাগল। মৃগদাবে এসে যশের সোনার পাদুকা জোড়া দেখতে পেয়ে তারা সঙ্গে সঙ্গে যশের পিতা সুকুমার শ্রেষ্ঠীকে এসে জানাল। খবর পাবার সঙ্গে সঙ্গে সুকুমার শ্রেষ্ঠী স্বয়ং যশের খোঁজে রথে চড়ে মৃগদাব বনে এসে পৌঁছালেন। দূর থেকে পিতাকে আসতে দেখে যশ বুদ্ধকে মিনতি করে বললেন,

”ভগবান! দয়া করে আমাকে ওই সংসাররূপী নরকে আবার ফেরত পাঠাবেন না।”

বুদ্ধ যশকে আশ্বাস দিলেন। এবং তাঁকে সেখানেই বসতে বললেন। কিন্তু বুদ্ধের অলৌকিক ঋদ্ধিশক্তিতে শ্রেষ্ঠী তাঁর সামনে বসে থাকা যশকে দেখতে পেলেন না। সুকুমার শ্রেষ্ঠী বুদ্ধকে বললেন, ”প্রভু! আপনি যশকে দেখেছেন কি? শুনেছি, আমার কর্মচারীরা এখানে এসে তার পাদুকা দেখেছে। আশ্চর্য! ওই তো! সামনেই আমার পুত্রের পাদুকা জোড়া পড়ে আছে! দেখতে পাচ্ছি। যশ কি কিছুক্ষণ আগে এখানে এসেছিল কিংবা বর্তমানে এখানেই আছে প্রভু?”

বুদ্ধ বললেন, ”গহপতি! তা যদি জানতে চান, আপনাকে এখানে বসতে হবে। যদি শান্ত হয়ে কিছুক্ষণ বসেন, আপনি এখানে আপনার পুত্রকে অবশ্যই দেখতে পাবেন।”

বুদ্ধের কথায় গৃহপতি সুকুমার শ্রেষ্ঠী বুদ্ধকে অভিবাদন করে একধারে বসলেন। বুদ্ধ শ্রেষ্ঠীকে দান, শীল, আত্মসংযম ইত্যাদি উপদেশ দিতে লাগলেন। বুদ্ধের ধর্ম উপদেশ শুনে শ্রেষ্ঠী মুগ্ধ হয়ে বলতে লাগলেন,

”প্রভু! আপনি যেন এক অন্ধকে আলো দেখালেন! বিমুঢ়কে পথ দেখালেন!”

বুদ্ধ তখন বিভিন্নভাবে তাঁর কাছে ধর্ম ব্যাখ্যা করতে লাগলেন। শ্রেষ্ঠী কৃতার্থ হয়ে ত্রিশরণ উচ্চারণ করে বুদ্ধের শরণাগত উপাসক হলেন। অর্থাৎ ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি। ধর্মং শরণং গচ্ছামি। সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি।’ ইনি বুদ্ধের প্রথম ত্রিবাচিক উপাসক। ত্রিশরণ শেষে যশের পিতা বুদ্ধকে প্রণাম করে বসতেই যশকে তাঁর সামনে বসে থাকতে দেখতে পেলেন।

শ্রেষ্ঠী যশকে বললেন, ”তোমার মাতা তোমার শোকে আকুল হয়ে সারাক্ষণ বিলাপ করছেন। তুমি কি তাঁকে জীবন দান করবে না পুত্র? শীঘ্র গৃহে ফিরে চলো। তুমি কি প্রব্রজ্যা নিতে চাও? তাই কি তুমি এখানে এসেছো? যদি তাই হয়, তোমার সেই ইচ্ছে তুমি দূর করো। তুমি আমাদের একমাত্র সন্তান! কত পুণ্যে আমরা তোমাকে লাভ করেছি। আমার ধনসম্পদে একমাত্র তোমারই অধিকার। মনে রেখো, আমি বারাণসী নগরের রাজার শ্বেতছত্র লাভ করে এই নগরের শ্রেষ্ঠীপদ পেয়েছি। আমার অবর্তমানে আমার সুবিশাল এই বাণিজ্য, এই কর্মকাণ্ড তোমাকেই দেখে রাখতে হবে। তোমাকে কখনও জল অথবা স্থলপথে বহুদূর পথ অতিক্রম করতে হবে না। নানা দেশ বিদেশ থেকে উপযুক্ত মূল্যে পণ্য আনবেন আমার অধীনস্থ বণিকেরা এবং অণুশ্রেষ্ঠীরা। তুমি অগ্রশ্রেষ্ঠী হয়ে কেবল তাঁদের সবার উপর নজর রাখবে। তুমি গৃহে ফিরে চলো যশ! প্রব্রজ্যার কঠোর জীবন তুমি পালন করতে পারবে না। দুঃখময় জীবন আমার পুত্রের শোভা পায় না। সে অনাদরে ভিক্ষান্ন খেয়ে বাঁচতে পারবে না। গৃহে ফিরে চলো পুত্র!

নগরের শ্রেষ্ঠ নটীরা সবসময় তোমার মনোরঞ্জন করবে, তোমার শরীর হীরে ও নানা রত্নের অলঙ্কারে ঝলমল করবে। কান সর্বদা অসাধারণ সঙ্গীত ও শুভকথা শুনবে। চোখ দেখবে রাশি রাশি মৎস্য, মাংস, মিষ্টান্নাদি প্রভৃতি সুখাদ্য এবং জিহ্বা ইচ্ছেমত তার স্বাদ গ্রহন করবে। তোমার পরনে থাকবে কাশীর সূক্ষ্ম ও মূল্যবান বস্ত্র, গলায় দুলবে সুগন্ধী শ্বেতপুষ্পের মালা, উর্ধবাসের নীচে শরীর জুড়ে চন্দন, অগরু প্রভৃতির আলেপন থাকবে। তুমি জানো, তোমার বাসস্থানগুলি অত্যন্ত সুন্দর। বারাণসীর শ্রেষ্ঠ স্থপতি সেগুলি নির্মাণ করেছেন, সেইসব প্রাসাদে তিনটি ঋতুতে অত্যন্ত আরামে বসবাস করা যায়, এবং সেখানে আছে মনোরম ফল ও ফুলের অপূর্ব উদ্যান। তুমি আজীবন বিলাস ও বৈভবে যাতে আয়েস করে থাকতে পারো, তোমার পিতা তেমন ব্যবস্থাই চিরস্থায়ী করেছেন। এই ভোগ উপকরণ ভোগে রত থেকে তুমিই হবে বারাণসীর শোক ও দুঃখশূন্য একজন সর্বাধিক সুখী মানুষ। তোমার জীবনে দুঃখের ছায়ামাত্র থাকবে না।”

যশ এই কথার উত্তর না দিয়ে বুদ্ধের মুখের দিকে করুণভাবে কেবল তাকালেন। বুদ্ধ উত্তর দিলেন,

”যশের কাছে বিলাস বৈভব এখন আর আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে না, গহপতি! বিগত রাতে সেই সমস্ত উপকরণকে সে স্বেচ্ছায় বিসর্জন দিয়ে এখানে চলে এসেছে। মানুষের কাছে সুখ হল আপেক্ষিক বস্তু। তাই বারাণসী নগরের শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যক্তিই যে সব থেকে সুখী মানুষ হবেন এর কোনো স্থিরতা নেই। একজন ভিক্ষুকও দিনের শেষে নিজেকে সবথেকে সুখী মানুষ মনে করতে পারে। মানুষের গর্ব করার মত আছেই বা কী? তার শরীরটাও যে তার অধীন নয়। কালের আক্রমণে তা একসময় জীর্ণ ও পুরনো হয়ে যায়। মানুষ চিরকাল বেঁচেও থাকে না, তাঁর ভোগসুখ উপভোগের সময়ও অসীম নয়। তাকে বার্ধক্য ও ব্যাধির যন্ত্রনা সহ্য করতে হয়। আপনার পুত্র বন্ধনমুক্ত ও অনাসক্ত পরিব্রাজকের জীবন গ্রহণ করবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আপনার কি যশকে দেখে মনে হচ্ছে সে এখনও সাধারণ মানুষের মত নানাবিধ সুখভোগের উপযোগী আছে?”

”না প্রভু! একটি রাতের মধ্যে আপনি তাঁকে অদ্ভুতভাবে সম্পূর্ণ পরিবর্তিত করে দিয়েছেন। যশের মুখমণ্ডলে এখন এক অপরূপ আলো দেখছি আমি, এক পরম পবিত্রতার চিহ্ন। আমি তা দেখে বিস্মিত হয়েছি। ভেবেছি এ কী করে সম্ভব হল? তাই তো ওকে আমি ভোগ উপকরণ সমূহের বিবরণ দিলাম, যাতে ওর সব পূর্বস্মৃতি জেগে ওঠে। আমি সত্যিই বিস্মিত! এরপরেও সে সংসারে ফিরে আসতে চায় না!

এখন আমি এটাই বলব যে, সে যা চায় আমি তাতে আর বাধা দেব না। কারণ তা হবে আমার এক ভয়ানক পাপ!  যদি যশ সংসারত্যাগ করে প্রব্রজিত হয়েই সুখী হয়, তবে তাই হোক। আমি ফিরে গিয়ে পরিবারের সবাইকে সব কথা বুঝিয়ে বলব। তবে আপনি যদি দয়া করে যশকে নিয়ে সশিষ্য একবার আমার গৃহের নিমন্ত্রণ স্বীকার করেন, আমি কৃতকৃতার্থ হব। যশের মাতাও যশকে একবার শেষবারের মত দেখতে পাবে।”

সশিষ্য বুদ্ধ উপস্থিত হয়েছেন যশের বাড়িতে। একটি খুব রোগা অল্পবয়সী কিশোরী বধূ বুদ্ধের পা পাদপীঠের উপর রেখে জল ঢেলে ধুয়ে দিল। এক মুহূর্তের জন্য বুদ্ধ তখন দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন মেয়েটির মুখের দিকে। দেখেই বুঝলেন কিশোরী বধূটি অসম্ভব মনোকষ্টে আছে। সে হল যশের স্ত্রী সুমেধা। বুদ্ধ মেয়েটির মনোকষ্টের কারণ অনুভব করতে পারলেন। বুদ্ধ আশ্চর্য হলেন মেয়েটি যশ প্রব্রজিত হয়েছে বলে দুঃখিত নয় এতটুকু, সে দুঃখিত অন্য একটি কারণে। মেয়েটির মন বুঝতে পেরে খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন তিনি।

সুমেধা মনে মনে বুদ্ধের ধর্ম গ্রহন করে প্রব্রজিত হতে চায়! লজ্জা ও ব্রীড়াবনত হয়ে সে মুখ ফুটে সে কথা কাউকে বলতে পারছে না, তাই ভয়ানক মনোকষ্টে আছে সে। তাঁর দুঃখী ও পবিত্র মুখটি দেখে বুদ্ধ ভাবতে লাগলেন যশোধরার কথা। যশোধরার সঙ্গে যেন কিছুটা সাদৃশ্য আছে মেয়েটির। তিনি চোখ বুঝলেন। তাঁর সামনে আলোকিত ভবিষ্যতের পথ। সেই আলোয় দাঁড়িয়ে আছে যশোধরা, সুমেধা, যশের মাতা, তাঁর পালিতা মাতা প্রজাপতি গৌতমী এবং আরও অনেক অনেক নারী ভিক্ষুণী। তাঁদের পরনে গৌরীক বসন ও গৌরীক উর্ধবাস, খালি পা এবং হাতে কষ্টি পাথরের ভিক্ষাপাত্র ও কাঁধে গৌরীক ঝুলি। বুদ্ধ নারীর সুরক্ষার প্রশ্নে এখনই নারীদের প্রব্রজ্যায় সম্মতি দেননি। ভিক্ষুদের থাকার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থাই নেই, তাঁরা রাত্রে থাকেন গুহা ও বনে জঙ্গলে। এভাবে নারীদের থাকা সম্ভব নয়। তাদের জন্য দরকার সুরক্ষিত বাসস্থান। তবে কি আগামী দিনে নারীরা সঙ্ঘে যোগ দেবে? অনাগত ভবিষ্যতে নিশ্চয় সঙ্ঘ আরও অনেক বড়ো হবে, তখন ধনী শ্রেষ্ঠী বা রাজানুগ্রহ লাভ ঘটা সম্ভব। বুদ্ধ সুমেধাকে আশীর্বাদ করে সেই ভবিষ্যত ভিক্ষুণীদের উদ্দেশ্যেই যেন বললেন,

”তোমাদের সবার আশা পূর্ণ হোক কল্যাণী!”

তারপর বুদ্ধের শরণ নিলেন যশের স্ত্রী সুমেধা ও যশের মাতা বিমলা।

যশের স্ত্রী সুমেধা ও যশের মাতা বিমলাই হলেন বুদ্ধের প্রথম ত্রিবাচিক নারী উপাসক।

***

বুদ্ধের সংঘে প্রব্রজিতদের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বুদ্ধ যশকে নিয়ে তাঁর বাড়িতে সশিষ্য যাওয়ার পরেই বারাণসীর অণুশ্রেষ্ঠী ও শ্রেষ্ঠী পরিবারের চারজন তরুণ প্রব্রজিত হতে চেয়ে সংঘে যোগ দিলেন। এঁরা হলেন বিমল, সুবাহু, পূর্ণজিৎ ও গবম্পতি। যশের পিতার আরও পঞ্চাশটি সহায়ক ও বন্ধু পরিবার ছিল। তাঁরাও মনে করলেন যে নিশ্চয়ই প্রব্রজিত হওয়া অত্যন্ত লাভজনক ও অসামান্য বিষয়। কারণ যশের পিতা খুবই বিচক্ষণ ও অভিজাত ব্যক্তি। তাঁরা তাই সমাজে যশের পিতার সমান মর্যাদা পেতে তাঁদের পুত্রদেরও প্রব্রজিত করতে চাইলেন। এইভাবে আরও পঞ্চাশজন তরুণ সংঘভুক্ত হলেন। তাঁরা সকলেই কয়েক মাসের ভেতর অর্হত্ব লাভ করলেন। এভাবে তখন জগতে মোট একষট্টি জন অর্হৎ হলেন।

বেশ কয়েক মাস কেটে গেল। বুদ্ধ ঠিক করলেন তিনি উরুবেলা যাবেন। সেখানে তিনি সাধনা করার সময় দীর্ঘ সময় কাটিয়েছিলেন। তখনই তিনি দেখেছেন সেখানে অগ্নি উপাসক উরুবেল কাশ্যপ অসম্ভব জনপ্রিয় একজন আজীবক সম্প্রদায়ের ধর্মপ্রচারক। তাঁরা তিন ভাই। উরুবেল কাশ্যপ জ্যেষ্ঠ, তারপর নদী কাশ্যপ মধ্যম ও কনিষ্ঠ হলেন গয়া কাশ্যপ। তিনজনের তিনটি আশ্রম আছে। সেখানে উরুবেল কাশ্যপের পাঁচশো এবং নদী ও গয়া কাশ্যপের তিনশো ও দুশো শিষ্যরা বাস করেন। বুদ্ধ জানেন উরুবেল কাশ্যপ সাধনস্তরে কিছুদূর অগ্রসর হয়েছেন, কিন্তু তিনি অহংকারী ও একগুঁয়ে স্বভাবের এবং প্রতিপত্তিলোভী হওয়ার কারণে সিদ্ধিলাভ করতে পারেননি তবে দুষ্কর তপস্যায় তাঁর ক্লান্তি নেই। সাধনায় তাঁর কিছু শক্তিলাভও হয়েছে। তবে ওই পর্যন্তই, পরম বোধিজ্ঞান তিনি আজও লাভ করতে পারেননি। বুদ্ধ ঠিক করলেন সংঘের প্রসারের জন্য উরুবেল কাশ্যপকে তিনি তাঁর কিছু অসাধারণ ঋদ্ধিশক্তির পরিচয় দেবেন, এতে উরুবেলের অহংকার নাশ হয়ে মঙ্গল হবে। উরুবেলায় যাবার আগে বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের ডেকে পাঠালেন।

ভিক্ষুরা বিভিন্ন স্থানে ধর্মদেশনা করতে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা এখন বিভিন্ন স্থানে থেকে সাধনা করেন ও দিনে একবার ভিক্ষা করে যা সংগ্রহ হয়, তা-ই খেয়ে থাকেন। 

বুদ্ধের আহ্বানে তাঁরা আবার একত্রিত হলেন। বুদ্ধ বললেন,

”আমি এখন ধর্মদেশনার জন্য একাকী উরুবেলার সেনানী গ্রামে যাব। সেই গ্রামেই আমি বোধিলাভ করেছি, তাই ধর্মদেশনার মাধ্যমে গ্রামের মানুষের মঙ্গলসাধন করা আমার কর্তব্য।

ভিক্ষুরা! তোমরা এতদিন কেবল ধর্মোপদেশ দিয়েছ, এবং যারা ধর্মে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল, তাদের নিয়ে আমার কাছে উপস্থিত হয়েছিলে। এতে সকলের অনর্থক পরিশ্রম হয়েছে। আমি এখন থেকে তোমাদের সকলকে ত্রিশরণের মাধ্যমে উপসম্পদা দেবার অনুমতি দিলাম।

ভিক্ষুরা কেউ এক পথে যাবে না। প্রত্যেকে যে যার মত বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ো। কেউ আমার অনুগমন করবে না। এক একজন এক একদিকে যাও! যদি কোনো উপযুক্ত প্রার্থী তোমাদের কাছে আগ্রহী হয়ে প্রব্রজ্যা গ্রহন করতে আসে কিংবা কোনো বিখ্যাত কুলপুত্র প্রব্রজ্যা প্রার্থী হয়ে আসে তাহলে নিজের সমস্ত কাজ ফেলে তখনই তাদের প্রব্রজ্যা দান করবে। বালকদের ক্ষারমাটি দিয়ে একা নদীতে স্নান করতে পাঠাবে না, বরং তাদের নিজেরাই সস্নেহে স্নান করিয়ে দেবে। চুলে নিজেরা মৃত্তিকা মাখো বলবে না, তোমরাই মৃত্তিকা মাখিয়ে তাদের চুল ধুয়ে দিয়ে তারপর কেশমুন্ডন করবে। এমন স্নেহময় আচরণ করলে বালকেরা সঙ্ঘের অনুরক্ত হবে, আর তারা গৃহে ফিরে যেতে চাইবে না।

প্রব্রজ্যাপ্রার্থী কেশ ও দাড়ি মুন্ডন করবে এবং স্নান করে কাষায় বস্ত্র পরে সমবেত ভিক্ষুদের পাদবন্দনা করবে। তারপর পদাগ্রে বসে উত্তরাসঙ্গ বা উত্তরীয় কাঁধের একপ্রান্তে রেখে হাত অঞ্জলিবদ্ধ করে সে বলবে — ‘আমি বুদ্ধের শরণাগত হলাম, ধর্মের শরণাগত হলাম, সঙ্ঘের শরণাগত হলাম। এইভাবে তিনবার উচ্চারণ করে সে ত্রিশরণ নেবে।”

ক্রমশ

   জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক একত্রে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s