ধারাবাহিক উপন্যাস -অন্তিম অভিযান-পিটার বিশ্বাস

পূর্বপ্রকাশিতের পর

কর্মীদের শেষ দলটাও অনেকক্ষণ হল চলে গেছে। গুহাটা আবার সেই প্রথমদিকের দিনগুলোর মতই নিঃশব্দ। সে সময়টা পাতালগুহার এক কোণে আছড়ে পড়তে থাকা জলপ্রপাতটার ঝরঝর শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজই আসত না জিষ্ণুদের কানে। তারপর, আস্তে আস্তে একাঘ্নির ওয়ার্কশপ গড়ে ওঠবার পর থেকে আলোয়, শব্দে গুহাটা একেবারে জমজমাট থেকেছে গত কয়েকটা বছর।

আজ ফের নতুন করে নৈঃশব্দ এসে ঘিরে ধরেছে তাকে। ছাদ থেকে একটা তীব্র আলোর ধারা দানবিক ক্ষেপণাস্ত্রটাকে আলোকিত করে রেখেছে। বাকি সমস্ত আলো এখন নেভানো। গ্রামবাসীদের তাই ইচ্ছা ছিল।

কথাটা খেয়াল হতে মৃদু একটা হাসি ফুটে উঠল প্রফেসর বোসের মুখে। তাঁর পাশে বসে থাকা বৃদ্ধ গ্রামপ্রধানের দেখা গেল সেটা নজর এড়ায়নি। তীক্ষ্ণধী মানুষটা যেন খোলা খাতার মতই পড়ে নিতে পারেন তাঁর পরিচিত মানুষদের চিন্তাকে। নীচু গলায় বললেন, “সরল মানুষের বিশ্বাসকে নিয়ে হেসো না সত্যব্রত। ওর মধ্যে সত্যি লুকিয়ে থাকে।”

dharaontim02 (Medium) প্রফেসর বোসের চোখের সামনে খানিকক্ষণ আগের দৃশ্যগুলো ভাসছিল। অস্ত্রনির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু সম্পূর্ণ প্রযুক্তিটাই এখনো অপরীক্ষিত। কাজেই ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরক কেন্দ্রিয় অংশটা ইনস্টলেশনের পরে তার কাছাকাছি এলাকায় এক নিজেকে ছাড়া আর কাউকে রাখতে সাহস পান না প্রফেসর। এমনকি জিষ্ণুকেও চলে যেতে হবে। তবে সে কথা এখন তাকে বলা যাবে না। বেঁকে বসবে সে। এ নিয়ে কা পোনের সঙ্গে প্রফেসরের দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে প্রফেসরের। প্রথমবার জিষ্ণুকে সরিয়ে দেবার কথাটা শুনে একটু অবাকই হয়ে তাঁর দিকে দেখেছিল কা পোন। তারপর মাথা নেড়ে বলেছিল, “তাহলে আপনারও হৃদয় বলে কোন বস্তু আছে প্রফেসর!”

প্রফেসর বোস উত্তরে মাথা নেড়েছিলেন, “জিষ্ণুকে আমি ভালোবাসি কা পোন। সে আমার একমাত্র ছেলে। কিন্তু তাকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দিতে চাইছি সম্পূর্ণ অন্য কারণে। সে এই প্রজেক্টের ফল ব্যাক মেকানিজম। আমি ছাড়া একমাত্র সে জানে কেমন করে একাঘ্নিকে গড়ে তুলতে হয়, কেমন করে তাকে সঠিক সময়ে চালু করতে হয়। সে জটিল বিজ্ঞান আমি তাকে হাতে ধরে শিখিয়েছি। যদি এখানে অপেক্ষা করবার সময়ে আমার কিছু হয়ে যায় তাহলে তাকে তুমি এইখানে ফিরিয়ে আনবে। এ কাজ সম্পূর্ণ করবার দায়িত্ব তাকে নিতে হবে তখন। আর তাই তাকে আমি আমার সঙ্গে রাখতে চাই না। এ মিশনের দুটো প্রাণ। সে দুটো আলাদা আলাদা জায়গায় রাখাই সঠিক কৌশল হবে।”

“কিন্তু,সে কি রাজি হবে আপনাকে ছেড়ে যেতে? জিষ্ণু আপনাকে প্রাণের চেয়েও ভালোবাসে। ঈশ্বরের চেয়েও বেশি ভক্তি করে।”

“রাজি তাকে হতে হবে কা পোন,” প্রফেসরের চোখের কোনে দু ফোঁটা জল চিকমিক করে উঠেছিল বুঝি। তারপর তা মুছে ফেলে দৃঢ় গলায় বলেছিলেন, “তোমাকে সে অনেকটাই মানে, ভালোও বাসে। তাকে বোঝাবার দায়িত্ব তোমার। আগামী আট বছর তাকে সাবধানে রাখার, জীবনের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলবার দায়িত্বও তোমাকে নিতে হবে। এ গুহার সমস্ত পথ বন্ধ করে দিয়ে আমি এর ভেতরে ওই মিসাইলকে নিয়ে একেবারে হারিয়ে যেতে চাই এই সময়টা। শেষ আঘাতবিন্দু আসবার আগে যেন কোনমতেই আর আমার বা একাঘ্নির কোন সন্ধান না পায় ওরা। সম্পূর্ণ পৃথিবীর ভাগ্য নির্ভর করছে এর ওপর। তার কাছে আমাদের ছোটোছোটো ভালোবাসা, চাওয়াপাওয়ার দাম কতটুকু কা পোন?”

এর কোন উত্তর কা পোনের কাছে ছিল না। উত্তর দেবার চেষ্টাও সে করেনি। শুধু মনে মনে বলেছিল, “তুমি মানুষ নও প্রফেসর। হয় তুমি পাথর, নয় ঈশ্বর।”

খানিক বাদে প্রফেসর ফের মুখ খুলেছিলেন, “কিন্তু তাকে মানুষ করে তুলবে তোমার পথে নয়, তাকে-”

কা পোনের মুখটা লাল হয়ে উঠেছিল এক মুহূর্তের জন্য। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলেছিল, “আমার পেশা নিয়ে এমন সরাসরি কিছু না বললেও হত। আপনার ছেলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা পাবে। দশজনের মধ্যে একজন হয়ে সে ফিরে আসবে আপনার কাছে আপনি বিজয়ী হবার পর। দেখে নেবেন প্রফেসর। কা পোন চি-র শপথ রইল আপনার কাছে।”

গ্রামবাসীদের সরিয়ে দেবার কাজটা অবশ্য অনেক সরল ছিল। সব কথা বুঝিয়ে বলতে তাঁর ইচ্ছাকে অমান্য করেনি গ্রামের মানুষজন। গুহামণ্ডলের গোলকধাঁধার মধ্যে পথ খুঁজে খুঁজে ভেতর দিয়ে এগিয়ে পাহাড়ের একেবারে শেকড়ের কাছে তাদের নতুন আস্তানা তারা গত কিছুকাল ধরেই গড়ে তুলেছে ধীরে ধীরে। আজ এ গ্রাম ছেড়ে সেই নতুন গ্রামে চলে যাবার আগে একাঘ্নিকে পুজো করেছে তারা। গুহার সমস্ত আলো নিভিয়ে দিয়ে শুধু একটি আলোকে একাঘ্নির ওপরে জ্বালিয়ে রেখে সমবেত গলায় দুর্বোধ্য কিন্তু সুরেলা উচ্চারণের মন্ত্র পাঠ করেছে প্রকৌশলের দেবতা জাওগির উদ্দেশ্যে। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, জাওগিই পৃথিবীকে রক্ষা করবার জন্য প্রফেসরকে পাঠিয়েছিলেন তাদের মধ্যে। এ অস্ত্রও তাঁরই দান।

“এবার আমাকে উঠতে হবে সত্যব্রত।” বলতে বলতে বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন এইবার।

“হ্যাঁ জোরাম। আপনি এগিয়ে গেলে আমাকে পরের কাজগুলো শেষ করতে হবে। আর দেরি করা ঠিক নয়।”

“জাওগি তোমার সহায় হোন।”

তাঁর ন্যুব্জ শরীরটা একটা লাঠিতে ভর করে, বয়ে যাওয়া জলস্রোতটাকে ধরে ধরে এগিয়ে গেলেন বৃদ্ধ। এ পাহাড়ের কেন্দ্রীয় শিকড়কে ঘিরে এক গভীর পাতাল হ্রদে গিয়ে মিশেছে এই নদী। সে পথ একা একা খুঁজে নিতে তাঁর কোন অসুবিধে হবে না। গুহার দূরতম কোণে যেখানে নদীটা একটা সুড়ঙ্গ বেয়ে বয়ে চলেছে নীচের দিকে, সেইখানে পৌঁছে এক মুহূর্ত থেমে দাঁড়ালেন বৃদ্ধ। তারপর একটুকরো অন্ধকারের মতই এগিয়ে গিয়ে মিশে গেলেন তার গাঢ় অন্ধকার অন্দরমহলে।

********

“বাবা, খেয়ে নেবে? কাল থেকে কিছু মুখে তোলনি তো!”

জিষ্ণু তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে ডাকছিল। তার হাতে একটা পুঁটুলি থেকে সদ্য তুলে আনা নানান রঙের একরাশ ছত্রাক উঁকি মারছিল।

সেইদিকে তাকিয়ে একটু হাসি ফুটে উঠল প্রফেসরের মুখে। এখন শুধু ছেলেটাকে নিয়ে এখন দিন পনেরো একটু আনন্দ করা, একটু তার সঙ্গে থাকা, আর একটু একটু করে তাকে তৈরি করে তোলা আসন্ন লম্বা বিচ্ছেদটার জন্য।

জিষ্ণুর হাত থেকে পুঁটুলিটা নিয়ে তারথেকে একটা লাল রঙের রসালো বলের মত দেখতে ছত্রাকে ছোট একটা কামড় বসিয়ে চিবোতে চিবোতে বললেন, “খাব, তবে এ দিয়ে পেট ভরাব না আজ আর। আজ ফ্রেশ মাংস খাব। এখানকার জঙ্গলে বুনো এলাচ আর লেমন গ্রাস হয় একজাতের। সেই দিয়ে পাখির মাংস রোস্ট করলে যা খেতে হয় বুঝলি?”

“পাখি—মানে-”

“সে কী রে? এর মধ্যেই ভুলে গেলি? আজ আমাদের বনভোজনের দিন যে!”

সামনে পড়ে থাকা ছোটো পর্দাটার গায়ে আঙুল ছুঁইয়ে তাকে জাগিয়ে তুলল জিষ্ণু। তার স্পিকার থেকে রিমঝিম গুরুগুরু শব্দ আসছিল। সেখানে ঘন ইস্পাতনীল মেঘের ছায়া পড়েছে।

“বাইরে কিন্তু বৃষ্টি নেমেছে বাবা। এই দেখ।”

“শ্রাবণ মাস। বৃষ্টি তো নামবেই। তাতে কী? বৃষ্টির একটা বড়ো সুবিধে কী জানিস? পাখিগুলো সব যার যার আস্তানায় ঢুকে বসে থাকে। চোখকান খুলে বাসাগুলো ধরতে পারলেই সহজ শিকার।”

“বুঝলাম। কিন্তু মারবে কী দিয়ে? পাথর ছুঁড়ে? বাইরে তো লেজার পিস্তল চালানো চলবে না। ভুলে গেছ?”

“উঁহু ভুলিনি। আকাশে লালপিওতে ইয়াব্বড়ো চোখ মেলে চেয়ে আছে সে আমি ভুলব কেমন করে? লেজার ব্লাস্ট হলেই চেপে ধরবে এসে।”

আশ্চর্য তরল হালকা গলায় কথা বলছিলেন প্রফেসর বোস। ভয়ানক আতঙ্কের বিষয়টাকে কত হালকাভাবে বলে চলেছেন। জিষ্ণু অবাক হয়ে দেখছিল তাঁর দিকে। এতগুলো বছরের মধ্যে এই প্রথমবার নিজের বাবাকে যেন চিনতে পারছিল না সে। যেন নতুন করে নিজের কিশোর বয়সটা ফিরে পেয়েছেন তিনি কোন জাদুমন্ত্রে।”

কথা বলতেবলতেই প্রফেসর তাঁদের ঘরটার মধ্যে ঢুকে গিয়ে একজোড়া বড়োসড়ো গুলতি বের করে নিয়ে এসেছেন। টাইটানিয়ামের তৈরি হাতলগুলোর ধাতু ইস্পাতের চেয়ে শক্ত অথচ নমনীয়। তাতে লম্বা চামড়ার ফিতে লাগানো। একটা থলের থেকে ধাতুর তৈরি ছোটো একটা গুলি বের করে এনে তার একটায় বসাতে বসাতে বলছিলেন, “বড়ো মিসাইলের সঙ্গে সঙ্গে এই ছোটো মিসাইল লঞ্চারদুটোও আমি বানিয়ে রেখেছি বহুকাল আগে থেকে, আজকের দিনটার জন্য, বুঝলি? এবারে দ্যাখ শুধু এর শক্তিটা। দূরে পাথরের গায়ে ওই হলদে রঙের প্যারাসোল মাশরুমের থোকাটা ঝুলছে দেখেছিস? এইবারে—”

বলতে বলতেই তাঁর গুলতি থেকে অব্যর্থ লক্ষে ধেয়ে গিয়েছে একটা গুলি। ঠং করে শব্দ উঠল একটা। মাশরুমের থোকাটা থরথর করে কেঁপে উঠে ছিটকে পড়ল নীচের দিকে। জিষ্ণু উঠে গিয়ে সেটাকে কুড়িয়ে আনতে আনতে বিস্মিত চোখে দেখছিল সেটার দিকে। থোকাটায় কোন চোট আসেনি। শুধু নমনীয় টাইটানিয়াম হ্যান্ডেলের স্থিতিস্থাপক ধাক্কায় তৈরি তীব্র শক্তির আঘাতে তার গোড়ার বেলেপাথরের একটা অংশ ভেঙে মাশরুমের থোকাটাকে সঙ্গে নিয়ে নেমে এসেছে নীচে।

“কীরে , কী মনে হয়? পাখি মরবে?”

“হুম। শুধু পাখি নয়, চাইলে মানুষও মারা যাবে ওতে। চালায় কেমন করে?”

“আয় দেখিয়ে দি। এই যে এইখানটা চেপে ধর—তারপর ফিতেয় গুলিটা বসিয়ে –এই যে এইভাবে টেনে ধর—এক চোখ বন্ধ করে নিশানা কর—হ্যান্ডেলটা যেন টানের চোটে বেঁকে যায়। কী মারছিস তার ওপরে নির্ভর করবে কতটা বাঁকাবি—মানে কতটা শক্তি দিবি তুই তোর মিসাইলকে—হ্যাঁ—এইবার মার-

“টং-টং-টং”– শব্দ ওঠে বারংবার গুহার চারদিক ঘিরে। প্রৌঢ় মানুষটা আজ শিশুর মত উচ্ছল হয়ে উঠেছেন, শক্তি ও অভিজ্ঞতার মধ্যে বিচিত্র এক শেখা ও শেখাবার প্রতিযোগিতা চলতে থাকে সেই নির্জন গুহার ভেতরে। সে খেলার সাক্ষি থাকে শুধু এক নির্বাক দানবিক মিসাইল।

*********

dharaontim01 (Medium)“বাবা, ট্র্যাগোপান।”

দুরবিনে চোখ লাগিয়ে জিষ্ণু আস্তে আস্তে ডাকছিল। প্রফেসর নীচ থেকে জিষ্ণুর দিকে চোখ তুলে তাকালেন একবার। গুহামুখ ছেড়ে শদুয়েক মিটার সরে এসেছেন ওঁরা এখন। তাঁবুর কাছেই পায়ের বেশ খানিকটা নীচে বর্ষায় ফুলে ওঠা নদীটার লালচে ঘোলাটে জল খলখল করে ছুটে চলেছে। সর্বক্ষণের সঙ্গী যন্ত্রপাতির বাক্সটা থেকে একটা লেজার পিস্তল কোমরে গুঁজে নিয়ে, হাতের মৃদু চাপড়ে জেটবেলোটাকে একবার পরখ করে নিয়ে  প্রফেসর বের হয়ে এলেন। এমনিতে একে এখানে কাজে লাগানো যাবে না। কিন্তু এ পাহাড়ে নিরস্ত্র হয়ে তিনি খোলা আকাশের নীচে কোথাও যেতে রাজি নন।

“সাবধানে উঠো। পাহাড়ের গায়ের মাটি নরম হয়ে আছে।”

“তুই সাবধান। ওয়েট কর আমি আসছি।”

প্রায় সত্তর ডিগ্রি নতিতে পাহাড়ের মাটি জড়ানো পেছল ঢালটা ওপরের দিকে উঠে গেছে। সাবধানে বুকে হেঁটে একটু একটু করে জিষ্ণুর কাছে উঠে আসতে আসতে পেছনের পকেট থেকে গুলতিটা হাতে বের করে নিলেন প্রফেসর। প্রাথমিক জড়তাটুকু কেটে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। শরীরের যাবতীয় প্রতিবর্ত ক্রিয়াগুলো জানান দিচ্ছে এককালের দুরন্ত পর্বতারোহণের শিক্ষা পাওয়া শরীর কিছুই ভোলেনি। বয়সের জড়তাকে কাটিয়ে তুলে সেই শিক্ষাই তাঁকে প্রতি মুহূর্তে আরো সাবলীল করে তুলছিল পেছল পাহাড়ের গায়ে।

“ক্লাইম্বটা বেশ টেকনিক্যাল কিন্তু জিষ্ণু। তুই অত সহজে-” বলতেবলতেই অবশ্য রহস্যটা পরিষ্কার হয়ে গেল প্রফেসর বোসের কাছে। কা পোন। যে শিক্ষাগুলো ছেলেটাকে দেবার সময় তিনি পাননি কখনো, কা পোন সে অভাবের জায়গাগুলো পূরণ করে দিয়েছে ঠিক তাহলে। বুকের ভেতরটা ফুরফুরে হয়ে উঠছিল প্রফেসর বোসের। জিষ্ণু ভালো থাকবে।

“কোথায়?”

দুরবিনটা তাঁর হাতে দিয়ে একটু সরে ঢালটার গায়ে তাঁকে জায়গা করে দিল জিষ্ণু। কাদার মধ্যে মুখ জাগিয়ে থাকা একটুকরো পাথরকে গ্রিপ করে নিজেকে প্রায় ঝুলিয়ে রেখেছে ঢালের কিনারায়। তার দিকে প্রশংসার চোখে একঝলক তাকিয়ে নিয়ে দুরবিনে চোখ লাগালেন প্রফেসর। ভুল দেখেনি ছেলেটা। প্রায় শ দুয়েক মিটার ওপরে একটা গাছের গোড়ায় ঝোপের মধ্যে লালকালোর একটা আভাস পাওয়া যায়। ট্র্যাগোপানই বটে। একটা পাখিকে কাবু করতে পারলে দুজনের মত পেটভরা মাংসের জোগাড় হয়ে যাবে।

“ট্রেলটা কিন্তু সুবিধের নয় জিষ্ণু। পাথরের গায়ে মাটি বৃষ্টিতে আলগা হয়ে আছে। আরো অনেকটা এগোতে হবে। যাবি? না ছেড়ে দিবি এটাকে?”

“উঁহু। এটার গায়ে আমাদের ডিনারের নাম লেখা হয়ে গেছে বাবা। আমি এগোচ্ছি।”

“গুলতিতে আমার হাত কিন্তু তোর চাইতে পাকা।”

“তা হোক। আমি আগে দেখেছি। এ আমার শিকার।”

পাখিটা বোধ হয় দূর থেকে তাঁদের উপস্থিতি টের পেয়েছে। মাথা উঁচু করে সন্দিগ্ধ চোখে এদিক ওদিক দেখছিল সে। তারা দুজন কাদামাখা ঢালের গায়ে মাথা নীচু করে স্থির হয়ে রইল। এ শিকার ধৈর্যের খেলা। পাশাপাশি শুয়ে থাকতে থাকতে প্রফেসর হঠাৎ নিচু গলায় বললেন, “জিষ্ণু?”

“বলো।”

“একটা কথা। তোকে কিন্তু এইবার অন্য জায়গায়-”

“না।” তাঁর কথাটা শেষ হবার আগেই জিষ্ণু বলে উঠল, “তোমাকে একা রেখে আমি-”

“জিষ্ণু, এটা ইমোশনাল হবার সময় নয়। ঠিক আট বছর বাদে, ২১২৬ সালের চোদ্দই আগস্ট রাত এগারোটা ত্রিশ মিনিটে ওই ধূমকেতু পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়বে। তার ঠিক চোদ্দো মিনিট আগে কয়েকটা সুনির্দিষ্ট কমান্ড জাগিয়ে তুলবে একাঘ্নির ইঞ্জিনকে। শুরু হবে বোমার ডিটোনেশনের কাউন্টডাউন। সে কাজটা শুধু পৃথিবীতে দুজন করতে পারে। আমি আর তুই। আমাদের দুজনের একসঙ্গে থাকার মানে হল, এখানে কোন অ্যাটাক হলে, বা দুর্ঘটনা ঘটলে দুজনের একসঙ্গে–”

-অনেকক্ষণ চুপ করে শুয়ে রইল জিষ্ণু। মাথাটা কাদামাটিতে গুঁজে দিয়েছে। পিঠটা কেঁপে কেঁপে উঠছিল বারবার। অমোঘ যুক্তিটাকে অস্বীকার করবার ক্ষমতা নেই তার।

কিন্তু– বুকের ভেতর একটা দলা পাকিয়ে উঠছিল তার। হঠাৎ পাশ ফিরে বাবার দিকে ফিরে চাইল সে। সে চোখে শীতল একটা প্রতিজ্ঞার ছাপ ছিল। মাথা নেড়ে ধীর গলায় কেটে কেটে বলল, “এই একটা ব্যাপারে তুমি শত যুক্তি দিয়েও আমাকে নাড়াতে পারবে না বাবা। জানি তুমি ঠিক। একটা যন্ত্রের মত নিখুঁত তোমার হিসেব। কিন্তু তবু, গোটা পৃথিবীর নিরাপত্তার খাতিরেও, তোমাকে এখানে ওই গুহায় একলা কবর দিয়ে আমি চলে যেতে পারব না বাবা। তার ফলে যদি এ গ্রহ ধ্বংস হয় তাতেও আমার কিছু যাবে আসবে না।”

দাঁত চেপে শেষের কথাগুলো বলতেবলতেই গুলতিটা হাতে চেপে ধরে বুকে হেঁটে সে পেছল ঢালটা বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল ওপরের দিকে।

তার ছোটো হয়ে আসতে থাকা শরীরটার দিকে তাকিয়ে হতাশভাবে মাথা নাড়লেন প্রফেসর। এই ভয়টাই তিনি করে এসেছেন এতগুলো দিন। এই শেষ মুহূর্তটার জন্য নিজেকে নানাভাবে প্রস্তুত করেছেন অনেকদিন ধরে। এখন কা পোনের ওপরে ভরসা করা ছাড়া আর কোন রাস্তা খোলা থাকল না তাঁর। এক সে যদি পারে ছেলেটাকে বুঝিয়েসুজিয়ে—

গুরগুর শব্দটা ঠিক তখনই ভেসে এল পাহাড়ের মাথার দিক থেকে। শরীরের নীচে মাটির ভেতর তিরতিরে কাঁপন উঠছিল। হঠাৎ ফ্যাকাশে মুখে ওপরের দিকে চেয়ে দেখলেন প্রফেসর। সেখানে-

ক্রমশ

অন্তিম অভিযান উপন্যাসের আগের সমস্ত এপিসোড একত্রে এই লিংকে–>