ধারাবাহিক উপন্যাস জাদু রাজ্য মুরাদুল ইসলাম বর্ষা ২০১৮

আগের পর্বগুলো

 রাতুল, আকাশ এবং হারিরি এর উত্তর কী দিবে ভেবে পেল না।

ব্যাঙ বলল, “তাহলে একটা ধাঁধার উত্তর দাও। যদি পার তাহলে তোমাদের নিয়ে যাব আমাদের রানির কাছে। তিনি তোমাদের যা জানা প্রয়োজন সব বলে দিবেন। কিন্তু যদি উত্তর দিতে না পার তাহলে বুঝব তোমরা মিথ্যে বলেছ। এর জন্য পানির এই জগতের সবচেয়ে গভীর কুয়ায় তোমাদের নিক্ষেপ করা হবে যেখানে বিষাক্ত সব প্রাণীর বসবাস।”

একটু থেমে গিয়ে ব্যাঙ বলল,

“আমি তুমি একজন, দেখিতে একরূপ

আমি কত কথা কই, তুমি থাকো চুপ”

এর মানে কি?”

রাতুল কখনো এই ধাঁধা শুনেনি। আকাশও মনে করতে পারল না এর উত্তর কী হবে। হারিরি বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে থাকল। সে প্রথম লাইনই বুঝতে পারেনি। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাঙ তিনটি মিটিমিটি হাসছিল।

একটি ব্যাঙ বলল, “তোমরা উত্তর দিতে পারনি। অতএব, অন্ধকার কুয়াতেই নিক্ষিপ্ত হবে তোমরা।”

এবার একটি ব্যাঙ বাঁকানো বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে অদ্ভুত সুর সৃষ্টি করল এবং চড়া গলায় গান শুরু ধরলঃ

“অন্ধকারের ছায়া তুমি ফিরে এস

নিয়ে যাও সব ঝঞ্জাল

পবিত্র করে দাও এ ভূবন

সাথে নিয়ে অশুভের কঙ্কাল

তুমি ফিরে আসো ভয়, সাথে নিয়ে ক্ষয়

নিয়ে এসো ভূগর্ভের বিভীষিকা

তুমি অন্ধকারের জীব, তুমি ভয়ের অগ্নিশিখা”

ব্যাঙের কন্ঠ বেশ তীব্র। তার গান শেষ হতে না হতেই দূরের এক পাহাড় থেকে আন্দোলন শুরু হল। যেন একটি বৃহদাকার টিলা এদিকে এগিয়ে আসছে। গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে।

ব্যাঙ বলল, “ইমোগি চলে আসছে। অন্ধকারের বাসিন্দা ইমোগি। অন্ধকার কুয়ার পাহারাদার ইমোগি।”

ইমোগি এক বিশাল এবং ভয়ংকর অজগর সাপ। লম্বায় হবে প্রায় ৪৬ ফিট। ওজন প্রায় এক টনের বেশি। দেখতে অনেকটা ড্রাগনের মত মুখ।

মুখ দেখলেই ভেতরটা পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। হারিরি দাঁড়িয়ে ছিল সামনে। তার দু’পাশে কিছুটা পেছনে রাতুল এবং আকাশ।

ইমোগি গড়িয়ে গড়িয়ে তার বিশাল শরীর নিয়ে এসে দাঁড়াল। তার আগমনে চারপাশে পরিবেশে আন্দোলন শুরু হয়েছে।

একটি ব্যাঙ বলল, “ইমোগি, হে অন্ধকারের জীব। এরা আমাদের জগতে অনধিকার প্রবেশ করেছে। অন্ধকার কুয়ায় এদের নিক্ষেপ করো। সেখানে তারা যেন থাকে চিরকাল।”

ইমোগি তার ভয়ংকর মুখ নিয়ে সামনে এগিয়ে আসল। একেবারে হারিরির সামনে। হারিরি ভয় পেলেও দাঁড়িয়ে ছিল। কারণ পালাবার উপায় নেই। তাদের পা যেন শক্ত হয়ে খুঁটি গেড়ে বসে আছে।

ইমোগি এসে হারিরির দিকে তাকাল। বড় অজগর সাপেরা মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে সম্মোহিত করে ফেলে। ইমোগিও তার নীল চোখ মেলে তাকিয়ে ছিল হারিরির চোখের দিকে। কিন্তু এরপরই সে তার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ব্যাঙদের দিকে। তখন তার চোখ আগুনের মত জ্বলছে।

গম্ভীর থমথমে কন্ঠে ইমোগি বলল, “এটা তো জাদু সম্রাট নিকোলাই পুত্র। নিকোলাই এর কাছে আমার পূর্বপুরুষেরা সাহায্য নিয়েছেন। একে আমি নিয়ে যেতে পারব না।”

যে ব্যাঙটা গান গেয়েছিল সে তখন বসে পায়ের উপর পা তুলে বলল, “আমাদের নির্দেশ মানাই তোমার কাজ। আমাদের রানি এ নির্দেশই দিয়েছেন তোমাকে। ভুলে যেও না রানির আদেশ অমান্য করলে তোমাকেও নিক্ষেপ করা হবে অন্ধকার কুয়ায়।”

ইমোগি আবার থমথমে গলায় বলল, “কিন্তু এদের অপরাধ কী? এরা কী করেছে? তোমরা কি জানো না জাদু সম্রাট নিকোলাইকে হত্যা করে তার কালো জাদুকর ভাই ক্ষমতা নিতে চাচ্ছে। সে যদি জাদু রাজ্যের রাজা হয়ে যায় তাহলে কারোই সুখ থাকবে না।”

দাঁড়ানো ব্যাঙ বলল, “সে আমাদের রানি দেখবেন। আমরা শুধু নিয়মমত এদের ধাঁধা জিজ্ঞেস করেছি। কিন্তু এরা উত্তর দিতে পারেনি।”

ইমোগি জিজ্ঞেস করল, “কী ছিল ধাঁধা?”

বসে থাকা ব্যাঙ মাথা নেড়ে বলল,

“আমি তুমি একজন, দেখিতে একরূপ

আমি কত কথা কই, তুমি থাকো চুপ”

ইমোগি এক হতাশ নিঃশ্বাস ছাড়ল। ব্যাঙদের পাশ দিয়ে ঝড়ের মত গেল তার নিঃশ্বাসের বাতাস ঝাঁপটা।

ইমোগি আবার ফিরে এল হারিরির সামনে। সে বলল, “আমার করার কিছুই নেই নিকোলাই পুত্র। আমি এখানে এদের নির্দেশ মত কাজ করার জন্যই রয়েছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করো।”

ইমোগি সত্যিই বেদনার্ত হয়ে উঠেছিল। কারণ অন্ধকার কুয়ার বিভীষিকা সম্পর্কে তার চেয়ে বেশি আর কেউ জানে না। সেখানে নিকোলাই পুত্র এবং তার বন্ধুদের ফেলতে তার খারাপ লাগছিল। ইমোগির চোখ ভিজে গিয়েছিল পানিতে। তখন দেখা গেল তার চোখ স্বচ্ছ হয়ে গেছে। আয়নার মত।

হারিরির চোখের দিকে তাকিয়ে যখন সবেমাত্র ইমোগি সম্মোহিত করা শুরু করবে তখনই ইমোগির চোখের দিকে তাকিয়ে রাতুল চিৎকার করে উঠল। সে বলল, “আমি ধাঁধার উত্তর পেয়েছি।”

ইমোগি সম্মোহিত করা বন্ধ করে তাকাল রাতুলের দিকে। ব্যাঙদুটিও বেশ অবাক হয়েছে। একটি ব্যাঙ কৌতুকপূর্ণ স্বরে বলল, “তাহলে বলো?”

রাতুল বলল, “ছবি। ছবির ব্যক্তি কখনো কথা বলে না।”

আকাশ এবং হারিরি খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠেছিল। ইমোগিও হাসি হাসি মুখে তাকাল। জন্তুটি এত বড় এবং ভয়ানক দেখতে হলেও সে আসলে খারাপ না। ধূর্ত ব্যাঙদুটি চুপসে গেল।

ইমোগি ব্যাঙদুটির দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে আমি এখন যাই। এখন নিয়ম অনুযায়ী তোমাদের দায়িত্ব এদের সাহায্য করা।”

ইমোগি গড়িয়ে গড়িয়ে আবার চলে গেল। এত বড় প্রাণী চলে যাওয়ায় আবার আন্দোলন শুরু হল চারপাশে। ইমোগি যাওয়ার পর একটি ব্যাঙ মিনমিনে স্বরে বলল, “এবার বলো তোমাদের আমরা কীভাবে সাহায্য করতে পারি?”

হারিরি বলল, “আমরা জানতে চাই কীভাবে কালো জাদুকর কোবিলাইকে ধ্বংস করা যাবে।”

ব্যাঙ বলল, “এটা আমরা বলতে পারব না। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন কেবল আমাদের রানি। তোমাদেরকে আমাদের সাথে যেতে হবে রানির দরবারে।”

হারিরি বলল, “তাহলে চলো।”

ব্যাঙেরা বলল, “ঠিক আছে। চলো আমাদের সাথে।”

ব্যাঙেরা দুটি ইলেক্ট্রিক ইল মাছের পিঠে চেপে বসল। রাতুলেরা উঠে পড়ল জাদুর গালিচায়। খুব দ্রুত তারা চলতে লাগল পানির জগতের মধ্য দিয়ে ব্যাঙদের রানির প্রাসাদে।

অল্পক্ষণের মধ্যেই সেখানে তারা পৌছে গেল। পানির নিচে এক ঝলমলে প্রাসাদ। মনে হয় পুরোটাই সোনা দিয়ে বানানো। স্থানে স্থানে লাল নীল হরেক রঙের মূল্যবান পাথর জৌলুস ছড়াচ্ছে।

ব্যাঙেরা মাছের পিঠ থেকে নেমে সদর দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে করতে বলল, “চলে এসো। এটিই আমাদের রানির প্রাসাদ।”

রাতুল, আকাশ এবং হারিরি গালিচা থেকে নেমে হেটেই প্রবেশ করল প্রাসাদে। প্রাসাদের ভেতরটা আরো বেশি চকমক করছে। বিভিন্ন ধরনের শৌখিন সামগ্রীতে ভরপুর। এমন রাজকীয় প্রাসাদ কল্পনাও করা যায় না। তারা চারদিকের দেয়ালের অসাধারন সব কারুকার্য দেখতে দেখতে কক্ষের প্রায় মধ্যেখানে চলে গেল। কক্ষের একপাশে ঝমকালো পর্দা দেয়া।

ব্যাঙেরা বলল, “তোমরা বসে পড়ো। রানি এই পর্দার আড়ালে থেকে তোমাদের সব বলবেন।”

হারিরি বলল, “আমরা কী এখন প্রশ্ন করতে পারব?”

ব্যাঙ বলল, “না। তোমরা কিছুই বলবে না। দৃশ, অদৃশ্য জগতে যা কিছু ঘটছে আমাদের রানি তার খবর রাখেন। জাদু রাজ্যের বিভিন্ন অংশ থেকে অনেক রথী মহারথীরা তার কাছ থেকে তথ্য জানতে আসেন। তিনি সব জানেন। তোমাদের কোন প্রশ্ন করতে হবে না। চুপ করে বসে শুধু শুনে যাও। কথা শেষ হলে চলে যাবে। বৃথা সময় নষ্ট করবে না। আর কখনোই পর্দার আড়ালে কি আছে তা দেখার চেষ্টা করো না। যদি তা করো, জেনে রেখো স্বয়ং দেবতারা নেমে এলেও তোমাদের মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারবেন না।”

হারিরি বলল, “ঠিক আছে।”

হারিরি, আকাশ এবং রাতুল বসে পড়ল মূল্যবান রত্নপাথর কারুকার্যময় কার্পেটে। সে কার্পেটে জাদু রাজ্যের বিভিন্ন স্থাপনার ছবি টেরাকোট্টার মত করে আঁকা আছে। দেখলে শুধু চেয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। মনে হয় যেন এক মায়াবী গল্প লেখা আছে এখানে।

অধ্যায় ষোল

রাতুলরা যখন মুগ্ধ হয়ে দেখছিল কার্পেটের মধ্যে খোদাই করা দারুণ সব চিত্র তখন হঠাৎ করে পর্দার আড়াল থেকে এক কিন্নর কন্ঠ বলে উঠলঃ “তোমাদের স্বাগতম। আমি যা বলি খুব মনযোগ দিয়ে শোন। এর প্রতিটি লাইন তোমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ন।”

কিছু কন্ঠ শুনলে ইচ্ছে করে দেখতে কে কথা বলছে। এটি সেরকমই কন্ঠস্বর। কিন্তু দেখতে বারন করেছে ব্যাঙেরা। তাই রাতুল, হারিরি এবং আকাশ তাকিয়ে রইল ঝলমলে পর্দার দিকে। সে পর্দার আড়াল থেকেই আসছে শব্দ। কিন্নর কন্ঠ বলা শুরু করল, 

জাদু রাজ্যের উত্তরপ্রান্তে আছে পবিত্র পাহাড়। সে পাহাড়ে থাকেন দেবী আইসিস। দেবী আইসিস সাধারণত সহজে দেখা দেন না। তাকে পাহাড়া দেয়ার জন্য আছে চারজন কাঁকড়া মানব। বিষাক্ত সেসব কাঁকড়া মানবের মুখ মানুষের মত হলেও পুরো শরীর বিষাক্ত কাঁকড়ার। তাদের আছে তীব্র কিছু বিষ।

অনেক আগে একবার দেবী আইসিস বের হয়েছিলেন জাদু রাজ্যে। জাদু রাজ্যে তখন অস্থির অবস্থা। প্রাণীতে প্রাণীতে কলহ চলছে। এক বড় জাদুকর শামিতেল যার নিয়ন্ত্রণে ছিল রাজ্যের সব প্রজাপতি। সে হঠাৎ করে একটা অদ্ভুত কাজ করে বসেছিল। আরেক জাদুকর হার্পির সুন্দরী স্ত্রীকে হরণ করে সে নিয়ে যাচ্ছিল দূর পাহাড়ে। পথে কাম্যকসরোবর নামে একটা হ্রদের পাশে যাত্রাবিরতি দিয়েছিল সে। সেখানেই এক বিষাক্ত সাপের ছোবলে হার্পির স্ত্রী মারা যায়। এতে ভীষণ ক্ষীপ্ত হয় হার্পি। এই ঘটনায় পুরো জাদু রাজ্য প্রায় দু ভাগ হয়ে শুরু হয় যুদ্ধ  শুরু হবার উপক্রম। জাদু রাজ্যের আকাশ ছেয়ে যায় প্রজাপতিতে। শামিতেল তার সমস্ত প্রজাপতি মুক্ত করে ছেড়ে দেয়। প্রজাপতিরা আত্মার প্রতীক। এত এত প্রজাপতি একসাথে ওড়ার অর্থ ছিল প্রচুর প্রানহানি হবে। প্রজাপতি ওড়াওড়িতে জাদু রাজ্যের বাসিন্দারা শংকিত হয়ে পড়ল।

তখনই পবিত্র পাহাড়ের গুহা থেকে বের হয়ে বাইরে এসেছিলেন দেবী আইসিস। তার সৌন্দর্যের কথা সর্বজন বিধিত। সবাই জানে তার রূপ ও গুণের কথা। দেবী আইসিস এসে সব প্রজাপতিকে একটি বড় বাক্সের মধ্যে বন্দি করলেন। হার্পির স্ত্রী অপহরণ করায় শামিতেলকে দেয়া হল নির্বাসন। কেড়ে নেয়া হল তার সমস্ত জাদুশক্তি। আর অন্যদিকে হার্পি আবেদন জানাল তার স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ার জন্য। দেবী আইসিস হার্পির স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিলেন। এ শুধু দেবী আইসিসের পক্ষেই সম্ভব মৃতকে পুনরায় জীবন ফিরিয়ে দেয়া।

তখন আরেকটি ঘটনাও ঘটেছিল। সে ঘটনাতেও দেবীর মহানুভবতার নিদর্শন মেলে। জাদুরাজ্যের অমানিশা যখন কেটে গেল তখন আইসিস চলে যাচ্ছিলেন পবিত্র পাহাড়ে। উড়ন্ত কচ্ছপ দ্বারা চালিত অনিন্দ্য সুন্দর এক রথে চেপে তিনি যাচ্ছিলেন। তার সৌন্দর্য এতই বিকশিত করে রেখেছিল তার যাত্রাপথ যে বহুদূর থেকেও সে উজ্জ্বলতার আলোকরশ্মি দেখা যাচ্ছিল।

জাদু রাজ্যে তখন সবচেয়ে সুন্দরী হিসেবে সুনাম ছিল বেথোয়া নামে এক অভিজাত মহিলার। মহিলা ছিল ভয়ানক অহংকারী, জেদী এবং স্বার্থপর। সে যখন দেখল দেবী আইসিসকে সবাই সম্মান জানাচ্ছে, সবাই দেবীর রূপে গুণে মুগ্ধ তখন সে রাগে দুঃখে তার ঘরের দরজা বন্ধ করে রইল। দেবী আইসিসকে নিয়ে কচ্ছপ টানা রথ তার ঘরের সামনে দিয়ে যাবার সময় ব্যাপারটা আইসিসের প্রহরী কাঁকড়া মানবদের দৃষ্টি এড়াল না। তার রেগে গিয়ে বেথোয়ার দরজা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করল। দেবীকে উপেক্ষা করার দুঃসাহস দেখানোর জন্য বেথোয়ার শিশুপুত্র বিশাখাকে তারা তাদের বিষাক্ত কাটা দিয়ে দংশন করল।

শিশুপুত্র বিশাখা তীব্র বিষে নীল হয়ে গেল সাথে সাথেই। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে তার মৃত্যু হল। বেথোয়ার আহাজারীতে কেঁপে উঠল এলাকা।

দেবী আইসিস বিব্রত হলেন। তিনি একজনের অপরাধে আরেকজনকে শাস্তি দেয়ার ঘোর বিরোধী। এছাড়া শিশুপুত্রকে এভাবে হত্যা করা অন্যায়। তিনি তার প্রহরী কাঁকড়ামানবদের ভৎসর্না করে বললেন, “এসব কী? আমার সাথে কথা না বলে তোমরা ওর শিশুপুত্রকে মেরে ফেললে?”

কাঁকড়ামানবদের একজন ঘাড় নিচু করে বলল, “দেবী, আমাদের প্রতিটি কাজে দৈব নির্দেশ থাকে। এ কাজের ফল জাদু রাজ্যের জন্য ভবিষ্যতে হয়ত ভালো হবে। এছাড়া ওর মা আপনাকে অপমান করার চেষ্টা করেছে। পুত্রশোকই ওর একমাত্র শাস্তি।”

দেবী আইসিস জানতেন কাঁকড়ামানবদের প্রতিটি কাজ দৈব নির্দেশ প্রাপ্ত। জাদু রাজ্যের জন্য অমঙ্গল হয় এমন কিছু তাদের দ্বারা কখনো হবে না। কিন্তু তবুও তিনি বেথোয়ার শিশুপুত্র হত্যাকে মেনে নিতে পারছিলেন না।

তিনি বললেন, “শিশুপুত্রকে আমার সামনে নিয়ে এসো।”

একজন কাঁকড়া মানব বেথোয়ার ঘরে গিয়ে বিষে নীল হয়ে যাওয়া শিশুপুত্রকে নিয়ে আসল। দেবী তাকে পর্যবেক্ষণ করে আত্মা ফিরিয়ে দিলেন। ছেলেটি চোখ মেলে তাকাল।

সেই ছেলেটিই হল আজকের বিশলক্ষ্য। কালো জাদুকর কোবিলাই এর প্রধান সহচর কিংবা ডানহাত বলা যায়।

একে বধ করতে হলে কাঁকড়া মানবদের প্রয়োজন। কাঁকড়া মানবদের বিষ ছাড়া অন্য কিছুতে এর মৃত্যু হবে না। কাঁকড়া মানবদের বিষ সংগ্রহের জন্য যেতে হবে দেবী আইসিসের পবিত্র পাহাড়ে। 

কাঁকড়া মানবেরা একে তো ভয়ংকর, আর তাদের রাগও অত্যধিক। ফলে তাদের কাছ থেকে বিষ সংগ্রহ সহজ হবে না। জাদু রাজ্যের সব প্রাণীই তাদের ভয় পায়। কেউ পবিত্র পাহাড়ের দিকে যেতে সাহস করে না।

পবিত্র পাহাড়ে যাওয়ার পথটিও দুর্গম। উঁচু নিচু, খানা খন্দ, গর্তে গর্তে পানি জমে আছে। স্থানে স্থানে কাঁদা, ইত্যাদি পার হয়ে যেতে হয়। এজন্য কোন ধরনের যানবাহনেই কাজ চলে না। এমনকী সুলেমান বাদশাহর গালিচারও ক্ষমতা নেই সেদিকে যাবার।

পবিত্র পাহাড়ে যেতে হয় দৈত্য পিঁপড়ায় চড়ে। দৈত্য পিঁপড়া এক ধরণের বড় পিঁপড়া থাকে হাতিপাড়া থেকে কিছু দূরেই। সেখানে তারা মাটি খুঁড়ে বড় বড় ঘর বানায়। সেসব মাটির সাথে উঠে আসে রাশি রাশি সোনা।

প্রতিদিন বিকেলে এসে সেসব সোনা মুখে করে নিয়ে যায় বৃহদাকার সব ফড়িং। এই ফড়িংয়েরা সোনার টুকরা, সুতার মত তন্তু নিয়ে উড়ে যায় সূর্যের পানে। তারা একবার সূর্যকে বাঁচিয়েছিল। যখন এক মস্ত ড্রাগন খেয়ে ফেলেছিল সূর্যটাকে। জাদু রাজ্যে নেমে এসেছিল ঘোর অন্ধকার। তখন এই ফড়িংরাই উড়ে যায় এবং সেই ড্রাগনকে ভয় দেখায়। ফড়িংদের দেখে বিশাল ড্রাগন সত্যিই ভয় পেয়েছিল। সে ছিল ভীত, কিন্তু তার ভয়ে কেউ তাকে আক্রমণ করতে আসে নি এজন্যই সে সূর্যকে গিলে ফেলতে পেরেছিল। ফড়িংয়েরা আক্রমণ করতে গেলে সে সূর্যটাকে মুখ দিয়ে বের করে দিয়ে পালায়।

সেই থেকেই জাদু রাজ্যের সূর্যের আলোর রঙ বদলে গেল। ড্রাগণের বহুরঙা পাকস্থলীতে থাকার কারণেই বোধহয়। তার সাথে সাথে বদলে গেল আকাশের রঙ। এখন তাই বিভিন্ন সময়ে সূর্যের আলোর রঙ বদলের সাথে সাথে জাদু রাজ্যের আকাশও রঙ বদলায়।

পিঁপড়ারা পবিত্র পাহাড়ে নিয়ে যেতে রাজী হবে কি না বলা যাচ্ছে না। এই সময় তাদের ব্যস্ত থাকার সময়। প্রতিবছর এই সময়ে মারাত্মক কিছু পিঁপড়াভূকেরা তাদের আক্রমণ করে। এছাড়া জঙ্গল থেকে কখনো কখনো উঠে আসে সিংহ পিঁপড়া। সিংহ পিঁপড়া হচ্ছে অর্ধেক সিংহ এবং অর্ধের পিঁপড়া। মাথাটা সিংহ এবং শরীর বৃহদাকার পিঁপড়ার। এরা সিংহ হওয়ার কারণে তৃণ খেতে পারে না, পিঁপড়া হবার কারণে মাংস খেতে পারে না। ফলে জঙ্গলে থাকে এবং অদ্ভুত জীবন যাপন করে। এরা জীবনের প্রতি সবসময় বিরক্ত থাকে। প্রায় সময়ই পিঁপড়াদের আক্রমণ করে হত্যা করে।

আর পিঁপড়াভুকেরা এই সময়ে পিঁপড়াদের আক্রমণ করে ধরে নিয়ে যায়। বছরের খাবার তারা এ-সময়েই সংগ্রহ করে। পিঁপড়াভূকেরা শক্তিশালী এবং এদের জন্মের কাহিনীও চমৎকার। দেবতা কাং ঘরে জন্ম নিয়েছিল একটি পিঁপড়াভূক। তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন তাকে। ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে তার অন্য দুই সন্তান এটিকে হত্যা করে। দেবতা কাং তখন তার সন্তান পিঁপড়াভূকের দেহকে গলিয়ে নির্যাস বের করেন এবং তা ছড়িয়ে দেন জাদু রাজের পশ্চিমের ঘণ জঙ্গলে। সেই নির্যাস থেকে জন্ম নেয় পিঁপড়াভূকেরা।

পিঁপড়াভূকদের সাথে যেহেতু সরাসরি দেবতা কাং এর সংযোগ আছে তাই জাদু রাজ্যের প্রাণীরা তাদের সাথে লাগতে ভয় পায়। পিঁপড়াভূকেরা অন্য কোন প্রাণীর ক্ষতি করে না। শুধুমাত্র বছরের একটি সময়ে এসে পিঁপড়াদের ধরে নিয়ে যায় খাওয়ার জন্য।

প্রতিবার পিঁপড়ারা পিঁপড়াভূকদের সাথে যুদ্ধ করে। প্রতিবারই ভয়ানক সংঘর্ষ হয়।

পিঁপড়াদের বাহন হিসেবে পেতে হলে এই পিঁপড়াভূকেরা যখন তাদের আক্রমণ করবে তখন তাদের যুদ্ধে সাহায্য করতে হবে। এতে হয়ত কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তারা পবিত্র পাহাড়ে পৌছে দিতে পারে।

পিঁপড়াদের পিঠে চড়ে দেবী আইসিসের পবিত্র পাহাড়ে যেতে হবে। সেখানে দেখা মিলবে কাকড়া মানবদের। কাকড়া মানবদের কাছে বিষ সংগ্রহ করে বিশলক্ষ্যকে ধ্বংস করতে যেতে হবে।

জাদু রাজ্যের সর্ব পশ্চিমে আছে আগার্থা জনপদ। সেখানে বাস করে এক ধরনের উপজাতি মানব। তারা কখনো বাইরে আসে না। নিজস্ব দেবতা, নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে তারা নির্বিবাধে জীবন যাপন করে আসছিল। কিন্তু সম্প্রতি কোবিলাই এর চোখ পড়েছে এ অঞ্চলের দিকে। সে এই উপজাতি মানবদের ধ্বংশ করে আগার্থায় নিজের রাজধানী স্থাপনের চিন্তা করছে। আগার্থায় রাজধানী হলে তার জন্য ভালো হবে।

এখন কোবিলাই এর ডানহাত তথা প্রধান সহকারী বিশলক্ষ্যের সাথে আগার্থার উপজাতিদের সংঘর্ষ হচ্ছে। তোমরা আগার্থার লোকদের সাহায্য করবে। আগার্থায় বিশলক্ষ্যের জাদুর প্রাসাদ আছে। সেখানে রাখা আছে আশ্চর্য গোপন জ্ঞানের এক পুস্তক। বিশলক্ষ্যকে হত্যা করে সে পুস্তক যদি তোমরা নিয়ে আসতে পার তবেই কোবিলাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবে।

সে পুস্তকটি হল নিগুঢ় জ্ঞাণ এবং কালো জাদু বিদ্যার বই গায়েত আল হাকিম। এই বইয়ে নিষিদ্ধ সব জাদুও লিপিবদ্ধ করা আছে। বইটি জাদুবিদ্যার গোপন সব মন্ত্র এবং পৃথিবীর তাবত জ্ঞাণের সার সংক্ষেপ লিপিবদ্ধ করেছিলেন জাদু ও জ্ঞানের দেবতা থথ। বইটিতে সমস্ত প্রাণীকূল এবং দেবতাদের বুঝার সমস্ত সূত্র উল্লেখ করে দেয়া আছে। দেয়া আছে সব গোপন মন্ত্র আর নিষিদ্ধ জ্ঞাণের নির্যাস। এ বইটি যার কাছে থাকবে সে দেবতাদের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ ঘোষণা করতে সক্ষম হবে।

বইটি পৃথিবীতেও গিয়েছিল। পৃথিবীতে বিভিন্ন নামে এর খন্ডিত বিভিন্ন অংশ আছে। পৃথিবীতে এর ইতিহাস সম্পর্কে একটু জানা যাক।

দশম-একাদশ শতকে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান হয়ে উঠে অন্যতম প্রধান জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র। তখন জাদু রাজ্যে বইটি নিয়ে বেঁধে যায় ভয়ানক সংঘর্ষ। সে সংঘর্ষের সময় বইটি নানা হাত ঘুরে চলে যায় পৃথিবীতে। জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে অসামান্য সব তথ্য সম্বলিত এই বই পড়ে যায় তখনকার ইরানের একজন শ্রেষ্ট কবি ওমর খৈয়ামের হাতে। বালক খৈয়াম তখন প্রসিদ্ধ ইমাম মোয়াফেককউদ্দিনের ছাত্র। ইমাম সাহেব সম্পর্কে এ কথা প্রচলিত ছিল যে তার ছাত্ররা জীবনে সফলতা অর্জন করবেই। ইমামের বয়স তখন ৮৫ বছর। তার ছাত্রদের মধ্যে তিনজন ছিল জ্ঞানে ও বুদ্ধিতে সবচেয়ে প্রখর। এদের মধ্যে একজন গীয়াসউদ্দিন ইবন আল ফাতাহ আল খাইয়ামি, পরে তিনি বিখ্যাত হন ওমর খৈয়াম নামে। আরেকজন হাসান ইবনে আলী ইবনে ইছহাক তুসী যিনি পরে বিখ্যাত হন নিজাম উল মুলক নামে। অপরজন হলেন হাসান ইবনে আলী ইবনে সাব্বাহ আর রাজী যিনি পরে বিখ্যাত হন হাসান সাব্বাহ নামে।

এই তিনজন বন্ধু ছিলেন। বইটি সম্পর্কে তিনজনই জানতেন। ওমর খৈয়াম বইটি পড়ে জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠেন। নিজাম উল মুলক বইটিতে আইন শাস্ত্রের চমৎকার সব ব্যাখ্যা দেখে মুগ্ধ হন। আর হাসান সাব্বাহ আকৃষ্ট হন এন অন্ধকার দিকটার দিকে।

বড় হয়ে ওমর খৈয়াম হয়ে গেলে একজন দার্শনিক, গনিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং সাধক কবি। মান, যশ, খ্যাতিতে তার আগ্রহ ছিল না। জীবনের নিগুঢ় সব তথ্যকে তিনি কবিতার ভাষায় প্রকাশ করতেন।

নিজাম উল মুলক হয়ে গেলেন খোরাসানের শাসনকর্তা সেলজুক বংশের সুলতান মালিক আলপ আর্সালানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি লিখেছিলেন শাসন সংক্রান্ত অমূল্য গ্রন্থ সীয়াসৎ নামা।

শিয়াদের ইসমাইলি সম্প্রদায়ের অনুসারী হাসান সাব্বাহ হাটেন ভিন্নপথে। তিনি নির্যাতীত শিয়াদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে গড়ে তুলেন এক গোপন গুপ্ত ঘাতক দল। তিনি তার বাহিনীর নাম দেন ফিদায়ী। তারপর পাহাড় পর্বতের মধ্যে গড়ে তুলেন আলামূত নামের এক দুর্গ। তার সেই দুর্গে ছিল বিশাল এক গ্রন্থাগার। দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ইত্যাদি সম্পর্কে অসাধারন জ্ঞাণের অধিকারী ছিলেন তিনি। সেই প্রাচীন জাদুর গ্রন্থটি নিজের লাইব্রেরীতে নিয়ে আসার ইচ্ছা ছিল তার অনেক দিনের।

তিনি তার বন্ধু ওমর খৈয়ামের কাছে লোক পাঠালেন তাকে আলামূত দুর্গে আমন্ত্রণ জানিয়ে। দূত ওমর খৈয়ামের কাছে পৌছানোর আগেই নিজাম উল মুলক বইটি সুলতানের গ্রন্থাগারের জন্য চেয়ে নেন। তিনি খৈয়ামের জন্য বার্ষিক বার শত স্বর্ণমুদ্রা ভাতার ব্যবস্থা করেন।

বইটি না পেয়ে ক্ষীপ্ত হয়ে উঠেন হাসান সাব্বাহ। তিনি জানতেন এই গুরুত্বপূর্ন বই অন্য কারো হাতে পড়লে সে প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠতে পারবে। এই বইটি নিয়ে নিজাম উল মুলকের সাথে হাসান সাব্বাহর দ্বন্দ্ব বাঁধে।

নিজাম উল মুলক একসময় আততায়ীর হাতে খুন হন। আততায়ী তাকে ছুরি দিয়ে পিঠে আঘাত করেছিল।

বইটি এরপর চলে আসে হাসান সাব্বাহর গ্রন্থাগারে। হাসান সাব্বাহ এই গ্রন্থের সাহায্য নিয়ে প্রভূত শক্তির অধিকারী হয়ে উঠেন। তার নামে তখন প্রকম্পিত হত মধ্যপ্রাচ্য। কিন্তু তার আক্রমণ পদ্বতি ভিন্ন হলেও তিনি আসলেই ছিলেন একজন জ্ঞানসাধক। বইটি নিয়ে এতই সাধনায় মশগুল থাকতেন বইটি পাওয়ার পর আর কখনো আলামূত দুর্গের বাইরে বের হন নি। এমনকী ছাদেও যান নি।

তিনি তার সম্প্রদায়ের বিভিন্ন দাবী দাওয়া আদায়ের জন্য সুলতানের বড় বড় কর্মকর্তাদের হুমকি দিতেন। তা মানা না হলে তার গুপ্ত ঘাতকদের পাঠিয়ে হত্যা করাতেন। তিনি কখনো সাধারণ মানুষকে হত্যা করেন নি। সেলজুক সুলতান মালিক শাহকেও হত্যা করে তার পাঠানো গুপ্তঘাতকেরা।

এভাবেই তিনি হয়ে উঠেন ভয়ানক শক্তিশালী। তাকে লোকে বলত শেখ উল জাবল অর্থাৎ পর্বতের সেই বৃদ্ধ মহান ব্যক্তি।

এই বইটির উৎপত্তি কোথায় সে সম্পর্কেও তার ধারণা স্পষ্ট ছিল। জাদু রাজ্যে সংঘাত থেমে গেলেও বইটি আলামূত দুর্গ থেকে আনা যায় নি হাসান সাব্বাহর কারণে। হাসান সাব্বাহ তখন জাদু রাজ্যের সবার থেকে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। হাসান সাব্বাহ মারা যাবার পরও বইটি তার গ্রন্থাগারে রয়ে যায়। অবশ্য কেউ তার শক্তি সম্পর্কে জানতো না। এত গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের সম্পর্কে জানিয়ে যাবার মত যোগ্য কাউকে হাসান সাব্বাহ পাননি।

নিজাম উল মুলক যখন সুলতানের গ্রন্থাগারে বইটি নিয়েছিলেন তখন এর কিছু কিছু অংশ বিভিন্ন ভাষায় লিখে রাখার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবার আগেই হাসান সাব্বাহ বইটি সুলতানের গ্রন্থাগার থেকে আলামূতে নিয়ে আসেন। ফলে বইটির কিছু অসম্পূর্ন কপি পৃথিবীতে থেকে যায়। তা এখনো পৃথিবীতে আছে বিভিন্ন জায়গায়।

হাসান সাব্বাহর আলামূতে যে মূল কপিটি ছিল তা জাদু রাজ্যে আবার ফিরে আসে চেঙ্গিস খানের বংশধর হালাকু খানের আলামূত আক্রমণের মধ্য দিয়ে। বর্বর হালাকু খান হাসান সাব্বাহর সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারটি পুড়িয়ে দেয়। সেই ঢামাঢোলের মধ্যে জাদু রাজ্যে বইটি আবার নিয়ে আসেন দেবতা থথ।

বইটি অনেকদিন তার কাছেই ছিল। তারপর এক পাহাড়ী ঈগলের ছদ্মবেশে এসে বইটি তার কাছ থেকে নিয়ে যায় কোবিলাই।

এ পর্যন্ত বলে হঠাৎ করেই কন্ঠস্বরটি বন্ধ হয়ে গেল।স

রাতুল, আকাশ এবং হারিরি মুগ্ধ হয়ে শুনে যাচ্ছিল জাদু রাজ্য এবং এক জাদু পুস্তকের বিস্ময়কর ইতিহাস। হঠাৎ থেমে যাওয়ায় তাদের মনে হচ্ছিল কোথাও যেন ছন্দ কেটে গেছে।

তারা কিছুক্ষণ নিশ্চুপে বসে রইল। এরপরও পর্দার আড়াল থেকে কোন শব্দ এল না। তখন হারিরি বলল, “মনে হয় কথা শেষ হয়েছে। আমাদের এখন এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত।”

আকাশ বলল, “কিন্তু আসলে এই পর্দার আড়ালে কী আছে?”

হারিরি বলল, “ব্যাঙদের রানি আছেন পর্দার আড়ালে। আমরা তার কথাই শোনলাম। এখন চলে যাওয়া জরুরী। অনেক কাজ বাকী। উপরে আমাদের জন্য সবাই অপেক্ষা করে আছেন।”

হারিরি পর্দার দিকে তাকিয়ে বলল, “ব্যাঙদের রানি আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার উপকারের কথা আমরা ভূলব না।”

তারপর তারা তিনজন হেটে বেরিয়ে আসল রানির প্রাসাদ থেকে। বের হয়ে দেখল বাইরে জাদুর গালিচা পড়ে আছে। অর্থাৎ তার এই প্রাসাদে প্রবেশের ক্ষমতা নেই। চারপাশের পরিবেশ কিছুটা মরুভূমির মত। তবে আবহাওয়া কিছুটা ঠান্ডা।

আকাশ, রাতুল এবং হারিরি গিয়ে উঠল গালিচায়। হারিরি গালিচাকে নির্দেশ দিল, “যাও, সুলেমান বাদশার গালিচা, এই জলের নিচের জগত থেকে আমাদের উপরে নিয়ে যাও। যেখানে অপেক্ষা করে আছেন আমাদের বন্ধুরা।”

গালিচা উড়তে শুরু করল। পানির নিচে অদ্ভুত অদ্ভুত প্রাণীদের পেরিয়ে ছুটল উপরের দিকে। এক জায়গায় একটা জমকালো নগরী দেখা গেল। গালিচা উড়ে যাচ্ছিল তার উপর দিয়ে। আকাশ প্রায় চেঁচিয়ে বলল, “ঐ দেখো, হারানো নগরী আটলান্টিস।”

রাতুল জিজ্ঞেস করল, “আটলান্টিস আবার কী?”

আকাশ বলল, “প্রাচীনকালে হারিয়ে যাওয়া এক নগরী। আমি বইয়ে পড়েছি।”

গালিচা যখন আটলান্টিসের উপর দিয়ে যাচ্ছিল তখন দেখা গেল কচ্ছপটানা রথে কে যেন এগিয়ে আসছে। একটি বুড়ো মতন লোক। পরনে অদ্ভুত আলখেল্লা জাতীয় পোশাক।

লোকটি তার বাহন নিয়ে গালিচার কাছে এল এবং তার হাতের জাদুদন্ড ব্যবহার করে গালিচা থামিয়ে দিল।

হারিরি তখন ফিসফিস করে বলল, “ইনি সমুদ্রের দেবতা মানানান।”

বুড়ো মতন লোক গালিচার কাছে এসে তাদের দিকে ভালো করে তাকাল। তারপর খসখসে গলায় বলল, “এ যে দেখছি নিকোলাই এর ছেলের সাথে দুটি পৃথিবীর মানুষও। অদ্ভুত ব্যাপার! আমি ভবিষ্যৎবাণী অবিশ্বাস করেছিলাম।”

হারিরি বলল, “সমুদ্র দেবতা মানানান, আপনি আমাদের শ্রদ্ধা গ্রহণ করুন।”

দেবতা মানানান বললেন, “তোমরা এখানে এসেছিলে কেন? আমার সমুদ্রে এসেছ আমার অনুমতি না নিয়ে।”

হারিরি বলল, “আমাদের ভুল হয়ে গেছে। এ জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমরা এসেছিলাম ব্যাঙদের রানির কাছে কোবিলাইকে কীভাবে ধ্বংশ করা যাবে তা জানতে।”

দেবতা মানানান বললেন, “তোমরা গিয়েছিলে বোয়ানের প্রাসাদে?”

হারিরি বলল, “আমরা ব্যাঙদের রানির প্রাসাদেই গিয়েছি শুধু।”

দেবতা মানানান বললেন, “ওর নামই বোয়ান। যাইহোক, তোমরা এখন সোজা চলে যাও সে দূর্ভাগা বীর আয়ুধের কাছে।”

রাতুল বলল, “কিন্তু আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। আমাদের খুব তাড়াতাড়ি উপরে যেতে হবে।”

দেবতা মানানান বেশ অবাক হয়ে বললেন, “তোমরা কী ভবিষ্যৎবাণীর কথা জানো না। তোমাদের তো অবশ্যই আয়ুধের কাছে যেতে হবে। সে হাজার হাজার বছর ধরে আছে এই সমুদ্রের নিচে। তার কাছে তোমাদের যেতেই হবে।”

রাতুল বলল, “কিন্তু আমরা উপরে না গেলে যে কোবিলাই জাদু রাজ্যের সম্রাট হয়ে যাবে।”

দেবতা মানানান বললেন, “কিন্তু ভবিষ্যৎবাণী মতে তোমাদের অবশ্যই আয়ুধের সাথে দেখা করে যেতে হবে। দৈববাণী যখন এতটুকু সত্যি হয়েছে যে তোমরা জাদু রাজ্যে এসে পড়েছ, তাহলে আমার ধারনা বাকিটুকুও সত্যি হবে। কোবিলাইকে পরাজিত করতে হলে তোমাদের যেতে হবে আয়ুধের কাছে।”

হারিরি বলল, “কিন্তু তিনি কোথায় আমরা কীভাবে জানব?”

দেবতা মানানান তার হাতের জাদুদন্ড দিয়ে গালিচাকে ইশারা করলেন। গালিচা চলতে শুরু করল। পিছন থেকে মানানান বললেন, “গালিচা তোমাদের আয়ুধের কাছে নিয়ে যাবে।”

রাতুল, আকাশ এবং হারিরি কিছুই বুঝতে পারছিল না। কে এই আয়ুধ? কেনোই বা তাদের যেতে হবে এর কাছে?

কিন্তু ভাববার অবকাশ বেশি ছিল না। গালিচা ক্রমেই খুব দ্রুত চলতে শুরু করল। এবং একসময় এসে থামলো এক কালো গুহার সামনে। সমুদের নিচের গুহা। বেশ শান্ত একটি এলাকায়। আশপাশে কোনোধরনের মাছ কিংবা প্রাণীর অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছে না।

গুহার সামনে গালিচা গিয়ে থামার পর রাতুলরা দেখতে পেল কালো আলখাল্লার মত দীর্ঘ পোশাক পরা একটা লোক লাঠিতে ভর দিয়ে গুহার সামনের এক পাথরে বসে আছে।

রাতুলদের দেখে লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। ঠিক যেমন খাঁচার শালিক পাখি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় সে-রকম করে। তারপর গমগমে কন্ঠে বলল, “কে তোমরা? এখানে কী চাও?”

হারিরি বলল, “আমি হারিরি। জাদু সম্রাট নিকোলাইয়ের পুত্র। এরা আমার বন্ধু। আমরা সমুদ্র দেবতা মানানানের কথায় এখানে এসেছি।”

আলখেল্লা পড়া লোকটি গর্জে উঠল, “মানানান! দেবতা মানানান তোমাদের এখানে পাঠানোর কে? আমার শান্তি নষ্ট করার অধিকার তাকে কে দিয়েছে! আহ! মানুষের গন্ধ পাচ্ছি! কতদিন পর মানুষের গন্ধ পাচ্ছি! আমার বুঝি মাথা খারাপ হয়ে গেল। যাও! যাও তোমরা এখান থেকে। আমি মানুষের গন্ধ পাচ্ছি!”

হারিরি, রাতুল এবং আকাশ অবাক হয়ে গেল লোকটির আচরনে।

লোকটি গর্জে উঠল, “তোমরা যাচ্ছো না কেন? আমি কথা বলতে পারব না। হাজার বছর আগে ছেড়ে এসেছি মানুষের সংস্পর্শ। কিন্তু আজো আমি গন্ধ পাচ্ছি মানুষের। আমি সম্পূর্ন পাগল হয়ে গেছি আজ। এসব দেবতাদের কারসাজি।”

হারিরি সাহস করে বলল, “মানুষের গন্ধ পাচ্ছেন কারন আমার বন্ধুরা পৃথিবীর মানুষ।”

আলখেল্লা পড়া লোকটা এই কথায় দপ করে উঠে দাঁড়াল। তারপর রাতুল এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে তাদের কাছে এগুতে লাগল। খুব ভয় লাগছিল রাতুলের। কিন্তু তবুও সে দাঁড়িয়ে রইল। আকাশ দাঁড়িয়ে রইল তার পিছু। লোকটা কাছে এসে বেদনার্ত চোখে বলল, “তোমরা পৃথিবীর মানুষ?”

রাতুল এবং আকাশ মাথা নেড়ে বলল, “হ্যা।”

আলখেল্লা পরা লোকটার মুখে যেন হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, “আজ আমি হাজার হাজার বছর পর কোন মানুষ দেখলাম। জানো, আমিও তোমাদের মত মানুষ। এক দূর্ভাগা মানুষ।”

রাতুলের পাশে দাঁড়ানো হারিরি বলল, “দেবতা মানানান বলেছেন ভবিষ্যৎবাণী অনুযায়ী নাকী আমাদের আপনার সাথে দেখা করার কথা।”

আলখেল্লা পরা লোকটি বলল, “হ্যাঁ। আমি এখন সব বুঝতে পেরেছি। এই ভবিষ্যৎবাণী যে সত্যি হবে তা আমি জানতাম না। তবে তোমরা যেহেতু এসে গেছ তাই আমি তোমাদের সেই জাদুর পাত্রটা দেব। যা আমার জীবনের একমাত্র সম্বল। তোমরা জাদু রাজ্যকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে যাচ্ছ। আমার জাদুর পাত্র তোমাদের সাহায্য করবে।”

লোকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে গুহার ভিতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর একটা কারুকাজ করা প্রায় তিন ইঞ্চি লম্বা ব্রোঞ্জের পাত্র নিয়ে ফিরে এল।

বলল, “এই সেই পাত্র। এটা তোমাদের সাথে রাখবে। জাদু রাজ্যের ভেতরে প্রয়োজনে পাত্রটি তোমাদের সাহায্য করবে। জাদু রাজ্যের বাইরে এর কোন ক্ষমতা নেই। এবং পাত্রটি কী সাহায্য করবে তা আমি তোমাদের বলতে পারব না। সেটা বলা নিষেধ।”

হারিরি পাত্রটা হাতে নিল।

রাতুল বলল, “আপনার নাম কী বীর আয়ুধ?”

লোকটা হেসে বলল, “বীর আয়ুধ!”

তারপর আস্তে আস্তে বলা শুরু করল তার কাহিনী।

“তা এককালে ছিলাম। অনেক অনেক দিন আগে শ্যামনগর বলে এক দেশ ছিল পৃথিবীতে। সেখানে আমি ছিলাম বিখ্যাত বীর। একবার গিয়েছিলাম সমুদ্রে। সেখানে ভাসতে ভাসতে এল একটি কাঠের বাক্স। বাক্সটা খুলেছিলাম। এর ভিতর থেকে বেরিয়ে এল এক ডানাওয়ালা পরী। আমাকে বলল সুখের দেশের কথা। সমুদ্রের ওপারে আছে সুখের দেশ।

“আমি সঙ্গীসাথীদের বললাম, সুখের দেশ সন্ধানে যাব। তারা রাজি হল। এক শুভদিনে চব্বিশজন সঙ্গী নিয়ে জাহাজে করে বের হলাম। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর আমরা দেখতে পেলাম সেই সুখের দেশ। যে দেশে নেই কোন ক্ষুধা, দুঃখ, যন্ত্রণা, মৃত্যু কিংবা ভয়।

সুখের দেশের লোকেরা আমাদের স্বাগত জানাল। স্বয়ং রানি এসে আমাদের বরণ করে নিয়ে গেল। তারপর সুখে শান্তিতে কাটতে লাগল আমাদের দিন।

“কিন্তু শুধু সুখ এবং আনন্দ কী আর ভালো লাগে? সাথের একজন একদিন বলল, সে দেশে ফিরে যেতে চায়। দেশের জন্য আমাদেরও খারাপ লাগছিল। আমাদের সেই শ্যামনগরের মাটির সোঁদা গন্ধ, ফসলের ঘ্রাণ, দখিনা বাতাস যেন চোখ বুঝলে অনুভব করতে পারছিলাম। আমরা সুখের দেশ থেকে চলে যেতে চাইলাম। কিন্তু দেখা গেল বিভিন্ন অজুহাতে রানি আমাদের আটকে রাখতে চায়। এভাবে অনেকদিন কাটল। রানি আমাদের চোখে চোখে রাখে।

“শেষে অনেক অপেক্ষা ও চেষ্টার পর আমরা রানির চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশের উদ্দেশ্যে জাহাজ ছাড়লাম। অনেক কষ্টে জাহাজ চালনা করে যেতে পেরেছিলাম দেশের বন্দরে। কিন্তু পথেই আমাদের মনে অনেক দুশ্চিন্তা ভর করে। আমরা পথেই অনুভব করতে পারছিলাম কোথাও কিছু একটা ঠিক নেই। চারপাশ যেন কিছুটা অন্যরকম লাগছে।

“দেশের বন্দরে গিয়ে নিশ্চিত হলাম। আসলে আমরা সুখের দেশের মায়াজালে বন্দি ছিলাম কয়েকশ বছর। এরই মধ্যে বন্দর এবং আমাদের দেশ সবই বদলে গেছে। জাহাজ থেকে না নেমেই একজনকে জিজ্ঞেস করলাম আয়ুধকে চিনে কী না। সে জানাল তারা গল্প শুনেছে তাদের দেশের ছেলে বীর আয়ুধ পাঁচশ বছর আগে সমুদ্র যাত্রায় বেরিয়েছিল। আর ফেরেনি।

“আমি বুঝতে পারলাম মাটিতে নামলেই আমাদের বিপদ হবে। তাই সঙ্গীদের নামতে নিষেধ করলাম। কিন্তু একজন সঙ্গী হতাশ হয়ে লাফিয়ে পড়েছিল জাহাজ থেকে। দেখলাম সে মাটিতে পড়া মাত্র ছাই হয়ে গেল।

দুঃখে আবার আমরা জাহাজ ভাসালাম সাগরে। মাঝ সমুদ্রে ঝড়ের কবলে পড়ে জাহাজ ডুবে গেল। আর আমার শেষ আশ্রয় হল এই নির্জন সমুদ্রের কোনে।

“আমার সঙ্গীদের সবাই হয়ত মারা গেছে। আমি বেঁচে গিয়েছিলাম এক অদ্ভুত উপায়ে। জাদুর পাত্রটি সাথে থাকার কারণে। এটা আমাকে সুখের দেশের রানি দিয়েছিল। তোমরা এটা সব সময় সাথে রেখো। তোমাদের সাথে দেখা হয়ে খুব ভালো লাগল। অনেকদিন পর কথা বলতে পারলাম।”

রাতুল, হারিরি এবং আকাশ বীর আয়ুধের গল্প শুনে তাকে বিদায় জানিয়ে আবার গালিচায় উঠল। এবার ডাঙার উদ্দেশ্যে তাদের যাত্রা। বীর আয়ুধের জন্য তাদের খারাপ লাগছিল। গালিচা যখন চলা শুরু করল আয়ুধ তখন আবার গুহার সামনের সেই পাথরে গিয়ে বসল। এভাবে আবার কতোকাল সে বসে থাকবে কে জানে!

ক্রমশ

ছবিঃ ইন্দ্রশেখর

জয়ঢাকের সমস্ত ধারাবাহিক একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s