ধারাবাহিক উপন্যাস

অন্তিম অভিযান->পিটার বিশ্বাস

dharaontim01 (Small) (2)

।৬।

২১১৮ খৃষ্টাব্দ

হাতের কমিউনিকেটরটা মৃদু টিঁ টিঁ করে শব্দ করে উঠল একবার। হাত ঘুরিয়ে ঘড়িটার পর্দায় আঙুল ছোঁয়ালো জিষ্ণু।

“সাড়ে আটটা বাজে।” ঘড়ির পর্দায় প্রফেসর বোসের মুখে বিরক্তির স্পর্শ ছিল। জিষ্ণু একটু অস্বস্তিভরে মাথা নাড়ল, “শেষ হয় নি এখনো বাবা।”

শিডিউল অনুযায়ী আজ সন্ধে সাড়ে ছটার মধ্যে কনটেইনমেন্ট চেম্বার তৈরি থাকবার কথা জিষ্ণু। কা পোন যে কোন সময় এসে পৌঁছোবে। আর কতক্ষণ সময় নেবে তুমি?”

ঘড়ির ডায়াল থেকে প্রফেসর বোসের মুখটা অদৃশ্য হয়ে গেছে। জিষ্ণুর মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল একটু। বাবা একটু বুড়ো হয়ে গেছে। একটু বেশি অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে আজকাল।

উঠে দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে দেয়ালের একটা জায়গা ছুঁলো জিষ্ণু। একখণ্ড টাইটানিয়াম টাইল নিঃশব্দে সরে গিয়ে একটা ফোকর তৈরি হয়ে গেল সেখানে। পায়ের নীচে সটান নেমে গেছে দানবিক যানটার অতিকায় দেহ। অনেক নীচে, গুহার মেঝের কাছে পিঁপড়ের সারের মতন মানুষজনের যাওয়া আসা। স্তূপাকৃতি টাইটানিয়াম আকরিক জমা হয়ে আছে কিছু দূরের ফার্নেসরুমের কাছে। সাতটা বছর! ওর মধ্যে ধীরে ধীরে তিলতিল করে সে গড়ে উঠতে দেখেছে এই অতিকায় দানব ক্ষেপণাস্ত্রকে। যত্ন করে শিখেছে তার কলাকৌশল। আর তারপর শিখতে শিখতে কখন যে নিজেই তার বাবার হাত থেকে একে গড়ে তোলবার দায়িত্বটা নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছে তা সে নিজেই ভালো করে খেয়াল করে নি।

dharaontim02 (Small)ঘুরে এসে ঘরটার মধ্যেকার অতিকায় ধাতব গহ্বরটার দিকে চোখ চালাল জিষ্ণু।  দানবিক চৌম্বক কয়েলগুলো অমিত শক্তির সম্ভাবনা নিয়ে ঘুমিয়ে আছে। ওর একেবারে কেন্দ্রস্থলে রাখা রয়েছে একটা ছোট্টো পাত্র। এই অতিকায় যানের প্রাণ ভোমরা আজ সেখানে প্রতিষ্ঠিত হবে।

অ্যালার্ম সুইচটা একবার টিপে দিল সে। এখান থেকে দেখা না গেলেও হাজারবার দেখা দৃশ্যটা কেমন তা সে মনের চোখে দিব্যি দেখতে পায়। গোটা গুহাক্ষেত্রটার সমস্ত আলো নিভে যাচ্ছে আলার্মের শব্দ পাবার সঙ্গেসঙ্গে। কজর্মব্যস্ত বিরাট এলাকাটা ডুবে যাচ্ছে নিবিড় অন্ধকারে। স্বয়ংক্রিয় সুইচেরা একে একে পাতালনদীর ওপর তিন জায়গায় বসানো তিনটে অতিকায় টারবাইন থেকে জন্মানো বিপুল তড়িতশক্তিকে সংহত করছে তার পায়ের নীচে ঘুমিয়ে থাকা চৌম্বক কয়েলগুলোর মধ্যে।

কন্ট্রোল প্যানেলের লাল রঙের বড়ো সুইচটা এইবার চেপে ধরল জিষ্ণু। জেগে উঠেছে অতিকায় চৌম্বক কয়েলরা। মৃদু থরোথরো কাঁপুনি জেগেছে গোটা যানটিতেই। কয়েলের মধ্যে ছুটে চলা সুতীব্র তড়িৎপ্রবাহ তার কেন্দ্রস্থলে রাখা ছোট্টো ফাঁকা অঞ্চলটাকে ঘিরে গড়ে তুলছে নিশ্ছিদ্র চৌম্বক আবরণ। সেই বিদ্যুতের ছোঁয়ায় আয়নিত বাতাস চোম্বক কুন্ডলিগুলোকে ঘিরে একটা অপার্থিব প্রভা তৈরি করছিল।

ক্যালিব্রেটরে রিডিং আসা শুরু করছিল একে একে। কন্ট্রোল প্যানেলের ওপর যন্ত্রের মত আঙুলগুলো ঘোরাফেরা করে চলেছিল জিষ্ণুর। তড়িৎপ্রবাহের মান ও অভিমুখে বিভিন্ন সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটিয়ে চৌম্বকক্ষেত্রের আবরণটিকে নিখুঁত করে না তোলা অবধি ওর কেন্দ্রটি তার ভয়াল জ্বালানিকে সঞ্চিত রাখবার উপযুক্ত হয়ে উঠবে না।

কাজটা জটিল। সময়সাপেক্ষ। প্রায় এক কিলোগ্রাম প্রতিবস্তু সঞ্চিত থাকবে ওর ভেতরে আগামী আট বছর ধরে। চৌম্বক বন্দিশালার গঠনে এতটুকু ত্রুটি থেকে গেলে যে কোন মুহূর্তে প্রলয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটে যেতে পারে।

সাতটা ইন্ডিকেটরের প্রত্যেকটা একে একে নির্ধারিত সবুজ চিহ্নগুলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সেইদিকে সতর্ক চোখ রেখে হাতের ঘড়িটা সামনে তুলে এনে তাতে কয়েকটা সংকেতশব্দ উচ্চারণ করল জিষ্ণু। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই তার ডায়ালটা কালো হয়ে গিয়ে কা পোনের হাসি হাসি মুখটা ভেসে উঠল সেখানে।

“খবর বলো।”

“মিশন সাকসেসফুল। খরচ হয়েছে মন্দ নয়। ছ হাজার মেট্রিক টন টাইটানিয়াম খরচ হয়েছে। আমি জীবনে-”

তার কথা মাঝপথে কেটে দিয়ে জিষ্ণু বলল, “পুরো পরিমাণটা জোগাড় হয়েছে? কতক্ষণ লাগবে তোমার এসে পৌঁছোতে?”

হঠাৎ ঘড়ির মধ্যে থেকে কা পোনের মুখটা সরে গিয়ে সেইখানে তার যানের ভেতরটা ভেসে উঠল। আড়াল থেকে তার গলা ভেসে আসছিল- “টেম্পোরারি কনটেইনমেন্ট চেম্বারটা আমার গোটা জাহাজটাকে জুড়ে নিয়েছে। মাত্র এক কিলোগ্রাম জ্বালানির জন্য—”

“কতক্ষণ লাগবে তোমার পৌঁছোতে?” জিষ্ণু অসহিষ্ণু গলায় ফের প্রশ্ন করল। পর্দায় কা পোনের মুখটা ভেসে উঠেছে আবার। তার দিকে চোখ টিপে সে বলল, “তুমি একেবারে তোমার বাবার মত হয়ে দাঁড়াচ্ছ দিন দিন। শোনো ছোকরা, কা পোন মিষ্টি হাসির চাকর। ভুরু কোঁচকানো না কমালে গোটা রাতটা লেগে যাবে আসতে আসতে। আর একটুখানি হাসো যদি, তাহলে আর দু ঘন্টা। ভারত মহাসাগরের ওপরে আছি।”

কা পোনের চুলদাড়িতে দু একজটা সাদার ঝলক দেখা যায় আজকাল। চেহারাটা অবশ্য বিশেষ কিছু বদলায় নি। মুখের কঠিন দাগগুলো সামান্য নরম। জিষ্ণু জানে, কেবলমাত্র তার দিকে তাকালেই কা পোনের মুখের সে পাথুরে দাগগুলো এইটুকু নরম হয়ে ওঠে।

হেসে ফেলল জিষ্ণু। তারপর বলল, “আচ্ছা, আচ্ছা। প্লিজ আংকল। শিগগির চলে এসো। এইবার হল তো?”

“হল মানে? আমার জিষ্ণু বেটা আমায় প্লিজ বলেছে। এইবার আমার বুড়ো ঘোড়া কেমন ছুট দেয় দেখো। ঘড়ি মিলিয়ে নাও। ঠিক দেড় ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাব আমি।”

“উঁহু, অত ব্যস্ত হতে হবে না। বাত্তিকলোয়ার কাস্টমস এলাকা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে ঢুকবে এসে বুঝতে পারছি। ওদের কাস্টমস ভেসেলগুলো কিন্তু সুপারসনিক। সেই সেবারে গাইডেন্স সিস্টেম আনবার সময় -মনে আছে?”

“ফুঃ। ওই একবারই ওরা কা পোনকে একটু অস্বস্তিতে ফেলেছিল। আর একবার লাগতে এসে দেখুক শুধু, আমার কার্তাং ভি এস দেখতেই পুরোনো মডেল। এমন ভেলকি দেখাব- যে বেটারা—”

সংযোগ কেটে যাবার মুখে কা পোনের সেই বিখ্যাত ঠোঁটচাপা হাসিটার শব্দ জিষ্ণুর কানে এসে পৌঁছোল ঠিক। মাসছয়েক আগের কথা। মিসাইলের গাইডেন্স সিস্টেমের জন্য দরকারি ইলেকট্রনিকসের একটা চালান উত্তর কোরিয়ান চোরাচালানকারীদের কাছ থেকে জোগাড় করে নিয়ে এই এয়ারস্পেস দিয়ে আসবার পথেই শ্রীলংকার কাস্টমস ভেসেলের হাতে প্রায় ধরা পড়বার উপক্রম হয়েছিল তার। কোনমতে রক্ষা পেয়েছিল সে সে যাত্রা। ফিরে আসবার পর এ নিয়ে প্রফেসর বোসের কাছে তাকে কম কথা সহ্য করতে হয় নি। সেই থেকে ওই এলাকার আইনরক্ষকদের ওপরে রেগে আছে কা পোন। ফের একটা কিছু হলে তার হাতে ওদের বিলক্ষণ দুঃখ যে আছে সেটা বোঝা যাচ্ছিল তার সেই হাসিটার থেকে।

dharaontim01 (Small)জিষ্ণু অবশ্য বেশ নিশ্চিন্তেই তার কাজে ফিরে গেল অবশ্য। এক ফাঁদে দুবার ধরা দেবে না কা পোন। এ প্রজেক্টের গুরুত্বও সে বোঝে। নিতান্ত নিরুপায় হলে তার ওপর নির্দেশ আছে গোটা যানটাকে উড়িয়ে দেবার। সে সম্ভাবনা যাতে না তৈরি হয় সেটা নিশ্চিত করবার মত বুদ্ধি আছে এই শৃগালধূর্ত মানুষটির।

কয়েক মিনিট বাদে রিডিংগুলো আরো একবার দেখে নিয়ে নিশ্চিত হয়ে সামনের দেয়ালজোড়া পর্দাটাকে জাগিয়ে তুলল সে। প্রফেসর বোসের ত্রিমাত্রিক প্রতিবিম্বটা ভাসছিল সেখানে। সামনে অন্য একটা পর্দায় ক্রমাগত বয়ে চলা সংখ্যার সারির দিকে চোখ রেখে মগ্ন হয়ে রয়েছেন তিনি।

“বাবা-”

“কথা বোলো না। জাইরোটেলের নতুন রিডিং আসছে।” চাপা গলায় জবাব দিলেন প্রফেসর। জিষ্ণু চুপ করে গেল। গত প্রায় বছরদয়েক তার হাতে ওয়ার্কশপের সব দায়িত্ব দিয়ে প্রফেসর বোস নিজেকে একেবারে গুটিয়ে নিয়েছেন তাঁর জাইরোটেল অবজারভেটরি নিয়ে। সৌরজগতের পাঁচটি বিভিন্ন স্থানে ভেসে চলা বিভিন্ন দেশের আলাদা আলাদা মহাকাশযানের ট্রান্সপন্ডার সংকেতকে এই জাইরোটেল যন্ত্রটা দিয়ে গোপনে ব্যবহার করে ক্রমাগত সংগ্রহ করে চলেছেন এগিয়ে আসা কালান্তক ধূমকেতুটার গতিবিধি। চুলচেরা বিশ্লেষণ করে চলেছেন তার গতিপথ আর সেইসঙ্গে তাল মিলিয়ে তাঁর ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য গতিপথ। বড়ো সুক্ষ্মভাবে তার গতিপথ বদলে চলেছে সুইফট টাটল।। ক্ষেপণাস্ত্রের অনবোর্ড যন্ত্রগণকে সেই তথ্যগুলো ক্রমাগত সরবরাহ করে প্রফেসর বোস তার শেষ আঘাতের অভিমুখের নিখুঁত নির্ধারণের কাজটি করে চলেছেন একনিষ্ঠভাবে।

“পোর্ট খুলে দাও, মেইনফ্রেমে তথ্যগুলো পাঠাব এবারে।”

জিষ্ণু নিঃশব্দে একটা বোতাম টিপে ধরল। তারপর বলল, “ঘন্টাদেড়েকের মধ্যে কা পোন পৌঁছোচ্ছে। কনটেইনমেন্ট চেম্বার রেডি। তুমি কি আসবে?”

“দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছচ্ছি আমি। তুমি তৈরি হয়ে নাও। তোমাকে বেরোতে হবে।”

“আ-আমায় -বেরোতে হবে—মানে?”

“কা পোন এসে পৌঁছোবার পর তোমাকে নিয়ে তাকে ফের উড়ে যেতে হবে। কমপক্ষে শ পাঁচেক মাইল দূরে কোথাও গিয়ে আশ্রয় নেবে তোমরা। তোমাদের কাছ থেকে সংকেত পাবার পর আমি কনটেইনমেন্ট চেম্বারে জ্বালানী ভরা শুরু করব।”

“কিন্তু বাবা—”

“কোন কিন্তু নয় জিষ্ণু। এ ক্ষেপণাস্ত্রের জনক আমি। এর ভেতরে প্রতিবস্তু জ্বালানি ঠিকভাবে সংরক্ষণের ব্যাপারে এ গ্রহে এক আমি ছাড়া আর কোন অভিজ্ঞ কারিগর নেই। এ কাজ আমি বিশ্বাস করে এমন কি তোমার হাতেও ছেড়ে দেব না। তৈরি হয়ে নাও-”

“কিন্তু বাবা-”

“আহ্‌! কোনো কিন্তু নয় এখন। কনটেইনমেন্ট চেম্বার প্রতিবস্তু সংরক্ষণের প্রযুক্তি এখনও অনুন্নত। কাজটা করতে গিয়ে যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে যায় সেক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে অন্তত একজনকে বেঁচে থাকতে হবে ফের একে গড়ে তোলবার জন্য। কিন্তু আর নয়। তুমি কাজ কর। আমি কা  পোনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে তোমার কাছে আসছি—-

ক্রমশ

উপন্যাসের আগের সমস্ত পর্ব একত্রে এইখানে