বনের ডায়েরি পাখি দেখা-মাছরাঙা অলোক গাঙ্গুলী শীত ২০১৮

আগের পর্ব ধনেশ

স্টিভেন স্পিলবার্গের সৃষ্টি জুরাসিক পার্ক ছায়াছবির সিরিজের কথা মনে আছে নিশ্চয়। এই সব ছবিতে ডাইনোসর জাতীয় এক অতি ভয়ংকর এবং প্রকান্ড টিকটিকি দেখা গিয়েছিল। আর দেখা গিয়েছিল কিছু উড়ন্ত ডাইনোসর পাখি, নাম টেরোড্যাক্টিল (Pterodactyl)। তাদের চেহারা, অর্থাৎ চোখ, ঠোঁট, তাকানো এমনকি ওড়ার কায়দাও আমাদের খুব চেনা একটি পাখির সঙ্গে মেলে। এমনিতেই পাখিদের টেরোড্যাক্টিলদের উত্তরসুরিও বলা হয়ে থাকে। আর এই পাখি হল গিয়ে আমাদের পাড়ার পাখি, নাম মাছরাঙা। মাছরাঙা (Coraciiformes) বর্গের অন্তর্গত একদল অত্যন্ত উজ্জ্বল রঙের ছোট বা মাঝারি আকৃতির একদল পাখি। অ্যান্টার্কটিকা বাদে প্রায় সারা পৃথিবীতেই মাছরাঙা দেখা যায়।  এ উপবর্গের তিনটি গোত্র রয়েছে। গোত্রগুলো হল Alcedinidae (গাং মাছরাঙা), Halcyonidae (গেছো মাছরাঙা) ও Cerylidae (পান মাছরাঙা)।  

মাছরাঙা কিন্তু আবার আমাদের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য-পাখি। কারণ  আমাদের বাংলা হল গিয়ে নদনদীর রাজ্য, আর এই সব নদী, জলাশয়ের ধারে গাছের ডালে বসে থাকতে দেখা যায় রঙিন এই সুন্দর পাখিটিকে। 

সারা পৃথিবীতে প্রায় ৯০ প্রজাতির মাছরাঙা দেখা যায়। এদের প্রায় সবারই দেহের তুলনায় মাথা বড়, লম্বা, ধারালো ও চোখা চঞ্চু, খাটো পা ও খাটো লেজ রয়েছে। বেশিরভাগ মাছরাঙার দেহ উজ্জ্বল রঙের আর স্ত্রী-পুরুষে সামান্য ভিন্নতা দেখা যায়। অধিকাংশ মাছরাঙা বিষুবীয় অঞ্চলে বসবাস করে এবং এদের বড় একটা অংশকে কেবলমাত্র বনে দেখা যায়। এরা অনেক ধরনের প্রাণী শিকার করে, তবে তার বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে মাছ। শিকারের আশায় তারা এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে জলের দিকে। 

এদের মাছ ধরে খাওয়ার দৃশ্য অতি চমৎকার। যেই না মাছের দেখা মেলে, ওমনি ছোঁ মেরে জলের ভিতর ডুব দিয়ে, বলতে গেলে প্রায় ডাইভ মেরে তুলে নিয়ে আসে তার শিকার। যদিও মাছ হল গিয়ে এই পাখির অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য, তবে এরা ব্যাঙ এবং অন্যান্য পোকামাকড়ও খেয়ে থাকে। 

আমাদের রাজ্যে চার প্রকারের মাছরাঙা পাওয়া যায়। এরা হচ্ছে Common Kingfisher(ছোট অথবা পাতি মাছরাঙা), 

White-breasted Kingfisher(সাদা বুক মাছরাঙা), Stork-billed Kingfisher(মেঘ-হও মাছরাঙা), Pied Kingfisher(পাকড়া মাছরাঙা) । এছাড়াও আরেকটি প্রজাতির মাছরাঙা রয়েছে যা সুন্দরবন ছাড়াও দেশের কিছু অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায় যায় নাম Blue-Eared Kingfisher(নিলাভ কান মাছরাঙা)। পুরুষ পাখিটি তার স্ত্রী সঙ্গিকে উড়তে উড়তেই আকৃষ্ট করার প্রয়াস করে সাধারণত তাকে একটি মাছ উপহার দিয়ে। তারপরে তারা কোন নদীর তীরে খাড়া পাড়ের মধ্যে তাদের বাসা বানায় তাদের লম্বা ঠোঁট দিয়ে গর্ত খুঁড়ে। এই সুরঙ্গ ৩ ফিট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এই সুরঙ্গে স্ত্রী মাছরাঙা ডিম পাড়ে এবং পরবর্তী পর্যায়ে পুরুষ মাছরাঙাটি ডিম ফোটায় সাহায্য করে থাকে। 

যে মাছরাঙা আমরা প্রায় আমাদের আশপাশে দেখতে পাই তা হল সাদা বুক মাছরাঙা (White-breasted Kingfisher)। ফুটবল মাঠে রেফারির বাঁশির সুরের মত এদের কন্ঠ। হঠাৎ কোথা থেকে ডাক দিলে মনে হয় কেউ বুঝি বাঁশি বাজাল। সেই জন্যেই এই মাছরাঙাকে দূর থেকে ডাকলেই  সনাক্ত করা যায়। 

আরেকটি হল মেঘ-হও মাছরাঙা (Stork Billed Kingfisher)। এদের ডাক আবার অনেকটা কর্কশ প্রকৃতির। আর ছোট বা পাতি মাছরাঙা (Common Kingfisher), যাকে জলের ধারেই বেশি পাওয়া যায়, অনেকটা ধীর প্রকৃতির ডাক, চড়ুই-এর মতন। উজ্জল নীল রঙের এই পাখিটি দেখতে কিন্তু অতি চমৎকার।

পাকড়া মাছরাঙা (Pied Kingfisher) ও তাই। সাদা কালো এই মাছরাঙাটির মাথায় ছোট একটা ঝূঁটি আছে। Pied Kingfisher আবার অনেকটা Crested Kingfisher এর সঙ্গে মেলে। দুটোরই গায়ের রঙ প্রায় একই রকম। কিন্তু Crested Kingfisher কেবল মাত্র হিমালয় অঞ্চলেই দেখা যায়। 

একটু সচেতন হলেই এই পাখিগুলোকে আমাদের বাড়ির আনাচেকানাচে দেখতে পাওয়া যায়। সাদা বুক মাছরাঙাকে তো প্রায়ই আমাদের বাড়ির পেছনে গাছের ডালে বসে থাকতে দেখি, মাঝে মাঝে মুখে শিকারও ধরা থাকে। অন্যান্যগুলো জলাশয়ের পাশ দিয়ে গেলেও দেখা যায়। হিমালয় অঞ্চলে বেড়াতে গেলে দেখতে পাওয়া যেতে পারে Oriental Dwarf Kingfisher, Crested Kingfisher ও Blue-eared Kingfisher। 

কিছু প্রজাতির মাছরাঙা ভারতের উপকুলীয় অঞ্চলেও দেখা যায় যার মধ্যে কলার্ড মাছরাঙা (Collared Kingfisher) ও কালো মাথা মাছরাঙা (Black Capped Kingfisher) দেখা যায়। আমাদের দেশে ও বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে এই পাখি দুটির দেখা পাওয়া যায়। এছাড়া ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের উপকুলবর্তী জেলাগুলিতে এর দেখা মেলে। আর এদের পাওয়া যাবে আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে। 

মাছরাঙা পাখি এতটাই সুন্দর যে এরা সহজেই চোখে পড়ে যায় এদের উজ্জ্বল রঙের জন্য আর তাছাড়া এরা খোলা জায়গায় থাকতে পছন্দ করে, বিশেষ করে জলের ধারে। এবারে কোথাও বেড়াতে গেলে অন্যান্য পাখিদের সঙ্গে মাছরাঙাদের প্রতিও বিশেষ নজর রাখা প্রয়োজন। ক্যামেরার লেন্স বন্দি করতে পারলে তো কথাই নেই। নিজের তোলা পাখির ছবির সমাদর আলাদা ।  টেরোড্যাক্টিলদের নিরীহ উত্তরসুরিদের একটা ছবির এ্যালবাম বাড়িতে থাকলে মন্দ হয় না। স্টিভেন স্পিলবার্গের সঙ্গে জুরাসিক ওয়ার্ল্ডের কথাও বার বার মনে পড়বে। 

আমার বাড়ির আশেপাশে চার প্রকারের মধ্যে অন্তত তিন প্রকারের মাছরাঙা আমি প্রায়ই দেখতে পাই। আজকাল তো আবার দেখি আমার অফিসের সাত তলার জালালা দিয়ে, বোধহয় আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই একটি মেঘ-হও মাছরাঙা (Stork Billed Kingfisher) তারস্বরে ডাকতে থাকে। আমি কেবল জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ওকে মুগ্ধ হয়ে দেখি আর   ভাবি ইশ্বর ওকে কত মন দিয়ে ঢেলে সাজিয়েছে। একবার জিম করবেট জাতীয় উদ্দ্যানে রামগঙ্গা নদীর তীরে একটা বড় পাথরের উপর হটাৎ মনে হল একটা ছোট আকারের মাছ পড়ে আছে। যেহেতু ওখানে জীপ থেকে নামার অনুমতি নেই, তাই চালক কে বললাম গাড়িটাকে একটু পেছাতে। তারপর কাছে যেতেই দেখি মাছ নয় কিন্তু অবিকল মাছের মতন দেখতে একটি ঝুঁটিওয়ালা মাছরাঙা (Crested Kingfisher) শিকারের আশায় বসে আছে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষায় রইলাম যে এই বুঝি নদীতে ডুব দিয়ে একটা মাছ তুলে আনবে, কিন্তু গাড়ির চালক জানাল যে আর বেশিক্ষণ এখানে অপেক্ষা করা নিরাপদ নয়। এই নদীর জলে বাঘ, হাতি আর একটু পরেই জল খেতে আসবে তখন আমাদের দেখতে পেয়ে ওরা মোটেই আমাদের আপ্যায়ন করবে না বরঞ্চ আমাদের তাড়া করে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই আর সময় নষ্ট না করে ওখান থেকে আগে পলায়ন করলাম। তার মধ্যে অবশ্য আমি মাছরাঙাটিকে আমার ক্যামেরা লেন্সবন্দি করে ফেলেছি। 

কিন্তু অতি পরিচিত এই পাখিটি দিন দিন বিভিন্ন এলাকা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। IUCN (International Union for Conservation of Nature – Hdqrs. Gland, Switzerland) এর রিপোর্ট অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরের জলের স্তর দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় এবং দক্ষিণাঞ্চল দিন দিন প্লাবিত হওয়ায় এদের আবাসস্থল ক্রমাগত ধ্বংসের পথে, তাছাড়া জল-দূষণ এবং নদী ভরাট-এর ফলেও এরা ক্রমশ তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে। তাই এই রঙিন প্রজাতির পাখি গুলোর প্রাকৃতিক নিবাস রক্ষায় আমাদের সচেষ্ট হতে হবে।

বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s