পুজোর উপন্যাস গৌরীভিটিলের অদ্ভুত গন্ধ পুষ্পেন মণ্ডল শরৎ ২০১৭

পুষ্পেন মন্ডলের আগের উপন্যাস সমুদ্রগুপ্তের তরবারি

পুষ্পেন মণ্ডল

।।এক।।

“নেপোলিয়নের সাথে টিপু সুলতানের খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিল, সেটা জানিস কি?”

আমরা চুপ করে আছি দেখে সৌম্যদা বই থেকে মুখ তুলে আবার বলল, “১৭৯৪ সালে নেপোলিয়নের তত্ত্বাবধানে ফ্রান্সের সাথে টিপু সুলতানের একটা সামরিক চুক্তি হয়েছিল। ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ফ্রান্সের সৈন্য সুলতানের পক্ষ নেবে। পরিবর্তে ফ্রান্সের সাম্রাজ্য বিস্তারে টিপু নেপোলিয়নের পাশে থাকবে। যদিও কার্যক্ষেত্রে তা হয়নি। নেপোলিয়নের সৈন্য ১৭৯৮ সালে মিশরে ‘নীলনদের যুদ্ধ’-এ ব্রিটিশ সৈন্যদের কাছে গো-হারান হেরে যায়। আর এদিকে ১৭৯৯ সালে শ্রীরঙ্গপত্তম দুর্গে মারাঠা আর ব্রিটিশদের যৌথ শক্তির সামনে যুদ্ধক্ষেত্রেই প্রাণত্যাগ করেন টিপু সুলতান। ফ্রান্সের সাহায্য আর এসে পৌঁছায়নি।”

ট্রেনে ঝিমুনিভাবটা এসেছিল অনেকক্ষণ। একটানা দুলুনি আর ইতিহাসের গল্প শুনতে শুনতে কখন যে ঘুম জড়িয়ে ধরেছে চোখে বুঝতেই পারিনি। শেষে সৌম্যদাই ডেকে দিল, “চল, এসে গেছে ডেসটিনেশন।”

চেয়ে দেখি শ্রী, অরো আর দিয়াও ঢুলছে ঘাড় কাত করে। শেষরাতে ট্রেন পালটে একটা ফাঁকা বগিতে উঠেছিলাম আমরা। লোকাল ট্রেনের এক বৃদ্ধ প্যাসেঞ্জারকে সৌম্যদা বলে রেখেছিল, “মুরাঙ্গাদুলাই আসলে বলবেন।”  তা সেই লোকটিকেও দেখতে পেলাম না। আর পেলেও খুব একটা সুবিধা হত বলে আমার মনে হয় না। কারণ একটাই, এদের খটমট ভাষা।

যাই হোক, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম ভোরের আলো ফুটেছে সবে। দৃষ্টিপথে শুধুই ধু ধু চাষের জমি। বহু দূরে নারকেলগাছের সারি। হু হু করে সব দৌড়চ্ছে পেছনদিকে।

খানিক বাদে স্টেশন চত্বরে ট্রেন ঢুকে পড়ল। তাড়াহুড়ো করে কাঁধের সব বড়ো ব্যাগ আর হোল্ডলগুলো নিয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে বাইরে পা রাখতেই একঝলক নোনা হাওয়া ধাক্কা মারল নাকে।

শ্রী বলল, “মনে হচ্ছে সমুদ্র খুব বেশি দূরে নয়।”

স্টেশন বলতে শুধুমাত্র লম্বাটে ফাঁকা লাল মোরাম বিছানো একটা জনশূন্য জায়গা। লোকজনও বেশি নেই। দূরে দেখা যাচ্ছে একটা গুমটি। ওটাই মনে হয় টিকিট কাউন্টার। ট্রেনটা চলে যাবার পর কিছুক্ষণ এদিক ওদিক দেখে গুমটির দিকেই এগোলাম আমরা। নেমপ্লেটে বিজাতীয় ভাষায় যা লেখা আছে সেটা পড়া আমাদের কম্ম নয়।

হেলতে দুলতে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম শেডের নিচে একটা কাঠের বেঞ্চ। সেখানে বসে আছে খাকি পোশাক পরা এক বৃদ্ধ গ্যাংম্যান। সৌম্যদা কাছে গিয়ে জানতে চাইল, “এখান থেকে গৌরীভিটিল যাব। কোনও গাড়ি পাওয়া যাবে কি?”

এখানে জানিয়ে রাখি, তামিলরা বাড়িকে ভিটিল বলে। লোকটা ঘোলাটে চোখে তাকাল আমাদের দিকে। কিন্তু উত্তর দিল না কোনও। প্রশ্নটা ইংরাজি ও হিন্দিতে পুনরাবৃত্তি করল আবার। পাশ থেকে একজন মাঝবয়সী লোক লক্ষ করছিল আমাদের। তিনি এগিয়ে এসে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করল, “উনি কানে শোনেন কম। আর আপনাদের ভাষা উনি বুঝতেও পারবেন না। কোন গৌরীভিটিলের কথা বলছেন বলুন তো?”

সৌম্যদা ঘুরে তাকিয়ে বলল, “স্বর্গীয় রমেশ আইয়ারর বাড়ি। তাঁর ছেলে মধুবন পাঠিয়েছে আমাকে। বলেছিল স্টেশনে নেমে সমুদ্রের ধারে টিলার মাথায় গৌরীবাড়ি বললে সবাই এক ডাকে চিনবে।”

ভ্রূ কুঁচকে চোখটা একবার কপালে তুলে আবার নামিয়ে নিলেন কুচকুচে কালো রঙের মানুষটি। বললেন, “বুঝেছি। ক’দিন আগে আর একজন এসেছিলেন। আসলে ওখানে তো অনেকদিন কেউ থাকে না। একেবারে পোড়ো হয়ে আছে। বুনো আগাছায় ভর্তি। তাছাড়া…”

তাঁকে থামিয়ে সৌম্যদা জিজ্ঞেস করল, “আর একজন এসেছিলেন? চেনেন তাঁকে?”

“না স্যার, কয়েকমাস আগের কথা। লোকটাকে আমি দেখিনি। করিমকাকার মুখে শুনেছিলাম। একজন দাড়িওলা বয়স্ক লোক এসেছিলেন রাতের ট্রেনে। তিনিও গৌরীভিটিলের খোঁজ করছিলেন।”

“তাই নাকি! তা সেই বাড়িটা এখান থেকে কতদূর?”

“তা দু-তিন কিলোমিটার হবে।”

দিয়া প্রশ্ন করল, “যাব কীসে?”

অরোর সব কিছুতেই হামবড়াইয়া ভাব। সে হাত নেড়ে জানাল, “অবশ্য কিছু না পেলে হেঁটেও চলে যাওয়া যায়, রাস্তাটা শুধু বলে দিন।”

শ্রী তার কথা শুনে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, হেঁটেই চল, দু-তিন কিলোমিটার এমন কিছু বেশি নয়।”

“একটা অটো আছে আমার। যদি বলেন, পৌঁছে দিতে পারি।”

বললাম, “আমরা মোট পাঁচজন। ব্যাগপত্রও অনেক আছে। হবে আপনার গাড়িতে?”

“ভালোভাবে হয়ে যাবে। আসুন আমার সাথে।”

উপরের ক্যারিয়ারে মালপত্র উঠে গেল সব। দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে নিয়ে ভট ভট করে আওয়াজ তুলে মেঠো বালি পথে ছুটল অটো। বেশ একটা ঝাঁকুনি লাগছে। লাফানি বললেই ভালো হয়। চালক বললেন, “আমার নাম সর্বেশ। পাশের গ্রামে থাকি। এই গাড়িটা আমার নিজের। আপনারা তো আজকেই ফিরবেন। অপেক্ষা করব তাহলে।”

সৌম্যদা মিঠে রোদে বড়ো করে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে সানগ্লাসটা চোখে বসিয়ে উত্তর দিল, “না দাদা, আমরা এখন ক’দিন আছি এখানে।”

“সে কী! থাকবেন কোথায়? মানে এখানে তো হোটেল-টোটেল কিছুই নেই।”

“কেন? ঐ বাড়িতেই থাকব।”

“ওটা মানুষের বাসযোগ্য নয়, স্যার। বহুবছর হল ওখানে লোকজন থাকে না। বুনো শিয়াল আর সাপখোপের আস্তানা।”

“ঠিক আছে, দেখা যাক। আগে তো চলুন। তবে আপনি যদি আমাদের সাথে ক’দিন সময় দেন তার পুরো পারিশ্রমিক পেয়ে যাবেন।”

সে ব্যাজার মুখে জানাল, “কিন্তু সন্ধ্যার পর আমাকে আর পাবেন না।”

অটোর ঝাঁকুনি খেতে খেতে অরো প্রশ্ন করল, “কেন? সন্ধ্যার পরে কী ব্যাপার?”

সর্বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জানাল, “ওটা একটা অভিশপ্ত বাড়ি। আপনারা শহরের মানুষ, ওসব বিশ্বাস করবেন না জানি। গ্রামের মানুষ ঐ বাড়িটাকে এড়িয়ে চলে।”

শ্রী এতক্ষণ নতুন কেনা ক্যামেরাটা নিয়ে খুটুর-খাটুর করছিল। ওর ছবি তোলার নেশা। ভূতুড়ে বাড়িতে ক’টা দিন কাটাতে হবে শুনে এককথায় রাজি হয়ে গেছে। হঠাৎ ফিসফিস করে বলল, “ঐ গন্ধটার কথা জিজ্ঞেস কর।”

সৌম্যদা প্রশ্ন করল, “আপনাদের গ্রাম ঐ বাড়িটা থেকে কতদূর?”

“তা স্যার, পাঁচ-ছ কিলোমিটার হবে।”

“ঐ বাড়িটার কাছাকাছি গেলে নাকি একটা অদ্ভুত পচা গন্ধ পাওয়া যায়?”

“অদ্ভুত গন্ধ! কই জানি না তো!” একটু থেমে আবার বলল, “তবে বাড়িটার অনেক দুর্নাম আছে। না হলে তো কবেই বিক্রি হয়ে যেত। শুনেছিলাম বছরচারেক আগে এক ব্যবসায়ী ভদ্রলোক দেখতে এসেছিলেন। সমুদ্রের ধারে ওরকম নিরিবিলি জায়গায় ঐ বাড়িটাকেই সারিয়ে নিলে ভালো হোটেল হয়ে যেত। কিন্তু কী দেখে যে ভয় পেয়ে পালালেন তা কেউ জানে না।”

জানতে চাইলাম, “আপনি কোনওদিন ঢুকেছেন ঐ বাড়িতে?”

“না স্যার। শুধু আমি কেন, ওখানে গ্রামের কোনও লোকই যায় না। শোনা যায়, বছর ত্রিশ আগে ওখানে এক ডাকাত দলের সর্দার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে থাকত। আমাদের গ্রামে অবশ্য কখনও উৎপাত করেনি। ডাকাতি করত দূরে দূরে গিয়ে। আর গ্রামের এক মহাজনের কাছে বিক্রি করতে আসত চুরি করা মাল। মাঝে অনেকদিন তারা আর আসেনি। তো সেই মহাজন দু’জন লেঠেলকে পাঠিয়েছিলেন ঐ বাড়িতে খোঁজ নিতে। কিন্তু তারা ফিরে এসে কাঁপতে কাঁপতে বলল, জনাকুড়ি লোকের পচাগলা মৃতদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে গোটা বাড়ি জুড়ে। কারও হাত নেই, কারও পা নেই, আর কারও মুণ্ডু নেই। তারপর থেকে গ্রামের লোক ও-পথ মাড়ায় না।”

বলতে বলতেই অটো রাস্তা ছেড়ে ঝাউবনের মধ্যে প্রবেশ করল। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সামনে দেখা গেল নীল সমুদ্র। যদিও জল অনেক দূরে। গর্জনের আওয়াজ ভেসে আসছে। সমুদ্র দেখলেই আমার মন তিরবেগে ছুটে যায় মাতাল জলরাশি লক্ষ করে। যাক, আমরা একটা গোপন এক্সপিডিশনে এসেছি। তাই মনকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে চুপ করালাম। সামনে বালির চড়া। দূর থেকে দেখা গেল, সমুদ্রের পাড়ে বেশ কয়েকটা টিলা-পাহাড় মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সৌম্যদা ঐদিকেই আঙুল তুলে জানাল, “পূর্বঘাট পর্বতমালার অংশ।”

শ্রী বলল, “আমি তো অনেক আশা নিয়ে এসেছি। এবারে অরিজিনাল ভূত দেখব বলে।”

অরো ফোড়ণ কাটল, “শুধু দেখবি? ছবি তোলার জন্য নাইট ভিশন ক্যামেরাও তো নিয়ে এসেছিস দেখছি।”

আসলে ফটোগ্রাফিটা ওর নেশা। ছবি ও ভালোই তোলে। একই সুরে সুর মিলিয়ে দিয়াও জানাল, “আগেও বেশ কয়েকটা ভূতের বাড়িতে রাত কাটিয়েছি আমরা। কিন্তু সেগুলো ছিল পুরোটাই গুজব।”

অরো বলল, “এই ধরনের গল্প বেশিরভাগ গুজবই হয়। এই ভূত ভাগাও মঞ্চে আমারও তো হল বছর দুয়েক। আজ পর্যন্ত একটা জায়গাতেও আসল ভূতের দেখা পেলাম না।”

আমি স্মৃতির পলি হাতড়ে জানিয়ে দিলাম, “সে বার দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার আছিপুরে নদীর ধারে একটা দুশো বছরের পুরনো বারুদ ফ্যাক্টরিতে গিয়েছিলাম রাত কাটাতে। রাত্রিবেলা ঐ বাড়িটার কাছে কেউ গেলে নাকি বিকট অট্টহাসির শব্দ শুনেছে অনেকে। সেই থেকে ‘ভূতে ধরা’ গণ হিস্টিরিয়ার মতো একটা রোগ স্থানীয় গ্রামগুলিতে ছড়াচ্ছিল। শেষে আমরা ফাঁদ পেতে দু’জন লোককে ধরেছিলাম। ওরাই দিনের বেলা ওঝা সেজে ঝাড়ফুঁক দিত, আর রাতে ভূত সেজে ভয় দেখাত লোকেদের।”

আমরা চারজন অনেকদিনের বন্ধু। যে সময়ের কথা বলছি, তখন আমরা কলেজে পড়ি। উদ্ভট জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার পাশাপাশি যুক্তিবাদী, কুসংস্কার বিরোধী কাজকর্মও শুরু হয়েছে। পাতি বাংলায় যাকে বলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। এখানে আসাটাও হঠাৎ করে।

সপ্তাহখানেক আগের কথা। কফিহাউসে সেদিন আড্ডাটা জমে উঠেছিল ভূতকে কেন্দ্র করে। আমার একটা ভূতের গল্প বেরিয়েছে নাম করা এক কিশোর-পত্রিকায়। সেজন্য আমারই ঘাড় ভেঙে সবাই মোচ্ছব করছিল। ফিশ-কবিরাজিগুলো সবে শেষ হয়েছে কি হয়নি, অরো আরও চারটে চিকেন কাটলেটের অর্ডার দিয়ে বসল। আমার হার্টবিট বেড়ে গেছে ততক্ষণে। সদ্য হাতে পাওয়া সারা মাসের টিউশনির টাকা গেল বানের জলে ভেসে। হঠাৎ করে সৌম্যদার আগমন। পাশ থেকে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে ভ্রূ নাচিয়ে বলল, “কী রে, সত্যিকারের ভূতের বাড়ি যাবি নাকি তোরা?”

আমি মনে মনে তখন মানিব্যাগের মোট টাকার অঙ্কটা হিসাব করছি। শ্রী ব্যঙ্গার্থক প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল, “তুমি আবার প্রাণীতত্ত্ব ছেড়ে ভূত বিশেষজ্ঞ হলে কবে?”

“প্রাণীতত্ত্বের সাথে ভূতেদের খুব নিবিড় সম্পর্ক। সে তোকে পরে ভালো করে বুঝিয়ে বলব। তবে তোরা যদি রাজি থাকিস তাহলে নতুন একটা অভিজ্ঞতা হবে সে গ্যারেন্টি দিতে পারি। আমি ক’দিন পরেই বেরোচ্ছি। গন্তব্য ভারতের একদম দক্ষিণে, সমুদ্র উপকূল। যদি রাজি থাকিস তাহলে তোদের টিকিটটাও কাটব। ঘোরা তো হবেই সঙ্গে একটা রোমহর্ষক থ্রিলার ফ্রি।”

“আগে রহস্যটার একটা আভাস দাও।” আমি একটু খুঁচিয়ে জানার চেষ্টা করলাম ব্যাপারটা। উত্তরে মুখে কিছু না বলে পকেট থেকে একটা ইংরাজি নিউজ পেপার কাটিং বের করে ভাঁজটা সযত্নে খুলে টেবিলের উপর মেলে ধরল। দেখলাম, তাতে লেখা আছে, ব্যাঙ্গালোর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট প্রাণীবিজ্ঞানী প্রফেসার ডঃ অনুপ বাগচী নিখোঁজ।

কিছুক্ষণের আলোচনাতেই ঠিক হয়ে গেল আমাদের যাওয়া। ভেবে দেখলাম, বেশিদিন ঘরে চুপচাপ বসে থাকলে মাথার ঘিলুতে মরচে পড়ে। যেটা আর যাই হোক, এই বয়েসের পক্ষে মোটেই শুভ লক্ষণ নয়। তাছাড়া কলেজের পরীক্ষাটাও সবেমাত্র শেষ হয়েছে, হাতে কাজকম্ম তেমন কিছু নেই।

অরো বলল, “চল, তাহলে ঘুরেই আসা যাক সবাই মিলে। এমনিতেও অনেকদিন হল আউটিং হয়নি। তবে খরচপাতি কিন্তু সব তোমাকে করতে হবে।”

সৌম্যদা হাসিমুখে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।

সমুদ্রের ধার দিয়ে বেশ কিছুটা গিয়ে আবার ঝাউবনের মধ্যে প্রবেশ করল গাড়ি। তারপর আঁকাবাঁকা পথে টিলার গা দিয়ে কিছুটা উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল জঙ্গলের মধ্যে।

“কী হল! তেল শেষ নাকি?”

সর্বেশ সাদা ধপধপে দু’পাটি দাঁত বের করে গাড়ি থেকে নেমে জানাল, “এই পাহাড়ের উপরেই বাড়িটা। বাকি পথ হেঁটে উঠতে হবে। আপনারা যান। বাড়ির ভেতরটা দেখে যদি মনে হয় থাকার মতো, গুছিয়ে নিতে পারবেন, তাহলে কিছু জিনিসপত্র লাগলে এনে দেব গ্রাম থেকে।”

অগত্যা ব্যাগপত্র নামিয়ে পিঠে বেঁধে পাথরের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করলাম উপরে। এবড়োখেবড়ো পাথরের ধাপগুলিতে সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। দু’দিকে বুনো ঝোপঝাড়ের মধ্যে ফুটে রয়েছে থোকা থোকা রংবাহারি ফুল। সমুদ্রের দিক থেকে আসা দমকা হাওয়ায় ঝাউগাছের পাতায় আওয়াজ হচ্ছে শনশন করে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই চোখের সামনে ভেসে উঠল জঙ্গলের মধ্যে বিশাল বড়ো দোতলা বাড়ি। আরও একটু এগোতে পুরো বাড়িটা দেখা গেল। অবশ্য বাড়ি না বলে অট্টালিকা বলাই ভালো। পলেস্তারা খসা শ্যাওলা ধরা দেয়াল। ফাঁকফোকর দিয়ে অজস্র বট অশ্বত্থ শাখাপ্রশাখা বিস্তার করেছে বহুকাল ধরে। শ্রী একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল পোড়ো বাড়িটার দিকে। তারপর ক্যামেরার ক্লিক শুরু হল পর পর। আমার মনে হল, যেন জটাধারী ধ্যানমগ্ন কোনও সাধু গভীর রহস্য বুকে চেপে বসে রয়েছেন।

সামনে ঝোপের মধ্যে একটা বাঁশের শক্ত লাঠি পড়েছিল। সেটা তুলে নিয়ে গুল্মবন ঠেলে এগোতে গিয়ে অরো মন্তব্য করল, “এটা মনে হয় সেই লেঠেলগুলো ফেলে পালিয়েছিল। গ্রামের মহাজন যাদের পাঠিয়ে ছিলেন ডাকাত দলের খোঁজে।”

“মানে তুই বলতে চাস, এটা তিরিশ বছর আগের লাঠি? এটাকে দেখে কি অত পুরনো বলে মনে হচ্ছে?” শ্রী লাঠিটাকে খুঁটিয়ে দেখে প্রশ্ন করল।

সৌম্যদা বলল, “তিরিশ বছর ধরে একটা বাঁশের লাঠি রোদবৃষ্টিতে পড়ে থাকলে সেটাও মাটিতে মিশে যাবার কথা। এটা বেশ নতুন। তবে জিনিসটা হাতছাড়া করিস না। কাজে লাগবে। পা ঠুকে ঠুকে আয়। পায়ের শব্দে সরে যাবে সাপখোপ আর বুনো জন্তুরা।”

কর্কশ স্বরে একটা পাখি আওয়াজ করে উড়ে গেল মাথার উপর দিয়ে। চার ধাপ সিঁড়ি উঠে প্রধান দরজা। তার সামনে পৌঁছাতেই পেছন থেকে একঝলক দমকা হাওয়া এসে এলোমেলো করে দিল আমাদের চুল। ফিরে তাকাতে উপর থেকে চোখে পড়ল দিগন্ত বিস্তৃত নীল জল। আহ্‌, কী সুন্দর! দূর থেকে দেখা যাচ্ছে ঢেউগুলো ভাঙছে।

ভেজানো দরজাটা জোরে ঠেলতে ফাঁক হয়ে গেল একটা পাল্লা। ভেতরটা বেশ অন্ধকার। সৌম্যদা আমাদের ক্যাপ্টেন। সেই প্রবেশ করল প্রথম। পেছনে একে একে আমরাও এগলাম। বলল, “উপরে দেখ। কড়িবরগা থেকে বাদুড় ঝুলছে!”

শ্রী ছবি তোলার অনেক বিষয় পেয়েছে। সে জন্য তার মন খুব খুশি। সে মন্তব্য করল, “এতে অবাক হওয়ার কী আছে? ভূত আর বাদুড়ের সম্পর্ক অনেকদিনের।”

দিয়া গলাটাকে গম্ভীর করে বলল, “ভ্যাম্পেয়ার!”

ফাঁকা বাড়িতে কথাটা বেশ অনুরণিত হল, ভ্যাম্পেয়ার… পেয়ার… পেয়ার… পেয়ার…

আমি বললাম, “হতেও পারে। অসম্ভব কিছুই না।”

চারদিকেই নোংরা। শুকনো পাতা আর জন্তুদের বিষ্ঠা। ঝুল। একটা ভ্যাপসা বুনো গন্ধ। কিছুটা এগোতে সামনে পড়ল ফাঁকা চওড়া উঠোন। উপরে আকাশ দেখা যাচ্ছে। চারদিক ঘিরে বড়ো বড়ো ঘর। কারোরই প্রায় তালা নেই দরজায়। দু-একটায় উঁকি মেরে দেখলাম আমরা। একটা দুটো ঘুণে খাওয়া ভাঙা আসবাব ছাড়া বেশিরভাগই ফাঁকা। চিঁ চিঁ শব্দ করে একটা বেজি দৌড়ে পালাল। একটা সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলাতে। সৌম্যদা সেদিকেই এগোল।

দিয়া হঠাৎ প্রশ্ন করল, “এখানে কি তুমি কোনও গুপ্তধনের সন্ধানে এসেছ?”

অরো অবাক গলায় বলল, “গুপ্তধন! ও মাই গড! এটা তো মাথায় আসেনি এতক্ষণ। সেই ডাকাত সর্দারের লুকিয়ে রাখা সোনাদানা তো? বাহ্‌, তাহলে তো আমরা রাতারাতি বড়লোক হয়ে যাব রে!”

“কথাটা না জেনে বললেও একেবারে ভিত্তিহীন নয়, বুঝলি? গুপ্তধন এ বাড়িতে থাকার একটা সম্ভাবনা আছে। তবে সেটা আদৌ এতদিন অক্ষত আছে কি না বা থাকলেও উদ্ধার করা যাবে কি না সেটা পরিষ্কার নয়। তবে এখানে আসার ওটাই একমাত্র কারণ নয়। তোরা শুধু এটুকু জেনে রাখ যে এই বাড়ির ইতিহাসটা জানার পর সপ্তাহ খানেক আমি ভালো করে ঘুমাতে পারিনি।”

দিয়া কিছুক্ষণ আগে জঙ্গল থেকে তোলা একটা জবাফুল কানের পাশে চুলের মধ্যে গুঁজে বলল, “একটু খোলসা করে বলবে কি?”

“বলব তো নিশ্চয়ই। আগে এখানে থাকার মতো একটা ব্যবস্থা করতে হবে আর তৈরি করতে হবে গোটা বাড়ির আর্কিটেকচারাল একটা ম্যাপ।”

“কেন! ম্যাপ বানাতে হবে কেন?”

“বাড়িটা লম্বায় প্রায় তিনশো ফুট, আর চওড়ায় দুশো। মাঝামাঝি জায়গায় একটা পাথরে বাঁধানো পরিখা মানে মিষ্টি জলের পুকুর আছে। আমরা এখন যেখানে আছি সেটা হল বাইরের মহল। লাগোয়া আরও দুটো মহল আছে এর পেছনে। আর আমার ধারণা, বাড়িটার নিচে আছে অনেকগুলি গুপ্তঘর আর সুড়ঙ্গ।”

“বাব্বা! এত খবর তোমার বন্ধু মধুবন আগে থেকেই দিয়ে দিয়েছে তোমাকে?”

সৌম্যদা হাঁটতে হাঁটতে বলল, “সে এসব কিছুই জানে না। এখানে আসেনি কোনওদিন। মধুবন থাকে নরউইচে। অর্থনীতির অধ্যাপক। আমি গতবারে যখন গিয়েছিলাম ওখানে, কথা প্রসঙ্গে এই বাড়ির কথাটা বলল। যাদের থেকে ওর বাবা কিনেছিলেন তাঁরা লন্ডনে থাকেন। সেখানেও গিয়েছিলাম আমরা। ডঃ মিল্টন বনেদি বড়লোক। ওঁর কাছে একটা হাতে লেখা বই আছে। সেটা ছিল ওঁর প্রপিতামহর আত্মজীবনী। তিনি ছিলেন তৎকালীন এক বড়ো ব্রিটিশ শিল্পপতি। তো সেই আত্মজীবনীতে এই বাড়িটির উল্লেখ রয়েছে। লিখে গেছেন প্রায় একশো বছর আগের একটা দুর্ঘটনার কথা। মধুবনের বাবা অবশ্য সেসব কিছুই জানতেন না। সমুদ্রের ধারে টিলার মাথায় একটা পুরনো বাড়ি কম দামে পেয়েছিলেন। কিনে নেন বিশেষ খোঁজখবর না করেই। কিন্তু একটি রাতও এখানে তিনি কাটাতে পারেননি।”

“কেন?”

“কারণ, এই বাড়িটা কেনার পর যেদিন গৃহপ্রবেশ করার কথা ছিল সেদিনই ওঁর স্ত্রী মানে মধুবনের মা মারা যান। ব্যাপারটা হয়ত কাকতালীয়। কিন্তু রমেশবাবুর ধারণা হয় এই বাড়িতে কোনও অশুভ শক্তির বাস। তারপর থেকে তিনিও আর আসেননি এখানে। অনেক চেষ্টা করেছেন বাড়িটা বিক্রি করার, কিন্তু আজ পর্যন্ত খরিদ্দার পাওয়া যায়নি। একটা মাড়োয়ারি খদ্দেরের কথা তো আসতে আসতেই শুনলি। মধুবন ঐ ব্যাপারটা বলেছিল আমাকে।”

কথা বলতে বলতে দোতলার সবক’টা ঘর আমরা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। চোখে পড়ল, দক্ষিণদিকে সমুদ্রমুখী পর পর কয়েকটা ঘর তালাবন্ধ। পিঠের রুকস্যাক থেকে একটি চাবির তোড়া বের করে সৌম্যদা জানাল, “আসার সময়ে ওদের মাদুরাইয়ের বাড়ি থেকে নিয়ে এলাম চাবির তোড়াটা। রমেশবাবু নাকি বাড়িটা কেনার পর কিছুটা অংশ সারিয়েছিলেন। সেই সময়েই এই তালাগুলি লাগানো হয়েছিল।”

প্রথম ঘরটা খুলতেই নাকে ঢুকল একটা চিমসে গন্ধ। দীর্ঘদিন বন্ধ হয়ে পড়ে থাকলে যা হয়। তবে ঘরটি বেশ বড়ো। আসবাব তেমন কিছু নেই। একটা খাট পড়ে আছে কোণের দিকে। উপরের গদিটা যদিও নষ্ট হয়ে গেছে। একটা ধুলোয় মোড়া বড়ো ড্রেসিং-কাম-শোকেস। আর একটা টেবিল চেয়ার। সবক’টা দরজা জানালা বন্ধ থাকায় আবর্জনা অন্য ঘরগুলোর তুলনায় অনেক কম। তবে ঝুল জমে আছে বহুকালের। কাঁধের ব্যাগগুলো নামিয়ে রেখে লাঠি দিয়ে ঝুল পরিষ্কার করতে লেগে গেল অরো।

দিয়া বলল, “যাই বল, ঐ সর্বেশ নামে লোকটা যা ভয় পাইয়ে দিল! মনের মধ্যে একটা তোলপাড় চলছে কিন্তু।”

“গ্রামের মানুষের মনে কুসংস্কার তো থাকবেই,” বলে সৌম্যদা সমুদ্রের দিকের বড়ো জানালাদুটো খুলে দিতে ঝোড়ো হাওয়ায় বহুদিনের ভ্যাপসা গন্ধটা মিলিয়ে গেল ধীরে ধীরে। বাইরে থেকে কিছু ঝাউপাতা কুড়িয়ে এনে ঘরটা পরিষ্কার করতে আরও কিছুটা সময় লাগল।

হোল্ডলগুলো খুলে মেঝেতে বিছিয়ে তাতে টান টান হয়ে শুয়ে আমি বললাম, “দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা কী হবে?”

শ্রী জানাল, “সঙ্গে যা আছে খিচুড়ি হয়ে যাবে। কিন্তু জল আর কেরোসিন তেল চাই।”

সৌম্যদা বলল, “ঠিক আছে, আমি আর অরো সর্বেশের সাথে গ্রামে গিয়ে কেরোসিন তেলের বন্দোবস্ত করে আসছি। জলও আনিয়ে নেব কিছুটা।”

আমি একটা বই পড়ছিলাম ট্রেনে আসতে আসতে। থমাস হ্যারিসের লেখা ‘দ্যা সাইলেন্স অফ দ্যা ল্যাম্বস’। সাসপেন্স থ্রিলার। সেটাই ব্যাগ থেকে বের করে আবার পড়া শুরু করলাম। জানালার বাইরে ঝাউপাতার মধ্যে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঝড়ো হাওয়া। অদ্ভুত একটা শব্দ হচ্ছে ঝমঝম করে। সেটা শুনতে শুনতে কখন ডুবে গিয়েছিলাম রহস্য গল্পের মধ্যে। শ্রী আর দিয়া গুনগুন করে কথা বলছিল। অবচেতন মনে শুধু একবার শুনলাম, ‘চল, আমরা একটু চারপাশটা ঘুরে দেখি।’

মাঝখানে কতটা সময় কেটেছে ঠিক খেয়াল নেই। আচমকা একটা আওয়াজ হল বাইরের বারান্দায়। কেউ যেন ভারী পায়ে দৌড়ে চলে গেল ধপ ধপ করে। প্রথম চটকায় হকচকিয়ে গিয়ে ডাক দিলাম, “শ্রীইইই… দিয়াআআ…”

কিন্তু কোনো প্রত্যুত্তর এল না। বইটা রেখে বাইরে এলাম। কেউ কোথাও নেই। আবার হাঁক দিলাম। আশ্চর্য! এবারেও সাড়াশব্দ নেই কোনও। তাহলে শব্দটা যে কানে এল সেটা কি মনের ভুল? সাসপেন্সের গল্প পড়তে পড়তে ঘোরের মধ্যে শুনলাম নাকি! কিন্তু ওরা তো অনেকক্ষণ গেছে। ঘড়ি বলছে দেড়ঘণ্টা হতে চলল। বারান্দার রেলিং ধরে উপরে তাকিয়ে দেখলাম, সূর্য মাথার উপরে উঠেছে অনেকটা। সৌম্যদা আর অরোর তো এত দেরি হবার তো কথা নয়! একটা অজানা ভয় মনের মধ্যে চেপে বসছে।

হঠাৎ নাকে এল একটা বিচ্ছিরি আঁশটে গন্ধ! অনেকটা পচা ডিমের মতো। কেমন গুলিয়ে উঠল পেটটা। পকেট থেকে রুমাল বের করে নাকে চেপে ধরলাম। সৌম্যদা আসার সময় কি এই গন্ধটার কথাই বলেছিল? কোথা থেকে আসছে গন্ধটা? কিছু বুঝতে পারছি না। আমরা যখন এসেছিলাম এখানে তখন তো ছিল না! দৌড়ে গিয়ে ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে ব্যাগ থেকে পারফিউম বের করলাম। ফ্যাঁস ফ্যাঁস করে স্প্রে করলাম চারদিকে। তারপর সমুদ্রের দিকের জানালার ধারে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস নিলাম অনেকক্ষণ। কী সব ঘটছে! খেয়াল করলাম, গায়ের সব রোম খাড়া হয়ে গেছে আমার। মনটাকে শান্ত করার জন্য তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ সমুদ্রের দিকে। একটু ধাতস্থ হওয়ার পর ফিরে গিয়ে দরজাটা খুললাম আবার। গন্ধটা মিলিয়ে এসেছে অনেকটা।

এদিক ওদিক দেখে, ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলাম নিচে। উঠোন পেরিয়ে প্রধান দরজা দিয়ে বেরোতে যাব, হঠাৎ শিহরণ খেলে গেল সারা শরীরে। একটা দশ ফুটের মতো লম্বা কালো মোটা সাপ সরসর করে ঢুকে গেল ইটের ফোকরে। বাপ রে! আর একটু অসাবধান হলেই সাপের গায়ে পা পড়ত। তখন একটা ছোবলেই গঙ্গাপ্রাপ্তি। আতঙ্কে নট নড়নচড়ন অবস্থা। নিঃশ্বাস পড়ছে ঘন ঘন।

“কী রে? এখানে ওরকম স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”

সৌম্যদার গলার আওয়াজে সম্বিৎ ফিরল। ঢোঁক গিলে বললাম, “একটা বিশাল বড়ো সাপ…”

“সাপ! কোথায়?”

আঙুল তুলে দেখালাম, “ঢুকে গেল ঐ গর্তে।”

“কীরকম দেখতে ছিল?”

সাপটির বর্ণনা শুনে সৌম্যদা বলল, “মনে হচ্ছে কিং কোবরা। এই পোড়োবাড়িটা যে সাপেদের পুরনো দুর্গ হবে তাতে আর আশ্চর্যের কী! সেই জন্যই তোদের পা ঠুকে ঠুকে সাবধানে হাঁটতে বলেছিলাম। ঠিক আছে, চল উপরে। কার্বলিক অ্যাসিড আছে সঙ্গে। চারদিকে ছড়াতে হবে।”

আমি কোনওরকমে ঢোঁক গিলে বললাম, “কিন্তু শ্রী আর দিয়া কোথায় গেল? ওদের অনেকক্ষণ থেকে খুঁজছি।”

অরো অবাক হল কথাটা শুনে, “কেন, ওরা তো তোর সাথেই ছিল!”

“আমি বই পড়ছিলাম। ওরা বলল, চারপাশটা একটু ঘুরে দেখবে।”

“উপরের সব ঘর খুঁজে দেখেছিস?”

আমি মাথা নাড়লাম, “হ্যাঁ। নেই কোথাও!”

অরো ব্যস্ত হয়ে বলল, “চল, বাড়ির পেছনদিকটা যাই।”

সৌম্যদা হঠাৎ খামচে ধরল আমার হাতটা, “দাঁড়া।”

“কী হল?”

পেছন ফিরে মেন গেট থেকে নেমে রাস্তা দিয়ে কিছুটা গিয়ে একটা ঝোপের সামনে দাঁড়াল সৌম্যদা। নিচু হয়ে একটা মাটিতে পড়ে থাকা লাল জবাফুল তুলে নিল।

“মনে আছে, এখানে আসার সময়ে ওরা তুলেছিল এই ফুলটা? পরে শ্রী মাথায় লাগিয়েছিল। টিলার নিচে একটা বড়ো জবাফুলের গাছ রয়েছে। আর যতদূর মনে পড়ছে, আমি ওকে যখন শেষ দেখেছি উপরের ঘরে, তখনও ওর মাথায় ছিল এটা।”

“তার মানে?”

“তার মানে ওরা বাড়ির মধ্যে নেই। এই রাস্তা দিয়ে নিচে নেমেছে। আর তখনই ফুলটা পড়েছে এখানে।”

“নিচে কোথায় যাবে?”

কিছুক্ষণ ভ্রূ কুঁচকে থাকার পর সৌম্যদা চুলে হাত চালিয়ে বলল, “মেয়েরা সমুদ্র দেখলে ঘরে চুপ করে বসে থাকতে পারে না। আমার ধারণা, ওরা স্নান করতে গেছে। এসে পড়বে। চল, আমরা ততক্ষণ উপরে গিয়ে রান্নার ব্যবস্থা করি।”

“তবুও আমি গিয়ে দেখে আসি সমুদ্রের দিকটা। তোমরা ঘরে যাও।” কথাটা বলে অরো পাথরের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। আমি ভেবে দেখলাম, সৌম্যদার কথাটাতে যুক্তি আছে। আমরা ঘরে পৌঁছানোর মিনিট দুয়েকের মধ্যেই কানে আসল হি হি করে হাসির শব্দ। পরক্ষণে দেখা গেল ভিজে চুলে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে শ্রী আর দিয়া।

আমি ওদের বারান্দায় দৌড়ানোর শব্দ আর পচা গন্ধটার কথা জানালাম। সৌম্যদা দেখলাম কথাটা শুনে গুম খেয়ে রইল কয়েক মিনিট। আবার বেরিয়ে ভালো করে রেইকি করে এল জায়গাটা। তারপর স্টোভ জ্বেলে খিচুড়ি চড়িয়ে দিয়ে বলল, “আমার বিশ্বাস, এরকম ঘটনা আরও কিছু ঘটবে। ভয় না পেয়ে চোখ, নাক, কান সবসময়ে খোলা রাখতে হবে। এই বিশ্রী গন্ধটার কথা মিল্টন সাহেব তাঁর আত্মজীবনীতেও লিখে গিয়েছিলেন।”

শ্রী গম্ভীর হয়ে বলল, “তার মানে গন্ধটা একশো বছরের পুরনো?”

।।দুই।।

সেদিন খাওয়া শেষ করতে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেল আমাদের। খিদের মুখে গরম গরম আলুর ঝোল আর খিচুড়ি একেবারে অমৃত লাগল। শুধু শেষপাতে চাটনি অথবা মিষ্টি ছিল না বলে একটু খুঁতখুঁত করছিল মনটা। দিয়াকে বলতে একটা পেপারমিন্ট এগিয়ে দিল আমার দিকে। সেটা চিবোতে চিবোতে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখলাম, জোয়ারের টানে জল অনেকটা পাড়ের কাছে চলে এসেছে। এরকম জনমানবহীন সমুদ্রসৈকতের আলাদা আকর্ষণ। আমারও মনটা দৌড়ে গিয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে। দেখলাম, গোটা সমুদ্রসৈকত লাল হয়ে আছে। শ্রী টেলিলেন্স লাগানো ক্যামেটা এগিয়ে দিতে তাতে চোখ রেখে দেখলাম কোটি কোটি লাল কাঁকড়া থিক থিক করছে তটে। বললাম, “এই বাড়িটাকে হোটেল বা রিসর্ট করলে চলবে দারুণ!”   

দিয়া জিজ্ঞেস করল, “সৌম্যদা, সেই সাহেবের ডায়েরির কথা কী বলছিলে তখন?”

ল্যাপটপ খুলে এক মনে কীসব নোট করছিল। সেটা বন্ধ করে পিঠে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে বলল, “বলব। তার আগে আলো থাকতে থাকতে বাড়ির ভেতরদিকটা সবাই মিলে একবার ঘুরে আসি চল।”

সিঁড়ি দিয়ে নেমে পশ্চিমদিকে নিচের উঠোন পেরোতে বাইরের মহল্লা শেষ হল। আরও দু’ধাপ সিঁড়ি দিয়ে নামতে একটা ভাঙা দরজা। সেটা পেরিয়ে আবার মাঝখানে একটু ফাঁকা জায়গা। কাঁটাগুল্ম, ঝোপঝাড় ভর্তি। সৌম্যদা উক্তি করল, “জায়গাটা মানুষের পক্ষে সত্যিই নিরাপদ নয়। তোরা সাবধানে আয়। বিষধর সাপ, শিয়াল, বনবেড়াল তো আছেই, হায়নাও থাকতে পারে। ঐ দেখ, সাপের খোলস।”

দেখলাম বিশাল বড়ো একটা সাপের খোলস। দুপুরে দেখা সাপটারই হবে হয়তো। শুনেছি, খুব বিষধর সাপ একই জায়গায় দুটো থাকে না। পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে ফাঁকা জায়গাটার মধ্যিখানে লম্বা আর চওড়ায় প্রায় পঁচিশ ফুট একটা পাথর ঘেরা পরিখা চোখে পড়ল। উঁকি মেরে দেখলাম, জল কুচকুচে কালো। চারদিকে মোটা মোটা বট-অশ্বত্থের শেকড় আর শাখামূলগুলি, শ্যাওলা ধরা দেয়াল, পাথরের পিলার, মেঝে সব জায়গায় নিজেদের বিজয়ধ্বজা উড়িয়েছে। চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকার ঘরগুলি। আচমকা চেঁচিয়ে উঠল দিয়া। কারণ, চোখের পলকে গা ঘেঁষে দৌড়ে কী একটা চলে গেল! আমিও সরে এসেছি ভয় পেয়ে।

কাঁপা গলায় দিয়া বলল, “কালচে বাদামী রঙের কী জন্তু ওটা?”

“সিভেট ক্যাট, মানে উদবেড়াল,” অরো মিচকে হেসে বলল, “উদবেড়ালের কামড়ে মারা গেছে, এমন কথা শোনেনি কেউ। চিৎকার করে কাঁপুনি ধরিয়ে দিলি!”

শ্রী ফিসফিস করে মন্তব্য করল, “মনে হচ্ছে ঐ ঘরগুলির মধ্যে আরও অনেক জোড়া চোখ অপেক্ষা করছে।”

হঠাৎ খেয়াল হল, পাশে সৌম্যদা নেই। এদিক ওদিক খোঁজাখুঁজির পর লক্ষ গেল একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে। সেদিকে এগিয়ে গিয়ে দেখি, এক হাতে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে মেঝেতে কী যেন পর্যবেক্ষণ করছে। তারপর পকেট থেকে একটা মেজারিং ফিতে বের করে মাপতে শুরু করল। আমরা একে একে ঢুকলাম। আর প্রত্যেকের রুমাল সমেত হাত আপনা থেকেই চাপা পড়ল নাকে। কারণটা সেই বিদঘুটে পচা গন্ধ। সৌম্যদা ঘাড় তুলে বলল, “শ্রী, তোর ক্যামেরাটা দে তো।”

তারপর বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে মেঝের ছবি তুলল। আমিই প্রশ্ন করলাম, “কী আছে মেঝেতে?”

প্রথমে মাথা নাড়তে নাড়তে চুকচুক করে একটা আওয়াজ করল। তারপর হাতের পাঁচটা আঙুল দেখিয়ে ফিসফিস করে বলল, “প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর পায়ের ছাপ।”

অরোর সমস্ত বিষয়ে ফাজলামি করা স্বভাব। বলল, “বাহ্‌! এটা নিশ্চয়ই মৈনাকের পরের গল্পের হেডিং হতে চলেছে।”

আমি ওর কথায় কান না দিয়ে নিচু হয়ে মেঝেতে দেখলাম ধুলোর আস্তরণের মধ্যে সত্যি পাঁচ আঙুলের ব্যাঙের মতো কোনও প্রাণীর পায়ের ছাপ। এক একটা ছাপ লম্বাচওড়ায় ফুট খানেকের কাছাকাছি। তার মানে জীবটি মানুষের সমান সমান লম্বা আর বেশ বড়সড়। কথাটা সৌম্যদাকে বলতে ও গম্ভীর গলায় গালে হাত ঘসতে ঘসতে বলল, “ভাবছি, এরকম কোনও প্রাণী পৃথিবীতে এখনও টিকে আছে? যদিও…” কিছু আরও বলতে গিয়েও চেপে গেল মনে হল।

সেখান থেকে বেরিয়ে সামনেই পরিখা। তার পাশ দিয়ে কিছুটা গিয়ে আরও দু’ধাপ সিঁড়ি নামতে দেখা গেল আর একটি বন্ধ দরজা। সৌম্যদা বলল, “এটা মনে হচ্ছে পেছনের মহল্লা, অন্দরমহল।”

চারপাশে জমে থাকা ময়লা আর আগাছা দেখে অরো স্বগতোক্তি করল, “দরজাটা খোলা হয়নি বহুদিন। এঁটে গেছে শক্ত হয়ে।”

দু-চার বার হাত দিয়ে ঠেলার পর আমি সজোরে লাথি মারলাম একটা। কিন্তু তাতেও কোনও কাজ হল না। সবাই মিলে ধাক্কা দিতে একচুলও সরল না দরজাটা। ভালো করে লক্ষ করে আমাদের হাত বাড়িয়ে থামতে বলল সৌম্যদা। অস্ফুট স্বরে বলল, “আশ্চর্য!”

“লক্ষ করেছিস, এই দাগগুলো?” আঙুল দিয়ে দেখাল ছোটো ছোটো গর্ত। “সামনের দুটো মহল্লার দরজার অবস্থা দেখেছিস? খুবই খারাপ। অর্ধেক ভেঙে পড়েছে। ঘুণে খাওয়া কাঠ। অথচ এটা মনে হচ্ছে কালো বোর্নিও হার্ড উডের তৈরি। একশো বছর কেন, পাঁচশো বছরেও এ কাঠ নষ্ট হবার নয়।”

“তাই নাকি! তা কী এমন রয়েছে এর ভেতরে?”

“সেটা এই দরজা ভাঙতে পারলে তবেই বলা সম্ভব। পেছন দিকে যাবার আর কোনও রাস্তা আছে কি না সেটাও দেখতে হবে আগে।”

অরো দু’দিনের না কাটা দাড়িতে একবার হাত বুলিয়ে বলল, “দেয়ালটাও উঠে গেছে একদম মসৃণ। দোতলাতেও কোনও জানালা নেই। বাড়ির পেছনদিকে গিয়ে একবার দেখা যাক।”

“হ্যাঁ, ওদিকেও যাব। তার আগে তোরা আমাকে একটু সাহায্য কর।” বলে পিঠের ব্যাগ থেকে কীসব ছোটো ছোটো যন্ত্রপাতি বের করল সৌম্যদা।

“এগুলো কী?”

“ওয়্যারলেস হাই ডেফিনেশন মুভি ক্যামেরা, উইথ নাইট ভিশন। মোট তিরিশটা আছে। বাড়ির ভেতরে বাইরে সব জায়গাতেই লাগাতে হবে, বুঝলি! জাপানি জিনিস। রাত্রেও নিখুঁত ছবি তুলবে। ইঁদুর, আরশোলা, সাপ সব কিছুই ধরা পড়বে এর লেন্সের মধ্যে এলে। আর ছবিগুলো শব্দ সমেত আমার ল্যাপটপে রেকর্ডিং হবে। এর জন্য স্পেশাল ব্যাটারি এনেছি। আটচল্লিশ ঘণ্টার ব্যাকআপ আছে।”

“বাপ রে! তুমি তো ভালোমতো তৈরি হয়েই এসেছ দেখছি।”

বলা বাহুল্য, যে সময়ের ঘটনা তখন ভূ-ভারতে এসব জিনিস খুব একটা সহজলভ্য ছিল না।

বিভিন্ন কোণে ক্যামেরাগুলো সাবধানে লাগিয়ে দিলাম আমরা। হিসাব করে নিলাম যাতে পুরো জায়গাটা মোটামুটি কভার করে। তারপর মেন গেট দিয়ে বেরিয়ে ঝাউবনের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগোলাম বাড়ির পেছনদিকে। আকাশে টুকরো মেঘগুলোতে লাল রং মাখিয়ে সূর্য ততক্ষণে পশ্চিমে ঢলতে শুরু করেছে। ঝাউগাছের নিচেতে ক্রমশ জমাট বাঁধছে অন্ধকার। তার সাথে রহস্যটাও ঘনীভূত হচ্ছে টের পাচ্ছিলাম। একটা নিমগাছ থেকে কয়েকটা ডাল ভেঙে নিয়ে সৌম্যদা বলল, “আমি আর অরো সর্বেশের সাথে গ্রামে গিয়ে কয়েকজনের সাথে কথা বললাম। সবার প্রায় একই মত। এই বাড়িটা নাকি অভিশপ্ত।”

অরো জানাল, “যারা এখানে রাত্রিবাস করেছে কেউ নাকি জীবিত ফেরেনি।”

শ্রী ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল, “তাহলে আমরাই বা রিস্কটা নিচ্ছি কেন বুঝতে পারছি না।”

“কেন? তুই কি ভয় পেয়েছিস? ভূতের বাড়ির ছবি তুলতে যাব বলে তো আনন্দের নাচতে নাচতে চলে এলি।”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আমি বললাম, “কিছু একটা যে রয়েছে সেটা বেশ টের পাচ্ছি।”

কথা বলতে বলতে এসে পৌঁছলাম বাড়ির পেছনদিকে। শ্যাওলা ধরা মোটা দুর্গের মতো দেয়াল। নিচে উপরে কোনও জানালা নেই। সোজা উঠে গেছে। পেছনদিকে ঘন জঙ্গল। অনেক খুঁজেও এদিক থেকে ভেতরে প্রবেশের জন্য কোনও দরজা পেলাম না।

বললাম, “তার মানে বাড়ির পেছনদিকে যাবার ঐ একটাই রাস্তা?”

সৌম্যদা মাথা চুলকে বলল, “ঐ হার্ড উডের তৈরি কালো দরজাটা কিন্তু…”

“কিন্তু কী?”

“ঠিক আছে, আজকের রাতটা যাক। তারপর দেখা যাবে।” নিজের মনেই স্বগতোক্তি করে কিছুক্ষণ জঙ্গলের মধ্যে কীসব খুঁটিয়ে লক্ষ করল। তারপর বলল, “এদিকেও দু-একটা ক্যামেরা লাগিয়ে দিই।”

।।তিন।।

যখন ঘরে ফিরলাম সন্ধ্যার ঘন অন্ধকারে বাড়িটাকে আরও থমথমে লাগছে। জঙ্গলের পাখিরা চ্যাঁচামেচি করতে করতে হাঁপিয়ে গিয়ে চুপ করেছে সবে। একটানা ঝপাং ঝপাং ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে সাদা ফসফরাস মাখা দিকচক্রবালের রেখা থেকে। আঁশটে গন্ধটা আবার নাকে এল। অথচ সারাদিন এই গন্ধটা তেমন টের পাইনি। সূর্যের আলোর তেজে কি চাপা পড়ে ছিল এতক্ষণ! সৌম্যদা ব্যাগ থেকে একটা বড়ো আতসকাচ বের করে প্রায় শুয়ে পড়ল বারান্দায়। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে কাচটা একহাতে ধরে এগোতে লাগল মুণ্ডুটা নিচু করে। কলেজে পড়াতে দেখেছি ওকে চক-ডাস্টার হাতে। ডিবেট কম্পিটিশনে ঝড় তুলতে দেখেছি স্টেজে। ক্রিকেটমাঠেও ব্যাট আর বল হাতে দাপিয়ে বেড়িয়েছে বহুদিন। তবে ধুলোর মধ্যে হামাগুড়ি দিতে এই প্রথম দেখলাম।

এদিকে অরো স্টোভ জ্বেলে চায়ের জল ফোটাতে শুরু করল। সৌম্যদা মিনিট কুড়ির হামাগুড়ি পর্ব শেষ করে হাত-পা ঝেড়ে ফিরে এসে টেবিলে বসল। সমুদ্রের হাওয়ায় ততক্ষণে গন্ধটা কমে এসেছে। ল্যাপটপ অন করে ক্যামেরাগুলো চালাল। পরপর সাদাকালো ছবি ফুটে উঠল স্ক্রিনে। একটা একটা করে জুম করে করে দেখা গেল ছবি ও শব্দ ঠিকঠাক আসছে কি না। চিঁ চিঁ করে পুকুরের ধার থেকে দুটো ছুঁচোর মারামারির শব্দ কানে এল। দিয়া এগিয়ে এসে বলল, “এখানে বসেই তো গোটা বাড়িটাতে নজর রাখা যাবে দেখছি।”

আত্মপ্রশান্তির একটা অভিব্যক্তি মুখে ছড়িয়ে সৌম্যদা বলল, “তা যাবে। এখন দেখা যাক আজ রাতে বিশেষ কিছু ঘটে কি না।”

শ্রী স্ন্যাক্স আর চায়ের কাপগুলো এগিয়ে দিল সবাইকে। দিয়া প্রশ্ন করল, “এবার সেই সাহেবের ডায়েরিতে কী লেখা ছিল, সেটা একটু বলবে?”

ব্যাটারিচালিত একটা সাদা আলো জ্বলছিল ভেতরে। অরো উঠে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। যদিও ল্যাপটপের স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে বাইরের বারান্দাটা। হঠাৎ খেয়াল হল, বাইরের ঝড়ো হাওয়াটা আর নেই। সৌম্যদা উঠে গিয়ে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখে ফিসফিস করে বলল, “আকাশের তারাগুলি আর দেখা যাচ্ছে না। মেঘ করছে, বৃষ্টি হতে পারে।”

আচমকা একটা অদ্ভুত আওয়াজে শিউরে উঠল সকলে। তীক্ষ্ণস্বরে অনেকগুলি চিৎকার একসাথে। এরকম জনশূন্য জায়গায় গায়ের রক্ত জল হয়ে যাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। চোখগুলি আমড়া-আঁটির মতো বেরিয়ে এসেছে শ্রীয়ের। সৌম্যদা কান খাড়া করে শুনে বলল, “বাদুড়রা শিকার ধরতে বেরিয়েছে।”

“ওও!”

কিছুক্ষণের মধ্যে থেমে গেল শব্দটা।

“যাক, এবার শুরু কর তোমার গল্প।”

পুরনো কাঠের চেয়ারটিতে পা তুলে বসে কপালের ঘামটা মুছে নিল সে। মেঝেতে বিছানো হোল্ডলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে বাকিরা। ঝোড়ো হাওয়াটা বন্ধ হতেই গুমোট করেছে খুব। ঘাম গড়াতে শুরু করেছে সকলের। এমনিতেই আমরা বিষুবরেখার খুব কাছাকাছি আছি। দিয়া আর শ্রী দুটো বই বের করে নাড়তে শুরু করেছে হাতপাখার মতো। ব্যাগ থেকে একটা ডায়েরি বের করে কোলের উপরে রেখে কিছুক্ষণ চোখ বুলিয়ে নিয়ে সৌম্যদা শুরু করল, “সময়টা আঠারোশো শতাব্দীর শেষের দিকে। তৎকালীন মাদ্রাজকে ঘিরে বেশ কিছু বড়ো বড়ো বস্ত্রশিল্প গড়ে উঠেছে। সামান্য মূল্যে জমি কিনে অথবা জবরদখল করে কারখানা গড়ে উঠল অনেক। পেছনে মদতদাতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। জোনাথন মিল্টন ব্রিটেন থেকে এদেশে এসেছিলেন ১৮৭৫ সাল নাগাদ। যন্ত্রপাতির উপর টেকনিক্যাল পড়াশোনা কিছু করা ছিল তাঁর। সাধারণ মেকানিক হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন একটি কারখানায়। তারপর বহু তেল খড় পুড়িয়ে মাদ্রাজের কাছে নিজেই একটা কাপড়ের মিল চালু করেন। সেটা ১৮৯৯ সাল। তারও বেশ কয়েকবছর পরে, মিল যখন বেশ রমরম করে চলছে, তখন স্থানীয় এক রাজা মহেন্দ্রনাথ চারির কাছ থেকে কিনেছিলেন এই প্রাসাদটা। রাজা ছিলেন মিল্টন সাহেবের বন্ধু। বাড়িটা মহেন্দ্রনাথ তৈরি করেছিলেন তাঁর তৃতীয় স্ত্রী গৌরীদেবীর জন্য। তিনি ছিলেন পরমা সুন্দরী এক মহীয়সী নারী। সেই সময়ে পড়াশোনা করতে তিনি বিদেশে গিয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের রয়্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়তে। যদিও পাশ করার আগেই তাঁকে দেশে ফিরতে হয়েছিল। দেশীয় আয়ুর্বেদ নিয়েও তাঁর প্রচুর আগ্রহ ছিল। সেই নিয়ে তিনি স্থানীয় ভাষাতে বইও লিখেছিলেন। ১৯০৭ সালে গৌরীদেবী এই বাড়িতে মারা যান।”

“কীভাবে?”

“ব্যাপারটা ঠিক কী হয়েছিল, সেটা সাহেবের আত্মজীবনীতে কোনও উল্লেখ নেই। পরে রাজা মহেন্দ্রনাথ বাড়িটি সাহেবকে বেচে দেন। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, বাড়িটা বিক্রি করলেও রাজা এই বাড়িতে শেষজীবন পর্যন্ত আসতেন। তাঁর ধারণা ছিল গৌরীদেবীর আত্মা এই বাড়িতেই আছেন। রাতের দিকে শোনা যেত তাঁর নূপুরের পদধ্বনি। মিল্টনসাহেব লিখেছিলেন যে তিনিও নাকি কয়েকবার শুনেছেন সেই শব্দ। ভোর রাতে।”

গুড়গুড় করে মেঘ ডাকছিল অনেকক্ষণ ধরে। শুরু হল ঝিরঝিরে বৃষ্টি। 

“একটা প্রশ্ন ছিল।” অরো হাত তুলে বলল। “তুমি যে ক্যামেরাগুলো লাগালে তাতে কি ভূতের ছবি উঠবে?”

শ্রী তাকে এক দাবড়ানি দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “সেই পচা আঁশটে গন্ধের কথাটা বল।”

“মিল্টনসাহেব বাড়িটা কেনার পরে খুব কম সময়ই ছিলেন এখানে। শেষের মহল্লায় রাজা থাকতেন এসে মাঝে মাঝে। এই বাড়িতেই বৃদ্ধ বয়েসে মারা যান তিনি। শেষ মহল্লায় সাহেব কোনওদিন প্রবেশ করেননি। তিনি লিখেছেন, মাঝে মাঝে বিকট আঁশটে গন্ধে বমি উঠে আসত। কিন্তু সেই গন্ধের উৎস যে কী কিছুতেই খুঁজে পাননি।”

সৌম্যদাকে থামিয়ে অরো বলে উঠল, “এই বিচ্ছিরি গন্ধের মধ্যেই কোনও রহস্য লুকিয়ে আছে। আমি প্রথমে ভাবছিলাম কাছাকাছি কোনও জন্তু বা সামুদ্রিক বড়ো মাছ মরে পড়ে আছে। এটা তারই গন্ধ আসছে মাঝে মাঝে।”

“এই ব্যাপারটা তোদের বিস্তারিত বলতে গেলে জীববিজ্ঞানী প্রফেসার ডঃ অনুপ বাগচীর গবেষণাপত্র উল্লেখ করতে হবে।”

“মানে যিনি এখানেই নিরুদ্দেশ হয়েছেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

মাথা নেড়ে সৌম্যদা চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভেবে নিল। তারপর শুরু করল, “আমরা যে সমুদ্র দেখি তার জলের নিচে আছে অদৃশ্য ছাদের নানা ভাগ। বিভিন্ন স্তর। যে সমস্ত জায়গায় প্রবল ঢেউ খেলে সেখানে তীরের ঠিক কাছের পাথরগুলো অসংখ্য শামুক, ঝিনুক, গেঁড়ি বা চিংড়িজাতীয় প্রাণীতে ঢাকা পড়ে থাকে। ঐ সমস্ত প্রাণী তাদের জায়গায় এমনভাবে শক্ত হয়ে এঁটে বসে থাকে যে প্রবল ঝড়ঝঞ্ঝাও তাদের সরাতে পারে না।

“আর একটু গভীরে গেলে দেখবি, জলের যে স্তরে সূর্যের আলো পড়ছে সেখানে ধূসর বাদামী ও সবুজ শ্যাওলার মাঝখানে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে রংবেরঙের মাছ, দোল খাচ্ছে স্বচ্ছ জেলিমাছ, চলেছে তারামাছের ঝাঁক। মগ্নশিলার গায়ে অদ্ভুত সব প্রাণীর বাস। তারা গাছপালার মতো স্থির। খাদ্যের সন্ধানে তাদের ঘুরে বেরাতে হয় না। খাবার জিনিস আপনা আপনিই তাদের মুখে এসে পড়ে। এদের মধ্যে আছে লাল অ্যাসিডিয়া। দেখতে অনেকটা দুই মুখওয়ালা কুঁজোর মতো। তারা জলের সঙ্গে খুদে খুদে প্রাণীদেরও শুষে খেয়ে ফেলে। উজ্জ্বল রঙের অ্যানেমোনরা পাশ দিয়ে কুঁচোমাছদের সাঁতরে চলে যেতে দেখলে পাপড়ির মতো দাঁড়া দিয়ে চেপে ধরে তাদের।

“সমুদ্রের অন্ধকার নিচের তলার চেহারা একদম অন্যরকম। সেখানে রাতের পর দিন কক্ষণো আসে না। সবসময়ে একইরকম কুচকুচে কালো। জলের গভীরে যেখানে আলো নেই, শ্যাওলাও নেই সেখানে। কেননা, শ্যাওলা জন্মাতে হলে আলো দরকার। সমুদ্রের তলদেশ একটা অন্ধকার কবরখানার মতো। ওপরের স্তর থেকে প্রাণী আর উদ্ভিদের দেহাবশেষ সেখানে জমা হতে থাকে যুগ যুগ ধরে।

“তরল পলির উপর ঘুরে বেড়ায় দশ ঠ্যাঙওয়ালা কাঁকড়ার দল। লম্বা লম্বা তাদের দাঁড়া। অন্ধকারের মধ্যে সাঁতার কেটে বেড়ায় একধরনের মাছ। তাদের মুখ চওড়া। কারও কারও চোখের কোনও বালাই নেই। কারও বা চোখজোড়া ড্যাবড্যাব করে বেরিয়ে আছে একজোড়া টেলিস্কোপের মতো। এমন সমস্ত মাছ আছে যাদের গা বরাবর চলে গেছে আগুনের মতো টকটকে রঙের ছোটো ফুটকি। দেখে মনে হয় যেন ছোট্ট একটা জাহাজ। আর তার গায়ে আলোর ঝলমলে কতকগুলো ঘুলঘুলি। কী বিচিত্রই না সে জগৎ! এখনও হয়তো এমন অনেক প্রাণী সমুদ্রের তলদেশে লুকিয়ে আছে যাদের আমরা চোখেও দেখিনি।

“উপকূলের কাছাকাছি সমুদ্রের অগভীর যে জলভাগ আছে সেটাও কিন্তু আবার একেবারেই ডাঙার মতো নয়। ডাঙা আর সমুদ্রের ঐ অংশের মাঝে আছে তটরেখা। আচ্ছা, এক জাতের লোক কি বাস উঠিয়ে আরেক জগতে যেতে পারে? মাছ কি সমুদ্র থেকে উঠে এসে হতে পারে ডাঙার বাসিন্দা?

“ব্যাপারটা অসম্ভব বলেই মনে হয়। কেননা, মাছ জলের ভেতরের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত। তীরে উঠে বাস করতে হলে চাই ফুলকোর বদলে ফুসফুস। পাখনার বদলে চাই পা। মাছ একমাত্র তখনই সমুদ্র ছেড়ে ডাঙায় এসে বসবাস করতে পারবে যখন আর সে মাছ থাকবে না। বিজ্ঞানীদের যদি একথা জিজ্ঞেস কর, তাহলে তাঁরা বলবেন যে কোনও জাতের মাছ সত্যি সত্যিই যদি তীরে উঠে এসে বসবাস করতে থাকে তাহলে তারা তাদের মৎস্যত্ব হারিয়ে ফেলবে। জল থেকে ডাঙায় স্থান বদলের এই পর্ব এক-আধ বছরের ঘটনা নয়। এটা চলতে থাকে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে। অস্ট্রেলিয়ায় যে সমস্ত নদী শুকিয়ে যাচ্ছে সেখানে আজকের দিনেও এক জাতের হর্ণফিস দেখতে পাওয়া যায় যাদের পটকা দেখতে অনেকটা ফুসফুসের মতো। খরার সময়ে নদী যখন ক্ষীণ হয়ে নোংরা ডোবার আকার ধারণ করে, তখন আর সমস্ত মাছ মারা যায়, কিন্তু একমাত্র হর্ণফিসরাই টিকে থাকে। কারণ, তাদের ফুলকোর পাশাপাশি ফুসফুসও আছে। তাজা বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে হলে মাথাটা একবার করে জলের উপরে তুললেই হল। আফ্রিকা আর দক্ষিণ আমেরিকাতেও একধরনের মাছ আছে যাদের জল ছাড়াও দিব্যি চলে। খরার সময়ে তারা পাঁকের ভেতরে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকে। বর্ষা না নামা পর্যন্ত ফুসফুসের সাহায্যে শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়।

“তার মানে মাছেরও ফুসফুসের বিকাশ ঘটতে পারে। তা না হয় হল, কিন্তু পা?

“এক্ষেত্রেও জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত আছে। গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে একধরনের লাফানে মাছ আছে, যারা তীরের উপর তিড়িংবিড়িং তো করেই, এমনকি গাছেও উঠতে পারে। পাখনাজোড়া তাদের পায়ের কাজ করে।

“মাছ যে তীরে উঠে আসতে পারে এই সমস্ত জীবই তার হাতেনাতে প্রমাণ। কিন্তু তারা যে সত্যি সত্যিই কোনও এক সময়ে ডাঙায় উঠে এসে বসবাস শুরু করে দিয়েছিল তার হাতেনাতে প্রমাণ কী?

“এর প্রমাণ হল লুপ্ত জীবজন্তুদের হাড়গোড়। প্রত্নতত্ত্ববিদরা মাটির প্রাচীন স্তরে এমন একধরনের জীবের সন্ধান পেয়েছেন, মাছের সঙ্গে যার অনেক মিল, অথচ তাকে ঠিক মাছও বলা চলে না। অনেকটা ঠিক ব্যাঙ বা ট্রাইটনের মতো উভচর। জীবটির নাম স্টেগোসেফালাস। পাখানার বদলে তার ছিল সত্যিকারের পাঁচ আঙুলের পা।

“এই স্টেগোসেফেলাস পৃথিবী থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে অনেকবছর আগে। কিন্তু গৌরীদেবী এই সমুদ্রের তীরে বেশ কিছু অ্যাম্ফিবিয়ান বা উভচর স্টেগোসেফেলাস প্রজাতির প্রাণী দেখতে পান। একশো বছর আগে। তারপর তাদের উপর বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করে তাদের বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করেন। ঐ আঁশটে গন্ধটা অ্যাম্ফিবিয়ানের গা থেকেও আসতে পারে।”

বাইরে বৃষ্টির বহর বেশ বেড়ে গেছে তখন। দমকা হাওয়ার সাথে জলের ঝাপটা ঢুকছে ভেতরে। আমি উঠে গিয়ে বন্ধ করে দিলাম জানালাগুলো। সেই সময়ে হঠাৎ চোখে পড়ল নিচে একটা টর্চের আলো। পরক্ষণেই নিভে গেল সেটা। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকেও আর কিছুই দেখতে পেলাম না। কী জানি, চোখের ভুল হবে হয়তো! এত রাতে এদিকে কে আর আসবে। কাউকে কিছু না বলে নিজের জায়গায় বসে পড়লাম এসে।

তারপর জিজ্ঞেস করলাম, “একটা দুর্ঘটনার কথা বলছিলে। সেটা কী?”

ল্যাপটপের স্ক্রিনে সবক’টা ক্যামেরার ছবি আবার ভালো করে দেখে নিয়ে সৌম্যদা বলল, “দুর্ঘটনা একটা ঘটেছিল। মিল্টনসাহেবের দুই বন্ধু এসেছিলেন এখানে ইংল্যান্ড থেকে। উদ্দেশ্য ছিল শিকার। টিলার পেছনে তখন ঘন জঙ্গলে বাঘ ঘুরত। বেশ কিছুদিন ধরে চেষ্টা করে বিভিন্ন জায়গায় ফাঁদ পেতে শিকার করা হল। নেপথ্যে ঘটল মর্মান্তিক কিছু নৃশংস ঘটনা।”

আমি সকলের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কীরকম?”

“বাঘ শিকারের জন্য যে ফাঁদের ব্যবস্থা সাহেবরা করেছিলেন সেগুলি ছিল জীবন্ত মানুষের বাচ্চা। আর বাচ্চাগুলিকে তারা সংগ্রহ করেছিল পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে। প্রচণ্ড ক্ষোভে ফুঁসছিল গরিব মানুষগুলি। জনাথন আর হ্যারিসাহেবকে ঘিরে ধরে জীবন্ত পুড়িয়েই মারছিল তারা। রাজা এসে তাঁদের প্রাণ বাঁচান। সেদিন রাতে তাঁরা এই বাড়িতেই ছিলেন। কিন্তু মিল্টনসাহেবকে হঠাৎ করে ব্যবসার কাজে মাদ্রাজ যেতে হল। বাবুর্চি, খানসামা আর পাহারাদার মিলিয়ে জনাদশেক লোক আরও ছিল বাড়িতে। তিনদিনের মাথায় সাহেব ফিরে এসে দেখলেন প্রায় সবাই মৃত। সর্বেশ এখানে আসার সময়ে ঠিক যেমনটা বলেছিল, সেই ডাকাতদলের লোকেরা যেভাবে মারা গিয়েছিল, একশো বছর আগে সাহেবের বর্ণনাতেও একই কথা লেখা আছে। কারোর হাত নেই, কারোর মুণ্ডু বা পা নেই। চারদিকে শুধু রক্ত আর রক্ত। তাৎক্ষণিকভাবে মনে হয়েছিল এটা ক্ষিপ্ত গ্রামবাসীদের কাজ। কিন্তু পরে ব্যাপারটা অন্যদিকে গড়ায়।”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সৌম্যদা আবার বলল, “একজন বাবুর্চি শুধু বেঁচে গিয়েছিল ভাগ্যক্রমে। এই টিলা থেকে দু’কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের ধারে আধমরা অবস্থায় তাকে উদ্ধার করেছিল জেলেরা। পরে খবর পেয়ে সাহেব তাকে মাদ্রাজের এক হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। কিন্তু সে বেশিদিন বাঁচেনি। তবে সাহেবকে যা বলেছিল, সেটা বিশ্বাস করা একটু কষ্টকর। তারপর থেকে মিল্টনসাহেবও আর পা রাখেননি এই বাড়িতে।”

“কী বলেছিল বাবুর্চি?” আমাদের উৎকণ্ঠা যেন গলার কাছে গিয়ে আটকে গেছে।

হাতের ট্যাবটাকে আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে সৌম্যদা বলল, “মিল্টনসাহেব লিখেছিলেন, তাঁর বাবুর্চি হায়দার তখন মাদ্রাজের এক হাসপাতালে ভর্তি। তিনি দেখা করতে গেলেন। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে সে। উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। পিঠে দগদগে ঘা। খুব কষ্ট করে জানাল, ঐ বাড়িতে পিশাচের বাস। সেদিন সন্ধ্যার পর হঠাৎ একটা পচা আঁশটে গন্ধ কোথা থেকে এসে ভরে গেল বাড়িটাতে। দুই সাহেব ঘর থেকে বেরিয়ে চ্যাঁচামেচি শুরু করলেন। প্রথমেই ডাক পড়ল আমার। আমি জোড়হাত করে তাঁদের জানালাম, এই গন্ধটা রান্নাঘরের নয়। বাড়ির পেছনদিক থেকে আসছে। ওনারা প্রথমে গিয়ে খুব ধাক্কাধাক্কি করলেন সেই দরজায়। কিন্তু কিছুতেই খুলতে না পেরে বন্দুক নিয়ে গেলেন। বেশ কয়েকটা গুলি দরজায় লেগে ছিটকে গেল। আমরা ক’জন ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম পেছনে। দেখলাম, দরজার কাঠ পাথরের মতো শক্ত। রাজামশাই আমাদের বারবার বারণ করেছিলেন দরজার ওপারে না যেতে। শুধু মাঝরাতে কিছু অদ্ভুত শব্দ শোনা যেত ওদিক থেকে। সাহেবদের বলেছিলাম সেসব কথা। কিন্তু ওনারা সে কথায় কান দেননি। বেশ কয়েকটা গুলি খরচ করেও যখন দরজাটা খুলল না, ওনারা রাগে গরগর করে গালিগালাজ করতে করতে ফিরে গেলেন নিজেদের ঘরে। তারপর মাঝরাতে আমরা যখন নিচের ঘরে ঘুমোচ্ছি, আচমকা একটা আর্ত চিৎকারে পিলে চমকে গেল আমাদের। আমরা সবাই মশাল হাতে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম। বারান্দায় দুই সাহেব মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। চারদিকে শুধু রক্ত। আর বিচ্ছিরি সেই আঁশটে গন্ধ। এরপর একে একে আমাদের মশালের আগুনগুলি নিভে গেল। অন্ধকারের মধ্যে গরম হাওয়ার মধ্যে দিয়ে একজোড়া সবুজ জ্বলজ্বলে চোখ এগিয়ে এল। আর কিছুই দেখিনি। পেছন ফিরে প্রাণপণে ছুটলাম। বাকিদের চিৎকার ভেসে আসছিল পেছন থেকে। যখন আমি অন্ধকারের মধ্যে পড়িমরি করে নামছি টিলা থেকে একটা গরম নিঃশ্বাসের হলকা ধাক্কা মারল পিঠে। আর ধারালো ছুরি দিয়ে যেন কেউ চিরে দিল আমাকে।”

আমরা হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। বাইরে ততক্ষণে বৃষ্টির শব্দ বন্ধ হয়েছে। অরো জড়ানো গলায় প্রথম মুখ খুলল, “সেরকম কোনও প্রাণী আমাদের আক্রমণ করলে কী হবে?”

“তার জন্যও ব্যবস্থা আছে আমার কাছে।” বলে উঠে গিয়ে ব্যাগ থেকে একটা কালো রঙের পিস্তল বের করে এগিয়ে দিল অরোর হাতে। একে একে সবাই একবার করে হাতে ধরে দেখলাম। জিনিসটা বেশ ভারী। সৌম্যদা জানাল, “এটা ‘সিগ সাওয়ার পি-২২৬’ নাইন এম.এম. ফুললি অটোম্যাটিক পিস্তল। পর পর আঠারো রাউন্ড গুলি ফায়ার হবে। তবে এর প্রয়োজন পড়বে বলে মনে হয় না আমার।”

রাতের খাওয়া শেষ করে আমরা মশার ধূপ জ্বালিয়ে মেঝেতে পাতা হোল্ডলের উপর শুয়ে পড়েছি। গায়ে একটা পাতলা চাদর। আমি সৌম্যদাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, যে পালা করে রাতজাগার কোনও ব্যাপার আছে কি না? সে বলল, “ও নিয়ে চিন্তা করিস না। আমার ঘুম এমনিতেই খুব পাতলা। আর দরজাটাও চেক করে দেখে নিয়েছি, বেশ শক্তপোক্ত। কোনও প্রাণী চট করে ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়বে, তেমন সম্ভাবনা নেই। পিস্তলটা আমার হাতের কাছেই থাকছে। অতএব তোরা নিশ্চিন্তে ঘুমো।”

কিন্তু ঘটনা একটা ঘটল। তখন গভীর রাত। আচমকা ভেঙে গেল আমার ঘুমটা। কোনও বিদঘুটে স্বপ্ন দেখেছিলাম বোধহয়। একটু ধাতস্থ হয়ে তাকালাম চারপাশে। মৃদু নাইট ল্যাম্পের মধ্যেও সবকিছু দেখা যাচ্ছিল পরিষ্কার। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করার পর খেয়াল হল নিস্তব্ধতাকে চাপা দিয়ে একটা শব্দ হচ্ছে। অন্যদের ঘুমন্ত শ্বাসপ্রশ্বাসের ফাঁকে একটা আওয়াজ আসছে ক্রমাগত ক্যাঁচক্যাঁচ করে। কীসের শব্দ এটা? দরজা বা জানালা কেটে কেউ ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে নাকি! বুঝতে পারলাম না।

বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও যখন আওয়াজটা থামল না, ধীরে ধীরে উঠে বসলাম। দেখলাম, সৌম্যদা তার বিছানায় নেই। সে আবার কোথায় গেল এত রাতে? উঠে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা অন করে বাইরের সবক’টা ক্যামেরার ছবি খুঁটিয়ে লক্ষ করলাম। কিন্তু কোনও নড়াচড়া চোখে পড়ল না। সাদাকালো ছবিতে সব নিস্তব্ধ, নিঝুম! অবশ্য এটা ঠিক যে এত ক্যামেরা লাগিয়েও সমস্ত জায়গা কভার করা যায়নি। বিশেষ করে পরিত্যক্ত ঘরগুলির ভেতরে কোনও ক্যামেরা নেই। আর দুটো ক্যামেরার ছবি একেবারে কালো হয়ে আছে। আশ্চর্য! হাতঘড়িতে সময় দেখাচ্ছিল, পৌনে তিনটে। বাকিরা সব নিঃসাড়ে ঘুমাচ্ছে। আর সেই আওয়াজটা হয়ে চলেছে ক্রমাগত। বেশ কিছুক্ষণ কান খাড়া করে শুনে এগিয়ে গেলাম দরজার দিকে। দরজার গায়ে যে কাঠ আছে, আওয়াজটা আসছে সেখান থেকে। কাঠের উপর দু-তিনটে টোকা দিতে বন্ধ হল শব্দটা। পুরনো কাঠের ভেতরে একধরনের বড়ো কাঠপোকা থাকে, মনে হচ্ছে এ তারই আওয়াজ।

দরজাটা ভেজানো ছিল। সৌম্যদা তার মানে বাইরে গেছে। কাউকে কিছু না বলে আমি হাত বাড়িয়ে টর্চটা নিয়ে এগিয়ে গেলাম দরজার দিকে। আস্তে করে খুলে মুণ্ডুটা বাড়িয়ে দিলাম বাইরে। অন্ধকার। তবে মৃদু আলো এসে পড়ছে কোথা থেকে। ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে দরজাটা আবার ঠেকিয়ে দিলাম। বারান্দার রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দেখলাম চাঁদের আলো এসেছে উপর থেকে। পূর্ণচন্দ্র নয়, একটা ফালি। যাকে বলে রাকা। কিছুদিন আগে পেরিয়ে গেছে পূর্ণিমা। সেই একফালি চাঁদটাও মাঝে মাঝে লুকিয়ে পড়ছে ভাসমান মেঘের আড়ালে। তাই অন্ধকারটাও এক-একবার বেড়ে যাচ্ছে।

উপরের বারান্দার দু’পাশে ঘরগুলি একেবারে নিস্তব্ধ। শুধু চিঁচিঁ করে ছুঁচো বা ইঁদুরের আওয়াজ পেলাম দূর থেকে। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা টর্চের আলো। জ্বলেই নিভে গেল। বাড়ির পেছন থেকে। সৌম্যদা তবে কি ঐদিকেই গেছে? হাজাররকম ভাবনা ভিড় করছে মাথার মধ্যে। ঠিক সেই সময় একটা চাপা গোঙানির মতো আওয়াজ কানে এল। তারপর কারা যেন দৌড়ে চলে গেল বারান্দা দিয়ে। নিচে কী হচ্ছে বুঝতে পারছি না উপর থেকে। সৌম্যদার যদি কোনও বিপদ হয়!

ফিরে গিয়ে ওদের ডেকে তুলে বললাম, “আমি যাচ্ছি পেছনদিকে। তোরা সাবধানে থাকবি। আর একটু লক্ষ রাখিস ক্যামেরার ছবিগুলোর দিকে।” বলে বড়ো লাঠি আর টর্চটা নিয়ে নেমে এলাম নিচে। প্রথম মহল্লাটা পেরিয়ে মাঝেরটাতে ঢুকতেই কানে এল একটা ঝুমঝুম শব্দ। যেন কেউ হেঁটে যাচ্ছে নূপুর পরে। অথচ টর্চের আলোয় কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। মাঝে মাঝে বন্ধ হচ্ছে, আবার শুরু হচ্ছে শব্দটা কিছুক্ষণ পর। আওয়াজটা আসছে বিভিন্নদিক থেকে। শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা ঠাণ্ডা তরল স্রোত নেমে গেল। শেষে কি সত্যিই ভূতের মুখোমুখি হতে হবে নাকি! সমস্ত সাহস জড়ো করে লাঠি ঠুকে ঠুকে এগিয়ে চললাম এক-পা এক-পা করে। মনকে বোঝালাম, জগতে যা কিছু আছে সবকিছুই যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। অলৌকিক বলে কিছু হয় না। কিন্তু কেন জানি আমার পিছু ছাড়ছে না ভয়টা।

শেষে অন্ধকারে অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম টর্চ বন্ধ করে। নূপুরের শব্দটা ক্রমশ এগিয়ে আসছে আমার দিকে। দম আটকে এল যেন। মেঝের দিকে তাকাতে লক্ষ পড়ল দুটো ছোটো ছোটো জ্বলন্ত চোখের দিকে। টর্চটা জ্বালতে দেখি একটা বড়ো শজারু। শিকারের খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছে এ-ঘর ও-ঘর। তারই বড়ো বড়ো কাঁটাগুলো একে অপরের গায়ে লেগে ঝুমঝুম করে আওয়াজ হচ্ছে। বাপ রে! আমার তো পিলে চমকে গিয়েছিল একেবারে!

কিছুটা এগোতে একটা চাপা আওয়াজ কানে এল। হিস হিস করে। তার সাথে মিশে আছে গরগর করে মানুষের নাক ডাকার মতো অদ্ভুত শব্দ। কিছুক্ষণ শুনলাম কান খাড়া করে। মনে হল পাথরের পুকুরটার পেছনদিকের কোনও ঘর থেকে আসছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন আমাকে সম্মোহিতের মতো টানছে ঐদিকে। পশ্চিমে তিন-চারটে ঘর পেরিয়ে আওয়াজটা আরও একটু যেন জোর হল। একটা  চিমসে গন্ধও আসছে নাকে। তবে এটা সেই আঁশটে গন্ধর মতো নয়। দেখলাম একটা বড়ো ঘরের দরজা নেই। কাছে গিয়ে কানটা বাড়িয়ে দিতে, পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, এই ঘরটাই আওয়াজের উৎস। ভেতরে তাকাতে চোখে পড়ল জ্বলজ্বলে চোখ। জোড়ায় জোড়ায়। টর্চটা জ্বালতে দেখলাম গোটা পাঁচেক লক্ষ্মীপেঁচা। দেয়ালের কুলুঙ্গিতে বসে জটলা করছে। একটা বড়ো ইঁদুর মেরে নিয়ে এসে বাচ্চাদের সাথে খাচ্ছে ভাগ করে। জোরালো আলোয় ওদের চোখ ধাঁধিয়ে গিয়ে চুপ করে গেল।

টর্চটা নিভিয়ে নিলাম। আর সেই সময়েই পাশের ঘর থেকে একটা খটাং করে ভারী ধাতব আওয়াজ কানে এল। কীসের আওয়াজ ওটা? গেলাম পা টিপে টিপে। একটা নরম হলুদ আলো বেরোচ্ছে ঘরটা থেকে। কে আছে ওখানে? সৌম্যদা নাকি! কিন্তু সে এখানে কী করছে এত রাতে? দরজার দিয়ে মুখ বাড়ালাম ভেতরে। একটা ছোটো মোমবাতি জ্বলছে। আর কাউকে তো দেখা যাচ্ছে না। এগিয়ে গেলাম মোমবাতিটার দিকে। সেটা বসানো ছিল মেঝের এককোণে। লক্ষ পড়ল, তার পাশে মেঝেতে একটা চৌকো ফাঁকা জায়গা। মেঝে থেকে একটা পাথর তুলে রাখা আছে পাশে। তার মানে এটা কোনও জন্তু বা ভূতের নয়, মানুষেরই কাজ। উঁকি মেরে দেখি ভেতরে একটা লোহার ঢাকনা। তাহলে কি এটারই বন্ধ করার আওয়াজ হল খটাং করে। ঢাকনাটির এক পাশে ওটা ধরে তোলার জন্য হাতল রয়েছে। হাত বাড়িয়ে সেটা ধরে টান দিতে খুলে গেল। ভেতরে নেমে গেছে একটা সিঁড়ি। আলো ফেলে দেখলাম, একটা মানুষ কোনওরকমে গলতে পারবে সেখান দিয়ে।

সবে পা-টা বাড়াতে যাব, নাকে ধাক্কা মারল সেই পচা গন্ধ। বাপ রে! সারা শরীর গুলিয়ে এল। মনে পড়ল দুপুরের কথাটা। রুমালটা বের করে তৎক্ষণাৎ চেপে ধরলাম নাকে। একটা গরম হাওয়া কোত্থেকে এসে লাগল পিঠে। একটা আওয়াজ হতেই ঘুরে তাকালাম। দুটো জ্বলজ্বলে সবুজ চোখ অন্ধকারের মধ্যে। তারপর আর মনে নেই কিছু। শুধু মাথার মধ্যে চিনচিনে একটা অনুভূতি হল, আমি লুটিয়ে পড়লাম মেঝেতে।

।।চার।।

চোখের পাতাগুলো প্রচণ্ড ভারী হয়ে আছে। তাও খুব কষ্ট করে খুললাম। চারপাশটা প্রচণ্ড অন্ধকার আর স্যাঁতস্যাঁতে। ঠাণ্ডা পাথর। হাতড়ে বুঝলাম ছোট্ট একটা ঘরে বন্দী আমি। বাইরের আলো বাতাস প্রবেশ করারও জায়গা নেই। এখানে কী করে যে এলাম মাথায় ঢুকছে না। হাঁটু আর হাতের কনুইয়ে বেশ ব্যথা। যন্ত্রণা হচ্ছে। মনে পড়ল, বড়ো বড়ো সবুজ চোখওলা প্রাণীটার কথা। কী ছিল ওটা? সৌম্যদা যে স্টেগোসেফালাসের কথা বলছিল, সেটাই কী? ভয়ে আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়ে গিয়েছিল একেবারে। পকেট হাতড়ে দেখলাম টর্চটাও নেই। হাতঘড়িটা চলছিল। দেখলাম সকাল সাতটা বাজে। দেয়াল ধরে উঠে দাঁড়িয়ে অন্ধের মতো হাতড়ে হাতড়ে ঘুরলাম গোটা ঘরটা। কিন্তু অবাক কাণ্ড, চারটে দেয়ালের মাঝখানে কোনও দরজাই নেই। কীরকম হল ব্যাপারটা! প্রথমে মনে হল ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছি না তো! হয়তো ঘুম ভেঙে দেখব বজবজের দোতলা বাড়ির চিলেকোঠায় শুয়ে আছি।

গায়ে একটা চিমটি কেটে দেখলাম লাগছে। তার থেকেও বড়ো প্রমাণ পেলাম, একটা মশা ভোঁ ভোঁ করে উড়ছে অনেকক্ষণ থেকে কানের কাছে এবং মাঝে মাঝে তেড়ে এসে কামড়াচ্ছেও। তখন মশার কামড়ে গা চুলকাচ্ছে। অতএব জেগেই আছি।

এখন কথা হচ্ছে, এখানে আমি এলাম কী করে? এটা কি চৌকো কোনও কুয়ো? দেয়ালে যার কোনও দরজা নেই? আমাকে তাহলে উপর থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। আর তখনই সম্ভবত হাঁটু আর কনুইয়ে চোট লেগেছে। ডানদিকে চোখের উপরে, কপালে জ্বালা জ্বালা করছে। কিন্তু এই চৌকো কুয়োর গভীরতা তাহলে খুব বেশি হবে না। তা না হলে অজ্ঞান অবস্থায় আনুমানিক পনেরো ফুটের উপর থেকে যদি কেউ ফেলে দেয় তাহলে হাত-পা ভেঙে যেত বা মাথা ফেটে যেতে পারত। তার মানে একটা মানুষের যা উচ্চতা সেরকম জায়গা থেকেই আমাকে ফেলা হয়েছে।

চিৎকার করলাম অনেকক্ষণ ধরে। নাম ধরে ডাকলাম সবাইকে। কিন্তু কোনও লাভ হল না। কেউ এল না সাহায্যের জন্য। এই ঘরটা বাড়ির মধ্যে ঠিক কোথায়? গুপ্ত কোনও ঘর হবে। বাইরের লোক সহজে ঘরটিকে খুঁজে পাবে বলে মনে হয় না। আপাতত কিছুই করার নেই। সৌম্যদারা যদি আমাকে খুঁজে বের করতে পারে তো ভালো। না হলে এখানেই হয়তো শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হবে।

ধ্যান করার ভঙ্গিতে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। খিদে পাচ্ছিল খুব। জলতেষ্টাও পাচ্ছে। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তাও করতে পারছি না কিচ্ছু।

অনেকক্ষণ পরে আবার উঠে চিৎকার করলাম গলা ফাটিয়ে। আগের মতোই শুধু গলাটা ব্যথা হল। নিজেকে কেমন যেন পাগল পাগল লাগছে।

চোখটা এতক্ষণে বেশ সয়ে গেছে অন্ধকারে। ঘরটাকে ফের ভালো করে খুঁটিয়ে লক্ষ করতে দেখি একটা দেয়ালে প্রায় আট ফুট উচ্চতায় একটা দরজা। লাফিয়ে হাত পাওয়া যাচ্ছে ঠিক কথা। কিন্তু সেটা দেয়ালের সাথে একদম এঁটে আছে। বাইরে থেকে কেউ না খুললে, আমার পক্ষে ওখানে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

আবার এদিক ওদিক তাকাতে লক্ষ গেল উলটোদিকে একদম নিচে পাথরের মেঝের লাগোয়া একটা ঢাকনা। একটা মানুষ গলে যাবার মতো চৌকো লোহার তৈরি। কিন্তু বহুবছর হয়তো এটা ব্যবহার হয়নি। হাত দিয়ে দেখলাম স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ার জন্য মরচে ধরেছে। বেশ জোরে জোরে লাথি মারলাম কয়েকবার। তিন-চারবার লাথি খেয়ে তুবড়ে গেল। উৎসাহ পেয়ে কিছুটা করে সময় দম নিয়ে একই কাজ করলাম বারংবার। ফলে লোহার পাতটা মুড়ে ঢুকে গেল ভেতরে। একটা সরু ড্রেনের মতো। নেমেছে নিচের দিকে। কী আছে শেষে সেটা বোঝার কোনও উপায় নেই। আমার রোগা পাতলা শরীর কোনওরকমে চেপেচুপে ঢুকে যাবে ভেতরে। কিন্তু তারপর? যদি বাইরে যাবার রাস্তা না পাই, তাহলে! আবার কি উপরে উঠে আসতে পারব? মনে তো হয় না। কারণ, মসৃণ পাথরের দেয়াল ধরে নামা যতটা সহজ ফিরে আসাটা নয়।

আরও অনেকক্ষণ বসে বসে চিন্তা করলাম। ঘড়িতে তখন দুপুর গড়িয়েছে। সবথেকে বড়ো কথা, খিদের অনুভূতিটা মিলিয়ে গেছে একেবারে। তবে জলতেষ্টাটা যাচ্ছে না কিছুতেই। জিভ আর গলা শুকিয়ে কাঠ। মাঝে মাঝেই উপরের দরজায় লাফিয়ে ধাক্কা দিচ্ছি। আর চেঁচিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছি। যদি ভাগ্যক্রমে আমার আওয়াজ কারোর কানে যায়! কিন্তু কোন প্রত্যুত্তর নেই। হতাশা গ্রাস করছে ক্রমশ।

এরকম করে আরও ঘণ্টা তিনেক কাটার পর সিদ্ধান্ত নিলাম, মৃত্যুই যখন হবে তখন চেষ্টা করতে ছাড়ব কেন? নামব ঐ সরু পাথরের নালা দিয়ে। এগিয়ে গিয়ে একটা বড়ো করে নিঃশ্বাস নিলাম। তারপর শরীরটাকে যথাসম্ভব সরু করে ঢুকিয়ে দিলাম সেই পাথরের গর্তের মধ্যে। আগেই বলেছিলাম ভেতরটা খুব পিচ্ছিল। তো সড়াৎ করে নেমে গেলাম।

পড়লাম গিয়ে জলের মধ্যে। তবে জলটা দাঁড়ানো অবস্থায় হাঁটুর বেশি নয়। আর পুরোপুরি সোজা হয়ে দাঁড়ানোও যাচ্ছে না এখানে। উপরের ছাদটা খুব নিচুতে। একটা বিচ্ছিরি পচা পাঁকের গন্ধ। মৃদু একটা আলো আসছিল লোহার জানালার ভেতর দিয়ে। কিন্তু সেটাও খুব সামান্য। এই জায়গাটা মনে হচ্ছে একটা আবর্জনার স্তূপ। পায়ে অনেকগুলি গোল গোল কীসব ঠেকছিল। একটা তুলে নিলাম কাদাজলের ভেতর থেকে।

চোখের সামনে আনতে চমকে গেলাম। সেটা একটা মানুষের করোটি! তার মানে একরাশ খুলি জমা হয়ে রয়েছে এখানে। আর শুধু খুলি নয়, মানুষের অন্য হাড়গোড়ও রয়েছে বিস্তর।

সারা গায়ের রোমগুলি রীতিমতো খাড়া হয়ে গেছে। ব্যাপারটা কী? এটা কি মানুষ মারার কারখানা? এ বাড়ির অন্দরে লুকিয়ে আছে কোনও পৈশাচিক বর্বর কাহিনি? কিন্তু এখান থেকে বেরোনোর কোনও রাস্তা কি আছে?

হাতড়াতে হাতড়াতে পাথরের খাঁজে পা দিয়ে একটু উপরে উঠে একটা রাস্তা পেলাম। সেখান দিয়ে পা-টা বাড়াতেই আবার পিছলে গিয়ে দড়াম করে আছাড় খেলাম আর একটা পাথরের মেঝেতে। শারীরিক কষ্টের অনুভূতিগুলি কমে গেছে কোনও কারণে। না হলে উপর থেকে পড়ে যতটা আঘাত পাওয়ার কথা ছিল ততটা কিন্তু লাগেনি। যাই হোক, চারদিকে শুধু ঘন অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না। নাকি আমার দৃষ্টিশক্তিটাই চলে গেল তাই ভাবছি। আগের বারের মতো দেয়াল ধরে ঘরটার পর্যবেক্ষণ করে যা বুঝলাম, এটা হল একটা ডিম্বাকৃতি প্রকোষ্ঠ। একদিকটা সরু হয়ে টানেলের আকৃতি নিয়েছে। সেখান দিয়ে মাথাটা গলিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে শুরু করলাম। প্রায় মাটির সমান্তরালে কখনও শুয়ে পড়ে, কখনও কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে ঘষে ঘষে এগিয়ে চললাম অন্ধকারের মধ্যে। সময়ের হিসাব করে দেখলাম প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা হতে চলল আটকা পড়েছি এই ভূগর্ভস্থ গোলকধাঁধার মধ্যে। বুঝতে পারছি না এর জাল কেটে বেরোতে পারব কি না। তবু কষ্ট করে এগোচ্ছি সামনের দিকে। সুড়ঙ্গর মুখটা সামান্য নিচের দিকে বাঁক নিয়ে একটা চৌবাচ্চার মধ্যে শেষ হল।

চৌবাচ্চাটা একটা ঘরের মধ্যে। সেখানে থেকে আবার একটা ড্রেন নেমে গেছে বাঁদিক ঘেঁষে। এখানে দেখলাম, একটা মৃদু আলো এসে পড়েছে। পাশে একটা লোহার দরজা। আলোটা সেখান থেকেই সরু হয়ে আসছে মেঝেতে। সেই সরু ফালিতেই চোখ রাখলাম। একটা মশাল জ্বলছে সেখানে। তবে মনে হল ঘরে কেউ নেই। দরজাটা ঠেলে ঢুকে গেলাম। প্রথমেই চোখে পড়ল একটা দেয়ালজোড়া র‍্যাকে অদ্ভুত সব যন্ত্রপাতি সাজানো। সরু মোটা বিভিন্ন শেকল। হাজাররকম সাইজের ছুরি। লোহার বিভিন্ন সাইজের পাত্র। একটা বড়ো চৌকো টেবিল। তার মাঝে আবার গোল গর্ত।

যেন বহুবছরের পুরনো কোনও অপারেশন থিয়েটার। কীসের জন্য তৈরি হয়েছিল এটা! ভাবলাম, মশাল যখন জ্বলছে তখন জীবিত মানুষ নিশ্চয়ই আছে এখানে। সামনের কাঠের দরজায় গিয়ে চাপ দিতে খুলে গেল। সেখান দিয়ে উঠে গেছে সিঁড়ি। সেটা গিয়ে শেষ হল আর একটা ঘরের মধ্যে। একটা ঢাকনা দিয়ে উপর থেকে বন্ধ করা আছে সিঁড়ির মুখটা। সামান্য ফাঁক দিয়ে আওয়াজ আসছে। বেশ কয়েকজন কথা বলছে উপরে। ভাষাটা সম্পূর্ণ অপরিচিত। তামিল বা মালায়লম হবে। মাঝে মাঝে দু-একটা শব্দ বলছে ইংরাজিতে। ফাঁকে চোখ ঠেকিয়ে দেখলাম একজন মাঝবয়সী কালো লোক ঠোঁটে সিগারেট গুঁজে পায়চারি করছে। পাশে একজন বয়স্ক দাড়িওয়ালা লোককে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছে পিলারের সাথে। আরও দু-তিনজন লোক আছে ঘরের মধ্যে। যদিও তাদেরকে দেখতে পাচ্ছি না। শুধু আওয়াজ পাচ্ছি গলার।

নিজেদের মধ্যে ওরা অচেনা ভাষায় কথা বললেও ঐ দাড়িওয়ালা লোকটির সাথে কথা বলছে ইংরাজিতে। কথোপকথনটা অনেকটা এরকম –

“ডঃ বাগচী, আপনাকে শেষবারের মতো প্রশ্ন করছি, নেপোলিয়নের আংটিটা কোথায় আছে বলুন।”

“তোমরা বিশ্বাস কর, আমি সত্যিই জানি না সেটা কোথায় আছে।”

“না, বিশ্বাস করতে পারছি না। গত একমাস ধরে আপনি এই বাড়িতে পড়ে আছেন। আমরা জানি তার পেছনে কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। আপনি এমন অনেককিছু জেনে গেছেন যেটা আমাদের পক্ষে বিপদজনক। এখন যদি আমাদের জিনিসটার সঠিক সন্ধান দেন তাহলে আপনাকে আমরা যেতে দেব। নাহলে আপনার কপালে মৃত্যুই অপেক্ষা করছে।”

আর একজন পাশ থেকে বলল, “এমনিতেই পুলিশের তাড়া খেয়ে আমাদের কোণঠাসা দশা। লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে দিনের পর দিন। তার উপরে চার-পাঁচজন ছেলেমেয়ে আপনাকে খুঁজতে খুঁজতে এখানে এসে হাজির হয়েছে। এখন দুটো রাস্তা আছে। এক, আপনি যদি আমাদের ঐ আংটিটা দিয়ে দেন তাহলে চুপচাপ চলে যাব আমরা। আর দুই, আপনি নিজে তো মরবেনই, ঐ ছেলেমেয়েগুলোকেও মেরে লাশ গুমঘরে ঢুকিয়ে দেব। পুলিশের বাবা আসলেও খুঁজে পাবে না।”

“তোমরা কেন বুঝতে পারছ না, আমি এখানে এসেছি গৌরীদেবীর জীবন নিয়ে রিসার্চ করতে। একশো বছর আগে উনি যে গবেষণা করেছেন তা নিয়ে একটা ডকুমেন্ট তৈরি করছি আমি। এর মধ্যে নেপোলিয়নের আংটি কোথা থেকে এল!”

“প্রফেসার, আমার চোখে আপনি ধুলো দিতে পারবেন না। তিন বছর আগে ব্যাঙ্গালোরের মিউজিয়ামে আপনাকে দেখেছিলাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিপু সুলতানের জিনিসপত্রগুলো খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিল। টিপু সুলতানের সাথে নেপোলিয়নের যে সুসম্পর্ক ছিল সেটা জানেন তো? সুলতানকে নেপোলিয়ন একটা দামী হিরের আংটি উপহার পাঠিয়েছিলেন। পরে ইংরেজদের কাছে যুদ্ধে হেরে যাবার পর নবাবের খাস নকর বেশ কিছু গয়নাগাটির সাথে সেই আংটিটিও চুরি করে এনে বিক্রি করে দেন রাজা মহেন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষ রাজা জ্ঞানেন্দ্রনাথকে। মহেন্দ্রনাথ এই বাড়িতে যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন তাঁর কাছেই ছিল সেই আংটিটি। কিন্তু পরে আর সেটা খুঁজে পাওয়া যায়নি।”

“আমি এই বিষয়টা জানতাম না। ব্যাঙ্গালোরের মিউজিয়ামে আমি গিয়েছিলাম ১৭৯৪ সালের ‘ইন্দো-ফ্রান্স এলাইন্স’-এর চুক্তিপত্রটা দেখতে। সেখানে এই আংটির বিষয়ে কোথাও উল্লেখ নেই।”

“তা আছে কি না আমরা জানি না। তবে সেই আংটিটা এই বাড়িতেই কোথাও আছে। তার প্রমাণ হল এই উইল।”

“কীসের উইল এটা?”

“রাজা মহেন্দ্রনাথরা ছিলেন ছয়ভাই। নিয়ম অনুযায়ী বংশের বড়ছেলে পেয়েছিলেন নেপোলিয়নের আংটিটি। সেই কথাটা রাজবংশের এই উইলে লেখা আছে।”

অন্যজন বলল, “আমাদের হাতে সময়ও নেই বেশি। আজ রাতের মধ্যেই আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে। পুলিশের লোক যেকোনও সময়ে এসে পড়তে পারে।”

“আপনাকে দু’ঘণ্টা সময় দেওয়া হল। ভেবে দেখুন, কী করবেন।”

“না হলে একে একে সবাই খুন হবে আপনার চোখের সামনে। আর শেষে আপনিও।”

শেষ কথাটা বলে ওরা চলে গেল সবাই। শুধু হাত বাঁধা অবস্থায় প্রফেসার রয়ে গেলেন ঘরে। আমি ততক্ষণে ভেবে নিয়েছি কী করব। সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে এলাম নিচের ঘরে। সেখান থেকে একটা ধারালো ছুরি নিয়ে আবার গেলাম উপরে। আস্তে আস্তে ঢাকনাটা খুলে প্রবেশ করলাম। প্রাথমিকভাবে আমাকে ছুরি হাতে দেখে ডঃ বাগচী একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলেন বটে। তবে পরক্ষণেই ব্যাপারটা বুঝে যেতে ওঁর মুখে হাসি ফুটে উঠল। “তুমি কী সৌম্যর ছাত্র?”

আমি মাথা নেড়ে ছুরি দিয়ে ওঁর বাঁধনগুলো কাটতে কাটতে বললাম, “আপনাদের কথাবার্তা অনেকটা শুনেছি। শুধু ঐ সবুজ চোখওয়ালা স্টেগোসেফেলাসের ব্যাপারটা মাথায় ঢুকছে না কিছুতেই।”

উনি বললেন, “স্টেগোসেফেলাসরা মনে হয় এখন আর কেউ বেঁচে নেই। যদিও প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে পর্যন্ত তারা এখানেই ছিল। সাধারণ মানুষদের ভয় দেখানোর জন্য স্মাগলাররা এসব ট্রিকস করছে।”

উপরে ওঠার সিঁড়িটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছে লোকগুলো। এখন রাস্তা একটাই। আবার নিচে নামা। প্রফেসার যাওয়ার আগে ঐ দরজাটাতেও ছিটকিনি তুলে বন্ধ করে দিলেন। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমি প্রশ্ন করলাম, “কীসের স্মাগলিং করে এরা?”

“অস্ত্রশস্ত্র, ড্রাগস, পুরনো দামী জিনিস, জাল টাকা সবকিছু। বাড়ির পেছনের অংশটা হচ্ছে ওদের গুদাম। রাত্রিবেলা সমুদ্রপথে বিদেশি জাহাজ থেকে ডিঙিনৌকায় মাল এসে জমা হয় এখানে। কাছেই বড়ো সমুদ্রবন্দর। তাই সুবিধা হয়েছে এদের। এখান থেকে মালগুলি সময় সুযোগমতো ছড়িয়ে দেয় দেশের বিভিন্ন জায়গায়। আমি মাসখানেক আগে এখানে এসেছিলাম গৌরীদেবীর কাজের ব্যাপারে রিসার্চ করার জন্য। প্রথমে আমাকেও ভয় দেখানো হয়েছিল। পচা গন্ধ, প্রাগৈতিহাসিক জন্তুর পায়ের ছাপ, বড়ো বড়ো সবুজ চোখ, এসব দিয়ে। আমার তখনই সন্দেহ হয়েছিল যে এসব বুজরুকির পেছনে নির্দিষ্ট কোনও কারণ রয়েছে। ওদের গুদামের গোপন দরজাটা ঐ পাথরের পুকুরের মধ্যে দিয়ে গেছে। সেটা ধরে ফেলতেই আমাকে বন্দী করে ফেলল। তারপর থেকে আমাকে চাপ দিচ্ছে নেপোলিয়নের আংটিটি আদায় করার জন্য।”

“আচ্ছা, ঐ পচা গন্ধটা নাকি একশো বছর আগেও ছিল?”

“তা থাকতে পারে। তবে সেটার কারণ ছিল অন্য। বর্তমান গন্ধের উৎস হাইড্রোজেন সালফাইড নামে একধরনের রাসায়নিক যেটা থেকে একটা বিচ্ছিরি পচা ডিমের গন্ধ ছাড়ে।”

কথা বলতে বলতে আমরা নেমে এলাম সেই যন্ত্রপাতির ঘরটাতে। প্রফেসার বললেন, “এটা ছিল গৌরিদেবীর গবেষণাগার-কাম-অপারেশন থিয়েটার। এখানে মৃত মানুষের শরীর নিয়ে এসে কেটে পরীক্ষা করতেন ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি। ভারতীয় শল্যচিকিৎসক তখন ছিল হাতে গোনা। পশ্চিমি চিকিৎসা বিদ্যার সাথে আয়ুর্বেদ ঔষধি মিশিয়ে তিনি বহু দুরারোগ্য ব্যাধির সফল চিকিৎসা করেছেন।”

আগেই আমি দেখে গিয়েছিলাম এখান দিয়ে একটা সরু গুহার মুখ চলে গেছে বাইরের দিকে। আমার অনুমান যদি ঠিক হয় তাহলে ওটাই হচ্ছে এখান থেকে বাইরে বেরোনোর একমাত্র রাস্তা। প্রফেসারকে বললাম সে কথা। উনি মাথা নেড়ে জানালেন, “ও রাস্তাটা আমরা পরে চেষ্টা করব, তার আগে দেখি নেপোলিয়নের আংটির গল্পটা সত্যি কি না?” বলে এগিয়ে গেলেন দেয়ালে যন্ত্রপাতির র‍্যাকের দিকে।

র‍্যাকের পাশে একটা হাতল ধরে দু’বার ক্লক ওয়াইজ আর তিনবার অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজ ঘোরাতে র‍্যাকটা সরে গেল এক পাশে। ওদিকে আর একটা ঘর। জ্বলন্ত মশালটা হাতল থেকে খুলে নিয়ে ঢুকে গেলেন ভেতরে। আমি গেলাম পেছন পেছন। বললেন, “এ ঘরটাতে আমি আগেও ঢুকেছি। এখানে গৌরীদেবীর গবেষণার কাগজ আর বইপত্র আছে অনেক।”

দেখলাম চারদিক ঘিরে দেয়ালে শুধু র‍্যাক। প্রচুর পুরনো বই সেখানে থাক দিয়ে সাজানো। তিনি বললেন, “সমস্ত বই আমার মোটামুটি ঘাঁটা হয়ে গেছে। বিভিন্ন ভাষায় লেখা সবই চিকিৎসাসংক্রান্ত বই। সংস্কৃতে লেখা অনেক আয়ুর্বেদের পুঁথিও আছে। বেমানান শুধু এটা।” ডানদিকের কোণে ছ’নম্বর তাক থেকে পেড়ে আনলেন একটা বই। দেখলাম মেরুন কভারের উপরে সোনার জলে লেখা ‘রিলিজিয়ন এন্ড স্পিরিচুয়ালিটি’।

প্রফেসার বললেন, “আমার সাবজেক্ট নয় বলেই এটাতে হাত দিইনি তখন। পরে মনে হল, এটা হয়তো বিশেষ কোনও উদ্দেশ্যে এখানে রাখা ছিল।”

আমার গোল গোল চোখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে তিনি বইটার পাতা ওলটালেন। কিন্তু দেখা গেল ভেতরের পাতাগুলো সব একসাথে আটকে আছে। প্রফেসার একটা ছুরি দিয়ে কেটে মাঝখান থেকে ছাড়িয়ে ফেললেন পাতাগুলিকে। আর ভেতর থেকে বেরোলো একটা ঝকঝকে বড়ো নীল পাথর বসানো সোনার আংটি। উপরে সূক্ষ্ম কারুকাজ করা। মশালের আলোয় তার জৌলুস যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে। তিনি নিজে বেশ কিছুক্ষণ জিনিসটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে আমার হাতে দিয়ে বললেন, “এমন জিনিস সবার হাতে নিয়ে দেখার সৌভাগ্য হয় না।”

।।পাঁচ।।

গল্পের শেষটা আবার ট্রেনে।

ফেরার সময়ে সৌম্যদার মাথায় দেখলাম একটা ব্যান্ডেজ বাঁধা। সে বলল, “সেদিন রাতে কুয়োর পাশে দুটো ক্যামেরা আচমকা বন্ধ হয়ে গেল। আমি ভাবলাম, দেখে আসি একবার। তা ওখানে যেতেই মাথার পেছনে কেউ মেরেছিল কিছু দিয়ে। তারপরই ব্ল্যাক আউট।”

শ্রী জানাল, “মৈনাক আমাদের ডেকে দিয়ে চলে যাবার পর আমরা ল্যাপটপের ছবিগুলোর দিকে চেয়ে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। শেষ ওকে মাঝের পুকুরের দিকটায় যেতে দেখেছি। তারপর আমাদের চোখের সামনেই ক’টা ক্যামেরা বন্ধ হয়ে গেল পট পট করে। মনে হল কেউ যেন ক্যামেরার লেন্সগুলিতে কিছু লাগিয়ে দিচ্ছিল।”

অরো মাথা নেড়ে ওকে সায় দিয়ে বলল, “আমরা সবাই মিলে একসাথে বেরোলাম চুপিসাড়ে। সেখানে গিয়ে দেখি ক্যামেরার মুখে কেউ আলকাতরা লাগিয়ে দিয়েছে। বুঝলাম এ কোনও মানুষেরই কাজ। আর তারা চায় না আমরা এখানে থাকি। এদিক ওদিক খোঁজাখুঁজি করতে সৌম্যদাকে অজ্ঞান অবস্থায় পেলাম একটা ঝোপের মধ্যে। কিন্তু মৈনাককে অনেক খুঁজেও দেখতে পেলাম না।”

আমি আর প্রফেসার মিলে ওদের বুঝিয়ে বললাম পরের ঘটনাগুলি। সেদিন ভোররাতে অনেক কষ্ট করে নিস্তার পেয়েছিলাম ওদের হাত থেকে। সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে গলে এসে আমরা দু’জনে পৌঁছলাম একটা লোহার জানালার সামনে। বাইরেটা ঝোপঝাড় অন্ধকারে ঢাকা। রডগুলি ধরে দু’জনে মিলে ঝাঁকালাম অনেকক্ষণ ধরে। শেষে একটা একটা করে রড খুলে গেল।

একটা ছোট্ট লাফ দিতে হল সেই ফাঁকটার মধ্যে দিয়ে। এখানটা পাহাড় শেষ হয়ে শুরু হয়েছে বালিয়াড়ি। শ্যাওলায় পিছলে নামতে গিয়ে মাথাটা ঠুকে গেল একটা পাথরে।

কোনওরকমে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম পাশের একটা গাছে ধরে। প্রফেসারও চলে এসেছেন ততক্ষণে ডালপালা খামচে। আচমকা মূর্তিমান যমদূতের মতো সেই লোকগুলো প্রায় মাটি ফুঁড়ে হাজির হল সামনে। চারজনের হাতেই পিস্তল। আমি আড়চোখে তাকালাম প্রফেসারের দিকে। তিনি নির্বিকার। ভাবলেশহীনভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

একজন শর্ট হাইটের লোক ওঁর নাকের ডগায় পিস্তল তাক করে কড়া গলায় বলল, “আমরা জানতাম আপনি এই পথেই পালানোর চেষ্টা করবেন। তাই অনেকক্ষণ হল ঘাপটি মেরে বসে আছি। এবার ভালোয় ভালোয় দিয়ে দিন আংটিটা।”

প্রফেসার কোনও তর্ক না করে পকেট থেকে বের করে এগিয়ে দিলেন জিনিসটা। ওরা সবাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিল। প্রফেসার গম্ভীর গলায় বললেন, “এবার ছেড়ে দিন আমাদের।”

একটা অট্টহাসি হেসে লোকটা বলল, “ছেড়ে নয়, মেরে দেবে।”

পিস্তলটা তাক করে গুলি চালাতে যাবে, সেই মুহূর্তে চার-পাঁচটা সবুজ প্রাণী হঠাৎ জঙ্গলের মধ্যে থেকে ছুটে এসে একজোটে ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকগুলোর উপরে। আমাদের হাত রুমাল সমেত আবার নাকে উঠে গেছে। কারণ, বিচ্ছিরি পচা গন্ধ! চোখে হাজার ভোল্টের বিস্ময়। প্রাণীগুলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মানুষগুলির দেহ ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে একজোটে দৌড়ে চলে গেল সমুদ্রের দিকে। তারপর মিলিয়ে গেল সাগরের ঘন নীল জলে।

“স্টেগোসেফেলাস!” আমার মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে গেল আপনা থেকেই।

প্রফেসার তাদের পিছনে কিছুটা দৌড়ে ধপাস করে বসে পড়লেন বালিতে। আমিও ছুটলাম তাঁর সঙ্গে। পেছনে পড়ে রইল রক্তে ভেসে যাওয়া বীভৎস শরীরগুলো।

জিজ্ঞেস করলাম, “কী হল ব্যাপারটা?”

সেই প্রশ্নের উত্তর অনেক ভাবনাচিন্তা করে এতক্ষণ পরে ছুটন্ত ট্রেনের মধ্যে পাওয়া গেল। প্রফেসার বললেন, “আমার ধারণা, ঐ বাড়ির পেছনের মহলটায় ছিল প্রাণীগুলির আস্তানা। পরে স্মাগলাররা এসে ওদের সেই বহুবছরের আশ্রয়স্থল কেড়ে নিয়েছিল। তারই প্রতিশোধ নিল প্রাণীগুলি।”

সৌম্যদা জানতে চাইল, “স্টেগোসেফালাসরা কি এতটাই বুদ্ধিমান?”

“চোখের সামনে যা দেখলাম, তাতে মনে হয় না এরা সাধারণ কোনও অ্যাম্ফিবিয়ান। সম্ভবত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এদের মধ্যে জিনগত কোনও পরিবর্তন হয়েছে। আর তার ফলে এরা হয়ে উঠেছে বুদ্ধিমান আর ক্ষিপ্র। এই বাড়িটাই ছিল ওদের আস্তানা। যতবার ওদেরকে কেউ সেই জায়গা থেকে বিতাড়িত করতে চেয়েছে, ততবার ওরা আত্মরক্ষার জন্য প্রত্যাঘাত করেছে।”

_____

গল্পটি এখানেই শেষ। শুধু অত্যুৎসাহী পাঠকদের জন্য দুটো তথ্য দিয়ে রাখিঃ

নেপোলিয়নের আংটিটি কেউ যদি দেখতে চান তাহলে ব্যাঙ্গালোর মিউজিয়ামে ঢুঁ মারতে পারেন। সেখানে আংটিটির নিচে ইংরাজিতে পরিষ্কার লেখা আছে ‘সৌজন্যেঃ ডঃ অনুপ বাগচী’

গৌরীভিটিল এখনও আছে। তবে গতবারের বিধ্বংসী সুনামিতে ভেঙেচূরে গেছে অনেকটা। সৌম্যদা খোঁজখবর নিয়েছিল, সুনামির পর থেকে আর ফিরে আসেনি সেই উভচর প্রাণীগুলি

ছবিঃ মৌসুমী

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প উপন্যাসের লাইব্রেরি

                                     

 

Advertisements

4 Responses to পুজোর উপন্যাস গৌরীভিটিলের অদ্ভুত গন্ধ পুষ্পেন মণ্ডল শরৎ ২০১৭

  1. Sagarika Ray says:

    ভাল লাগল ।

    Like

  2. Subhayu Bandyopadhyay says:

    bhalo laglo

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s