পুজোর উপন্যাস বিবুধসমাগম প্রহেলিকা সুদীপ চ্যাটার্জি শরৎ ২০১৯

সুদীপ চ্যাটার্জির আরো গল্প-উপন্যাস

কুকুলকানের সন্ধানে (উপন্যাস), অন্তু আর ঠাকুমার গল্প, সাইলেনটিয়াম (প্রথম খণ্ড) (উপন্যাস) সাইলেনটিয়াম (পর্ব 2)(উপন্যাস)সুলভিন আর সমুদ্রের গল্প

চিঠির বক্তব্য সংক্ষিপ্ত ও সুস্পষ্ট। আমার পাঠানো আবেদনপত্র ও যাবতীয় শিক্ষাগত নথিপত্র তাঁরা পেয়েছেন এবং আমাকে বিলেতে ডেকেছেন সাক্ষাৎকারের জন্যে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে রিসার্চ স্কলার হিসেবে কেমব্রিজে থেকেই আমি পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারব এবং মাস খানেকের মধ্যেই বৃত্তির টাকা আমার হাতে চলে আসবে। কিন্তু আমি এই প্রস্তাব অস্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আমি কেমব্রিজে গিয়ে সাক্ষাৎকার দিতে পারব না। কেননা, বিলেত যাওয়া ও থাকার একমাসের যা খরচ তার সিকিভাগও আমার কাছে নেই। আবেদনপত্র পাঠানোর সময় আশা করেছিলাম, ডাক পেলে কোনও না কোনওভাবে টাকার ব্যবস্থা করে ফেলতে পারব। কিন্তু সেই ভাবনা যে অযৌক্তিক ছিল, আজ সারাদিন ভেবে বুঝতে পেরেছি। মফস্বলের ছেলে আমি—আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কেউই আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নয়। বিলেত তো দূর, দিল্লি-বোম্বাই গিয়ে থাকার কথাও কেউ স্বপ্নে ভাবে না। এই মফস্বল থেকে পাশ করে ছোটোখাটো কোনও স্কুলে চাকরি আর সুযোগ পেলে বিকেলে কয়েকটা টিউশনি—এই আমার ভবিষ্যৎ। বই পড়ে যে স্বপ্ন দেখেছি মনে মনে এত বছর ধরে, বাস্তবের কঠিন ধরাতলে যে তা ধূলিসাৎ হওয়ার ছিল, এটাই তো স্বাভাবিক। মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করা অধরা থেকে গেল। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবজারভেটরির ছবিটাও মনের গোপনেই চাপা থাক। ভাগ্যে না থাকলে আর কী করা যাবে? নিয়তিকে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

ছোটোবেলা থেকেই মহাকাশের রহস্য জানার কৌতূহল ছিল আমার। এই উৎসাহটাকে আরও চাগিয়ে দিয়েছিলেন অরুণাভর জ্যাঠামশাই। তাঁকে আমিও জেঠু বলেই ডাকতাম। নানান বিষয়ে অগাধ জ্ঞান ছিল জেঠুর। ফিজিক্সের রহস্য কীভাবে মহাকাশ আর পৃথিবীকে বেঁধে রেখেছে, কত সহজভাবে বুঝিয়ে দিতেন তিনি। উৎসাহ দিতেন স্বপ্ন দেখার, স্বপ্নকে সত্যি করার। একসময় জেঠুরা জমিদার ছিলেন এ অঞ্চলের, বিষয়সম্পত্তি তাঁর যথেষ্টই ছিল। আকছার পুরনো বই অথবা এন্টিক কিনে তার গল্প জুড়ে দিতেন। বছর খানেক আগে জেঠুও চলে গেছেন। কেমব্রিজে টাকার অভাবে পড়তে যাওয়া হবে না শুনলে আমার চেয়ে কম কষ্ট হত না তাঁর। স্বপ্ন ভেঙে গেছে, সান্ত্বনা দেওয়ার লোক আজ অনেকদূরে। আমার চোখের পাতা অজান্তেই ভিজে উঠল।

দুই

সকালবেলাতেই অরুণাভ এসে হাজির। সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে উঠে এল আমার ঘরে। এসেই সোজা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “ওই, কালকে যাসনি কেন রে?”

“এমনিই, ইচ্ছে করছিল না।”

অরুণাভকে প্রচণ্ড উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। ধপাস করে মেঝের ওপর বসে পড়ে সে বলল, “শোন, তোর সঙ্গে আমার একটা ইম্পর্ট্যান্ট ব্যাপারে আলোচনা করার আছে। খুব সিরিয়াস ব্যাপার।”

আমি প্রশ্নবাচক ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে।

অরুণাভ বলল, “কালকে আমি জেঠুর ঘরটায় পুরনো বই খুঁজছিলাম। সেখানে একটা বইয়ের মধ্যে একটা চিরকুট পেয়েছি। একটা সেলোফেন পেপারে মুড়ে সযত্নে রাখা ছিল বইয়ের মধ্যে। চিরকুটটায় আছে জেঠুর হাতে লেখা একটা ধাঁধা। পড়ে তো মনে হচ্ছে গুপ্তধনের সংকেত। বেশ রহস্যজনক ব্যাপার।”

ব্যাপারটা শুনে আমি তেমন আগ্রহী হলাম না। জেঠু কৌতুক আর হেঁয়ালি করতে ভালোবাসতেন ঠিকই, কিন্তু টাকাপয়সা জমিয়ে রাখার স্বভাব তার মোটেই ছিল না। গুপ্তধনের কথায় আমার মোটেই বিশ্বাস হল না। নেহাত কৌতূহলের বশে আমি অরুণাভকে বললাম, “দেখি, কী ধাঁধা। কোথায় তোর চিরকুট?”

অরুণাভ সন্দেহজনক চোখে চারদিকে দেখে নিয়ে বলল, “সেটা জেঠুর ঘরেই লুকিয়ে রেখেছি। বিশ্বাস নেই, বেশি লোকে জানাজানি হলে ব্যাপার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। চল, সেখানেই গিয়ে দেখবি।”

তিন

জেঠুর ঘরটা দেখে মনে হয় লাইব্রেরি। চারদিকে বই। সবধরনের বইয়ের জন্যে আলাদা আলাদা আলমারি। দেওয়াল দেখাই যায় না। কোনার দিকের একটা ছোটো বইয়ের আলমারির হাতলে সোনার জল করা আছে। সেখানে থাকে নানান বিদেশি জার্নাল, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকা আর এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার নতুন সংস্করণ। জানালার কাছে ছোটো একটা স্টাডি টেবিল। সেখানে একটা গ্লোব আর সামান্য কয়েকটা জিনিস। অরুণাভ উঁচু একটা তাক থেকে একটা বই নিয়ে সেখান থেকে সাবধানে একটা কাগজ বের করে বলল, “এই সেই সংকেত। দেখ, কিছু বুঝিস কি না। আমার মাথাতে তো কিছুই ঢুকছে না।”

কাগজটা হাতে নিলাম। তুলোট কাগজ। তার ওপর জেঠুর মুক্তোর মতো হাতের লেখায় লেখা একটা ছড়া। অনেকটা ছোটোদের ছড়ার আঙ্গিকে লেখা। মোটেই গোয়েন্দা গল্পের মতো কোনও চমকপ্রদ সংকেত নয়।

কৃষ্ণকায় ঠায় দাঁড়ায়, হাতে ঢাল তার
নীলাভ শুভ্র রাজা বসে পায়ের কাছে যার।
রাজার সঙ্গে কৃষ্ণকায় সন্ধি যদি করতে চায়,
সন্ধি করে ধীর পায় জ্ঞানের দিকে পা বাড়ায়।

বার বার পড়েও আমি মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না। অরুণাভ এদিকে খুবই উৎকণ্ঠিত হয়ে আমার দিকে চেয়ে আছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লাম। অরুণাভ আমার হাত থেকে লেখাটা নিয়ে আবার বলল, “এটা পাক্কা গুপ্তধনের সংকেত। মাথা ঘামিয়ে মানেটা বের করতে হবে। আমরা এবার রোজ এখানে কয়েক ঘন্টা বসে এই হেঁয়ালির সমাধান করার চেষ্টা করব। আর শোন, তুই কাউকে এই ব্যাপারে কিচ্ছু বলবি না।”

অরুণাভর কাণ্ড দেখে আমার হাসিই পেল। ব্যাটা গোয়েন্দা গল্পের পোকা। বয়স বেড়েছে, সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে গোয়েন্দাগিরির ভূত। আমাদের এই মফস্বলে রোমাঞ্চকর কোনও ঘটনা হয় না বলে অরুণাভ প্রায়ই আফসোস করে। যতটা না গুপ্তধনের টানে, তার চেয়ে বেশি আমার বিষণ্ণতা কাটাতে আমি রাজী হয়ে গেলাম। আর কিছু না হয়, জেঠুর বাড়িতে এসে কয়েকটা বই পড়ে দুপুরটা ভালোই কাটবে।

চার

আজ সপ্তম দিন। সাতদিন কাবার হতে বেশি সময় লাগেনি। জেঠুর ঘরে বসে ধাঁধার মানে বের করার চেষ্টা শুরু হয়েছিল ভালোই, কিন্তু শেষমেশ লাভ হয়নি কিছুই। একগাদা হেঁয়ালি আর সংকেত সমাধানের বই গাদা করে এনেছে অরুণাভ। সঙ্গে ডাই করে রাখা তার নিজস্ব গোয়েন্দা সংগ্রহ। প্রথম প্রথম দুয়েকদিন সব চেষ্টাই হয়েছিল। নানান লজিক থেকে নাম্বার সিস্টেম—সবকিছুই খাটিয়ে দেখা হয়ে গেছে। ছড়া রয়েছে নিজের জায়গায়।

অরুণাভর বাড়িটা বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা। গরমকাল। কিছুক্ষণ মাথা খাটানোর পরেই ঘুম পেয়ে যায়। মাঝেমাঝেই বইপত্র খুলে আমরা দু’জনেই চিৎপাত হয়ে ঘুম লাগাই। একসময় অরুণাভ উঠে জিভ কেটে বলে, “ইস! বড্ড সময় নষ্ট হল। দাঁড়া, একটু চা দরকার মাথা খোলার জন্যে।”

চায়ের সঙ্গে মাঝেমাঝেই বেগুনি, ফুলুরি, সর্ষের তেল-পেঁয়াজ-আলুভাজা নিয়ে মাখা মুড়িও আসে। সেইসব সাঁটাতে সাঁটাতে জেঠুর আলমারি থেকে কয়েকটা বই এনে পড়তে শুরু করি। কয়েকদিন লাভের মধ্যে বেশ কয়েকটা বই পড়া হয়েছে আমাদের। সময় ভালোই কাটছে। আমার মনখারাপ অনেকটা কেটে গেছে। গুপ্তধনের কথা তো ভুলেই গেছি। অরুণাভ অবশ্য হাল ছাড়েনি।

আজ বিকেলে চা খেতে খেতে অরুণাভ বলে উঠল, “দূর দূর। কোনও লাভই হচ্ছে না। শুধু রাজ্যের বই পড়ে জ্ঞানবৃদ্ধি হচ্ছে।”

আমি মুচকি হাসলাম। ব্যাটা আজকে আলমারি থেকে একটা জ্যোতির্বিজ্ঞান-সংক্রান্ত ইংরেজি বই নিয়ে এসেছে। আলুর চপে জব্বর এক কামড় দিয়ে বইয়ের প্রথম পাতাটা খুললাম। পাতা জুড়ে ওরায়ন (orion) তারামণ্ডলের ছবি। অরুণাভ ইংরেজিটা ভালো জানে। আমি এই তারামণ্ডলগুলো বাংলাতেই ভালো চিনি। অরুণাভকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই, তুই ওরায়ন মণ্ডলের বাংলা নাম জানিস?”

অরুনাভ মুখ ভেংচে বলল, “না। ভুলে গেছি। তুই বল।”

“পারলি না তো? বাংলাটা ভালো করে পড় রে। গোয়েন্দা হতে গেলে শুধু ইংরেজি পড়লেই চলবে? ওরায়নের বাংলা নাম হল কালপুরুষ।”

অরুণাভ কিছুক্ষণ ড্যাবড্যাবে চোখে আমার দিকে চেয়ে রইল ভেবলুর মতো। তারপর তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বলল, “কী নাম বললি?”

“কালপুরুষ। কেন রে, কী হল? ছ্যাঁকা খেলি যে বড়ো!” আমি হেসে উঠলাম।

ততক্ষণে আরেকবার লাফিয়ে উঠেছে অরুণাভ। চোখ দু’খানা জ্বলজ্বল করছে উত্তেজনায়। আমি অবাক হয়ে তাকাতেই সে আমার মাথায় একটা চাঁটি মেরে বলল, “ইডিয়ট! কালপুরুষ, কালপুরুষ! ওরায়ন বা কালপুরুষ মণ্ডলকে দেখলে মনে হয় যে একটা মানুষ হাতে ঢাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কৃষ্ণকায় মানে কালো, মানে কাল। কালো পুরুষ যে ঢাল হাতে দাঁড়িয়ে। কালপুরুষ। জেঠু কালপুরুষ তারামণ্ডলের কথা বলতে চেয়েছে হেঁয়ালিতে।”

ততক্ষণে মাথায় চাঁটি খেয়ে আমিও উত্তেজিত হয়ে উঠেছি। মাথা দৌড়োতে শুরু করেছে। ঠিকই তো! ধাঁধাটার তাহলে সত্যি কোনও একটা মানে আছে!

অরুণাভ আমাকে বলল, “দ্যাখ। তুই তারামণ্ডলগুলোর কথা আমার চেয়ে ভালো জানিস। বাংলা নামগুলোও তোর জানা আছে। ভেবে দেখ পরের লাইনগুলো।”

আমি চিরকুটটা তুলে আবার প্রথম লাইন দুটো পড়লাম—

কৃষ্ণকায় ঠায় দাঁড়ায়, হাতে ঢাল তার

নীলাভ শুভ্র রাজা বসে পায়ের কাছে যার।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সহসা আমার মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। এ তো জলের মতো সোজা! কালপুরুষ তারামণ্ডলের বাঁ-পায়ের কাছে যে তারাটি অবস্থিত, তার নাম রিগেল (rigel)। বাংলায় যাকে আমরা বলি বাণরাজা। বাণরাজা শুভ্র বা সাদা রঙের দেখতে, তার গা থেকে বিচ্ছুরিত হয় নীলাভ আলো। সূর্যের চেয়ে এর ব্যাস তেত্রিশ গুণ বেশি। সেইজন্যে এই আলো অনেক বেশি জোরালো। সব মিলে যাচ্ছে। কালপুরুষ আর বাণরাজা।

পরের লাইনগুলোর কথা মনে পড়ল। লেখাটা হাতে তুলে নিয়ে লাইনগুলো মাথায় ঝালিয়ে নিলাম।

রাজার সঙ্গে কৃষ্ণকায় সন্ধি যদি করতে চায়,

সন্ধি করে ধীর পায়ে জ্ঞানের দিকে পা বাড়ায়।

সন্ধি। সন্ধি। কালপুরুষ আর বাণরাজার সন্ধি–কী সন্ধি? পুরুষ আর রাজা? রাজপুরুষ? পুরুষ রাজা?

অরুণাভ জিজ্ঞাসু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে ব্যাপারটা বলতেই সে তুড়ি মেরে লাফিয়ে উঠল। তারপর বলল, “দেখ, আমি গোয়েন্দা গল্পে পড়েছি, এই হেঁয়ালিগুলো কোনও স্থান-বিশেষের কথা বলে। সেখান থেকে দিক ঠিক করে গুপ্তধনের জায়গায় যেতে হয়।”

মাথার মধ্যে সন্ধি হয়ে চলেছে। অরুণাভ একটু চিন্তা করে বলল, “ধরা যাক, সোজা নিয়মে সন্ধি করে এল পুরুষ রাজা, কিন্তু জ্ঞানের দিকে পা বাড়ায় মানে কী? জ্ঞান কি আরেকটা তারা?”

ভেবেচিন্তে মাথায় কিছুই এল না। কিছুক্ষণ মাথা ঘামিয়ে আবার মুড়ি চিবোতে শুরু করলাম। এক ফাঁকে অরুণাভকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই চিরকুটটা যদি সত্যি কোনও অর্থবহনকারী সংকেত হয়, তাহলে তো এটা যেখানে সেখানে ফেলে রেখে যেতেন না জেঠু। ঠিক করে বল তো, তুই এটা ঠিক কোত্থেকে পেয়েছিলিস।”

অরুনাভ এক খাবলা মুড়ি মুখে পুরে বলল, “আর বলিস না। জেঠুর ঘরে যত বই, রাখার জায়গা হচ্ছে না। জেঠু মারা যাওয়ার পর বাবা বললেন, এত বই কী হবে? হয় বিক্রি করে দেওয়া হোক, না হলে লাইব্রেরিতে দিয়ে দেওয়া যাক। সেটা আমার ঠিক পছন্দ হয়নি। জেঠুর কাছে অনেক ভালো ভালো গোয়েন্দা আর রহস্য গল্প ছিল। ভাবলাম, সেগুলো বেছে বেছে আমার আলমারিতে তুলে রাখব। জেঠুর ঘরে এসে যেই গোয়েন্দা গল্পের আলমারি থেকে বইগুলো হাতড়চ্ছিলাম, সেখানে রবীন্দ্রনাথের গুপ্তধন বইটা বের করতেই এই চিরকুটটা মাটিতে পড়ল।”

আমি একটু চিন্তা করে মাথা নেড়ে বললাম, “হুঁ। যতদূর মনে হচ্ছে, জেঠু ইচ্ছে করেই চিরকুটটা ওখানে রেখেছিলেন। হয়তো তোর উদ্দেশ্যেই। তিনি জানতেন, তিনি না থাকলে তুই নিশ্চয়ই গোয়ন্দা গল্পগুলো নিতে ওই আলমারিটা দেখবি, তখন তোর হাতে ওই চিরকুটটা পড়বে। তারপর ‘গুপ্তধন’ বইয়ের ভিতরে চিরকুটটা রাখা, এটা কাকতালীয় ব্যাপার বলে তো মনে হচ্ছে না রে। ব্যাপারটা এতদিনে সিরিয়াস মনে হচ্ছে।”

অরুণাভ আমার কথা শুনে গুম হয়ে গেল। তারপর আঙুল দিয়ে মেঝেতে আঁচড় কাটতে কাটতে বলল, “জেঠু বেঁচে থাকতে ছোটোবেলায় অনেকবার আমাদের তারা চিনিয়ে দিতেন রাতে ছাদে গিয়ে। এতদিনের অনভ্যাসে বেশিরভাগটাই ভুলে মেরে দিয়েছি। যতটা জ্ঞান হয়েছে…”

আমি অরুণাভকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “তুই এনসাইক্লোপিডিয়ার আলমারিটা দেখেছিস জেঠু মারা যাওয়ার পর?”

“না তো। কেন রে?”

আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “একটা সন্দেহ হচ্ছে। জেঠুর জ্ঞানের স্রোত ছিল বই। কোনও বই যদি সবচেয়ে বেশি জানতে সাহায্য করে… তুই একটু আলমারিটা খুলে দেখ তো পুরুষরাজা বা রাজপুরুষ নামে কোনও বই আছে কি না সেখানে।”

এবার আলস্য ঝেড়ে উঠে পড়া গেল। অরুণাভ কোনার আলমারির সোনালি হাতল টেনে খুলে ফেলল। বাঁধানো মলাটে সার সার বই সাজানো আছে। কিন্তু খুঁজে রাজপুরুষ নামের কোনও বই পাওয়া গেল না। আচমকা ‘ইউরেকা’ বলে একটা চিৎকার শুনতেই দেখলাম, অরুণাভর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তার হাতে কালো বাঁধাই করা একটা ইংরেজি বই। বইটার নাম ‘The Black Arrow’।

আমি হচকচিয়ে গিয়ে বলে উঠলাম, “কী হল?”

আবার ফটাস করে আমার মাথায় চাঁটি পড়ল অরুণাভর। প্রচণ্ড উত্তেজনায় আমার মাথার চুলগুলো খিমচে ও বলল, “ব্ল্যাক অ্যারো মানে কালো বাণ রে, গাধা। কালপুরুষ আর বাণরাজার সন্ধি করে পাওয়া কালবাণ, রাজপুরুষ নয়।”

আমি মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে অরুণাভর হাত থেকে বইটা নিলাম। টেবিলের ওপর রেখে দুরু দুরু বুকে বইটা খুলতেই দেখা গেল পাতাগুলো কেটে কেটে খাঁজ করা হয়েছে। তার ফলে অনেকটা জায়গা তৈরি হয়েছে সেখানে। সেখানে রাখা আছে… গুপ্তধন নয়, ভাঁজ করে রাখা চারটে কাগজ। সেগুলোর ওপর সোনালি অক্ষরে এক, দুই, তিন, চার লেখা।

অরুণাভ ছোঁ মেরে একটা কাগজ তুলে নিয়ে খুলে ফেলল। তারপর আরেকটা। চারটে কাগজ না খুলেই সে মাটিতে বসে পড়ে বলল, “গেছি রে ভাই। আবার হেঁয়ালি। লাও ঠ্যালা।”

ততক্ষণে আমিও কাগজগুলো খুলে ফেলেছি। জেঠুর হাতে লেখা তুলোট কাগজের একইরকম চিরকুট। হেঁয়ালিই বটে, কিন্তু এবার একটা নয়, চারটে। জেঠু হয়তো মনে মনে চেয়েছিলেন যে কোনও ব্যক্তি যে প্রথম ধাঁধার উত্তর খুঁজে পাবে, তার হাতে তুলে দিতে সংকেতের শেষ অংশ। প্রথম সংকেত না বুঝলে হয়তো সেই ব্যক্তি বাকি সংকেত বোঝার যোগ্য নয়। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা চারটে কাগজের লেখাগুলো জোড়া দিয়ে সাজিয়ে ফেললাম লাইন করে। গোটা গোটা অক্ষরে জেঠু লিখেছেন—

১) উড়িষ্যাতে বসে আছেন সাতটি মহাজ্ঞানী,
ছয়জনেতে একলা থাকে একটি মাত্র রানি।
বাম কোণেতে একলা যিনি মনের দুঃখে কাঁদেন,
গম্ভীরাকে সঠিক ভেবে তার সাথে ঘর বাঁধেন।

২) আঁধার রাতে একলা চেয়ে নেইকো মানুষজন,
প্রথম সখার কথাই শুধু ভাবছে সারাক্ষণ।
ইচ্ছে করে তারই কাছে ছুটে চলে যায়,
সুখের ছোঁয়ার চাবিকাঠি পেতে যদি চায়।

৩) সাত ভাই চম্পা একসাথে যে বসে,
লিখল যে বই ডুবল সবাই সেই বইয়েরই রসে।
জোছনা রাতে ভেড়ায় চড়ে পরে সাদা জামা,
সাতরাজার ধন মানিক যেথায় রবিমামা দেয় হামা।

৪) ইদিক সিদিক হেথায় সেথায় কোথাও যায় না সে,
এখান সেখান যেখান থেকান দৃষ্টিগোচর যে।
সঠিক ভেবে সঠিকভাবে বুঝবে যেই জন,
সৃষ্টি বোঝার দৃষ্টি পাবে, পাবে গুপ্তধন।

পাঁচ

সটান পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে অরুণাভ বলল, “বিবুধসমাগম প্রহেলিকা।”

আমি হাঁ হয়ে বললাম, “সেইটা আবার কী জিনিস রে?”

অরুণাভ মাথা তুলে বলল, “বিবুধসমাগম মানে নক্ষত্রমণ্ডল রে। গোয়েন্দা গল্প হলে নাম দিত নক্ষত্রমণ্ডল রহস্য। কিন্তু এই লেভেলের জিনিস গোয়েন্দা গল্পেও থাকে না। তাই আমি নাম দিলাম বিবুধসমাগম প্রহেলিকা।”

আমি হা হা করে হেসে উঠলাম। অরুণাভ আমার হাসিকে পাত্তা না দিয়ে ম্লান স্বরে বলল, “ভাই, আমার মাথার ভিতর ঢিব ঢিব করছে। মাথা ধরে গেছে। একটা ছড়া বুঝতেই সাতদিন চলে গেল। তা এখানে তো সংকেতের ডিপো। সাতজন্ম কেটে যাবে।”

আমি উলটেপালটে কাগজগুলো দেখছিলাম পরের দিন দুপুরে। জিজ্ঞেস করলাম, “তুই এত নিশ্চিত হচ্ছিস কী করে এগুলো আলাদা আলাদা ছড়া? একটা বড়ো সংকেতও হতে পারে।”

“আরে, লেখাগুলো তো এক-দুই-তিন-চার করে আলাদা-আলাদাই লেখা ছিল। তারপর দেখ, প্রতিটা লেখার ধরন অন্যরকম। বাঁধাধরা ছন্দ নয় ঠিকই, কিন্তু অন্তমিল মেলানোর একটা চেষ্টা আছে। না ভাই, এ আমার কম্ম নয়।”

আমার মাথায় কিন্তু এবার জেদ চেপে গেছে। আমি অরুণাভকে একটা ঠেলা মেরে বললাম, “অত ঘাবড়াচ্ছিস কেন? জেঠু আমাদের জন্যেই এই চ্যালেঞ্জটা রেখে গেছেন। ওঁর ভরসা ছিল, তুই আর আমি মিলে এটার সমাধান করতে পারব। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই লেখাগুলোতেও অ্যাস্ট্রোনমির সংকেত লুকিয়ে আছে। মনে আছে, এই অ্যাস্ট্রোনমির জন্যেই জেঠুর সঙ্গে আমার আলাপ। মহাকাশের কথা অনবরত বলে চলতেন, আমরাও মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। সেই থেকেই মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে পড়ার ইচ্ছে হয়েছিল। সেই ইচ্ছে তো আর…”

অরুণাভ উঠে বসল। আমার কাঁধে একটা হাত রেখে বলল, “ঠিক বলেছিস। চেষ্টা করতে হবে। ছড়াগুলোর মানে না বের করতে পারলে লজ্জার ব্যাপার হবে। কিন্তু কোত্থেকে শুরু করি বল তো!”

আমি একটু ভেবে বললাম, “দ্যাখ, আগের ছড়াটা ছিল তারামণ্ডল নিয়ে। এটাও ওরকম কিছু হবে। একটু বই-টই ঘাঁটলেই বোঝা যাবে মনে হয়।”

অরুণাভ খিঁচিয়ে উঠে বলল, “সে গুড়ে বালি। অ্যাস্ট্রোনমি কি ছোটো ব্যাপার নাকি? কোটি কোটি তারকামণ্ডল, গ্রহ, নক্ষত্র আছে। কী কী পড়ে উলটোবি?”

মোক্ষম জবাব। অকাট্য যুক্তি। আমি আমতা আমতা করে বললাম, “না না, অত কঠিন হেঁয়ালি লেখে না কেউ গুপ্তধনের জন্যে। তারপর লিখেছেন জেঠু। আরে বাবা, ওরকম শক্ত ধাঁধা হলে তো গুপ্তধন কেউ কস্মিনকালেও খুঁজে পাবে না।  আরে এই দ্যাখ, মনে হচ্ছে এই প্রথম লাইনটা বেশ সোজা। সপ্তর্ষির কথা বলা হচ্ছে। উড়িষ্যাতে বসে আছেন সাতটি মহাজ্ঞানী।”

অরুণাভ ঠোঁট উলটে বলল, “সেটা তো আমিও জানি। কিন্তু উড়িষ্যা এল কোত্থেকে রে বাবা! সঙ্গে রানিও আছে। যা দেখছি, লোটাকম্বল বেঁধে উড়িষ্যাতে চলে যেতে হবে।”

আমরা দু’জনেই চিন্তা করে যাচ্ছি ঘন্টার পর ঘন্টা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে, সন্ধে গড়িয়ে রাত্রি। বেশ কয়েকবার চা পান হয়েছে। সঙ্গে চানাচুর, তেলেভাজা আর বিস্কুটের সদ্ব্যবহার ভালোই হয়েছে, কিন্তু ছড়ার মানে বের হয়নি। একসময় ক্লান্ত হয়ে আমি উঠে পড়লাম। আবার কাল বসতে হবে।

ছয়

দু’দিন কেটে গেছে। জেঠুর ধাঁধাগুলোর মানে বের করতে হিমশিম খেয়েছি, কিন্তু পরিষ্কারভাবে কোনও অর্থ বের করতে পারিনি আমরা দু’জনেই। মাঝে মাঝে কয়েকটা সূত্র ঝিলিক দেয় বটে, কিন্তু শেষপর্যন্ত কোনও উত্তরে পৌঁছোন যায় না। কাঁহাতক আর এই অবস্থায় থাকা যায়? অরুণাভ আর আমি দু’জনেই হাঁফিয়ে উঠেছি।

তৃতীয়দিন সকালে অরুণাভ আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। আমার মাকে প্রণাম করে একগাল হেসে বলল, “মাসিমা, লুচি খাওয়াবেন?”

মা অরুণাভকে খুব পছন্দ করে। তার পিঠে একটা হালকা কিল মেরে হেসে মা বলল, “তোরা ওপরে ছাদে গিয়ে বস। লুচি করে দিয়ে আসব।”

আমরা ছাদে এসে মাদুরের ওপর বসলাম। কলেজের ফর্ম ভরতে হবে। আমরা দু’জনেই ঠিক করেছি একসঙ্গে পড়ব একই কলেজে। কেমব্রিজ যদি ভাগ্যে নাও থাকে, দু’বন্ধুতে মিলে গল্প করে, বই পড়ে কাটিয়ে দেওয়া যাবে কয়েকটা বছর। তারপর নিয়তি যেদিকে নিয়ে যায়।

কিছুক্ষণ পর মা লুচি দিয়ে গেল। একটা ফুলকো লুচি ফাটিয়ে ফুঁ দিতে দিতে অরুণাভ বলল, “চল, কয়েকদিনের জন্যে আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে ঘুরে আসা যাক।”

আমি একটা আস্ত লুচি মুখে পুরে চিবোচ্ছিলাম। কোনওরকমে সেটা ম্যানেজ করে বললাম, “গ্রামের বাড়ি মানে যেটা তোর জেঠু কিনে রেখেছিলেন?”

“হ্যাঁ। এখানে থেকে একঘেয়ে মনে হলে কয়েকদিন ওই বাড়িটায় কাটিয়ে আসতেন। আসলে এককালে জমিদারি ছিল তো, টাকাপয়সার অভাব ছিল না। গ্রাম তো নামেই, প্রায় জঙ্গল। বাড়িটা কিন্তু বিশাল। পুরনো বাড়িটা সস্তায় পেয়ে নিজের মতন করে বানিয়ে নিয়েছিলেন। শুনেছি, বিলেত থেকে জেঠুর বন্ধুরা এসেও থেকে গেছে সেখানে। চারদিকে জঙ্গল, পুকুর, আমবাগান, বাঁশবাগান। একটা নদীও আছে ছোটো। আজকাল জায়গাটা আগের মতো অত শুনশান নেই। চল, ঘুরে আসি। যা গরম পড়েছে, ওখানে গিয়ে মাথাটা ঠাণ্ডা হতে পারে।”

“তুই আগে কোনওদিন যাসনি?”

“হ্যাঁ, গেছি কয়েকবার। দারুণ জায়গা। চল, আজই বেরিয়ে পড়া যাক। ওখানে গিয়ে যদি সংকেতের কোনও সুরাহা হয়! কাকিমাকে বলে দিচ্ছি।”

বিশেষ আপত্তি করলাম না। এই গরমে প্রাণটা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। খবরে দিয়েছে দিন দুয়েকের মধ্যে কালবৈশাখী হতে পারে। গ্রামের বাড়িতে বৃষ্টি দেখতে আশা করি ভালোই লাগবে।

দুপুরের মধ্যেই ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়া হল। ঘন্টা দুয়েক লাগল সেখানে পৌঁছতে। জনবসতি হয়েছে বটে, কিন্তু বাড়িটার আনাচে-কানাচে এখনও অনেকটাই জঙ্গল রয়ে গেছে। আকাশে হালকা মেঘ করেছে, সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে। বেশ বড়ো বাড়ি, এককালে হয়তো কোনও রাজা-উজির বানিয়েছিলেন শখ করে। সঙ্গে লাগোয়া পুকুরে বাঁধানো ঘাট আছে। মৌজ করে চান করে নিলাম দু’জনেই।

বিকেলবেলায় চা নিয়ে গুছিয়ে বারান্দায় বসা গেল। বলাইদা বলে একজন পুরনো বিশ্বাসী লোক এই বাড়িটার দেখাশুনা করে। অনেকদিন পর অরুণাভ আর আমাকে পেয়ে অনর্গল গল্প করে চলেছে মানুষটি। আমি চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, “আচ্ছা বলাইদা, জেঠু কি এখানে মাঝেমাঝেই আসতেন, নাকি?”

বলাইদা উত্তর দিল, “হ্যাঁ দাদাবাবু, তাঁর খুব প্রিয় জায়গা ছিল এটা। পুরনো বাড়িটাকে নিজের মতো করে সারিয়ে-সুরিয়ে নিয়েছিলেন। জায়গা তো কম নয়, উপরনিচ মিলিয়ে প্রায় তিরিশটা ঘর। মাঝেমধ্যে না এলে চলবে কেন? বড়ো দাদাবাবু এলে রাজ্যের জিনিসপত্র নিয়ে আসতেন, হইচই করতেন, ছাদে, বারান্দায় বসে বই পড়তেন, অনেক গল্পও বলতেন। কী সুন্দর গল্প বলতে পারতেন! এই ছোটো দাদাবাবুও আগে ছোটো থাকতে অনেকবার এসেছে। এখন বড়ো লায়েক হয়েছে কিনা, তাই এই বুড়োকে ভুলে গেছে।”

আমি হেসে উঠলাম। অরুণাভ পাশ থেকে বলে উঠল, “তা বলাইদা, জেঠু আকাশ-টাকাস নিয়েও গল্প বলতেন নাকি?”

বুঝলাম, ব্যাটার মাথায় এখনও হেঁয়ালি ঘুরে বেড়াচ্ছে।

বলাইদা বলল, “সে আর বলতে! ওই তো ওঁর শখ ছিল। রাজ্যের বই পড়া আর চোখে যন্ত্র লাগিয়ে আকাশ দেখা।”

“টেলিস্কোপ।” আমি বলে উঠলাম, “তা কী কী গল্প করতেন? একটু শোনাও না, বলাইদা।”

বলাইদা স্মৃতি হাতড়ে বলল, “সে কত কিছু—চাঁদ, সূর্য, তারাদের কথা। একটা গল্প আমার এখনও মনে আছে। তোমরা নিশ্চয়ই তার কাছে সপ্তর্ষির গল্প শুনেছ?”

সপ্তর্ষির কথা শুনতেই আমরা সজাগ হয়ে উঠেছি। জেঠু কত গল্পই না বলতেন। সব আমাদের মনেও নেই। ততক্ষণে বলাইদা বলতে শুরু করেছে, “সপ্তর্ষির সাতটা তারা আসলে সাতটা ঋষি। তাদের নামগুলো আজ আর ঠিক মনে নেই।”

ঋষিদের নামগুলো অনেকবার শুনেছিলাম বলে আমার মনে ছিল। আমি বললাম, “ক্রতু, পুলহ, পুলস্ত্য, অত্রি, অঙ্গিরা, বশিষ্ঠ আর মরীচি। এই ঋষিদের সাতজন বউ। আবার কোনও ঋষিদের একাধিক বউ ছিল, নামগুলো আর ঠিক করে মনে নেই। ঋষিদের বউ নিয়ে নানারকম গল্প আছে। খুব সম্ভবত সম্ভূতি, অনুসূয়া, ক্ষমা, প্রীতি, সন্নিতি, লজ্জা…”

“আর অরুন্ধতী। বাকিদের মধ্যে কে কার স্ত্রী সেকথা আজকাল ঠিক মনে পড়ে না। কিন্তু অরুন্ধতী যে বশিষ্ঠের স্ত্রী ছিলেন এটা আমার বেশ মনে আছে। তোমারও তো বেশ মনে থাকে, দাদাভাই।” বলাইদা তারিফের সুরে বলে উঠল।

আমি হেসে বললাম, “আসলে ছোটবেলায় জেঠুর দেওয়া গল্পের বইয়ে এইসব পড়েছি তো। গল্পগুলো বেশীরভাগই ভুলে গেছি, কয়েকটা নাম শুধু মাথায় রয়ে গেছে।”

বলাইদা বলল, “যাই হোক, সাত ঋষির এই সাত বউ, তারা যেমন রানির মতো রূপবতী তেমনি তাদের জ্ঞান। তারপর একবার হল কী, আকাশপথে অগ্নিদেব একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। তিনি তো এই সাতজনকে দেখতে পেয়ে আবদার করে বসলেন, তিনি তাদের বিয়ে করবেন। কিন্তু ঋষিদের সাতজন বউ পাত্তাই দিল না। মনের দুঃখে অগ্নিদেব জঙ্গলে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন। এদিকে দক্ষের এক মেয়ে স্বাহা, তিনি অগ্নিদেবের এই কষ্ট সহ্য করতে পারলেন না। স্বাহা তখন অঙ্গিরার স্ত্রীর রূপ ধরে অগ্নিদেবের সঙ্গে গিয়ে দেখা করলেন। অগ্নিদেব তাঁকে পেয়ে কয়েকদিন মহানন্দে রইলেন। কিন্তু দিন কয়েকের মধ্যেই তার পাগলামি আবার বাড়তে লাগল। বাকি ছয়জনকেও তার চাই। স্বাহা বেচারি আর কী করেন, তিনি একেকবার একেজনের রূপ ধরে অগ্নিদেবের সেবা করতে লাগলেন, কিন্তু শত চেষ্টা করেও বশিষ্ঠের স্ত্রী অরুন্ধতীর রূপ তিনি ধরতে পারলেন না। অরুন্ধতী ছিলেন মহাবিদুষী ও তাপসী। তার রূপ ধরা কী সোজা!

“এদিকে সাত ঋষি শুনতে পেলেন, তাদের ছয়জনের স্ত্রী অগ্নিদেবের দাসীগিরি করছে। আর যায় কোথায়! সেই শুনে বিনা দোষে ঋষিরা তাদের ছয় পত্নীকে তাড়িয়ে দিলেন। সেই জন্যে অরুন্ধতী ছাড়া অন্য কোনও স্ত্রী তারা রূপে সপ্তর্ষিমণ্ডলে থাকতে পারে না। এরপরেও আরও অনেক গল্প আছে। কী, কেমন লাগল দাদাবাবুরা?”

দাদাবাবুদের তো এদিকে অবস্থা কাহিল। এ যে মেঘ না চাইতেই জল। এই গল্প আগে কোনওদিন শুনেছিলাম বটে, কিন্তু বেমালুম ভুলে গেছিলাম এতদিনে। ততক্ষণে অরুণাভ তড়িঘড়ি বের করে ফেলেছে ছড়ার কাগজটা।

উড়িষ্যাতে বসে আছেন সাতটি মহাজ্ঞানী,

ছয়জনেতে একলা থাকে একটি মাত্র রানি।

ঠিক। ঋষিদের দ্বারা বিতাড়িত ছয় পত্নী একসঙ্গে থাকেন। তাদের ছয় স্বামীও একা। আর অরুন্ধতি একা থাকেন সপ্তর্ষিমণ্ডলে। সহসা অরুণাভ বলল, “ব্যাগে করে অ্যাস্ট্রোনমি মিনি ভলিউমটা নিয়ে এসেছি। একছুটে নিয়ে আয় তো। একটা ব্যাপার যাচাই করে নেওয়া যাক।”

বিনা বাক্যবায়ে বইটা নিয়ে এসে তার কোলে দিলাম। উত্তেজিত হয়ে ব্যাটা আবার না মাথায় চাঁটি মারে, সেই জন্যে মাথায় হাত চেপে অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু বিপদ এল অন্যদিক থেকে। মিনিট তিনেকের মাথায় পাতা উলটে অরুণাভ আমার পিঠে বিরাশি সিক্কার একটা চড় মেরে বলল, “গাধা, সপ্তর্ষিমণ্ডলকে ইংরেজিতে কী বলে জানিস? উর্সা মেজর (ursa major)। উড়িষ্যাতে মানে, উর্সা কনস্টেলেশনে। বুঝলি বোকচন্দর?”

বুঝলাম যে আমার ভাগ্যে আরও অনেক চাঁটি, চাপড়, কিল অপেক্ষা করছে। ব্যাটা গত দু’দিন ধরে এত কাঠখড় পোড়ানোর সময় তার ইংরেজি বিদ্যা ভুলে গিয়েছিল কেন সেটা জিজ্ঞেস করলে আরেকবার গাল খেতে হবে। তাই পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললাম, “ধর, ধরে রাখ।”

“কী ধরব? তোকে? লেগেছে বুঝি?” বলে অরুণাভ বলাইদাকে ডেকে আমায় ধরতে এগিয়ে এল।

আমি চেঁচিয়ে উঠে বললাম, “ওরে বলদ, আমাকে নয়, ওই ক্লুটা ধরে রাখ। ওটা ধরেই আমাদের এগোতে হবে।”

এদিকে বলাইদা দুই দাদাবাবুর কাণ্ড দেখে ঘাবড়ে গিয়েছে। হাসতে হাসতে সে বলল, “তোমরা গল্প করো, আমি খিচুড়ি বসাতে চললাম।”

আমি টানটান হয়ে বসে গম্ভীর মুখ করে বললাম, “এগুলো খুবই সহজ রে। জেঠু খালি একটু জট পাকিয়ে দিয়েছেন। আরও অনেক বেশি সজাগ থাকতে হবে। যাই হোক, পরের লাইনগুলো কী?”

অরুণাভ পড়ল—

বাম কোণেতে একলা যিনি মনের দুঃখে কাঁদেন,

গম্ভীরাকে সঠিক ভেবে তার সাথে ঘর বাঁধেন।

আমি পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললাম, “বইটা দেখে দেখে সপ্তর্ষিমণ্ডলের ছবিটা আঁক তো। নামগুলো আমি বাংলায় লিখে দিচ্ছি।”

মিনিট পাঁচেক পর আঁকাটা দাঁড়াল এইরকম।

কাগজটা হাতে নিয়ে মনোনিবেশ করলাম। সঙ্গে অ্যাস্ট্রোনমি ভলিউমটা খুলে রাখলাম কাছে। এই হেঁয়ালি বুঝতে হলে ছোটো থেকে বড়ো হওয়া পর্যন্ত যা যা জেনেছি জেঠুর কাছ থেকে মহাকাশ সম্পর্কে, ভালো করে ঝালিয়ে নিতে হবে। বড়ো হওয়ার সাথে সাথে ছোটো ছোটো জিনিসগুলো আমরা নিজের অজান্তেই ভুলে যাই।

খানিকক্ষণ পরেই বলাইদা হাঁক পাড়ল, “খিচুড়ি রেডি।”

আমরাও বইপত্তর বন্ধ করে খাওয়ার ঘরের দিকে রওনা হলাম।

খিচুড়ি খেতে খেতে অরুণাভকে বললাম, “আমার একটু পড়া রিভাইস করতে হবে, বুঝলি। তুই ঘুমিয়ে পড়িস। আমি একটু ছড়ার কাগজটা আর বইটা নিয়ে বসব।”

অরুণাভ একটা আস্ত পাঁপড় মুখে পুরে বলল, “আমিও জেগে থাকব।”

আমি মাথা নেড়ে বললাম, “দু’জনে একসঙ্গে বসলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। তুই বরং জেঠুর শোওয়ার ঘর থেকে একটা গোয়েন্দা গল্প পড়ে ফেল এই ফাঁকে।”

অরুণাভ দোনামনা করে রাজী হয়ে গেল। বুঝলাম, গোয়েন্দাগিরি করার চেয়ে গোয়েন্দা গল্প পড়ার আকর্ষণ অনেক বেশি। পেট পুরে খিচুড়ি খেয়ে আমি একটা লন্ঠনের আলোয় অ্যাস্ট্রোনমির বইটা খুলে বসলাম।

সাত

সকাল থেকেই ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। কখনও বৃষ্টির তেজ বাড়ছে, আবার কখনও কমছে খানিকটা। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। আকাশ জুড়ে ঘন কালো মেঘ আধিপত্য বিস্তার করেছে আজ, সঙ্গে জোরালো হাওয়া। বেশ শীত শীত করছে। সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে এমন দৃশ্য দেখলে কার না ভালো লাগে? যখন গরমে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি কয়েকদিন ধরে।

আমার শুতে বেশ রাত হয়েছিল। অরুণাভর লাফালাফিতে উঠে দেখি, ব্যাটা পেখমবিহীন ময়ূরের মতো নাচ শুরু করেছে। বৃষ্টি দেখে এরকম আহ্লাদ হওয়া আশ্চর্যের কিছুই নয়। বৃষ্টিতেই স্নান সেরে নিলাম দু’জনে। জামাকাপড় বদলে পরোটা-আলুভাজা সহ গরম গরম চা খেতে খেতে বলাইদাকে বললাম, “আজকে দুপুরের কী মেনু, বলাইদা? আবার খিচুড়ি হবে নাকি?”

বলাইদা হেসে বলল, “না দাদাবাবু, খিচুড়ি বিকেলে করে দেব বৃষ্টি চলতে থাকলে। আজকে পুকুরের মাছ আছে, সঙ্গে ডাল, শুকনো করে আলু-পোস্ত আর ঝাল ঝাল মাংসের ঝোল।”

অরুণাভ আর আমি একসঙ্গেই বলে উঠলাম, “তোফা, তোফা! জমে ক্ষীর একেবারে।”

বলাইদা হাসতে হাসতে বেরিয়ে যেতে আমি অরুণাভর দিকে তাকিয়ে বললাম, “কী হে, গোয়েন্দাবাবু! কিছু বুঝছেন, না খেয়েই গুপ্তধন উদ্ধার হবে?”

আমার মুড দেখে অরুণাভ সন্দেহজনক চোখে আমার দিকে তাকাল। তারপর বলল, “কিছু বুঝতে পেরেছিস বুঝি? এত আমোদ কীসের?”

কাল যতটা বুঝতে পেরেছি, সোজাসুজি খুলে বললে মজাটা মাটি হয়ে যাবে। তাই মুখটা আবার জোর করে উদাস করে বললাম, “নাহ্‌, কিছুই বুঝিনি এখনও।” তারপর বললাম, “কালকে অন্ধকার হয়ে গেছিল। তোর সপ্তর্ষির আঁকাটা ভালো করে দেখা হয়নি। এখন আলোতে একটু বের কর তো।”

অরুণাভ কাগজের আঁকাটা বের করে সামনে রাখল। বলল, “এই যে তারামণ্ডলের ছবি।”

জিজ্ঞেস করলাম, “কোনটা কোনদিক রে বাবা? পূর্ব-পশ্চিমভাবে এঁকেছিস বুঝি?”

অরুণাভ বলল, “হ্যাঁ, পূর্বদিকে মরীচি, আর পশ্চিমে ক্রতু।”

ততক্ষণে সংকেত খুলে আমি হাসতে শুরু করেছি। আমাকে হাসতে দেখে অরুণাভ অবাক। বলল, “মাথাখারাপ হয়ে গেল নাকি রে? হাসছিস কেন?”

আমি বললাম, “এই দু’লাইন বুঝতে পেরে গেছি রে। সত্যিই সোজা। এই দেখ কী লেখা—

“বাম কোণেতে একলা যিনি মনের দুঃখে কাঁদেন,

গম্ভীরাকে সঠিক ভেবে তার সাথে ঘর বাঁধেন।

“এখানে ঘর বাঁধেন মানে আবার সন্ধি করতে হবে। কিন্তু কোন দু’জনের? গম্ভীরার সাথে যিনি ঘর বাঁধেন, মানে যিনি সপ্তর্ষিমণ্ডলের বাম কোণে আছেন।”

অরুণাভ মন দিয়ে দেখে বলল, “বাম কোণে তো আছেন ক্রতু। তার সঙ্গে গম্ভীরার সন্ধি কী রে? গম্ভীরা বাবাজি এখানে এলেন কোত্থেকে?”

এই সূত্রের সমাধান কাল রাতেই করে রেখেছি। তাই মনে মনে মুচকি হেসে কপট গাম্ভীর্যে অরুণাভকে বললাম, “গম্ভীর কথাটার ইংরেজিটা কী, স্যার?”

অরুণাভ চোখ ছোটো করে বলল, “সিরিয়াস। কেন?”

“ঠিক। এবার দ্যাখ, সিরিয়াস বলে মহাকাশে যে তারকাটা আছে সেটা সপ্তর্ষিমণ্ডলের কাছাকাছিই দেখা যায়। আর সিরিয়াস মানে গম্ভীরাকে সঠিক ভাবার কারণ হল, এই তারকাটা মহাকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা। ফার্স্ট বয়ও বলতে পারিস। তার সঙ্গে সন্ধি করলে আখেরে লাভই হবে। এবার তুই বইটা দেখে বল তো সিরিয়াস তারকাটা কোন মণ্ডলে আছে।”

অরুণাভ উত্তেজিত হয়ে উঠেছে আবার। বই দেখে দেখে ও বলল, “ক্যানিস মেজর (canis major)।”

আমি বললাম, “ঠিক। এই মণ্ডলটার কথা বাংলায় নেই। কিন্তু সিরিয়াসের বাংলা আছে। বাংলায় সিরিয়াসের নাম হল ‘মৃগব্যাধ’। এইবার তুই সন্ধি করে বল সঠিক উত্তর কী।”

অরুণাভ হিসেব করে বলল, “বাম পাশের ঋষির সঙ্গে সন্ধি করতে হবে মৃগব্যাধের। মানে ক্রতু আর মৃগব্যাধ তো? যাচ্চলে! ক্রতু + মৃগব্যাধ… কোনও মানেই তো বেরোচ্ছে না!”

এই মুহূর্তটার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম ভিতরে ভিতরে। এবার আমার পালা। অরুণাভর পাওনা বিরাশি সিক্কার চড়টা ওর পিঠে বসিয়ে দিয়ে বললাম, “গাধা। কারণ, সপ্তর্ষিমণ্ডলের স্কেচটা তুই ভুল এঁকেছিস।”

অরুণাভ ককিয়ে উঠল। তারপর খচে লাল হয়ে বলল, “কেন? ভুল কোথায়?”

আমি তার খাতাটা হাতে নিয়ে বললাম, “এই দ্যাখ, ভারত, অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকা যদি তুই ম্যাপে দেখতে চাস, তাহলে দিকগুলো এরকম থাকে। পূর্ব থাকে ডানদিকে, পশ্চিম বাঁদিকে। এইরকম—

“কিন্তু মাথার ওপর চোখ তুলে মহাকাশ দেখতে গেলে দিকগুলো ওরকম করে আঁকা হয় না ম্যাপে। তখন পশ্চিম চলে যায় পূর্বদিকে আর পূর্ব চলে যায় পশ্চিমদিকে। এইরকম—

“জেঠু আমাদের ছোটো থাকতে অনেকবার বলেছেন। ভুলে মেরে দিয়েছিস। তাহলে এইবার সপ্তর্ষিমণ্ডলের স্কেচটা দাঁড়াবে এইরকম। তোর আঁকার উলটো—

“এইবার সন্ধি কর। সবচেয়ে বাম কোণে আছে যেই ঋষি মরীচি, তিনি ঘর বেঁধেছেন মৃগব্যাধ ওরফে গম্ভীরার সাথে।”

খাতার নতুন পাতায় বড়ো বড়ো করে লিখলাম, মরীচি + মৃগব্যাধ।

অরুণাভ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। বুঝলাম, ওষুধের ডোজ বেশি হয়ে গেছে। ব্যাটাকে খোলসা করে না বললে আবার না কিল-চড় মেরে বসে। ওর হাত ধরে উঠিয়ে দিয়ে বললাম, “চল, একটু ঘুরে আসা যাক। তোকে একটা জিনিস দেখাব।”

কোনও কথা না বলে সে উঠে পড়ল। ঘরের কোণে রাখা আদ্যিকালের বিরাট ছাতাটা নিয়ে আমি অরুণাভকে নিয়ে নেমে গেলাম উঠোনে। তারপর বাগান পেরিয়ে গেটের কাছে গিয়ে বললাম, “ফলকে কী লেখা আছে, গোয়েন্দাবাবু?”

অরুণাভর চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল। অস্ফুটে বলে উঠল, “মৃগমরীচিকা।”

“ঠিক। মৃগব্যাধ এবং মরীচি সন্ধি করে মৃগমরীচি, তার থেকে মৃগমরীচিকা। যেখানে জেঠু ঘর বেঁধেছিলেন। যদি গুপ্তধন বলে সত্যিই কিছু থেকে থাকে, আমার বিশ্বাস তা এই বাড়িতেই আছে।”

কয়েক মুহূর্ত অরুণাভ কোনও কথা বলল না। তারপর লাফিয়ে উঠে ‘সাবাশ’ বলে চিৎকার করে উঠল। পরমুহূর্তেই আনন্দের আতিশয্যের ফলে আবার আমার পিঠে তার থাবড়া এসে পড়ল। আমার হাত থেকে ছাতাটা খসে গেল।

আট

বৃষ্টি থামার কোনও লক্ষণ নেই। দুপুরে জব্বর খেয়ে আমরা একটা ভাতঘুম দিয়ে নিলাম। একটি ছড়া যে উদ্ধার হয়েছে, তারই পুরস্কার নিজেদের দিলাম আর কী। বিকেলবেলায় ঘুম থেকে উঠে দেখি বৃষ্টি তখনও হয়ে চলেছে। ইতিমধ্যে ভালোই ঠাণ্ডা পড়ে গেছে। একটা শাল গায়ে দিয়ে চা নিয়ে বসলাম দু’জনেই। বলাইদাও আমাদের সঙ্গে এসে বসেছে একটা মোড়া নিয়ে এসে। বনজঙ্গলের ওপর বৃষ্টির জল পড়ে জায়গাটার রূপ খুলে গেছে। সজল সবুজের প্রাচুর্যে চোখও আরাম পাচ্ছে আমাদের, তার মধ্যে মধ্যে পুকুরের কাছ থেকে শুনতে পাচ্ছি ব্যাঙের গান। ঘন বনের ভিতর থেকে ঝিঁঝিঁর ডাকও চলছে ক্রমাগত। বিকেলের আলো প্রায় মরে এসেছে, তার ওপর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। এরকম অবস্থায় মাথা খাটাতে আর ভালো লাগে না। তা অঙ্ক হোক বা গুপ্তধনের সংকেত। চুপ করে বসে দু’জনেই বৃষ্টির শব্দ শুনতে লাগলাম।

একসময় অন্ধকার নেমে এল। বৃষ্টি খানিকটা ধরে এসেছে। বলাইদা আমাদের উদ্দেশ্য করে আঙুল তুলে বলল, “ওই দেখো, চাঁদ উঠছে আকাশে।”

তাকিয়ে দেখলাম, গাছপালার ফাঁক দিয়ে মেঘের কোলে আবছা চাঁদের অবয়ব দেখা যাচ্ছে। মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলাম সেইদিকে। বলাইদা আমাদের বলল, “এই চাঁদ নিয়ে যে বড়ো দাদাবাবু কত গল্প বলতেন! জানো তো, চাঁদের সাতাশ জন বউ। তাদের নামের বাহারও সেরকম। বড়ো দাদাবাবু এই বাড়িতে যত ঘর আছে, তাদের নাম রেখেছিলেন চাঁদের বউদের নামে।”

এই খবরটা অরুণাভরও জানা ছিল না। সে জিজ্ঞেস করল, “বলাইদা, এটা তো জানতাম না! আগে তো এরকম কিছু শুনিনি।”

বলাইদা বলল, “তুমি ছোটো দাদাবাবু কতদিন আসনি এখানে। প্রায় ছয়-সাত বছর। স্কুল-কলেজের পড়াশুনা নিয়েই ব্যস্ত ছিলে। বড়ো দাদাবাবু মারা যাওয়ার বছর চারেক আগে তিনি প্রত্যেকটা ঘরের মাথায় ওই নামের ফলক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এখানে তো ইলেকট্রিক আলো আসেনি এখনও, কাল সকালে দেখো। দেখতে পাবে।”

আমরা ঠিক করলাম, কাল সকালে জলখাবার খেয়ে ঘরগুলো ঘুরে ঘুরে দেখব। সেদিন আর এ নিয়ে বিশেষ কথাবার্তা হল না।

আবার টুপটাপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে বাইরে। একসময় বলাইদা ভূতের গল্প বলতে শুরু করল। সেই গল্প এমনই জমে গেল যে রাতে খেয়ে শুতে আমাদের বারোটা বেজে গেল। বিছানায় শুতেই একঘুমে রাত কাবার হয়ে গেল।

নয়

পরের দিন সকালে উঠে দেখি অরুণাভ স্নান-টান সেরে একেবারে তৈরি। আমাকে দেখে সে তাড়া দিয়ে বলল, “ওঠ ওঠ, অনেক কাজ আছে। কাল দুপুরের পর থেকে কোনও কাজই হয়নি। আজকে বাকি ছড়াটার মানে বের করতে হবে।”

আমি হাই তুলে বললাম, “তার আগে ঘরগুলো দেখতে হবে রে। এই বাড়িতেই যখন গুপ্তধন থাকার কথা, ঘরগুলো দেখলে বাড়ির প্ল্যানটা মাথায় বসে যাবে।”

স্নান, জলখাবার সেরে বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। চারতলা বিশাল বাড়ি। প্রত্যেকটা তলায় নয়টা করে ছোটোবড়ো ঘর, মোট সাতাশটা। কলতলা, রান্নাঘরগুলো অবশ্য আলাদা। বলাইদা ঠিকই বলেছিল, ঘরগুলোর ওপরে তামার ফলকে নাম খোদাই করে লেখা। অরুণাভ খাতা খুলে নামগুলো লিখতে লিখতে চলল। চাঁদের সাতাশটা বৌয়ের নাম জানতেই আমাদের ঘন্টা দুয়েক কেটে গেল। একসময় চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বললাম, “লিখেছিস সবক’টা? এবার পড় দেখি।”

অরুণাভ পড়তে লাগল, “অশ্বিনী, ভরনী, কৃত্তিকা, রোহিণী, মৃগশিরা, আর্দ্রা, পুনর্বসু, পুষ্যা, অশ্লেষা, মঘা, পূর্ব ফাল্গুনী, উত্তর ফাল্গুনী, হস্তা, চিত্রা, স্বাতী, বিশাখা, অনুরাধা, জ্যেষ্ঠা, মূলা, পূর্ব আষাঢ়া, উত্তর আষাঢ়া, শ্রবণা, ধনিষ্ঠা, শতভিষা, পূর্ব ভাদ্রপদা, উত্তর ভাদ্রপদা আর রেবতী।”

আমি একটু চিন্তা করে বললাম, “জেঠু বাড়ির ঘরগুলোর নাম এদের নাম রেখেছিলেন কেন?”

অরুণাভ ভুরু কুঁচকে বলল, “তোকে বলেছি না গোয়েন্দা গল্পের সংকেত কোনও স্থান-বিশেষের দিকে নির্দেশ করে? আমরা প্রথম সংকেত থেকে একটা বইয়ের নাম পেলাম। সেখান থেকে পেলাম এই বাড়ির নাম। এবার এই বাড়ির কোনও একটা ঘরে আমাদের পৌঁছতে হবে।”

“বটে। কিন্তু সেই ঘরটা খুঁজে পাব কী করে? পরের লাইনগুলো কী লেখা আছে সংকেতে?”

আবার বের করা হল লেখাটি—
আঁধার রাতে একলা চেয়ে নেইকো মানুষজন,
প্রথম সখার কথাই শুধু ভাবছে সারাক্ষণ।
ইচ্ছে করে তারই কাছে ছুটে চলে যায়,
সুখের ছোঁয়ার চাবিকাঠি পেতে যদি চায়।

অরুণাভ বলল, “এই দেখ, পরিষ্কার চাঁদের কথা বলছে জেঠু, আঁধার রাতে একলা চেয়ে…”
আমি কিছুক্ষণ মাথা চুলকে বললাম, “সে তো হল, তারপর?”
অরুণাভ বলল, “একটু ভাবা যাক।”
তারপর সে চোখ বুজে শুয়ে পড়ল সটান। ভাবছে না ঘুমাচ্ছে আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। আমিও অ্যাস্ট্রোনমির বইটা নাড়াচাড়া করতে শুরু করলাম চাঁদের সম্পর্কে জানার জন্যে।

মহাকাশের হিসেব মতো ধরতে গেলে, তারকাদের পটভূমিতে চাঁদের গতিপথ পূর্ব থেকে পশ্চিম নয়, বরং পশ্চিম থেকে পূর্ব। চাঁদ তার প্রতিটা তারকার পটভূমিতে পশ্চিম থেকে পূর্বে স্থান বদলায়। সাতাশ দিন পর আবার সেই একই স্থানে ফিরে আসে প্রথম তারকার কাছে যেখান থেকে সে যাত্রা শুরু করেছিল। সাতাশ দিনের প্রত্যেকদিন সে একটি বিশেষ নক্ষত্রের পটভূমিতে। এই সাতাশটি নক্ষত্রই তার সাতাশটি বউ। চাঁদের পথের ঋতু বদলেরও বিশেষ ভূমিকা আছে। একটা কলম তুলে ছোটো ছোটো কয়েকটা নোট নিচ্ছিলাম। আচমকা বিদ্যুচ্চমকের মতন ব্যাপারটা আমার কাছে জলের মতো সোজা হয়ে গেল। অরুণাভকে ঠ্যালা মারতেই সে ধড়মড় করে উঠে বসে বলল, “হয়ে গেছে?”

আমি তাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললাম। “জানিস তো, মাস আর ঋতু ঠিক হয় চাঁদের গতিপথ দিয়ে। প্রতিমাসে চাঁদ একেকটা নক্ষত্রের পটভূমিতে পূর্ণিমা পালন করে। এই নে খাতা, লিখে রাখ নোটগুলো।

“ধর যদি আশ্বিন মাস হয়, পূর্ণিমা পালন হবে অশ্বিনী নক্ষত্রে। কার্তিক মাস হলে চাঁদ থাকবে কৃত্তিকার কাছে। বুঝেছিস? এইবার তুই বল দেখি, বিশাখা নক্ষত্রে পূর্ণিমা পড়লে কোন মাস হবে?”

“বৈশাখ।” অরুণাভ তুড়ি মেরে বলল।

“ঠিক। এই হল কনসেপ্ট। ধাঁধার সমাধানও এখানেই। তার আগে এই চার্টটা দেখে রাখতে হবে। প্রত্যেক দুই মাসে একটা করে ঋতু দেখ লিখে রেখেছি।” বলে আমার লেখাটা ওর হাতে দিলাম।

১) বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ (গ্রীষ্ম)
২) আষাঢ়-শ্রাবণ (বর্ষা)
৩) ভাদ্র-আশ্বিন (শরৎ)
৪) কার্তিক-অগ্রহায়ণ (হেমন্ত)
৫) পৌষ-মাঘ (শীত)
৬) ফাল্গুন-চৈত্র (বসন্ত)
“এইবার আবার লাইনগুলো পড়া যাক। দেখেই বুঝতে পারবি জলের মতো সোজা।”
অরুণাভ জোরে জোরে পড়ল—

আঁধার রাতে একলা চেয়ে নেইকো মানুষজন,
প্রথম সখার কথাই শুধু ভাবছে সারাক্ষণ।
ইচ্ছে করে তারই কাছে ছুটে চলে যায়,
সুখের ছোঁয়ার চাবিকাঠি পেতে যদি চায়।

তারপর ভেবে বলল, “প্রথম লাইনে চাঁদের কথা বলা হয়েছে। এখন চাঁদ তার প্রথম সখার কথা ভাবছে আর তার কাছেই চলে যেতে চাইছে। এ তো ছেলেভোলানো ছড়া রে! চাঁদের পথের প্রথম নক্ষত্র মানে অশ্বিনীর কথা বলছে।”
“কারেক্ট।” আমি বললাম, “বিদেশি এরিস (aries) মণ্ডলে থাকা অশ্বিনী নক্ষত্র। সুখের চাবিকাঠি তার কাছেই পাওয়া যাবে।”
অরুণাভর চোখ চকচক করে উঠল। গলা নামিয়ে সে বলল, “কোন ঘরটার নাম অশ্বিনী জানিস এই বাড়িতে?”
“কোন ঘরটা?”
অরুণাভ বাচ্চা ছেলের মতো করে বলল, “ওই যে, জেঠুর স্টাডি রুম। বই আর অ্যান্টিকে ঠাসা। এইবার গুপ্তধন পাবই পাব।” বলেই অরুণাভ সিঁড়ির দিকে ছুটল। আমিও ছুটলুম তার পিছনে।

দশ

এখন বাজে সন্ধে ছ’টা। সারা দুপুর জেঠুর স্টাডি রুমে তল্লাশি চালিয়ে আমরা হাঁফিয়ে পড়েছি। বলাইদাকে সবটাই খুলে বলা হয়েছে। তার সাহায্য ছাড়া এতদূর অবধি আসাও সম্ভব ছিল না। স্টাডি রুমটা নিয়মিত দেখাশুনা করে বলাইদা। তাই সবকিছুই ঝকঝকে তকতকে। অনেক মূল্যবান বই, মূর্তি, মডেল রাখা আছে সেখানে। কিন্তু আসল গুপ্তধন পেতে হলে ধাঁধার সমাধান করা ছাড়া উপায় নেই। প্রায় চার-পাঁচ ঘন্টা ধরে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে আমরা তিনজনেই ক্লান্ত। অরুণাভর সকালের অতি উৎসাহ ঝিমিয়ে এসেছে আবার। আমার কিন্তু মনে একটা আত্মবিশ্বাস এসেছে। কাল থেকে মাথা মোটামুটি ঠিক পথেই চলছে যখন আরেকটু সময় দিলে ব্যাপারটার এপার ওপার হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। শুধু শুধু লাফালাফি না করে আমি বরং অ্যাস্ট্রোনমির বইটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ার চেষ্টা করছি। পড়তে পড়তে মনে পড়ে যাচ্ছে ছেলেবেলার অনেক কথা—অনেক মহাকাশের ছোটো ছোটো গল্প, খেলাচ্ছলে জেঠুর কাছ থেকে শুনেছিলাম সেই সময়ে। কবে যে স্মৃতি থেকে সব আবছা হয়ে গিয়েছিল! সেই কথাগুলো নতুন করে ফিরে আসছে স্মৃতিতে। এই অনুভবও কম সুখের নয়।

বলাইদা আজকে চায়ের বদলে কফি করেছে, সঙ্গে গ্রামের দোকানের কেক। কফি খেতে খেতে নিজের মনেই পরের লাইনগুলো ভাবছিলাম।

সাত ভাই চম্পা একসাথে যে বসে,

লিখল যে বই ডুবল সবাই সেই বইয়েরই রসে।

কী মাথামুণ্ডু বলা হচ্ছে এখানে অনেক ভেবেও বুঝতে পারিনি। সাত ভাই চম্পা বলতে কি আবার সপ্তর্ষিমণ্ডলের কথা বলতে চাইছেন নাকি জেঠু?

এমন সময় অরুণাভ কিছু না ভেবেই বলাইদাকে জিজ্ঞেস করে বসল, “ও বলাইদা, জেঠু তোমাকে সাত ভাই চম্পা বলে কোনও তারার গল্প বলেনি?”

সেই প্রশ্ন শুনে তো বলাইদার মুখে হাসি খেলে গেল। মিচকে হেসে বলল, “বলেননি আবার! কিন্তু ওটা তো ডাকনাম গো দাদাবাবু। সেদিন ওই যে সাত ঋষির কথা বললাম! ঋষিরা যে ছয়জন পত্নীকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই ছয়জন ঋষিপত্নী একসঙ্গে থাকেন কৃত্তিকা মণ্ডলে। কিন্তু ওই যন্তর দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, ওই মণ্ডলে আরেকটা ছোট্ট তারা আছে। তাই বাংলায় অনেকে কৃত্তিকাকে সাত ভাই চম্পা বলে ডাকে।”

আমি চমৎকৃত হয়ে তাকিয়ে রইলাম বলাইদার দিকে। অরুণাভ দেখি ততক্ষণে একটা আস্ত কেক বলাইদার মুখে পুরে দিয়েছে। তারপর জড়িয়ে ধরে বলতে শুরু করেছে, “তুমি জিনিয়াস, বলাইদা! এবার থেকে তুমিই আমাদের আকাশ চিনিয়ে দেবে।”

বলাইদা কোনওরকমে কেকটার সদগতি করে লজ্জা পেয়ে বলল, “ধ্যাত! আমি কি ওইসব জানি নাকি? যা ওই কয়েকটা গল্প বড়ো দাদাবাবুর কাছ থেকে শোনা। তোমরা দাঁড়াও, আমি একটা লন্ঠন দিয়ে যাই।”

বলাইদা লন্ঠন দিতেই আমরা লন্ঠন হাতে নিয়ে আবার জেঠুর স্টাডির দিকে ছুটলাম। দরজা খুলে টেবিলের ওপর লন্ঠনটা রাখলাম। একটা হালকা আলোর আভা ছড়িয়ে গেল ঘরটার ভিতরে। অরুণাভ উত্তেজনা সংবরণ করে বলল, “খালি লন্ঠনে হবে না রে, একটা টর্চ নিয়ে আসি দাঁড়া।”

সে ছুটে বেরিয়ে গেল। আমি হাতের চেটো থেকে লেখাটা বের করে আলোর কাছে রেখে ভাবতে শুরু করলাম। প্যারাগ্রাফের দ্বিতীয় অংশটা কীরকম একটা আভাস দিচ্ছে। খানিকক্ষণ পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।

অরুণাভ ফিরে এল মিনিট পাঁচেকের মধ্যে। টর্চ জ্বেলে সে বলল, “মাথা খুলে গেছে রে, শমী। সাত ভাই চম্পা হল কৃত্তিকা। তারা যে বই লিখল সবাই সেই বইয়ের রসে ডুবে গেল। ওই যে বাংলা বইয়ের তাকে যত্ন করে বাঁধানো রাখা আছে সেই বই—কৃত্তিবাস রামায়ণ। এবার দেখবি বইটা খুলতেই গুচ্ছের নতুন হেঁয়ালির কাগজ বেরোবে।”

আমরা তাক থেকে বইটা পেড়ে ভয়ে ভয়ে আলোর কাছে এনে খুললাম। কিন্তু না। ভিতরে কিছুই নেই। সাধারণ একটা বই বলেই মনে হচ্ছে। বেশ কয়েকবার উলটেপালটে দেখা হল, কিছুই নেই। অরুণাভ হতাশ হয়ে চেয়ারে বসে পড়েছে। আমি বললাম, “নিশ্চয়ই কোনও ভুল হয়েছে। আচ্ছা, পরের লাইনগুলো পড়ে দেখি। একটা ক্লু পেয়েছি মনে হচ্ছে।”

“আর ক্লু! সব ধাপ্পা। জেঠু আমাদের সঙ্গে মজা করে গেছে শুধু।” অরুণাভ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।

ওর কথায় কান না দিয়ে আমি পরের লাইনগুলো জোরে জোরে পড়লাম—

জোছনা রাতে ভেড়ায় চড়ে পরে সাদা জামা,

সাত রাজার ধন মানিক যেথায় রবিমামা দেয় হামা।

“এখানে রবিমামা বলতে নিশ্চয়ই সূর্যকে বোঝানো হচ্ছে। এই লাইনদুটো শুনে তোর প্রথমেই কী মনে হচ্ছে?”

অরুণাভ বিরক্ত হয়ে বলল, “ধুস, কী পচা যাচ্ছেতাই ছড়া রে বাবা! জোছনা রাতে ভেড়ায় চড়ে! ম্যাগো! শিশুসুলভ কথা।”

আমি বলে উঠলাম, “একদম ঠিক বলেছিস। জোছনা মানে তো চাঁদের কথা। কিন্তু ভেড়া কথাটা আমাদের কানে এতই বেমানান লাগছে যে ওটা আমি বদলে মেষ করে দিচ্ছি ভালো বাংলায়। মানে দাঁড়াল যে জোছনা মানে পূর্ণিমার রাতে। মেষ পরে সাদা জামা, মানে চাঁদ আছে মেষ রাশিতে? পরের লাইনে বলা হয়েছে সাত রাজার ধন মানিক সেখানে আছে যেখানে রবিমামা, মানে সূর্য আছে? কী বুঝলি? কিছু বুঝলি?”

অরুণাভ মাথা নাড়ল। আমি বললাম, “এটা একটা প্রশ্ন? পূর্ণিমা রাতে চাঁদ যদি মেষ রাশিতে থাকবে তাহলে সূর্য কোন রাশিতে থাকবে?”

অরুণাভ থতমত খেয়ে বলল, “তার মানে?”

“মানে খুব কঠিন নয়, তবে রাশির কনসেপ্টটা জানা চাই। তোকে সংক্ষেপে বলছি। চাঁদ যেমন নক্ষত্রের পটভূমিতে পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে যায় সাতাশ দিন ধরে, সূর্যও তেমন তারামণ্ডলদের পটভূমিতে পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে যায় তিনশো পঁয়ষট্টি দিন ধরে, মানে একবছর বা বারো মাস ধরে। প্রতিমাসে সূর্য একেকটা তারামণ্ডলের পটভূমিতে থাকে। এই বারোটি তারামণ্ডল হল বারোটি রাশি, আর একবছরের এই পথ হল ক্রান্তিবৃত্ত বা ecliptic।

“কিন্তু সূর্যের আলোয় এই দূরদূরান্তে থাকা তারামণ্ডলগুলো দেখাই যায় না। তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একটা পথ বের করেছেন। সেটা হল পূর্ণিমার সময় চাঁদ যেই রাশিতে থাকবে, সূর্য থাকবে তার চেয়ে সাত রাশি পর। মানে সোজাসুজি দেখতে গেলে পূর্ণিমার রাতে চাঁদ যদি মেষ রাশিতে থাকবে, জ্যোতির্বিজ্ঞান হিসেবে সূর্য থাকবে তুলা রাশিতে।”

অরুণাভ আমার দিকে এগিয়ে এল নিঃশব্দে। আমি একটা চড়, কিল অথবা গাঁট্টার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু অরুণাভ সেসব কিছুই না করে আমার কাঁধে একটা হাত রাখল। “কী হল?” বলতেই আমার নজরে পড়ল, অরুণাভ আঙুল তুলে ঘরের দক্ষিণদিকে নির্দেশ করছে। সেখানে রাখা আছে একটা ব্যালেন্স বা তুলা রাশির বিদেশি মডেল।

এগারো

মডেলটা বেশ বড়ো আর ভারী। আমরা টর্চ জ্বেলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আলো ফেলে দেখলাম চারদিকে। দেখে মনে হচ্ছে, জমির সঙ্গে লাগানো আছে সিমেন্ট দিয়ে। কৃত্তিবাসী রামায়ণটা অরুণাভর হাতে ধরা ছিল। কী মনে হতে সেটা চেয়ে নিয়ে আমি বইটা দাঁড়িপাল্লার ডানদিকের পাল্লায় রাখলাম। পাল্লা নড়ল না। স্পষ্ট এটা দাঁড়িপাল্লার মতন ওজনে ওঠানামা করে না। মডেলটা ব্যালেন্স হিসেবে কাজ করছে না যখন তখন নিশ্চয়ই অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে। অরুণাভ কিছু না ভেবেই বইটা তুলে একবার বাঁদিকের পাল্লায় রাখতেই একটা ঘড়ঘড় শব্দে দেখি পাল্লার নিচের দিকের একটা চৌকো ঢাকনা সরে গেছে। উত্তেজনায় ঘামতে শুরু করেছি দু’জনে। অরুণাভ চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও নিজেই নিজের মুখ চেপে ধরেছে। আমরা একে অপরের দিকে তাকালাম। বুক ধড়ফড় করছে। চোখের পলক অবধি পড়ছে না। কিছু ভেবে অরুণাভ বইটা তুলে নিতেই ঢাকনাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। আমি দুয়েকটা অন্য বই এনে ওই পাল্লায় রেখে দেখলাম, কোনও হেলদোল নেই। অরুণাভ অস্ফুটে বলে উঠল, “ওয়েট সেনসিটিভ ভল্ট। ওই বইটার ওজনের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। অন্য কোনও ওজন রাখলে ঢাকনা খুলবে না।”

আবার কৃত্তিবাসী রামায়ণ রাখতেই ঢাকনা খুলে গেল। টর্চের আলোয় উঁকি মেরে দেখলাম দু’জনে, ভিতরে একটা কম্বিনেশন লক। ইংরেজিতে A থেকে Z অবধি লেখা আছে। সঠিক বোতাম টিপলে ভল্ট খুলবে, নচেৎ নয়। অরুণাভ আমার হাত চেপে ধরেছে। আমি নিঃশব্দে কাগজ খুলে পড়লাম—

ইদিক সিদিক হেথায় সেথায় কোথাও যায় না সে,

এখান সেখান যেখান থেখান দৃষ্টিগোচর যে।

কোনও সন্দেহ নেই। অরুণাভকে বললাম, “তোকে যদি প্রথমেই বাংলায় একটা তারার নাম জিজ্ঞেস করা হয়, তোর কী মনে পড়ে?”

“ধ্রুবতারা।” ফিসফিস করে উত্তর দিল অরুণাভ।

আমি বললাম, “কেন জানিস? কেননা সে আমাদের চোখের সামনেই থাকে সবসময়। ধ্রুবতারা স্থির, ধ্রুব মানে যার কোনও গতি নেই। যেকোনও জায়গা থেকে উত্তরদিকের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় তাকালেই তাকে দেখা যায়। লোককে দিক ঠিক করতে সে সাহায্য করে আসছে যুগ যুগ ধরে।”

নিঃশ্বাস বন্ধ করে বোতাম টিপতে লাগলাম কম্বিনেশন লকে। DHRUVTARA… কিন্তু না, খুলছে না তো! ওহো, ভুল হয়ে গেছে।

অরুণাভর মুখে অনেকক্ষণ পর হাসি দেখা গেল। তার দিকে চাইতেই সে ছোট্ট করে মাথায় একটা চাঁটি মেরে কিছু না জিজ্ঞেস করতেই বলল, “POLESTAR।”

আবার বোতাম টিপতে লাগলাম।  P O L E S T A R টেপামাত্র আমাদের চমকে দিয়ে সামনের বইয়ের আলমারিটা ঘড়ঘড় শব্দে একদিকে সরে গেল। আমি আর অরুণাভ ভিতরে তাকাতেই ভয় পাচ্ছি। সত্যি তাহলে গুপ্তধন! হিরে, জহরত, মুক্তো, সোনাদানা… না আরও দামি কিছু? ধীরে ধীরে আমরা টর্চের আলো ফেলে গুপ্ত চেম্বারটার দিকে এগিয়ে গেলাম।

বারো

চেম্বারটা ছোটো। কিন্তু সেখানে সোনাদানা, টাকাপয়সা বা অন্য কোনও দামি জিনিসের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। আমি আর অরুণাভ অবাক হয়ে দেখলাম, জায়গাটা ভর্তি নানাধরনের টেলিস্কোপ দিয়ে। গুনে দেখলাম মোট আঠারোটি টেলিস্কোপ সযত্নে রক্ষিত আছে সেখানে। ঘরের মাঝখানের টেলিস্কোপের চারপাশে একটা কাচের আবরণ। পাশে গিয়ে দেখলাম, প্রতিটি টেলিস্কোপের সঙ্গে তার মডেল নম্বর আর ইতিহাস লিখে রাখা আছে। কোনও কোনওটা বেশ পুরনো মনে হচ্ছে দেখে। অরুণাভও এই কাণ্ড দেখে হচকচিয়ে গেছে। সে অস্ফুটে বলল, “এই কি জেঠুর গুপ্তধন?”

আমি ভেবে দেখলাম, সব সূত্র সেই দিকেই নির্দেশ করছে। এই জন্যেই হেঁয়ালিগুলো এমন লোকের জন্যে রেখেছিলেন যারা মহাকাশবিজ্ঞানে আগ্রহী, যারা এই টেলিস্কোপগুলোর মূল্য বুঝতে পারবে। শেষের লাইনদুটো পড়লেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে এখন।

সঠিক ভেবে সঠিকভাবে বুঝবে যেই জন,

সৃষ্টি বোঝার দৃষ্টি পাবে, পাবে গুপ্তধন।

সৃষ্টি বোঝার দৃষ্টি, এখন কোনও সন্দেহ নেই। টেলিস্কোপের মাধ্যমেই পাওয়া যায় সেই দৃষ্টি। অরুণাভকে সেকথা বলতে গিয়ে দেখি সে গিয়ে দাঁড়িয়েছে কাচের বাক্সের কাছে। আমাকে ডেকে সে দেখাল, কাচের বাক্সের মধ্যে একটা নোটবুক রাখা আছে জেঠুর। সাবধানে সেই নোটবুকটা বের করে পড়তে শুরু করলাম।

তেরো

কোনওদিন স্বপ্নেও ভাবিনি জীবনে এরকম কোনও কিছুর মুখোমুখি হব। ছোটোবেলা থেকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম আকাশের দিকে, বিস্ময়ে ঘোর লেগে যেত সূর্য, তারা, গ্রহ, উপগ্রহদের কথা শুনে। তারপর জেঠুর সঙ্গে আলাপ। তাঁর সঙ্গে কথা বলে আরও অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে উঠলাম মহাকাশবিজ্ঞান সম্পর্কে। পড়াশুনার জন্যে মাঝখানের কয়েকবছর সেই ভালোবাসার জগত থেকে খানিকটা ব্যবধান থাকলেও ভবিষ্যৎ এই নিয়ে গড়ে তোলার স্বপ্নই দেখে এসেছি চিরকাল। মহাকাশের বিশালতার মাহাত্ম্য খানিকটা বুঝতে পেরেছি বলেই হয়তো এই সৌভাগ্য হল আজ। জেঠুর ছোটো নোটবুক পড়ে আমরা যা জানতে পেরেছি সেরকম ঘটনা বাস্তব জীবনে বিরল। সংক্ষেপে সেই কথা লিপিবদ্ধ করে রাখছি।

সারাজীবন ধরে অরুণাভর জেঠু নানাধরনের, নানা দেশের টেলিস্কোপ সংগ্রহ করেছেন। কখনও নিলাম থেকে কিনেছেন, কখনও কোনও লোকের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে। আঠারোটি টেলিস্কোপ যা আমরা তার গুপ্ত চেম্বারে দেখেছি, অ্যান্টিক হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে তার মূল্য তিন কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু টাকাটা এখানে বড়ো ব্যাপার নয়। এই গল্প আসল মোড় নেয় যখন জেঠু লন্ডনে একটা নিলামে যোগ দিতে যান। সেখানে তার সঙ্গে একজন লোকের পরিচয় হয়। লোকটা জেঠুকে বলে তার সংগ্রহে পৃথিবীর প্রথম তৈরি করা টেলিস্কোপের রেপ্লিকা মডেল আছে। জেঠু প্রথমে পাত্তা দেননি। রেপ্লিকা বা নামিদামি টেলিস্কোপের নকল মডেল নিলামে পাওয়াই যায়, সেরকম কিছু দুর্মূল্য জিনিস নয়। গ্যালিলিওর তৈরি টেলিস্কোপের রেপ্লিকা জেঠু আগেই সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু তারপর লোকটা তাঁকে বলে, এই টেলিস্কোপ নাকি আরও পুরনো। আসলে প্রথম টেলিস্কোপ তৈরি করা হয়েছিল নেদারল্যান্ডসে। হান্স লিপের্সী আর জাকারিযাস জানসেন বলে দুই চশমার কারিগর পৃথিবীর প্রথম অপটিক্যাল টেলিস্কোপ তৈরি করেন। এইগুলো ছিল রিফ্র্যাকটিভ বা প্রতিসরণমূলক টেলিস্কোপ যাতে কনকেভ আইপিস অর্থাৎ অবতল চশমার কাঁচ ব্যবহার করা হয়েছিল। জেঠু এই বিষয়ে বেশি কিছু জানতেন না। খোঁজখবর করে জানতে পারেন, লোকটার কথা সত্যি। লিপের্সী আর জানসেনের নকশা দেখেই গ্যালিলিও প্রথম টেলিস্কোপ তৈরি করেন এবং ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী করে তোলেন সেই দৃষ্টিযন্ত্র। জেঠু আরও জানতে পারেন যে লিপের্সী আর জানসেনের তৈরি প্রথম মডেলের মাত্র তিনটে রেপ্লিকা আছে সারা পৃথিবীতে। তার একটা রাশিয়াতে, একটা আর্জেন্টিনাতে আর আরেকটা রাখা ছিল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবজার্ভেটরিতে। কিছুদিন আগেই কেমব্রিজ থেকে রহস্যজনকভাবে সেই রেপ্লিকা মডেলটি নিখোঁজ হয়ে যায়। জেঠু স্পষ্ট বুঝতে পারেন, লোকটা তাঁকে যা গছাতে চাইছে সেটা আসলে চোরাইমাল। অন্যায়ভাবে চোরাই অ্যান্টিক কেনা অপরাধ। কিন্তু তা সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত লোভ সংবরণ না করতে পেরে জেঠু মডেলটা কিনে নেন। পৃথিবীর প্রথম তৈরি টেলিস্কোপের মডেল।

শেষ জীবনে এসে জেঠু যদিও আফসোস করতে শুরু করেন তার সিদ্ধান্তের জন্যে। অন্যায়ভাবে টেলিস্কোপ মডেলটা কেনার গ্লানি তাকে শান্তি দেয়নি কোনওদিন। এদিকে কেমব্রিজ থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছিল যে যদি কোনও ব্যক্তি ওই টেলিস্কোপ ফিরিয়ে আনতে পারে, তাকে প্রচুর অর্থ পুরস্কার হিসেবে দেওয়া যাবে। জেঠু ভেবেছিলেন, বিনা পয়সাতেই তিনি মডেলটা ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু সেই সময় তিনি পাননি।

চৌদ্দ

দু’মাস পরের কথা। জেঠুর বাড়ি থেকে পাওয়া টেলিস্কোপের মডেলটা আমি আর অরুণাভ কেমব্রিজে পাঠিয়ে দিয়েছি তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কোনওরকম টাকাপয়সা পুরস্কার হিসেবে নিতে আমরা দু’জনেই অস্বীকার করেছি। অরুণাভর পরিবারও এই সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে। তার কিছুদিন পরেই কেমব্রিজ থেকে আমার আর অরুণাভর নামে দুটো চিঠি এসে উপস্থিত।

চিঠির বক্তব্য সংক্ষিপ্ত। একটা ঐতিহাসিক অ্যান্টিক তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে আমাদের দু’জনকেই কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোনমি বিভাগে গিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এ বাবদ যত টাকা লাগবে তারাই দেবে। এমনকি প্লেনের টিকিটও তারা পাঠিয়ে দেবে আমাদের ঠিকানায়।

কয়েকদিনের মধ্যেই দুই বন্ধু পাড়ি দেব সেখানে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবজার্ভেটরি যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের। ভাগ্য এমন করে আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে সে কি কোনওদিন ভেবেছিলাম?

রাতে আজকাল প্রতিদিনই আমরা ছাদে গিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে থাকি। চেষ্টা করি আমাদের চেনা নক্ষত্রগুলো খুঁজে বের করার। হয়তো বিজ্ঞান মানবে না, কিন্তু আমাদের ভাবতে ভালো লাগে যে জেঠুও হয়তো একটা নক্ষত্র হয়ে আমাদের দিকে চেয়ে আছেন। হাসতে হাসতে বলছেন তার প্রিয় লাইনদুটি—

সঠিক ভেবে সঠিকভাবে বুঝবে যেই জন,

সৃষ্টি বোঝার দৃষ্টি পাবে, পাবে গুপ্তধন।  

_____

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ এই গল্পের মূল ধারণা শ্রী অরূপরতন ভট্টাচার্যর লেখা বই ‘আকাশ চেনো’ থেকে নেওয়া। এই বই ছোটোবেলায় হাতে না পড়লে জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক আশ্চর্য জগত অচেনাই রয়ে যেত। অরূপবাবুকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানালাম।

অলঙ্করণঃ মৌসুমী।

টেকনিক্যাল ছবিঃ লেখক কর্তৃক সংগৃহীত

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প উপন্যাসের লাইব্রেরি 

 

6 Responses to পুজোর উপন্যাস বিবুধসমাগম প্রহেলিকা সুদীপ চ্যাটার্জি শরৎ ২০১৯

  1. রুমেলা says:

    অসম্ভব সুন্দর একটা উপন্যাস উপহার দিলে সুদীপ। তোমার পড়াশোনা আর লেখার গতি বারবার আমাকে চমকে দিচ্ছে।

    Like

  2. Tina Banerjee says:

    Khub bhalo laglo. Besh unique concept. Astronomy niye onek Kichu jante parlam. Puzzle gulo khub sundor. Lekhar bhasha khub sohoj, tai Porte khub bhalo legeche.

    Like

  3. nil says:

    খুব সুন্দর উপন্যাস।পড়তে পড়তে অনেক কিছু জানতে পারলাম।

    Like

  4. সুদীপ says:

    অনেক ধন্যবাদ

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s