পুজোর উপন্যাস

 

54476

uponyasnarsernew01 (Small)

   দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

ফেসবুকে সচরাচর অচেনা লোকজনের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টে রাজি হই না আমি। কতরকমের মানুষজন আছে, কে যে কোন মতলবে চলে কে জানে। তা এ মেয়েটা একেবারে নাছোড়বান্দা। বারতিনেক রিকোয়েস্ট বাতিল করবার পর সেদিন সকালে উঠে মোবাইল অন করতেই দেখি চার নম্বর বার ফের রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে বসেছে। কৌতূহল হতে মেয়েটার পাবলিক প্রোফাইলে গিয়ে একটু নেড়েঘেঁটে দেখলাম। কিছুই দেয়া নেই সেখানে। ভাবলাম এবারে একে একটু বকুনি দেয়া দরকার। তার মেসেজ ইনবক্সে গিয়ে একটু কড়া ভাষায় দু চার কথা লিখে দিয়ে খবরের কাগজের দিকে মন দেয়া গেল।

আমাদের এরেরা কলোনি এলাকাটা পুরানা ভোপালের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা দূরে। পঞ্চাশ ষাট বছর আগেও এখানটা জঙ্গল ছিল শুনেছি। এখন দিব্যি সাজানোগোছানো পল্লী হয়ে উঠলেও তার এখানেওখানে দুটো একটা কেঁদ-মহুয়া-খিরনি-কুল্লুর মতন বুনো গাছ চোখে পড়ে। আমার বাড়ির সামনেটাতেই তেমন কটা গাছ রয়েছে। ভরা বর্ষায় তাদের ক্যানোপিতে সবুজের বাহার। বৃষ্টি পেয়ে নীচের মাটিতে ঝোপঝাড়গুলোও ফনফনিয়ে উঠেছে। দেখলে মনে হবে বুঝি জঙ্গলটা কংক্রিটের ফাঁকফোকর দিয়ে আঙুল গলিয়ে অপেক্ষায় আছে। একটু অন্যমনস্ক হলেই ফের থাবা মেরে ছিনিয়ে নেবে নিজের রাজত্বকে।

“কী হে ভুবন? আজ অফিস নেই?”

মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি বোসসাহেব গেটটা খুলে ছাতা বন্ধ করতে করতে এসে ভেতরে ঢুকছেন।

হেসে বললাম, “রিটায়ার করেছেন তো মাত্র এক বছর। এখনি উইক এন্ড কবে কবে হয় ভুলে গেলেন?”

“ওহো তাইতো। আজ তো শনিবার। ব্যাপার কী জানো, রিটায়ারমেন্ট টেন্ট কিছু নয়, আসলে করেছি তো বনের চাকরি। ওতে উইক এন্ডই বা কী আর উইক ডে-ই বা কী? হিসেব থেকেছে নাকি কোনোদিন?”

কথাটা অবশ্য সাহেব ভুল বলেন নি। বনবিভাগে তো অনেক মানুষই চাকরি করেন, কিন্তু ওঁর মতন কাজপাগল আর পণ্ডিত মানুষ সহজে মেলে না। এখন চাকরিজীবন শেষ হতে পড়াশোনা নিয়েই থাকেন। এখানকার প্রবাসী বাঙালি সমিতিতে এখন আমি সেক্রেটারি আর উনি প্রেসিডেন্ট। মাঝেমধ্যে মর্নিং ওয়াক করতে করতে এসে একটু গল্পসল্প করে যান। দুচারটে কাজের কথা হয়, নতুন কী পড়লেন সে নিয়ে আলোচনাও হয় একটুআধটু।

“জেঠু চা নাও,” পিপুল চায়ের ট্রেটা এনে বোসসাহেবের সামনে বাড়িয়ে ধরল। ট্রের ওপর একপাশে আমার ফোনটাও রাখা। সেইটের দিকে দেখিয়ে সে বলে, “তোমার ফেসবুক ইনবক্সে একটা মেসেজ এসেছে বোধায় বাবা। ট্রিং করে শব্দ হল একটা। দেখে নাও।”

ফোনটা হাতে নিয়ে তার গায়ে আঙুল ছোঁয়াতে লাগলাম আমি।

“জরুরি কিছু?”

পর্দায় তখন ফের সেই আদৃতা চ্যাটার্জি নামটা ভেসে উঠেছে। মেসেজটাকে পর্দায় আনতে আনতেই আমি অন্যমনস্কভাবে কিছু একটা বলতে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেটা বলবার আগেই হঠাৎ একটু চমকে উঠলাম আমি।

“কী হল হে? খারাপ কোন খবরটবর-”

আমি নীরবে ফোনটা তাঁর দিকে বাড়িয়ে ধরলাম।

বোসসাহেবের আবার ইংরিজি হরফের বাংলা পড়তে সমস্যা হয়। ধরে ধরে উচ্চারণ করে পড়ছিলেন, “আমি আদৃতা। ড: আর এন চ্যাটার্জির মেয়ে। প্রফেসর জিনি কার্লোসের কাছে পিএইচ ডি করছি ইয়েল-এ—আপনার সঙ্গে আমার বাবার হারিয়ে যাবার ঘটনাটার ব্যাপারে—”

ফোনটা আমার হাতে ফেরত দিয়ে পাথরের মতন বসে রইলেন বোসসাহেব। তারপর খানিক বাদে নিজের মনেই বললেন, “বাপের পথেই হাঁটছে। সেই এক ইউনিভার্সিটি, একই গাইড–”

আমি চুপচাপ বাইরের দিকে তাকিয়ে বসেছিলাম। ছুটির সকালটা হঠাৎই একেবারে বিস্বাদ ঠেকছিল। খানিক বাদে একটু ইতস্তত করে বললাম, “কী করব বলুন তো স্যার?”

“ওকে ডেকে পাঠাও ভুবন। সব কথা ওর জানবার অধিকার আছে।”

“কিন্তু স্যার, যে কথাগুলো দুনিয়ার কেউ বিশ্বাস করবে না—”

“আমি তো করেছি।”

“আঃ! আপনার কথা আলাদা স্যার। জঙ্গলেই তো জীবনটা কাটিয়ে দিলেন। কিন্তু একটা বাচ্চা মেয়ে, বিদেশের শহরে বড়ো হয়েছে, সে–”

“না ভুবন। ও মেয়ে কেন বাপের পথেই হেঁটেছে তুমি বোঝো নি? আমি নিশ্চিত, রবি কোথায় কীভাবে হারিয়ে গেল, সেইটে ও জানতে চায়। তাই তার ক্লু খোঁজবার জন্য বাপের গবেষণার বিষয়টাকেই নিজের বিষয় করে নিয়ে তাঁর পথে এগিয়েছে। যাঁর কাছে কাজ করছে বলে লিখেছে তাতে তার জন্য দরকা্রি পড়াশোনাও করেছে সে তো বোঝাই যায়। ভারতীয় ট্রাইবাল ব্ল্যাক ম্যাজিক নিয়ে গবেষণায় এখনও ডঃ কার্লোসই দুনিয়ায় এক নম্বর। তোমার কথাগুলো শুনে সেটা বিচার করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা ওর থাকবে আশা করি। তুমি এ নিয়ে দ্বিধা কোরো না।”

একটু ইতস্তত করে আমি ফের ফোনটা টেনে নিলাম কাছে।

বোসসাহেব ফ্রুট কাস্টার্ডের ট্রেটা এনে টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে ছাইদানির ধার থেকে নিভন্ত চুরুটটা তুলে নিয়ে দাঁতের ফাঁকে গুঁজতে গুঁজতে বললেন, “খেয়ে দেখ। আয়াম আ ফার্স্টক্লাস ডেসার্ট মেকার টু।”

“উ-ম্‌-ম্‌,”

এক চামচ মুখে তুলেই আদৃতা একটা খুশির শব্দ করল, “ফিরে গিয়ে ম্যাডামকে বলতে হবে। রান্নাবান্নার ব্যাপারে শি হ্যাজ ফাইনালি মেট হার ম্যাচ।”

“সে কী? তোমার প্রফেসরসাহেব রান্নাবান্নাতেও আছেন নাকি?”

“নয়ত কী? তাঁরও তো তিনকূলে কেউ নেই। বাবার হারিয়ে যাবার খবর ওদেশে গিয়ে পৌঁছোনোর পর থেকে ওঁর কাছেই তো মানুষ হয়েছি। একদিনও কিচেনে ঢুকতে দেন নি। দারুণ রান্নার হাত।”

ওর দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা মোচড় দিচ্ছিল আমার। মা মরা মেয়ে। আমার পিপুলের বয়েসি হবে। বিদেশবিভুঁয়ে পরের বাড়ি মানুষ। কিন্তু মুখের হাসিটা ঠিকই আছে। শক্ত চিবুক আর চাপা ঠোঁট দেখলেই বোঝা যায় ভয়ানক জেদি। ওকে এই বিপদটার মুখে ঠেলে দিতে—

চিন্তার সুতোটা ছিঁড়ে গেল আদৃতার গলার শব্দে, “আংকল, এইবারে আপনি বলুন। ঠিক কী হয়েছিল সেদিন জঙ্গলে? ফ্যাক্টস-এর সঙ্গে আমার অনুমিতিগুলো মিলিয়ে নিতে চাই একবার—”

একটু ইতস্তত করে বললাম, “বলব। এখনো অবধি যে কথাগুলো বোসসাহেব বাদে দ্বিতীয় কাউকে সাহস করে বলতে পারিনি, সে সবই বলব। কিন্তু ভয় হচ্ছে তুমি তা বিশ্বাস করতে পারবে কি না।”

“ট্রাই মি।”

“যদি বলি দশ বছর আগে তোমার বাবা আমার চোখের সামনে একজন মৃত্যুহীন কালো প্যান্থার হয়ে কাঠেরিয়ার জঙ্গলে সওশির পাহাড়ের কাছে হারিয়ে গিয়েছিলেন তাহলে বিশ্বাস করতে পারবে?”

আদৃতা হঠাৎ একেবারে চুপ হয়ে গেল। তারপর প্রায় ফিসফিস করে বলল, “মৃত্যুহীন? তার মানে এখনো-”

বাইরে রাত বেড়েছে। বোসসাহেবের বাড়িটা কলোনির একটু একটেরেতে। চারপাশে অনেক গাছ। সেখান থেকে রাতের শব্দ উঠছিল। সেইদিকে চোখ রেখে আমি গল্পটা বলে যাচ্ছিলাম আদৃতাকে। সামনে খোলা ল্যাপটপটার কিবোর্ডে দ্রুত আঙুল চলছিল তার-

দশ বছর আগের স্মৃতি। এখনো তার প্রতিটা মুহূর্ত আমার মনে আছে। কিচ্ছু ভুলিনি। রবি আর আমার কাঠেরিয়ায় যাওয়া, সওশির পাহাড়ের মাথায় সেই গুহায় ঢুকে, ছাদের গায়ে আঁকা ব্যাঘ্রমানবের ছবির নীচে শুয়ে রবির সম্মোহিত হয়ে যাওয়া, নিজের ওপর সম্মোহনের জাল ছিঁড়ে আমার তাকে নিয়ে পালানো, আর সবশেষে, বৃষ্টির সেই রাতে পথহারানো জঙ্গলের ভেতর প্যান্থারবাহিনীর সামনে রবির একলা গিয়ে দাঁড়ানো, তারপর ভেজা মাটির বুকে থাবার ছাপে জমা বৃষ্টির জলে নিজের শরীরের রক্ত মিশিয়ে খেয়ে তার কালো প্যান্থারে বদলে যাওয়া, চলে যাবার আগে আমার দিকে তার সেই করুণ দৃষ্টি, এর কোনকিছু বাদ না দিয়ে সম্পূর্ণ গল্পটা যখন শেষ করলাম, দেয়ালঘড়িতে তখন রাত বারোটার ঘন্টা বাজছে। বাইরে একঘেয়ে বৃষ্টির শব্দ উঠছিল। মহারাষ্ট্রের ওপরে গভীর নিম্নচাপ। আজ রাতে এ বৃষ্টি ধরবে না।

“এই ওয়েদারে এত রাতে হোটেলে ফিরবে, না আজ আমার এখানেই-” বলতে বলতেই হঠাৎ থেমে গেলেন বোস সাহেব। ফিরে দেখি, আদৃতার চোখে দু ফোঁটা জল টলমল করছে।

একটু বাদে নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল, “এখানেই শুয়ে পড়ব’খন স্যার। এখনো অনেক কথা বলবার আছে আমার। আংকলের গল্পটা আমার ডেটা আর থিওরিটাকে সম্পূর্ণ সাপোর্ট করছে।”

বলতেবলতেই আদৃতা দ্রুতহাতে তার ল্যাপটপে আঙুল চালাচ্ছিল। একটু বাদে তাতে একটা স্লাইড প্রেজেন্টেশান এনে সেটা চালিয়ে দিয়ে বলল, “আপনারা এইটা একটু দেখুন প্রথমে। আমি বলে যাই। জিওফ্রে ল্যাং এবং বালাজি দেশমুখের নাম শুনেছেন কি?”

পর্দায় ভেসে ওঠা ছবিদুটোর দিকে তাকিয়ে বোসসাহেব মাথা নাড়লেন, “চিনি। আমিই ওঁদের সওশির পাহাড়ের কাছাকাছি জঙ্গলে এক্সক্যাভেশানের পারমিশান দিয়েছিলাম বছর পাঁচেক আগে।”

“রাইট। বিখ্যাত প্যালেন্টোলজিস্ট। সওশির এক্সক্যাভেশান সাইটে দশ হাজার বছরের পুরোনো ভূস্তর থেকে ওঁরা একটা ইমপ্যাক্ট ক্রেটারের খোঁজ পেয়েছিলেন। সেখানটার পাথরের সঙ্গে এমন কিছু ধাতুর গুঁড়ো মিলেছিল যে ধাতুর অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই আংকল।”

“কোন উল্কা বা-”

“সে বিষয়ে নিশ্চিত কিছু কেউ বলতে পারেন নি। ব্যাপারটা নিয়ে রহস্য আরো বাড়িয়ে তুলেছে সে এলাকার মাটির নমুনায় প্রচুর পরিমাণে মিশে থাকা এই বস্তুটা।”

পর্দায় ভেসে ওঠা ছোটো ছোটো স্ফটিকখণ্ডগুলোর দিকে দেখিয়ে ফের আদৃতা বলল, “ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে তোলা বহুগুণ বিবর্ধিত ছবি। একধরণের ভাইরাস। পৃথিবীর আর দশটা ভাইরাসের সঙ্গে এর গঠনের মিল নেই কোন। আংকেলের গল্প আর পৃথিবীতে পাওয়া যায়না এমন দুটো বস্তুর একসাথে সে গল্পের ঘটনাস্থলে হাজির থাকা থেকে একটা তত্ত্ব খাড়া হচ্ছে আস্তে আস্তে যে–”

“কিন্তু এর সঙ্গে তোমার বাবার হারিয়ে যাওয়ার সম্পর্ক কোথায়?”

“সরি। তত্ত্বের কথা বলবার আগে আমার সেটা প্রথমে বলে নেয়া উচিত ছিল। সম্পর্ক আছে স্যার। আসলে, ‘নেচার’এ ল্যাং ও দেশমুখের মূল গবেষণাপত্রটা  বের হবার পর বিষয়টা নিয়ে ওদেশে বেশ কিছু কাজ হয়েছে। বছরতিনেক আগে অ্যানালস অব এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ক্রিপটোবায়োলজি পত্রিকায় একটা গবেষণাপত্র বের হয়। তাতে মানুষের রক্তের বিভিন্ন ধরণের নমুনার ওপরে এ ভাইরাসটার কার্যপ্রণালী নিয়ে কিছু পরীক্ষার ফলাফল দেয়া হয়েছিল। ম্যাডামের নজরে পড়তে তিনি পেপারটা আমায় এনে দিয়েছিলেন।

“একটা বিচিত্র ফলাফল দেখা গিয়েছে সে পরীক্ষায়। পৃথিবীতে সামান্য কিছু মানুষের দেহকোষে কিউ সি ৮০ নামের অ্যাক্টিন গোত্রের একটা জিন পাওয়া যায়। এই ভাইরাসটার মধ্যেও তার উপস্থিতি রয়েছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে সেই ধরণের মানুষের কোন কোষের সংস্পর্শে এলে এটা অকল্পনীয় বেগে কোষটাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। সম্পূর্ণ বদলটা ঘটতে সময় লাগে ষোলো সেকেন্ডের একটু কম।”

“এইরকম একটি পরিবর্তিত দেহকোষের জিনসংকেতগুলোর ভিত্তিতে কমপিউটার সিমুলেশানে যে প্রাণীটার ছবি তৈরি করা হয়েছে সেটা দেখুন আপনারা—”

পর্দায় ফুটে ওঠা অতিকায় ব্ল্যাক প্যান্থারের ছবিটার থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম আমি। বুকের ভেতর একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। হঠাৎ চোখের সামনে ঝাঁপিয়ে আসছিল দশ বছর আগের সেই বৃষ্টিঝরা রাতের ছবিটা। একদল কালো প্যান্থারের সতর্ক পাহারায় আমার গাড়ির সামনে উপুড় হয়ে বসে নিজের রক্ত মেশা জল খেতে থাকা মানুষটা—তারপর—চোখের সামনে তার মানুষের চেহারাটা বদলে গিয়ে—

“দুটো প্রশ্ন আদৃতা,” বোসসাহেবের কথায় চমকে ফিরে তাকালাম তাঁর দিকে, “এ দুটো প্রশ্নের সঠিক জবাবের ওপরে তোমার তত্ত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, ল্যাং আর  দেশমুখের কাজটার সময় সেখানে জনাপঞ্চাশেক লোক গিয়েছিল। আমি নিজেও সেখানে গিয়েছি সেসময় বেশ ক’বার। সওশির পাহাড়েও উঠেছি। কিন্তু ছ মাসের প্রজেক্ট চলাকালীন ওখানে ভুবনের বলা প্যান্থারবাহিনীর কোন অস্তিত্ব আমি খুঁজে পাইনি। তোমার তত্ত্ব এর কোন ব্যাখ্যা দিতে পারবে কী? আর দ্বিতীয়ত, তুমি কী করে নিশ্চিত হচ্ছ যে তোমার বাবা ওই দুর্লভ জিনের বাহক ছিলেন?”

“ব্যাখ্যা আছে স্যার। ল্যাং-এর দলবল প্যান্থারদের দেখা না পাওয়া, আংকেলের বেঁচে ফেরা আর বাবার বদলে যাওয়া এ তিনটে ঘটনা একই সুতোয় বাঁধা। সে সুতোটা হচ্ছে ওই কিউ সি ৮০। ও অঞ্চলের যে সমস্ত মিথ নিয়ে আমি কাজ করেছি তাতে একটা কথা বারংবার বলা হয়। সওশিরের অধিষ্ঠাতা দেবতা যাকে নিজের দলে নেবেন তাকে প্রথমে টেনে আনেন তাঁর ওই গুহায়। সম্ভবত কিছু লক্ষণ বিচার করে তার দেহে এই জিনটার উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয় সেখানে। সে পরীক্ষায় পাশ করলে—”

“তার মানে তোমার অনুমান-”

“অনুমান নয় আর আংকল। আপনার গল্প আর আমার এতদিনের গবেষণার ফলাফল একত্র করে এইবারে আমি প্রায় নিশ্চিত, আপনার শরীরে ওই জিনের উপস্থিতি খুঁজে পায় নি ঐ শয়তান দেবতা। এ জিনের ধারক মানুষ অত্যন্ত দুর্লভ। ল্যাং-এর দলের মধ্যেও সম্ভবত তেমন কেউই ছিল না। বাবার দেহে নিঃসন্দেহে ওই জিনের উপস্থিতি ছিল। তাই তারা বাবাকে বেছে নিয়েছিল নিজেরাই।”

“নিছক অনুমান আদৃতা। তোমার বাবার কোষে ওই জিনের উপস্থিতির কোন প্রমাণ-”

 “প্রমাণ আমি নিজে স্যার। পরীক্ষা করে দেখেছি আমার দেহকোষ এ জিনের মালিক। একমাত্র উত্তরাধিকার সূত্রে ছাড়া এই দুর্লভ জিন আমার শরীরে আসবার কোন সম্ভাবনা ছিল না।”  

একটা দীর্ঘ নৈঃশব্দের পর বোসসাহেব যখন মুখ খুললেন তখন তাঁর গলায় ক্লান্তির স্পর্শ ছিল, “এবারে কী করতে চাও তুমি আদৃতা?”

“আমি ওখানে যাব স্যার। আমার জিনের পরিচয় পেলে ওরা আমার সামনে আসবে। বাবাকে আমি আর একটিবার—” বলতে বলতে গলা কাঁপছিল মেয়েটার। একটু থেমে নিজেকে সামলে নিয়ে সে ফের বলল, “আমি তখন দশ বছরের মেয়ে। বাবাকে খুব ভালোবাসতাম স্যার। আমায় একবার ওই পাহাড়ের কাছে যেতে হবে—একটা শেষ চেষ্টা-”

“পাগলামি করছ আদৃতা,” আমি মাথা নাড়লাম, “আমি ওদের সামনে থেকে দেখেছি। মানুষের মনকে নিয়ে কত সহজে ওরা খেলা করতে পারে সে বিষয়ে তোমার কোন ধারণাই নেই। তুমি যা বলছ তার খানিকটাও যদি সত্যি হয় তাহলে ওখানে গিয়ে তুমি ফিরে আসতে পারবে না। রবি পারেনি। কেউ কখনো পারবে বলে আমি মনেও করি না।”

“আমার কিন্তু তা মনে হয় না ভুবন,”বোসসাহেব মাথা নাড়লেন, “ভেবে দেখ, সেই এক্সক্যাভেশানের সময় কিন্তু আমরা এদের কাউকেই কোথাও দেখিনি। বড়োসড়ো একটা মানুষের দল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হাজির থাকলে হয়ত এদের সে সাহস হবে না। আর হলেও আমরা তার মোকাবিলা করতে পারব বলেই মনে হয়।”

বোসসাহেবের চোখদুটো চকচক করছিল। মানুষটাকে আমি আজও চিনতে পারলাম না। সুন্দরবনের গহন জঙ্গলে মাটিতে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছুটে আসা পূর্ণবয়স্ক রয়েলবেঙ্গলকে  ট্র্যাংকুলাইজ করবার অভিজ্ঞতা রয়েছে ওঁর। অথচ আজ পর্যন্ত কেবল দুটো মানুষখেকো বাঘ আর কিছু রোগ এলিফ্যান্ট ছাড়া শিকারের নামে ফুর্তির জন্য একটা চড়ুই পাখিও মারেন নি। একা মানুষ। সংসার করলেন না কখনো, সে-ও ওই জঙ্গল আর অ্যাডভেঞ্চারকে ভালোবেসে। তিনকুলে টানমায়া বাড়াবার জন্য কেউ নেই। ষাট বছর পেরিয়েও রক্তের তেজ গেল না মানুষটার।

আদৃতা ম্লান একটু হেসে মাথা নাড়ল, “ঠিক ওই কারণেই বড়ো দলবল নিয়ে ওখানে যাওয়া আমাদের চলবে না স্যার। আমাকে একাই যেতে হবে। নাহলে, আপনিই তো বললেন, সামনে আসবে না ওরা। আমার মিশনটার কী হবে তাহলে?”

বোসসাহেব চুপ করে তাকিয়ে রইলেন মেয়েটার মুখের দিকে। সিনেমার নায়কদের মত কোন কায়দাটায়দা না করে কত সহজ গলায় চূড়ান্ত সাহসী একটা কথা বলে গেল মেয়েটা। তবে সেটা সাহস না বলে বোকামোও বলা যায়। আবেগপ্রবণ একটা কমবয়েসি মেয়ের চূড়ান্ত বোকামো। এ হতে দেয়া যায় না।

উঠে এসে তার পাশে বসে বললাম, “মাথা ঠান্ডা করো আদৃতা। বাবার সন্ধান করতে গিয়ে নিজের একটা বড়ো ক্ষতি ছাড়া আর কী লাভ হবে তোমার বলো দেখি? তাকে তুমি আদৌ খুঁজে পাবে কিনা সেটাতে সন্দেহ আছে। আর খুঁজে পেলেও, তাঁকে তো ফিরিয়ে আনতে পারবে না তুমি। এমন একটা ক্ষ্যাপামোর চিন্তা মাথা থেকে তাড়াও। তোমারও যদি তার মতন দশা হয় তাহলে রবি মনে শান্তি পাবে ভেবেছ?”

মাথা নীচু করে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল আদৃতা। তারপর খুব আস্তে আস্তে বলল, “আমি জানি আংকল। অতটা আবেগপ্রবণ আমি নই। সেইজন্যই পেপারটা হাতে পাবার পরও তিনটে বছর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছি। আপনি যা বললেন ঠিক সেই কারণেই আশা আমিও ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু তারপর গতমাসে আমাদের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়েরই অন্য এক গবেষকদল এর ওপরে দ্বিতীয় একটা গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করেন।

“ভাইরাসটার দেহকোষকে বদলে দেবার কৌশলকে ব্যবহার করে তাঁরা পরীক্ষামূলক একটি রেট্রোভাইরাস তৈরি করতে পেরেছেন যেটি যে কোন কারণে বদলে যাওয়া দেহকোষকে তার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারে চোখের পলকে। অসুখে নষ্ট হয়ে যাওয়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে জিন থেরাপিতে আগের চেহারায় ফিরিয়ে দেয়ার কাজে লাগানো হবে এই রেট্রোভাইরাসটাকে। ক্যানসার চিকিৎসায় এ ভাইরাস কাজে আসবে। কাজে লাগানো হবে বার্ধক্যনিরোধক গবেষণাতেও।

“তার মানে তুমি বলতে চাইছ—”

বোসসাহেবের চোখদুটো চকচক করছিল। বিজ্ঞানের নানান শাখায় তাঁর অবাধ যাতায়াত। তবে আমার মাথায় অবশ্য ঢুকছিল না কিছু। ছোটোবেলা থেকে অংক-বিজ্ঞান আমার দু চোখের বিষ। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “মানে, ব্যাপারখানা ঠিক-”

“আমি বুঝতে পেরেছি ভুবন,” বোসসাহেবের গলায় উত্তেজনার স্পর্শ ছিল, “কোনভাবে যদি এ ভাইরাসটাকে রবির শরীরে ঢুকিয়ে দেয়া যায় একবার–”

“জানি না স্যার। জিনিসটা ল্যাবরেটরির ভেতরে কয়েকটা মানবকোষের ওপরে খানিক পরীক্ষা হয়েছে এখন পর্যন্ত। জিনি ম্যাডামের দৌলতে তার একটামাত্র নমুনা আমি হাতে পেয়েছি। ওরই ভরসায় একটা চেষ্টা স্যার,” বলতে বলতে ঝোলা থেকে ছোট্ট একটা স্টিলের বাক্স বের করে আনল আদৃতা। তার ওপরে কাচের ছোট জানালা দিয়ে ভেতরে নিরীহদর্শন একটা ধাতব ক্যাপসুল চোখে পড়ে।

বোসসাহেব জিনিসটা হাতে ধরে নিয়ে বসে মাথা নাড়ছিলেন। খানিক বাদে হঠাৎ মুখ তুলে বললেন, “তুমি উন্মাদ। একটা অপরীক্ষিত ওষুধের ক্যাপসুলের ভরসায় অর্ধেক পৃথিবী বেড় দিয়ে অচেনা, শক্তিশালী শত্রুর সঙ্গে একলা একলা লড়তে চলে এলে? কিন্তু আমি—আমার গর্বে বুকটা ফুলে উঠছে জানো? রবি সৌভাগ্যবান মানুষ ছিল। এমন মেয়ে যার—”

বলতেবলতেই উত্তেজিত হয়ে উঠে সারা ঘর জুড়ে পায়চারি করছিলেন বোসসাহেব। তারপর হঠাৎ আদৃতার সামনে এগিয়ে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তা বাবাকে খুঁজে পেলে ওষুধটা খাওয়াবে কীভাবে কিছু ভেবেছ?”

আদৃতা দুদিকে মাথা নাড়ল একবার।

“বুঝেছি। হাতে একটা কিছু এসেছে, আর আগুপিছু কিচ্ছু না ভেবে অমনি এরোপ্লেনের টিকিট কেটে চড়ে বসেছ। তা জঙ্গলে যে যাবে, তা বন্দুক পিস্তলে অভ্যেস আছে তো, নাকি ল্যাপটপ দিয়ে বাঘ মারবে ভাবছ?”

সে মাথা নেড়ে বলল, “আমাদের ওদেশে যা অবস্থা এখন তাতে সব্বাইকে ওইটে আজকাল শিখে রাখতে হয়। আমাদের বাড়িতেও ম্যাডামের লাইসেন্সড পিস্তল আছে। লোকাল শুটিং ক্লাবের মেম্বার আমরা দুজনেই।”

“হুমম্‌,” বলতে বলতে বোসসাহেব দেরাজ খুলে গোটাকয় বন্দুক বের করে টেবিলের ওপর এনে রাখলেন। তার থেকে রিভলভারের মত দেখতে একখানা অস্ত্র বেছে নিয়ে আদৃতার দিকে সেটা বাড়িয়ে ধরে বললেন, “দেখ। চলবে?”

জিনিসটা দেখতে সাধারণ কোনো পিস্তলের মতন নয়। মাথার দিকে নলটা বেশ সরু। ট্রিগার আছে বটে, কিন্তু বুলেটে ঘা দেবার মত কোন হ্যামার চোখে পড়ছিল না। গুলি ভরবার ম্যাগাজিনও নেই। নলটার পেছনদিকে একটা ফুটো আর বাঁটের পেছনদিকে বাতাসের চাপ মাপবার ডায়াল।

বন্দুকটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখে নিয়ে মেয়েটা বলে, “এটা আমি ঠিক—”

“এটা বাতাসের চাপে চলা একটা ডার্ট গান। ঘুমপাড়ানি ডার্ট ছোঁড়বার কাজে লাগে। ও নইলে তোমার ওষুধটা ডেলিভারি করবে কী করে?”

“কিন্তু স্যার আমি এ বন্দুক কখনো-”

“চালাও নি, তাইতো? অসুবিধে নেই। পিস্তল চালাবার অভ্যেস তো আছে। বাকিটা আমি তোমায় এক মুহূর্তে শিখিয়ে দেব। তোমার ওষুধের ক্যাপসুল আমার কাছে দিয়ে দাও। আমি ওটাকে একটা ডার্ট সিরিঞ্জে ভরে তৈরি করে রাখব।”

আমি একটু অবাক হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “কী বলছেন স্যার? ওকে এইভাবে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে আপনার-”

বোসসাহেব আমার কথায় কান না দিয়ে টেবিলের ওপর থেকে আরো দুটো রাইফেল  বেছে নিয়েছেন ততক্ষণে। রাইফেলটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “উইলফ্রেড অ্যান্ড ক্র্যামার। সেমি অটোমেটিক। এক বার্স্টে চোদ্দোটা অবধি গুলি ছোঁড়ে। রিকয়েল প্রায় নেই। এইটে তোমার কাছে থাকবে ভুবন। আর আমি—হা হা—এই দ্যাখো, একে আমি বলতাম মনস্টার লিকার। পয়েন্ট সেভেন জিরো জিরো ক্যালিবার। এর একটার বেশি দুটো শট আজ অবধি কোন পাগলা হাতির প্রয়োজন হয় নি।”

“কী বলছেন স্যার?—আপনি-এই বয়সে-”

“যাব ভুবন। ওকে একলা ছেড়ে দেব নাকি ওই বিপদের মুখে? তুমি আমি দুজনেই যাব। বাপের জন্য এত করল, সব ছেড়েছুড়ে জীবন নিয়ে বাজি খেলতে চলে এল আধা পৃথিবী ঘুরে, নিজের সুখের জীবন ছেড়ে। কাজেই শেষ চেষ্টাটায় ওর নিজের অধিকার। সেটা ও নিজের হাতেই করুক আমি চাই। কিন্তু সেইসঙ্গে, ওকেও জ্যান্ত ফিরিয়ে আনতে হবে তো! আমাদের আদৃতা মাকে—” বলতেবলতে তার মাথাটায় একটু হাত বুলিয়ে দিলেন বোসসাহেব। মোটা মোটা কর্কশ আঙুলগুলো অনভ্যস্ত ভঙ্গীতে তার চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিয়েই সংকোচে পিছিয়ে এল যেন। আদৃতা মুখ তুলে তাঁর দিকে তাকিয়ে ফের হাতটাকে নিজের মাথায় ধরে নিয়ে রেখে বলল, “আশীর্বাদ করুন জেঠু।”

“করলাম মা। তুমি সফল না হলে কে হবে? নিজের জন্য কিচ্ছু ভাবতে হবে না তোমায়। তুমি শুধু তোমার হাতের কাজটার দিকে মন দাও। আমরা দুজন সঙ্গে রইলাম তোমার দেখভাল করবার জন্য।”

ইটারসি বাজার থেকে বেরিয়ে খানিক দূর এগোবার পর আমি স্টিয়ারিং-এ বসলাম। বোসসাহেব এতক্ষণ নিজেই একটানা চালিয়ে এসেছেন। এইবার একটু রেস্ট নেবেন।

আদৃতা লোভি দৃষ্টিতে একবার স্টিয়ারিঙের দিকে তাকিয়েছিল। বললাম, “চালাবে? ছ গিয়ারের গাড়ি। স্টিয়ারিং, গিয়ার সব ম্যানুয়াল কিন্তু।”

সে খানিক ভেবেচিন্তে বলল, “থাক আংকল। শহরের রাস্তায় ইলেকট্রনিক গিয়ারের হালকাপলকা অটোমেটিক গাড়ি চালিয়ে অভ্যেস। শেষে আবার কোন সমস্যা না হয়। তবে আপনাকে কম্পানি দিতে পারি। জেঠু পেছনে নিশ্চিন্তে রেস্ট নিয়ে নিন একটু।” বলতে বলতেই সে পেছনের সিট থেকে নেমে আমার পাশে এসে বসল।

এ গাড়িটা চালিয়ে ভারী আরাম। ল্যান্ডরোভার ডিফেন্ডার। আর্মার্ড কারের মতন গাড়ি। ভারী। বিশ্বাসযোগ্য। কথা শোনে। দেখবার মতন পিক আপ। সকাল থেকেই বৃষ্টি নেই সেদিন। বিকেলবেলার ঝিমঝিমে রোদ চারদিকে। রাস্তা ফাঁকা ছিল। ফোর্থ গিয়ারে পড়ে আমার হাতে উড়ে যাচ্ছিল যেন গাড়িটা। একটা আশ্চর্য নিস্তব্ধতা ছেয়ে ছিল চারদিকে। হাতের ডাইনে খানিক দূরে সদ্য জল পেয়ে চালু হওয়া বুদনির ঝোরাটার ঝরঝর করে বয়ে যাবার শব্দ আসে শুধু।

পিপ্পল গ্রামের মোড়ে পৌঁছে বেশি খুঁজতে হল না অবশ্য। বাঁয়ের দিকে প্রথম দুটো রাস্তা ছেড়ে তিন নম্বরটা ধরতে হবে এটা মনেই ছিল। তবে হাইওয়ে ছেড়ে সে রাস্তায় গিয়ে ঢুকেই মেজাজটা বিগড়ে গেল। আগে দিব্যি মুরাম ছড়ানো লাল রাস্তা ছিল। বৃষ্টির মধ্যেও কাদাটাদা বিশেষ হত না। কিন্তু এইবার দেখা গেল, গোটা রাস্তা জুড়ে ভাঙা ইটের স্তূপ এদিকওদিক ছড়ানো। রাস্তার ওপরেও বিছোনো রয়েছে খোয়া আর আধলা ইট। সরকারী স্কিমের গ্রামীণ রাস্তা তৈরির কাজ চলছে বোঝা গেল।

তবে ল্যান্ডরোভার এমন রাস্তাকে বিশেষ পরোয়া করে না। চওড়া চাকা। গিয়ার এক ঘর নামিয়ে বনবন করে তার ওপর দিয়েই চললাম। দেরি করা যাবে না এখন। আকাশে মেঘ ফিরে আসছিল ফের। খানিক পরেই কাঁচা রাস্তা শুরু হয়ে যাবে। তখন বৃষ্টি নামলে বিপত্তির একশেষ হবে।

ঠোক্কর খেতে খেতে গাড়ি চলেছে। বোসসাহেবের অবশ্য তাতে কোন হুঁশ নেই। ওর মধ্যেই দিব্যি পেছনের সিটে লাফাতেলাফাতে নাক ডেকে চলেছেন। আশপাশের মাঠ, ঘরবাড়ি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছিল ততক্ষণে। দুপাশ থেকে ক্রমশই আরো কাছে এগিয়ে আসছে জঙ্গল। চাকার নিচে তিরের মতন সোজা পথটা এইবার আস্তে আস্তে অতিকায় একটা প্রাগৈতিহাসিক সাপের মতন এঁকেবেঁকে উঠছিল। ছুটন্ত গাড়ি তার শরীরে নড়াচড়ার দৃষ্টিভ্রম আনে। ঠিক এই সময় হঠাৎ ঠং করে একটা শব্দ উঠল গাড়ির তলা থেকে। আদৃতা একটু চিন্তিত চোখে আমার দিকে তাকাতে আমি রাস্তা থেকে চোখ না ফিরিয়েই বললাম, “ও কিছু নয়। আধলা ইটের টুকরো ছিটকে উঠে কাঠামোর গায়ে ধাক্কা খেয়েছে।”

মেয়েটা একটু অস্বস্তিভরা চোখে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল একবার। সেখানে তখন কুণ্ডলি পাকিয়ে উঠছে সাদাকালো মেঘ। ঘড়িতে দেখলাম সাড়ে পাঁচটা। এর মধ্যেই অন্ধকার হয়ে আসছিল চারদিক। নিভন্ত সূর্যের শেষ আলোয় মেঘের গায়ে কমলা রঙের আভাসটুকু চোখে পড়ে শুধু।

********

    “ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি তো আংকল?” হেডলাইটের আলোয় পাশ দিয়ে মাকড়শার জালের মত বের হয়ে যাওয়া ট্রেলগুলোর দিকে দেখতে দেখতে আদৃতা বলে উঠল হঠাৎ। জানালার কাচগুলো সব তোলা রয়েছে। বাইরে বৃষ্টি নেমেছে জোর। ওয়াইপারের ক্রমাগত যাতায়াতেও উইন্ডস্ক্রিন স্বচ্ছ থাকছিল না। একটা বাঁক ঘুরতে ঘুরতে নিচু গলায় জবাব দিলাম, “আমি এ পথে আগেও এসেছি। রাস্তা ভুল হবে না। তুমি বরং কাচের ভেতর দিকটা একটু মুছে দাও।”

সিটবেল্ট খুলে একটু এগিয়ে বসে গিয়ার বক্সের পাশে রাখা কাচ মোছবার ঝাড়ণটা তুলে নিতে গিয়ে আদৃতা একবার অস্ফুটে উঃ করে উঠল।

বললাম, “কী হল?”

“ছ্যাঁকা খেলাম যেন। গাড়ি খুব গরম হয়ে যাচ্ছে আংকল।”

আমি ইন্ডিকেটারের দিকে তাকালাম। কাঁটাটা লাল এলাকার থেকে অনেক নিচেই তো রয়েছে। তবে? ইঞ্জিন অবশ্য খানিক আগে থেকে হালকা হেঁচকির শব্দ তুলছে। কিন্তু তাতে আমি বিশেষ আমল দিই নি। আর বড়োজোর কিলোমিটার সাতেক পথ বাকি আছে।

গাড়িটা থামিয়ে ইঞ্জিন চালু রেখে ডায়ালটার গায়ে জোরে জোরে টোকা মারলাম ক’টা। কাঁটাটা আটকে গিয়েছিল বোধ হয় কোনভাবে। টোকা খেয়ে একবার কেঁপে উঠেই সটান ওপরের দিকে উঠে গেল। তারপর লাল এলাকাটার একেবারে শেষ সীমা ছুঁয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল।

“স্টিয়ারিঙে বোসো আদৃতা। আমি একবার নীচে নেমে দেখি কী হল-” বলতে বলতে সিটের পেছনদিকে ঝোলানো রেনকোটটা টেনে নিয়ে মুড়ি দিয়ে আমি ড্রাইভারের দিকের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম।

তীব্র হাওয়ার ধাক্কায় এক মুহূর্তের জন্য বেসামাল করে দিয়েছিল আমাকে। ধারালো ছুঁচের মত বৃষ্টির ধারা এসে বিঁধছে সারা শরীরে। হেডলাইটের আলোদুটো, যেন রাক্ষসের চোখের মত তীব্র দুখানা আলোর কলাম ছুঁড়ে দিচ্ছিল সামনের দিকে।

বনেট খুলে সাবধানে রেডিয়েটরের ঢাকনাটায় একটা পাক দিতেই সেটা ছিটকে এসে শোঁশোঁ শব্দ করে খানিক বাষ্প বের হয়ে এল। জল কমে এসেছে এর মধ্যে। বুঝতে পারছিলাম, রাস্তার ওই ইট বা পাথরের টুকরোটা ঠিকরে এসে লেগেই গন্ডগোলটা করে দিয়ে গেছে। কোন একটা সুক্ষ চিড় ধরেছে রেডিয়েটারে। সেখান দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে জল বেরিয়ে যাচ্ছে।

দ্রুত চিন্তা করছিলাম আমি। পথ বাকি নেই বেশি। সঙ্গে জেরিক্যানে লিটার কয়েক মিনারেল ওয়াটার রয়েছে। সেইটা এতে ঢেলে কোনমতে বাকি রাস্তাটুকু পাড়ি দিয়ে দিতে পারলে নিশ্চিন্ত। কাঠেরিয়ার বনবাংলোতে ছোটোখাটো মেরামতি করার মত জিনিসপত্রের অভাব হবে না।

মুখ তুলে বৃষ্টি আর হাওয়ার শব্দের ওপরে গলা তুলে হাঁক দিয়ে বললাম, “আদৃতা, টর্চ আর জলের জেরিক্যানটা নিয়ে এস। তাড়াতাড়ি।”

কথাটা তার কতদূর কানে গেল বোঝা গেল না। তবে আমার হাতের ভঙ্গী দেখে ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পেরেছিল বোধ হয়। একটু বাদেই জিনিসপত্রগুলো নিয়ে দরজা খুলে নেমে এল আদৃতা। রঙিন রেনকোটে ঢাকা মানুষটাকে একেবারে বাচ্চা একটা মেয়ের মতই লাগে।

    বনেটের ভেতর উপুড় হয়ে ভারী জেরিক্যানটা ধরে রেডিয়েটারের মধ্যে সাবধানে জল ঢালছিলাম আমি। পেছন থেকে টর্চ ধরে রেখেছে আদৃতা। জল ঢালা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে এমন সময় হঠাৎ ঠং করে টর্চটা তার হাত থেকে এসে গড়িয়ে পড়ল বনেটের ভেতরদিকটাতে। চমকে উঠে পেছন ঘুরে দেখি, মেয়েটা আমার পাশে আর দাঁড়িয়ে নেই। জোড়া হেডলাইটের আলোয় ভূতগ্রস্তের মত আস্তে আস্তে সে এগিয়ে যাচ্ছিল সামনের রাস্তাটা ধরে। তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে তার হাতটা ধরে বললাম, “কী করছ কী?”

হঠাৎ আমার হাতটা ছাড়াবার জন্য ছটফটিয়ে উঠল মেয়েটা। তারপর প্রাণপণে চিৎকার করে উঠল, “ছেড়ে দিন আমায় আপনি। আমাকে যেতে হবে–ওই তো সামনে—দেখুন—কী বিশাল! আমি—”

আমাদের সামনে হেডলাইটের আলোয় গাছপালা আর ঘন আন্ডারগ্রোথের ওপর অবিরাম বৃষ্টির ধারা নেমে আসছিল। তার মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে এগিয়ে যাওয়া নির্জন পথটার দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা একবার কেঁপে উঠল আমার। দশ বছর আগে একবার আমি এই কথাগুলো শুনেছিলাম। ওর বাবার মুখে। এইরকমই এক বর্ষার রাতে। এ জায়গাটার কাছাকাছি কোন জায়গাতেই।

হঠাৎ আমাদের পেছন থেকে বৃষ্টির আওয়াজকে ছাপিয়ে বোসসাহেবের গলাটা ভেসে উঠল, “মেয়েটাকে নিয়ে নিচু হও ভুবন—মাটিতে শুয়ে পড়। আয়াম গোইং টু-”

পেছন ফিরে দেখি গাড়ির ছাদের মধ্যেকার ঢাকনা খুলে গিয়ে সেখান দিয়ে বোসসাহেবের অন্ধকার মূর্তিটা মাথা তুলেছে। তাঁর হাতের ভারী অস্ত্রের বাড়িয়ে ধরা নলটার দিকে একমুহূর্ত তাকিয়ে দেখেই দু হাতে আদৃতাকে টেনে নিয়ে সটান সেই বৃষ্টিভেজা পথের ওপর গড়িয়ে গেলাম আমি, আর প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই আমাদের পেছন থেকে গম্ভীর গর্জন করে উঠল পয়েন্ট সেভেন বোরের মনস্টার লিকার। মাথার ওপর দিয়ে শীষ দিয়ে ছুটে গেল আগুনের রেখা। আর গুলির শব্দকে ছাপিয়ে, আমাদের মেরুদণ্ডের ভেতর কাঁপুনি ছড়িয়ে দিয়ে জঙ্গল জেগে উঠল গম্ভীর একটা গর্জনের শব্দে। বিরাট লাফ দিয়ে অতিকায় একটা শরীর যেন ছিটকে গেল পথের পাশের গভীর জঙ্গলে। তারপর ঝোপঝাড় ভেঙে একরাশ পায়ের শব্দ বৃষ্টির শব্দের ভেতর মিলিয়ে গেল।

“হিট অর মিস?”

গাড়িতে উঠে আসতে, তোয়ালে দিয়ে নিজের মাথাটা মুছতে মুছতে বোসসাহেব আদৃতার দিকে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলেন।

uponyasnarsernew02 (Small)ইঞ্জিনের তাপ এক ঝটকায় বেশ খানিকটা কমে গিয়েছে। গাড়িতে ফের স্টার্ট দিলাম আমি। ভেজা মাটির ওপরে সরসর করে একপাক ঘুরে উঠল চাকাগুলো, তারপর একটা বাঘের মতই লাফ দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল বিশ্বস্ত ল্যান্ডরোভার।

আদৃতার ঘোর তখনও কাটে নি। শূন্য দৃষ্টিতে বোসসাহেবের দিকে ঘুরে বলল, “আ-আপনি দেখেন নি?”

“না। আমি দেখিনি। গুলিটা একেবারে আন্দাজে, তোমার গতিপথটা দেখে চালিয়েছিলাম। এবং আমি যদি ভুল  না করে থাকি তাহলে ভুবনও ওটাকে দেখতে পায় নি। কিন্তু তুমি দেখেছ, তাই না? চোট হয়েছে?”

আদৃতা এবারে যখন কথা বলল, তার গলা অনেক স্বাভাবিক, “হ্যাঁ জেঠু। দেখেছি। সেই মুহূর্তের ফিলিংটাও মনে করতে পারছি। একটা ম্যাগনেটিক আকর্ষণ ছিল জন্তুটার দু চোখে। আমাকে টানছিল। ইন্টেলিজেন্ট দৃষ্টি। কিছু কমিউনিকেট করতে চাইছিল। কিন্তু কেবল আমি দেখতে পেলাম এটা আমার ঠিক বিশ্বাস-”

বোসসাহেব অসহিষ্ণু গলায় বলে উঠলেন, “এখন ওসব কথা ভাববার সময় নয়। আগে এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে কাঠেরিয়া পৌঁছোনো এখন আমাদের ফার্স্ট প্রায়োরিটি। এখন বল, চোটটা লেগেছে?”

“না। তবে একেবারে মাথার কাছ দিয়ে গ্রেজ করে গেছে সেইটা দেখেছি। তারপর জন্তুটা আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় নি।”

“সেটা ওর সৌভাগ্য। দ্বিতীয় শটটা ভুল করত না আর। যেটুকু আওয়াজ ও করেছিল তাতে আর একমুহূর্ত ওখানে দাঁড়ালে আজকে ওকে জ্যান্ত ফিরে যেতে হত না,” বলতেবলতেই বোসসাহেব তাঁর শক্তিশালী অস্ত্রটার গায়ে আদুরে হাত বুলিয়ে নিলেন একবার। তারপর বললেন, “সিটের ওপর দিয়ে বেয়ে পেছনে চলে আয় তো মা। আমার পাশে এসে বোস। ভুবন একাই বাকি রাস্তাটা চালিয়ে যাক। তোকে আর সামনের কাচের মুখে বসতে হবে না—”

********

uponyasnarsernew03 (Small)অন্ধকারের মধ্যে গাঢ়তর একটা অন্ধকারের দলার মত দাঁড়িয়ে ছিল বাড়িটা। হেডলাইটের উজ্জ্বল আলো তার গায়ে এসে পড়তে অন্ধকার যেন ভারী অনিচ্ছায় খানিকটা দখল ছেড়ে দিল তার ওপর থেকে। আলোর বৃত্তের ঠিক বাইরে একটা আদিম জন্তুর মতই অপেক্ষা করছিল তা। আমি অবাক হয়ে ঘুরে ঘুরে চারদিকে দেখছিলাম। দশ বছর আগে যখন এসেছি এখানে, এ বাড়ির এমন দুর্দশা ছিল না তখন। তার চারপাশে ঝোপজঙ্গল ভিড় করে এসেছে। উঁচু ভিতের গায়ে বর্ষার জল পেয়ে ফনফনিয়ে বেড়ে উঠেছে বনজ লতাগুল্মের দল।

বৃষ্টির তেজ কমে এসেছে ততক্ষণে। টিপটিপ করে ঝরে চলেছে যদিও। আদৃতা নেমে দাঁড়িয়ে নিজের ব্যাগটা পিঠে বাঁধতে বাঁধতে বলল, “এখানে কেউ থাকে?” বোসসাহেবও দেখলাম একটু অবাকই হয়েছেন। এ রাজ্যের জঙ্গলের সবচেয়ে বড়োকর্তা ছিলেন কিছুদিন আগেও। নিজের রাজ্যপাটে ঘুরতে এসে এহেন অভ্যর্থনা তিনি ঠিক আশা করেন নি। বিড়বিড় করে বললেন, “এখানে তো সূরযভান ক্যাজুয়ালের থাকার কথা! খুব দায়িত্ববান মানুষ। এর আগে যখন এসেছি তখন সাধ্যে যতটা কুলোয় তার চেয়ে বেশিই করেছে। খবর তো ওকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল—” বলতেবলতেই অধৈর্য হাতে গাড়ির হর্নটা চেপে ধরলেন তিনি।

প্রায় আধমিনিট ধরে হর্ন বাজিয়েও কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে যখন ভাবছি বাকি রাতটা গাড়ির ভেতরেই কাটিয়ে ফেলব, ঠিক তখন বাড়ির কোন একটা ঘরের ভেতর থেকে আওয়াজ এল, “আয়া সরজি-”

খানিক বাদে যে মানুষটা বের হয়ে এল তাকে দেখলে দশ বছর আগের সেই সূরযভান বলে চেনা যায় না। হঠাৎ করেই ভীষণ বুড়িয়ে গেছে লোকটা। পরনের পোশাক ময়লা। অযত্নে বেড়ে ওঠা চুলদাড়িতে মুখ ঢেকে গেছে।

“কী ব্যাপার সূরযভান? বাংলোর এমন হাল করে-”

কথাটা আর শেষ করা হল না বোসসাহেবের। হঠাৎ এগিয়ে এসে তাঁর পা দুটো জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল লোকটা। কাঁদে আর জড়িয়েমড়িয়ে বলে, “মেরা লীলাবিটিয়াকো লে গয়া সা’ব। উসকি জগহ মুঝে কিঁউ নহি লিয়া উস রাকষস্‌ নে? উসকি শাদি যো তয় হুঈ থী–”

বোঝা গেল শোকেদুঃখে এমনকি নরসেরজির ভয়টাও চলে গেছে তার মনের ভেতর থেকে। রাগের মাথায় দেবতাকে রাক্ষস ডাকতে শুরু করে দিয়েছে। থরথর করে কাঁপছিল লোকটা। শরীর বেশ গরম। টলছিল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। তার চেহারায় দীর্ঘ অর্ধাহার, ক্লান্তি আর বুক ভাঙা দুঃখের ছাপ। এগিয়ে গিয়ে দু হাতে জড়িয়ে ধরলাম আমি তাকে। একেবারে হালকা হয়ে গেছে মানুষটা এই অকাল বার্ধক্যের আক্রমণে।

আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতেই হঠাৎ দেখি তার চোখ গিয়েছে আদৃতার দিকে। সঙ্গেসঙ্গেই আমাকে ছেড়ে দিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেল সে। আঙুল দিয়ে দেখায় আর চিৎকার করে, “কিঁউ লে কে আয়া ইস বিটিয়াকো? ইসকো বলি চঢ়ানা হৈ ক্যা সাহাব? ভাগ যা বেটি –ভাগ—ভাগ যা তু ইঁহাসে—”

তার গায়ের কাঁপুনিটা বেড়ে উঠছিল। খিঁচুনি শুরু হয়ে গিয়েছে হাত পায়ে। আমি এগিয়ে গিয়ে ফের চেপে ধরলাম তাকে।

আদৃতা তার দিকে একঝলক তাকিয়েই তার ব্যাগটা খুলে একমনে ঘাঁটাঘাঁটি করছিল। খানিক বাদে  সেখান থেকে একটা বাক্স খুলে ছোটো একটা সিরিঞ্জ বের করে আনল সে। তারপর একটা কাচের অ্যাম্পুল কামড়ে ভেঙে তার ওষুধটা সিরিঞ্জের মধ্যে টেনে নিয়ে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে সূরযভানের হাতের পেশিতে ওষুধটা ঢুকিয়ে দিতেদিতেই চাপা গলায় বলল, “নক আউট পাঞ্চ। সাবধানে ধরে রাখুন।”

গাড়ি থেকে একটা কম্বল বের করে এনে সূরযভানের এলিয়ে পড়া শরীরটা তাতে মুড়ে নিয়ে ঘরের ভেতর উঠে এলাম। এমার্জেন্সি ব্যাটারির আলোয় দেখা যাচ্ছিল অযত্নের ছাপ তার চারপাশে। তারই মধ্যে একটা জায়গা খানিক পরিষ্কার করে তাকে শুইয়ে দিতেদিতেই বোসসাহেব স্লিপিং ব্যাগগুলো ভেতরে নিয়ে এসেছেন। তার দুখানা আমাদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “শুয়ে পড়ো। আমি জেগে থাকব।”

বাইরে বৃষ্টি ফের জোর হয়ে উঠছিল। অন্ধকারের মধ্যে হাওয়ার শোঁশোঁ আওয়াজ আর বনবাড়ির চালে বৃষ্টির ক্রমাগত শব্দ। মেয়েটা আমার পাশে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকে গুটিশুটি হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকের আলোয় তার মুখটা চোখে পড়তেই সূরযভানের প্রলাপ মনে পড়ে যাচ্ছিল। একে এখানে নিয়ে এসে কোনো ভুল করলাম না তো? বাইরে ওই অনন্ত অন্ধকারের মধ্যে রবি হয়ত এখন কোথাও—

আর ভাবতে পারছিলাম না আমি। বুকের ভেতর একটা গভীর অস্বস্তি পাক দিয়ে উঠছিল। বারবার শুধু দশ বছর আগের সেই রাতটার ছবি ভেসে আসছিল চোখের সামনে। রবি—

******

“মেয়েকে নরসেরজিই নিয়েছেন সেটা বুঝলে কেমন করে সূরযভান?”

সূরযভান দু হাঁটুর ফাঁকে মাথাটা গুঁজে দিয়ে মেঝের ওপর থেবড়ে বসেছিল। বেলা প্রায় দশটা বাজে। সকাল থেকে বৃষ্টিটিষ্টির বালাই নেই আর। রোদ উঠেছে। বাইরে ঝলমলে আলোয় বৃষ্টিধোয়া জঙ্গল ঝিলিক দিচ্ছিল। অবশ্য বেলা বাড়লে সে কোন রূপ ধরবে সেটার আন্দাজ পাওয়া মুশকিল। ইনটারনেট-এ ওয়েদার ফোরকাস্ট দেখবার উপায়ও নেই। কোনো ফোন কোম্পানির টাওয়ারই ধরে না এখানে।

লম্বা একটা ঘুম দিয়ে উঠে সূরযভান এখন অনেকটাই তাজা। টুকটুক করে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে গ্রাম থেকে হরিদাস নামে এক ছোকরাকে ডেকে এনেছে। সে এখন বাংলো ঝাড়পোঁছ করবার কাজে ব্যস্ত। তাদের দু’জনকে জেরা করে যতটুকু জানা গেছে, তাতে মাসকয়েক আগে ঘটনাটা ঘটেছে। লীলা সূরযভানের নিজের মেয়ে নয়। বউ মরেছে তার অনেককাল আগে। নিজের ছেলেপিলে নেই। একাই থাকত, তারপর বয়স বাড়ছে দেখে কাকা মোহনদাসের এই বড়ো নাতনীটিকে দত্তক নিয়েছিল চেয়েচিন্তে।

ভালোই চলছিল সবকিছু। কিন্তু বিপদ এল গত হোলির আগের দিন রাত্রে। বাংলোর উঠোনে হোলিকাদহন হবার পর আনন্দফূর্তি সেরে সবাই যখন ঘরে ফেরার পথ ধরবে তখন দেখা যায় লীলা নিখোঁজ। অতএব সন্দেহটা গিয়ে পড়েছে নরসেরজির প্যান্থারবাহিনীর ওপরেই। সূরযভান তার পর থেকেই একেবারে পাগলের মত হয়ে গেছে। দু একবার একাই সওশির পাহাড়ে গিয়ে চড়াও হবার মতলব করেছিল। গ্রামের লোকজন ধরেবেঁধে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। সে অবশ্য যতটা না সূরযভানের ভালোর জন্যে তার চেয়েও বেশি নরসেরজির রাগের ভয়ে। ছেলেপুলে নিয়ে ঘর তো সবাই করে।

সেই থেকে সূরযভান একাএকাই এই বনবাড়িতে পড়ে থাকে। তিনকুলে তার জন্য কাঁদবার কেউ নেই। গ্রামের লোকজন দু একবার তাকে বোঝাবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়েছে। সবাই ধরেই নিয়েছে কোনদিন সকালে এসে দেখবে বেচারা এইখানেই দেহ রেখেছে। তখন শাস্ত্রমতে তার কাজকাম করালেই হবে। চাষের মরসুমে কে আর অন্যের খেয়াল করে।

“কী হল, বলো?”

“তাছাড়া আর কে নেবে সা’ব? এখানে এই জঙ্গলে কে আসবে আমার মেয়েটাকে এভাবে নিয়ে যেতে? বড়ো ন্যাওটা ছিল আমার সাহেব। ওর ঠাকুর্দা চিরটাকাল নরসেরজির পুজো করে এল, আর তার মেয়েকেই শেষে কৃপা করে বসলেন নরসেরজি–”

“কোনো জন্তুজানোয়ারের আক্রমণও তো হতে পারে?”

“না সাহেব। গোটা এলাকা তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখা হয়েছে। মেয়ে দূরস্থান, তার পরনের কাপড়ের একটা টুকরোও চোখে পড়েনি কারো। তাছাড়া–”

“তাছাড়া –কী?”

“অন্য লক্ষণও ছিল সরজি। আগে বুঝিনি। হারিয়ে যাবার একমাস আগের ঘটনা। সন্ধেবেলা বিজনিয়ার হাট থেকে বাপবেটিতে সওদা করে ফিরছিলাম। তা মেয়ে আমার হঠাৎ বলে, ‘বাবা বাঘ।’ আমি সঙ্গেসঙ্গে দাঁড়িয়ে গিয়ে চারপাশের জঙ্গল ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলাম। নাক টেনে শ্বাস নিলাম। কোথাও কিছু নেই।

মেয়ের আমার কিন্তু বারবার ওই এক কথা, ‘বাঘ- ওই যে ঝোপের আড়ালে-আমাদের পিছু পিছু আসছে।’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেমন বাঘ?’ তা বলে, ‘কালো চিতাবাঘ।’ আমি হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলাম। জানতাম, নরসেরজি যাকে বলি নেবেন কেবল তাকেই বলি নেবার আগে দেখা দেন। অন্যে দেখতে পায় না। দেখাশোনা হয়ে বলি পছন্দ হলে তারপর তাকে ডেকে নেন নিজের ডেরায়—কিন্তু সরজি, তখন আমার যে কী হয়েছিল, আমি হেসে হেসে তাকে বললাম, ‘লীলাবিটিয়া ও তোর চোখের ভুল। অন্ধকারে কী না কী ঝোপঝাড় দেখে কালো বাঘ ভাবছিস।’ বাড়ি এসে এই বারান্দায় বসে কত হাসাহাসি হল সেই নিয়ে।”

বলতেবলতেই গলা ভারী হয়ে এল তার। কাঁদে আর বলে, “কেন আমি তখনই তাকে জঙ্গল ছাড়িয়ে ইটারসিতে তার পিসির বাড়িতে দিয়ে আসিনি? আমি আমার নিজের হাতে আমার বিটিয়াকে বলি হবার জন্য রাক্ষসের মুখে এগিয়ে দিলাম সরজি—আমি পাপী—পাপী—” এই বলে, আর দুহাতে দমাদম নিজের বুক চাপড়ায় সূরযভান।

হঠাৎ পেছন থেকে আদৃতার গলায় অস্ফুট একটা শব্দ শুনে মুখ ঘুরিয়ে দেখি, ছাইয়ের মত সাদা হয়ে গেছে মুখটা তার। আমাকে তাকাতে দেখে প্রায় জোর করেই মুখের ভাবটাকে বদলে ফেলল সে। তারপর দৃঢ় গলায় বলল, “না আংকেল। যা ভাবছেন তা মুখ ফুটে বলবেন না। আপনাদের অমান্য করতে ভালো লাগবে না আমার। বিপদ আসতে পারে না জেনে আমি এ পথে পা দিই নি।”

বললাম, “কিন্তু-”

“কোন কিন্তু নয় ভুবন। এটা মানুষের দুনিয়া। এখানে এসে একটা অজানা কোনকিছু রাজত্ব চালিয়ে যাবে, যখন খুশি মা বাপের কোল থেকে ছেলেমেয়ে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে তা হতে দেয়া যায় না,” হঠাৎ উত্তেজিত গলায় বোসসাহেব বলে উঠলেন। চোখদুটো চকচক করছিল তাঁর, “এ যদি নরসের হয়, তাহলে আমিও পল্লব বোস। আমার এলাকায় বসে থেকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে যাবে আর আমি লেজ গুটিয়ে পালাব?”

আদৃতা আমার হাতটা ছুঁয়ে বলল, “হ্যাঁ আংকল। আমারও খুব ভয় লাগছে আমি স্বীকার করছি। কিন্তু পালিয়ে আমি যাব না। কাল রাতে আমি ওকে দেখতে পেয়েছি। আপনারা পান নি। জেনেটিক ম্যাচিং-এর কোন একটা জাদু আছে এর মধ্যে। আর কোন ব্যাখ্যা হয় না এর। সম্ভবত জীবটাও এই পরীক্ষাটা করেই প্রথমে তার সম্ভাব্য শিকার বেছে নেয় অনেক লোকজনের মধ্যে থেকে। আমি তাতে কাল রাতে পাশ করেছি। এবারে ও দলবল নিয়ে যেভাবে হোক আমাকে ধরবার চেষ্টা করবেই। আপনি বলেছিলেন না, চলে যাবার আগে বাবা আপনার দিকে ঘুরে দেখেছিল একবার? এখনো যদি সেটুকু চেতনাও থেকে থাকে তাঁর মধ্যে, তাহলে একটা চেষ্টা করব আমি। আমার সঙ্গে আপনি আছেন, জেঠু আছেন। আ-আমি পারবই—আমি–”

বোসসাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আদৃতার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “আমি জানি তুমি পারবে মা। আর এত সাহসে বুক বেঁধে এত বিপদ মাথায় নিতে যখন রাজি হয়েছিস, দেখবি ভাগ্যও তোর সহায় হবে। হবেই। তাছাড়া, আমরা দুজন তো রইলাম সঙ্গে। পল্লব বোস শুধু দুতিনটে বন্দুকের ভরসায় এ খেলা খেলতে নামে নি এইটে জেনে রাখিস। আরো কিছু চমক আমার কাছে জমানো আছে।”

সূরযভান বাংলাটা একটু আধটু বোঝে। গোটা কথাবার্তাটাই মন দিয়ে শুনেছে বসে বসে। তার খানিক খানিক যে বুঝেছেও সেইটে বোঝা গেল তার এর পরের কাজটায়। সটান উঠে এসে আদৃতার পায়ের কাছে মাথা ঠোকে আর বলে, “আপ দেবী হৈ মাঈয়া। হমরা বিটিয়াকো ভি লওটা দো। উসকে লিয়ে মেরা জান কসম।”

তার দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকালাম নীরবে। বুলেট তো মাত্র একটাই রয়েছে আদৃতার কাছে। একটাই সুযোগ মিলবে আমাদের। তার পর—কিন্তু সে পরের কথা পরে ভাবা যাবে’খন।

**********

“সকাল থেকেই একটা কথা ভাবছিলাম জেঠু,” আদৃতা হঠাৎ বোসসাহেবের দিকে ঘুরে বসল। দুপুর পেরিয়ে বিকেল নামছে জঙ্গলে। সারাদিন পরিষ্কার থাকবার পর ফের আকাশে মেঘ জমছে আস্তে আস্তে। সামনে খানিক দূরে দুটো গাছের এমাথা ওমাথায় একটা অতিকায় ফ্লাইং স্কুইরেল ঝাঁপাঝাঁপি করছিল। বনবাড়ির বেড়ার ওধার দিয়ে একদল সম্বর খাওয়াদাওয়া সেরে রাতের বিশ্রামের জায়গার দিকে চলেছে।

“বলছিলাম, শিকারের ময়দানটা নরসেরকে বেছে নেবার সুযোগটা না দিলে কেমন হয়?”

বোসসাহেব একটা নতুন চুরুট বের করে নিয়ে তার মাথাটা কাটছিলেন। সেটা করতেকরতেই বললেন, “কী বলতে চাইছ?”

“বলছিলাম, নরসের এ জঙ্গলকে আমাদের চেয়ে নিঃসন্দেহে গভীরভাবে জানে। ফলে আক্রমণ যখন করবে তখন সে নিঃসন্দেহে এমন একটা সময় আর জায়গা বেছে নেবে যেখানে তার সুবিধেটা সবচেয়ে বেশি হয়।

“সময়টা যে রাত্রি হবে সেটার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই,” আমি বললাম, “যতগুলো ঘটনা শুনেছি বা দেখলাম, তাতে এরা আক্রমণ করে রাত্রে।”

“ঠিক। তার মানে মুখোমুখি হবার জন্য দিনের বেলাটা এদের কাছে সুবিধের নয় বলে ধরে নেয়া যায়। আমরা যদি দিনের বেলা ওর গুহায় গিয়ে-”

“দিনের বেলা? বোসসাহেবরা যখন ওখানে দিনের বেলা সার্ভে করতে গিয়েছিলেন, তখন এদের কোনো চিহ্ন পাননি কিন্তু সওশিরের পাহাড়ে। জঙ্গলের মধ্যে কোথায় যে ঘাঁটি গেড়ে থাকে এরা সেটাও কারো জানা নেই। সে খবর আগে জোগাড় না করে দিনদুপুরে নরসেরের গুহায় গিয়ে কোন লাভ হবে না আদৃতা।”

বোসসাহেবের চুরুটের মাথা কাটা শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেইটে ধরিয়ে একরাশ নীল নীল ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন, “আমার কিন্তু বিশ্বাস, হবে। অন্তত তার একটা ভালো সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। হিসেবে ভুল না হলে আমাদের ওখানেই তার দেখা পেয়ে যাওয়া উচিত।”

“এতটা নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে আপনি?”

“নিশ্চিত হচ্ছি এ জঙ্গলটাকে আমি হাতের তালুর মত চিনি বলে। এ আমার গত ত্রিশ বছরের কর্মক্ষেত্র ভুবন। ব্ল্যাক প্যান্থার একটা দুষ্প্রাপ্য জীব। অতগুলো সেই জন্তু যদি এ জঙ্গলের কোনোখানে লুকিয়ে থাকত তাহলে বনবিভাগের কোন না কোন সার্ভেতে তাদের দেখা যেতই। নরসের নিজে অদৃশ্য হতে পারে, কিন্তু তার চ্যালাচামুন্ডারা তা নয়। এর একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে। এরা ওই পাহাড়ের মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে ঘাঁটি গেড়ে আছে। সাধারণভাবে সেটা কারো চোখে পড়ে না। সেইটেকে খুঁজে বের করতে হবে শুধু প্রথমে। গুহার ভেতরের ছাদে নরসেরের যে অতিকায় ছবিটা আছে বললে, ওর তলায় শুয়ে থাকতে গিয়েই তো রবিকে প্রথম ধরেছিল। নিতান্ত তোমার বন্দুকের জোরে ওখান থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলে তোমরা। ওইখানে গিয়ে এবার আদৃতা আমাদের টোপ হবে। আসতে ওকে হবেই ভুবন। লোভ বড়ো মারাত্মক বস্তু হে!”

আমার চোখে হঠাৎ ভেসে উঠল, নরসেরজির গুহা থেকে রবিকে নিয়ে পালিয়ে আসবার সেই রাতটার কথা—এতক্ষণ এ দৃশ্যটা মনে পড়েনি কেন? পাহাড়ের সারা গায়ে অজস্র ছোটোবড়ো গুহামুখে জ্বলজ্বল করতে থাকা চোখেদের সার—

নিজের অজান্তেই বলে উঠলাম, “আছে। ওই সওশির পাহাড়ের মধ্যেই এ রহস্যের চাবিকাঠি আছে—”

বোসসাহেব মাথা নিচু করে বাঁহাতটা মুঠো করে তার ওপর ডান হাতের তর্জনী দিয়ে টোকা মারছিলেন। মুদ্রাদোষ। খানিক বাদে মাথা ঘুরিয়ে ডাক দিলেন, “সূরযভান—”

“আয়া সারজি—” রান্নাঘরের দিক থেকে তার গলার শব্দ পাওয়া গেল।

“আসতে হবে না। হরিদাসকে বলো, গাড়ির চাবি নিয়ে গিয়ে ডিকিতে একটা ট্রাংক রাখা আছে সেইটে নিয়ে আসতে এখানে।”

বের হবার সময়েই ট্রাংকটা গাড়িতে তুলে নিয়েছিলেন বোসসাহেব। তাতে কী আছে জিজ্ঞাসা করতে রহস্যময় একটা হাসি দিয়ে বলেছিলেন, “এমার্জেন্সি র‍্যাশন। কখন কী কাজে লেগে যায়?”

খানিক বাদে ট্রাংকটা দুহাতে বুকের কাছে ধরে হরিদাস এসে হাজির। বস্তুটা যে বেজায় ভারী সেটা তার হাঁটবার চালেই পরিষ্কার বোঝা যায়। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে ফের। ট্রাংকটা মেঝেতে এনে নামাতে তার গায়ের জলের ফোঁটাগুলো মুছে নিয়ে সেটাকে খুলে ফেললেন বোসসাহেব। ভেতর থেকে প্লাস্টিকে জড়ানো মেশিনগানের মতো একটা বস্তু বের করে এনে দেখিয়ে বলেন, “টিয়ার গ্যাস লঞ্চার। লেটেস্ট মডেল একেবারে। আটটা কার্ট্রিজ লাগানো যায় ম্যাগাজিনে। ষোলোখানা কার্ট্রিজ নিয়ে এসেছি।”

আমি অবাক হয়ে জিনিসটা হাতে তুলে নিয়ে দেখতে দেখতে বললাম, “এ জিনিস পেলেন কোথায়?”

“পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সাপ্লাই। ভুঁইয়া সাহেবকে চেনো তো?”

“হ্যাঁ। অ্যান্টি রায়টের ডিআইজি তো? এরেরা কলোনিতেই তো থাকে।”

“প্রমোটি বুড়ো। আমার সঙ্গে বেজায় ভাব। টেনিস ক্লাবে যাই একসাথে রোজ। তায় আবার বাঙালি। সেই সুবিধেটা কাজে লাগিয়ে ফেললাম। খুশি হয়েই জোগাড় করে দিয়েছে। বলে, ‘যা শান্ত শহর, এসব যন্তোর পড়ে থেকে জং ধরে যাবে। আপনি দু একটা শট মেরেটেরে আনুন। মেশিন চালু থাক।’”

বলতেবলতে আরো কটা পুঁটুলি বের হয়েছে বাক্সের ভেতর থেকে। তার মধ্যে বেশ কটা প্লাস্টিকের প্যাকেটে বড়ো সাইজের হোমিওপ্যাথির গুলির মতো একরাশ করে বস্তু ভরা। সেইসঙ্গে একটা ছোটো সাইজের গাড়ির ব্যাটারি, তার, আরো কীসব টুকিটাকি জিনিস। বস্তুগুলোকে আমি চিনি। আনফো এক্সপ্লোসিভ।

“হিঞ্জম্যান সিমেন্ট কোম্পানির ক্যাপটিভ মাইনিং প্ল্যান্ট আছে একটা সিহোরের দিকে। ওর এমডিকে বলেকয়ে জোগাড় করে আনলাম খানিকটা।’”

“ও দিয়ে কী করবেন?”

“দরকার আছে ভুবন। খোলা জঙ্গলে রাত কাটাবার প্রয়োজন হলে জায়গাটাকে ওই দিয়ে বুবি ট্র্যাপ করে নেব বলেই নিয়ে এসেছিলাম। সিমেন্ট কোম্পানির এক্সপ্লোসিভ লৌকিক অলৌকিক ভূত ভগবান বোঝে না। ওর গণ্ডির মধ্যে থাবা রাখলে আস্ত ফিরতে পারবে না তোমাদের নরসেরজি বা তার দলবল। কিন্তু এর খানিকটা আজ এখানেই কাজে লাগাবার দরকার হবে বলে মনে হচ্ছে।”

“এখানে বাংলোর মধ্যে-”

“ফাঁদ পাতব ভুবন। বাংলোর মধ্যে নয়। উঠোনে। একবার আদৃতা ওর হাতছাড়া হয়েছে যখন, তখন আজ রাত্রেও ওর একটা চেষ্টা করবার সম্ভাবনা আছে এইখানে।”

বাইরে সন্ধের অনেক আগেই আকাশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। বৃষ্টির তোড় বেড়ে উঠেছে আবার। খোলা দরজা দিয়ে ভেজা হাওয়া বয়ে আসছিল। তাতে বনের গন্ধ মাখানো। সেইদিকে একবার দেখে নিয়ে একটা রেনকোট টেনে নিয়ে অন্যটা আমার দিকে এগিয়ে ধরে বোসসাহেব বললেন, “পারলে একটু রেস্ট নিয়ে নাও এখন আদৃতা। রাত জাগতে হবে আজ। আমরা বাইরের কাজটা সেরে ফিরে আসছি।”

উঠোনের ওপারে বাংলোর চারপাশের তারকাঁটার বেড়াটা মোটামুটি অক্ষতই রয়েছে এখনো। তার মাঝখানে চওড়া একটা খালি জায়গা। ওখানে এককালে একটা গেট লাগানো ছিল। এখন আর নেই। সেখান থেকে মুরামের পায়েচলা পথ যেখানটায় এসে বাংলোর বারান্দার নিচে ঠেকেছে সেখানটায় একটা হাতখানেক লম্বা গর্ত খুঁড়ে ফেললাম বোসসাহেবের নির্দেশে। আনফো এক্সপ্লোসিভের দানাভরা দুটো প্যাকেটের সঙ্গে একটা ডিটোনেটোর একসঙ্গে প্লাস্টিকে প্যাক করে নেয়া হয়েছিল আগেই। জিনিসটাকে গর্তের মধ্যে রেখে সেটাকে ভালো করে বুজিয়ে দিয়ে ডিটোনেটারের তারের মাথাটা হাতে ধরে বারান্দায় উঠে এলাম যখন, ততক্ষণে রেনকোট থাকা সত্ত্বেও দুজনেই পুরো ভিজে গিয়েছি প্রায়।

ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢুকে অবশ্য মনটা ভালো হয়ে গেল। আদৃতা বিশ্রাম নেবার জন্য মোটেই ব্যস্ত নয় দেখলাম। এর মধ্যেই কখন রান্নাঘরে গিয়ে সূরযভানকে দিয়ে বড়ো বড়ো তিনকাপ চা আর একরাশ সেঁকা পাঁপড় তৈরি করিয়ে রেখেছে। বোসসাহেবের অবশ্য সেদিকে মন ছিল না। তারের অন্য মাথা ব্যাটারিতে আটকে সুইচটুইচ লাগিয়ে যতক্ষণে চায়ের কাপ হাতে নিলেন ততক্ষণে পাঁপড়ভাজা অর্ধেক শেষ।  তাতে লম্বা একটা আরামের চুমুক দিয়ে বলেন, “আসুক এবারে দেখি। গেঁইয়ো ভূতদের মধ্যে সর্দারি করে ওস্তাদ হয়েছে। পল্লব বোস থাকতে এই রাজ্যের জঙ্গলে ওসব নরসের টেরের দাপট বের করছি।”

********

“ভুবন—”

কখন যেন চোখদুটো জড়িয়ে এসেছিল একটু। কানের কাছে বোসসাহেবের মৃদু ডাকে ধড়মড় করে উঠে বসলাম আমি। মৃদু একটা আলো ছেয়ে ছিল চারপাশে। বাইরে বৃষ্টি থেমে গিয়ে চাঁদ উঠেছে। মাঝরাতের আধখাওয়া চাঁদ। তারই আলো চুঁইয়ে আসছিল ঘরের ভেতর। উঠে বসতে বোসসাহেব ইশারায় আদৃতার দিকে দেখালেন। আমার পাশে বসে থাকা তার শরীরটা মৃদু দুলছিল। চোখদুটো খোলা। বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মাথার চুল এলোমেলো হয়ে এসে পড়েছিল তার মুখের ওপর।

“আদৃতা মা-”

কানের কাছে বোসসাহেবের ডাকটা কানে যেতে হঠাৎ একটু শিউরে উঠে তাঁর দিকে চোখ ঘোরালো সে। তারপর ফিসফিস করে বলল, “সদর দরজার কাছে। এইদিকে তাকিয়ে আছে। আমায় ডাকছে—আমায়—”

“তোমার বাবার কথা মনে আছে আদৃতা? অতবড়ো বৈজ্ঞানিক, এখন একটা মূক জন্তু হয়ে–এই পশুটাই কিন্তু তাঁর জীবনটাকে–”

বোসসাহেবের নিচুতারে বাঁধা গলায় ইস্পাতের মত কাঠিন্য ছিল। এইবারে কাজ হল যেন। হঠাৎ চমকে উঠল আদৃতা। চোখের দৃষ্টি স্বাভাবিক হয়ে আসছিল তার। মাথাটায় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, “থ্যাংক ইউ জেঠু। একটু বেসামাল হয়ে গিয়েছিলাম। এবারে আমি ঠিক থাকব।”

“যেমন যেমন করতে বলেছি সেগুলো মনে রাখবে। আমার সিগন্যাল পেলে সঙ্গেসঙ্গে—”

“মনে আছে জেঠু। আ-আমি চেষ্টা করব-”

আমার চোখ তখন আর সেদিকে নেই অবশ্য। চাঁদের ফ্যাকাশে আলোয়, বৃষ্টি ভেজা উঠোনের নরম মাটির বুকে একটা আশ্চর্য জাদু দেখছিলাম আমি। সেখানে তখন নিজেনিজেই ফুটে উঠছে চারটে থাবার চলমান ছাপ। আস্তে আস্তে সেগুলো এগিয়ে আসছিল আমাদের দিকে।

আদৃতা আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। আমাদের দিকে তাকিয়ে ফ্যাকাশে মুখে হাসল একবার। তারপর, যেন কোন অদৃশ্য শেকলের টানে ঘর ছেড়ে বাইরে বের হয়ে গিয়ে বারান্দার ওপরে উবু হয়ে বসল।

একটা আশ্চর্য নাটক ঘটে চলেছিল আমাদের চোখের সামনে। বারান্দায় উবু হয়ে বসে আছে আদৃতা। তার গলা দিয়ে একটা অদ্ভুত শব্দ বের হয়ে আসছিল। আর, সামনের উঠোনের ওপর অদৃশ্য কোন মহাজীবের পদচারণায় কেবলই ফুটে উঠছিল সারসার থাবার চিহ্ন। আদৃতার শরীর থরথর করে কাঁপছিল। অনুমান করতে পারছিলাম, একটা মরণপণ যুদ্ধ চলেছে দুটো মনের মধ্যে। একদিকে একটা প্রাচীন, হিংস্র, অভিজ্ঞ মন আর অন্যদিকে তারুণ্যের শক্তিতে ভরপুর কিন্তু অনভিজ্ঞ একটা চেতনার মধ্যে নিঃশব্দ লড়াই চলছে।

বোসসাহেব হাতে সুইচটা নিয়ে যেন ধ্যানস্থ হয়ে বসেছিলেন। তাঁর সমস্ত মনোযোগ তখন কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে চলমান ছাপগুলোর দিকে। আস্তে আস্তে তা তখন এগিয়ে আসছিল মুরামের পথের ওপর মার্কা দেয়া বিস্ফোরণবিন্দুটার ওপরে। ভূতে ভগবানে কোনকালেই বিশ্বাস নেই আমার। কিন্তু সেই মুহূর্তে শুধু একটাই প্রার্থনা ঘিরে রেখেছিল আমার মনকে—শেষ নির্দেশটা যখন আসবে আদৃতার সে সময় যেন সেইটা পালন করবার মত আত্মনিয়ন্ত্রণটুকু বেঁচে থাকে—

“আদৃতা—জাম্প—”

বন্দুকের বুলেটের মতই তীক্ষ্ণ শব্দ করে বোসসাহেবের আদেশটা রাতের নিস্তব্ধতাকে হঠাৎ ফালাফালা করে দিয়ে গেল। আর সঙ্গেসঙ্গেই গোটাকয়েক ঘটনা একসঙ্গে ঘটে গেল মুহূর্তে্র মধ্যে। একটা লম্বা ব্যাকভল্টে আদৃতা ছিটকে এসে আছড়ে পড়ল আমাদের দুজনের মাঝখানে। বোসসাহেবের হাত থেকে সুইচটা ছিটকে গেল, কিন্তু ততক্ষণে তাঁর কাজ শেষ। সুইচের একটা চাপে গম্ভীর গর্জন করে উঠোনের ওপর মাটি ভেদ করে জেগে উঠেছে বিস্ফোরণের আগুন, একটা অদৃশ্য ভারী শরীর গিয়ে আছড়ে পড়েছে কিছুটা দূরে। বিস্ফোরণের শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল একটা অপার্থিব, গম্ভীর হুংকারের শব্দ।

“আই ক্যান সি ইট—মাই গড-ইটস বিগ-” বোসসাহেবের গলা শুনে তাড়াতাড়ি তাঁর বন্দুকের নলটা অনুসরণ করে দেখলাম, মাটির ওপর আস্তে আস্তে ফুটে উঠছে একটা অতিকায় প্যান্থারের অবয়ব। চোট পেয়েছে বটে কিন্তু তাতে কাবু হয় নি সে। ক্ষিপ্রগতিতে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে আসতে থাকা অবয়বটা। বোসসাহেব নিশানা নিয়েছিলেন, কিন্তু গুলিটা চালাবার অবসর দিল না সে। একটা অর্ধস্বচ্ছ কাচের জীবের মত চেহারা নিয়ে বিরাট লাফে তারকাঁটার বেড়া পার হয়ে উল্টোদিকের ঝোপঝাড়ের ভেতরে চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল।”

বন্দুকটা হাতে করে বোসসাহেব ছুটে বের হয়ে গিয়েছিলেন উঠোনের ওপর। আদৃতা আমার পাশে মাটিতে শুয়ে থরথর করে কাঁপছে তখনও। ঘোরটা তার পুরোপুরি কাটেনি। পাশ ফিরে তার গায়ে একটা কম্বল জড়িয়ে দিয়ে বললাম, “চোখ বুজে থাকো। আর ভয় নেই কোন।”

হঠাৎ দু হাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরে জড়ানো গলায় সে বলল, “মাথাটা ছিঁড়ে পড়ছে আমার আংকল। কী ভয়ানক শক্তি ওই চোখদুটোতে—আর এক মুহূর্ত দেরি হলে আমি বোধ হয় আর—”

“এদিকে এসো ভুবন। দেখে যাও। নরসেরের অদৃশ্য রহস্য উদ্ধার হয়েছে।”

মেয়েটাকে শুইয়ে রেখে তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে গেলাম। মাটির ওপর এখানে সেখানে রক্ত ছিটিয়ে পড়েছে। আঙুলে করে তার একটুখানি তুলে ধরে আমায় দেখিয়ে বোসসাহেব বললেন, “রক্ত। ওতেই ওর রহস্যটা লুকিয়ে আছে ভুবন। রবির সঙ্গে তোমার অ্যাডভেঞ্চারের গল্পটা মনে কর। বাঘটাকে গুলি করবার পর তার কাঁধে একটা ক্ষত হয়েছিল। শুধুমাত্র তখনই তুমি ওটাকে দেখতে পেয়েছিলে তাই না?”

আমি নিঃশব্দে ঘাড় নাড়লাম। বোঝা যাচ্ছিল, অদৃশ্য ওই নরসের সাধারণ অবস্থাতে কেবল তার শিকারের চোখেই ধরা দিলেও, দেহ থেকে রক্তপাত হলে যতক্ষণ সে ক্ষত রক্ত ঝরায়, ততক্ষণ তার অদৃশ্য হবার শক্তি হারিয়ে যায়।

হাতের ঘড়িতে দেখলাম তিনটে বাজছে। দেরি করতে মন চাইছিল না আমার। আহত পশুকে অনুসরণ করবার মধ্যে একধরণের উত্তেজনা আছে। বোসসাহেবের দিকে ফিরে বললাম, “ট্রেল করবেন?”

উনি মৃদু হেসে বললেন, “এই রাত্রে? চারপাশে তাকিয়ে দেখো ভুবন। এই আদিম জঙ্গল ওর নিজের জমি। রাতের অন্ধকার ওর শক্তির উৎস। আর আমরা? দশ পনেরো হাতের বেশি দৃষ্টি চলবে না আমাদের এখন। বোকার মত প্রাণ দেবার জন্য এ খেলায় আমি নামিনি। ঘরে ফিরে চলো। ঘন্টাদুয়েক জেগে কাটিয়ে ভোরের আলো ফোটবার সঙ্গেসঙ্গে রওনা হব আমরা। পালিয়ে ও যাবে কোথায়? ঘাঁটি বলতে তো ওই সওশির পাহাড়।”

শালবনের পাতায় বৃষ্টির শব্দ হচ্ছিল। বেলা প্রায় সাড়ে নটা হবে। মাথার ওপর ঘন মেঘের আড়ালে সূর্য কোথায় মুখ লুকিয়েছে কে জানে। তার হালকা আলোর আভাস সে জঙ্গলকে আলোকিত করতে পারে নি। চারপাশের ঝোপঝাড়ে সন্ধ্যেবেলার মতই অন্ধকার ছড়িয়ে রয়েছে। নিঃশব্দে পথ চলছিলাম আমরা। আদৃতাকে মধ্যে রেখে আগেপিছে আমরা দুজন। আদৃতা মাঝেমাঝেই রেনকোটের ওপর দিয়ে তার কোমরে বাঁধা ডার্টগানটার গায়ে হাত ছুঁইয়ে দেখে নিচ্ছিল। মনের অবস্থাটা তার বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না আমার। একটা ক্ষীণ আশা। অনেকগুলো অনিশ্চয়তা রয়েছে গুলিটা চালানো আর তার ফল হবার মধ্যে। তবু সেই সামান্য আশাটুকুকে অবলম্বন করেই বাঘের গুহায় মাথা গলাতে চলেছে সে।

uponyasnarsernew04 (Small)শালবন শেষ হয়ে আসছিল। গাছের ভিড় সামান্য হালকা হয়ে আসছে। সামনে, হাতের বাঁয়ে সওশিরের পাদদেশ আর বেশি দূরে নয়। গাছের ফাঁক দিয়ে খানিক দূরে মেঘের দিকে সটান উঠে যাওয়া নীলচে কালো নিস্তব্ধ চূড়াটা চোখে পড়ছিল। রাস্তাটা বাঁহাতে একটা বাঁক নিয়ে এগিয়ে গেছে তার পাদদেশের দিকে।

 “একটা জিনিস খেয়াল করেছ ভুবন?” হঠাৎ বোস সাহেব পেছন থেকে নিচু গলায় বলে উঠলেন, “একটা অন্যরকম শব্দ আসছে কাছাকাছি কোথাও থেকে। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই কানে আসছে আমার-”

আমি কান খাড়া করে চুপ করে রইলাম। চারপাশের নিশ্ছিদ্র নীরবতার মধ্যে মাথার ওপর শালবনের ক্যানপির মধ্যে জল ঝরবার ঝরঝর শব্দ পাওয়া যায় শুধু।

“নাঃ। আমি কিন্তু অন্যরকম কিছু-” কথাটা শেষ করবার আগেই শব্দটা এবারে আমার কানেও ধরা পড়ল। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে থাকা মৃদু একটা আলাদা রকমের আওয়াজ। হাতের ডানদিক থেকে আসছে। বনেজঙ্গলে চাকরির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা না থাকলে একে জঙ্গলের আর পাঁচটা স্বাভাবিক শব্দের থেকে আলাদা করে চিনতে পারা কারো সাধ্যের বাইরে।

বোসসাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সেইদিকে খানিক তাকিয়ে রইলেন। নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলছিলেন, “হালকা কোনো জীব। দোপেয়ে। আমি দেখছি। তুমি আদৃতাকে কভার করবে-”

 আমার ইশারা পেয়ে আদৃতা আস্তে আস্তে পিছিয়ে এসে বাঁদিকের একটা ঝোপের ভেতর ঢুকে বসেছে ততক্ষণে। তাকে আড়াল করে ভেজা পথের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে কাঁধের বন্দুক নামিয়ে আনতে আনতেই মাটির ওপর চার হাতপায়ে উবু হয়ে ক্ষিপ্র একটা শ্বাপদের মতই উল্টোদিকের জঙ্গলের ভেতরে ছুটে গেল বোসসাহেবের শরীরটা, আর তার পরেই ধপ করে একটা শব্দ উঠল সেখানকার ভেজা মাটিতে। সেইসঙ্গে সাহেবের চিৎকার, “কৌন হৈ তু? কাপড়া উতার আপনা মুহ সে—”

ছুটে গিয়ে দেখি, আপাদমস্তক চটে ঢাকা একটা মানুষের শরীর কাদার ওপর চিত হয়ে পড়ে আছে, আর বোসসাহেব তার ওপরে ঝুঁকে হাঁক ছাড়ছেন। কাছে পৌঁছোতে পৌঁছোতেই অবশ্য রহস্যের উন্মোচন হয়ে গেল। লোকটা সূরযভান। বোসসাহেবের পায়ের নিচে শুয়ে ইনিয়েবিনিয়ে কাঁদছে। বলে, “মুঝে আপনা সাথ লে চলো বড়াসাব। বঁহা মেরি লড়কি ভি তো হৈ—” বলতেবলতেই তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সে তার মাটিতে ছিটকে পড়া অস্ত্রটা ফের হাতে তুলে নিল। একটা তীক্ষ্ণধার বল্লম। কোমরে একটা দা-ও বেঁধেছে।

জেরায় জানা গেল, সাহেবরা নরসেরের আস্তানায় হামলা বোলতে যাবেন জানতে পেয়ে আগের রাত থেকেই তার ঘুম হয় নি আর। আগে থেকে বললে সাহেবরা অনুমতি দেবেন না তা সে ঠিক বুঝেছিল। তাই লুকিয়ে লুকিয়ে পিছু নিয়েছে। আমাদের দুজনের রাগি মুখের দিকে ঘুরে ঘুরে সে চায় আর ভেউ ভেউ করে কাঁদে। শেষে পেছনে আদৃতাকে এসে দাঁড়াতে দেখে তার শরণ নিল সূরযভান। বলে, “বিটিয়া তু ইনলোগোকো সমঝা। উসনে তেরি বাপকো ছিনা, ঔর মেরা জিগর কা টুকরাকো ভি ছিন লিয়া। উনসে লঢ়না তেরে জৈসা মেরা ভি হক বনতা হৈ।”

আদৃতা বিপন্ন চোখে একবার তার দিকে আর একবার আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল। বোসসাহেবের মুখটা দেখি একটু নরম হয়ে এসেছে। মাথা নেড়ে বলেন, “ব্যাটা যে যুক্তি দিয়েছে তার ওপরে কিছু বলার নেই। ঘরের মা মেয়েদের সম্মান বাঁচাতে এ মুল্লুকের লোকেরা এইভাবেই জান কবুল করে। এইটাই দস্তুর।” তারপর সূরযভানের দিকে ফিরে বলেন, “ঠিক আছে চল তবে। অস্ত্রশস্ত্র তো ভালোই সঙ্গে এনেছ। তা চালাবার জোর আছে কবজিতে নাকি-”

সূরযভান বোসসাহেবের দিকে একঝলক কৃতজ্ঞ দৃষ্টি ফেলে বলল, “অগর জরুরত পঢ়া তো দেখ লিজিয়ে গা সা’ব।” তারপর সামনে এগিয়ে গিয়ে পথটার ওপর দাঁড়িয়ে সওশির পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলে, “ইস খুলে রাস্তে সে যানা ঠিক নহী হোগা সা’ব। হমারে সাথ আইয়ে-”

পথ ছেড়ে বাঁদিকের জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়লাম আমরা। বৃষ্টির জল পেয়ে বেড়ে ওঠা আন্ডারগ্রোথ আমাদের কোমরের কাছাকাছি উঠেছে। তাই ভেঙে এগোতে এগোতেই খেয়াল করছিলাম জমি আস্তে আস্তে ওপরের দিকে উঠছে।

জঙ্গল ভেঙে খানিকদূর এগিয়ে একটা শুঁড়িপথ নজরে পড়ল। না জানা থাকলে এর অস্তিত্ব টের পাওয়া সম্ভব নয়। গাছপালা, ঝোপঝাড়ের আড়াল নিয়ে সাপের মতন পাক খেয়ে তা উঠে গেছে সওশিরের চুড়োর দিকে।

“একে সঙ্গে নিয়ে কাজটা ভালোই করেছি বলে মনে হচ্ছে হে,” পেছনপেছন হাঁটতে হাঁটতে বোসসাহেব বলে উঠলেন একবার, “লোকাল লোক। পথঘাটের ঘাঁতঘোত ভালোই চেনে। খোলা রাস্তা দিয়ে গেলে নরসেরের চ্যালাচামুন্ডাদের চোখে পড়বার যতটা ভয় থাকত, এখানে ততটা হবে না।”

সরু রাস্তাটা তখন একটা খাড়া চড়াইয়ের রূপ নিয়েছে। ভেজা, পিচ্ছিল পথ বেয়ে সাবধানে উঠতে হয়। চারপাশে ঝুলে থাকা ভেজা ঘাসের মুথা আর শেকড়বাকড় ধরে ধরে উঠতে উঠতে হঠাৎ একসময় বৃষ্টিঝরা মেঘের ব্যাকগ্রাউন্ডে ছুরির ফলার মতন আকাশের দিকে মাথা তোলা পাহাড়চূড়াটা দেখা গেল ফের। এইবারে তা একেবারে সামনে এগিয়ে এসেছে। আদৃতা একমুহূর্তের জন্য আমার হাতে সজোরে একটা চাপ দিয়ে ধরেই কী মনে করে ফের ছেড়ে দিল তা। তারপর দৃঢ়পায়ে এগিয়ে গেল সামনের খোলা জায়গাটার দিকে।

চারপাশে ঢেউখেলানো মসৃণ মাথার পাহাড়ের দলের মধ্যে এক তীক্ষ্ণ ব্যতিক্রমের মত দেখায় এই চূড়াটাকে। তার একেবারে গোড়ায় ফুট দেড়েক উঁচু আর ত্রিশফুট লম্বা ফাটলটা একটা ভূতুড়ে হাসিমুখের মতন জেগে রয়েছে। এই হল নরসেরের গুহায় ঢোকবার পথ।

নিরন্ধ্র অন্ধকার ফাটলটার সামনে দাঁড়িয়ে যার যার ঝোলা থেকে আলো লাগানো হেডব্যান্ডগুলো বের করে কপালের সঙ্গে বেঁধে নিচ্ছিলাম আমরা তিনজন।

“দরকার না হলে একত্রে আলোগুলো জ্বালাবে না। একবারে একটাই আলো জ্বলবে,” হেডব্যান্ডের ক্লিপ আটকাতে আটকাতে বোসসাহেব সাবধানবাণী দিচ্ছিলেন, “একএকটা আলো দুঘন্টা পর্যন্ত চলে। হিসেব করে চললে অন্তত ঘন্টাছয়েক আলো পাওয়া যাবে তিনটে মিলে।

“প্রথমে আমার আলোটা জ্বালব। সাবধানে আমার পিছু পিছু এস।” বলতেবলতেই কপালের আলোটাকে জ্বালিয়ে নিয়ে ফাটলটার মুখে পা দিয়ে উঠে বসে তার ভেতরে নেমে গেলেন বোসসাহেব।

 আগের বারও দেখেছি, তবু অতটুকু উচ্চতার ফাটলের ভেতর দিয়ে ঢুকে অত বিশাল একটা গুহায় পৌঁছে ফের একবার আশ্চর্য হয়ে গেলাম। বহুকাল সমুদ্রের নিচে ডুবে থাকা এই পর্বতশ্রেণীর শরীরে সমুদ্রের জল এরকম অনেক স্থাপত্যই গড়ে দিয়েছে। বোসসাহেবের হেডব্যান্ডে বাঁধা আলোর তীব্র রশ্মি তার ভেতরের জমাট অন্ধকারকে ফালাফালা করে দিচ্ছিল। দেয়ালজোড়া অজস্র গুহাছবির যুদ্ধরত অর্ধমানব আর অর্ধপশুর দল যেন বহুদিন পরে হঠাৎ আলোর স্পর্শ পেয়ে বহুবর্ণ ঝিলিক দিয়ে উঠছে আমাদের চারপাশে।

গুহার ঠিক মাঝখানে ছাদের গায়ে অতিকায় ব্যাঘ্রমানবের ছবিটা সিংহাসনের ওপর রাজার মতন বসে ছিল। তার চোখের জীবন্ত দৃষ্টি বুকের ভেতর কাঁপুনি তুলছিল আমার। দশ বছর আগে—ওই ছবির নিচে রবির পাশাপাশি আমিও শুয়ে পড়েছিলাম। পরীক্ষায় পাশ করিনি, তাই বেঁচে গিয়েছিলাম হয়ত। কিন্তু সেই তীব্র মানসিক আক্রমণের অনুভূতিটা এখনও আমার স্মৃতিতে আছে। আর এ মেয়েটা স্বেচ্ছায় বাঘ ধরবার টোপ হয়ে সেখানে-

বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধের সঙ্গেই একটা বুনো বোঁটকা গন্ধও ভাসছিল। গন্ধটা আমাদের অচেনা নয়। বোসসাহেব সতর্ক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁকে ইশারায় ডেকে নিয়ে আমি নীরবে গুহার একপাশে ঢালু হয়ে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া গলিটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তীব্র গন্ধটা ওইদিক দিয়েই ভেসে আসছে।

 আগে থেকেই কী করা হবে তার একটা পরিকল্পনা ছকেই নেয়া ছিল। সেইমত আদৃতাকে গুহার ঠিক মাঝখানে ছাদের সেই অতিকায় ছবিটার নীচে শুইয়ে দেয়া হল। সুড়ঙ্গটার মুখে গিয়ে পোজিশান নিয়ে দাঁড়ালেন বোসসাহেব। বাইরের দরজায় পাহারায় থাকা সূরযভানকে ইশারায় সতর্ক করে দিয়ে আমি গিয়ে আদৃতার পাশে বসে ইশারা করতেই বোসসাহেবের আলোটা নিভে গেল।

অন্ধকারটা সঙ্গেসঙ্গেই ঝাঁপিয়ে এল চারদিক থেকে। পেছনে অনেক দূরে ফাটলের মুখটা একটা লম্বা দাগের মত আলোকিত হয়ে আছে। কিন্তু সে আলো গুহার দরজা পেরিয়ে ভেতরে পৌঁছোয় না।

মিনিটের পর মিনিট কেটে যাচ্ছিল আমাদের সেই নিঃসীম অন্ধকারের রাজত্বে। তারপর হঠাৎ আদৃতার গলার মৃদু গোঙানির শব্দে সতর্ক হয়ে উঠলাম আমি। শব্দটা বোসসাহেবের কানেও গিয়েছিল। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই তীব্র আলোর একটা ফলা ধেয়ে এল আদৃতার শরীরটা লক্ষ্য করে। আর তারপরই বোঁটকা গন্ধের একটা ঝটকা নাকে এসে লাগল আমার। মাথা ঠান্ডা করে বোসসাহেবের দিকে আলো ফেললাম একবার। তিনি একইভাবে বসে রয়েছেন ঢালু হয়ে যাওয়া গলিটার দিকে তাকিয়ে। তার মানে ওদিকে নতুন কিছু ঘটেনি। তাহলে গন্ধটা—

সন্তর্পণে আদৃতার মুখটাকে দেখলাম একবার। চোখদুটো খোলা। স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে ওপরের দিকে। ঠোঁটদুটো অস্ফুটে নড়ছে। কথাগুলো ভালো করে শোনবার জন্য মুখটা তার কাছে নামিয়ে আনতেই হঠাৎ গন্ধটা বেজায় তীব্র হয়ে উঠল। সেইসঙ্গে মৃদু গরগর করে একটা শব্দ উঠে আসছিল। আদৃতার ঠোঁটদুটো নড়ছে। ফিসফিস করে অচেনা কোনো ভাষায় কিছু একটা বলে চলেছে সে—গরগর শব্দটা তার মুখ থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। তাহলে কি–

মাথার মধ্যে একটা ধারণা গড়ে উঠতে শুরু করছিল আমার। আদৃতাকে ঘিরে মেঝেটার ওপরে  আলো ফেলে ফেলে সন্তর্পণে পাক দিতে শুরু করলাম আমি। মেঝের এ জায়গাটা সম্ভবত ফাঁপা। আগে খেয়াল করিনি, পা ফেললে মৃদু ফাঁকা শব্দ হচ্ছে। একটা লম্বাটে চৌকো পাথরের স্ল্যাব রয়েছে ছবিটার ঠিক নীচে। আদৃতা শুয়ে রয়েছে তার ঠিক ওপরটাতে। স্ল্যাবটা ওপর থেকে বসানো। তার জোড়ের কাছে মাথা নামালে গন্ধ আর শব্দ দুটোই বেড়ে উঠছিল! ওখানে কেউ বা কিছু একটা আছে— সবার চোখের আড়ালে শিকারের একেবারে কাছাকাছি এসে হাজির হয়ে–

ভাবনাটা মাথায় আসতেই উঠে দাঁড়িয়ে আদৃতাকে হ্যাঁচকা টানে তুলে ধরলাম আমি। হেডব্যান্ডের আলোটা জ্বেলে তার ফাঁকা মুখের ওপরে ঘুরিয়ে ধরলাম। হঠাৎ একটা গোঙানির শব্দ বের হয়ে এল তার মুখ থেকে। তার ফাঁকা দৃষ্টিতে তীব্র ভয়ের ছাপ ফিরে আসছিল।

ঝটাপটির শব্দ পেয়ে বোসসাহেব আর সূরযভান ততক্ষণে দুপাশ থেকে এগিয়ে এসেছেন গুহার কেন্দ্রের দিকে। আদৃতাকে সূরযভানের দিকে ঠেলে দিলাম আমি। ততক্ষণে সে চেতনা ফিরে পেয়েছে খানিকটা। তবু ঘোরলাগা ভাবটা পুরো কাটে নি তার। বৃদ্ধ সূরযভান তাকে দুহাতের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মৃদু গলায় কিছু বলছিল। আমাদের তখন সেদিকে কান নেই। স্ল্যাবটার ঠিক মাঝখানে একটা ছোটো গর্তমত রয়েছে। তার মধ্যে অ্যানফো এক্সপ্লোসিভ আর ডিটোনেটোরের একটা পুঁটুলি রেখে দিয়ে দ্রুতহাতে তার টেনে নিয়ে বেশ খানিকটা দূরে সরে গেলাম আমরা তিনজন।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিস্ফোরণের শব্দে থরথর করে কেঁপে উঠল গোটা গুহাটা। আর সেই শব্দকে ছাপিয়ে উঠল মেঝের নিচে থেকে আসা একটা বুনো গর্জন। শব্দটা হয়ে একটা উপকার হল অবশ্য। আদৃতার ঘোরলাগা ভাবটা দেখি একেবারে কেটে গিয়েছে। সূরযভানের হাত ছাড়িয়ে সে নিজেই সবার আগে এগিয়ে এল বিস্ফোরণের জায়গাটার দিকে।

পাথরের স্ল্যাবটা উড়ে গিয়ে তার ঠিক নীচে অন্ধকার একটা গর্ত দেখা দিয়েছে। সেদিকে দেখে বোসসাহেব মাথা নাড়তে নাড়তে বিড়বিড় করছিলেন, “ইনজেনিয়াস। ওপরের ছবিটা একটা ধোঁকার টাটি। এই স্ল্যাবের নীচ থেকে কোন সুড়ঙ্গ এর ঘাঁটির দিকে গিয়েছে। এইখানে এসে শিকারের শরীরের নীচে দাঁড়িয়ে তার সম্মোহন চালাত ব্যাঘ্রদেব নরসের। এইবার–একে বাগে পেয়েছি।”

গর্তটার ভেতরে আলো ফেলে দেখা গেল সেটা বেশি গভীর নয়। একে একে লাফ দিয়ে সেখানে নেমে এসে এদিক ওদিক একটু তাকাতেই নজরে পড়ল তার একপাশ দিয়ে লম্বা একটা সুড়ঙ্গ চলে গেছে পাহাড়ের অন্দরমহলের দিকে। সেইদিকে দেখিয়ে বোসসাহেব মৃদু গলায় বললেন, “চলো। এইবার শেষ মোকাবিলার পালা।” বলতেবলতেই দ্রুত ঝোলা খুলে গ্যাস মুখোশক’টা বের করে আমাদের দুজনের হাতে দিয়ে নিজেও একটা নাকে বেঁধে নিলেন, তারপর পেছন ফিরে সূরযভানের দিকে ঘুরে তার কাঁধের বৃষ্টিভেজা গামছাটা নিয়ে তার নাকেমুখে বেঁধে দিয়ে নিজের পাওয়ারলেস চশমাটা তার চোখে এঁটে দিতে দিতে বললেন, “খুলিস না। নইলে ধোঁয়াকামান চললে জ্বলুনি কাকে বলে টের পাবি।” আমি ততক্ষণে আমার স্যাক থেকে টিয়ার গ্যাস লঞ্চারটা বের করে এনে তার কার্ট্রিজগুলো একবার পরীক্ষা করে নিয়ে ফিতেটা গলায় পরে নিয়েছি।

“সবার সামনে থাকবে ভুবন। কোন আক্রমণ হলে কী করতে হবে তা তোমাকে আমি আগেই ব্রিফ করেছি। আমি তোমার ঠিক পেছন থেকে তোমায় ফায়ার কভার দেব। আমার পেছনে থাকবে আদৃতা, আর সূরযভান সবার পেছনে আসবে—” বোসসাহেবের নির্বিকার, ঠান্ডা গলায় দেয়া নির্দেশগুলো শুনলে মনে হবে ড্রয়িংরুমে বসে রাঁধুনিকে রান্নার রেসিপি বলে দিচ্ছেন। এমন গলা চরম বিপদের মুখেও বুকে ভরসা আনে। আলো নিভিয়ে আমরা নিঃশব্দে সেই অন্ধকার শুঁড়িপথটা ধরে এগিয়ে চললাম।

ক্রমশই ঢালু হয়ে উঠছিল রাস্তাটা। হাওয়ায় দমচাপা ভ্যাপসা ভাবটা বেড়ে চলেছে। কপালে ঘাম জমে উঠছিল আমাদের। এঁকেবেঁকে পথটা এগিয়ে চলেছে পাহাড়ের একেবারে শেকড়ের দিকে। চারপাশে তখন কাঁধ ঘেঁষে এসেছে নিরেট পাথরের দেয়াল। ছাদটা আস্তে আস্তে নিচু হয়ে আসছিল। সরু একটা লাইন বেঁধে আস্তে আস্তে মাথা ঝুঁকিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা। কিন্তু খানিক বাদে সেটাও আর সম্ভব হল না। একটা বাঁক ঘুরতেই কপালে সজোরে ঠোকা খেয়ে পিছিয়ে এলাম আমি। আলোটা জ্বালাতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু বোসসাহেব আমাকে বারণ করলেন। তারপর পকেট থেকে একটা ছোটো টর্চ বের করে এনে সেটা একমুহূর্তের জন্য জ্বেলে নিয়েই ফের বন্ধ করে দিলেন। ক্ষীণ, লালচে আলোর ক্ষণস্থায়ী আবছায়ায় দেখলাম, নতুন রাস্তাটার ছাদ মাথা থেকে বড়োজোর ফুটচারেক ওপরে।

বোসসাহেব গ্যাসমুখোসটা খুলে একবার বাতাস শুঁকলেন। তারপর মুখোশটা ফের পরে নিয়ে অন্ধকারের মধ্যে আমার পাশ দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন, “বাঘের গন্ধ। কাছাকাছি এসে পড়েছি। সাবধান। কোন শব্দ নয়–”

নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিয়ে সুড়ঙ্গটার মধ্যে এগিয়ে যেতে শুরু করলাম আমরা। পথ মোটামুটি সমতল। মেঝের ওপর ধুলোর আবরণ পুরু হয়ে থাকায় এগিয়ে যেতে বিশেষ কষ্ট হচ্ছিল না। কিন্তু তারপর, অঘটনটা  ঘটে গেল একেবারে হঠাৎ করেই। আগে থেকে কোন ইঙ্গিত না দিয়ে অন্ধকার পথটা একেবারে হঠাৎ খাড়াই হয়ে প্রায় আশি ডিগ্রি নতিতে ঝাঁপ দিল নীচের দিকে। টাল সামলাতে না পেরে নিচের দিকে গড়িয়ে গেলাম আমরা–

**********

নীচে এসে আছড়ে পড়বার প্রথম কটা মুহূর্তের হতভম্ব ভাব কেটে যেতে খেয়াল হল খুব বেশিদূর গড়িয়ে পড়িনি। জায়গাটার পাথুরে মেঝের ওপর জমে থাকা পুরু শ্যাওলার স্তর  আঘাতকে অনেকটাই রুখে দিয়েছে।

গ্যাস মুখোসের আবরণ ভেদ করে, শ্বাস বন্ধ করা একটা দুর্গন্ধ ভেসে আসছিল নাকে। মেঝেটার ওপরে এখানে ওখানে জমে আছে গুহার ছাদ চুঁইয়ে নেমে আসা জল। তীব্র পচা গন্ধ উঠছিল তার থেকে। তার সঙ্গে মিশে থাকা পশুদেহের বোঁটকা গন্ধ আর পচা মাংসের গন্ধ মিলে জায়গাটার বাতাস ভারী হয়ে আছে।

সম্বিত ফিরতে উঠে দাঁড়িয়ে চারদিকে সতর্ক চোখে তাকিয়ে দেখলাম একবার। ভেলভেটের মত অন্ধকারের ভেতর যতদূর চোখ যায় জোনাকির মত রাশ রাশ সবজেটে আলোর ফুলকি জ্বলছে। আস্তে আস্তে আমাদের ঘিরে সেগুলো কাছে এগিয়ে আসছিল নিঃশব্দে—

যন্ত্রের মতন কাজ করছিলাম আমরা। চারজন চারদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আদৃতাকে ঘিরে একটা ব্যূহ তৈরি করে নিয়েছি। আলো নিয়ে কৃপণতা করবার উপায় নেই আর। তিনটে আলো একসঙ্গে জ্বলে উঠেছে তিনজনের কপালে। সেই আলোয় যতদূর চোখ যায় সেই অতিকায় গুহার ভেতরে অসংখ্য কালো প্যান্থারের ভিড়। জানি হয়ত কোন লাভ হবে না, তবু আমাদের হাতের অস্ত্রগুলো তৈরি হয়ে আছে যেকোন মুহূর্তে প্রত্যাশিত আক্রমণের জন্য।

নিঃশব্দে আমাদের ঘিরে একটা গোল বৃত্ত তৈরি করে অপেক্ষা করে চলেছিল প্যান্থারের দলটা। অতিকায় এই পাতাল গুহার চত্বর আমাদের আলোর সীমারেখাকে ছাড়িয়ে আরো দূরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে। সেই অন্ধকারের মধ্যে তখন ক্রমশই ভিড় জমাচ্ছিল আরো অসংখ্য সবুজ জোনাকির মত চোখের দল। পেছনদিকে, যেখানটা দিয়ে এসে নেমেছি সেই দিকটাতেও তখন সতর্ক পাহারা দিয়ে চলেছে তাদের কয়েকজন।

uponyasnarsernew05 (Small)হঠাৎ আমার গায়ে একটা ধাক্কা দিয়ে বাইরে বের হয়ে এল আদৃতা। আর তার পর বিরাট সেই গুহার দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল তার তীক্ষ্ণ গলার স্বর, “বাবা, আমি তোমার আদৃতা, আমি এসেছি বাবা। তোমায় ফিরিয়ে নিয়ে যাব আমি। এখানে তুমি থেকে থাকলে—” কথাগুলো বলবার সঙ্গেসঙ্গে তার মাথার হেডল্যাম্পের আলো ঘুরে চলেছিল গুহার চারদিকে। ঝিকিয়ে উঠছিল অপেক্ষমান অজস্র চোখ।

তার বাকি কথাটাকে ডুবিয়ে দিয়ে হঠাৎ গুহার দূরতম প্রান্তে ডেকে উঠল একটা বাঘ। হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে সে জায়গাটায়। হেডল্যাম্পের আলোয় দেখা যাচ্ছিল, জমাট বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা প্যান্থারের দলটার মধ্যে দিয়ে দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে একটা মাঝারি চেহারার বাঘ।

বৃত্তটার মধ্যে পৌঁছে জীবটা হঠাৎ একেবারে থেমে গেল। তার সবুজ চোখের দৃষ্টিতে কোন হিংস্রতার আভাস ছিল না। ধীরে—খুব ধীরে তার চোখে চোখ রেখে আদৃতা এগিয়ে যাচ্ছিল তার দিকে- তার হাতে তখন উঠে এসেছে সেই অদ্ভুতদর্শন ডার্টগান।

কিন্তু জীবটার কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছোবার আগেই গুহার অন্য একটা দিক থেকে জেগে উঠল আরেকটা গম্ভীর গর্জন। আমাদের আলোগুলোর মুখ সেদিকে ঘুরে গেছে। ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে থাকা প্যান্থারের দল দুপাশে সরে গিয়ে পথ করে দিচ্ছিল। তার মধ্যে দিয়ে ভারী পায়ে সামনে এগিয়ে আসছিল রাজকীয় চেহারার একটা প্যান্থার। এগিয়ে আসতে আসতেই বারবার মুখ ঘুরিয়ে সে চেটে নিচ্ছিল কাঁধের ওপরের গভীর ক্ষতচিহ্নটাকে। সেখান থেকে তখনও সামান্য রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে।

বৃত্তের মাঝখানে এসে, ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া অন্য জীবটাকে থাবার এক আঘাতে বেশ খানিকটা দূরে ছিটকে ফেলে দিল সে। তারপর শীতল, গভীর চোখদুটোকে তুলে ধরল আদৃতার চোখের দিকে।

একবার একটু কেঁপে উঠেই একেবারে স্থির হয়ে গেল আদৃতা। তার হাত থেকে ডার্টগানটা মাটির ওপর খসে পড়েছে। হঠাৎ গুহার বদ্ধ হাওয়ায় বাজের মত ফেটে পড়ল প্যান্থারদের মিলিত গর্জনের শব্দ। নিজেদের জায়গায় স্থির থেকে বারংবার গর্জে উঠছে তারা। সেই মিলিত জয়ধ্বনির শব্দের মধ্যেই আমাদের চোখের সামনে ধীরে ধীরে মাটিতে উবু হয়ে বসে পড়ছিল আদৃতা। পায়ের নিচে একটা গর্তের ভেতর জমে থাকা জলের ওপর উবু হয়ে বসে হঠাৎ নিজের ডানহাতটার মণিবন্ধে কামড়ে ধরল সে।

সম্মোহিতের মতন সেইদিকে তাকিয়েছিলাম আমরা দুজন। বুঝতে পারছিলাম আর দেরি নেই। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছিল আমার। ফুলের মত মেয়েটা দুনিয়া পেরিয়ে এসে এইখানে—তার পরিচিত পৃথিবীর চোখের আড়ালে—

কিন্তু সেই মুহূর্তে এক আশ্চর্য কঠিন বাঁধনে বাঁধা ছিল আমাদের মনগুলো। সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের শিকার। তার কাঁধের ওপর দিয়ে সরাসরি হৃৎপিন্ডে একটা গুলির আঘাত শুধু—অথচ সেই মুহূর্তে নিজের হাতের একটা আঙুলও নাড়াবার মত ইচ্ছাশক্তিও অবশিষ্ট ছিল না আমাদের কাছে।

তীক্ষ্ণ দাঁতের খোঁচায় আদৃতার মণিবন্ধ থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত বের হয়ে তখন মিশে যাচ্ছে গর্তের জলের সঙ্গে। প্যান্থারদের গর্জন থেমে গেছে একেবারে। নিঃশব্দে অপেক্ষা করে চলেছে তারা সে নাটকের পরের অবশ্যম্ভাবী দৃশ্যটার জন্যে, যে দৃশ্যে একদিন তাদের প্রত্যেকেই হয়ত অংশ নিয়েছিল। ধীরে ধীরে রক্তমেশা সেই জলের দিকে মাথা নামিয়ে আনছিল মেয়েটা। তার সামনে গর্বিত চোখে নিঃশব্দে অপেক্ষা করছিল ব্যাঘ্ররাজ নরসের।

কিন্তু জলের মধ্যে মুখ আর ঠেকানো হল না তার। হঠাৎ সেই গুহাকে কাঁপিয়ে দিয়ে দ্বিতীয় একটা গর্জন ভেসে উঠল। চমক ভেঙে তাকিয়ে দেখি ছিটকে পড়ে থাকা প্যান্থারটা ফের উঠে দাঁড়িয়েছে এবারে। নরসেরের থাবার আঘাতে তার ঘাড়ের কাছে খানিকটা চামড়া ছিঁড়ে উঠে এসেছে। রক্ত ঝরছিল সেখান দিয়ে। দ্বিতীয় আরেকটা গর্জন বাতাসে ছুঁড়ে দিয়ে সে এক লাফে এসে পড়ল নরসেরের পিঠের ওপর। তীক্ষ্ণ দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরল তার শরীর। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই একসঙ্গে গর্জন করে উঠল সেই অপেক্ষমান প্যান্থারের দল। হেডলাইটের আলোয় ঝিকিয়ে উঠল মাড়ি বের করা সারসার তীক্ষ্ণ দাঁতের আক্রমণসংকেত। আমাদের ঘিরে তাদের বৃত্ত দ্রুত ছোটো হয়ে আসতে শুরু করেছে তখন।

আকস্মিক আক্রমণে মুহূর্তের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল জীবটা। আদৃতার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে মাথা বেঁকিয়ে হিংস্রভাবে সে আক্রমণ করল অন্য প্যান্থারটাকে। আর তার সঙ্গেসঙ্গেই টের পেলাম, আঙুলে সাড় ফিরে আসছে আমার।

কিন্তু হাতের অস্ত্রটা তুলে ধরবার আগেই আমাদের পেছন দিক থেকে হঠাৎ ছিটকে এল সূরযভানের রোগাভোগা শরীরটা। চোখের সামনে তার মেয়েরই বয়সী আরো একটা মেয়ের আসন্ন দুর্ভাগ্যের ছবিটা তার মন থেকে সমস্ত ভয় মুছে দিয়েছে। অতিকায় জীবটার কাছাকাছি পৌঁছে তার হাতের বল্লমের ফলা একবার ঝিকিয়ে উঠেই বিঁধে গেল তার শরীরে। সঙ্গেসঙ্গে একটা যন্ত্রণার শব্দ করে তার দিকে বিরাট মাথাটা নামিয়ে আনল নরসের।

uponyasnarsernew06 (Small)আমার হাতে উঠে আসা লঞ্চার থেকে তখন আমাদের বৃত্তটার মধ্যে বারবার আছড়ে পড়ছে টিয়ার গ্যাসের গোলা। ধোঁয়ায় ঢাকা এলাকাটার মধ্যে ছুটে ঢুকে আসতে গিয়েও গর্জন করে বারংবার পিছিয়ে যাচ্ছিল প্যান্থারের দল। তীব্র জ্বলুনীধরা ধোঁয়া ব্যাঘ্ররাজকেও ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল নিঃসন্দেহে। হঠাৎ মাটির দিকে মাথাটা একবার নীচু করেই এক মুহূর্তের জন্য পেছনের দুপায়ে ভর দিয়ে খাড়া হয়ে উঠল সে। তার দাঁতের ফাঁকে সূরযভানের রক্তমাখা শরীরটা দুলছিল। বুকটা অরক্ষিত অবস্থায় আমাদের সামনে খোলা।

সেই একটা মুহূর্তই যথেষ্ট ছিল বোসসাহেবের জন্য। গুহার বাতাসকে কাঁপিয়ে পরপর দুবার গর্জন করে উঠল তাঁর হাতের মনস্টার লিকার। রক্তের একটা ধারা ফোয়ারার মত লাফ দিয়ে উঠল নরসেরের বুকের ভেতর থেকে। ক্লোজ রেঞ্জে পয়েন্ট সাত ক্যালিবারের দুটো বুলেট তার হৃৎপিন্ডকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।

দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই আস্তে আস্তে দুলছিল তার শরীরটা। মুখের থেকে সূরযভানের প্রাণহীন শরীরটা খসে পড়ে গেছে নিচে। আর সেইসঙ্গেসঙ্গেই ঝড়ের মতন একটা বদল আসছিল তার চেহারায়। মাথা বাদে তার বাকি শরীরটা দ্রুত বদলে গিয়ে এক অতিকায় মানুষের চেহারা নিচ্ছে তখন।

কয়েক মুহূর্ত মাত্র। তারপরই দু হাতে হাওয়া আঁকড়ে ধরবার ব্যর্থ চেষ্টা করে মাটির ওপর আছড়ে পড়ল ব্যাঘ্রমুখ অতিকায় জীবটির শরীর।

প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই গোটা গুহাটার মধ্যে একটা নৈঃশব্দ জেগে উঠল। যেন কোন মন্ত্রবলে থেমে গেছে প্যান্থারদের মিলিত যুদ্ধের ডাক। টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ার আবরণ মিলিয়ে গেছে ততক্ষণে। কিন্তু তবু আমাদের দিকে এগিয়ে আসবার কোন চেষ্টা করছিল না হিংস্র চেহারার প্রাণীগুলো। খানিকক্ষণ আগের সেই হিংস্রতার কোন চিহ্নও আর অবশিষ্ট নেই প্রাণীগুলোর মধ্যে। নরব্যাঘ্রের মৃত্যুর সঙ্গেসঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে তাদের মনের ওপর তার আধিপত্যের যুগ।

“অন্তত ছ’টা বুলেট এর শরীরে না ঢুকিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হব না,” গ্যাসমুখোশটা এক টানে খুলে ফেলে দিয়ে ফের একবার মাটিতে পড়ে থাকা মূর্তিটার দিকে বন্দুক উঁচিয়ে ধরছিলেন বোসসাহেব। কিন্তু হঠাৎ আদৃতা এগিয়ে এসে বন্দুকের নলটা দু হাতে আঁকড়ে ধরল তাঁর। ক্লান্ত গলায় বলল, “না জেঠু। একটু সময় দিন আমায়। ওখানে-”

তাকিয়ে দেখি, নরব্যাঘ্রের পিঠের ওপর তখনও লেপটে রয়েছে তার আক্রমণকারী প্যান্থার। তার রক্তমাখা শরীর দেখে বোঝা যাচ্ছিল, অসম সেই যুদ্ধে গভীর চোট পেয়েছে সে। আদৃতাকে সামনে দেখতে পেয়ে এইবার সে ধীরে ধীরে নেমে এসে আহত শরীরটাকে টানতে টানতে এগিয়ে এল তার কাছে। তারপর তার পায়ের কাছে মাটিতে মাথা রেখে বড়ো নিশ্চিন্তে চোখদুটো বুজে ফেলল।

বোসসাহেব নীরবে তাদের কাছে এগিয়ে এসে প্রাণীটার পাশে বসে পড়লেন। তার দেহের নানা জায়গায় হাত ঠেকিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু অনুভব করে নিয়ে যখন মুখ তুললেন, তখন তাঁর চোখে হাসির স্পর্শ, “ত্রিশটা বছর জীবজন্তুদের নিয়েই তো কাটালাম মা, যতটুকু জ্ঞানগম্যি আমার আছে সেই দিয়েই বলছি, কোন গভীর আঘাত পায় নি এ। দেহের চামড়া আর মাংসে ঘা খেয়েছে কিছু। তুমি ভয় পেয়ো না।”

কৃতজ্ঞ চোখে তাঁর দিকে একবার তাকিয়ে দেখল আদৃতা। তারপর নিজের মুখ থেকে গ্যাসমুখোশটা খুলে ফেলে এদিক ওদিক তাকিয়ে কিছুদূরে ছিটকে পড়ে থাকা ডার্টগানটাকে কুড়িয়ে নিয়ে এল। শুয়ে থাকা জীবটার পাশে দাঁড়িয়ে তার দিকে সেটা তাক করে ধরতে হঠাৎ চোখদুটো খুলে গেল প্রাণীটার। সামনে উদ্যত অস্ত্র দেখে এক মুহূর্তের জন্য একটা আদিম হিংস্রতার স্পর্শ বুঝি খেলে গেল সেই চোখদুটোতে। কিন্তু তার পরের মুহূর্তেই ফের একবার শান্ত, কোমল হয়ে এল তা। মাথাটা উঁচু করে পূর্ণদৃষ্টিতে আদৃতার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে অপেক্ষা করে রইল সে।

একটুক্ষণ ওইভাবে স্থির থেকে তারপর বন্দুকটা ধীরে ধীরে নামিয়ে আনল আদৃতা। ওষুধভরা ডার্টটাকে তার থেকে খুলে এনে হাতে নিল। অজানা একটা রাসায়নিক। একটা জীবদেহে তার সম্পূর্ণ ডোজ কীভাবে কাজ করবে তা কেউ জানে না। হাতটা একবার কেঁপে উঠল বুঝি তার। তারপর বাঘটার মাথাটা নিজের কোলের মধ্যে নিয়ে বসে বড়ো যত্নে, সন্তর্পণে সে ডার্টের তীক্ষ্ণমুখ ছুঁচটা সজোরে গেঁথে দিল তার গলার পাশে দপদপ করতে থাকা ধমনীর ওপর।

যন্ত্রণাদায়ক আঘাতটা পেয়ে একটা করুণ শব্দ করে ডেকে উঠল জীবটা। তার শরীরে মৃদু একটা কাঁপুনি শুরু হয়েছে। কাঁপুনিটা আস্তে আস্তে তীব্র খিঁচুনিতে বদলে যাচ্ছিল। তীক্ষ্ণ নখওয়ালা থাবাগুলো আছাড়িপিছাড়ি করে ছুঁড়ে চলেছে সে চারদিকে। তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে তার কাছ থেকে আদৃতাকে একরকম টেনে সরিয়ে নিয়ে এলাম আমি। জীবটার গায়ে হাতের ছোঁয়া লেগেছিল আমার। তার গায়ের উত্তাপ একলাফে অনেকটা বেড়ে গিয়েছে। দেহের প্রতিটা কোষের মধ্যে যেন একটা আগুনে লড়াই চলেছে তার। আর সেই ছটফটানি চলতেচলতেই একটা বদল আসছিল তার চেহারায়। গায়ের কুচকুচে কালো লোমগুলো ঝরে পড়ে বের হয়ে আসছিল বাদামি রঙের চামড়া। দ্রুত বদলে যাচ্ছিল শরীর আর চারটে থাবার গড়ন। বোসসাহেবের বন্দুক তখন কানফাটানো শব্দ করে ফের আগুন উগড়ে চলেছে পাশে পড়ে থাকা নরব্যাঘ্রের নিঃসাড় দেহের ওপর।

 “ভুবন,” একটা  ক্ষীণ গলার শব্দ পেয়ে পেছন ফিরে তাকালাম আমি। মাটির ওপর শুয়ে থাকা রবি আমাকে ডাকছিল। তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে তার গায়ের ওপর স্যাক থেকে বের করে আনা একটা তোয়ালে ছড়িয়ে দিলাম আমি।

“ও—ও কে?”

তার প্রসারিত আঙুলের দিকে একবার তাকিয়ে আমি বললাম, “তোর মেয়ে রে। কত বড়ো হয়ে গেছে দ্যাখ একবার। বিরাট বড়ো পণ্ডিত হয়েছে। কতো নামডাক। পৃথিবী উজিয়ে এইখানে এসেছে তোকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। এখন ওঠ। বাড়ি চল।”

“আমায় একটু বসিয়ে দে তো,” রবির প্রসারিত হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় ধরে নিল আদৃতা। তারপর বড়ো যত্ন করে তুলে বসিয়ে দিল তাকে। চারদিকে অপেক্ষা করতে থাকা জন্তুগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে দেখল রবি। তারপর মুখের কাছে দুহাত জড়ো করে গম্ভীর একটা ডাক ডেকে উঠল পরপর তিনবার। ডাকটা শুনে সচকিত হয়ে কান খাড়া করল জন্তুগুলো। তারপর হঠাৎ পেছন ঘুরে দ্রুতপায়ে মিলিয়ে গেল গুহার অন্যপাশের গভীর অন্ধকারের মধ্যে।

*********

“কিন্তু ওরা? ওদের কী হবে ভুবন?”

রবির দেখানো পথ ধরে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ফিরে এসেছি তখন মাটির ওপরের নরসেরের গুহায়। সূরযভানের শরীরটা বয়ে আনছিলাম আমি আর বোসসাহেব। এইবারে একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। শরীরটা মাটির ওপর নামিয়ে রেখে আমি বললাম, “এর জবাব আমার কাছে নেই রবি। কিছু করতে পারলে আদৃতা পারবে।”

আদৃতা আলো ফেলে ফেলে গুহার দেয়ালের ছবিগুলো দেখছিল। দেয়ালের কাছে থেকেই উত্তর দিল, “ভেব না বাবা। আমরা আবার ফিরে আসব এখানে। পথ যখন পেয়েছি তখন এদের প্রত্যেককে আবার নিজের জীবনে ফিরিয়ে দেব আমরা। নরসেরের অভিশাপ শেষ হয়ে গেছে।”

তার হাতের আলোটা তখন দেয়ালের একপাশে একটা বিরাট ছবির প্যানেলের ওপর গিয়ে পড়েছে। সেখানে দুটো গ্রামের মাঝখানে বিস্তীর্ণ খোলা জমির ওপর চিতাবাঘের দুটো দল একে অন্যের সঙ্গে মরণপণ লড়াইতে ব্যস্ত। তাদের বেশ খানিকটা পেছনে নিরাসক্ত ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন নরসের, মহিষাসুর, পক্ষীমানব আমন রা, কুকুরের মাথাওয়ালা আনুবিস, ছাগমুণ্ড দক্ষজীবের দল।

হঠাৎ সেইদিকে তাকিয়ে একটু শিউরে উঠল রবি, “ভুল করছিস আদৃতা। শেষ হয়ে যায় নি এখনো। ছবিগুলো ভালো করে দ্যাখ। ওরা সবাই আছে। মাত্র একজন নরসেরকে আমরা শেষ করতে পেরেছি। কিন্তু সভ্য দুনিয়ার চোখের আড়ালে আজও নেপালের অরণ্যে রাজত্ব করে চলেছে মহিষাসুর। মিশরের মরু অঞ্চলে এখনো আনুবিসের অন্ধকার শাসনের শেষ হয় নি। ব্রাজিলের গভীর জঙ্গলের দ্বিপদ পুমাজীব, লক নেসের অতিকায় মৎস্যমানব, জাভাদ্বীপের উড়ন্ত দানব আ হুল—ওদের শেষ নেই।

“এতগুলো বছর তাদের একজনের সঙ্গে থেকে আমি এদের সবার কথা গভীরভাবে জেনেছি। জেনেছি মানুষের সভ্যতার শুরুতে, সূর্য নিভে যাওয়া এক প্রাচীন গ্রহের অন্ধকার, আর্দ্র বুক থেকে মহাকাশ সাঁতরে তাদের আলোহীন তারকাযানের এই গ্রহের বুকে নেমে আসবার ইতিহাস, জেনেছি বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের ছড়িয়ে পড়বার কাহিনী। আমাদের কাজ শেষ হয় নি মা। সবে তার সূচনা হল এইখানে।”

************

পাহাড় বেয়ে সূরযভানের মৃতদেহ বয়ে আস্তে আস্তে নীচে নেমে আসছিলাম আমরা। এখন শেষ বিকেল। বৃষ্টি থেমে গিয়ে বনের মাথায় মাথায় সোনালি রোদ খেলছে। সেইদিকে তাকিয়ে আদৃতা হঠাৎ নিচু গলায় বলল, “ভেবো না বাবা। তুমি দেখে নিও। আমরা পারবই—”

uponyas04 (Small)ছবিঃ মৌসুমী

Advertisements