পুজো স্পেশাল ইন্দ্রশঙ্করের ডানা ইন্দ্রনাথ শরৎ ২০১৭

জয়ঢাক পুজো স্পেশাল ২০১৭ সব লেখা একত্রে 

উত্তরবঙ্গের বক্সার দুয়ারে একখানা গ্রাম। গ্রাম সদর বলে লোকে। পাহাড়ের কোলে সে গ্রাম। ছোটো ছোটো পায়ে সেইখানে উঠে এসে যদি জিজ্ঞেস করো ইন্দ্রদার বাড়ি কোনটা! যে কেউ বলে দেবে। গাছপালা ঘেরা একটা দোতলা বাড়ির কাঠের রেলিং এর পাশে পাশে টবেও লাগানো রয়েছে ফুলগাছের চারা।

একদিন আমরা ছোটোয় বড়োয় মিলে কলকাতার ভোরুকা মাউন্টেনিয়ারিং ট্রাস্টের সাথে হৈ হৈ করে এসে পড়লাম সেখানে। নিউ আলিপুরদুয়ার থেকে আমাদের বন্ধুরাও এল আমাদের সঙ্গে।

সারদিন আড়ালে আড়ালে তদারকি করল মানুষটা। ইন্দ্রদাদা। মাঝারি উচ্চতা। হাসিমুখ। কথা কম। রান্নাঘরে তার ব্যস্ততার শেষ নেই। পাছে ছোটোদের খাবারের কোনো অসুবিধে ঘটে! গানে গল্পে হাসি মজায় এদিক ওদিক ঘোরাঘুরিতে কেটে গেল সারাটাবেলা। দিন গড়িয়ে এল। সন্ধ্যা নামল। আলো আঁধারিতে গুটিশুটি মেরে আমরা ঢুকে পড়লাম দোতলার একটা ঘরে। এসময় ইন্দ্রদা এলেন। ইন্দ্রশংকর থাপা।

মৃদু হাসি তার মুখে। নীচের উঠোনে চাঁদের আবছা আলোয় মায়া মায়া হয়ে রয়েছে। ইন্দ্রদা এসে শুরু করলেন গল্প। যেন রূপকথা। মা পাখি আর ছানা পাখিদের গল্প।

– তারপর ছানাপাখিরা তো খুব চেঁচামেচি শুরু করল। তারা বলছে মা, ওমা, খিদে পেয়েছে। বাবা, ও বাবা খিদে পেয়েছে।

ইন্দ্রদার গলা অমনি ছানাপাখিদের স্বর থেকে বদলে গেল বাবা পাখির গলায়। বাবা পাখি তখন বলল, এই তো রোসো বাছা। এই যাব আর আসব। এক্ষুণি।

বাবা পাখি তো উড়ে উড়ে চলে গেলো দক্ষিণের বনে। আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম ইন্দ্রদার পিঠে মুড়ে রাখা দুটি ডানা। এইবারে সেটা খুলে গেল। টান টান ছড়িয়ে দিয়ে ইন্দ্রদাই বাবা পাখি হয়ে উড়তে লাগলেন ঘরের মধ্যে। ছোটো একরত্তি ঘরখানা হয়ে উঠল দক্ষিণের জঙ্গল। উড়তে উড়তে বাবা পাখি এসে পড়ল সেইখানে, যেখানে পাখিধরা মানুষ জাল পেতে বসে রয়েছে। আর খাবার খুঁজতে খুঁজতে বাবাপাখি গিয়ে পড়েছে একেবারে জালের মধ্যিখানে। ব্যস আর তো উড়তে পারল না। ডানা ভারী হয়ে এলো।

এদিকে ছানাপাখিদের তো খুব খিদে পেয়েছে। বেলা গড়িয়ে আসে। ছানারা ততই নিস্তেজ হয়ে আসে। তারা মিহি গলায় ডাকে,

– মা, মা গো, খিদে পেয়েছে। মা, মা গো …

মা অস্থির হয়ে ওঠে। ইন্দ্রদা অস্থির হয়ে ওঠেন। অবিকল মা পাখির স্বর এবারে তার গলা থেকে।

– এই তো বাছা। এই তো বাবা এলো বলে। আচ্ছা আমি দেখছি। যাব আর আসব। চুপটি করে থাকো, লক্ষীটি!

এই না বলে মা পাখিও উড়ে গেলো দক্ষিণের দিকে। জঙ্গলে। ইন্দ্রদাও ওড়া শুরু করলেন মা পাখির মতো সাদা নরম পালকের ডানা মেলে। উড়তে উড়তে ক্লান্ত ডানা। আকাশের অনেক ওপর থেকে মাটির কাছাকাছি নেমে এলো মা পাখি। আর সেখানেই পাতা ছিল মানুষের পাতা জালের ফাঁদ। আর মা পাখি তখনই দেখতে পেল বাবা পাখিকে। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। মাকেও আটকে পড়তে হল জালে।

– তাহলে ছানাদের খাবার জোগাড় হবে কী করে?

ছোটোরা সমস্বরে বলে ওঠে। ইন্দ্রশংকরও সটান দাঁড়িয়ে পড়েন মেঝের ওপরে।

– কী করে?  কী করে?

জঙ্গল পাহাড় জুড়ে সকলের সমবেত স্বর ছড়িয়ে পড়তে লাগল। গাছে গাছে, পাহাড়ের ঢালে ঢালে, জঙ্গলের আনাচে কানাচে। সন্ধ্যার আঁধারে মৌন সবাই। মন খারাপ। ছানাপাখিরাও ঝিমিয়ে পড়েছে। আহা রে বাছারা আমার! চোখও তো ফোটেনি তাদের! ওড়ার মতো তত শক্তও হয়নি ডানা। এখন তাদের কে খাওয়াবে! ডানা ঝাপটানোর মৃদু আওয়াজ শোনা যায়। ইন্দ্রশংকর তার ডানা মুড়ে রাখেন। তারপর যেন আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে এমন করে স্কুলের ছেলেমেয়েদের জড়ো করতে লাগলেন। অদৃশ্য ছেলেমেয়ের দল এপাহাড় ওপাহাড় থেকে ইন্দ্রশংকরের পিছে পিছে এসে জড়ো হয়। এ পাহাড় সে পাহাড়, এগ্রাম সে গ্রাম ঘুরে চলেন ইন্দ্রশংকর। আমরাও ঘুরে ঘুরে চলি তার পেছন পেছন। তারপর সকলে মিলে জড়ো হল ইস্কুলের মাঠে। এক ভোরবেলায়। সকলেই নিয়ে এসেছে যে যার গুলতি। যা দিয়ে এতকাল পাখপাখালি কাঠবিড়ালি খরগোশ আঘাত করে এসেছি।

সবাই মিলে এক জায়গায় জড়ো করল গুলতির ঢের। ডাঁই হয়ে উঠল একটা স্তূপ। মাস্টারমশাই সকলকে নজর করলেন। একজন নেই। তার নজর এড়ায়নি। বিকাশ। সে আসেনি তো। সকাল গড়িয়ে দুপুর। তবু তার দেখা নেই। একজনও যদি বাদ পড়ে যায়, মাস্টারমশাই মনে মনে ভাবেন, তাহলে তো অভিযান সফল হবে না। হতেই পারে না। গুলতির পাহাড় অমনিই রইল। ছেলের দল রইল পাহারায়। মাস্টারমশাই একলাই বেরিয়ে পড়লেন বিকাশের খোঁজে। জঙ্গলের গভীরে। বনপথের আশেপাশে। কোথায় গেল ছেলেটা। দুষ্টু ছেলে, তবু অবাধ্য তো সে নয়!

– বিকাশ, বিকাশ!

মাস্টারমশাই ডাকেন। ইন্দ্রশংকর ডাকেন। দেখাদেখি আমরাও গলা মেলাই।

– বিকাশ, বিকাশ!

জবাব দেয় না কেউ। জঙ্গলে হাওয়া লেগে ডালপালা দোলে। সড়সড় শব্দ হয়। পাখি ডাকে না। জানোয়ারের আওয়াজ মেলে না। নিঃশব্দ কেন চারিপাশ? ব্যাপারখানা কী! অবশেষে বিকাশকে খুঁজে পাওয়া গেল। একটা উঁচু গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে সে। কাছে যেতেই স্পষ্ট হল বিষয়। একটা মা পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে। গুলতির ছোঁড়া ঢিল তার ঠোঁটে লেগেছে। প্রায় নির্জীব। মাস্টারমশাই জিজ্ঞাসা করলেন।

– কেন মারলে ঢিল?

বিকাশ জবাব দিল না। তাকিয়ে রইল মাটির দিকে। মাস্টারমশাই বিকাশকে নিয়ে গেলেন সেইই ছানাদের কাছে। তারা তখন নির্জীব হয়ে গাছের কোটরের বাসায় পড়ে আছে। চোখও যে ফোটেনি, কী করেই বা যাবে বাইরে। কোথায়ই বা যাবে? তাদের দিকে দেখিয়ে মাস্টারমশাই বিকাশকে খুব নরম করে বললেন ‘দ্যাখো তো, মা বাবাকে যদি আমরা আহত করি তারা তো আর খাবার খুঁজে নিয়ে যেতে পারবে না। ছানারা বসে থাকবে, কখন মা আসবে, কখন বাবা আসবে। তারাও যে তোমার মতোই ছোটো! অপেক্ষায় থেকে থেকে তারা নির্জীব হয়ে পড়বে। তারপর মারাও যেতে পারে। যাবেও। কেননা তারা নিজেরা তো আর খাবার খুঁজতে পারবে না। তাদের সে ক্ষমতাই নেই। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের বাবা মায়েরা না থাকলে তাদের খাওয়াবে কে? তারা বড়োই বা হবে কী করে!

বিকাশ মাথা নিচু করেই রইল। হঠাৎ তার বুকের মধ্যেটা হু হু করে উঠল। পায়ে পায়ে সে ফিরে চলল ইস্কুলের দিকে। মাস্টারমশায়ের পেছন পেছন। ইস্কুলের মাঠে পৌঁছে প্রথমেই সে ছুঁড়ে দিল তার গুলতিটা মাঠের মাঝখানের স্তূপে। মাস্টারমশায়ের চোখে জল। মুখে হাসি। সেই স্তূপে আগুন ধরাল বিকাশই, মাস্টারমশাইয়ের সাথে। পুড়িয়ে দেয়া হল হিংসা। পুড়িয়ে দেয়া হল অস্ত্র। পুড়িয়ে ফেলা হল লোভ।

অমনি গাছে গাছে ফিরে এল পাখি। গাছে গাছে ফিরে এলো কচি সবুজ পাতা। ফিরে এলো কাঠবিড়ালি, ফিরে এলো প্রজাপতি, আর যতো পোকামাকড়ের দল।

সকলে মিলে শপথ নিল পশু পাখি গাছপালা কারুর কোনো অনিষ্ট করবে না কেউ। সকলে মিলে মিশে থাকবে একঠাঁই, একসাথে। দেখাদেখি আমরাও সকলে মিলে সেই শপথ নিলাম মনে মনে। ইন্দ্রশংকর এবার তার দুহাতের মুদ্রায় মেঘ ভাসিয়ে নিয়ে এলেন। হাল্কা বৃষ্টির ছাঁট সেই মেঘের ছায়ায় ছায়ায়। আমরা আরো নিস্তব্ধ হয়ে শুনতে শুরু করলাম ইন্দ্রশংকরের মৃদু অথচ দৃঢ় গলার সুর। মেঘের আড়াল সরিয়ে সরিয়ে ভেসে ভেসে আসে তার কন্ঠস্বর।

পাঁচভাই সাথে সাথে থাকি

মৌমাছি গাছ পশু পাখি

মানুষেরা সুখে ছিল বনে

ফল পেড়ে, জল তুলে এনে।

মৌমাছি ফুলে ফুলে ঘুরে

মধু এনে ঘরে জমা করে

ফুল ক্রমে গাছেদের স্নেহে

পাকাফল ধরে তার দেহে

পশুপাখি গাছপালা ভরা

ছিল সুখে পাঁচভাই তারা

তারপরে কী যে হল হায়,

বুদ্ধিতে আঁধার ঘনায়

লোভ এসে গাছে দিল কোপ

পোকামাকড়েরা পেল লোপ।

পশু পাখি ক্রমে গেল মারা

মানুষের দল দিশাহারা।

– তারপর?

সকলে সমস্বরে বলে উঠল। ছোটোরা বলল, ‘তারপর?’ হাওয়া বলল, ‘তারপর?’ বারান্দার টবের ছোটো ছোটো গাছের দল মাথা বাড়িয়ে উৎসুক হয়ে চেয়ে রইল, তারপর কী হল জানবার জন্য। ছোটোরা ভারী চিন্তিত হয়ে চাইল তাদের ইন্দ্রদাদার দিকে। ইন্দ্রদাদার হাতে তখন একখানা মোমের বাতি। সেইখানা তিনি উঁচু করে ধরলেন।

– ‘আমরা ছিলাম পাঁচ ভাই। মৌমাছি, পশু, পাখি, গাছপালা আর মানুষ। লোভে পড়ে মানুষ কেটে ফেলতে লাগল গাছ। বনজঙ্গল উজাড় হতে থাকল। গাছের গোড়ার কীটপতঙ্গ লুপ্ত হল। ফুল ফুটল না। মৌমাছি উড়ে উড়ে মধু খুঁজে খুঁজে হন্যে হয়ে গেল। ফল ধরল না গাছে। পাখিরা খাবার না পেয়ে উধাও হল। গাছে গাছে পাখিদের কলরব গেল থেমে। পশুরা পেল না তাদের খাবার। তাদেরও আর দেখা গেল না। বিস্তীর্ণ মরুভূমির মধ্যে একা দাঁড়িয়ে রইল মানুষ। নির্বান্ধব। একলা। নিঃসঙ্গ। ভাইবোনবন্ধুহীন। মোমের আলোর পাশে পাশে ইন্দ্রশংকরের হাতে উঠে এল একটা শুকনো গাছের ডাল। ডালের মাথায় অবিকল একখানা হাত। তার একখানাই আঙুল। কড়ে আঙুল। মুঠো নেই। শক্তি নেই। জোর নেই। হাতের শক্তি নিঃশেষ হয়ে শুকিয়ে মরতে চলেছে শীর্ণ জীর্ণ হাত।

– তাহলে উপায়? কী উপায়?

শিউরে উঠল সকলে। ছেলেমেয়েরা ছোটোরা বড়োরা সব্বাই।

– আছে, আছে। সে উপায়ও হল।

– কী সে উপায়? আমাদেরও বলো সে কথা।

ইন্দ্রদাদার কথা ছড়িয়ে পড়ল একটা ছোট্টো গ্রামের কুটির থেকে পাশের গ্রামে, পাশের পাহাড়ে, উজাড় হওয়া জঙ্গলের আনাচে কানাচে, গ্রামে গঞ্জে, ছোটোদের মনে মনে, বড়োদের মুখে মুখে।

– বলো বলো আমাদেরও বলো সে উপায়।

– গাছ লাগানো শুরু হয়ে গেল। বিকাশের মতো ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা গাছ লাগাতে শুরু করল। বাড়ির পাশে, খেলার মাঠে, উজাড় হয়ে যাওয়া জঙ্গলের পাশে, চারাগাছ লাগানো চলল। দেখতে দেখতে জঙ্গল ঘন হয়ে উঠল। পতঙ্গেরা ফিরে এলো। পোকামাকড়েরা আবার বাসা বেঁধে বসল। দেখাদেখি পাখিরা এলো ফিরে। গাছ খুশি হয়ে ফুল ফোটাল। মৌমাছি ফিরে এলো। ফুল হল। ফল হল। পশুরা ফিরে এলো জঙ্গলে। মানুষের শুভ বোধ আবার বন্ধুদের ভাইদের ফিরিয়ে আনল চারপাশে। জঙ্গল আবার ঢেকে ফেলল চারপাশ। খুশির জোয়ারে ভেসে গেল গ্রামের পর গ্রাম। অনেক দূর দূর থেকে বন্ধুরা এলো বক্সার পাহাড়ে, আশপাশের যত পাহাড় জঙ্গলে। নদীর প্রবাহের পাশে পাশে। রক্ষা পেল পাহাড়, রক্ষা পেল পরিবেশ, রক্ষা পেল মানুষ। রক্ষা পেল পশুপাখি পোকামাকড় সব্বাই যারা যারা এই পৃথিবীর বাসিন্দা।

একটা মশাল জ্বলতে থাকল ইন্দ্রদাদার হাতে। বেজে উঠল তারযন্ত্র। ছোট্টো মানুষটার গলায় বেজে উঠল,

ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা

তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা

ও সে যে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি

সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি।।

তার চারধারে আপনা থেকেই গোল হয়ে ঘিরে এলো ছেলেমেয়েরা। তাদের গলাতেও উঠে এলো জন্মভূমির গান। সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি। প্রতিটি ছেলেমেয়ের মুখের ওপর মশালের আলো পড়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠল জন্মভূমির মুখ। প্রতিটা মুখ হয়ে উঠছিল ইন্দ্রশংকরের হাসিমুখ। বক্সার দুয়ারে দাঁড়িয়ে সেই আলোর প্রতি আমরা সকলেই প্রণাম জানালাম।

ছবি ও ভিডিওঃ  ইন্দ্রশেখর, অলোক গাঙ্গুলি

ইন্দ্রনাথ উর্ফ শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সব লেখা একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s