পুজো স্পেশাল চলো যাই যাদুঘরে দিলীপ রায়চৌধুরি শরৎ ২০১৬

ডক্টর দিলীপ রায়চৌধুরীর নাম কল্পবিজ্ঞানপ্রেমী বাঙালি পাঠকের অজানা থাকবার কথা নয়। গতশতাব্দির দ্বিতীয়ার্ধে এই তরুণ বৈজ্ঞানিক বেশ কিছু অসামান্য কল্পবিজ্ঞান কাহিনি রচনা করে আশা জাগিয়েছিলেন। অকালমৃত্যু তাঁকে আমাদের মধ্যে থেকে কেড়ে নিয়ে গেছে। সঙ্গের লেখাটি কিন্তু কল্পবিজ্ঞান নয়, তাঁর লেখা অন্য একটি অসাধারণ নিবন্ধ। প্রথম প্রকাশিত হয় শারদীয় তরুণতীর্থ পত্রিকায় ১৯৭০ সালে।লেখাটির সন্ধান ও প্রকাশের অনুমতি দেবার জন্য আমরা তাঁর কন্যা শ্রীমতী যশোধরা রায়চৌধুরীর কাছে কৃতজ্ঞ

pujosplmuseum01 (Medium)

ছুটির দিনে  কোলকাতা শহরে যারা বেড়াতে বেরোও অথবা বাইরে থেকে কোলকাতায় যারা বেড়াতে আসো তারা যাদুঘর দেখতে যাওয়ার নামে প্রায়ই নাক সিঁটকোও। হয়তো বাড়ির খুব ছোট ভাইবোনদের পাল্লায় প’ড়ে নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও যাদুঘর যেতে হয় কিন্তু সব সময়েই মনে হয়, এর চেয়ে বুঝি দু’ঘন্টা সিনেমা কি সার্কাসে গেলেই ভালো ছিল। আমার কোলকাতার বন্ধুদের আমি চিনি, তারা যাদুঘরকে অশিক্ষিত পাড়াগেঁয়েদের আড্ডাঘর মনে করে।

সত্যি বল্‌তে কি যারা লেখাপড়া কিছুই জানেনা, তাদের যাদুঘরে গিয়ে পাথর আর ম্যমি দেখেই ফিরে আসা হয়। কিন্তু যাদুঘরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটালে অনায়াসেই কারো একটি গবেষণা প্রবন্ধ তৈরী হয়ে যেতে পারে, অবশ্য মগজে যদি কিচ্ছু থাকে! ধরো জীবজগতের বিবর্তনের কথা- যাদুঘরে পেছনের দিকে দোতলায় একটি ঘরে সব রকম মৃতপ্রাণীর দেহ সযত্নে রক্ষিত আছে। আমরা প্রায় সময়ই বলে থাকি মানুষ হচ্ছে বানরের বংশধর (কারো কারো বেচাল দেখলে এই বলে গালাগালিও দিই) কিন্তু কিভাবে আমারা শাখামৃগত্ব থেকে বর্তমানে সভ্য অবস্থা প্রাপ্ত হলাম, তার একটা ইতিহাস আছে।

আমাদের পুরানে আছে, সৃষ্টির আদিতে সমগ্র পৃথিবী জলমগ্ন ছিল। কথাটায় হয়তো খুব বেশি ভুল নেই, কারণ জীবনের সৃষ্টির আদি- উপকরণ হচ্ছে জল। কোনো এক বিশেষ মুহুর্তে এক বিশেষ রাসায়নিক অবস্থায় পৃথিবীর আদি প্রাণ এককোষী জীব সৃষ্টি হয়েছিল। সেই এককোষী জীব থেকে একদিকে গাছপালা তথা উদ্ভিদজগতের সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে বুকে হাঁটা সরীসৃপ থেকে ধীরে ধীরে উভচর, খেচর, সবশেষে বর্তমান পৃথিবীর প্রাণী জগতের অভ্যুদয় ঘটেছে। যাদুঘরের ঐ বিশেষ ঘরটিতে এই ইতিহাসের একটি সুন্দর ছবি পাবে অন্তত, গত শেষ কয়েক হাজার বছরের।

এই ইতিহাসে একটি বিশেষ জিনিস লক্ষ করার আছে। পরিবেশের, আবহাওয়ার তফাৎ ঘটলেই প্রাণীর আচার আচরণের, কাজ করার  ধরণধারণের তফাৎ ঘটে যায়। দেখলেই বোঝা যায় যখন জলে ভর্তি ছিল, তখন  বুকে হাঁটা সরীসৃপদের চ্যাপ্টা পায়ে জল কেটে  এগোনোর  জন্য লম্বা ল্যাজের দরজার ছিল। ক্রমে জল যখন শুকিয়ে এল, তখন ডাঙায় চলতে চলতে সামনের পা দুজোড়া অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেল এবং এই দুটোই আমাদের এখনকার হাতের কাজ চালাচ্ছে। কাজ এবং পরিশ্রম করার ধরণের উপরও দেহের গঠন অনেক নির্ভর করছে। বানর জাতীয় প্রাণীর হাতগুলি লম্বা লম্বা, মাংসপেশীর উন্নতি আমাদের মতো এমন কেন্দ্রীভূত নয়, তার কারণ গাছে গাছে ঝুলবার ফলে এরকম হতে বাধ্য। কিন্তু ক্রমে যখন সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে বাস করা গরিলা শিম্পাঞ্জি জাতীয় প্রানীদের মধ্যে চালু হয়ে পড়ল এবং পায়ের জোরে হাঁটা শুরু হল, তখন হাতের দৈর্ঘ্যও কমে গেল এবং মাংসপেশী ভাগে ভাগে পুষ্ট হয়ে আমাদের বর্তমান পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে এল। এই সঙ্গে সঙ্গে মস্তিকও পুষ্ট হতে থাকে এবং চিন্তা করবার ক্ষমতাও স্থূল থেকে সূক্ষ্ম হতে আরম্ভ করল।

এই হল সংক্ষেপে আমাদের সমাজ প্রগতির আদিকথা। এখন  যাদুঘরে গিয়ে, এই কাঠামোয় রক্তমাংসের প্রলেপ লাগানোর ভার তোমাদের উপরে।

বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে ঐক্যের কথা উঠলে অনেকে খুব সহজভাবে স্বীকার করতে চাইবে না। কারণ সাপ থেকে ব্যাঙের উৎপত্তি হয়েছে কি ছাগল থেকে ঘোড়া’র উৎপত্তি এরকম কথা মেনে নেওয়া বড়ো কঠিন। প্রাকৃতিক বাছাই’এর মধ্যে দিয়ে কোনও  বিশেষ প্রাণীর কোনও একটি বিশেষ জাত টিকে আছে এটা যদি বুঝতে পারা যায় তখন প্রশ্ন  ওঠে পৃথিবীর চেহারা বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রাণীর ভেতরে বদল হল কি? স্তন্যপায়ী জীব সরীসৃপদের মধ্য থেকে কী করে উঠে এলো।

pujosplmuseum06 (Medium)

একটা কথা স্মরণ করে রাখতে হবে যে, এখনকার অধিকাংশ প্রাণীই, লক্ষ লক্ষ বছর আগে যে সব প্রাণী পৃথিবীর বুকে চরে বেড়াত ঠিক তাদের বংশ থেকে জাত নয়। এমন সব প্রণী এদের মাঝখানে ছিল যারা আজ লুপ্ত  হয়ে গেছে। যদি তাদের দেহাবশেষ খুঁজে না পাওয়া যেতো তবে এই যুক্তি প্রমাণ করা কঠিন হতো। কিন্তু সৌভাগ্যের কথা ক্রমেই মাটির তলা থেকে বিভিন্ন জন্তুর পাথর হয়ে যাওয়া দাঁত, হাড় অথবা দেহের ছাপ উদ্ধার করা যাচ্ছে আর এই বিভিন্ন জন্তুর মধ্যেকার ফাঁক ক্রমেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এই সব পাথরের গায়ের অবশেষকে ইংরেজিতে বলে fossil ; 

আরও আশ্চর্যের কথা এবং মানুষের পক্ষে ভরসার কথা এই যে বৈজ্ঞানিকরা এই পাথরের বয়স নির্ণয় করতেও সক্ষম হচ্ছেন। নিশ্চয়ই জানো, রেডিয়ম বা ওইরকম তেজষ্ক্রিয় পদার্থ থেকে সব সময় রশ্মি নির্গত হচ্ছে এবং অনবরত রেডিয়ম বদলে অন্য মৌলিক পদার্থ হয়ে যাচ্ছে। এখন বৈজ্ঞানিকরা হিসাব করে দেখছেন সব তেজষ্ক্রিয় পদার্থের একটা বিশেষ অংশ (ধর, অর্ধেকটা) খরচ হয়ে অন্য পদার্থ হয়ে যেতে একটা বিশেষ সময় লাগে। মাটির তলা থেকে যে পাথর পাওয়া গেল, তার মধ্যে কোনও একটি বিশেষ তেজষ্ক্রিয় ধাতব পদার্থের পরিমাণ যদি আমরা জানতে পারি এবং তার অর্ধেক ক্ষয়ে যাওয়ার সময় যদি আমাদের জানা থাকে তবে আমরা অনায়াসেই অঙ্ক কষে সেই পাথরের বয়স বার করতে পারব।

দেখা গেছে, এইভাবে পদার্থ বিজ্ঞানীরা ফসিলের যে বয়স বলছেন এবং ভূবিজ্ঞানী এবং জীববিজ্ঞানীরা যে সময়কার প্রাণীর ফসিল বলে ওটা ঠিক করছেন, তা অধিকাংশ সময়েই মিলে যায়। লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে প্রথম জীবনের সাড়া জেগেছিল। নিম্নস্তরের গাছপালা সেই আদিম যুগে কতবার কতরূপে বদলিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। অসংখ্য জীবশ্রেণী আবিভূর্ত হয়েছে, তারপর প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্ঘর্ষে কোথায় মিলিয়ে গেছে।

প্রথম ফসিল যবে আবিস্কৃত হয়েছিল, তারপর থেকে পৃথিবীর ইতিহাস আদিম যুগ থেকে প্রাণীর উৎপত্তি অনুযায়ী ভাগ করা হয়েছে।

প্রথম যুগ ছিল সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী। এই সময় দু’টো বিরাট পর্বতমালা সৃষ্টি হয়েছে। ট্রিলোবাইট

pujosplmuseum02 (Medium)

জাতীয়(trilobites) প্রাণী এই রকম সময়েই আবির্ভূত হয়ে তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল। এমনি সময়েই পৃথিবীর প্রথম মাছ পৃথিবীতে দেখা গেল। (মনেও ভেব না যে এখনকার ইলিশ মাছ তাদের বংশধর) এই যুগের প্রায় শেষাশেষি উভচর প্রাণী, সরীসৃপ তারপর উচ্চতর গাছপালা (ফার্ণ জাতীয়) সৃষ্টি হল।

পৃথিবীতে জীবনের উৎপত্তি কিভাবে হল এ সম্পর্কে আজও কোন সঠিক ধারণায় আমরা পৌঁছতে পারিনি কিংবা সবচেয়ে আদিম প্রাণীর  দেহাবশেষ আজও আমরা পাইনি। জীবনের উৎপত্তির সময়ে পৃথিবীর ভৌগোলিক অবস্থা যদি আমরা কল্পনা করি তবে ভাবতে হবে চারিদিকে ধূ ধূ মরুভূমি রয়েছে, আগ্নেয়গিরি থেকে  ঘন ঘন অগ্ন্যুৎপাত হচ্ছে। লাভায় মাঠঘাট ভেসে যাচ্ছে। বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প তরল হয়ে সমুদ্রের সৃষ্টি হল কিন্তু বাতাসে বেশি অক্সিজেন নেই। এ ধারণা আমরা করেছি কারণ সে যুগের যে সব পাথর আমরা চিনতে পেরেছি তাতে খুব কম পরিমাণেই অক্সিজেন সংশ্লিষ্ট আছে। এখনকার বাতাসের অক্সিজেন নিশ্চয়ই সবুজ গাছপালার প্রশ্বাস থেকে জন্মেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ পরিবর্তিত হতে থাকার  ফলে জৈব পদার্থগুলি কোনও একসময় সৃষ্টি হয়েছিল। এই জৈব পদার্থগুলি মাটির মধ্যস্থতায় খুব সম্ভবতঃ পৃথিবীতে প্রাণের প্রথম সাড়া জাগিয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে ভাইরাস জাতীয় কয়েকটি জৈব পদার্থ (যাদের ঠিক প্রাণী বলা যায় না।) অন্য জৈবপদার্থের সাহায্যে বংশ বৃদ্ধি করতে পারে  এবং বোধহয় এইরকম জীবই প্রথম পৃথিবীতে দেখা দিয়েছিল। প্রথম দিককার জীবন জলেই উৎপন্ন হয়েছিল এবং অক্সিজেন ব্যতিরেকেই বাঁচত। এখনকার বহু এককোষী জীব  যেমন অক্সিজেন ব্যতিরেকে বংশ বৃদ্ধি করতে পারে এবং নিজেরাই অক্সিজেন সৃষ্টি করে, এমনি প্রাণী পৃথিবীতে সমগ্র  প্রাণীজগতের বিবর্তন সম্ভব করেছে।

সবচেয়ে প্রাচীন যে ফসিলের সন্ধান  পাওয়া গেছে তার নাম এ্যালগি। বয়স কম করে ৫০০০ লক্ষ বছর। এখনকার জে্লিমাছের মতো অথবা (Algae) জাতীয় কোনও প্রাণীর দেহাবশেষ এতে বোঝা  যায়। অমেরুদণ্ডী প্রাণীর  মধ্যে সব চেয়ে ভালো অবশেষে পাওয়া গেছে ট্রিলোবাইটের (Trilobite) যার কথা আমরা আগেই বলেছি। এদের সমুদ্রের ঝাড়ুদার  বলা যায়। এরা বহু সামুদ্রিক অবস্থায় নিজেদের মানিয়ে নিতে পারত, সমুদ্রের তলায় এরা বুকে হাঁটত অথবা কোনও কোনও জাতের মধ্যে সাঁতারুও দেখা যেত। কারও একজোড়া চোখ ছিল কারও কপালের মাঝখানে একটা বড়ো চোখ ছিল। চিংড়ি জাতীয় প্রাণীর অবশেষও এ সময় পাওয়া গেছে।

ধীরে ধীরে  পৃথিবীর চেহারা বদলাতে আরম্ভ করল, সমুদ্রের তলা থেকে মাটি জেগে উঠল সাগরের বুকে। আগ্নেয়গিরি তেজ কমে এলো। অগভীর সমুদ্রে প্রবাল জাতীয় প্রাণীর কঙ্কাল থেকে দ্বীপ জন্মাতে শুরু হল তবে এখনকার মতো বড়ো আকারের নয়। গভীর জলে, গ্রাপটোলাইট ক্রাষ্টাসিয়া প্রভৃতি কাঁকড়া জাতীয় প্রাণী দেখা দিল।

সৃষ্টির আদিতে জলমগ্ন ছিল অথচ এখন সেখানে বিরাট উঁচু পাহাড়, পর্বত এমন জায়গা পৃথিবীতে বহু আছে। এশিয়ার অধিকাংশ জায়গাই আজ থেকে ৫ হাজার লক্ষ বছর আগে হয়তো বিরাট সমুদ্র ছিল। কিন্তু এখন পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পাহাড় (যাকে মানুষ সেদিন জয় করেছে) সেখানে দেখা দিয়েছে। যে সময় পৃথিবীর তলায় মাটির নাড়াচাড়া শুরু হল, কয়লা তৈরি হতে আরম্ভ করল, তখন থেকেই পাহাড় দেখা দিতে শুরু করল। মাটি কুঁচকে গিয়ে উত্তর গোলার্ধে সমুদ্রের মাঝখানে কোথাও কোথাও ছেদ পড়ল। ক্রমাগত জল বাষ্প হয়ে যাওয়ার ফলে সমুদ্রের জলে লবণ ও ক্ষার জাতীয় জিনিসের পরিমাণ বেড়ে গেল। এর ফলে এ্যাল্‌গি, স্পঞ্জ প্রভৃতির সুবিধাই হয়েছে। কিন্তু বাষ্পীভবনের সঙ্গে সঙ্গে কোনো কোনো জায়গায় জল শুকিয়ে গিয়ে ছোট ছোট হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও বা জল সম্পূর্ণ বাষ্প হয়ে গিয়ে লবণ পটাশ (যে জিনিস পটকাতে ব্যবহার করো) প্রভৃতি সেখানে জমা হল।

বুঝতেই পারছ জল বেশি নোনা হয়ে যাওয়ায় যে সব প্রাণী আগেকার অবস্থায় কোনও রকমে খাপ খাইয়ে টিঁকে ছিল তারা মহা মুশকিলে পড়ে গেল। এমনি করে পুরানো সামুদ্রিক প্রাণীদের কয়েকটা জাত, যেমন রুগোজ জাতের প্রবাল, ট্রিলোবাইট প্রভৃতি ক্রমে এ অবস্থা সইতে না পেরে লুপ্ত হয়ে গেল। এই  সময়ের ভারী অদ্ভুত জাতের এক এক ধরণের মাছের দেহাবশেষ যাদুঘরে রাখা আছে। হেলিক প্রোইস্ন জাতের হাঙরের স্প্রিং এর মতো জড়ানো দাঁত মুখের নীচে ঝুলতে দেখা যেত।

পৃথিবীর অবস্থা বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে মেরুদণ্ডী প্রাণীর আবির্ভাব অনিবার্য হয়ে পড়ল। একদিকে সমুদ্রের বুক ভেদ করে আগ্নেয়গিরির শক্তি ডাঙা জাগিয়ে তুললো অন্যদিকে পুরানো পাহাড় বাতাস জলে ক্ষয়ে নুড়ি-পাথর, বালি কাদা  সৃষ্টি করতে লাগলো। এই সব বালি কাদা জমে অববাহিকার সৃষ্টি হল; সাগর কিনারে ব-দ্বীপ দেখা দিল। যে সব কাদা সাগরের তলায় গিয়ে ঠাঁই নিলো পরে তারই কিয়দংশ চাপের ফলে জমে গিয়ে তোমাদের শ্লেটের পাথরের জন্ম দিয়েছে।

pujosplmuseum04earlylandscape (Medium)ডাঙা দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে একদল আভ্যন্তরীণ বন্দোবস্ত বদলে নিয়ে বাতাসে নিশ্বাস নেওয়ার উপযোগী হয়ে উঠল। নানাজাতের মাকড়শা, কীটপতঙ্গ আজও এদের বংশ রক্ষা করছে। গাছপালার সংখ্যা অত্যন্ত বেড়ে গেল। তখনকার যে সব পুরানো লাল পাথর ডেভনশায়ার প্রভৃতি জায়গায় পেয়েছি তা থেকেই এ প্রমাণ আমরা সংগ্রহ করেছি। পাতা বা ডালপালার ভালো করে আবির্ভাব ঘটেনি একথা বলা চলে তবুও আধুনিক গাছপালার অনেক ব্যবস্থাই প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তখনই দেখা দিয়েছিল। যেমন ধরো, গাছের গুঁড়ির মধ্যে মাটি থেকে শোষিত রস চলাচলের রাস্তা কিংবা গাছের গায়ে একটা স্বচ্ছ ছাল যেখানে নিশ্বাসপ্রশ্বাসের ছোট ছোট ছিদ্র আছে। এই ছিদ্র পথের মারফৎ গাছ কার্বনডাইঅক্সাইড  ভেতরে নিতে পারে।

সাঁতার কাটতে গেলে কি ডাঙায় চলাফেরা করতে গেলে মেরুদণ্ড অত্যন্ত দরকার। তাই খুব তাড়াতাড়ি মেরুদণ্ডী প্রাণীর আবির্ভাব হয়েছিল বলতে হবে। গায়ে বেশ শক্ত পুরু আঁশ আছে দেখতে মাছের মত অথচ চোয়াল নেই এমন সব প্রাণী (নাম দেওয়া গেছে ostracoderm) নদীতে কি মোহনায় প্রথমে দেখা দিল তারপরে ধীরে ধীরে নানাজাতের সত্যিকারের মাছ, যাদের এখনকার মত আঁশ আছে, ফুসফুস এবং লম্বা লম্বা পাখনা আছে এমন জাতের দেখাও পাওয়া গেল। বন্যা কি জোয়ারের জল সরে গেলে এরা পাখনায় ভর করে নদীতে সাগরে চলে যেতে পারতো এবং এমনি মাছের জাত থেকেই প্রথম উভচর প্রাণীর সৃষ্টি হয়। গ্রিনল্যাণ্ডের এমনি জাতের আদিম উভচরের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। এছাড়াও মাছের অন্যান্য জাতের মধ্যে হাঙর শ্রেণী সমুদ্রে ভিড় করল।

অবশ্য মনে কোরো না, অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের দিন এর মধ্যেই ফুরিয়ে গেল। নানা জাতের প্রবাল সমুদ্রের স্বচ্ছ অগভীর জায়গায় ভিড় করতে লাগলো। কোনোটা ঢাক্‌নাওলা কাপের মতো, কোনোটা অনেকগুলো ধুতরো ফুল এক বোঁটায় ফুটলে যেমন হয় তেমনি, আবার কোনোটা শিকলের মত অনেকখানি জুড়ে। কোনো কোনো বালি বিছানো সমুদ্রের তলায় এক জাতের স্পঞ্জ দেখা দিল, যার দেহে জালের মতো বালির কঙ্কাল।

সৃষ্টির প্রারম্ভে যে সব পাথর ছিল তার উৎপত্তি হচ্ছে আগ্নেয় অর্থাৎ কিনা গ্যাসীয় থেকে তরল এবং তারপর কঠিন অবস্থা ধারণ করার সঙ্গে সঙ্গে এরা জন্মলাভ করেছে। কিন্তু বাতাস, জলে ক্ষয়ে একদিকে এইসব পাথর থেকে যেমন বালি, কাদার উদ্ভব হল তেমনি বালি এবং অন্যান্য জিনিস যেমন চুন, প্রাণী গাছপালার দেহাবশেষ ইত্যাদি একসঙ্গে মিলে চাপের ফলে বেলে পাথর কি চুণাপাথর সৃষ্টি হল। গাছপালা পৃথিবীর ভেতরকার উত্তাপ ও চাপের ফলে কয়লার জন্ম দিয়েছে। কয়লার ভাঁজের মধ্যে বহু সময়েই আমরা গাছপালার ছাপ পেয়েছি। অনেকে বিশ্বাস করেন যে পেট্রোলিয়মও এমনি করে জন্মেছে। যাই হোক, ক্রমে গাছপালায় যেমন পৃথিবী ভরে গেল তেমনি প্রাণীদের জীবন ধারণের প্রক্রিয়াও বদলিয়েছে। অমেরুদণ্ডী প্রাণীর স্থান অগভীর সমুদ্রে নির্দিষ্ট হয়ে রইল, গভীর সমুদ্রে হাঙর প্রভৃতি বড়ো জাতের মাছ আর সাগর ও ডাঙার মধ্যে উভচর প্রাণী। এই সময় যে পৃথিবীর বহু জায়গায় গাছপালা ভার্তি ছিল তা আমরা  বর্তমান পৃথিবীর কয়লার পরিমাণ থেকে বুঝতে পারি। বায়ুমণ্ডলও যে গাছপালার উপযোগী বেশ জলীয় বাষ্পে ভর্তি ছিল তাও ধরে নেওয়া যায়। এও প্রায় আড়াই হাজার লক্ষ বছর আগেকার কথা বলছি।

দেখতে দেখতে আমরা পৃথিবীতে জীবনের ইতিহাসের ধারা বেয়ে অনেক দূর এসে পড়েছি। সমুদ্রের বুক থেকে যেমন মহাদেশগুলো জেগে উঠতে লাগল, তেমনি জীবনেরও যেন নবযুগ সৃষ্টি হল। তখনকার মহাদেশগুলোর একটু কাল্পনিক বর্ণনা এই প্রসঙ্গে বোধ হয় মন্দ লাগবে না। চারিদিকে মরুভূমি ধূ ধূ করছে, মাঝে মাঝে ছোট গাছপালায় ভর্তি পাহাড়, এখানে সেখানে চঞ্চল বালিয়াড়ি, কোথাও বা প্রচুর লবণ জমে আছে। প্রবাল দ্বীপের প্রবাল এবং চুনে ভর্তি সামুদ্রিক গাছপালা দেখলে মনে হয় তখন সমুদ্র বেশ গরমই ছিল।

pujosplmuseum05 (Medium)

এদিকে কত নতুন জাতের প্রাণী যে পৃথিবীতে আর সমুদ্রে দেখা দিচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। অগভীর সমুদ্রে শামুক, কাঁকড়া জাতীয় প্রাণীদের নতুন ধরণের বহু আদি  পুরুষের দেখা মিললো। শুশুক, তারামাছ, জাতীয়  প্রাণীদের পূর্বপুরুষও এই সময়ই দেখা গিয়েছিল বলেও বিজ্ঞানীরা মনে করেন। নতুন ধরণের প্রবাল, হাড়ওয়ালা  নানারকমের মাছও এদের সঙ্গে সঙ্গে হাজির হল। ইকথাইওসেরস (Ichthyosaurs) নামে এই সময়কার এক রকমের মেরুদণ্ডী সামুদ্রিক সরীসৃপের অবশেষ আবিস্কৃত হয়েছে। এরা  দ্রুত সাঁতার কাটতে পারতো এবং তেকোনা ধারালো দাঁতের অস্ত্রও এদের ছিল। গভীর সমুদ্রে ডুব সাঁতার কাটবার সুবিধার জন্য বোধ হয় জলের চাপ সইতে পারে এমন হাড়ের খাঁচায় এদের চোখ ঢাকা ছিল। আরেক ধরণের সামুদ্রিক সরীসৃপ এই সময় দেখা গিয়েছিল; এদের গলা ছিল খুব লম্বা এবং পাখনার মতো ডানা দিয়ে এরা সাঁতার কাটতে পারত। এদের নাম দেওয়া হয়েছে প্লেসিওসরাস (Plesiosaurs)। প্রবাল জমে কোনো কোনো জায়গায় হয়তো হ্রদের মতো হয়ে গিয়েছিল, বাতাসে চক খড়ি জাতীয় জিনিসের গুঁড়ো উড়ে এসে এখানে চুনাপাথরের সৃষ্টি হয়ে গেছে। এই সব হ্রদের মতো জায়গায় জেলিমাছ এবং আরও নানা ধরণের কীটপতঙ্গ বাসা বাঁধত। চূনাপাথরের গায়ে তারা স্পষ্ট দেহের ছাপ এঁকে রেখে গিয়েছে। সমুদ্রের অমেরুদণ্ডী প্রাণী ও মাছ ছাড়া সমুদ্রের ধারে বাস করে অথবা উড়ে বেড়ায় এমন জানোয়ার অথবা পাখির দেহের অবশেষও এই সব চুনাপাথরে আবিস্কৃত হয়েছে। টেরোড্যাকটিল (Pterodactyl)  আর্চিওপ্টেরিক্স (Archaeopteryx) এদের মধ্যে প্রধান। সহজেই অনুমান করা যায়, ডাঙা যতো বেশি দেখা দিতে লাগল, উভচরী বৃত্তি ছেড়ে দিয়ে ডাঙায় চরে বেড়ানো প্রাণীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে লাগল। অতিকায় ডাইনোসর অথবা উড়ন্ত টেরোড্যাকটিল প্রভৃতি এইদিকে ইঙ্গিত দিয়েছিল। এর মধ্যে টেরোড্যাকটিল উড়তে পারত কিন্তু সরীসৃপের সব চরিত্রই এর মধ্যে বজায় ছিল। এই পথ দিয়ে আস্তে আস্তে পাখিদের বিবর্তন হল, সরীসৃপদের গায়ের আঁশ হয়ে গেল পালক।

সেই যে খড়িমাটি জমা শুরু হল প্রায় সাতশো লক্ষ  বছর ধরে তার রাজত্ব চললো সমস্ত পৃথিবী জুড়ে, ইউরোপে, উত্তর আমেরিকায়, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায়। এই সময়কার পৃথিবীতে গাছপালার পরিমাণ থেকে সহজেই ধরে নেওয়া যায় যে জলবায়ু বেশ মোলায়েম জীবনের উপযোগী ছিল। উত্তরে প্রায় গ্রিনল্যাণ্ডে পর্যন্ত সবুজের সাড়া জেগেছিল বলতে হবে। প্রথম দিকে বিভিন্ন জায়গায় বিস্তৃত এলাকা জুড়ে অগভীর জলের উপর সবুজ বালি জমতে লাগলো, আর সমুদ্রের তলায় জমতে দেখা গেল নীল রঙের কাদা। তারপরে জমি যখন ক্ষয়ে ক্ষয়ে মসৃণ হতে থাকলো, তখন খড়িমাটি জমতে শুরু করল।

অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে স্পঞ্জ এই সময়ের সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য লাভ করেছিল। এখনও সমুদ্রের ধারে ধারে এই ধরণের স্পঞ্জ দেখতে পাওয়া যায়। সমুদ্রের ধারে যেগুলো পাওয়া যেতো তার দেহে চুণের পরিমাণ বেশি ছিল, কিন্তু সমুদ্রের একটু গভীর জলে যেগুলো দেখতে পাওয়া যেতো তাদের দেহে বালির পরিমাণ বেশি ছিল। স্থানে স্থানে সঞ্চিত হয়ে চকমকি পাথর রূপে খড়িমাটির মধ্যে আজও এর দেহাবশেষ মিলবে। জার্মানির হ্যানোয়ের থেকে খড়িমাটির মধ্যে এইরকম জাতের স্পঞ্জের অবশেষ মিলেছে। এ্যাসিড দিয়ে যদি খড়িমাটি গলিয়ে ফেলি তবে স্বচ্ছ কাচের মতো স্পঞ্জের কঙ্কাল দেখতে পাওয়া যাবে।

মেরুদণ্ডওলা প্রাণীদের মধ্যে সমুদ্রে নানা জাতের মাছ দেখতে পাওয়া গেল, যাদের বংশধরেরা হেরিং হাঙর কড রূপে আজও বিরাজ করছে। এই সব মাছেদের শত্রুদের সংখ্যাও সমুদ্রে কম ছিল না, যার ফলে বিভিন্ন শ্রেণীর প্রাণীদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও ছিল অত্যন্ত তীব্র। মাসাসর নামে  লম্বা সাপের মত এক ধরণের সামুদ্রিক সরীসৃপ মাছখেকো যম ছিল। বোধ হয় এদের গল্প পৌরাণিক কাহিনীতে স্থান পেয়েছে। এছাড়া বিরাটকায় কচ্ছপ (কূর্ম), উড়ন্ত টেরোড্যাকটিল সমুদ্রের ধারে ঘুরতে দেখা যেতো। টেরোড্যাকটিলদের ডানা প্রায় কুড়ি ফুটের চেয়ে বড়ো ছিল। কিন্তু হলে হবে কি বেশি দূরে উড়ে যাবার ক্ষমতা তাদের ছিল না।

গাছপালার চেহারা ক্রমেই বদলাচ্ছিল। আগে পাতার কোনও বাহার ছিল না, কিন্তু এই সময় থেকে পাতায় ভর্তি গাছ দেখা দিল, ফুলের সমারোহে সবুজ পৃথিবীতে বোধ হয় রংও লাগল। আধুনিক জাতের অনেক গাছের ফসিলই আমরা পেয়েছি। ডুমুর ম্যাগ্নোলিয়া পপ্‌লার এই সব বিলিতি গাছের অগ্রজনের সৃষ্টি এই সময়ই হয়েছিল বলতে হবে।

কেন যে ফুলে ভরা গাছে এর দ্রুত পৃথিবী ছেয়ে গেল এখনও তার কোনও সঙ্গত কারণ দেখতে পাইনি। তবে যে সব কীটপতঙ্গ ফুলে পরাগ বয়ে নিয়ে যায় আর সে সব ফুলে মধু আছে তাদের মধ্যে যোগাযোগ খুব তাড়াতাড়ি গড়ে উঠেছিল।

এছাড়া মেরুদণ্ডী অতিকায় প্রাণীদের সংখ্যা এই সময় অনেক বেড়ে গেল। আগে যে ডাইনোসরের কথা বলেছি তারা তো বেশ সুখেস্বচ্ছন্দে বংশবৃদ্ধি করছিল। তারপরে টাইরান্নেসর নামে এক বিরাট মাংসাশী জন্তুর আবির্ভাব হয়েছিল, এর দেহের মাপখানা শোন একবার – দাঁড়ালে প্রায় কুড়ি ফুট উঁচু, দেহখানা লম্বায় চল্লিশ ফুট, সামনের শ্বদন্ত ৬ ইঞ্চি লম্বা। খুব বড়ো বড়ো নখ দিয়ে জীব জন্তুকে আক্রমণ করত! আমারিকার মনটানায় খড়িমাটির পাথরে এর হাড় পাওয়া গেছে। ট্রাইসেরাটপ নামে একটি শক্ত সমর্থ জবরদস্ত প্রাণীও এসময় দেখা দিয়েছিল, এর ঠোঁটটা ছিল কচ্ছপের মতো, আত্মরক্ষার জন্য মাথায় শিংও ছিল। এছাড়া ইগুয়ানোডন বলে এক ধরণের তৃণভোজী জন্তুরও দেখা মিলেছিল। এরা টিকটিকি, গিরগিটির বড়ো সংস্করণ!

যে সব স্তন্যপায়ী জীব পৃথিবীর বুকে ক্রমে বংশবিস্তার করে দখলিস্বত্ব ভোগ করছিল, তাদের চেহারা ধীরে ধীরে আজকালকার মত হয়ে এল। আজ থেকে সাড়ে চারশো কি সাড়ে তিনশো লক্ষ বছর আগে হাতির যে পূর্বপুরুষ পৃথিবীতে ছিল তার শুঁড় ছিল ছোট আর ওপরের এবং নীচের দুই চোয়ালেই এক জোড়া ক’রে বাঁকানো দাঁত ছিল। পৃথিবীর জায়গায় জায়গায় ঘাসে ভর্তি জমি দেখা দিয়েছিল বলেই বোধহয়, তৃণভোজী দলবদ্ধ প্রাণীদের সংখ্যা অসম্ভব বেড়ে গেল।

pujosplmuseum07 (Medium)চরে ঘাস খাওয়ার সুবিধামাফিক দাঁতের চেহারা বদলিয়ে, ঘোড়ার পূর্বপুরুষরাও এই সময়ই দেখা দিল। উত্তর আমেরিকায় দুভাগে ভাগ করা খুরওলা উটের প্রাচীন সংস্করণের আবির্ভাব হল। হরিণ, শুয়োর, আন্থাকোথেরিয়াম (Anthracotherium) নামে হিপোপটামাসের মত এক রকম প্রাণীর অবশেষও এই সময়কার মাটির স্তর থেকে খুঁড়ে বার করা গেছে। সবচেয়ে বড়ো কথা আফ্রিকায় বানর জাতীয় প্রথম প্রাণী, (যা থেকে কিনা উচ্চতর বানর গোষ্ঠী এবং পরিণামে মানুষ ধারা বেয়ে নেমে এসেছে) এই যুগে পাওয়া গেল।

গোড়া থেকেই বোঝাতে চেষ্টা করেছি, পৃথিবীর ওপরকার চেহারা যেমন বদলাচ্ছে, প্রাণীদের মধ্যেও পরিবর্তন ঠিক সেই রকম তাড়াতাড়ি আসছে। যখন জন্তরজানোয়ারের জগতে গণ্ডার, হাতীর পূর্বপুরুষ দেখা দিচ্ছে, সেই সময়তেই হিমালয় পাহাড়মালা, আল্পস পাহাড় কোথা থেকে যেন মাটি ফুঁড়ে হাজির হল। পাহাড় দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এশিয়া, ইউরোপের জলহাওয়া কোন যাদুমন্তরে বদলালো বুঝতে পারছ। যে জায়গায় ছিল শীত গরমের চরম জলহাওয়া, নাতিশীতোষ্ণ কোমল আবহাওয়ায় সেখানকার প্রাণী ও গাছপালার জগতে এক বিপ্লব দেখা দিতে বাধ্য। বৃষ্টি পড়ার ধরণধারণ বদলে গিয়ে যে জায়গায় জঙ্গল ছিল সেখানে ঘাসের জমি দেখা দিল। পপলার সেড়াব এই সব গাছ, এছাড়া নানা রকমের ছোট জাতের ঝোপ ঝাড়ে হ্রদের চার পাশে এখনকার মতই শোভা বিস্তার করেছিল বলেই এখন মনে হচ্ছে।

এখনকার প্রায় সব প্রাণীই এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছিল বলতে হবে। ইউরোপের সঙ্গে এশিয়া এক হয়ে গিয়ে বিস্তীর্ণ জঙ্গল জুড়ে হরিণ, বুনো ঘোড়া, জিরাফ এসব যেন চড়ে বেড়াচ্ছে এমন ছবি দেখতে পাচ্ছি। খালি বুনো জীবজন্তুই নয়, সোজা হয়ে চলতে ফিরতে পারে মানুষের মতো এমন বনমানুষ জাতীয় প্রাণী দেখা দিল।

বলতে গেলে, এখান থেকেই বর্তমান যুগের শুরু। তাও দশলক্ষ বছর আগেকার কথা বলছি। উত্তর ইউরোপ ও আমেরিকায় এবং আল্পস, হিমালয় প্রভৃতি পাহাড় পর্বতে যে বরফের রাজত্ব ছিল তা গরম অবস্থা দেখা দেওয়াতে গলে যেতে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে মাটি যেন উপর দিকে ঠেলে  উঠতে  লাগলো। বরফে যেসব জায়গা ঢাকা ছিল তা বনে জঙ্গলে সবুজ হয়ে গেল। গাছপালার ধরণ অনেক বদলে গেল। আধুনিক নানা জাতের পাখি দেখা গেল। পুরানো হাতীর গায়ের লোম ঝরে এক জোড়া দাঁত খসে গিয়ে এখনকার হাতী বেরিয়ে এল।

pujosplmuseumapetomang (Medium)আধুনিক যুগ শুরু  হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চতর মেরুদণ্ডী প্রাণীদের জগৎ দেখা দিল। স্তন্যপায়ী মেরুদণ্ডীদের শ্রেষ্ঠ বিকাশ দেখা গেল মানুষের মধ্যে এবং খালি অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্য দিয়েই নয়, মস্তিষ্কের বিকাশেও মানুষ অন্যান্য প্রাণীদের ছাড়িয়ে গেল।

এখন সেই বহুবিদিত ‘বানর থেকে মানুষ’ তত্বের  সত্যতা কতটা বিচার করা যাক। এতদিনে নিশ্চয়ই বিবর্তন অর্থাৎ এক  প্রাণীশ্রেণীর সঙ্গে অপর শ্রেণীর সম্পর্ক যে কী তা বুঝতে তোমাদের বিশেষ অসুবিধা হচ্ছে না। সেইদিক থেকে ভাবলে আমাদের যুক্তি বোঝার অনেক সুবিধে হবে। কোলকাতার যাদুঘরে যদি যাও তবে দেখবে পিছনের দিকে দোতলার একটা ঘরে বিভিন্ন শ্রেণীর মৃতদেহ বিশেষ উপায়ে সংরক্ষণ করা আছে। সেইসব জন্তুদের মধ্যে কতকগুলো বানর জাতের প্রাণী আছে। একজাতের বানর যারা দৌড়াতে পারে, লাফাতেও পারে (তোমাদের বন্ধুদের কথা বলছি না কিন্তু)। আর এক জাতের আছে যারা গাছে গাছেই ঝোলে, ডাঙ্গায় যাদের জারিজুরি খাটে না। এদের এই বিভিন্ন ধরণের ভঙ্গীর কারণ, মেরুদণ্ডের গঠনের তফাৎ।

গাছে গাছে যে শ্রেণীর বানর ও গীবন ঘুরে বেড়ায়, তাদের হাত খুবই সরু, লম্বা এবং লোমশ। মেরুদণ্ড এদের যথেষ্ট বিকাশলাভ করেনি তাই চলবার সময়ও এদের দেহের উপরাংশ যেন কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকে। বৃক্ষচারী অন্য প্রাণীদের- যেমন ওরাং ওটাং, পা হাতের তুলনায় অনেক ছোট, দুর্বল এবং বাঁকা এবং গাছে ঘুরবার ফলে হাতের আঙুলগুলি লম্বা কোঁকড়ানো। দাঁত যদি পরীক্ষা করা যায় তো দেখা যাবে, কষের দাঁত খুব পরিস্ফুট নয় এবং তৃণভোজী ছাড়া আর কোনও প্রাণীর এমন হতে পারে না।

গরিলা ও শিম্পাঞ্জিদের মাটিতে হাঁটার ফলে মানুষের মতো শারীরিক গঠন অনেক বেশি পরিস্ফুট। ছোট, চওড়া হাত, বুড়ো আঙুল বেশ লম্বা, পায়ের পাতা চ্যাটালো; মেরুদণ্ড সুগঠিত বলে সোজা হয়ে দাঁড়ানো এদের পক্ষে কঠিন নয়।  তবে মাথার  ওজনটা একটু বেশি বলে সামনের দিকে এরা ঝুঁকে পড়তে  বাধ্য। এই দুই শ্রেণীর প্রাণীই যেন  গাছ আর ডাঙার সঙ্গে সন্ধি করেছে এবং গাছ থেকে ডাঙায় বদলি হওয়ার ব্যাপারে এরাই  যে সিঁড়ির মাঝখানের ধাপ এ বিষয়ে কোনই সন্দেহ নেই। মানুষের সঙ্গে পরীক্ষা করলে আরও গভীর আত্মীয়তা দেখা যায়। যথা, মানুষের মতো এর মেরুদণ্ডও টুকরো টুকরো ভার্টিব্রার হাড়ে ভাগ করা (সংখ্যায় প্রায় এক, কেবল এক জোড়া পাঁজরা কম বলে কোমরের কাছে একটু করে কম), ফুসফুস বিভিন্ন অংশে জোড়া, এমন কি কষ দাঁতের গঠন পর্য্যন্ত প্রায় এক।

pujosplmuseumapetomanbrain (Medium)

মস্তিষ্কের উন্নতি সম্পর্কে আগেই যে মতের কথা বলেছি, সে ধরণের সহজ ব্যাখ্যায় কারো কারো মন ওঠে না। চোয়াল ছোট হাল্কা হয়ে গেল, ঘাড়ের মাংসপেশী মাথার আকার বদলাতে সাহায্য করল এবং রক্ত চলাচলের তফাৎ হওয়াতে মস্তিষ্কের আকার বড়ো হতে লাগল। তাই বিজ্ঞানীরা আরও তথ্য জোগাড় করে যুক্তি ফাঁদলেন যে আসল বিবর্তন নির্ভর করছে ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক বা Cerebral Cortex এর  আবির্ভাবের ওপর। আমরা এখন  জানতে পেরেছি যে মস্তিষ্কের এই অংশ থেকেই আমাদের দেখা, কথা বলা, নড়াচড়া, জিভের আস্বাদ সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হয়। কোনও নিম্নস্তরের স্তন্যপায়ী জীবের এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্কটি বড়োই অপরিস্ফুট, নেই বললেই চলে। কেবল এর মধ্যে যে অংশটুকু গন্ধ পাওয়ার ক্ষমতা দেয় সেইটুকুই পরিষ্কার হয়েছে মাত্র। তাই ঘ্রাণেন্দ্রিয় কুকুর বেড়ালের এত প্রখর। এইসব প্রাণীদের মধ্যে ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মস্তিষ্কের কেন্দ্রগুলি এমনভাবে ছড়িয়ে আছে যে তা থেকে অন্যগুলি আলাদা করা  কঠিন। উচ্চতর প্রাণীদের মধ্যে কিন্তু ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক আকারে অনেক বড়ো এবং স্নায়ুরজ্জুর কেন্দ্র যাকে ইংরাজীতে বলে Medula তাকে ঢেকে এটা অনেক বিস্তৃত। আরও বড়ো কথা যে সব অংশ দেখা, শোনা, কথা বলা, ছোঁওয়ার ইন্দ্রিয়গুলোকে চালায় সেগুলো বেশ পরিষ্কার এবং ঘ্রাণের অংশ অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। এই কেন্দ্রগুলি পরস্পর বিচ্ছিন্ন এবং প্রত্যেকটির চারধারে একটা এলাকা আছে যেখান অনুভূতি সঞ্চিত হয় এবং এইসব জায়গাকে স্মৃতির ভাণ্ডার বলতে পারি। এই রকম এলাকার মাঝখানটিতে কল্পনার এলাকা। আমরা আজ পর্যন্ত ঠিক ভাবে মধ্যবর্তী জায়গাগুলোর অবস্থা বিচার ক’রে উঠতে পারিনি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে আদিম স্তরের অপরিষ্কার ঘ্রাণ-সর্বস্ব মস্তিষ্ক থেকে আমাদের এমন কূটবুদ্ধি সম্পন্ন সচেতন মস্তিষ্কের বিবর্তন হল কেমন করে? মস্তিষ্কের আকার যেমন বেড়েছে দেখতে পাচ্ছি সঙ্গে সঙ্গে নানা চেতনার উদ্ভব হয়েছে। মনে আছে নিশ্চয়, বানর শ্রেণীর মধ্যে দিয়ে মানুষের বিবর্তনের কথা আলোচনা করতে গিয়ে গাছপালার প্রভাব আমরা বিচার ক’রেছি এবং হাত ও পায়ের উদ্ভবের ওপরে গাছে চড়ার অনেক প্রভাব আছে। অনেকে মনে করেন মস্তিষ্কের বিকাশে ঠিক এই ধরনের প্রভাব কাজ করেছিল।

সাধারণ স্তন্যপায়ী জীবের মধ্যে হাত বলতে মানুষের অর্থে যাকে হাত বলে এমন কোন অঙ্গ নেই। বানর জাতীয় প্রাণীদের গাছে চড়ার জন্যেই উপরাঙ্গের উন্নতি হয়েছিল এবং তা থেকেই আধুনিক হাত জন্ম পেয়েছে। মুখ ও নাক দিয়ে গন্ধ ও স্পর্শের কাজ ছাড়া আর অন্য কোন কাজ চলে বলে তোমরা নিশ্চয়ই মনে কর না। (আত্মরক্ষার জন্য অবশ্য কামড়ানো চলে) কিন্তু গাছে চড়া থেকে আরম্ভ করে ফল পাড়া, বাদাম জাতীয় ফল ভাঙা  প্রভৃতি সব কাজেই হাতের জুড়ি মেলে না এবং চোখের সাথে এর আত্মীয়তা সব চেয়ে বেশি। এই সব কাজ করতে পারার ফলেই দ্রুত মস্তিষ্কের গঠন বদলে গিয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।

বুঝতেই পারছ এর কাজ করতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই মস্তিষ্ক উন্নত হল এবং সেই সঙ্গে মস্তিষ্কও পাল্টা হাত পায়ে ও চোখে নতুন দুষ্টু বুদ্ধি (কিছু সুবুব্ধিও) জোগাতে লাগল এবং ফলে সেগুলোও নতুন ধরনের নানা কাজ দক্ষ হয়ে উঠলো। দক্ষতা থেকেই বুদ্ধি গজায়, বুদ্ধি থেকেই আবার আরও নতুন দক্ষতা জন্মে। এই ভাবে এক ওপরমুখো ঘোরালো সিঁড়ি বেয়ে আধুনিক মানুষের মগজ বেরিয়ে এল।

যদিও এই সব যুক্তির মধ্যে অনেক ফাঁক আছে তবুও সমাজে পরিশ্রম করবার ফলে অর্থাৎ কাজের মধ্যে দিয়েই যে মানুষ শিখছে এ কথা যখন সত্যি, তখন গাছের জীবনের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তা যে এই পক্ষেও কিছু প্রকাশিত তা স্বীকার করে নিতে লজ্জা কী!

মস্তিষ্কের বিকাশ যেমন আমরা গভীর আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ করেছি অন্যান্য যে কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকাশ আমরা ঠিক সেইভাবেই বিচার করতে পারি। বিশেষ করে দাঁত, চোখ, অন্ত্রাদি, পা প্রভৃতির বিবর্তনের ক্ষেত্রেও ঠিক ঐ ধরণের যুক্তিই খাটে। মোট কথা কাজ করবার ধরনের বদল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, ঐ সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বদলে গেছে।

সবচেয়ে নিম্নতম প্রাণী এ্যামিবার চোখ বা ঐ জাতীয় কেন্দ্রীভূত স্নায়ুমণ্ডলী আছে কিনা সন্দেহ। হয়তো আলো পড়লে উত্তেজিত হয় এমন নিম্নতর ঐ স্তরের প্রাণী পাওয়া কঠিন নয় কিন্তু চোখের মত এরকম শক্তিশালী ইন্দ্রিয় পেতে অনেক হাজার বছর দরকার হয়েছে। বিশেষ করে অনেক ওপরে এসে আরেকটি অনুপম জিনিস দেখা গেল, সেটা হচ্ছে রঙ চিনবার, বাছবার ক্ষমতা।

আধুনিক কালে অন্ত্রাদি বিবর্তন সম্বন্ধে অনেক উল্লেখযোগ্য খবর পাওয়া গেছে। গবাদি পশুর রোমন্থনের প্রয়োজনে পাকস্থলীর একটি অংশে একটি বিশেষ ভিটামিন (ভিটামিন বি ১২) তৈরি হয়। এটিই খড়কুটো হজম করবার পক্ষে যথেষ্ট সাহায্য করে। আমাদের অন্ত্রে এ ধরনের কোনও বন্দোবস্ত নেই।

মানুষের মত সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ট জীবের অভ্যুত্থানের ইতিহাস এতো অল্প কথায় কেউ শেষ করতে পারে না, কিন্তু বিবর্তনের মূল সুরটি তোমরা ধরতে পেরেছ। তাই আমার ছুটি। এরপর এই কাঠামোর উপর রক্তমাংসের প্রলেপ লাগানোর ভার তোমাদের উপর।

pujosplmuseumostracodum (Medium)

খালি জীবজগত থেকে সভ্য মানুষের আবির্ভাবের যে গল্প সব শেষে তোমাদের বললাম তাও অর্ধেক মাত্র। কারণ মানুষের সমাজের উৎপত্তির ইতিবৃত্ত না জানলে এ গল্প শেষ হবে না। কিন্তু সে অন্য ভূমিকায় শুরু হবে। তাই সে কথা আজ থাক। বিবর্তনের ইঙ্গিতটুকু যদি তোমরা ধরতে পেরে থাক তবেই এ পরিশ্রম সার্থক। যাদুঘরে বেড়াতে গিয়ে মনে মনে ‘চলো যাই যাদুঘরে’র জানা কথাগুলো মিলিয়ে নিয়ে এক ছবি তুলে ধর, দেখবে কত পরিষ্কার হয়ে গেছে এই পৃথিবীর কথা।

 

1 Response to পুজো স্পেশাল চলো যাই যাদুঘরে দিলীপ রায়চৌধুরি শরৎ ২০১৬

  1. Riju Ganguly says:

    অসাধারণ লেখা। এটার ভিত্তিতে মেয়েকে অনেকগুলো গল্প বলা যেতে পারে।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s