পুজো স্পেশাল জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজো অনুপূর্বা রায় শরৎ ২০১৬

 pujospecialthakurbari01 (Medium)

বর্ষার মেঘ সরে যেতেই আকাশের দখল নেয় সাদা পেঁজাতুলো মেঘ,বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় শারদোৎসবের প্রস্তুতি। সময়বদলের খেলায় সেই প্রস্তুতি সেকালের সাবেকিয়ানার সাথে একালের ‘থিম’ পুজোর প্রতিযোগিতায় এনে দাঁড় করায়। শুরু হয়ে যায় বাঙালির দুর্গাপুজোয় ‘একাল-সেকাল’ এর কড়চা।

বাঙালির অতীতের দুর্গোৎসবের চর্চায় যে সব পরিবারের কথা উঠে আসে তার মধ্যে নিঃসন্দেহে স্থান পায় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজো। কিন্তু প্রশ্নটা এখানেই ! যে ঠাকুরবাড়ি ছিল ব্রাহ্ম অর্থাৎ নিরাকার ব্রহ্মের উপাসক, সেখানে দুর্গাপুজোর মতো সাকার ঈশ্বর সাধনা হত কীভাবে?  কে শুরু করেছিলেন এই পরিবারে পুজো আর সে পুজো বন্ধই বা হল কীভাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাস জানতে হলে যেতে হবে ঠাকুরবাড়ির গোড়ার কথায়।

যশোর জেলা থেকে কলকাতায় এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ থেকে সাত পুরুষ আগের পঞ্চানন কুশারী। কলকাতা শহরে আগন্তুক ব্রাহ্মণ পঞ্চানন সুতানুটি অঞ্চলে, গঙ্গার ঘাটে ব্যবসায়ীদদের পুজোআর্চা করতেন।লোকেরা তাকে ডাকত ঠাকুরমশাই, সেই থেকে তার নাম হয় পঞ্চানন ঠাকুর এবং পরবর্তীকালে তার উত্তরসূরীদের পদবীও হয় ‘ঠাকুর’। পঞ্চানন ঠাকুরের দুই নাতি নীলমণিঠাকুর এবং দর্পনারায়ণঠাকুরের মধ্যে বিষয়সম্পত্তি নিয়ে সবসময় বিবাদ লেগে থাকত।এই বিবাদের জেরে নীলমণিঠাকুর একদিন কুশারী বংশের গৃহদেবতা লক্ষী এবং শালগ্রামশিলা নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যান।পরবর্তীকালে তিনি কলকাতার মেছুয়াবাজার অর্থাৎ আজকের জোড়াসাঁকো অঞ্চলে এক সুবিশাল গৃহ নির্মাণ করেন। সুতরাং নীলমণিঠাকুরই জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি পত্তন করেছিলেন এবং সেই সাথে তিনি ঠাকুরপরিবারে দুর্গাপুজোও শুরু করেছিলেন। তবে ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজো নীলমণি ঠাকুরের নাতি প্রিন্স দ্বারকানাথের হাত ধরেই রাজকীয় আকার ধারণ করেছিল।

pujospecialthakurbari03 (Medium)এবার আসি পুজোর কথায়!  মাথায় গঙ্গানদী  নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঠাকুরবাড়িতে সমস্ত সাত্যিকতা মেনে প্রতিমা গড়ার মাটি আসত গঙ্গার পাড় থেকে। উন্মুক্ত ঠাকুরদালানে চলত ঠাকুর তৈরির কাজ, অর্ধচন্দ্রাকৃতির একচালার মূর্তিই ছিল ঠাকুরবাড়ির পুজোর বৈশিষ্ট্য। তবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হত প্রতিমার মুখের আদলের ওপর। প্রিন্স দ্বারকানাথের স্ত্রী দিগম্বরীদেবী ছিলেন অসামান্যা সুন্দরী এক নারী,  কথিত আছে ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজোর মায়ের মূর্তি একটা সময়ের পর এই দিগম্বরীদেবীর মুখের আদলে তৈরি করা হত। মাকে পরানো হত প্রচুর সোনার গয়না, মাথায় সোনার মুকুট থেকে কোমরে চন্দ্রহার সবই মায়ের গায়ে শোভা পেত। মূর্তিকে দু’বেলা বানারসী শাড়ি বদল করে পরানো হত, আবার কখনো পরানো হত দামী তসর কিংবা গরদের শাড়ি। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজোয় মায়ের ভোগ ছিল দেখার মতো। দু’বেলা অন্ন থেকে মিষ্টান্ন সব মিলিয়ে একান্ন রকমের পদ মা’র ভোগ হিসাবে নিবেদন করা হত, সাথে থাকত ফল, ডাবের জল ইত্যাদি। পরে সেগুলো ঠাকুরবাড়ির পুজোর দর্শনার্থীদের মধ্যে প্রসাদ হিসাবে বিতড়ণ করা হত। সেই সময় একদিকে বাংলায় ব্রিটিশ শাসন অন্যদিকে বাংলার মনীষীদের প্রভাবে নবজাগরণের জোয়ার চলছিল, তাই তখনকার সমাজের বিশিষ্ট মানুষরা ঠাকুরবাড়ির দুর্গোৎসবে আমন্ত্রণ পেতেন। আমন্ত্রণপত্র লেখা হত দ্বারকানাথের পিতা রামমণি ঠাকুরের নামে। একবার পিতামহের সেই আমন্ত্রণপত্র নিয়ে বারো বছর বয়সের বালক দেবেন্দ্রনাথঠাকুর গিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়কে নিমন্ত্রণ করতে, রামমোহনকে গিয়ে তিনি বলেছিলেন :  ” সামনে পুজো তাই তিনদিনই প্রতিমাদর্শনে আপনার নিমন্ত্রণ, পত্রে দাদুর এই অনুরোধ।” প্রতিমাপুজোয় বিরোধী  রামমোহন রায় এই আমন্ত্রণে খুব বিস্মিত হয়েছিলেন। যদিও বন্ধু দ্বারকানাথের পুত্র দেবেন্দ্রনাথকে তিনি খুব স্নেহ করতেন তাই নিমন্ত্রণপত্রটি প্রত্যাখ্যান করেননি আবার সরাসরি সেটা গ্রহনও করেননি, তিনি তাঁর ছেলে রাধাপ্রসাদের কাছে দেবেন্দ্রনাথকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। রাধাপ্রসাদ পিতার হয়ে সেটা গ্রহন করে দেবেন্দ্রনাথকে মিষ্টিমুখ করিয়ে দিয়েছিলেন। 

প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রতি বছর পুজোয় বাড়ির ছেলেমেয়ে এবং বউদের দামী দামী পোশাক উপহার দিতেন। পুজোর তিনমাস আগে থেকে দর্জিরা ঠাকুরবাড়িতে চলে আসতেন  এবং  সেখানে বসে তারা বানাতেন সকলের পুজোর পোশাক- ছেলেদের জন্য জড়ির টুপি, চাপকান, ইজার এবং মেয়েবউদের জন্য পছন্দমত জামাকাপড় সাথে নানা কাজ করা রেশমি রুমাল। পুজোর জন্য ঠাকুরবাড়ির প্রত্যেক মেয়েবউ দ্বারকানাথের কাছ থেকে উপহার পেতেন এক শিশি দামী সুগন্ধী, খোপায় দেওয়ার সোনা বা রুপোর ফুল, কাঁচের চুড়ি আর নতুন বই।আসলে দ্বারকানাথ পার্বণী দেওয়ার ব্যাপারে খুব দরাজ ছিলেন। বাড়ির দুর্গাপুজোয় ছোট থেকে বড়, মেয়েবউ এমনকি বাড়ির ভৃত্য-কর্মচারীরাও পেতেন। দুর্গাপুজোর মতো প্রতিমা বিসর্জনের পালাও ছিল সমান রাজকীয়। দশমীর দিন নানা রকমের বাদ্যি আর গ্যাসবাতি নিয়ে এগিয়ে যেত বিসর্জনের শোভাযাত্রা। পাশেই গঙ্গা আর সেই গঙ্গা পর্য্যন্ত মাতৃপ্রতিমার সাথে বাড়ির মেয়েবউরা  দরজা বন্ধ করা পাল্কিতে এগিয়ে গিয়ে বাড়ির উমাকে বিদায় দিতেন, সাথে যেত পিতলে বাঁধানো লাঠি হাতে প্রহরী।  তবে প্রতিমা বিসর্জনেরর ক্ষেত্রে যে কথাটা অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি তা হল বিসর্জনের সময় মায়ের শরীরে পরানো সোনার গয়না খুলে নেওয়া হত না, সেগুলো সমেত গঙ্গাবক্ষে প্রতিমা নিরঞ্জন করা হত। পরে নৌকোর মাঝি বা অন্যান্য কর্মচারীরা জল থেকে সে গয়না তুলে নিতেন কিন্তু ওইসব গয়না আর কখনোই ঘুরে ফিরে ঠাকুরবাড়িতে আসত না। আর এখানেই ছিল  ঠাকুরবাড়ির বনেদিয়ানার জিত ! একালের মতো দুর্গাপুজোর পর ঠাকুরবাড়িতেও স্বাভাবিক নিয়ম মেনে হত বিজয়া সম্মেলনী। সেই উপলক্ষে হত মস্ত জলসা- খোলা ঠাকুরদালানে নাচ,গান, নাটক এবং অন্যান্য আমোদপ্রমোদের ব্যবস্থাও করা হত। সেকালের নামকরা ওস্তাদেরা তানপুরা নিয়ে এসে গানে মাত করে দিতেন, রাজকীয় ঝাড়বাতির নীচে চলত বিজয়ার রাজসিক খাওয়াদাওয়া- মিষ্টিমুখ,গোলাপজল, আতর, পান আর কোলাকুলি।

একদা বারো বছরের যে বালক দেবেন্দ্রনাথ পিতার বন্ধু রাজা রামমোহন রায়কে পারিবারিক পুজোয় নিমন্ত্রন জানাতে গিয়েছিলেন, কুড়ি বছর বয়সে পৌঁছে সেই দেবেন্দ্রনাথই উপনিষদের প্রথম শ্লোকের অর্থের মধ্যে ব্রহ্মজ্ঞান খুঁজে পেয়েছিলেন। রামমোহনের ‘একেশ্বরবাদ’ মতবাদ সম্পর্কে তখন তিনি অবগত। একেশ্বরবাদ চর্চার লক্ষে তিনি গড়ে তুললেন ‘তত্ত্বরঞ্জিনী সভা’। পরে এর নাম পাল্টে হয় ‘তত্ত্ববোধিনী’ সভা এবং সেই সভার সাথে ‘ব্রহ্মসভা’ যুক্ত হয়। এই সভার দায়িত্ব নিয়ে পঁচিশ বছরের তরুণ দেবেন্দ্রনাথ ব্রাক্ষধর্মকে দীক্ষার ধর্মে রূপায়িত করে ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠা করলেন। দ্বারকানাথের জেষ্ঠ্যেপুত্রের হাত ধরেই ঠাকুরবাড়ি ধীরে ধীরে ‘ব্রাহ্ম’ পরিচয় প্রাপ্ত হল এবং দুর্গাপুজো সেই বাড়িতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল। যদিও এই পুজো বন্ধের ব্যাপারে সকলে সমান মতের অধিকারী ছিলেন না। দেবেন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ ভ্রাতা নগেন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন – “দুর্গোৎসব আমাদের সমাজের বন্ধন, সকলের সাথে মিলনের এক প্রশস্ত উপায়। ইহার উপর হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়, করিলে সকলের মনে আঘাত লাগিবে..”। এরপরও দু’তিন বছর ঠাকুরবাড়িতে দুর্গাপুজো হয়েছিল কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই পুজোয় আর অংশগ্রহন করতেন না,  পুজোর সময় তিনি চলে যেতেন ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় নতুবা তাঁর প্রিয়স্থান হিমালয়ে ।

পিতৃমুখী রবীন্দ্রনাথ পিতার আদর্শে জীবনে কোনো দুর্গোৎসবে অংশগ্রহণ করেননি, কিন্তু ‘দুর্গাপুজো’  তাঁর বিপুল সাহিত্যভান্ডারে কখনো ব্রাত্য ছিল না। কবিতা, ছোট গল্প, নাটক কিংবা উপন্যাসের বিষয়বস্তু হিসাবে বারবার উঠে এসেছে দুর্গাপুজো। আসলে শরৎ ঋতুর এই উৎসবকে তিনি মাটির প্রতিমাবন্দনায় মৃন্ময়ী না করে শরতের অমল আলোয় প্রকৃতি বন্দনা করে তাকে চিন্ময়ী করে তুলেছেন ‘শারদোৎসব’ নাটকে। ১৯০০ সালের দুর্গাপুজোর সপ্তমীতে বন্ধু প্রিয়নাথ সেন কে রবীন্দ্রনাথ একটা চিঠিতে  লিখেছিলেন – ” প্রকৃতির অনন্ত মাধুরী এবং অসীমতার মধ্যে যখন আমরা বিভোর হইয়া আমাদের সমস্ত প্রাণখানি ঢালিয়া দিই,তখনই প্রকৃত পূজা….”

pujospecialthakurbari04 (Medium)

এই ‘প্রকৃতপূজা’ কে  উপলব্ধি করতে তিনি মহালয়ায় শান্তিনিকেতনে শুরু করেছিলেন একদিনের মেলা ‘আনন্দবাজার’। শরতের আবাহনে সেখানে আশ্রমিক ছাত্রছাত্রীরা মেতে ওঠে মাটির ঠাকুরপুজোর আনন্দে নয়, প্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়ার মনের নির্বিরোধ আনন্দে- স্থলপদ্ম, শুভেচ্ছা, শিউলির মাদকতায় আর ‘গীতবিতান’ এর পাতা থেকে উঠে আসা শরতঋতুর গানে – ” শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি….”  !    

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s