পুজো স্পেশাল নাটক-পুজোর প্রস্তুতি আশুতোষ ভট্টাচার্য শরৎ ২০১৮

জয়ঢাকের নাট্যশালাঃ 
হাবুদের ডালকুকুরে , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুরাতন ভৃত্য যোগীনদাদা –রবীন্দ্রনাথের কবিতার নাট্যরূপঃ (তাপস শঙ্কর ব্রহ্মচারী)  রাজপুত্তুর, (কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়)   সেলফিশ জায়েন্ট- (অনুপম চক্রবর্তী,) 

আশুতোষ ভট্টাচার্য

চরিত্রদুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, অসুর, শিব, বিশ্বকর্মা, কুরিয়ার বয়

কৈলাসে শিবের নিবাসে সর্বদা হইচই কিছু না কিছু লেগেই আছে, কারো পরীক্ষা তো কারো খিদে পেয়েছে কারো ফুটবলে হাওয়া নেই তো কারো জ্যামিতি বাক্স পাওয়া যাচ্ছে না
ব্যাকগ্রাউন্ডে কার্তিক গাইছে,(আমার ভিনদেশী তারার সুরে)

মামার বাড়ি যাবে লক্ষ্মী সরস্বতী
বন্ধ ক’দিন পড়া কি আর হবে ক্ষতি!
গণেশ দাদা ভাবে এত কিসের তাড়া,
কার্তিক টিউশনে , সকাল বিকেল পড়া,
সাদা মেঘের ভেলা, রোদের লুটোপুটি
আনন্দ চারপাশে এখন পুজোর ছুটি।।

লক্ষ্মী- সত্যি রে ভাই, আর কিছুদিন পরেই তো পুজো, মা, পুজো তো এসেই গেল, ব্যাগপত্তর গোছাই, নইলে শেষ মুহূর্তে রাগারাগি, হুড়োহুড়ি হুলুস্থুলু বেঁধে যাবে। কবে যাব মামাবাড়ি?

দুর্গা- যাব তো অবশ্যই, তোর বাবাকে তো বলেছিলাম টিকিটের জন্য, যা ভুলো মন, ভাল মনে করেছিল, আজ জিগ্যেস করব।(শিব মঞ্চে আসে, এক হাতে বাজারের ব্যাগ অন্য হাতে ত্রিশুল)।

দুর্গা- তুমি আবার ত্রিশুল নিয়ে বাজারে গেছ, কচুশাক এনেছ, মোচা, নকুলদানা, বাসন মাজার সাবান, আরনিকা হেয়ার অয়েল ……।।আচ্ছা আমাদের পুজোর টিকিটের কি হল, এসি টু টিয়ার কাটতে বলেছিলাম কিন্তু। অনেকদিন আগে তো কাটতে বলেছিলাম।

শিব- লক্ষ্মী একটু জল দে দেখি, সরস্বতী হাওয়া কর, ঘেমে নিয়ে বাজার থেকে এলাম, সাথে সাথে শুরু হয়ে গেল তোর মায়ের র‍্যাপিড ফায়ার কোশ্চেন রাউন্ড।

শিব-(জল খেয়ে), আর টিকিট, পুজোর সময় বাদ দিয়ে বাপের বাড়ি যেতে পার না, পিল্পিল করে লোক চলেছে, পুরী, উটি, দারজিলিং, সিমলা, মানালি, কাশ্মীর, চেন্নাই কেরালা।কৈলাস এক্সপ্রেসের সব টিকিট বুকড, জনতা এক্সপ্রেস, হামসফর, পুজো স্পেশাল কোথাও ঠাই নাই। ফ্লাইট তারও সেই এক অবস্থা।

দুর্গা- কথার কী ছিরি দ্যাখো, পুজোর সময় বাদ দিয়ে আমার সময় হয়! ছেলেমেয়ের স্কুল, আঁকার ক্লাস, নাচের ক্লাস, জয়েন্ট এর কোচিং, তারপর গুল, ঘুঁটে দেওয়া, ছাতে বড়ি শুকোতে দিতে হয়, খবর তো রাখ না কিছুরই। সারাদিন কি ছাই ধ্যান কর, ব্যায়াম কর আর ডমরু বাজাও।

শিব- দেখি রেলের এক বড় অফিসার চিত্রগুপ্তের ভায়রাভাই, উনি যদি কোটায় কিছু করে দিতে পারেন।

দুর্গা- আরে আমরা তো ভি আই পিই! আমরা না গেলে পুজো হবে ভেবেছ?

শিব- দেখি, নইলে বিশ্বকর্মাকে বলব, এতদিন তো ওর বানানো নৌকো, পাল্কিতে চড়ে গেছ নাহলে হাতি কি ঘোড়ায় চেপে। আরে এসব নিয়ে অত চিন্তা করবার কিছু নেই। আমায় একটু করা করে লিকার চা বামিয়ে দাও দেখি, খানিক আদা দিয়ে। ওদিকে আজ আবার পরিবেশ বাঁচাতে ঠোঙার ভুমিকা শীর্ষক এক আলোচনা সভায় যোগ দিতে হবে , যেতে হবে সেই টুইংকিল নগরে।

সরস্বতী- মা আমার বীণার তাঁর পাল্টাতে হবে, হাঁসটা এত দুষ্টু  হয়েছে, ঠুকরে দিয়েছে। তারপর জুতোর বেল্ট ছিঁড়ে গেছে, ব্যাকরণ বইতে মলাট দিতে হবে। বাদাম চিড়েভাজার প্যাকেট নিতে হবে, ডাইজিন, জেলুসিল, সারিডনের পাতা নিতে হবে। নইলে তো সব দোষ আমার। আমি যাই গোছগাছ করি।

দুর্গা- গণেশ কোথায় গেলি রে, বাবারে এক দৌড়ে এই টাকার তেজপাতা আর এক পাতা গরম মশলা নিয়ে অ্যায় দেখি গোপালদার দোকান থেকে।

গনেশ(ঘেমে নেয়ে সাইকেলের চাকায় হাওয়া দিতে দিতে), বাবা এই সাইকেলটা আর চালানো যাচ্ছে না, সেই ক্লাইভের আমলের সাইকেল, আজ চেন পড়ে যায়, কাল সামনের চাকায় টাল, সে ঠিক হল তো ব্রেক কাজ করে না, রিমে মরচে ধরে গেছে। একটা রেসিং সাইকেল কিনে দাও না। অনলাইনে ডিসকাউন্ট দিচ্ছে আমাজনে খোঁজ নাও।

শিব- তোদের খালি কায়দা, এই সাইকেল নিয়ে আমি কতবার তিব্বত, কাশ্মীর ঘুরে এলাম, পেরুর মাচুপিচু কি মিশরের পিরামিড দেখে এলাম, ফাস্টক্লাস পারফর্মেন্স। তোর মাকে একবার কেরিয়ারে বসিয়ে বেড়াতে নিয়ে গেছি। (কান খোঁচাতে খোঁচাতে) বলি পড়াশুনো হচ্ছে! মহাভারত লেখা কতদুর। ওদিকে গ্রন্থকীট পাবলিকেশন আমায় রোজ তাড়া দিচ্ছে, লেখার কপি না দিলে মহাভারত ছাপতে পারছে না।

গণেশ- ( মাথা চুলকে), বাবা আসলে ওই মান্ধাতার আমলের কলম দিয়ে লিখতে ভারী কষ্ট, বারবার কলম দোয়াতে চোবাতে হয়, কালি শুকিয়ে যায়, হঠাৎ ঝপ করে কালি পড়ে গেল। একটা জেল পেন কিনে দিলে সুবিধে হয়। আর ইয়ে ব্যাস কাকু বলছিল কি, ভারী গরম কিনা, তালপাতার পাখার হাওয়ায় ঠিক হচ্ছে না , মানে মনঃসংযোগের অভাব ঘটে, নিদেনপক্ষে একটা ফ্যান হলে এসব ঝামেলা থাকে না। বেশ মনোযোগ দিয়ে লেখালিখির কাজটা করা যায়।

শিব- সে খানিকটা ঠিকই বলেছিস, কি সব উষ্ণায়ন না কি বলে না, আমার পিঠে পর্যন্ত ঘামাচি হয়েছে।জামাকাপড় সবসময় ঘামে জবজব করছে। আচ্ছা কার্তিক কোথায় বল দেখি। আজ আর্যভট্ট স্যারের সাথে দেখা, বলে কার্তিক নাকি সুদ কষা, লাভক্ষতির অঙ্ক কিছুই পারে না, ম্যাপ পয়েন্টিং এ লন্ডন লিখেছে কোলকাতার পাশে, ট্রান্সেশনেও তথৈবচ, হ্যাঁরে ও পাস করবে তো।কইগো( দুর্গাকে বলে) কাতুকে একটু ২৩ টি একান্ত প্রয়োজনীয় খাদ্যগুনের হেলথ ড্রিঙ্কটা তো খাওয়ালে পার, এই ছোট বয়সেই তো মস্তিস্কের কোষ গঠন হবে ঠিকঠাক।

কার্তিক- (ক্রিকেট বল খেলতে খেলতে প্রবেশ), মা রোজ রুটি আর ওই অখাদ্য পটলের তরকারির টিফিন দাও, আই আম রিয়েলি টায়ার্ড। অরুচি ধরে গেছে, বেশ পরোটা আজ ঝালঝাল আলুরদম, বোঁদে, নকুড়ের সন্দেশ দিলেও তো পার মাঝে মাঝে। আর বাবা তুমি বলেছিলে টেনে উঠলে বাইক কিনে দেবে, দ্যাখ রয়্যাল এন্ডফিল্ডের একটা দারুণ মডেল এসছে বাজারে।

শিব- আগে উঠে নে, তোর যা অবস্থা পাস না করে বোধহয় পাশবালিশ পাবি। বল দেখি কুকুরটা ল্যাজ গুটাইয়া পলায়ন করিল, ট্র্যান্সলেশন কি হবে।

দুর্গা- আরে তোমরা কি শুধু পড়াশুনো আর তর্ক করবে? ছেলেটার খিদে পেয়েছে দুটো লুচি ভেজে দি, সর একটু আটা ময়দা মাখ দেখি। আমি দেখি তেল আছে কিনা। আর তুমি রসিক মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে এক কেজি বোঁদে এনে দাও দেখি। আজ রাতে লুচি, আলুরদম, বোঁদে।

শিব- এক কেজি বোঁদে? লুচি? মাসের শেষে এ কি শুরু করেছ। এক কেজি বোঁদে দিয়ে তো সারা স্বর্গ লোকের মিষ্টিমুখ হয়ে যায় গো, আমি বলছিলাম মানে বোঁদের পরিবর্তে বাতাসা কি নকুলদানা দিয়ে হয় না, আফটার অল দুটোই তো সুগারকেন থেকে তৈরি হয়।

সরস্বতী-(ময়দা মাখতে মাখতে)- লক্ষ্মী, এবার পুজোয় আমরা সারারাত ঠাকুর দেখব। ফুচকা, আলুকাবলি, কুলফি মালাই খাব, মেট্রো চড়ব। আর প্রাইজ পাওয়া বড় বড় পুজোগুলো দেখতে যাব। বাদামতলা লস্যি সঙ্ঘ, খাদ্যে সুরুচি সঙ্ঘ, ট্রেন গড়িয়া আদি দুর্গা, দারুণ নবারুণ ক্লাব, পাকা চালতাবাগান…।।

লক্ষ্মী- আর বলিস না, এখন সব থিমের ঠাকুর, কেউ চায়ের ভাঁড়ে কেউ দেশলাই কাঠি দিয়ে, কেউ ভাঙা রেকর্ড কি টিন পেরেক দিয়ে ঠাকুর বানাচ্ছে,কেউ কেরালা, কাশ্মীর, নাগাল্যান্ড, রাজস্থান তুলে নিয়ে আসছে কদিনের জন্য কলকাতায়,  আর তেমন ভিড়। এক একটা ঠাকুর দেখতে পাক্কা এক ঘণ্টা। দেখি পুরুতকাকুকে বলে পাস টাস জোগাড় করা যায় কিনা।

কার্তিক-( কত যে সাগর নদীর সুরে)
কত যে ভূগোল জিকে পড়ে ফেললাম আমি
সন্ধি সমাস ইতিহাস
আকাশে মেঘের ভেলা, চারপাশে কাশফুল
পুজো এলো, আশ্বিন মাস।।
পুজো এলো, মনে রেখো!!!

লক্ষ্মী- বাঃ, দারুণ গান বানিয়েছিস রে, সর, লিটিল চ্যাম্পে এই গানটা গাইবি নাকি এবার? জমে যাবে।

সরস্বতী- আর লিটিল চ্যাম্পের কথা বলিস না, একশোটা চ্যানেলে কম্পিটিশন হচ্ছে, গানের থেকে বেশী বকবক আর এড দেখাবার ধুম। বেশ আয়েস করে একটা গান গাইব তাঁর জো আছে? ওরাই বলে দিচ্ছে কি গাইতে হবে, কেমন সাজতে হবে, হাসি হাসি মুখ করে ওদের শেখানো বুলি আউরে যেতে হবে। এর থেকে আমাদের বাড়িতে সব্বাই মিলে যে গানের আসর বসে ঢের ভাল।

কার্তিক- (প্রেম জেগেছে আমার মনের সুরে)
কুস্তি লড়ে বাইশ জনে, বীভৎস চেঁচাই
আমরা সবাই সুর বেসুরে
আবোল তাবোল গাই…
মামা, কাকা, দাদা, পিসি…।।

শিব-( দৌড়তে দৌড়তে শিবের প্রবেশ)- আর বোলো না, এখানেও মিডিয়া পৌঁছে গেছে, সবে বোঁদে নিয়ে কল্কেটা ধরাতে যাব, ব্যাস আমায় ছেঁকে ধরেছে, বলে আপনি মিহিদানা না বোঁদে ভালবাসেন, ল্যাংচা না ছানাবড়া, চন্দ্রমুখী না নৈনিতাল আলু, পাহাড় না সমুদ্র, ইউরপিয়ান ফুটবল না ল্যাটিন ফুটবল, হেমন্ত না মান্না, ঋত্বিক না সত্যজিৎ, পূর্ণিমা না আমাবস্যা। আর একগাদা ক্যামেরাম্যান আমার দিকে লেন্স টাক করে বসে আছে, বলে মর্তে নাকি লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। আমি যত বলি বাপ আমায় ছেড়ে দে, দেখিসনি স্যার সুকুমার রায় বলে গেছেন এই দুনিয়ায় সবই ভাল সস্তা ভাল দামিও ভাল, আমিও ভাল তুমিও ভাল, কিন্তু কে শোনে কার কথা।

গণেশ- তবে যাই বল বাবা, আমার কিন্তু বোঁদের থেকে মিহিদানা ঢের ভাল লাগে, আর মিহিদানার কথা বললেই আমার সীতাভোগের কথা মনে পড়ে, সীতাভোগের কথা উঠলেই আমার জল্ভরা সন্দেশের কথা মনে পড়ে, জল্ভরা সন্দেশের কথা উঠলেই আমার নবদ্বীপের ক্ষীর দই খেতে ইচ্ছে করে।

শিব- থামবি, এসব আর মনে করাস না রে, কখনো তো মনে হয় না, একটু পাণিনির কাছে ব্যাকরণটা পড়ি, বীরপুরুষ আবৃত্তি করি, থিওরি অফ রিলেটিভিটিটা বরাহমিহির কাকার কাছে শিখে আসি কিংবা কৌটিল্য খুড়োর কাছে ইকনমিক্সটা বুঝে আসি !!

কার্তিক- দাদা, তুই বড্ড ব্যাকডেটেড, কোথায় বলবি পাস্তা, বার্গার, পিজা, কোক তা না এখনো সেই আমার আটি চুষছিস। নতুনকে ভালবাসতে শেখ, আবাহন কর মর্যাদা দে স্বীকৃতি ডান কর।

গণেশ- বাপরে, এসব কঠিন কঠিন শব্দ কবে শিখলি রে ভাই, এবার তো মনে হচ্ছে তুই বাংলায় ফাস্ট হবি।

দুর্গা- তোরা ঝগড়া করা থামাবি, হাত মুখ ধুয়ে সব খেতে বস দেখি। লক্ষ্মী সর, আমি গরম গরম ভেজে দিচ্ছি তোরা দে দেখি সবাইকে। হ্যাঁরে মহিষাসুরকে ডাক দেখি, বেচারা বোধহয় মুগুর ভেজে চিলেকোঠার ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে।

অসুর- মা, লুচি করিয়াছেন, আমার তো আবার নিশিথে সামান্য অন্ন জাতীয় খাদ্য না গ্রহণ করিলে সঠিক নিদ্রা আসে না, উদাহরণ স্বরূপ , পান্তাভাত পেঁয়াজ সহযোগে, পোলাও, পলান্ন, ফ্রায়েড রাইস ইত্যাদি।

দুর্গা- বাবা আজ খেয়ে নে কোনমতে, আসছে মাসে তো মর্তে যাব তখন যা মন চায় খাস।

অসুর- এইবার মাতা আমি ভাবিতেছিলাম আর মর্তে যাইব না।

দুর্গা- কেন রে, হঠাৎ কী হল আবার,  মর্তে লোকে তোকে কত মান্য করে, তোর যুদ্ধের কায়দা দেখে সুখ্যাতি করে কত। তোকে নকল করবার চেষ্টা করে কত লোক।

অসুর- না মাত, সে বিস্তারিত কাহিনী, তাহার উপর ষষ্ঠীর দিন চালতাবাগান কৈলাস স্পোর্টিং ক্লাবে ফাইভ এ সাইড ফুটবল টুর্নামেন্ট, জয়লাভ করিলে মাংস ভাত, স্বর্ণ ও রৌপ্য পদক দিবে বলিয়াছে, সর্বোপরি ইদানীং আর যুদ্ধ বিগ্রহ করিতে মন সায় দেয় না, নকল দাড়ি, চুল লাগাইয়া চার পাঁচদিন ওইভাবে দাঁড়াইয়া থাকা ভারী কষ্টকর। ছারপোকা পিপীলিকা কামড়ায়, তাহার উপর গত বৎসর গণেশ দাদার ইঁদুর আমার বারমুডার পকেট ছিদ্র করিয়া দিল, যা সামান্য খুচরা পয়সা উপার্জন করিয়াছিলাম হারাইয়া গেল।

গণেশ- হু, ছিদ্র করিয়া দিল, আরে তুমি যে ওর কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছিলে সেটা বল।

অসুর-  এ তুমি কী বলিলে গণেশদা, তোমার ইঁদুর তো খালি আহার করে আর নিদ্রা দেয়, সকাল নটায় ঘুমাইতেছিল সাথে নাসিকা গর্জন,  তা আমি জাগাইয়া দিয়া বলিলাম,  চল খানিক শরীর চর্চা করিয়া আসি। কি ভুল বলিয়াছি বলুন মাতা!!

অসুর- সবচাইতে বড় কথা হইল, ওই গুপি গাইন বাঘা বাইন চলচিত্র দেখিবার পর, আমার আর যুদ্ধ বিগ্রহে মন নাই।

লক্ষ্মী- আরে কী মুশকিল, আচ্ছা অসুরকাকা তুমি বল , যুদ্ধ করতে না গেলে শুণ্ডি হুন্ডির সৈন্যরা অমন মণ্ডা, মেঠাই, পোলাও, মাংস, কালিয়া খেতে পারত? তারপর এ তো মিথ্যে মিথ্যে যুদ্ধ।

সরস্বতী- ঠিক, আর কোথাও দেখেছ, সৈন্য, সেনাপতিকে পুরুত ফলমূল, মিষ্টি খেতে দেয়, প্রদীপ জ্বালিয়ে আরতি করে, ঘণ্টা বাজিয়ে আরতি করে। অসুরের জন্য নতুন জামা কাপড় বরাদ্দ থাকে?

দুর্গা- সবাই চুপ কর, সব্বাই যাবে।আমার অর্ডার, তোমাদের নানা জনের নানা আবদার রাখতে রাখতে আমি পাগল হয়ে যাব দেখছি। আমি কাল মার্কেটিং করতে যাব।

সবাই হৈহৈ করে উঠল

অসুর- মাতা, তবে এইবার আমাকে একটি জগারস কিনিয়া দিবেন, খালিপায়ে আজকাল আর কেহ যুদ্ধ করে না, সর্বোপরি পুজো মণ্ডপে পেরেক আলপিন প্লাস্টিকের কাপ প্লেটে সর্বদা পা কাটিয়া যাইবার ভয় থাকে।

লক্ষ্মী- মা, আমার জনু একটা ভ্যানিটি ব্যাগ আর টেরাকোটার ঝাপি আর পেঁচার জন্য একটা গগস, বেচারা এত আলো না চারপাশে, খুব কষ্ট হয়।

সরস্বতী- আমার একটা গীতবিতান চাই সাথে অরিজিত সিং এর সিডি। গতবারও দু একটা মণ্ডপে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে বলেছিল। তৈরি হয়ে যাওয়াই ভাল, কি বল।

গণেশ- অতঃপর কর্ণ আর অর্জুনের ভয়ঙ্কর যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল কুরুক্ষেত্র মাঠে। মাঠে রেফারি দ্রোণাচার্য মাঝে মাঝে বাঁশি বাজান। আর ধারাবিবরণী দিচ্ছেন সঞ্জয়। অর্জুন ডিফেন্স করছেন বটে কিন্তু কর্ণ এক্সিলেন্ট। সমর্থকদের উন্মাদনাও দেখবার মত, কেউ পতকা, কেউ গামছা নেড়ে সমর্থন জানাচ্ছেন তাদের প্রিয় যোদ্ধাকে।

কার্তিক- দাদা, পার্ট ভুলে গেছিস, এ তো ছোটদের মহাভারতের সংলাপ। তোর আর কি দোষ, একসাথে দশটা নাটক করবি, এর পার্ট তাঁর ঘাড়ে চাপাবি, তবু অন্য কাউকে অভিনয় করতে দিবি না। হ্যাঁ মা আমার একটা স্মার্টফোন চাই, মর্তে গিয়ে সেলফি তুলব।

শিব- হারামজাদা, তোর স্মার্টফোন কেনা বার করছি। বল দেখি কিংকর্তব্যবিমুঢ় বানান কী?

কার্তিক- আমতা আমতা করে, হ্যাঁ বাবা, বলছিলাম, কিং মানে রাজা, কর্তব্য মানে টাস্ক বা রেস্পন্সিবিলিটি, আর মুড়ো মানে মাছের মুড়ো মানে মাথা।

এমন সময় এক ডেলিভারি বয় এসে উপস্থিত

বয়- আমি পক্ষীরাজ কুরিয়ার থেকে আসছি, এখানে পার্বতী দেবী বা মহাদেব বাবু বলে কে থাকেন? চিঠি আছে, আধার কার্ড দেখান আর এখানে সই করে রিসিভ করুন। বোন এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল দিও তো, আপনাদের এখানে ঠিকানা বের করা ভারী ঝঞ্ঝাট।

দুর্গা- আধার কার্ড কী ভাই? ভোটার কার্ড একটা ছিল বটে কিন্তু এখন তো আর ভোট দি না, আর এখানে তো আমায় সবাই চেনে।

বয়- সে কী মাসিমা আপনারা আধার কার্ড বানাননি, বিপিএল চাল পান কী করে? দুদিন পরে তো ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলতে পারবেন না, মোবাইল কানেকশন পাবেন না, ইনকাম ট্যাক্স খুব মুস্কিলে পড়বেন কিন্তু।

শিব- ঠিক আছে ঠিক আছে, আমাকেও অনেকে বলেছিল ব্যাপারটা, তা আধার যে কম্পালসারি হচ্ছে সে তো আমায় কেউ জানায়নি। এবার বানিয়ে নেব অবশ্যই। তা তুমি চিঠিটা দাও দেখি, আবার কে লোন শোধের তাগাদা দিচ্ছে না সভাপতিত্ব করবার নিমন্ত্রণপত্র দেখি।

শিব চিঠি খুলে পড়তে থাকেন।

শ্রীচরণেষু মা,
এবার পুজোয় তোমাদের মর্তে আগমন নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে শুনলাম। এ বিষয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। এর সঙ্গে আমাদের ইতিহাস, ভূগোল, সম্মান, অর্থনীতি, মিড ডে মিল, পঞ্চায়েত ইলেকশন, কন্যাশ্রী প্রকল্প, বিশ্বকাপ ফুটবল, ১০০ দিনের কাজ অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। তাই বাংলার সমস্ত সার্বজনীন পুজো কমিটির হত্তাকত্তা সভাপতি ক্যাশিয়ার মিলে ঠিক করেছি তোমাদের নিয়ে আসবার গুরুদায়িত্ব আমরাই কাঁধে তুলে নেব। নাসা আর ইসরো যৌথ উদ্যোগে একটা রকেট বানিয়ে দেবে যা জলে স্থলে অন্তরীক্ষে অবাধে চলে, নাম হবে বিজলী শকট। আপনাদের নিতে এই বাহন পঞ্চমীর সন্ধেতে উপস্থিত থাকবে। আপনি পুত্রকন্যা নিয়ে তৈরি থাকবেন।

ইতি,
আপনার গুণমুগ্ধ পৃথিবীবাসী।

দুর্গা- না বাপু, তুমি ওদের জানিয়ে দিও আমাদের যাবার বন্দোবস্ত আমরাই করে নেব। এরা নিয়ে যাবার সময় তো তাড়াহুড়ো করে নিয়ে যাবে, ফিরবার সময় হয় অসুবিধে, কর্মকর্তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না, বলে বাজেট শেষ, দুটো দিন ওয়েট করুন ওদিকে একটা কার্গো যাবে তাতে চলে যাবেন, নানান অজুহাত, তারপর এ রকেট টকেত বানাতে বিপুল খরচ, প্রচণ্ড দূষণ, আমি এসব বরদাস্ত করতে পারব না, মিডিয়া এসব খবর লুফে নেবে। ও  তুমি বিশ্বকর্মাকেই বল।

বিশ্বকর্মা দৌড়তে দৌড়তে আসে।

বিশ্বকর্মা- বলুন স্যার, ম্যাডাম।
দুর্গা- বিশু, নৌকো কতদূর?

বিশ্বকর্মা- কাজ তো ভালই চলছিল কিন্তু আলকাতরা পাওয়া যাচ্ছে না, বেশ কাঠ কেটে শুকিয়ে সিজিন করে নৌকোর স্ত্রাকচার তো বানিয়ে ফেলেছি, এবার প্রথামত আলকাতরা লাগাতে হবে। ও পেয়ে যাব। ওদিকে নৌকোর হাল, পাল , গলুই নিয়ে আলাদা আলাদা দল কাজ করছে। আশা করছি সময়মত শেষ হয়ে যাবে।

দুর্গা- আলকাতরার ব্যাপারটা খুব চিন্তার, আরে তুমি একটা টিন নিয়ে মোড়ের হার্ডওয়ারের দোকানটায় খোঁজ নাও না।

শিব- তোমরা দেখি আমায় শান্তিতে বসতেই দাও না, এখন খোঁজ আলকাতরা, কাল বলবে পেরেক নিয়ে এস, পরশু বলবে জিপিএস লাগিয়ে দি, বসবার ভাল গদি বানিয়ে দি। আচ্ছা বিশু সব কাজ থার্ড পার্টিকে দিয়ে করাস বলেই তোর আজ এত বদনাম। যেদিন থেকে তুই খাতা ডাইরি ছেড়ে ল্যাপটপ নিয়েছিল তোর ওপর আমাদের ভরসা কমে গেছে।

(বসন্ত বাতাসের সুরে)
শিউলি ফুলের গন্ধ ভাসে, বন্ধু মেঘ ভাসে আকাশে
কাশের বনে মাতাল হয় মন , আনন্দ উল্লাসে বন্ধু,
মেঘ ভাসে আকাশে।।
নতুন জামা নতুন জুতো ঠাকুর দ্যাখার ভিড়
অঞ্জলি আর অষ্টমীর ভোগ, মানুষে অস্থির বন্ধু
শিশির পড়ে ঘাসে।।
মহালয়া ঢাকের বাদ্যি অনেক গানের সুর
চড়ুই শালিক নেচে বেড়ায়, উঠোনে রোদ্দুর বন্ধু
আশ্বিন কার্তিক মাসে।।

নৌকো তৈরি। এ যেন মনপবনের নাও, চাঁদ সদাগরের নৌকো, রঙিন পাল উড়ছে, মৃদু মৃদু হাওয়া লাগছে পালে। নদীর ঘাটে আজ খুব ব্যাস্ততা। নৌকোতে মালপত্র বাক্স প্যাঁটরা তোলা হচ্ছে, অনেক দূরের পথ। একে একে লক্ষ্মী গণেশ কার্তিক সরস্বতী অসুর সিংহ ইঁদুর প্যাচা ময়ূর রাজহাঁস নৌকোতে ওঠে। দোষ হাতে অস্ত্রশস্ত্র সামলে এবার উঠবে দুর্গা। বিশ্বকর্মা প্রণাম করে তাঁকে, সাবধানে যাবে মা।

নৌকো ছেড়ে দেয়, সবাই গান ধরে
নাও ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দে। 

Advertisements

One Response to পুজো স্পেশাল নাটক-পুজোর প্রস্তুতি আশুতোষ ভট্টাচার্য শরৎ ২০১৮

  1. Sudeep says:

    Hahaha.. Darun

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s