পুজো স্পেশাল পাহাড় পাহাড় সম্পাদনাঃ শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় শরৎ ২০১৮

পাহাড়!! পাহাড়!!

(জয়ঢাকের ১৮ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ছোটোদের ট্রেক। ১৭ মে-২১ মে ২০১৮)

 পদব্রজে

দেবাশিস রায়

হাতে টুকরো টুকরো করে কাগজের পুরিয়া। ইস্টিশানে সদলবলে হাজির কিছু ছেলেবুড়ো। হাজিরা নেওয়ার সাথে সাথে তাদের হাতে একটা করে কাগজের পুরিয়া তুলে দিচ্ছে কড়াধাচের এক আধবুড়ো।  

হঠাৎ করে দেখলে মনে হবে ছোটোবেলার বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছে মেজ’দা। তার পাহাড়ায় পাহাড়ে চলেছে ব্যাটেলিয়ান। মেজদা’র ঝোলায় যেমন থাকার কথা আরকি – জল খেতে যাওয়া,  পেচ্ছাপ করতে যাওয়া ইত্যাদি লেখা চিরকুট। 

কড়া অনুশাসন। নড়চড় হবার নেই।  ভয়ে ভয়ে হাতের চিরকুট খুলে দেখলাম এস – থ্রি / ছয়। বাকিরাও যে যার মতো চিরকুট পাওয়া মাত্র পকেটে চালান দিল। বদলাবদলি চলবে না। ভাইস ক্যাপ্টেনরা ‘উত্তরবঙ্গ’র দুই দরজায় নাকে রুমাল চাপা দিয়ে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন,  কেউ যেন বেচাল না করে। 

জয়ঢাক বাজিয়ে রওয়ানা। ছোটোদের সাথে বড়দের পদব্রজে পাহাড়ে চড়া। সতেরো মে যাত্রা করে ২১শে মে ফেরা। দলেও জনা ২১।  সংগে ক্যাপ্টেন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর একুশে আইন। যাওয়া হবে টুঙলু। ভারত নেপাল সীমান্তরেখা বরাবর উত্তরবংগের সুপরিচিত এক টঙ এ ওঠার জন্য টুকিটাকি জিনিস সম্বল – ক্যাপ্টেনের দেওয়া ২১ দফা ফর্দ অনুযায়ী।  আপাত হাল্কা বস্তা কাঁধে ওঠানোর পর শোলার টুপি লোহার টুপি হবার মত অবস্থা। অথচ ঐ ফর্দ’র বাইরে নাকের ড্রপ ছাড়া অতিরিক্ত কিছুই নাই। তাতেই কাঁধেই স্পিন্ডলগুলো প্রবল প্রতিবাদে ফর্দাফাঁই।

সে যাই হোক, রেলসফর শেষ হলে সড়কপথে যাওয়ার প্রস্তুতি। আবার টোকেন বিলি। ভাগ্য দু’নম্বরী। গাড়িতে আর এক ভাইস ক্যাপ্টেন। আগের রাতের ইনপুট কে আউটপোস্টে গলাধাক্কা দেবার জন্যে ষড়যন্ত্র আগে থেকেই করা ছিল। সিদ্ধ ডিম ফলোড বাই মর্তমান বেনানা। ইষ্টনাম জপতে জপতে উঠে পড়লাম গাড়িতে। হে নিম্নচাপ – তোমায় পুজার ছলে তোমায় ভুলে থাকা। মান অভিমান করে লাভ নেই। মান ভঞ্জনের ব্যবস্থা চারচাকায় শেষ স্টপেজ – মানেভঞ্জনে। ওখান থেকেই ট্রেক শুরু।

 নেপাল সীমান্ত বরাবর সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে কালো পিচঢালা পথে চোখে পড়ার মত উন্নয়ন। এক ঢালে পাহাড় আর এক ঢালে কংক্রিট এর তৈরি গার্ড ওয়াল। পাকদণ্ডী পথ বেয়ে চক্রযান এর উর্দ্ধগতি – জান বাজি রেখে। আমরা অবশ্য নিজের পায়ে হেঁটে উঠবো – ওই পথেই, তেমনই ইচ্ছা।  প্রথম গন্তব্য চিত্রে – চিত্রাবৎ একটা গ্রাম। যার বাতাসে বাতাসে ভেসে বেড়ায় শান্তির বাণী – বুদ্ধং শরণম গচ্ছামি। চোখের পলকে পলকে রঙ পালটায় রডোড্রেনডন গুচ্ছ। আর পাহাড়ি ঢালে নাম না জানা ফুলেরা স্বাগত জানাতে দাঁড়িয়ে থাকে ছবির মত,  নীল-কমলা-লাল সাদা’র ডালি নিয়ে। সেই পথেই যাবো আমরা। পিঠে বস্তা চাপিয়ে নিলাম,  মাথায় টুপি আর হাতে বর্ষাতি। বাধ সাধলো আবার নিম্নচাপ – এ অবশ্য অন্য আয়োজন।  প্রাক বর্ষার মেঘ নিয়ে লুকোচুরি।  ভর দুপুরে গোধূলি’র অন্ধকার। 

এই অবধি ঠিকঠাকই ছিল। লোকাল গাইড হৈ হৈ করে দলবল নিয়ে সড়কপথে যাত্রা শুরু করবে করবে করছে, তখনই ক্যাপ্টেনের মেজদাসুলভ নির্দেশ- সিঁড়ি পথে চলো। যেমন বলা, তেমন কাজ – “জি স্যার”। মানেভঞ্জনে সরাইখানার পিছন দিয়ে কংক্রিট এর খাড়াই মই বেয়ে যাত্রা হল শুরু। দু’মিনিটের মধ্যেই বৃষ্টি এল তেড়ে। যাত্রা শুরু করেছিলাম প্রায় সর্বাগ্রে, মিনিট পনেরো’র মধ্যেই দলের বাকিরা লম্বা পায়ে চোখের ওপারে। বাকি রইলেন ভাইস ক্যাপ্টেন। কাঁধের ব্যাথাটা হঠাৎ যেন চাগিয়ে উঠলো। যাত্রারম্ভেই কাঁধ থেকে পায়ের  মহাবিদ্রোহ।  জানা ছিল,  সড়কপথেই ধীরে ধীরে উচ্চতাভেদ করবো, অনেকে তো শুনেছি  স্যান্ডাক চপ্পল পায়ে দিয়ে ফুঁ দিয়েই সান্দাকফু পৌঁছে গেছে। ছোটোখাটো ট্রেক আগে করিনি এমন নয়, তাই কোন ট্রেক’কেই জলভাত মনে করা ধাতে নেই। 

কিন্তু এবার কী হল?  চোখের সামনেপিছনে সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে,  গাছ বেয়ে নেমে আসা বৃষ্টির জল যেন ঠান্ডা স্রোতের মত শিড়দাঁড়া বেয়ে নেমে আসছে। সিঁড়িপথ কিছুটা অতিক্রম করেই কালো পিচের রাস্তায় পড়লাম, পাশ দিয়ে একটা জোঙ্গা ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে ইঞ্জিনের সরব গোঙানি নিয়ে বেড়িয়ে গেল উর্দ্ধমুখে। তারপরই সব চুপচাপ, চারদিক নিঃশব্দ – শুধু টানা বৃষ্টির শব্দ, কুয়াশা না মেঘ, না কি হোয়াইট আউট?  চোখে অন্ধকার, মাথাটা ঘুরে যাবার আগে বসে পড়লাম – ক্ষনিকের জন্যে সব ভুলে। কানে ঢুকলো – এই  হিন্দোল, এদিকে এসো। চোখেমুখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিয়ে, বাকি পথ হিন্দোলের হিল্লোলে। আর সফরসঙ্গী দেবতার জ্যোতিতে চিত্রায়িত।   

রাত শেষ হবার আগে ভাবিনি টুঙলু পৌঁছাতে পারব। শরীরটা কি সত্যিই দিচ্ছে না?  তবু ডাক্তার বিতান এর আশ্বাস,  ক্যাপ্টেন শান্তনু’র বাড়তি তদারকি, শিবুদার সদাচঞ্চল উচ্ছ্বাস,  উৎসুক  ছেলেদের রাত থাকতেই উঠে পড়া আর এডভান্স টিমে ছোট্ট দোয়েলি’র ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ উড়তে উড়তে এগিয়ে যাওয়া,  কানে কানে বলল – দেবাশিস চল, এই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে ঠিক পৌঁছে যাবি।  

প্রথমে আমরা কুড়িজন মানেভঞ্জন থেকে ট্রেক করে চিত্রে পৌঁছলাম। সেখানে চারটে ঘরে পাঁচজন পাঁচজন করে চলে গেল। তারপর ব্যাগ রেখে সবাই বাইরে চলে এল গল্প করতে।

সেখান থেকে আমাদের ক্যাপ্টেন আমাদের নিয়ে গেল এক বিশাল মনাস্ট্রিতে। সেখানে ১৫-১৬ দিন ধরে এক পুজো হচ্ছিল। তাতে অনেকে ডানদিকে আর অনেকে বাঁদিকে সারি দিয়ে বসেছিল। সবাই হাত জোড় করে মন্ত্র বলছিল। বুদ্ধর মূর্তিটির সামনে দুদিকে বেশ কয়েকজন বিভিন্নরকম বাজনা বাজাচ্ছিল। সেগুলো শুনে একটু ভয় লাগছিল তবে পুরো ব্যাপারটা বেশ ভালো লেগেছিল। তারপর তিনজন ছেলে এসে আমাদের গেলাশ আর চা দিয়ে গেল। আরো কিছুক্ষণ সেখানে থেকে তারপর ফিরলাম।

 

ট্রেকের খুদে সদস্যদের ডায়েরি থেকে

।১।

অগ্নীশ রায়চৌধুরি

প্রথমে আমরা কুড়িজন মানেভঞ্জন থেকে ট্রেক করে চিত্রে পৌঁছলাম। সেখানে চারটে ঘরে পাঁচজন পাঁচজন করে চলে গেল। তারপর বযাগ রেখে সবাই বাইরে চলে এল গল্প করতে।

সেখান থেকে আমাদের ক্যাপ্টেন আমাদের নিয়ে গেল এক বিশাল মনাস্ট্রিতে। সেখানে ১৫-১৬ দিন ধরে এক পুজো হচ্ছিল। তাতে অনেকে ডানদিকে আর অনেকে বাঁদিকে সারি দিয়ে বসেছিল। সবাই হাত জোড় করে মন্ত্র বলছিল। বুদ্ধর মূর্তিটির সামনে দুদিকে বেশ কয়েকজন বিভিন্নরকম বাজনা বাজাচ্ছিল। সেগুলো শুনে একটু ভয় লাগছিল তবে পুরো ব্যাপারটা বেশ ভালো লেগেছিল। তারপর তিনজন ছেলে এসে আমাদের গেলাশ আর চা দিয়ে গেল। আরো কিছুক্ষণ সেখানে থেকে তারপর ফিরলাম।

।২।

দোয়েলি মন্ডল

আমরা ট্রেক করে চিত্রে গেলাম, তারপর সেখান থেকে চিত্রে গুম্ফায় গেলাম। সেখানকার দৃশ্য আমার আগেও দেখা, যেহেতু আমি আগে অনেক গুম্ফায় গেছি। তবুও আমার খুব ভালো লেগেছে। মনি দেওয়ালটার ওপর অনেক পাথরের ওপরে পাথর রাখা ছিল সেগুলো আমার খুব ভালো লেগেছে। অনেক রকম সুন্দর ফুল ছিল আমি তাদের ছবি তুলেছিলাম। বাকি জায়গার ছবিও তুলেছিলাম। তারপর সেখানে ঘরের ডিজাইনগুলো ভালো লেগেছে।গুম্ফার মধ্যে অনেকে বসে বই পড়ছিল। আরো অনেক কাজ করছিল। মন্ত্র আর বাজনা শুনতে আমার দারুণ লাগছিল। তারপর ফিরে এলাম। আমার গুম্ফাটা এত ভাল লেগেছিল যে পরদিন আবার গেলাম। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল গুম্ফায় ঢুকতেই আমরা নেপাল দেশে প্রবেশ করলাম।

।৩। (নাম নেই… সম্ভবত অর্যমন ভট্টাচার্য)

১৭ মে রাত নটা পঁয়তাল্লিশ।

অনন্তের মধ্যে দিয়ে ট্রেনটা ছুটছে। চারদিকে মৃতের অন্ধকার। কাল ভোরে উত্তরবাংলা পৌঁছবো। আমি একেবারে ওপরের বাংকে। আমার পাশে কিরন। নীচে সোমশুভ্র আর ওর বন্ধু। সর্বক্ষণ হিন্দিতে বকবক করে। সোম এখন গান শুনছে। আমার পাশে কিরণ শুয়ে শুয়ে কী যেন ভাবছে! ভদ্রসভ্য দেখতে একটা টিকিট চেকার করিডোরে যাচ্ছ। গায়ে একটা সাদা শার্ট, ট্রাউসার আর একটা ব্লেজার। (অনুদিত)

১৯ মে

কাল আমরা গেলাম চিত্রে বুদ্ধ মঠ। সেখানে গিয়ে দেখলাম বুদ্ধের নানারকম ছবি। জুতো খুলে দাঁড়িয়ে আছি। একজন সন্ন্যাসী আমাকে ডাকলেন। আমরা গিয়ে বসলাম। প্রার্থনা হতে হতে বিরাট ড্রাম ও ট্রাম্পেট বাজছিল। একজন আমাদের সবাইকে চা দিল। আমার ওখানে গিয়ে খুব ভালো লেগেছে।

।৪।

স্টিভ রায় (অনুদিত)

ট্রেকিং দলে আমি একদিন বাদে এসে যোগ দিই, ফলে গতকাল সন্ধ্যায় চিত্রে বৌদ্ধ গুম্ফাতে আমার যাওয়া হয়নি। আজ  সকালে চিত্রে ছেড়ে আসার সময় বন্ধুদের সাথে একঝলক বাইরের পরিবেশটা দেখে এলাম। কুয়াশা আর ঠান্ডা ছিল খুব। কুয়াশার মধ্যে গুম্ফাতা অসাধারন দেখতে লাগছিল। ভেতরে একবার উঁকি মেরেও দেখতে পারলাম। দেখি অনেক ঘন্টা ঝুলছে, ধূপ জ্বালানো হয়েছে আর একটা বেদি সেখানে নানান জিনিস উৎসর্গ করা হয়েছে। সবমিলিয়ে আজকের হাঁটা শুরুর আগে এক চমৎকার অভিজ্ঞতা।

।৫।

সোমশুভ্র মিত্র (অনুদিত)

১৮ মে ২০১৮ । আজ  জয়ঢাকের ট্রেকিং দলের সাথে নেপালের একটা বৌদ্ধ গুম্ফায় গেলাম। খুব শান্ত আর রাজকীয় পরিবেশ। আমরা যখন গেলাম, পূজা হচ্ছিল। বুদ্ধের অনুসরণকারিরা নানারকম বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছিলেন, প্রার্থনা করছিলেন। ভদ্রতা করে তারা আমাদের চা-ও খাওয়াল। এটা একটা খুব সুন্দর গুম্ফা।

।৬।

ভরত কে মেনন (অনুদিত)

গতকাল আমাদের ট্রেকিং দলের সাথে একটা বৌদ্ধ মন্দিরে গেছিলাম। আমাদের থাকার জায়গার কাছেই। মজার ব্যাপার হল, ভারত-নেপাল সীমানার ঠিক ওপারেই মন্দিরটা।বেশ শক্তপোক্ত বাড়ি,অনেক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী তাদের চিরাচরিত পোশাক পরে ঘোরাঘুরি করছেন। ভেতরে অনেকে প্রার্থনার বই আর ধূপ নিয়ে বসে। প্রার্থনায় মন্ত্রের পাশাপাশি সঙ্গীতও ছিল। দুটি লম্বা শিঙা। একতা আরেকতার চেয়ে সামান্য বড়ো। দুটো বড়ো ড্রাম, একই আকারের। আমাদের যত্ন করে চা দিল। ওদের প্রার্থনার প্রক্রিয়াটা একটু আলাদা হলেও আমাদের সাথে আবার মিলও অনেক। আমার এক্কেবারে নতুন অভিজ্ঞতা, একদল আলাদা রকম লোক, আলাদা প্রার্থনার ভঙ্গীতে আসলে সেই আমাদের মতোই একই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছেন। এত আনন্দের এই অভিজ্ঞতা বহুদিন মনে থাকবে।

।৭।

ঋত্বিক প্রিয়দর্শী (অনুদিত)

১৮ মে ২০১৮। চিত্রের কাছে একটা বৌদ্ধ গুম্ফায় গেলাম বেড়াতে। আমাদের খুব শান্তভাবে ঢুকতে বলা হল, ওকগানে তখন একমাস ধরে কী একটা পূজা চলছিল। ঢুকে দেখি, তিন চার সারি লোক বসে নানান রকম বই, পুঁথি পড়ছেন, বুদ্ধের নামে প্রার্থনা করছেন। যন্ত্রগুলো বাজছিল, কিন্তু তালে তালে নয়,আর আওয়াজটা একটু কেমন গুমগুমে,চারপাশে আশ্চর্য অথচ খুব পরিচিত ও নিশ্চিন্তরকম আবহাওয়া তৈরী করেছিল। লোকগুলো খুব ভালো। আমাদের চা খাওয়াল। একটা অন্য রকম, নতুনরকম অভিজ্ঞতা।

।৮।

ঘরের বাইরে, জয়ঢাকি সফরে

শতদ্রু রায়

পাহাড় আমার বরাবরই প্রিয়। আর সেই টানেই “জয়ঢাক” এর বন্ধুদের সংগে বেড়িয়ে পড়া ট্রেকিং এ। এবারের গন্তব্য টংলু। সিংগালিলা পর্বতশ্রেণীর অন্যতম শৃঙ্গ,  যার উচ্চতা ১০,০৭০ ফুট। এর আগে পর্বতারোহণের সামান্য অভিজ্ঞতা হলেও, ট্রেকিং এই প্রথম। স্বাভাবিক ভাবেই নতুন অভিজ্ঞতার জন্য প্রস্তুত। বাবা আগেই বলেছিলেন, নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস না থাকলে অসুবিধে হবে। তাই ঘুম কাতুরে হলেও, দু-তিন দিন সকালে উঠে হাঁটা অভ্যেস করার পর একটা যুদ্ধ জয়ের অনুভূতি এল। ১৭ মে বৃহস্পতিবার যাত্রা শুরু হল। পরের দিন মানেভঞ্জন পর্যন্ত গাড়িতে রওয়ানা হবার পর মধ্যাহ্ন ভোজন সেরে ট্রেকিং এর সূত্রপাত।  শুরুতেই ট্রেকিং এর পুরোধা শান্তনু কাকুর নির্দেশ,  সড়কপথে নয় সিঁড়িপথে গেলে দ্রুত পৌঁছানো যাবে।  প্রথম দিনের গন্তব্য চার কিমি দূরে “চিত্রে” নামে একটি ছোটো গ্রাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে কিছু সময় পর হাঁপিয়ে পড়লাম।  একেই অনভিজ্ঞতা,  তারপর বৃষ্টি।  গন্তব্যে পৌঁছানো একসময় অসম্ভব মনে হচ্ছিল। তাও সকলের উপদেশ “স্লো, বাট স্টেডি” মনে রেখে এগোতে চাইলাম। একসময় চিত্রে’তে পৌঁছে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নিকটবর্তী একটি বৌদ্ধ মঠে যাওয়া হল। এর পূর্বে বৌদ্ধমঠ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হলেও এই মঠে সান্ধ্যকালীন আরাধনা দেখার বিরল অভিজ্ঞতা হল। কিছুক্ষণ সেই মঠে বসে সেখানকার নিভৃত পরিবেশের আবেশ গ্রহণ করে আবার ফেরা হল চিত্রে’র অস্থায়ী আস্তানায়। সন্ধ্যের আড্ডাতে যোগ দিয়েও মনে একটা আশঙ্কা ছিল। প্রথম দিনেই যা অভিজ্ঞতা হয়েছে, রাত পোহালেই আবার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে পারবো তো!!  যদিও বাবা উৎসাহ দিলেন,  প্রথম দিন অসুবিধে হলেও দ্বিতীয় দিন হবে না। বাস্তবিকই তাই হল। 

টংলু’র পথ অপেক্ষাকৃত চড়াই হলেও, ধীর লয়ে এগোতে এগোতে একসময় গন্তব্যে পৌঁছোলাম। টংলু পৌঁছালেও বিশ্রামের সুযোগ নেই। দলনেতার নির্দেশ ঘরে বসে থাকা চলবে  না।  অগত্যা বাইরেই ঘোরাফেরা করে তারপর দুপুরে খাবারের আয়োজন। ভোজন সাড়া হলে বলা হল, বৌদ্ধমঠ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু লিখতে। সেই লেখা শুরু করলেও, গল্পে মশগুল হয়ে থাকায় তা আর শেষ করার অবকাশ মিললো না। সন্ধ্যেবেলা আবার বসলো গল্পের আসর। বিষয় – ভূত। প্রথমে জনৈক দুই বন্ধু বললে, তাদের নাকি গতকাল রাত্রে ভৌতিক অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেই থেকে ভূতের গল্পের সূত্রপাত। প্রথম দিকের গল্পগুলো শুনতে বেশ ভালো লাগলেও, সেগুলি সেই অর্থে শিহরণ জাগানো ছিল না। কিন্তু শিবু জেঠুর বেনারস এর গল্প শোনার পর সত্যিই গায়ের রোম খাড়া হয়ে গিয়েছিল। গল্পটা শুনে বাকিদের কি হয়েছিল জানি না, আমার রাতে বেশ কিছুক্ষণ ঘুম আসে নি। কিন্তু উপায় নেই পরদিন ভোরে উঠতে হবে। তাই ভয় চেপে রেখেই ঘুমিয়ে পড়লাম। 

সকালে ঘুম ভাঙল হৈ চৈ শুনে। কাঞ্চনজঙ্ঘা উঁকি দিচ্ছে ভোরের আলোয় মেঘের ভেলা সরিয়ে। শীতে কাঁপতে কাঁপতে সে দৃশ্য চোখ ভরে উপভোগ করে  চললাম বার্ড ওয়াচিং এ । সেইমতো আধঘণ্টা কাটিয়ে ফেরা হল। তারপর বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে নামার জন্য প্রস্তুত।

নামার পথ গেছে সিংগালিলা অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে ধোত্রে নামক গ্রাম পর্যন্ত।  সেখান থেকে সড়কপথে যাত্রার জন্য গাড়ি থাকবে। পাহাড়ে ওঠাটা নামা অপেক্ষা কঠিন হলেও, নামাটাও খুব সহজ নয়। খুব সতর্ক পদক্ষেপে না নামলে ভারসাম্য হারানোর সম্ভাবনা।  একইভাবে চলতে চলতে কখন যে গন্তব্যে পৌঁছালাম টের পেলাম না। 

এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে একটা অন্যরকম অনুভূতি হল। প্রথম দিনের পর মনেই হয় নি, এতটা পথ যেতে পারবো। তাও বাড়ির পথে ফিরতে ফিরতে মনে পড়তে লাগলো ঐ তিন দিনের অভিজ্ঞতা। চারপাশের যান্ত্রিক কর্মব্যস্ত জীবন ছেড়ে প্রকৃতির কোলে একটু প্রাণ ভরে শ্বাস নেওয়া। হয়ত ট্রেকিং এর অনেক অভিজ্ঞতাই পরবর্তী কালে হবে, কিন্তু “প্রথম” অভিজ্ঞতা হৃদয়ে বরাবরই একটা বিশেষ জায়গা অধিকার করে থাকবে। 

Advertisements

One Response to পুজো স্পেশাল পাহাড় পাহাড় সম্পাদনাঃ শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় শরৎ ২০১৮

  1. Sudeep says:

    হিংসে ই হল

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s