পুজো স্পেশাল-গল্পগাছা বাজির জন্মকথা অরিন্দম দেবনাথ শরৎ ২০১৯


অরিন্দম দেবনাথ

পুজো বা কোনও উৎসবের প্রসঙ্গ উঠলেই মনে হয় আলোকসজ্জার পাশাপাশি নিকষকালো আকাশে ঝলসে ওঠা আগুনের স্ফুলিঙ্গের কথা। একটা ছোটো আগুনের ঝিলিক ছিটকে আকাশে উঠে হাজারো রঙের আলোর রেণু হয়ে মাটির পানে নেমে আসতে গিয়ে শূন্যেই মিলিয়ে গিয়ে মনের মাঝে একটা অদ্ভুত রেশ রেখে যায়।
এখন অবশ্য আগুনের স্ফুলিঙ্গের রোশনাই কোনও পুজো বা উৎসবের অপেক্ষা রাখে না। বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে খেলার মাঠে সব জায়গায় এর চল শুরু হয়েছে।
আতশবাজির জন্ম কবে হয়েছিল সঠিক বলা মুশকিল। অনুমান করা হয়, খ্রিস্টের জন্মের ২০০ বছর আগে চিনদেশে আতশ তথা শব্দবাজির জন্ম হয়েছিল। সেসময় চিনদেশের হান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত লায়ুং (Liuyang) অঞ্চলের দউইসেম সম্প্রদায়ের একজন গাঁটসুদ্ধু বাঁশের টুকরো জ্বলন্ত আগুনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। প্রচণ্ড তাপে এই গাঁটসুদ্ধু বাঁশ প্রচণ্ড শব্দ করে ফেটে উঠেছিল। আর ধর্মভীরু মানুষরা মনে করতে শুরু করছিল আগুনে গাঁটসুদ্ধু বাঁশ ছুড়ে দিলে যে শব্দ হবে তাতে করে ভূতপ্রেত ও অশুভ শক্তি দূরে চলে যাবে।
এই বাঁশের টুকরোকে আতশবাজির রূপ পেতে লেগেছিল অনেক বছর। ইতিহাস বলে, খ্রিস্টাব্দ অষ্টম শতাব্দীতে চিনদেশের এক অপরাসায়নবিদ অমরত্বের সন্ধানে একটি পাত্রে গন্ধক, কাঠকয়লা ও পটাশিয়াম নাইট্রেটের মিশ্রণ তৈরি করছিলেন। এই মিশ্রণে অগ্নিসংযোগ করলে তা থেকে উৎকীর্ণ ধোঁয়া-আগুন প্রার্থনাকারীকে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে দেবে—এই ছিল বিশ্বাস। এই মিশ্রণ সে-সময় জাদুকর ও গুণিনরা ব্যবহার করে লোককে ধোঁকা দিত। সেই মিশ্রণ রাখা একটি বন্ধ পাত্রে আচমকা আগুন ধরে গেছিল। আর শব্দ করে দুরন্ত গতিতে পাত্রের ঢাকনাকে ছিটকে নিয়ে ফেলেছিল বহু দূরে। জন্ম হয়েছিল বারুদের। এরপর ধীরে ধীরে খানিক পরীক্ষানিরীক্ষার পর এই মিশ্রণ তথা বারুদ বাঁশ ও কাগজের চোঙে ভরে অগ্নিসংযোগ করতেই আগুনের রকমারি স্ফুলিঙ্গের বিস্ফোরণ সৃষ্টি করেছিল আতশবাজির। কাগজের সাথে বারুদ মিশিয়ে সলতে পাকিয়ে জুড়ে দেওয়া হল বারুদভরা পাত্রে। তারপর সেই সলতেতে অগ্নিসংযোগ করে ছুড়ে দেওয়া হত দূরে। আমরা এখন ঠিক যা করে থাকি।
সময়-যানে চেপে যদি আমরা অষ্টম শতাব্দীতে উপস্থিত হতে পারতাম, দেখতাম সেই যুগের আতশবাজির রোশনাইয়ের সাথে এই সময়কার আতশবাজির সেরকম কোনও পার্থক্য নেই। শুধু সেই সময়কার আতশবাজিতে আজকের মতো রঙের বাহার ছিল না। সেসময়ের আতশবাজির রঙ ছিল শুধুই কমলা। পুজোপাঠ, জন্ম, বিবাহ অনুষ্ঠানে বাজি ব্যবহৃত হত মূলত এই বিশ্বাসে যে, শব্দ ও অগ্নিবর্ষণ মন্দ শক্তিকে কাছে ঘেঁষতে দেবে না।
বারুদ আবিষ্কারের কয়েকশো বছর পর বারোশো শতাব্দীতে চিনের সামরিক বাহিনী বিশাল ধাতুর নলের ভেতর বারুদ ভরে শত্রুপক্ষের শিবির লক্ষ্য করে অগ্নিসংযোগ করে আগুনের গোলা ছুড়তে সক্ষম হল। জন্ম হল কামান তথা রকেটের। আগুনের গোলা যখন আকাশপথে ছুটে যেত তা হয়ে উঠত দেখবার মতো আতসবাজি।

আরবদেশ ও ইউরোপের কূটনীতিক এবং ধর্মপ্রচারকদের চিনদেশে আনাগোনা শুরু হবার পর এদের হাত ধরে মঙ্গোলিয়া ঘুরে বারুদ পৌঁছল পশ্চিম গোলার্ধে। ১২৬৭ সালে এক ইংরেজ সন্ন্যাসী রজার বেকন চিনদেশে দেখা আতশবাজির কথা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘আগুনের ঝলকের সাথে জোরালো আওয়াজ করতে সক্ষম ছিল এই বস্তুগুলো।’ পশ্চিমী প্রকৌশলীরা এই বারুদকে ভিত্তি করে কামান ও গাদা বন্দুক বানিয়ে ফেলল। সাথে এই বারুদ দিয়ে রকমারি আতশবাজি তৈরি হতে লাগল। সেগুলো ছিল চিনদেশের বাজির থেকে অনেক উন্নত।
১৩৭৭ সালে ইতালির ভিসেনযার এক বিশপের প্রাসাদে আতশবাজি তার খেল দেখিয়েছিল। আকাশ থেকে নেমে আসা আগুনের স্ফুলিঙ্গকে ধর্মভীরু মানুষের দল পবিত্র আত্মার আগমন মনে করেছিল। মনে করেছিল স্বর্গ থেকে দেবদূতেরা আগুনের দড়ি বেয়ে নেমে আসছে।
১৫ শতাব্দীতে ইউরোপে বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনী রকেটের ব্যবহার শুরু করল মূলত আমোদের জন্য। ইটালিয়ান ও স্প্যানিশ শহরে আতশবাজির খেলা জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে এই সময় থেকেই। সেসময় ইটালিয়ান ধাতুবিশারদ ভ্যানোক্কিও ব্রিঙ্গিক্কিও ফ্লোরেন্স শহরে ঘূর্ণায়মান চাকার সাথে আতশবাজি বেঁধে জ্বালাতে দেখেছিলেন বলে লিখেছিলেন।
১৫৩৩ সালে আন্নে বলেয়ন-এর রাজ্যাভিষেক উপলক্ষে ইংল্যান্ডে টেমস নদীর বুকে ফায়ার ক্লাবের সদস্যরা বজরায় আতশবাজির প্রদর্শনী শুরু করলেন। টেমস নদীর জলে রাতের আঁধারে আলোর ঝরনা ঝরে পড়া শুরু হল। ১৫৭০ সালে ইংল্যান্ডের প্রথম রানি এলিজাবেথও টেমস নদীর বুকে এই আলোর উৎসব প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
এই শতাব্দীর শেষদিক থেকে ধনীরা তাঁদের প্রাসাদেও বিশেষ বিশেষ দিনে আলোর উৎসব করা শুরু করেছিলেন। রাতের অন্ধকারে প্রথমে পুরো প্রাসাদ চর্বির প্রদীপের আলোকে সজ্জিত হয়ে উঠত। সেই আলোকসজ্জাও ছিল দেখার মতো। তারা থেকে আরম্ভ করে অনেক আকারে জ্বলত এই চর্বির প্রদীপগুলো। তারপর একসময় গর্জে উঠত কামান। বারুদের কলাকুশলীরা সক্রিয় হয়ে উঠে শুরু করত তাদের খেলা। আকাশে আগুনের গোলা ঝলসে উঠে উল্কার মতো নেমে আসত মাটির দিকে। আলোর উৎসব ‘গ্যারিন্ডোলা’ শেষ হত আকাশে রকেটের ঝলকানি ও শব্দের গর্জনে। ধোঁয়ায় ঢেকে যেত চতুর্দিক।
এরপর জার্মান শহরেও আতশবাজির রমরমা শুরু হয়। নুরেম্বার্গের এক কার্নিভ্যাল সম্পর্কিত প্রাচীন রঙিন বইতে রঙচঙে পোশাক পরিহিত পুরুষদের হাতে এবং দুর্গের আকারের মাথার টুপিতে আতশবাজি জ্বালিয়ে উৎসবের দিন পথপ্রদর্শনের ছবি পাওয়া গেছে। যা থেকে মনে হয় আতশবাজি সেসময় ফ্যাশনেরও অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ষোলোশো শতাব্দীতে পশ্চিমে আতশবাজির ব্যবহার আর শুধু ধর্মীয়, বিবাহ, জন্ম বা কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রইল না। আতশবাজি রাজকীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সামরিক বাহিনীর জয় ইত্যাদি উপলক্ষে মনোরঞ্জনের অন্যতম উপকরণ হিসেবে পরিচিতি পেল। সেই সময়ও বাজির রঙ ছিল শুধুই কমলা।
সেসময় এই আতশবাজি জ্বালানোর জন্য আলাদা লোক থাকত। তাদেরকে বলা হত ‘ফায়ার-মাস্টার’ ও ‘গ্রিন-ম্যান’। এই গ্রিন-ম্যানরা ফায়ার-মাস্টারদের সহকারী ছিল। আতশবাজি প্রদর্শনী শুরু হবার আগে এই গ্রিন-ম্যানরা উপস্থিত জনতাকে নানারকম তামাশা দেখিয়ে মজিয়ে রাখত। আগুনের স্ফুলিঙ্গ থেকে বাঁচার জন্য সারা শরীর কাঁচা পাতায় মুড়ে রাখত এরা। তাই এদের বলা হত গ্রিন-ম্যান। এই গ্রিন-ম্যানদের আতশবাজির সবচাইতে কাছে বিপদ মাথায় নিয়ে দাঁড়তে হত। সেসময় বহু গ্রিন-ম্যান সাংঘাতিকভাবে আহত বা নিহত হত সঠিকভাবে না জ্বলা আতশবাজি সামাল দিতে গিয়ে।
ষোলোশো শতকে ইউরোপ থেকে ব্রিটিশদের হাত ধরে অ্যাটলান্টিক পার হয়ে আমেরিকা সহ তেরোটি ব্রিটিশ কলোনিতে আতশবাজি পৌঁছয়। সেসময় আতশবাজি তৈরিতে সিদ্ধহস্ত ফায়ার-মাস্টারদের কয়েকজন আবার ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। আমেরিকার স্বাধীনতা উদযাপনের দিন আতশবাজি প্রদর্শনী ব্রিটিশদের অবদান। ১৭৭৬ সালের ২ জুলাই জন অ্যাডামস আমেরিকার স্বাধীনতা প্রাপ্তির দু’দিন আগে তাঁর স্ত্রীকে লিখেছিলেন, ‘দিনটি হবে আমেরিকার ইতিহাসের সবচাইতে স্মরণীয় দিন… এই দিনটি উদযাপিত হবে ধুমধাম করে। প্যারেড হবে, ঘরে ঘরে আলোকসজ্জা হবে, আর থাকবে আতশবাজি…” জন অ্যাডামস এর কিছু বছর পর আমেরিকার উপরাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন।
এরপর ১৮৩০ সালে এক ইটালিয়ান আবিষ্কর্তা বারুদে বেরিয়াম জুড়ে আতশবাজিতে রঙের সঞ্চার ঘটালেন। জন্ম হল আজকের দিনের রঙদার আতশবাজির।
আতশবাজি ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বে।
জাপানে প্রতিবছর বসন্তকালে চেরি-ব্লুসম ফোটার কালে দেশের বিভিন্ন অংশে আতশবাজি জ্বালানোর উৎসব হয়। তার নাম ‘হানাবি তাইকাই’ – আগুনের ফুল। ২০০ আতশবাজি জ্বালানো হয় এই উৎসব উপলক্ষে। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে হয়ে আসছে এই উৎসব। সম্প্রতি পঁচিশ বর্ষীয় জাপানি চিত্রগ্রাহক কেইসুকের তোলা কিছু অসাধারণ আতশবাজির ছবি বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের এই উৎসব দেখতে জাপানমুখো করেছে। শুধু তাই নয়, জাপানে প্রতি গ্রীষ্মে জুলাই–আগস্ট মাসে প্রতি সপ্তাহান্তে এই বাজি পোড়ানোর উৎসব চলে। জাপানে রকমারি আতশবাজির চর্চা চলে আসছে কয়েকশো বছর ধরে। রইল সেসব প্রাচীন বাজির কিছু ছবি।
আমাদের দেশে মূলত দীপাবলি হল আলোর উৎসব। এসময় রাতের আকাশ ভরে ওঠে আলোর ফুলঝুরিতে। আর এই সমস্ত আতশবাজির একটা বড়ো সরবরাহকারী দেশ হল বাজির সৃষ্টিকর্তা দেশ চিন।