পুজো স্পেশাল রেল ঝমঝম-কুউউ ঝিকঝিক শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য শরৎ ২০১৯

রেলগাড়ি- কুউউ ঝিকঝিক

বাঁকুড়া থেকে আউসারা, যাবো ছুটির দিনে রেলগাড়ি চড়তে। রাত কেটেছে ডাক বাংলোয়, কেটেছে কোথায়! এখনও আছে শেষ রাত্তির। রিকশা চলেছে এঁকে বেঁকে শিউলিফুলের বাস জড়ানো হিমেল বাতাস গায়ে মেখে। রাস্তায় রাতজাগা টিমটিমে চা মিষ্টির দোকান দুটো একটা। মাঝে মাঝে হঠাৎ অন্ধকারের মাঝ থেকে ঝাঁপিয়ে আসা আলোয় আলো পুজোমন্ডপ। দুর্গা অসুর সিংহ কারো মুখ দেখবার উপায় নেই, সবাই কাপড়ে ঢাকা। কাল গেছে পঞ্চমী আজ ষষ্ঠি, পুজো এখনও শুরুই হয়নি! এখনও আনন্দের ঝুলিতে বাকী দিনকটা সম্বল। চলতে চলতে গাপ্পু ধরলো গান আপ্পু ধরলো তান। ওর কচি গলাটা শুনতে বাঁশির মতোই তো।
তুফান মেল –

যায় তুফান মেল।
কুউউ ঝুকু ঝুকু ঝুকু ঝুকু
তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে
ময়নামতির হাট এড়িয়ে
কাশের বনে ঢেউ খেলিয়ে
তুফান মেল যায় যায় যায় তুফান মেল।

কচি গলার মজার গান শুনে রিকশাও চলেছে তুফান মেলের ঢং এ। খুশি হয়ে ওদের সাথে গলা মেলাল পথের ক’টা কুকুর। অন্তু ডাকল, “যাবি আমাদের সঙ্গে রেলগাড়ি চড়তে?” সাহেবমামা এসেছে অস্ট্রিয়া থেকে, তার ক্যামেরা চমকে চমকে উঠছে থেকে থেকেই।
পুরোনো স্টেশনটা খুঁজে বার করে টিকিটের জানলায় দাঁড়াল কজন। বাকিরা গেল জায়গা রাখতে। গাড়ির কাছে গিয়ে বাঁশবনে ডোমকানা! বসব কোথায়, সবটাই তো খালি! ক্ষুদে লাইনে সারাদিনে এই একটিই ক্ষুদে গাড়ি, তাও খালিই পড়ে থাকে! সবাই তো কাজের মানুষ, এ গাড়িতে চড়বার সময় আছে কার? টিকিটদাদা বললেন দশদিন বাদে একসাথে একসাথে এতগুলো টিকিট বিক্রি হল।
ছোটো হলে কী হয়, ক্ষুদে ইঞ্জিনটা ফোঁসফোঁস করছে ‘আগুনে কয়লা’ খেয়ে। উগরে দিচ্ছে নীলচে কালো রঙের ধোঁয়া। চিমনির ধোঁয়া কালো, নীচে পিস্টনের ধোঁয়া সাদা। বুড়ো ড্রাইভার পিস্টন চাপতেই ফিসস করে শব্দ হচ্ছে আর ধোঁয়ায় ধোঁয়া চাদ্দিক। ছোটোরা লাইনের পাশে উবু হয়ে বসে যন্ত্রপাতি দেখছে অবাক হয়ে। বড়োদের কারো কারো স্মৃতির পুরোনো রেলগাড়িরা বহুদূর থেকে ছেলেবেলায় শোনা সুরেলা বাঁশি শোনায়। স্মরণের ডুবন্ত সুখে গায়ে কাঁটা দেয়, চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।
আদ্যিকালের বামনমার্কা ইঞ্জিনের সাথে সাকুল্যে ছটি কামরা আর পুঁচকে গার্ডের গাড়ি ব্যস। কামরার ছাদ হাত দিয়ে ছোঁয়া যায় ইচ্ছে করলে। ততক্ষণে সকাল হয়ে এসেছে। ফিটফাট গার্ডবাবু সবজে লাল নিশান নিয়ে হাতে নিয়ে প্ল্যাটফর্মে এসে দেখে শুনে অবাক!
“দল বেঁধে কোথায় চললেন আপনারা! কী কাজ? এ গাড়িতে তো এরকম দল যায় না!”
হেঁকে উঠল পুরো দল, “কোনো কাজ নেই। আমরা চলেছি ছুটির দিনের রেলগাড়িতে মজা করতে।”
গার্ড সাহেব হেসে বললেন, “মজাই বটে! এ হল বি ডি আর! মন্দ লোকে বলে বড়ো দুঃখের রেল।”
ছাড়ার সময় হল। টিং টিং ঘণ্টা পড়লও, সবজে নিশান উড়ল। নীলজামা ড্রাইভার পান টান খেয়ে বাঁশির শেকল টানতেই – কুউউউ! বাব্বা! এইটুকু শরীরে কী জোর আওয়াজ! যেন খ্যাপা হাতির ছানা।
চলতে শুরু করল, রেলের গাড়ি ঘস ঘস ঘসস। চলনের ঢংটা হল চলার কথা চলছি, কোথাও তাড়াতাড়ি পৌঁছে দেবার তাগিদ নেই। আরে তাড়াতাড়ি যেতে চায়টা কে? চল না আপন খেয়ালে। চলন যেন খেলনা গাড়ির। আর দোলন! আমরা অবশ্য ইচ্ছে করেই একটু বেশি দুলছিলাম।
বাঁকড়ো শহর ভুলতে বসেছে ক্ষুদে রেললাইনটাকে, তাই বাঁচোয়া! ঝোপঝাড় পোস্কার করেনি কেউ। এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিস্তর গাছপালা লতাপাতা যেমন ইচ্ছে বেড়েছে। নানারকম ফুলটুল ফুটিয়ে পথটার বাহার খুলেছে বেশ। ঘসর ঘসর করে পার হয়ে গেল দারুকেশ্বর নদীর ব্রিজ। নদী না নদ কে জানে! নামটাতো শুনতে ছেলে ছেলে। গাল্লু আপ্পু আর পাভেল তক্কো করল খানিক, মীমাংসা হল না। নদীর আবার ছেলেমেয়ে! কংসাবতী হল নদী, কাঁসাই তবে কী? এদিকে জল যে খুব আছে বলা যাবে না। একটা গরুর গাড়ি পেরোতে দেখেই বোঝা গেল। শীত ফুরোলেই নাকি সাদা বালির পেট চিতিয়ে পড়ে থাকে নদী। গরমের দিনে বালি খুঁড়ে জল তুলতে এখন ঘন কাশবনের ফাঁকে বয়ে যাওয়া সোঁতাটি দেখলে মন জুড়োয়। আপ্পু খোলা জানলা দিয়ে মুন্ডু বার করে যতদূর দেখা যায় চেয়ে রইল। ওর নাকি নদী দেখলেই নেমে যেতে ইচ্ছে করে। উপায় নেই বলে ওর মন খারাপ। পাভেল বলল সাঁতার জানিস? জলে না নামতে দিলে সাঁতার শিখব কী করে? বলল আপ্পু।
হেলে দুলে চলেছে মজার রেলের গাড়ি এর উঠোন ওর খিড়কিদোরের গা ঘেঁষে। খোলা দরজা দিয়ে আলাপ করতে আগ্রহী লতাপাতারা ঢুকে আসছে, কচি কাঁচাদের নরম হাতের আলতো আদর খেয়ে পিছিয়ে পড়ছে ফের। গাছের পাতা ছিঁড়তে বারণ, এরা সবাই জীবন সর্দারের স্যাঙাৎ, প্রকৃতি পড়ুয়ার দল। বড়োদেরও গল্পগাছা গানতান চলছে। তার সাথে সমানতালে চলছে জিলিপি সিঙারা কেক মিষ্টি আর মাটির ভাঁড়ে ফ্লাস্কবাহিনী গরম লাল চা। দলের সবচেয়ে ছোটোটির বেআইনি আবদার – আমিও ভাঁড়ে করে লাল চা খাবো। বেশ তাই সই!
চলতে চলতে কত যে ছবি পাল্টাচ্ছে ট্রেনের জানালায়। ক্ষেপে উঠে স্বভাবের তুলনায় একটু জোরেই চলেছে ট্রেন। মাঝে মাঝেই চরাচর কাঁপিয়ে হুইশেল দিচ্ছে কারণে অকারণে। দুর্বল রেললাইন ট্রেনের দুরন্তপনায় আপত্তি জানিয়ে নানারকম আওয়াজ করছে, শুনে ছোটোর দল হেসেই কুটিপাটি। গাল্লু বলল, ইঞ্জিনটা ছোটোভাইদের হাত ধরে পুজো দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে। দেখছ না মাঝে মাঝে কেমন হ্যাঁচকা টান মারছে! ছোটো ভাইরা কি আর অত তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারে?
ছোট্ট একটা স্টেশন গেল, বিকনা। কী মিষ্টি নাম। খাতা কলম নিয়ে তৈরি গাল্লু। নাম উঠে গেল খাতায়। নবান্দা! মানে কীরে বাপ! লেখ লেখ, নামের আবার মানে খোঁজে নাকী কেউ? গাল্লু মানে কী বল আগে। গাল্লু গাল ফুলিয়ে পা দোলাতে দোলাতে লিখে রাখল। আঠারো মাইল হল্ট বলে স্টেশনটার নামও বাদ পড়ল না। নতুন নতুন নাম লিখছে আর গাড়ির তালে তালে মাথা দোলাচ্ছে গাল্লু। মনে বোধহয় অন্য গানের সুর উঠেছে ওর।
ভোরের কুয়াশাভাব কেটে গিয়ে সোনারঙের রোদ উঠেছে ততক্ষণে। গাড়ির জানলায় ফুলে ফুলে সাদা শিউলির বন। গন্ধে ভরে গেছে সবদিক। বনের মাঝ বরাবর দুলন্ত ফুলন্ত কাশবনে ছাওয়া আঁকা বাঁকা ছোটো এক দুরন্ত নদী। নদীর ধারে সাদা বালির চরায় ছোট্ট সামিয়ানার তলায় আলো আলো মুখ করে দিব্যি ছোট্ট দুগগা ঠাকুরটি। রেলের গাড়ি ঝনঝনানি গরগরানি থামিয়ে থিতু হল। এ কোথায় এলাম? স্টেশন কই? থামবে কতক্ষণ? জানলায় সবাই মিলে উঁকিঝুঁকি স্টেশনের খোঁজে, হদিশ নেই তো কোনো স্টেশনের! থামল কেন রে বাবা? গার্ডসাহেব হাসিমুখে উদয় হলেন, দুহাতে একঝাড় কাশফুল।
“একী বসে আছেন যে সবাই? ঠাকুর দেখবেন না? চলুন চলুন। ছোটোরা চলে এস সবাই আমার পিছু পিছু।”
গার্ডসাহেব ছুট দিয়েছে কাশবনের মাঝ দিয়ে, ছোটোরা আছে পিছু পিছু হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার গল্প মনে করিয়ে দিয়ে। বলামাত্তর ছোটদের পেছনে বড়োরাও নেমেছে গাড়ি খালি করে। সবাই ছুটল ঠাকুর দেখতে। কেউ গেল শিউলিবনে ফুল কুড়োতে কেউ গেল নদীর ধারে। গাড়ি ছেড়ে দেবার ভয় নেই। গার্ডসাহেব নিজেই বসে আছেন নদীর ধারে উল্টোনো নৌকোর পিঠের ওপর চেপে। বুড়ো ড্রাইভারও মাটিতে গামছা পেতে বসে হুঁকো ধরাতে ব্যস্ত।
নদীটির স্রোত বয়ে যাওয়া বুকে নীল আকাশের ছায়া। দুলছে কাশফুল, শিউলিফুলের ডাল আর বাতাসে উড়ছে রেলগাড়ির কালো ধোঁয়া। সাদায় কালোয় ছবি ধরা রইল সাহেব মামার ক্যামেরায়।
ট্রেন ছাড়বার ধরা বাঁধা কোনো সময় নেই আজ। আপ্পুর ছোটো হাতের মুঠোয় সবজে নিশান ধরিয়ে গার্ডসাহেব বললেন, “তুমি এটা নাড়লেই গাড়ি চলবে।” শুনেই আপ্পু নিশেন লুকিয়ে ফেলেছে জামার তলায়, পাছে নড়ে যায় সেটা।
“এই নদীটার নাম কী? নাম লেখেনি কেন কেউ?” পাশের ছোট্ট নদীর দিকে আঙুল দেখাল ছোটোরা। “নাম নেই বুঝি ওর?”
“না না নাম আছে বই কি! নদীর তো নাম থাকতেই হয়। আমার বন্ধু অচিন্ত্যর সঙ্গে এই নদীর বিয়ে হয়েছিল যে!” গার্ডসাহেব জানালেন। নদীর সঙ্গে বিয়ে। ছোটোরা অবাক। মেনেও নিল অবশ্য কথাটা।
“কী নাম ওর?” খাতা বাগিয়ে বলল গাল্লু।
“লিখে রাখো গন্দাই। ভালো নামো গন্ধেশ্বরী। অবশ্য খুব ভালো করে জানা নেই আমার। গন্ধেশ্বরীর ভাই বোনও হতে পারে।” ড্রাইভার দাদু বলে গেলেন। গন্ধেশ্বরীই বটে এর নাম। এখন জল থাকলেও গরমের সময় শুকিয়ে যায়। বালির তলায় অবশ্য জল পাওয়া যায় বালি খুঁড়লে।
কারো তো কোনো তাড়া নেই। তাই ছোট্ট দুগগা ঠাকুরের কাছে কাটল সবার বেশ কিছুক্ষণ। গার্ডসাহেব বললেন, “এই বনে কিন্তু হাতি আছে। হঠাৎ চলেও আসতে পারে।”
হনুমানেরা বসে আছে এখানে ওখানে, ওরাও পুজো দেখতে এসেছে। হাতির কথা শুনে উঠে পড়ল সবাই গাড়ির কামরায়। খানিক বাদে চলল আবার রেলের গাড়ি আপ্পুর ইশারায়। সাহেবমামা ক্যামেরা কাঁধে চড়ে বসেছে গার্দের ক্ষুদে কামরার মাথার ওপর। চলতি গাড়ির ছাদের ওপর দিয়ে দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছে সে। গার্ডসাহেব নিজের জায়গা ছেড়ে এসে উঠল আমাদের কামরায়। সবাই মিলে গলা ছেড়ে গাওয়া গানের টান বড়ো শক্ত টান। তাতে নিজের গলা না মিলিয়ে কি থাকা যায়! গানের গলা ভালো মানুষটার, ভারী মিশুকে। কখন যে দলের একজন হয়ে গেছেন বুঝতেই দেননি। গানের পর এক বাদলা দিনের পাগলা ঝড়ে এই ছোট্ট দুঃখের রেলের দুর্দশার দুর্দান্ত বৃত্তান্ত শোনালেন তিনি।
সে এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার! দিনের বেলা রাতের আঁধার। গুমগুম শব্দ করে বুনো মোষের মতো মেঘের দল রাগ করেছে। আগুনে ঝিলিক মারছে এখানে ওখানে। কালো সেলেটের গায়ে আলোর দাগ টেনে সটান বাজ নেমে এল একটা তালগাছের মাথায়। দাউ দাউ আগুন ছড়িয়ে পড়ছে বনে। দেশলাই বাক্সের মতো ছোট্ট রেলগাড়ি চলেছে জঙ্গলের মাঝে গা ঢাকা দিয়ে ভীতু বাচ্চা ছেলেদের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে। বড়োদের বকুনি খেয়ে ছোটোরা যেমন যায়! জঙ্গল ছেড়ে খোলা জমিতে যেতেই চিত্তির! দেশলাই বাকসো বেচারা দমকা হাওয়ার দাপটে কাৎ হতে হতে পড়ল হাত পা শূন্যে তুলে উলটে। যাত্রী সেদিনও বিশেষ ছিল না তাই রক্ষে! অবশ্য মিনিট কয়েক বাদেই উলটো হাওয়ার ঠেলায় আবার আবার সিধে খাড়া লাইনের ওপর একেবারে ঠিকঠাক! আশ্চর্যের ব্যাপার কারও কোনো চোট হয়নি। শুধু নাগোরদোলায় চাপলে যেমন হয়, মাথা টাথা ঘুরে গেছলো আরকি। ঝড় যেন একটু নড়া ধরে নাড়া দিয়ে শাসন করে দিয়ে গেল শুধু, যেন বলল আর বার হবি ঝড়ের দিনে, দুষ্টু? জামাকাপড়ের ধুলো ঝেড়ে দুহাতে দুকান মুলে আবার চলল খেলনাগাড়ি নিজের পথে।
গপ্‌পো বটে একখানা! অবশ্যি সত্যি মিথ্যের বিচার কেই বা করতে যাচ্ছে।
চলে গেল ছোটোখাটো খানকতক ইস্টিশন। গাল্লুর খাতায় উঠেও গেল নামগুলো। বেলবনী, বেলিয়াতোড়, ধনসিমলা, ধগরিয়া। লিখতে লিখতে লাফিয়ে উঠেছে গাল্লু। বেলিয়াতোড় নামটা চেনা চেনা লাগছে যেন! বাবার কাছে শুনেছি, কোন শিল্পী যেন জন্মেছিলেন? যামিনী রায়। বাংলার পটের ছবি প্রাণ পেয়েছিল তাঁর তুলিতে। ভালো করে দেখে রাখ জায়গাটা। আর একজন মস্তো বড়ো শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজ জন্মেছিলেন বাঁকুড়ায়। “মনে রাখ এসব,” বাবা কপালে হাত ঠেকিয়ে বললেন।
রেলগাড়ি দাঁড়িয়ে হাঁফ ছাড়তে লাগল কিছুক্ষণ। মাটি না ছুঁয়ে পারা যায়? নেমে এল সবাই প্ল্যাটফর্মে। লাল কাঁকুড়ে মাটি একমুঠো তুলে পকেটে রাখল গাল্লু আপ্পু আর পাভেল।
প্ল্যাটফর্ম বলতে ঘাস বিছানো কাঁকুড়ে জমি। ছাউনি বলতে ইচ্ছেসুখে বেড়ে ওঠা বড়ো ছোটো অনেক কটি গাছ। তার ছায়াতেই দিব্যি আশ্রয়। বৃষ্টি হলে? জানি না যাও! টিকিট ঘর বলতে একখানা ঘর ছিল বটে, এখন না থাকার সামিল। জানলা দরজা হয়তো আর কারো কাজে লেগে গেছে। দেয়ালে এখানে সেখানে ইঁট নেই। থাকবার মধ্যে নিশ্চিন্তে জাবর কাটা দুটো গরু। তারা কেউ টিকিট বেচে বলে মনে হল না। আদ্যিকালে লেখাটেখাগুলো মুছে যায়নি অবিশ্যি। চোখ ঠাহর করলে দিব্যি পড়ে নেওয়া যায়। স্টেশনের নামগুলোও স্পষ্ট নয়, তবে নাম শুনলেই আদর আদর ভাব আসবে মনে।
বৃন্দাবনপুর, পাত্রসায়ের, চুয়াল্লিশ মাইল, ইন্দাস এল পরের পর। খাতায় উঠে গেল তারা। কতকালের স্টেশনগুলো নির্জনে মুখ লুকিয়ে পড়ে আছে। কোথাও কোনো লোক নেই। রেলগাড়িতে তেমন কেউ ওঠেও না নামেও না। সাহেবমামার ক্যামেরা চলছে তো চলছেই। কত কী ছবি তুলে ফেলল কে জানে? অন্য স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের কোনো ছাউনি বা ওভারব্রিজ বলে কিছু নেই। থাকার কোনো দরকারও তো নেই। শতাব্দীপ্রাচীন বড়ো বড়ো গাছগুলো মোটা মোটা শেকড়ে বসার জায়গা করে দিয়েছে, মাথার ওপর হাজারো ডালপালা আর ঘন পাতায় ছাতা ধরেছে। সবুজ পাতার ছাতার তলায় ঘন অন্ধকার ছায়ায় ঢাকা পুরো প্ল্যাটফর্ম। না, টিকিট ঘরের দেখা নেই কোথাও। নেই কোনো রেলের কর্মী। ভাবছো কী মজা টিকিটঘর নেই, মিনি মাগনা ট্রেনে চড়া যাবে। ঘর না থাকলেও টিকিট বিক্রি নেই কে বলল! সে গুড়ে বালি। নেই কথাটা বলা যাবে না কোনোমতেই। যে বাউলমানুষটা এতক্ষণ ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে শোনাচ্ছিল, কোন একটা স্টেশনে দুজন লোক উঠতেই সে গান থামিয়ে হয়ে গেল টিকিটবাবু। কমিশন এজেন্ট। পোষাকটা অবশ্য বাউলারই। একগোছা টিকিট হাতে তাদের দুজনের কাছে গিয়ে কী তার আকুলি বিকুলি। তারাও নেবে না টিকিট, এও ছাড়বে না। দুজনে মিলে অন্তত একটা টিকিট কাটুক তারা তা হলেও খানিকটা নিয়মরক্ষা গোছের হয়। জোর জবরদস্তি নেই কোনো, হাতে পায়ে ধরাধরি প্রায়! শেষে দুজনকে নগদ দুখানা বিড়ি ঘুষ দিয়ে বেচা গেল একটা টিকিট!
ও মা! বলতে ভুলেছি নির্জন শালবনের মাঝে পেখম মেলে দাঁড়িয়ে থাকা সেই একলা ময়ূরটার কথা। সোনা ফেলে আঁচলে গিঁট!

চলতে চলতে হঠাৎ গাড়ির শব্দ গেল পালটে! রেলের চাকায় সহজ ছন্দের খুশিয়ালী খুনসুটি সুর তাল হয়ে গেল গম্ভীর, গমগমে। সবাই গান টান থামিয়ে কান পাতল। উঁচু নীচু ঢেউ খেলানো খোলা মাঠ ছেড়ে ঘন শালবনের গহন আঁধারে ঢুকে পড়েছে রেলগাড়ি। দুষ্টু মিষ্টি মজার রেলের গাড়িটা যেন ঘুম ভাঙাতে এসেছে শালবনের। এখানে হাতির কানের মতো বড়ো বড়ো পাতা দোলানো শাল পিয়াল সেগুন গাছেরা শব্দ ধরে রাখে না, ফিরিয়ে দেয়। তাই রেলের মিঠে বাঁশির প্রতিধ্বনি ফিরে ফিরে আসে। চাকার ঝুকু ঝুকু ঝিক ঝিক ডবল হয়ে ঢাকের বোল তোলে। রেশ রেখে যায় মনে। বনের আঁধারে পাকিয়ে পাকিয়ে ওঠা রেলের ধোঁয়ায় রহস্য ঘনায়। রেলের চাকার ঝক্‌কর ঝক্‌কর শব্দ গহন বনের জমাট গাম্ভীর্যকে ঠাট্টা করে এগিয়ে চলে। বেচারা গাছগুলো দুষ্টুটার সঙ্গে যেতে পারছে না বলে মন খারাপ করে মাথা দোলায়।
চলতে চলতে অনেকদূর। সূয্যিঠাকুর উঠে এসেছে মাথার ওপর। শালবনের পাতাদের নাগাল এড়িয়ে শরতের সোনা রোদ্দুরে বনের সবুজ মখমল মেঝের ওপর কোথাও পেতেছে ছোটো বড়ো রুমাল, কোথাও বা খুচরো হয়ে অসংখ্য সিকি আধুলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। এ বনের সবুজ বড়ো মন মাতানো সবুজ, মায়াময় সতেজ। এ রঙকে বলে এমারেল্ড বা পান্না সবুজ। হঠাৎ সবার চোখ ধাঁধালো উজ্জ্বল সাতরঙের কারসাজিতে। পেখম মেলে সাথীহারা ময়ূর পান্নার পটে ছবি হয়ে ফুটে আছে। রেলের রোজকার দেখা দৃশ্য, সে কি আর থামে? গড়গড়িয়ে ঝিকঝিকিয়ে সে চলছে তো চলছেই। শেষটা ছোটোদের আবদারে রেলগাড়ি উলটোবাগে পিছিয়ে এল ফের।
কোথায় কী! বনের ছবি বনেই গেছে হারিয়ে। মন থেকে অবশ্য মুছে গেল না কারো। শালের চাঁদোয়ার তলায় ফের কিছুক্ষণ ছুটোছুটি গড়াগড়ি সবাই মিলে। ভারী রসিক এক কারবারি দোকান ফেঁদে বসে আছে এ হেন নির্জনতায়। চারদিকে তার লোহার জালের ঘেরাটোপ। কেন? হনুমান আর হাতিরা নাকি লাড্ডু খেতে বড়ো ভালোবাসে, বিনা পয়সায়। বারকয়েক খেয়ে যাবার পর এই ব্যবস্থা! হাতে হাতে গরম চা গাড়িশুদ্ধু সকলের। ছোটোদের জন্য গুড় দিয়ে লাল করা গরম দুধ, নানখাটাই কখনো মেঘ বিস্কুট ডুবিয়ে ডুবিয়ে। তার সাথে লুচি আলুরদম আর কাঁচা শালপাতার দোনায় গরম ঘুঘনীটাও বুঝি ছেড়ে যাওয়া যায়? শেষে গরম জিলিপি আর সেই হাতিদের প্রিয় লাড্ডুতে জমে উঠল খাওয়া দাওয়া। ফোকলামুখে দোকানদারের অবাক হাসি আর ধরে না। তার আজ পুজোর দিনে দোকান খোলা সার্থক।
এখানে ঘর বেঁধে থাকবার কথা মনে উদয় হলে দোষ দেওয়া যায় না। থাকা না হোক নিদেন একবার চোখের দেখাটি দেখতে যাওয়া উচিত মাঝে মাঝে। সময় না পাবার দোষ কি সময়ের, না যে সময় পাচ্ছে না বলে কেঁদে বেড়ায় তার মনের? মনের আগলটা তো খুলতে হয় মাঝে মাঝে। শালের বন। গহন সবুজ থেকে আবার নীল আকাশ। খোলা রোদ্দুর, ধানের ক্ষেতে গড়িয়ে যাওয়ার পাগলা হাওয়ার ঢেউ। অকারণে ডেকে ডেকে রেলের বাঁশি যেন ক্লান্ত। মজার রেলের ক্লান্ত শরীর ঘন শ্বাস ফেলতে ফেলতে চলেছে তো চলেছেই। ছেলেমানুষ রেল, তার অত খাটনি সয়! নতুন নতুন স্টেশন আসে যায়! খাতায় টুকে নেয় গাল্লু। শ্বাসপুর বোয়াইচন্ডী, গুইর, সেহরাবাজার। বাজার কোথায় রে বাবা? গাল্লু জানলা দিয়ে এদিক ওদিক খুঁজে বাজার পেল না কোথাও। গার্ডসাহেব শ্যামসুন্দর আসতে আমাদের পাশে এসে বসলেন। ঘাম টাম মুছে এমনিই চেয়ে দেখছেন সকলকে। আবার কবে দেখা হবে? মন খারাপ তার। মুখে কিছু না বললেও বেশ বোঝা যাচ্ছে। সাহেবমামা ওরও একটা ছবি তুলে নিল।
চলে চলে চাকায় রেলে ঝিমিয়ে পরা সঙ্গত। জানলার ফ্রেমে পরপর সাজানো চলার নেশায় মাতোয়ারা মুখ। উড়ো উড়ো চুল। হাওয়ায় ধোঁয়ায় লাল হয়ে যাওয়া চোখ। অনেকটা পথ চলে এলাম। আবার কবে উড়ো খই যাবে গোবিন্দের কাছে কে জানে?
বর্ধমান জেলায় ঢুকে পড়েছি বহুক্ষণ, রায়না আসতে দেরি নেই। দুপুর রোদে ঝিমিয়ে পড়া শ্যামসুন্দর স্টেশনে থেমেছে গাড়ি, গার্ডসাহেব জানিয়ে গেলেন। এখানে দাঁড়াবে বেশ কিছুক্ষণ।
আবার নেমে এল সবাই হাঁটাহাঁটি করতে। স্টেশন আগলে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রকান্ড বুড়ো বট। অসংখ্য জটার মতো ঝুড়ি নামিয়ে ধ্যানে বসে আছে যেন। বেশ লম্বা একটা অবসর সবাইকার। ইঞ্জিনের পেটে জল ঢালা হচ্ছে। তেষ্টা পেতেই পারে তার। সেই কোন ঝুঁঝকো-বেলা থেকে এই দুপুর অবধি পুজোর ধুনোগন্ধি অলস রোদ্দুরে দুষ্টুমি কম করেনি সে। জটাধর বটের মোটা ঝুড়ির থামে ঠেস দিয়ে বুড়ো ড্রাইভার দাদা হুঁকো ধরিয়ে বসেছে। ঝরতি পড়তি খাবার ভাগাভাগির পর বড়োরা কেউ শুয়েছে ঘাসের বিছানায় গা এলিয়ে কেউবা বাউলদাদাকে পাশে বসিয়ে গান শুনছে চোখ বুঁজিয়ে। আপ্পু আর অন্তু গেছে গার্ড সাহেবের হাত ধরে রেলগাড়ি চালানো শিখতে। গাল্লু আর মুনিয়া ব্যস্ত খাতায় কলমে।
“এ গাড়ির আয়ু ফুরিয়ে এসেছে বাবু। আর বোধহয় বেশিদিন চলবেনি।” ড্রাইভারদাদু হুঁকোর নীলচে ধোঁয়া বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে আনমনে বলল।
“কেন?”
“রেল কোম্পানির লাভ নেই এখানে রেলগাড়ি চালিয়ে। কোনো লোক এ গাড়ি চড়ে না। চড়লেও টিকিট কাটে না। কোম্পানি বলে কয়লা পুড়িয়ে লাভ নেই শুধু শুধু। বোধহয় এবার তুলেই দেবে। তিন চারটে লোকের মাইনে দিতে চায় না রেল কোম্পানি। খালি বলে রেল চালিয়ে লাভ নেই। তুলে দেব ন্যারোগেজ লাইনের গাড়ি।”
শুনে মন খারাপ হয়ে গেল। সব লাভই কি টাকার অঙ্কে দেখতে আছে? মাঝে মাঝে নিষ্কর্মা যাত্রীদের লাভও দেখতে পারত কোম্পানি, লোকসান হলেও। ভালোবাসায় ক্ষতি পোষায় না কোম্পানির?
যাক! মজার রেলের যাত্রায় মন খারাপ করতে নেই। তাই বলে কি মনের দুঃখ কমে? তোলা রইল সেটা বাড়ির জন্য। অস্ট্রিয়া থেকে আসা সাহেবমামা মুখচোখ লাল করে বলল, “আনবিলিভেবল! এত সুন্দর রাইড তুলে দেবে! টুরিস্টরা তো জানেই না এ রাইডের কথা, জানলে আসবে না? আমাদের দেশ হলে সবাই মিলে জোর করে, ভালোবেসে রেখে দিতাম।”
ততক্ষণে পেটপুরে ঠান্ডা জল আর কয়লা খেয়ে নতুন দম নিয়ে মাঠ ঘাট কাঁপিয়ে ট্রেন হুইশেল বাজাতেই যে যার আপন আপন জায়গা নিয়ে আগমনীগান জুড়েছে;
এবার আমার উমা এলে
আর উমায় পাঠাব না,
বলে বলবে লোকে মন্দ
কারো কথা শুনব না।
যদি এসে মৃত্যুঞ্জয়
উমা নেবার কথা কয়,
মায়ে ঝিয়ে করব ঝগড়া
জামাই বলে মানব না।

গাইতে গাইতে চোখে জল। কখন এসে গেছে আউসারা কে জানে! প্ল্যাটফর্মে নয়, মাঠের মাঝখানে থেমেছে গাড়ি। মিষ্টি গাড়ি, পুঁচকে গাড়ি, দুষ্টু গাড়ি। বিদায় জানাতে ইঞ্জিন থেকে নেমে এসেছে বুড়ো ড্রাইভারদাদা, গার্ডসাহেব, বাউলদাদা, সক্কলে।
নেমে যেতে হয় তাই নামতেই হল। নেমেছি বটে, মাঠের মাঝে দিগন্তজোড়া ধানখেতের মাঝে কোনোদিকেই গাঁঘরের কোনো চিহ্ন নেই। কোথায় রে আউসারা? ধূ ধূ ধানের ক্ষেতে হাওয়ায় সবুজ সমুদ্দুরের মতো দুলছে ধানগাছ। হেলছে দুলছে ঝিমোচ্ছে মাথা নুইয়ে যত দূর চোখ যায়। আলপথে সবাই চলেছি সার বেঁধে। মাঝে মাঝে ফিরে ট্রেনের দিকে হাত নাড়ানাড়ি চলছে। রেলবাঁধের উঁচু জমির ওপর দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে মজার রেলের আজব রেলের বন্ধুরা। ছোট্ট শুঁয়োপোকার মতো দেখাচ্ছে এখন রেলের গাড়িটাকে। দূর থেকে হুইশেল বাজল একবার, শোনা যায় কি যায় না। দুবার তিনবার বাজল। যেন বলছে মনে রেখো আমাকে। তারপর নীল আকাশের গায়ে কালো ধোঁয়ার আলপনা এঁকে দিতে দিতে চলে গেল নজরের শেষ সীমা পেরিয়ে।
দূরে নজরে পড়ছে আউসারা গাঁয়ের ঘরবাড়ি। বর্ধমান সদর শহরে যাবার বাস যায় ওখান দিয়ে। মাঠের মাঝে চলতে চলতে খোড়ো চালায় পুজো হচ্ছে। শোলার কদম, চাঁদমালা, আমের পল্লব টাঙানো। মাটির ওপর আলপনা, পুজোর ঘট, ধূপধুনোর গন্ধে ভরপুর। একচালি প্রতিমা। মাথার ওপর সামিয়ানা টাঙানো পূজামন্ডপ। গোলগাল দুগগাঠাকুরের ঘামতেলে জবজব মিষ্টিমুখ। টানা টানা কালো চোখে ঘুঘুর বুকের মতো শান্তি।
মাঠে হাওয়া বইছে জোর। নীল আকাশে সাদা মেঘের পাল। ধানের বুকে ঢেউ খেলানো পাটবন কাশবন দোলানো হাওয়া দূর থেকে কানে ভেসে আসছে দেবী বোধনের ঢাক।
ঢ্যাং কুড়া কুড় ঢ্যাং কুড়া কুড় কুড় কুড় কুড় তাক
দুগগা মায়ের ছানা পোনা গাঁ শহরের সকল জনা
বেঁচে বর্তে থাক সবাই বেঁচে বর্তে থাক।

2 Responses to পুজো স্পেশাল রেল ঝমঝম-কুউউ ঝিকঝিক শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য শরৎ ২০১৯

  1. সুদীপ says:

    কি সুন্দর! মায়াময় লেখা…

    Like

  2. SWAPAN says:

    kothy harie gechilam porte porte

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s