পুরাণ কথা নচিকেতা সংহিতা বর্ষা ২০১৬

নচিকেতা ১ম পর্ব   নচিকেতা ২য় পর্ব    নচিকেতা তৃতীয় পর্ব      নচিকেতা চতুর্থ পর্ব-    নচিকেতা পঞ্চম পর্ব

পর্ব ৬

puran57 (Medium)মরলোক নিয়ে জ্ঞানপিপাসু নচিকেতার কৌতুহল মেটানোর জন্য, যম সযত্নে বলে চললেন, “স্বয়ম্ভু ইন্দ্রিয়গুলিকে বানিয়েছেন বহির্মুখী করে। তাই মানুষমাত্রেই বাইরের জিনিস দেখতে পায়। কিন্তু তারা অন্তরাত্মাকে দেখতে পায় না। যে জ্ঞানী অমরত্ব লাভের সন্ধানে বাহির থেকে ইন্দ্রিয় গুটিয়ে নিয়ে অন্তরে অনুসন্ধান করেন, তিনি উপলব্ধি করেন অন্তরাত্মাকে।”

তিনি আরও বললেন, “শিশুর যেমন জ্ঞান থাকে না বলে কেবলই বাইরের ফূর্তির আকর্ষণে ছুটতে থাকে, আর বিপন্ন হয়, পড়ে মৃত্যুর ফাঁদে, তেমনই বিজ্ঞজন জানেন অমরত্বের প্রকৃতি। তাই তাঁরা সদা জঙ্গম চিরপরিবর্তনশীল বস্তুর মধ্যে স্থায়িত্ব খোঁজেন না।”

আরও স্পষ্ট করে বোঝাতে বললেন, “যেভাবে একজন আকার, স্বাদ, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ জানে এবং অনুভবের আনন্দ পায়, সেভাবেই বুঝে নেয় যে কীই বা জানতে বাকি রয়ে গেল।”

          সাধারণের সঙ্গে অন্তরাত্মাদর্শীর পার্থক্য বোঝালেন, “যেভাবে মরণশীল মানুষ স্বপনে কিংবা জাগরণে নানান দৃশ্য  অনুভব করে, সেভাবেই সর্বগামী আত্মাকে অনুভব করার পর বিজ্ঞজন আর কখনও শোকাতুর হন না।”

অন্তরাত্মাদর্শীর বর্ণনায় বললেন, “যিনি নিজের নিকটতম পরিসরে আত্মার সন্ধান পান, তিনি জীবনে মধুভোগী, বস্তুকে তিনি অনুভব ও উপভোগ করতে পারেন এবং তাকেই ভূত-ভবিষ্যতের অধীশ্বর বলে উপলব্ধি করেন, তাঁর মন থেকে সব ভয় লোপ পায়।”

সেই বর্ণনায় যোগ করলেন যম, “তিনি পঞ্চভূতেও আত্মার অস্তিত্ব টের পান,  যে আত্মার জন্ম তাপস অর্থাৎ ব্রহ্মাগ্নি থেকে, হৃদয়ের গহ্বরেঅধিষ্ঠানযে জলের সেই জলের সামনে।”

বললেন অদিতির কথাও, “তিনি সেই অদিতিকেও জানেন যে অদিতি পঞ্চভূত থেকে উদ্ভুত, জাগেন জীবনের নীতির সাথে এবং সর্বদেবে অধিষ্ঠান করেন, হৃদয়ে প্রবেশ করলে অধিষ্ঠানকরেন হৃদয়েও।”

এলো সর্বদর্শী আগুনের কথাও, “দুটি কাঠের বুকে লুকিয়ে থাকে সর্বদর্শী আগুন যেমন মাতৃজঠরে লুকানো থাকে ভ্রূণ, সদাজাগ্রত জ্ঞানপিপাসু সেই আগুনেরই পূজা করেন দিনের পর দিন, এই আগুনের পূজারী যজ্ঞে যাঁরা উৎসর্গ করেন নানান ভোগসামগ্রী তাঁরাও।”

এলো সূর্যের কথাও, “দেবতারাও নির্ভর করেন সূর্যদয় থেকে সূর্যাস্তের ওপর।”

তারপর জানালেন, “যা কিছু দৃশ্যমান জগতে দেখা যায়, তাই দৃশ্যাতীত জগতেও বিদ্যমান। যিনি দৃশ্যমান ও দৃশ্যাতীত জগতের মধ্যে তফাত দেখেন, তিনিই মৃত্যু থেকে মৃত্যুতে ঘুরতে থাকেন।”

আরও বললেন, “কেবল মাত্র বুদ্ধি দিয়েই এই সত্য উপলব্ধি করা যায়। দৃশ্যমান ও দৃশ্যাতীতে কোনো পার্থক্যই নেই। যে পার্থক্য দেখে সে মৃত্যু থেকে মৃত্যুর চক্রে আটকে থাকে।”

সন্ধান দিলেন পুরুষের, “আয়তনে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ পুরুষ বা আত্মা দেহের কেন্দ্রে থাকেন। তিনিই অতীত ও ভবিষ্যতের কর্তা। তাঁকে জানলে নির্ভয় হওয়া যায়। এই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ পুরুষ বা আত্মা ধূমহীন আগুনের মত। গতকাল, আজ এবং আগামীকাল তিনি একইরকম, ধ্রুব।”

সহজ ব্যাখ্যা করে বললেন, “বৃষ্টির জল যেমন পাহাড়ের মাথায় পড়ে চতুর্দিকে পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যায়, তেমনই যিনি দৃশ্যমান নানান দ্রব্যকে পৃথক পৃথক বস্তু বলে মনে করেন তিনি নানা দিকে ছুটে ছুটে বেড়ান।”

সিদ্ধান্তে বললেন, “হে গৌতম, এক আধারের শুদ্ধ জল অন্য আধারের শুদ্ধ জলে মিশে গেলে যেমন সবটাই একমাত্র শুদ্ধ জল হিসেবে পাওয়া যায়, তেমনই একজন আলোকপ্রাপ্ত জ্ঞানতপস্বীর অস্তিত্ব লীন হয়ে যায় সর্বময়ের মহাস্তিত্বে।”

পর্ব ৭

যম বলে চললেন, “অজাতনগরীর এগারো দ্বার – দুই চোখ, দুই কান, দুই নাসাগহ্বর, মুখগহ্বর, নাভি, পায়ু, যোনি আর ব্রহ্মতালুর অদৃশ্য গহ্বর। অজাত নগরীতে জ্ঞান স্থির, অপরিবর্তনীয়।  অজাতের ধ্যান করলে মনে কোনো অনুযোগ থাকে না। সেই ধ্যান অজ্ঞানতার থেকে মুক্ত করে বলে সব বাধা যায় কেটে।”

তিনি ব্যাখ্যা করে যোগ করলেন, “সে যেন উজ্জ্বল স্বর্গবাসী সূর্য, সে যেন সর্বত্রব্যাপী বাতাস, সে যেন যজ্ঞের বহ্নিশিখা, সে যেন গৃহের অতিথি। তার বাস পুরুষে, পুরুষাতীতেও। সে উৎসর্গেও থাকে, আবার সে মহাশূণ্যেও থাকে। যেমন যাবতীয় জলজীবীর উৎস সে , তেমনই সে সমস্ত ভূমিষ্ঠের মধ্যে বিরাজিত, সমস্ত যজ্ঞোৎসর্গেও সে থাকে, সে থাকে গিরিজ সমস্ত সত্ত্বায়। সে-ই সত্য, সে-ই মহান।”

তিনি বর্ণনা করে চললেন, “যে প্রাণবায়ুকে ঊর্ধ্বমুখে প্রেরণ করে আর নিঃশ্বাসকে নিম্নমুখে চালিত করে, তাকেই সশ্রদ্ধভাবে মেনে চলে সকল ইন্দ্রিয়। তা-ই আদরণীয় আত্মা যা কেন্দ্রস্থ, হৃদয়স্থ।”

তিনি প্রশ্ন করলেন, “যখন আত্মা শরীর ছেড়ে যায় তখন কী পড়ে থাকে?”

উত্তরে নিজেই বললেন, “কোনো জীবই প্রাণবায়ু গ্রহণ করে বা নিঃশ্বাস বর্জন করে বাঁচে না। বরং তারা বাঁচে অন্য এমন কিছুর দ্বারা যার ওপর প্রাণবায়ু আর নিঃশ্বাস নির্ভর করে।”

তারপরই তিনি জানালেন, “হে গৌতম, আমি তোমাকে খুলে বলব চিরন্তন ব্রহ্মের গুহ্য কথা আর মৃত্যুর পরে আত্মার কী পরিণতি হয়।”

আর বললেন, “কোনো কোনো আত্মা গর্ভে আশ্রয় নেয়, আবার শরীরে ফিরে যাওয়ার জন্য। অন্যান্য আত্মা ধ্রুবাকার ধারণ করে তাদের কীর্তি আর অভিজ্ঞতানুসারে।”

বললেন ব্রহ্মের কথাও, “যে সত্ত্বা সদা জাগরুক, সবাই ঘুমন্ত যখন তখনও, যা সকল ইচ্ছে পূর্ণ করে, যা খাঁটি, তাই ব্রহ্ম, কেবলমাত্র তা-ই অমর, চরাচর তাতেই অধিষ্ঠান করে, তাকে অতিক্রম করতে পারে না কিছুই।”

যোগ করলেন, “যেমন আগুন যা মূলগতভাবে একইরকম হলেও বিভিন্ন দাহ্য পদার্থের কারণের বিভিন্ন রকম ছাইতে পর্যবসিত হয়, তেমনই নানান জীবের অন্তরে লীন আত্মা একই হলেও তার প্রকাশের রূপটি হয় যে জীবের অন্তরে সে বসে তার মতো। সে বাইরেও থাকতে পারে।”

আরও যোগ করলেন, “যেমন হাওয়া যা মূলগতভাবে একইরকম হলেও জগতে প্রবেশ করে বিভিন্ন রূপ নেয়, তেমনই নানান জীবের অন্তরে লীন আত্মা একই হলেও তার প্রকাশের রূপটি হয় যে জীবের অন্তরে সে বসে তার মতো। সে বাইরেও থাকতে পারে।”

আবার বললেন, “যেমন সূর্য, যা সারা বিশ্বের চোখ, তার নজর সাধারণ চোখে দেখার কলুষ দিয়ে কলুষিত করা যায় না, তেমনই সমস্ত জীবের অন্তরাত্মা কলুষিত করা যায় না জাগতিক ক্লেশ দিয়ে।”

সন্ধান দিলেন, “এক শাসক আছেন, যিনি সব জীবেরই আত্মা, যিনি এক থেকে বহু আকার নিতে পারেন। যে জ্ঞানী তাঁর অন্তরে এই অস্তিত্বকে অনুধাবন করেন, তাঁর অন্তরেই এই আত্মার বাস, আর কারও নয়।”

আরও সন্ধান দিলেন, “চির পরিবর্তনশীলের মধ্যে যা ধ্রুব, যা চেতনার চেতনা, যা এক হলেও বিভিন্নের প্রত্যাশা পূরণ করেন তাঁকে অন্তরে অনুভব করেন যে প্রাজ্ঞজন, কেবলমাত্র তাঁদেরই হৃদয়ে চিরশান্তি বিরাজ করে, অন্য কারো নয়।”

প্রশ্ন করলেন, “প্রাজ্ঞজনে আত্মাকে অনুভবের অবর্ণনীয় পরমানন্দ প্রকাশ করেন ‘তথাস্ত’ বলে।আমি জানলাম কী  করে? সে আনন্দ কি নিজের আভায় উজ্জ্বল? না কি সে আনন্দ অন্য আলো প্রতিফলনে দৃশ্যমান হয়?”

তারপর নিজেই উত্তর দিলেন, “সূর্যও জ্বলে না তাকে আলোকিত করতে, চাঁদও কোনো প্রতিফলন ঘটায় না তার ওপর, কোনও তারাও আলো দেয় না তাকে, আলো দেয় না বজ্রপাতের ঝলকও, আগুনের তো প্রশ্নই ওঠেনা। যখন সে প্রতিভাত হয়, তার চারপাশে আলোকিত করে তার পারিপার্শ্বিকের সমস্ত কিছুকে, তার আলোতেই সমস্ত কিছু আলোকিত হয়।”

পর্ব ৮

যম বুঝিয়ে চললেন নচিকেতাকে, “প্রাচীন অশ্বত্থ গাছের শিকড় ছিল মাটির ওপরে আর ডালপালা ছিল মাটির নীচে। তা শুদ্ধ, তাই ব্রহ্ম। কেবলমাত্র তাই অমর। বাকি পৃথিবী তাতেই থাকে। কোনো কিছুই তার বাইরে যায় না।”

তিনি জানালেন, “জাগতিক সব কিছুর উৎপত্তি প্রাণ থেকে। সবই সেই প্রাণের ওপর দুলছে। এটা প্রবলভাবে ভয়ঙ্কর, যেন মাথার ওপর ঝুলে থাকা বজ্রপাত। যারা এই ব্যাপারটা বোঝে তারা অমর।”

তিনি স্পষ্ট করে দিলেন, “তারই ভয়ে আগুন দহন করে, সূর্য প্রতিভাত হয়, তার ভয়েই ইন্দ্র, বায়ু আর মৃত্যু, যিনি পঞ্চম পুরুষ, ছুটে চলেন।”

তিনি সোজা কথায় বলে দিলেন, “যে মানুষ তার দেহ লীন হওয়ার আগে তাঁর অস্তিত্বের কথা বুঝতে পারে না, তার পুনর্জন্ম হয় মর পৃথিবীতে।”

যম আবার বললেন, “আয়নার মধ্যে নিজেকে দেখার মতোই মানুষ তাঁকে নিজের মধ্যে দেখতে পায়। পরলোকে তাঁকে দেখায় স্বপ্ন দেখার মতো। গান্ধর্বলোকে তাঁকে দেখায় জলের মধ্যের দৃশ্যের মতো। ব্রহ্মলোকে তাঁকে দেখায় আলো ও ছায়ার মতো।”

ফিরে এলেন ব্রহ্মজ্ঞের বিবরণে, “ইন্দ্রিয় ও আত্মা পৃথক এবং ইন্দ্রিয়ের জাগরণ ও ক্রিয়াকলাপ আত্মার থেকে আলাদা একথা জানেন যে প্রাজ্ঞজন তিনি দুঃখ থেকে মুক্ত।”

আবার বর্ণনা করলেন অস্তিত্বকে, “ইন্দ্রিয়ের থেকে উচ্চতর মন, মনের থেকে উচ্চতর বুদ্ধি, বুদ্ধির থেকেও ওপরে মহান আত্মা, আত্মার থেকে ওপরেও অনুদ্ভাসিত অস্তিত্ব। তাকে পেরিয়ে সর্বগামী, সর্বব্যাপী অবর্ণনীয় পুরুষ। তাঁকে জানলে মরণশীল মুক্তি পায়, অমর হয়। তাঁর আকার জানা যায় না। তাঁকে চোখে দেখা যায় না। তাঁকে অনুভব করা যায় হৃদয় দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে, মন দিয়ে। যাঁরা পারেন তাঁকে অনুভব করতে তাঁরা অমর। যে অবস্থায় পঞ্চেন্দ্রিয় স্থির হয়ে যায় মনের সাথে, বুদ্ধি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, সেই অবস্থাকে বলা হয় সর্বোচ্চ অবস্থা। এই তীব্রভাবে ইন্দ্রিয় সংবরণ করাই যোগ। মানুষকে সজাগ থাকতে হয় যেহেতু যোগ আসে আর চলে যায়।”

তারপর প্রশ্ন করলেন,“তাঁকে কথায় বর্ণনা করা যায় না, মন দিয়ে ধরা যায় না, চোখে দেখা যায় না। তবে কেমন করে তাঁকে উপলব্ধি করা যায় যদি না কেউ বলে ‘তিনি আছেন’?”

আবার উত্তরও দিলেন, “তাঁকে উপলব্ধি করতে হয় ‘তিনি আছেন’ বলে। এবং অবশ্যই তাঁকে দৃশ্যমান ও দৃশ্যাতীত বাস্তব হিসেবে অনুভব করতে হয়। যিনি অনুধাবন করেন যে ‘তিনি আছেন’ কেবলমাত্র তাঁর কাছেই ‘তাঁর’ আসল রূপ প্রকাশ পায়।”

তারপর আরও জানালেন, “যখন হৃদয়ের সমস্ত প্রত্যাশা লোপ পায়, তখন মরণশীল অমর হয়, ব্রহ্মত্ব পায়, যখন হৃদয়ের সমস্ত যোগাযগ পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন মরণশীল অমর হয়। এখানে তাই অনুশাসন।”

হৃদয় প্রসঙ্গে আরও বললেন, “একশত এক স্নায়ু আছে হৃদয়ের। তার একটা গেছে মাথার মধ্যিখান ফুঁড়ে। এই স্নায়ু ধরে ঊর্ধমুখে যা যেতে পারে, সে অমরত্ব পায়। বাকি একশত স্নায়ুপথ গেছে ভিন্ন ভিন্ন লোকে।”

পুরুষ প্রসঙ্গে বললেন আবার, “বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ পুরুষ, যা অন্তরাত্মা, তার চিরন্তন বাস সব জীবের হৃদয়ে। মানুষের কর্ত্তব্য অধ্যাবসায় দিয়ে তাঁকে দেহ থেকে মুক্ত করা, ঘাসের শীষ খুঁটে শস্য বের করে আনার মতন।”

এই ভাবে নচিকেতা স্বয়ং যমের থেকে এই সমস্ত জ্ঞানলাভ করে, যোগের যাবতীয় নিয়ম শিখে শুদ্ধ হলেন, মুক্তি পেলেন মৃত্যু থেকে। ব্রহ্মত্ব অর্জন করলেন। এই ভাবে অন্য কেউ যেই একইভাবে জানবেন আত্মার স্বরূপ তিনিও ব্রহ্মত্ব অর্জন করবেন।

জয়ঢাকের পুরাণ কথা সব পর্ব একত্রে