পুরাণ কথা

পুরাণ কথা->নচিকেতা ও সত্য->সংহিতা

পর্ব ৩

puran54 (Small)শান্ত কিন্তু নির্ভীক স্বরে নচিকেতা বললেন, “একটা সন্দেহ আছে এই নিয়ে যে মৃত্যুর পর মানুষের কী হয়। কেউ বলেন যে মানুষ থাকে, কেউ বলেন যে মানুষ থাকে না। আমি আপনার থেকে মানুষের এই পরকাল সম্বন্ধেই জানতে চাই তৃতীয় বরে ।”

যম উত্তরে জানালেন, “প্রাচীনতম দেবতাদেরও এ নিয়ে সন্দেহ ছিল। এ কথা জানা মোটেও সহজ নয়। বেশ অস্পষ্ট বিষয় এটা। নচিকেতা, তুমি অন্য কোনো বর চাও। আমাকে চাপ দিও না। আমার থেকে পরকালের জ্ঞানের বর চেয়ো না।”

নচিকেতা দমলেন না মোটেই। বরং বললেন, “হে মৃত্যুদেবতা, আপনি নিজেই বলছেন যে দেবতারাও এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ ছিলেন না আর এই বিষয়টাও মোটেই সহজবোধ্য নয়। এ বিষয়ে আপনার থেকে যোগ্যতর শিক্ষক আর কেউ হতেও পারে না। তাই পরকালের জ্ঞানের সমতুল বর আর কিছু হতেই পারে না।”

তর্ক গভীরতর হলো। যম বললেন, “শতায়ু সন্তান-সন্ততি চাও, গোসম্পদ চাও, হাতি চাও, সোনা চাও, ঘোড়া চাও। চরাচরব্যাপী ভূমির ওপর অধিকার চাও আর ইচ্ছামৃত্যু চাও যাতে যতগুলি খুশি বসন্ত পার করে তবে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পার। যদি এর সমান কিছু চাও তো চাইতে পার অগাধ সম্পত্তির মালিকানা আর দীর্ঘায়ু কিংবা বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড শাসনের অধিকার। নচিকেতা, আমি তোমাকে যা চাইবে তাই দিতে পারি।  মরজগতে যা কিছু দুষ্প্রাপ্য, যেমন স্বর্গের অপ্সরা আর তাদের রথে চড়ে তাদের নৃত্যগীতের বিনোদন, যা মরণশীল মানুষ পেতেই পারে না, তেমন কিছু তোমাকে দেব নাহয়। নচিকেতা, মৃত্যু নিয়ে কোনো প্রশ্ন কোরো না।”

নচিকেতা তাঁর প্রার্থনায় রইলেন অটল। বললেন, “হে মৃত্যুদেবতা, এই সবই নশ্বর। এ সবই মানুষের বোধকে দুর্বল করে দেয়। এমনকি দীর্ঘতম জীবনও অমরত্বের নিরিখে হ্রস্বতর। মানুষের সম্পদলিপ্সা অনন্ত, অনির্বাণ। তাছাড়া, আপনি অর্থাৎ মৃত্যু যখন সামনে উপস্থিত হন তখন কী ধনসম্পদ সঙ্গে রাখা যায়? আমরা মরণশীল মানুষেরা কী করেই বা অমরত্ব পাব আপনার অর্থাৎ মৃত্যুর  রাজত্বে? নশ্বর পৃথিবীতে কোন মরণশীল মানুষই বা দীর্ঘজীবন উপভোগ করতে পারে যদি আপনার মতো অমোঘ অবিনশ্বর মৃত্যু স্বয়ং তাকে সৌন্দর্য আর ইন্দ্রিয়সুখের স্বরূপ বোঝান? হে মৃত্যুদেবতা, যা নিয়ে অপার সন্দেহ সেই পরকালের কথাই আপনি আমাকে বলুন।”

নচিকেতা অপ্রকাশিত সত্যকে জানার বর ছাড়া অন্য কোনো বর চাইলেনই না। যম তখন বললেন, “শুভ এক জিনিস, আর সহনীয় আরেক। এই দুটির ভিন্ন ভিন্ন পরিণতিই জীবনকে জড়িয়ে থাকে। যে শুভর সঙ্গে থাকে তার কল্যাণ হয়। আর যে সহনীয়কে আঁকড়ে ধরে সে জীবনের সত্য থেকে বঞ্চিত হয়। জীবনে শুভ আর সহনীয় উপস্থিত হলে প্রাজ্ঞজনে দুটোকেই পরীক্ষা করে দেখেন, একটার সাথে অন্যটার তফাৎ করতে পারেন। আর শুভকেই বেছে নেন, সহনীয়কে নয়। কিন্তু নির্বোধে শরীরের আরামকে গুরুত্ব দেয় আর সহনীয় যা তাই বেছে নেয়। নচিকেতা প্রজ্ঞার বিকিরণে তুমি সহনীয় সব কিছুকে অস্বীকার করেছ। যে সম্পদের জন্য মরমানব প্রাণ দিতে পারে তুমি তা হেলায় পরিহার করেছ। অজ্ঞানতা আর প্রজ্ঞা দুয়ের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য, দুটি চালিত হয় পরস্পরের বিপরীত দিকে। নচিকেতা, আমি বিশ্বাস করি তুমি প্রজ্ঞার সাধক কারণ বহু প্রলোভনেও তুমি জ্ঞানের পথ থেকে চ্যুত হও নি। নির্বোধে অজ্ঞানতার অন্ধকারে বাস করে যদি নিজেকে জ্ঞানী আর শিক্ষিত মনে করে তবে তারা জীবনের জটিল চক্রে ঘুরতেই থাকে অনবরত, যেমন ঘটে এক অন্ধ আরেক অন্ধকে পথ দেখালে। চিন্তাশক্তিহীন অজ্ঞানের কাছে কখনও পরকালের সত্য উন্মোচিত হয় না। সম্পদের মোহ মায়ায় ভুলে ‘এটাই জীবনের মোক্ষ’ ভেবে সে নিরন্তর ঘুরে মরে আমার অর্থাৎ মৃত্যুর শাসনে। কেউ যার কথা প্রায় শুনতেই পায় না, কিংবা শুনতে পেলেও বুঝতে পারে না, ভাবে সেই বুঝি চমৎকার শিক্ষক, আসলে সেই চমৎকার যে উপযুক্ত শিক্ষক জ্ঞান দিলে জ্ঞানার্জন করতে সক্ষম হয়। যেমন স্বল্পবোধ সম্পন্ন কেউ যতই চিন্তা করুন না কেন আত্মার যথাযথ স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে পারেন না। কেবলমাত্র আত্মার অন্তর্লীন নিগূঢ়তার জন্যই জ্ঞানী কারুর সঙ্গ ছাড়া আত্মাকে জানা অসম্ভব। তর্কের দ্বারা একে জানা যায় না। একে কেবলমাত্র জানা যায় যদি কোনো প্রকৃত জ্ঞানী এর ব্যাখ্যা করেন। নচিকেতা, তুমি সেই আত্মাকে সম্যক বুঝেছ। তাই তুমি সত্যে অবিচল। তোমার মতো প্রশ্নকারী দুর্লভ।”

নচিকেতা বললেন, “পার্থিব ধন যে নশ্বর তা আমি জানি কারন নশ্বর মানুষ কখনই অবিনশ্বর কিছু পেতে পারে না। তাই নশ্বর উপচারে উৎসর্গে নচিকেতা যজ্ঞ করেও আমি মরণশীল, নশ্বরই থেকে গেছি।”

…… চলবে

 আগের পর্ব ও জয়ঢাকের সমস্ত পুরাণের গল্প এই পাতায়