পুরাণ কথা

নচিকেতা ও সত্য

সংহিতা

আগের পর্ব

পর্ব ৪

puran55 (Medium)

নচিকেতার মনের কথা জানতে পেরে যম প্রসন্ন হলেন। সে কথা প্রকাশও করলেন সোচ্চারে, “নচিকেতা, তুমি কামনার নিবৃত্তি দেখলে, দেখলে  যাবতীয় রীতি মেনে যজ্ঞ করলে কী অসীমপ্রসারী ফলাফল পাওয়া যায়, পাওয়া যায় দীর্ঘায়ু, দীর্ঘযৌবন, অকল্পনীয় সুখ, সমৃদ্ধি, মনোরঞ্জন; জানলে যে এতে সমস্ত ইচ্ছে পূরণ হয়ে যায়।যেখানে ভয়ের কোনো ঠাঁই নেই,  তুমি সেই পরপারের কথাও জানলে। এইসব কী এবং কেমন তা জেনে ফেলাটা প্রশংসনীয়, মহৎ এবং সমর্থনযোগ্য। তবুও যথার্থ জ্ঞানী বলেই তুমি এই যা কিছু অর্জন করলে তার সবই পরিত্যাগ করলে। যে জ্ঞানী নিজের অন্তরের গভীরে ডুব দিয়ে নিজেকে জানার, নিজেকে চেনার চেষ্টা করেন এবং সেই অধ্যবসায়ে জেনে নেন নিজের হৃদয়ের গভীরতম কোটরে থাকা, নিজের অস্তিত্বের গহনে থাকা দুর্জ্ঞেয় প্রাচীন স্বত্ত্বাকে এবং সেই স্বত্ত্বাকেই সৃষ্টিকর্তা বলে চিনে নেন তিনি জাগতিক সুখ-দুঃখের শেকলে বাঁধা পড়েন না আর। যে মরণশীল ব্যক্তি জ্ঞানীর এই বিবরণ শোনে আর বোঝে, সে নিশ্চয়ই নিজের অস্পষ্ট স্বত্ত্বাটিকেও টের পায়। সেই টের পাওয়াতেই তার পরমানন্দ। কারণ নিজের অন্তরের গহীনে, অজানা অচেনা নিজের মধ্যে জগৎস্রষ্টার বসতটি চিনে নিতে পারাতেই তার সকল আনন্দের উৎস। তাই আমার বিচারে সত্যের প্রাসাদের সিংদরজা তোমার জন্য খোলা, নচিকেতা।”

উত্তর নচিকেতা আরও স্পষ্ট করে জানালেন তাঁর অতৃপ্ত কৌতহলের আরও খানিকটা। তিনি বললেন, “তাহলে আপনি যে দোষ-গুণের বাইরে, কার্য-কারণের বাইরে, অতীত-ভবিষ্যতের বাইরে দেখতে পান, সেটা কী বা কেমন তা আমাকে বোঝান।”

যম বললেন, “চতুর্বেদে মহিমান্বিত, সব তপস্যায় কাঙ্খিত, সমস্ত ব্রহ্মচারীর অভীষ্ট হলো ওঁ। এই শব্দই ব্রহ্ম। এই শব্দই মহত্তম। যে এই শব্দের সন্ধান পায় সে যা চায় তাই পায়। এই শব্দই সর্বোত্তম আশ্রয়, যে এই আশ্রয়ের সন্ধান জানে সেই ব্রহ্মাণ্ডে শ্রেষ্ঠতম। এই শ্রেষ্ঠতম স্বত্ত্বার জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। এর কোনো উৎস নেই, এ কিছুর উৎস নয়। এই সুপ্রাচীন স্বত্ত্বাটি অজাত, শাশ্বত, অবিনশ্বর। দেহ নিহত হলেও একে হত্যা করা যায় না। যে হন্তা ভাবে একে হত্যা করেছে, যে হত মনে করে যে তার অন্তর্লীন স্বত্ত্বাটি নিহত হয়েছে তারা কিছুই জানে না। কারণ এই স্বত্ত্বা হত্যা করে না, হত হয় না। এই অস্তিত্ব মহতের চেয়ে মহত্তর, অস্পষ্টের থেকেও অস্পষ্টতর। এর অধিষ্ঠান প্রত্যেক জীবের অন্তরে। দুঃখ আর কামনা নেই যার, যার মন আর ইন্দ্রিয় শান্ত সে-ই দেখতে পায় আত্মার মহিমা। বসে বসেও এই অস্তিত্বের গমন বহুদূর, শুয়ে শুয়েও এ সর্বত্রগামী। আমি ছাড়া আর কে-ই বা এই ঈশ্বরের কথা জানে? কে-ই বা একইসাথে নিরানন্দ ও পরমানন্দ? যে মহাজ্ঞানী বুঝতে পারেন যে শরীরের গমন ও ব্যপ্তি সীমিত হলেও, সর্বব্যাপী, মহৎ ও নিরাকার আত্মা নশ্বর শরীরেই বাস করে, তিনি কখনওই দুঃখ পান না। বুদ্ধিদীপ্ত ধারণার সাহায্যে কিংবা পুঁথিপাঠ করে কিংবা বারবার এর নাম শুনে এই অস্তিত্বকে অধিগত করা যায় না। এই অস্তিত্ব, যাঁকে আত্মা বলি, তিনি যাঁকে বেছে নেন কেবলমাত্র তিনিই আত্মার দর্শন পান। কেবল তাঁর কাছেই আত্মা স্বরূপ প্রকাশ করেন। যে অসদুপায় অবলম্বন করে, যার ইন্দ্রিয়বৃত্তি অসংযত, যে শান্ত নয়, যার মনে শান্তি নেই,  তার কাছে জ্ঞানের দ্বারাও আত্মার উন্মোচন হয় না। তাহলে কে-ই বা জানে কোথায় এই অদ্ভুত অস্তিত্বের বাস, সেই অস্তিত্ব যার ভোগ ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয়, মৃত্যু যার সৌরভ?

চলবে