প্রতিযোগিতার গল্প তৃতীয় স্থান-কাছে থেকে দূর রচিল অনিরুদ্ধ সেন শরৎ ২০১৭

জয়ঢাক গল্প প্রতিযোগিতা ২০১৬

“বল তো তাতু, বাংলায় প্রথম ভিনগ্রহ যাত্রার সাই-ফি কে লিখেছেন?”

ডিনারের পর ড্রইংরুমে বসে তাতিয়ানা আর তার দাদা তন্ময়ের কথা হচ্ছিল, সামনে টিভিতে খোলা একটা সাই-ফি থ্রিলার। সেখানে দেখাচ্ছে, কিছু মহাকাশযাত্রী ভিনগ্রহে গিয়ে প্রাণের সন্ধান পেয়ে ফুর্তিতে ডগোমগো হয়ে আধা গাছ, আধা জন্তু এক প্রাণীকে মহাকাশযানে তুলে শেষে দেখে ওটা মানুষখেকো! কী করে তারা এই বিপদ থেকে রক্ষা পাবে বোঝার আগেই অ্যাড ব্রেক আর তখন তন্ময়ের এই প্রশ্ন।

“তুই মনে হয় উত্তরটা জানার জন্য নয়, জানানোর জন্য প্রশ্নটা করছিস? তা বেশ, বলেই ফেল।”

তাতিয়ানার কথায় অপ্রস্তুত তন্ময় বলল, “মানে, আমার অন্তত মনে হয় প্রেমেন্দ্র মিত্র। ঘনাদার গুলগল্প ‘ফুটো’তে তিনি মহাশূন্যে এক ফুটোর মধ্য দিয়ে ঝট করে মঙ্গলগ্রহে যাবার কথা লিখেছিলেন। ভাবতে পারিস, আজ থেকে ষাট বছরের বেশি আগে লেখা! ‘ওয়ার্ম হোল’-এর ধারণা তখন বলতে গেলে আনকোরা। ও, ‘ওয়ার্ম হোল’ ব্যাপারটা জানিস তো?”

“একটু আধটু জানি। মানে, মহাশূন্যের মধ্য দিয়ে পোকায় কাটা গর্তের মতো কিন্তু অদৃশ্য একটা টিউব, যার ভেতরে সময়ের সংজ্ঞা হয়তো বাইরের চেয়ে অন্যরকম। তাই তার মধ্য দিয়ে যাত্রা করলে বাইরের থেকে তাড়াতাড়ি উল্টো দিকে পৌঁছনো যেতে পারে। কিন্তু ওয়ার্ম হোল তো এখনও প্রায় কল্পনায়। আর যদি তা খুঁজে পাওয়া যায় বা বানানোও যায়, সেটা এত অনিশ্চিত আর ক্ষণস্থায়ী হবে যে বাস্তবে তার –”

“জানি, জানি।” বাধা দিয়ে তন্ময় বলল, “সেইজন্যেই তো উনি ওটাকে গুল্প হিসেবে লিখেছেন।”

“হ্যাঁ, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘ঘনাদা’র আরও অনেক কাহিনিতেই গাঁজাখুরি গল্পের ছলে বিজ্ঞানের ছোঁয়া আছে। কিন্তু আমার মনে হয়, তার আগেই আর এক বাঙালি সাহিত্যিক স্পেস-টাইম ট্র্যাভেলের কথা লিখে গেছেন। লেখককে এলিয়েনরা হঠাৎ একদিন তাদের দেশে নিয়ে গেল। স্বপ্নের মতো সেই তারার রাজ্যে শুধু আলো, কোনও অন্ধকার নেই, দুঃখ নেই। সেখানে কিছুদিন কাটাবার পর কিন্তু লেখকের ভালো লাগল না, তাঁর মন কাঁদতে লাগল এই সুখেদুঃখে, পাতায়-ফুলে ভরা পৃথিবীটার জন্য। এলিয়েনরা কত বলল – কবি, তুমি এখানেই চিরকাল আনন্দে থাকো, আমাদের কবিতা শোনাও। কিন্তু তিনি সে অনুরোধ রাখতে পারলেন না। শেষ অবধি টাইম ট্র্যাভেল করে ফিরে এলেন এই আলোছায়ায় ভরা পৃথিবীতে।”

ভুরু কুঁচকে তন্ময় বলল, “লেখকটা কে রে? আমি চিনি?”

খিলখিলিয়ে হেসে তাতিয়ানা গান ধরল:

“ওই আলোকমাতাল স্বর্গসভার মহাঙ্গণ

হোথায় ছিল কোন্‌ যুগে মোর নিমন্ত্রণ –

আমার লাগল না মন লাগল না,

তাই কালের সাগর পাড়ি দিয়ে এলেম চলে –

শ্যামল মাটির ধরাতলে।”

তারপর একটু ফিচেল হেসে যোগ করল, “বাকিটা গীতবিতানে দেখে নিস।”

“ফাউল, ফাউল, চিটিং, চিটিং!” তন্ময় হৈ-হৈ করে উঠল, “কবির কল্পনা আবার সাই-ফি হয় নাকি!”

তাতিয়ানা রহস্যময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “ঐ যে ‘কালের সাগর পাড়ি দিয়ে এলেম চলে’, ওখানেই গানটা বিজ্ঞান হয়ে গেছে। তারা-নীহারিকার দূরত্ব যে সময়ের পাখায় না চড়ে পেরনো যায় না সেটা স্রেফ কবির নয়, বিজ্ঞানীর কল্পনা।”

তন্ময় পাল্টা কী যেন একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই অ্যাড শেষ হয়ে আবার ছবি শুরু হয়ে গেল আর ওরা দুজন তার রুদ্ধশ্বাস রহস্যে ডুবে গেল।

রাত হয়ে গেছে। ভাইবোন এবার যে যার ঘরে শুতে চলল। যাওয়ার আগে তাতিয়ানা হঠাৎ বলল, “দাদা, আমার কেমন গা ছমছম করছে।”

“দুর বোকা, সিনেমা দেখে সত্যি ভাবিস কেন!” তন্ময় বোনকে ভরসা দেওয়ার চেষ্টায় বলল। অবশ্য সত্যিই তারও যেন কেমন লাগছিল। সিনেমাটায় দেখিয়েছে মহাকাশযাত্রীর দল শেষ অবধি ঐ কালান্তক ভিনগ্রহীকে অনেক কষ্টে মহাকাশযানের বাইরে ফেলে দিল। কিন্তু তাদের অলক্ষ্যে মহাকাশযানের অভিকর্ষের টানে ‘জিনিস’টা তাদের পেছন পেছন আসতে লাগল আর এখানেই গল্প শেষ!

“তুই কি ভেবেছিস আমার সিনেমা দেখে ভয় করছে?” তাতিয়ানা হেসে বলল, “দাদা, আমি আর বাচ্চা নেই। আসলে ক’দিন ধরে আমার কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে, বিশেষ করে রাত হলে চারদিক শুনশান হয়ে যাওয়ার পর। মনে হয় কে যেন আমার খুব কাছাকাছি আছে, কী বলতে চায়। কিন্তু তাকে আমি দেখতে পাচ্ছি না।”

“ভূ-উ-ত?” তন্ময় ভয় পাওয়ার ভাণ করল।

“দ্যু-ৎ – ওসব কে বিশ্বাস করে! তবে – কিছু একটা ব্যাপার আছে।”

শুতে যাওয়ার আগে তাতিয়ানা তন্ময়কে ভাবিয়ে দিয়ে গেল।

বিছানায় শুয়েও তাতিয়ানার ঘুম আসছিল না। বোধহয় স্নায়ু উত্তেজিত। এইজন্যেই বলে, সুনিদ্রার জন্য শোবার কিছুক্ষণ আগে টিভি বা কম্পিউটারে বসতে নেই। তবে হালকা গান শোনা চলে। ভেবেচিন্তে তাতিয়ানা মিউজিক সিস্টেমে একটা পছন্দের অ্যালবাম লো ভলিউমে লাগিয়ে ভাবনায় তলিয়ে গেল। সে টের পেল, পাশে দাদার ঘরে আলো নিভল। ওদিকে বাবা-মা বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে পড়েছেন। মা সন্ধেবেলা টিভি সিরিয়াল দেখেন, তবে ডিনারের পর আর নয়। বাবা ইদানীং প্রায়ই রাতে শোওয়ার আগে মৃদুস্বরে বেহালা বাজান। ঠিক বেহালাও নয় অবশ্য। বলা যায় তাঁরই উদ্ভাবিত এক আশ্চর্য যন্ত্র, যা বেহালা, সুরবাহার ও জলতরঙ্গের অদ্ভুত মিশ্রণ। আজ তিনিও আর বাজাচ্ছেন না। চারদিকে রাতের নিস্তব্ধতা।

তাতিয়ানার মনে হঠাৎ ফ্ল্যাশব্যাকে ভেসে উঠছে ক’বছর আগেকার তার মোবাইলে আসা অত্যাশ্চর্য মেসেজ ও তার পরবর্তী ঘটনাবলীর কথা। প্রথম মেসেজটা বিভিন্ন প্রাচীন ভাষায় লেখা, যার সারমর্ম “তোমাদের অবস্থান জানাও” আর মেসেজের শেষে একটা চব্বিশ অঙ্কের সংখ্যা। দ্বিতীয় মেসেজটা আপাতদৃষ্টিতে এক তারকাপুঞ্জের রেখাচিত্র। একই মেসেজ বিভিন্ন দেশের আরও কয়েকজনের কাছেও গিয়েছিল। প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন ওগুলো সম্ভবত ধাপ্পা নয়, ভিনগ্রহীদের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা। সুতরাং সেই লাইনে তদন্তের প্রয়োজন আছে। তারপর সেই সূত্রে তাতিয়ানার স্বপ্নের মতো বিদেশযাত্রা। সেখানে আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’ ও আন্তর্জাতিক ভিনগ্রহী সন্ধানী সংস্থা ‘সেটি’র বিজ্ঞানীদের সাথে তার পরিচয়ের দুর্লভ সুযোগ। নানা অমূল্য ভাষণ শুনে ও স্মারক উপহার নিয়ে দেশে ফেরা।

তখন সে স্বভাবতই ফিজিক্স তথা অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের ‘খার’ খেয়ে গিয়েছিল। দাদা তন্ময়েরও ইচ্ছে ছিল, বোন ফিজিক্স অথবা ম্যাথেমেটিকস নিয়ে পড়ুক। কিন্তু তাতিয়ানা একটা ভালো ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সাইন্সে চান্স পেয়ে অনেক ভেবেচিন্তে শেষে ভর্তি হয়ে যায়। অনেকের সাথে কথা বলে, অনেক খোঁজ নিয়ে তার মনে এই ধারণাই দানা বেঁধেছে যে যত ওপরে ওঠা যায়, বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা ততই এক হয়ে ঐ ম্যাথেমেটিকসের মূলস্রোতে মিশে যায়। তার আরও ইচ্ছে আছে শেষ অবধি ‘কোয়ান্টাম কম্পিউটিং’ নিয়ে কাজ করার, যা কম্পিউটারের ক্ষমতাকে অণু-পরমাণুর স্তর অবধি নিয়ে গিয়ে বিশ্বের ক্রমবর্ধমান ‘প্রসেসিং পাওয়ার’-এর খিদে মেটাবে আর এভাবে কম্পিউটার বিজ্ঞান, গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের চূড়ান্ত মেলবন্ধন ঘটাবে। ‘কোয়ান্টাম কম্পিউটিং’ অবশ্য এখনও অনেকটাই তত্ত্বের স্তরে। তবে তাতিয়ানার বিশ্বাস, সে এম-টেক করে বেরোতে বেরোতে এই ফিল্ডে তার রিসার্চ করার উপযুক্ত বিষয়াদি তৈরি হয়ে যাবে।

সে বছর পাঁচেক হয়ে গেল। এই কথাগুলো হঠাৎ আবার তার মনে জেগে উঠেছে সম্প্রতি ঘটনাচক্রে সে একটা আবিস্কার করে ফেলার পর। কম্পিউটারের এক প্রাথমিক পাঠ বাইনারি নাম্বার ও নাম্বার সিস্টেম। এটা পড়ার ব্যাপারে সে দাদার কিছুটা সাহায্য নিয়েছিল, কারণ দাদার ম্যাথসে অগাধ ফান্ডা। শুধু তাই নয়, তার বোঝাবার ধরণও আলাদা। আদ্যিকালের নানা নাম্বার সিস্টেম থেকে আরম্ভ করে ডেসিমাল বা দশমিক পদ্ধতির উদ্ভব অবধি সহজে বর্ণনা করে সে পুরো ব্যাপারটা জলের মতো বুঝিয়ে দিল।

“জানিস তো, এই যে শূন্য বা জিরো, তার আইডিয়াটাও অঙ্কে এত সহজে আসেনি।” বোঝাতে বোঝাতে বলছিল তন্ময়, “নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে শেষে খৃষ্টের জন্মের কয়েকশো বছর পর ভারতের বিজ্ঞানী আর্যভট্ট ও তারপর ব্রহ্মগুপ্ত সংখ্যাহীনতার প্রতীক এই শূন্যকে নাম্বার সিস্টেমে ঠিক জায়গায় প্রতিষ্ঠা করে আধুনিক দশমিক পদ্ধতির ভিত দৃঢ় করেন।”

অবাক হয়ে ভাবতে ভাবতে তাতিয়ানা হঠাৎ বলে উঠেছিল, “দাদা, আমি যে অদ্ভুত এস-এম-এসটা পেয়েছিলাম তার ভাষাটা প্রাচীন ইরানীয় ছিল না?”

“হ্যাঁ, প্রাচীন লিপি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর রাধাকৃষ্ণ তো তাই বলেছিলেন।”

“সেটা কত শতাব্দীর?”

“খৃষ্টপূর্ব তিন-চার বা তারও আগেকার।” তন্ময় একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “কেন, তুই কী বলতে চাইছিস?”

বিজয়ীর হাসি হেসে তাতিয়ানা বলল, “তার মানে তখনও শূন্যভিত্তিক দশমিক পদ্ধতি গড়ে ওঠেনি। তাহলে যে চব্বিশ ডিজিটের সংখ্যাটা এস-এম-এসটায় ছিল, সেটাও আধুনিক দশমিক পদ্ধতিতে নয়, কোনও প্রাচীন পদ্ধতিতে লেখা। আমরা কি সেটা হিসেবে ধরেছিলাম?”

তন্ময় কিছুক্ষণ হাঁ করে থেকে বলল, “এটা তো মাথায় আসেনি। দাঁড়া, আমি প্রফেসর রাধাকৃষ্ণকে ফোন করে কনফার্ম করে নিচ্ছি।”

প্রফেসর কথাটা শুনে উত্তেজিত হয়ে বললেন, “তাই তো, এই বুড়োর পাকা মাথা এটা কী করে মিস করল! আমি তো সংখ্যাগুলোকে ডেসিমাল ডিজিট ধরে নিয়েই সেই অনুযায়ী ইংরেজিতে সেটা লিখে দিয়েছিলাম। তোমার বোনকে অনেক ধন্যবাদ জানিও ভুলটা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। আমি যথাসাধ্য তাড়াতাড়ি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও অঙ্কের ছাত্রের সাহায্যে সংখ্যাটাকে দশমিক পদ্ধতিতে পাল্টে নিয়ে তোমাকে জানাচ্ছি।”

“তোর আশঙ্কাই ঠিক!” তন্ময় সপ্রশংস দৃষ্টিতে বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, “প্রফেসর সত্যিই ব্যাপারটা খেয়াল করেননি। আর তাঁর দেওয়া সংখ্যাটা নিয়েই তো পৃথিবীর বিজ্ঞানীরাও এগিয়েছেন। এমনকি সেই অনুযায়ী মহাকাশে মেসেজ পাঠিয়েছেন।”

তাতিয়ানা অবশ্য চেপে গেল যে সেও তার স্বল্পবুদ্ধিতে ঐ সংখ্যাটাকে ফোন নাম্বার ধরে এস-এম-এসে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। আশা করেছিল কোনও ‘মিরাকল’ হবে, হয়নি। কতগুলি ডিজিট ডায়াল করার পরই ফোনটা ‘ইললিগাল নাম্বার’ বলে অ্যাবর্ট করে দিয়েছিল।

“কেলোটা বুঝেছিস?” তন্ময় ব্যাখ্যা করল, “অন্য কোনও নাম্বার সিস্টেমে লেখা সংখ্যাকে ডিজিট বাই ডিজিট ধরে ডেসিমাল করলে সেটা বিরাট ভুল হবে। যেমন ধর দশমিকের ৮ রোমানে VIII, কিন্তু তুই যদি তার ডিজিটগুলির জায়গায় V মানে ৫ আর I মানে ১ লিখিস তবে সেটা দাঁড়াবে ৫১১১। আবার ধর MC, এখানে M আর Cর মান বসিয়ে লিখলে সংখ্যাটা ১১০০র বদলে দাঁড়াবে ১০০০১০০! অর্থাৎ আদত সংখ্যাটা আমরা যা ধরেছি তার চেয়ে কম ডিজিটের হওয়ার সম্ভাবনা। দেখা যাক প্রফেসর কী বলেন।”

প্রফেসর পরদিনই উত্তর দিয়েছিলেন। আর ভাইবোন অবাক হয়ে দেখেছিল যে দশমিকে পরিণত নতুন সংখ্যাটা আদতে এক বারো ডিজিটের সংখ্যা!

তন্ময় ব্যাপারটা তক্ষুণি তাঁর গুরু প্রফেসর খাসনবীশকে জানিয়ে দিল। তিনিও এই নতুন সূত্র পেয়ে খুব উত্তেজিত। ‘সেটি’র সাথে যোগাযোগ করে ব্যাপারটার পুণর্মূল্যায়ন করার চেষ্টা করবেন বলেও জানালেন।

খাওয়ার টেবিলে তন্ময় তাতিয়ানার এই বুদ্ধিদীপ্ত আবিস্কারের কথা বাবাকে জানিয়েছিল। বাবা এককালে বিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ওদের আশা ছিল, তিনি নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে উৎসাহিত হয়ে কিছু মূল্যবান মন্তব্য করবেন। কিন্তু বাবার আজকাল যেন কী হয়েছে। তিনি সব সময় তাঁর ঐ বাদ্যযন্ত্রের চিন্তাতেই ডুবে থাকেন। ওদের কথা তিনি মন দিয়েই শুনলেন। দায়সারা বাঃ-বেশও বললেন। কিন্তু তারপর আবার ফিরে গেলেন তাঁর নিজস্ব চিন্তার জগতে।

“মানুষ আর মানুষ নেই! চারদিকে হিংসা বেড়েই চলেছে। এর প্রতিকার হওয়া দরকার।” তিনি ব্যথিত কণ্ঠে বললেন।

“বাবা, এর আগে কি হিংসা ছিল না?” তন্ময় যথারীতি তর্ক জুড়ল, “তোমাদের জন্মের কিছু আগেই তো দেশের মানুষকে দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, দেশভাগ, এমনকি বিশ্বযুদ্ধের অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সেই তুলনায় আজ –”

“দ্যাখো।” বাবার ইঙ্গিতে তন্ময় খোলা টিভির পর্দার দিকে তাকাল। সেখানে তখন খবরে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, বোমা বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ এইসবের ছবি দেখাচ্ছে।

“তোমাদের সময় অডিও-ভিজুয়াল ছিল না, এতসব অঘটন ফলাও করে দেখানোর ব্যাপারটাও ছিল না। এখন খবরের চ্যানেলগুলি সব এমন রগরগে করে দেখায় যে মনে হয় পৃথিবীতে শুধু অশান্তিই আছে। ওসব না দেখে বরং –”

“তোমার মা’র পাশে বসে সিরিয়াল দেখব? সেখানেও তো গৃহযুদ্ধ, অশান্তি, পারিবারিক চক্রান্ত, বিষপ্রয়োগ। মানুষ আর মানুষ নেই। লোভ, বিদ্বেষ সবকিছুকে গ্রাস করছে। এর একটা প্রতিকার না করতে পারলে পৃথিবীতে আবার একটা বিশ্বযুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠবে আর এবার সেটা হবে আগের বারের চেয়েও ভয়ঙ্কর।”

তাতিয়ানা জানে বাবাকে বলে কোনও লাভ নেই, তাঁর চিন্তা এখন অন্য খাতে বইছে। তাই সান্ত্বনা দেবার জন্য সে বলল, “তুমি আর কী করবে, বলো। বরং ওসব চিন্তা ছেড়ে ভালো গান শোনো, মনে শান্তি পাবে।”

“গান নয়, যন্ত্রসঙ্গীত। মিউজিক।” আবিষ্টমনে বললেন বাবা, “জানিস, ছোটোবেলা গ্রিক পুরাণের গল্পে পড়েছিলাম, বিখ্যাত বাদক এরিয়নের সর্বস্ব লুঠ করে জাহাজের নিষ্ঠুর নাবিকরা তাকে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু এরিয়নের বীণায় মুগ্ধ শুশুকের দল তাকে পিঠে করে নিরাপদে ডাঙায় পৌঁছে দিয়েছিল। তেমন বাজনা হলে তার সুরে মানুষ, পশু সবার মন থেকে হিংসা দূর হয়ে যায়।”

“তুমি কি সত্যিই এটা বিশ্বাস করো?”

“শুধু বিশ্বাস নয়। সত্যি বলছি মা, এখন এটাই আমার সাধনা।” বাবা সস্নেহে তাঁর পাশে রাখা যন্ত্রটা দেখিয়ে বললেন, “নানা যন্ত্রের স্বরের যা যা শুভ, মনোমুগ্ধকর, তা মিলিয়ে আমি এই যন্ত্রটিকে গড়ে তুলছি। তার সাথে বাঁধছি সেই সুর যা মানুষ, পশু সবাই স্তম্ভিত হয়ে শুনবে আর তাদের মন থেকে হিংসাদ্বেষ দূর হয়ে যাবে। তারপর আমি এই যন্ত্র হাজার-হাজার তৈরি করে সারা দেশে, তথা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেব।”

ছেলেমেয়েরা নিঃশব্দে বাবার কথা শোনে। অলীক কল্পনা, তবু বিশ্বাস করতে ভালো লাগে। তারা অবশ্য মুখে কিছু বলে না। মানুষটা জীবনে অনেক লড়াই করেছেন। অনেক আশা বিসর্জন দিয়েছেন সংসারের জন্য। রিটায়ার করার পর থাকুন না একটা স্বপ্ন নিয়ে। খুঁজে চলুন সেই যন্ত্র আর সেই সুর, যা সমস্ত প্রাণীর মন নির্মল করে পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি আনবে!

সত্যিই অবশ্য বাবা যখন যন্ত্রটা বাজান, ওদের মন স্নিগ্ধ হয়ে যায়। বেহালা, এস্রাজ, সুরবাহার, জলতরঙ্গ, আরও কীসের কীসের স্বর মিলে যেন প্রাণের তন্ত্রীতে এক মুগ্ধতার আবেশ এনে সব দুশ্চিন্তা, অস্থিরতাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। হঠাৎ তাতিয়ানার মনে হল, বাবা আজ বাজাননি দেখেই হয়তো তার এখনও ঘুম আসছে না। হয়তো মনের উদ্বেগগুলি, গা ছমছম ভাবটাও সেইজন্যে চেপে বসছে। গত ক’দিন ধরেই এই ঝামেলাটা হচ্ছে।

অবশ্য তার জন্য সম্ভবত দায়ী তারই এক হঠকারী সিদ্ধান্ত। এস-এম-এসের চব্বিশ ডিজিটের সংখ্যাটা যখন বারো ডিজিটের হয়ে গেল, তাতিয়ানার মনে হল এখন এটা একটা ফোন নাম্বার হলেও হতে পারে, নিদেনপক্ষে এরিয়া কোড সহ একটা ল্যান্ডফোন নাম্বার। অনেক ভেবে শেষে ‘লাক ট্রাই’ ঐ নম্বরে একটা মেসেজ ছেড়ে দিল, “Earth calling.”

কী আশ্চর্য, মেসেজটা এবার চলে গেল! অবশ্য কোনও উত্তর আসেনি। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে হলেও তাতিয়ানা যেন তারপর থেকেই হঠাৎ অনুভব করতে শুরু করল যে কে যেন তার খুব কাছ দিয়ে ঘোরাফেরা করছে। আরও কাছে আসতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। তার এস-এম-এসে বাইরের দরজা খুলে গেছে, তাই সেই আগন্তুক ভেতর দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। কিন্তু আর একটা আগল না খুলে গেলে সেই বাধাটা পেরোতে পারছে না। কে জানে, হয়তো দ্বিতীয় এস-এম-এস, অর্থাৎ ঐ তারকাপুঞ্জের চিত্রের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে ঐ দ্বিতীয় দরজার চাবি!

কিন্তু কাকে বলবে এই বিচিত্র অনুভূতির কথা? কে বিশ্বাস করবে?

এবার ঘুম আসছে। আধো ঘুমে আধো জাগায় তার কানে একবার আসছে টিভি সিনেমায় দেখা সেই বিচিত্র জীবটির গান, “আই ওয়ান্ট টু ইট ইয়োর ফেস, আই ওয়ান্ট টু ইট ইয়োর হ্যান্ড!” আবার শুনতে পাচ্ছে ‘নাসা’র বিজ্ঞানী স্টিভেনসন গল্প বলছেন – একজন মানুষ একদিন পাহাড়ি পথে চলতে চলতে পা পিছলে গড়িয়ে খাদের দিকে নেমে গেল। কিন্তু পড়তে পড়তে সে খাদের ঢালে একটা গাছের ডাল ধরে ঝুলে পড়ল আর সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে লাগল, “কেউ আছো কি?” হঠাৎ সে শুনল খাদের তলায় প্রায় পাতালের থেকে ভেসে আসছে এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর, “আছি। হাত ছেড়ে দিয়ে সোজা আমার কাছে চলে আয়।” ভ্যাবাচাকা ভাব কাটিয়ে লোকটি একটু পরে আবার চ্যাঁচাতে লাগল, “অন্য কেউ আছো কি?”

“এই গল্পের থেকে কী বুঝলে?” সবশেষে তাঁর মন্তব্য, “আমরা যদি কখনও অন্য কোনও গ্রহ থেকে ‘কেউ আছো কি?’ সিগন্যালের উত্তর পেয়েও যাই, কে বলতে পারে সেটা পৃথিবীর মঙ্গল না ধ্বংস আনবে?”

তবু একবার যখন ব্যাপারটা মাথায় ঢুকেছে, শেষ না দেখে শান্তি নেই। তাই তাতিয়ানা কাউকে না বলে একাই ঐ দ্বিতীয় মেসেজ অর্থাৎ তারকাপুঞ্জের ছবির রহস্যভেদের চেষ্টায় বসল। তার ভরসা স্রেফ ‘গুগল’। পরদিন ডিনার সারা হবার পর সে ল্যাপটপ টেনে বসল। দাদা পড়ায় ব্যস্ত। বাবাকেও দেখেছে গভীর মনোযোগে তাঁর যন্ত্রটার কীসব সূক্ষ্ণ সংস্কারে ব্যস্ত। মা তো নিশ্চয়ই ঘুমোবার উদ্যোগ করছে। আর তার ঘরে বসে তাতিয়ানা একের পর এক কনস্টেলেশনের চার্ট দেখছে আর তার সেই এস-এম-এসের ছবির সঙ্গে মেলাচ্ছে। মেলাতে মেলাতে সে হঠাৎ সাপের আকৃতির একটা ছবি দেখে অস্ফুট চিৎকার করে উঠল – পেয়েছি, পেয়েছি, অফিউকাস! আর তখনই ধড়মড়িয়ে উঠে বসে দেখে – সামনে ল্যাপটপ খোলা আর সে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে।

কী, কী যেন সে বলছিল স্বপ্নের ভেতর – অফিউকাস! তাড়াতাড়ি উঠে তাতিয়ানা গুগল সার্চ করে বের করল তারকাপুঞ্জটা। আরে, সত্যিই তো এটাকে বলে স্নেক কনস্টেলেশন, যেটা আকৃতিতে এস-এম-এসের ছবির এক অংশেরই মতো! তবে কি মেসেজটা ঐ তারকাপুঞ্জের থেকেই এসেছে? কিন্তু এই বিশাল তারকাপুঞ্জের কোন নক্ষত্র থেকে? মনে পড়ল, ‘সেটি’র বিজ্ঞানীরা বলেন ‘বাইনারি স্টার’-এর পরিবারেই জীবনের সম্ভাবনা বেশি। বাইনারি স্টার বা যুগ্ম নক্ষত্র হচ্ছে দুটি তারা, যারা একই ভরকেন্দ্রের চারপাশে ঘোরে। আবার খুঁজতে খুঁজতে সে পেল – ঐ তারকাপুঞ্জে অফিউকি এক যুগ্ম নক্ষত্র, যাদের গ্রহ আছে বলে কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন। নানা সূত্র ঘেঁটে সে আবার চটপট ঐ বারো ডিজিটের নাম্বারে মেসেজ করল: “Ophiuchi. Constellation Ophichus. From Earth: Right ascension 18h5.5m Declination 2.5o Distance 5.1 Parsec.” এটা জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিভাষায় পৃথিবীর থেকে ঐ নক্ষত্রের অবস্থান। ঐ নক্ষত্রের কোনও গ্রহে যদি বুদ্ধিমান প্রাণী থাকে, তারা ঠিক ‘ব্যাক ক্যালকুলেশন’ করে পৃথিবীর অবস্থান বের করে নেবে।

মেসেজটা চলে গেল! আর তাতিয়ানার বুক দুরদুর করতে লাগল। কিছু ঘটতে পারে এই উত্তেজনার সঙ্গে এক গভীর অস্বস্তি মেশানো অনুভূতি নিয়ে সে শুতে গেল।

কত রাত কে জানে, হঠাৎ বাজ পড়ার শব্দে তাতিয়ানার ঘুম ভেঙে গেল। অকালের ঝড়বৃষ্টি? না তো! তবে কী? ভালো করে বোঝার আগেই ঘরের ভেতর তার চোখের সামনে বাতাসের মধ্যে ফুটে উঠল এক আলোর সুড়ঙ্গ। প্রথমে সেটা দানা বাঁধল। তারপর তার মধ্যে একইভাবে ধীরে ধীরে দেখা দিল এক মূর্তি, যাকে দেখতে প্রায় মানুষের মতো। সে সদাহাস্যময়, তাতিয়ানার দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

“বন্ধু, তুমি তো তাতিয়ানা? আমি মিক।” একটু যান্ত্রিক গলায়, কিন্তু স্পষ্ট ইংরেজিতে লোকটি বলল।

“তুমি কি – এলিয়েন? ওটা কি – ওয়ার্ম হোল?”

“এলিয়েন, ওয়ার্ম হোল?” মিক হেসে বলল, “বলতে পারো, যদিও ব্যাপারটা হুবহু তা নয়। আসলে ঐ আলোর পথটা আমাদের বিশ্ব থেকে তোমাদের বিশ্বে আসার একটা পথ আর অন্য বিশ্ব থেকে এসেছি দেখে আমাকে এলিয়েনও বলতে পারো। কিন্তু আমাদের আর তোমাদের বিশ্ব তো একই জায়গায় অবস্থিত। তাই আমরা তোমাদের প্রতিবেশী আর এটা এক বাড়ি থেকে পাশের বাড়ি যাওয়ার একটা খিড়কি দরজাও বলতে পারো।”

“দ্যুৎ, একই জায়গায় দুটো বিশ্ব থাকতে পারে নাকি!”

“অবশ্যই পারে আর আছেও। কী, বিশ্বাস হচ্ছে না? দাঁড়াও, বুঝিয়ে দিচ্ছি। আচ্ছা বলো তো পদার্থের ক্ষুদ্রতম অংশ কী?”

“বলতে পারো, পরমাণু বা অ্যাটম।”

“সেই অ্যাটমে কী আছে?”

“ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন আরও নানা সাব-অ্যাটমিক পার্টিকল।”

“এবার বলো তো, তারা গোটা অ্যাটমটার কতটা অংশ জুড়ে থাকে?”

“তা, খুব কম অংশ হবে।” তাতিয়ানা একটু থতমত খেয়ে বলল।

“কম বলতে, আয়তন অনুসারে হাজার কোটি ভাগের একভাগেরও কম জায়গায়। অর্থাৎ, এই মহাবিশ্বে যা দেখছ, বেশির ভাগটাই স্রেফ ফাঁকা! তা, সেই ফাঁকার মধ্যে আর একটা কেন, অনেক মহাবিশ্বই গলে যেতে পারে। কিন্তু আমাদের বিজ্ঞানীরা এক প্রতিসাম্য বা ‘সিমেট্রি’র তত্ত্ব আবিস্কার করেছেন, যা বলে প্রতিটি মহাবিশ্বের একটি ‘যমজ’ জুড়ি আছে, যারা উল্টোদিকে ঘোরে। যেমন তোমাদের আর আমাদের মহাবিশ্ব, যারা বলতে গেলে একই স্পেসে উল্টোদিকে ঘুরছে। তোমাদের মতো আমাদেরও সূর্য, পৃথিবী, মানুষ, অন্যান্য প্রাণী আছে।”

“আরে বাঃ, তোমরা যদি আমাদের যমজই হও তাহলে তোমাদের কী বলে ডাকব?”

“সে এক সমস্যা বটে। তা, সুবিধের জন্য আমাদের পৃথিবীকে পরাপৃথিবী, আমাদের পরামানুষ বলতে পারো।”

“আমরা যদি একই স্পেসে থাকি তাহলে পরস্পরকে দেখতে পাই না কেন?”

“কারণ, আমাদের এই দুই মহাবিশ্বের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য রয়েছে এক অদৃশ্য মহাশক্তির দেওয়াল। মহাবিশ্ব দুটির ঘূর্ণনের প্রক্রিয়ায় মাঝে মাঝে এই দেওয়াল দুর্বল হয়ে কিছু সময়ের ‘জানালা’ দেখা দেয়। তখন ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছে শক্তির চাবি লাগাতে পারলে জানালা খুলে বিশ্ব আর পরাবিশ্বের মধ্যে যাতায়াতের পথ খুলে যায়। আমাদের বিজ্ঞানীরা হিসেব করে বের করেছিলেন যে তেমন একটা সময় এখন আসবে। তাই আমরা তোমাদের উদ্দেশ্যে র‍্যানডম মেসেজ পাঠিয়েছিলাম – যদি তার সঙ্কেত উদ্ধার করে কেউ পাল্টা মেসেজ দেয় তবে তোমাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থানটা জেনে কোন সময়ে কোন জায়গায় শক্তির চাবি লাগাতে হবে জানতে পারব বলে। শেষ অবধি তোমার মেসেজ দুটোর থেকে সেই তথ্যটা পেয়ে এই জানালাটা খুলতে পারলাম।”

“কিন্তু আমি তো পৃথিবী থেকে অফিউকির অবস্থান জানিয়েছিলাম? তোমরা তো সেখানকার বাসিন্দা নও।”

মিক একটু হেসে বলল, “আমরা তোমাদের পাশাপাশিই, আবার আকাশে পরস্পরের থেকে প্রায় সতেরো আলোকবর্ষ দূরে। অবাক হচ্ছ? আচ্ছা ধরো, তোমাদের আর আমাদের বাড়ি পাশাপাশি দুই গলিতে। আমাদের পেছনের দেওয়াল লাগোয়া, কিন্তু সামনের দরজার মধ্যে অনেক ফারাক। তাই স্বাভাবিকভাবে এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি অনেক দূর, রাজ্য ঘুরে যেতে হয়। কিন্তু যদি একটা খিড়কি দরজা খোলা যায়? মুহূর্তে এবাড়ি-ওবাড়ি করার শর্টকাটও খুলে যাবে। এখানেও ব্যাপারটা তাই। সোজা পথে আমাদের দূরত্ব সতেরো আলোকবর্ষ। কিন্তু একবার সময়ের জানালা খুলে গেলে আমাদের ফারাকটাও ঘুচে গেল। তুমি তোমাদের সামনের দরজার অবস্থান জানিয়েছ। তার থেকে হিসেব করে আমাদের কম্পিউটার তোমাদের পেছনের দরজার অবস্থানও বলে দিল। ব্যস, খুলে ফেললাম দরজা!”

“পাশের গলির বাড়ির সদর দরজা তো দেখা যায় না। এখানে কিন্তু আমরা আকাশে পরস্পরকে সোজাসুজিই দেখছি – সেটা তবে ঘোরাপথ হল কীভাবে?”

“আসলে এই মহাবিশ্ব তো থালার মতো চ্যাপ্টা নয়, পৃথিবীর মতোই গোল। তাই আমরা যাকে সোজাসুজি দেখছি, সেটা আসলে একটা বক্রতলের ওপরে। কেন, তোমরা স্থান ও কালের বক্রতা পড়োনি?”

“উঃ, আবার সেই আইনস্টাইনের ফান্ডা! রক্ষে করো, ওসব আমার মাথায় ঢোকে না। এবার বলো তো, তোমরা মেসেজ যদি পাঠালেই তো অমন বিদঘুটে প্রাচীন ভাষায় কেন?”

মিক মাথা চুলকে বলল, “ওখানেই তো গণ্ডগোল। ‘খিড়কি দরজা’ দিয়ে তোমাদের সাথে আমাদের এর আগে যোগাযোগ হয় হাজার দুই বছর আগে। তোমাদের একটি জাহাজ ঘটনাচক্রে গভীর সমুদ্রে না জেনে ‘ঠিক সময় ঠিক জায়গায়’ হাজির হয় আর তখন সেখানে এক বজ্রপাত ঘটে। ফলে আকস্মিকভাবে জানালা খুলে আকাশে তৈরি হয় এক আলোর সুড়ঙ্গ। নাবিকরা ভয়ে পেছিয়ে গেলেও এক পরম জ্ঞানী যাত্রী সাহসে ভর করে ঐ পথ দিয়ে পরাপৃথিবীতে চলে আসেন। তাঁর কাছ থেকে যা জেনেছিলাম, তোমাদের ভাষা সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান তদ্দুরই ছিল। তাই ঐ পুরনো ভাষাতেই আমরা সিগন্যাল পাঠিয়েছিলাম, এখন থেকে প্রায় বছর বাইশ আগে। ‘সামনের দরজা’ দিয়ে আমাদের সিগন্যাল যেতে প্রায় ১৭ বছর লাগে, তাই তোমরা সেটা পেয়েছিলে বছর পাঁচেক আগে। সৌভাগ্যক্রমে তোমাদের কিছু যন্ত্র তা ধরতে পারে আর তোমাদের কিছু মানুষ সেই ভাষার মর্মোদ্ধারও করতে পারেন। তবে ইদানীং তোমাদের বিজ্ঞানীরা ভিনগ্রহীদের উদ্দেশ্যে মহাকাশে নানা সঙ্কেত পাঠাচ্ছেন। তোমাদের কৃত্রিম উপগ্রহগুলিও অনেক সঙ্কেত ছড়াচ্ছে। তার কিছু কিছু ধরতে পেরে আমরা তোমাদের সমাজ, প্রযুক্তি ও ইতিহাস সম্বন্ধে অনেকটা ধারণা করতে পেরেছি। আর অন্তত একটা ভাষা, যাকে তোমরা ইংরেজি বলো, অতিকষ্টে শিখেছি।”

“কিন্তু আমার সিগন্যাল যেতে তো সতেরো বছর লাগার কথা। তুমি এত তাড়াতাড়ি এলে কী করে?”

মৃদু হেসে মিক বলল, “ইতিমধ্যে জানালাটা দেখা দিল যে। তোমার সিগন্যাল তাই সেখান দিয়ে সাথে সাথে চলে এল। এবার তোমার মেসেজগুলির থেকে আমরা হিসেব কষে কখন কোথায় শক্তির চাবি লাগাতে হবে বের করে সেই বন্ধ জানালা খুলে ফেললাম।”

“তোমরা তো মনে হচ্ছে আমাদের চেয়ে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে, তাই না?”

“এগিয়ে, তবে অনেক নয়। বলেছি না, আমরা দুই মহাবিশ্ব হচ্ছি ‘যমজ’। তা, যমজ ভাইবোনেদের মধ্যেও তো ফারাক হয়? এও তেমনি। তবে হ্যাঁ, এই মুহূর্তে মনে হয় আমরাই কিছুটা এগিয়ে।”

কিছুক্ষণ চুপচাপ ভেবে নিয়ে তাতিয়ানা খুব সাবধানে বলল, “তা মিক, এত কষ্ট করে জানালা খোলার পর তোমাদের ধান্দাটা কী? এখন কী করতে চাও? তোমরা আমাদের বন্ধু, না দুশমন? মিথ্যে বোলো না, আমি কিন্তু তোমার চোখের দিকে তাকালেই ধরে ফেলব।”

“না, মিথ্যে বলব কেন – তোমাদের কলম্বাস, ম্যাগেলন, মার্কো পোলো, আমুন্ডসেন এদের মতো আমিও একজন অভিযাত্রী। আমার উদ্দেশ্য নতুন দেশ আবিস্কার করা, নতুন বিষয় জানা।”

“খুব ভালো। কিন্তু তুমি এত কষ্ট করে নতুন মহাবিশ্বে এসেছ, তার পেছনে নিশ্চয়ই তোমাদের পরাপৃথিবীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিরাট পৃষ্ঠপোষকতা আছে। সেসব কি শুধু আবিস্কারের আনন্দের জন্য?”

“বাঃ, এই নতুন দেশ আমাদের কোনও উপকারে লাগে কিনা আমরা সেটাও তো নিশ্চয়ই দেখব। কলম্বাস, ম্যাগেলানও কি দেখেননি?”

“দেখেছিলেন। তাঁদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল – পুরনো মহাদেশে সবার স্বচ্ছন্দে থাকার পরিস্থিতি নেই দেখে নতুন মহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন করা। তোমাদের কেসটাও কি তাই? আর তুমি আমার একটা প্রশ্নের এখনও উত্তর দাওনি – তোমরা আমাদের শত্রু, না বন্ধু?”

“দ্যাখো, কী মানুষ কী পরামানুষ, সভ্যতার লক্ষণই হচ্ছে বৃদ্ধি। তোমরাও যেমন একটা সময় কতগুলি জায়গায় আবদ্ধ না থেকে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এইসব নতুন নতুন মহাদেশ আবিস্কার করেছিলে, এখনও যেমন চাঁদে, মঙ্গলে যান পাঠাচ্ছ সেখানে জনবসতি স্থাপন করা যায় কিনা দেখার জন্য, আমরাও তেমন ঐ বেড়ে ওঠার তাগিদেই আমাদের ‘যমজ’ গ্রহের সাথে যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করছি। আর আমরা বন্ধু না শত্রু, সেটা তো অনেকটাই তোমাদের ওপর নির্ভর করবে। আমরা এমন লেনদেন চাই, যাতে দুপক্ষেরই উপকার। যেমন আমাদের ওখানে পরামানুষ কম, যন্ত্র দিয়েই বেশি কাজ হয়। আর তোমাদের এখানে বাড়তি জনসংখ্যা একটা সমস্যা। আবার তোমরা কার্বন দূষণে ভুগছ। কিন্তু কম জীবিত প্রাণী থাকায় আমাদের ওখানে সেটা আর সমস্যা নয়। তাই তোমাদের মানুষ আর ফসিল জ্বালানী নিয়ে আমরা তোমাদের যন্ত্র ও দূষনহীন বিদ্যুতের প্রযুক্তি দিতে পারি।”

“কথাগুলো শোনাচ্ছে ভালো। তবে তার আগে জিগ্যেস করে নিই, তুমিও কি ঐ যন্ত্র, মানে রোবো?”

মিক একটু হেসে বলল, “আমার স্বর শুনে মনে হচ্ছে তো? না, আমি পরামানুষ। তবে ইংরেজি বলার সুবিধের জন্য যন্ত্রের সাহায্য নিচ্ছি, তাই কথা অমন শোনাচ্ছে।”

“আর একটা প্রশ্ন – এই জানালাটা তো মাত্র সামান্য সময়ের জন্য খুলবে। তার মধ্যে এতসব স্থায়ী লেনদেন হবে কী করে?”

“ভালো প্রশ্ন, তোমার মতো বুদ্ধিমান মেয়ের উপযুক্ত। আসলে, আমাদের প্ল্যান হচ্ছে আমরা অগ্রগামীরা এই জানালাটা যতক্ষণ খোলা থাকবে তার মধ্যে এখানে এসে ঘাঁটি গাড়ব। আমাদের পরাপৃথিবীর অগ্রসর সভ্যতা অনুযায়ী এই পৃথিবীর সভ্যতাকে নতুন আদলে গড়বার চেষ্টা করব – ঠিক যেমন তোমাদের গ্রহে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া অভিযাত্রীরা করেছিল। আর তাতে এই পৃথিবীর হাল দ্রুত বদলে যাবে, যেমন হয়েছিল তোমাদের উপনিবেশগুলিতে। তারপর এই জানালার দুই দিক থেকে পরামানুষেরা যোগাযোগ করে এই জানালা খোলাটা প্রকৃতির ওপর ছেড়ে না দিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্যে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে।”

“কিন্তু পৃথিবীর মানুষ যদি তোমাদের ইচ্ছে অনুযায়ী তাদের সভ্যতাকে নতুন করে গড়তে না চায়?”

“সেটা তাদের নির্বুদ্ধিতার পরিচয় হবে আর যারা বিরোধিতা করবে তারাও ঐ আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান বা অস্ট্রেলিয়ার অ্যাবরিজিনদের মতো ইতিহাসে স্থান পাবে।”

হঠাৎ এক শীতল স্রোত তাতিয়ানার বুক দিয়ে বয়ে গেল। সে ফিসফিসিয়ে বলল, “তথাকথিত ‘সভ্য’ মানুষ তো রেড ইন্ডিয়ান, অ্যাবরিজিনদের প্রতিরোধ রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দিয়েছিল! তার মানে তোমরাও আমাদের গ্রহটাকে আর তার মানুষদের গায়ের জোরে দখল করতে চাও! তোমরা – তোমরা আমাদের বন্ধু নও!”

“ভুল বুঝো না। তোমায় তো আমি প্রথমেই বন্ধু বলে ডেকেছি। কারণ আমি জানি তুমি অমন মুর্খ নও। তোমার মতো বুদ্ধিমান তরুণ-তরুণীরাই উন্নয়ন রথের সারথি হয়ে পৃথিবীতে আমাদের প্রকল্পকে রূপ দেবে। তোমাদের আমরা পরাপৃথিবীতেও নিয়ে যাব। সেখানে থেকে উন্নত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি শিখে উন্নত জীবনযাত্রার মান উপভোগ করতে পারবে। তোমাদের কোনও ভয় নেই।”

“কিন্তু আমি তো তা চাই না। আমি যে এই বোকাহাবা, ভালোমন্দ মানুষগুলি, এই গাছপালা, অবোলা প্রাণীগুলিকে নিয়ে যেমন আছি তেমনভাবেই বেঁচে থাকতে চাই!”

“তা যে আর হয় না, মেয়ে।” মিক ক্রুর হাসি হেসে বলল, “এত কষ্ট করে আমি তো ফিরে যাবার জন্য আসিনি। সভ্যতার ধর্মই হচ্ছে প্রসার, বৃদ্ধি, নতুন নতুন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার। তার থেকে তোমাদেরও নিস্তার নেই, আমাদেরও।”

সজল চোখে বলল তাতিয়ানা, “প্লিজ অগ্রদূত – তুমি ফিরে গিয়ে তোমার পরামানুষদের বোঝাও যে অগ্রগতি মানে শুধু বিস্তার আর অন্যের অধিকার হরণ নয়। অগ্রগতি হচ্ছে মনের থেকে হিংসা, দ্বেষ দূর করে মানুষে মানুষে ভালোবাসার সেতু তৈরি করে জীবনকে আরও ভালোভাবে উপভোগ করা। তোমরা যেখানে আছ, সেখানে থেকেই নিজেদের মনকে প্রসারিত করে সুখী হতে চেষ্টা করো।”

“তুমি অনেক গল্প-উপন্যাস পড়েছ – ওসব কল্পনাতেই হয়, বাস্তবে নয়। কী মানুষ কী পরামানুষ, উন্নত প্রাণীমাত্রই হিংসাদ্বেষ নিয়ে ছিল ও থাকবে। কেউ তা দূর করতে পারবে না, বরং তার সঙ্গে বোঝাপড়া করেই সভ্যতা গড়ে উঠবে। আর আমি যদি ফিরে গিয়ে তোমার শান্তি আর প্রেমের বুলি আওড়াই তো ওরা আমাকেই মানসিক সংশোধনাগারে ভরে দেবে। যাই হোক, সময় বয়ে যাচ্ছে। এবার আমার সঙ্গীদের আসতে বলতে হবে।” বলে মিক পেছন ফিরে ইশারা করল আর অন্ধকার ফুঁড়ে রূপ নিতে লাগল একের পর একে ছায়ামূর্তি।

“প্লীজ, আর এগিও না!” তাতিয়ানা হাত বাড়িয়ে তাদের বাধা দিতে গেল। কিন্তু মিক বিষণ্ণভাবে মাথা নেড়ে বলল, “দুঃখিত, তোমাকে আমরা এখনও বন্ধু হিসেবেই পেতে চাই। কিন্তু সাময়িকভাবে –” বলে সে পেছন ফিরে কী যেন ইঙ্গিত করল আর সাথে সাথে এক অদৃশ্য জাল তাতিয়ানার আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গেল। মিক তারপর হাত নেড়ে সঙ্গীদের এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিল।

হঠাৎ দোতলার থেকে জেগে উঠল এক বুক নিংড়ানো সুর – বাবা বাজাচ্ছেন! সাথে সাথে উপস্থিত সমস্ত ছায়ামূর্তি যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। বাবা বাজিয়ে চলেছেন আর পরাপৃথিবীর অতিথিরা নিবিষ্টমনে শুনে যাচ্ছে। আজ বাবাও বাজাচ্ছেন প্রাণ খুলে। সুরের মূর্ছনা ছুঁয়ে যাচ্ছে অন্তরের গভীরতম কোন তন্ত্রী আর জাগিয়ে তুলছে এক অত্যাশ্চর্য বিষাদমধুর অনুভূতি। কতক্ষণ পর কে জানে, বাবা থামলেন আর তাতিয়ানার সম্বিত ফিরল।

কাঁধে এক টোকা, যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। তাতিয়ানা টের পেল, তার চারপাশের সেই অদৃশ্য জাল যেন মন্ত্রবলে উধাও হয়েছে।

“কে? কী বাজাচ্ছিলেন?”

“আমার বাবা। তাঁর আবিস্কৃত এক যন্ত্রে নিজের তৈরি সুর বাজাচ্ছিলেন। বাবার সাধনা, এমন এক বাদ্যযন্ত্র আর এমন এক সুর আবিস্কার করবেন যা শুনলে মানুষের মন থেকে হিংসা, বিদ্বেষ দূর হয়ে যায়।”

তাতিয়ানা দেখল, মিকের মুখের দৃঢ় পেশী অনেক শিথিল হয়ে এসেছে। তার চোখে এক নরম আলো। সে বিহ্বল স্বরে বলল, “উনি সফল। সত্যিই এই সুর শুনলে মানুষ বা পরামানুষ সবার মন থেকে বিদ্বেষ আর জয়ের উদগ্র ইচ্ছা মুছে জেগে ওঠে ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতির ভাব। এই যন্ত্র আমার চাই। এর অজস্র কপি করে আমি পরামানুষদের মধ্যে বিলি করব। তাহলে আমি নিশ্চিত, সবার হৃদয় বদলে যাবে। পৃথিবী অভিযানের আর দরকার হবে না। এই যন্ত্রটা পেলে আমি এখনই ফিরে যাব আর তারপর এই সময়ের জানালা বন্ধ হয়ে যাবে।”

“বেশ, আমি নয় বাবাকে সব বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করব। তবু এই যন্ত্রটা বাবার প্রাণ – উনি ছাড়বেন কী? আর যন্ত্র পেলেই তো হল না, ঐ সুর তুমি কোথায় পাবে?”

“সেটা আমাদের সকলের মগজে রেকর্ড হয়ে গেছে। এবার আমাদের বিজ্ঞানী আর শিল্পীরা এই সুরের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে বের করবেন অনুরূপ আরও সুর ও উপসুর, যা আমরা সারা পরাপৃথিবীতে ছড়িয়ে দেব।”

“এস।” তাতিয়ানা মিককে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল।

বাবা চোখ বুঁজে হেলান-চেয়ারে বসে আছেন, পাশে রাখা তাঁর যন্ত্র। তাতিয়ানা মৃদুস্বরে ডাকল, “বাবা!”

“মা, তুই!” বাবা চোখ মেললেন। তাঁর মুখে এক স্মিত হাসি ফুটে উঠল। তারপর মিককে দেখে অবাক বিস্ময়ে বললেন, “ইনি?”

“তোমাকে পরে সব বুঝিয়ে বলব। সংক্ষেপে বললে, ও এক ভিনগ্রহী। ওরা আমাদের চেয়ে উন্নত আর আমাদের গ্রহে এসেছিল মানুষকে জয় করতে। কিন্তু বাবা – তুমি সফল! তোমার সুর ওর হৃদয় পরিবর্তন করে দিয়েছে। ও এখন অভিযান পরিত্যাগ করে ফিরে যেতে চায়। কিন্তু যাওয়ার আগে ও তোমার যন্ত্রটা চায়। তাহলে এমন আরও অজস্র যন্ত্র তৈরি করে ও ওদের গ্রহের মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে দেবে আর এর সুরে ওদের গ্রহ থেকে হিংসাদ্বেষ দূর হয়ে যাবে। তাহলে ওরা আর পৃথিবী জয়ের অভিযানে বেরোবে না। এতে ওদের আর আমাদের দুই গ্রহেরই মঙ্গল।”

মিক এগিয়ে এল আর বাবার সামনে নতজানু হয়ে বসে বলল, “হে মহামানব, আমরা পরাপৃথিবীর পরামানবেরা আপনার কাছ থেকে এই অলৌকিক যন্ত্র ভিক্ষা করছি। দয়া করে এটি আমাকে দিন।”

“কিন্তু তাহলে আমাদের পৃথিবীর কী হবে?” বাবা ইতস্তত করছেন, “আমি বরং আগে আর একটা তৈরি করে নিই, তারপর এটা নিও।”

“আপনি এমন আর একটা বানাতে অনেক সময় পাবেন, মহান। কিন্তু ততক্ষণে যে আমাদের সময়ের জানালা বন্ধ হয়ে যাবে। দয়া করে এটা দিন –” মিক হাত বাড়িয়ে দিল।

“আমি বৃদ্ধ মানুষ, আমার আয়ু থাকতে থাকতে যদি আর একটা না বানাতে পারি?” বলতে বলতে বাবা অনিশ্চিত হাতে যন্ত্রটা আঁকড়ে ধরলেন। আর এই সময় আগন্তুকের এক ছায়াসঙ্গী তিরবেগে পেছন থেকে এসে বাবার হাত থেকে এক ঝটকায় যন্ত্রটা কেড়ে নিল। তাতিয়ানা দেখল, বাবার শরীর যেন যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল। তারপর তিনি নিস্পন্দ হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।

“কেন এমন করলে, আমার হুকুম ছাড়া?” মিক হিসহিসিয়ে বলল, “আমি এই অভিযানের কম্যান্ডার!” সাথে সাথে সে রিমোটে একটা বোতাম টিপল আর সেই সঙ্গীটি তক্ষুণি অসাড় হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।

মিক এবার তাতিয়ানার সামনে নত হয়ে বলল, “আমি খুব দুঃখিত – কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি এটা চাইনি। এ একটি যন্ত্রমানব, অনুভূতিশূন্য। উনি আমাকে বাধা দিচ্ছেন ভেবে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এক গুরুতর অপরাধ করে ফেলেছে। কিন্তু এই যন্ত্র একবার পরামানুষদের বদলে দিলে আমরা যন্ত্রমানবদেরও বদলে ফেলব।”

“তোমরা – তোমরা আমার বাবাকে কী করেছ?” বাবার নিঃসাড় দেহটার দিকে তাকিয়ে তাতিয়ানা চিৎকার করে উঠল।

“বিশ্বাস করো, ওনার তেমন কোনও ক্ষতি হয়নি। শুধু যন্ত্রমানবের শরীরের সহজাত বিদ্যুৎতরঙ্গের অভিঘাতে উনি মূর্ছিত হয়ে পড়েছেন।”

“বাবার আঘাত গুরুতর, তুমি ওঁকে সারিয়ে দিয়ে যাও।” তাতিয়ানা আর্তনাদ করে উঠল।

“সেটা করা যেত। কিন্তু দুঃখিত, তার জন্য প্রয়োজনীয় সময় আমাদের হাতে নেই। আমাদের এখানে থেকে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু প্ল্যান বদলে আমরা ফিরে যাচ্ছি। সেটা আর ক’মিনিটের মধ্যে না করলে জানালাটা আবার এই জায়গায় ঘুরে আসবে ঘণ্টা বারো পরে। ততক্ষণে আমাদের ওপর থেকে ঐ সুরের প্রভাব কেটে গেলে আমাদের ফিরে যাওয়ার প্ল্যানও চৌপাট আর তোমাদেরও সমূহ সর্বনাশ। তোমার বাবা – চিন্তা কোরো না, একটু সময় লাগলেও এখানকার চিকিৎসাতেই উনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। চললাম।”

হঠাৎ একটা বজ্রপাতের মতো আওয়াজ হল। তানিয়ার চেতনা হারাবার উপক্রম হল। তার অর্ধচেতন চোখের সামনে মূর্তিগুলি একটু একটু করে বাতাসে মিলিয়ে গেল। তার সঙ্গে মিলিয়ে গেল বাবার সাধের বাদ্যযন্ত্রটা।

দীর্ঘদিনের চিকিৎসায় বাবা একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠছেন। কিন্তু সেদিন যে কী হয়েছিল, তা তিনি ঠিক মনে করতে পারেন না। তাতিয়ানা এলোমেলো অনেক কিছু বলে। কিন্তু তা কেউ বিশ্বাস করে না, এমনকি দাদাও নয়। বাবার জোর ইলেকট্রিক শক লেগেছিল। সবার অনুমান তিনি যখন বারান্দায় বসে বাজাচ্ছিলেন তখন কাছেই বাজ পড়ে, তার প্রভাবেই এই দুর্ঘটনা। বাবাকে ঐ অবস্থায় দেখে বুদ্ধিভ্রম হয়ে তাতিয়ানাও প্রায় মূর্ছিত হয়ে পড়ে আর সেই ঘোরের মধ্যেই নিশ্চয়ই ভিনগ্রহীর উদ্ভট স্বপ্ন দেখেছে, এটাই সবার সিদ্ধান্ত। আর বাবার বাজনাটা? ঘটনার পর তাতিয়ানার আর্তনাদ শুনে বাইরের লোকজনও দৌড়ে এসেছিল। সেই সময় তালেগোলে কেউ অতিমূল্যবান ভেবে ওটা হাতিয়ে নিয়েছে বলেই তন্ময়ের ধারণা।

কিন্তু তাতিয়ানা জানে, সে ভুল বলেনি। পরামানুষ সত্যিই এসেছিল আর বাবার বাজনা শুনে হৃদয়ের পরিবর্তনের ফলে পৃথিবী অভিযান ত্যাগ করে যন্ত্রটা নিয়ে ফিরে গেছে – তাদের বিশ্বের থেকে লোভ, বিদ্বেষ দূর করবে বলে। সে শুধু অপেক্ষায় আছে, বাবা কবে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

বাবা সুস্থ হচ্ছেন। ধীরে ধীরে বিভিন্ন নিজস্ব কাজ করতে পারছেন। ডাক্তাররা বলেন, চিকিৎসার মধ্য দিয়ে উনি প্রায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু একটা হাতে আর পুরো জোর পাবেন না। তাই বাজনার প্রকল্পেও আর হাত দিতে পারবেন না।

কথাটা যেদিন শুনল, তাতিয়ানার চোখ জলে ভরে গেল। বাবার শিয়রে বসে বলল, “পরামানুষ ফিরে গেল। কিন্তু তুমি আর ও বাজনা না বানাতে পারলে মানুষের কী হবে? বাইরে থেকে কারও আসার দরকার নেই, মানুষের লোভ, দ্বেষ তো ভেতর থেকেই পৃথিবীটা ধ্বংস করে ফেলবে।”

“কেন, তোরা পারবি না আমার কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে?” বাবা ছেলেমেয়ের মাথায় দু হাত রেখে বললেন, “তোরা নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা পারবি না এমন যন্ত্র আর এমন সুর আবিষ্কার করতে, যা মানুষের হৃদয় থেকে হিংসা দ্বেষ মুছে দেয়?”

“পারব, বাবা। পারতেই হবে।” গভীর প্রত্যয়ে ওরা বাবার হাত মুঠোয় চেপে ধরে।

জয়ঢাক ২০১৬ গল্প প্রতিযোগিতায় পুরস্কারপ্রাপ্ত আরো গল্পঃ

ভিনগ্রহীদের হাতের পুতুল ,  দূর আকাশের দোসর , বন্ধু ,  আথেনিকার আগন্তুক

জয়ঢাকি গল্প-উপন্যাসের লাইব্রেরি এইখানে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s