প্রতিযোগিতার গল্প ভিনগ্রহীদের হাতের পুতুল সুমিত নাগ বসন্ত ২০১৭

জয়ঢাক গল্প প্রতিযোগিতা-২০১৬ চতুর্থ স্থানাধিকারী গল্প

 এ প্রতিযোগিতা হয়েছিল রাজকুমার রায়চৌধুরিমশাইয়ের অসামান্য সাইফি “তাতিয়ানার মোবাইল“-এর একটা উপযুক্ত সিকোয়েল লেখবার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে। সে চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল বেশ কিছু  তাজা কলম। প্রথম ন’টি গল্প পুরস্কৃত হয়েছে বইমেলায় আমাদের অনুষ্ঠানে। প্রথম তিন আসবে পুজো সংখ্যায়। তার পরের বিজয়ীদের মধ্যে চার ও পাঁচ নম্বর বের হল এ সংখ্যাতে। 

golpobhingrohiderhaterputul-medium ।। আবার নতুন মোবাইল ।।

আমি চৈতালীকে বললাম, “এই রে! বাড়িতে বলা হল না যে আজ দেরি করে ফিরব। বাড়িতে চিন্তা করবে তো! তোর ফোনটা দে, বাড়িতে জানিয়ে দি।”

চৈতালী মুখ বেঁকিয়ে বলল, “তোর এই এক…। একটু বেরোবি কলেজ থেকে তাতেও মাকে জানানো, বাবাকে জানানো…।”

“বাজে বকিস না। দে ফোনটা। বাড়িতে ফোন করে জানাতে হবে।”

“কেন? তোর ফোনটা আনিসনি আজ?”

“তুই সব কিছু ভুলে যাস কেন?” আমি রেগে গিয়ে বললাম। গত পরশু কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার সময় মোবাইলটা হাত ফসকে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল। মোবাইলটা আসলে আমার ছিল না। মা কিনেছিল কিন্তু আমিই ব্যবহার করতাম। তা সেদিন বাড়ি ঢোকার মুখেই একটা ফোন এসেছিল আর আমি তাড়াহুড়ো করে ফোনটা ধরতে গিয়ে সেটা হাত থেকে ফেলে দিই। ফোনের স্ক্রিনটা ফেটে গিয়েছিল বিশ্রিভাবে। কিন্তু তাও চলছিল। কিন্তু কাল রাতে দেখি আর কিছুই কাজ হচ্ছে না। অন করাই যাচ্ছে না। ধুমসো কালো মতো হয়ে আছে স্ক্রিনটা। ওকে আমি কলেজে এসেই কথাটা বলেছিলাম। এরই মধ্যে ভুলে গেছে।

চৈতালীকে আমি কথাটা বলতেই ও জিভ কেটে আমায় ফোনটা দিল। আমি মাকে ফোন করে বলে দিলাম যে আজ সিনেমা দেখতে যাব কলেজের পরে। একটু আগে ছুটি কিনা। কিন্তু চৈতালী এ সব বোঝে না। আমার বাড়িতে যে একটু বেশিই চিন্তা করে – বিশেষ করে বাবা, ওকে আমি বোঝাই কী করে!

দাঁড়াও, দাঁড়াও! দেখো, আমায় আবার ভুলে যাওনি তো তোমরা! আমি সেই তাতিয়ানা। যার মোবাইল নিয়ে সেই কত কাণ্ড তোমরা সেবার পড়লে। আমিও এর ফাঁকে বড়ো হয়ে গেছি ঠিক তোমাদেরই মতো। আমি সেই নাসায় বেড়াতে গেলাম, আমার সঙ্গে খাসনবীশ স্যারও গেলেন। তা তিনি তো সেখানেই এখনও। এক বছরের জন্য গিয়েছিলেন, ফিরেও এসেছিলেন, কিন্তু আবার নাসার ডাকে ফিরে গিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। দাদাও এখন গবেষক। টি আই এফ আর–এ রিসার্চ করছে। আমারও তাই ইচ্ছে। গবেষক হব। আর খুঁজে বের করব সেই মোবাইলে ভিনগ্রহীদের সেই মেসেজের রহস্য – আজও যা কেউ ভেদ করতে পারেনি। অবশ্য অনেক বড়ো বিজ্ঞানীরা এই নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছেন তবু আমার মনে হয় এটা আমিই পারব, আমিই একমাত্র, আর কেউ না, আর কেউ না।

সিনেমা দেখে বেরোতে একটু রাত হয়ে গেল। সারা রাস্তা আসতে আসতে সিনেমাটার কথা ভাবছিলাম। ওহ, সিনেমাটা একটা বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে যে নিজের মাথার ভিতর নানা আওয়াজ শুনতে পায়। তার মনে হয় কারা যেন কথা বলছে, কারা যেন তাকে নানা ইঙ্গিত করছে, হাজারো ফিসফিস, হাজারো ঘটনা যেন কারা তাকে বলে চলেছে। ভাবতে ভাবতে আমার মাথার ভিতরেই একেবারে জট পাকিয়ে যাচ্ছিল চিন্তাগুলো। আমার এই হয়। কোনও সিনেমা, গল্প ভালো লাগলে এত বেশি ভাবতে থাকি আর আরও হাজারটা জিনিস নিজে নিজেই কল্পনা করে নিতে থাকি যে মনে হয় গল্পটা আমার নিজেরই, তখন কত কিছু এসে মাথায় চিন্তার জট পাকিয়ে দেয়। তখন আমি কেবল ওই নিয়েই ভাবতে থাকি।

ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেছে। কোনওদিনই এতটা রাত হয় না। এত জ্যাম ছিল রাস্তায়, সেইজন্য আরও দেরি হয়ে গেল। ভাগ্যিস, বাবা বাড়ি ফেরেনি। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। বাবা এখনও আমাকে খুব শাসনে রাখে। এমনকি দাদা বাইরে থাকে, কিন্তু দাদাকেও বাড়িতে এলে ছাড় দেয় না। আমি এখন বড়ো হয়ে বুঝি এটা ঠিক শাসন না, এটা আমাদের জন্য দুশ্চিন্তা। তাই এটা আমাকে কখনও বিরক্ত করে না। তা চৈতালী যাই বলুক এটা নিয়ে। বাড়ি এসে ফ্রেশ হয়েই আমি জৈব রসায়নের বইটা নিয়ে বসে পড়লাম। পরের দিন অনেক পড়া আছে। দাদার কলেজেই আমি এখন পড়ি। দাদার আর মায়েরও ইচ্ছে ছিল আমিও দাদার মতো ফিজিক্স নিয়ে পড়ব। কিন্তু কেমিস্ট্রিটা আমার ইলেভেন থেকেই এত ভালো লেগে গিয়েছিল যে আমি অন্য কিছু নেবার কথা ভাবিইনি। বাবা আমাকে বলেছিল, “তুই যা নিয়ে পড়তে চাস, তাই পড়। আর এতেও তোর রিসার্চের ইচ্ছায় কোনও সমস্যা হবে না।” রিসার্চ মানে অবশ্য সেই ভিনগ্রহীদের বিষয়েই। বিজ্ঞানের যে কোনও বিভাগে পড়েই এখন এইসব মহাকাশসংক্রান্ত গবেষণা করা যায়। তাই আমি একটুও দ্বিধা করিনি কেমিস্ট্রি নিতে কলেজে উঠে।

পড়তে পড়তে শুনতে পেলাম বাবা ডাকছে আমায়। আমার একটু ভয় লাগল। বাবা কি বকবে নাকি আমায় দেরি করে ফেরার জন্য? আমি একটু ভয়ে ভয়েই ও ঘরে গেলাম।

বাবা বলল, “এত দেরি করলি কেন রে? রাত হয়ে গিয়েছিল না?”

আমি একটু কাঁচুমাচু  হয়ে বললাম, “হ্যাঁ, আসলে সিনেমা দেখতে গেছলাম তো।”

“কী সিনেমা রে?”

আমি নামটা বললাম।

বাবার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, “আরে, আমিই তো ভাবছিলাম যে তোকে ওই সিনেমাটা দেখাতে নিয়ে যাব। দারুণ হয়েছে শুনছি। কেমন লাগল?”

আমি শুনেই লাফিয়ে উঠলাম, হড়হড় করে বলতে লাগলাম গল্পটা। মা বাধা দিয়ে বলল, “ওকে যেটা দেবে বলে ডাকলে আগে সেটা দাও তো। পরে গল্প শুনো না হয়।”

আমি শুনে অবাক হয়ে গেলাম। কী দেবে?

বাবা একটা নতুন মোবাইল ফোন বার করে আমার হাতে দিল। বেশ দামী সেট। সুন্দর মডেলটা। আমি অবাক হয়ে তাকাতেই বাবা বলল, “তোর মোবাইলটা খারাপ হয়ে গেছে শুনলাম। তাই এটা আজকেই কিনেছি। ভালো হয়েছে না?”

আমি বাচ্চা বয়েসের মতো বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। বাবা হাসতে হাসতে বলল, “অবশ্য এটা আমি এমনিতেই দিতাম। এবারে ক্লাসে টপ করার প্রাইজ।”

আমি এবার লাজুক মুখে বললাম, “থ্যাঙ্কস, বাবা।”

রাতে শোবার সময় আমার পুরনো সিম দুটো নতুন মোবাইলে ভরে নিলাম। আমার হঠাৎ মনে পড়ল বাবা আমায় সেই একদম প্রথম যে ফোনটা কিনে দিয়েছিল সেটা নিয়ে কত কিছুই না হল! সেই ফোনটা অবশ্য এখন নাসার বিজ্ঞানীদের হেফাজতে। আমার থেকে ওই ফোনটা নিয়ে নেওয়া হয়েছিল, কারণ সেই ফোনে আরও কোনও মেসেজ এলে যাতে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, তক্ষুনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। তবে যতদূর জানি আর কোনও মেসেজ সেই ফোনে আসেনি। এমনকি আমার মতো যে কানাডিয়ান ছেলেটির কাছেও শেষ দিকের ওই মেসেজগুলো এসেছিল, তার কাছেও আসেনি। ডঃ খাসনবীশ তাহলে দাদাকে নিশ্চয় জানাতেন।

ফোনটা চার্জে বসিয়ে অন করলাম আমি। লেখা ফুটে উঠল সবুজ আলো জ্বলে উঠে। আমি দেখলাম লেখা – “ওয়েলকাম ব্যাক, তাতিয়ানা”। আমার ভ্রু কুঁচকে গেল। এ আবার কী সিস্টেম যে নিজে থেকেই এইরকম ভাষা ফুটে ওঠে? আমার নাম ফুটে ওঠে? আর “ওয়েলকাম ব্যাক” মানেই বা কী? আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম। আবার কী নতুন রহস্য শুরু হচ্ছে আমার মোবাইল নিয়ে!

।। অদ্ভুত মেসেজ ।।

সকাল দশটা বেজে গেছে। শেষে ডাকাডাকিতে ক্লান্ত হয়ে আমি রেগেমেগে চৈতালীকে ধাক্কা দিতে লাগলাম। কী ঘুম রে বাবা! আমার বাড়িতে যদি এতক্ষণ ঘুমিয়ে পড়ে থাকি মা বোধহয় গায়ে জলই ঢেলে দেবে। আর একটু ধাক্কাধাক্কি করতে চৈতালী ঘুমজড়ানো চোখে উঠে বসল। বলল, “উফফ, একটা ছুটির দিন আমাকে ঘুমোতে দিবি না নাকি?”

আমি বললাম, “অনেক ঘুমিয়েছিস। ওঠ এখন।”

চৈতালী ব্যাজার মুখে উঠে বাথরুম গেল। আমি ওর বিছানার চাদরটা তুলে দিলাম। নাহলে এটা করতেও ও কাকিমা, মানে ওর মাকে ডাকাডাকি করে সময় নষ্ট করবে। কাকিমা ঘরে এসে বললেন, “যাক, রানি উঠেছেন। নেহাৎ তুই এলি তাই তাতিয়া, নাহলে আরও একঘণ্টা চলত।”

কাকিমা আমার নামটাকে ছোটো করে “তাতিয়া” বলে ডাকে। আমি বললাম, “সে আর বলতে! জানি না নাকি!”

কাকিমা আর কাকু চৈতালীকে কিছুই বলেন না। এত আদরে মানুষ। আর আমি বাড়িতে ফোন করলেই ওর যত আদুরে মনে হয়! আমি বিছানায় বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকলাম। সুন্দর বাগান আছে ওদের বাড়ির সামনেই। ঠিক গোছানো ফুলগাছের না, অনেক বড়ো বড়ো গাছ আছে, পাখির বাসা, সবসময় কিচিরমিচির করে। চৈতালীর ঘরটা তাই আমার খুব প্রিয়।

চৈতালী বাথরুম থেকে চলে এসেছে।

“কী নিয়ে বসবি এখন?”

“আশ্চর্য! কোয়ান্টামের সব কোশ্চেনগুলো আজ সলভ্ করব তো। কালকে টেস্ট আছে না!”

“হুঁ, সেই বাজে চ্যাপটার।”

আমি মুচকি হাসলাম। চৈতালী এমনিতে খুবই ভালো ছাত্রী, কিন্তু একটু কুঁড়ে। আর যে জিনিসটা পড়তে ওর ভালো লাগে না সেটা ওকে দিয়ে পড়ানো খুব কঠিন। কিন্তু তা বলে তো আর টিচাররা সেটা শুনবেন না। আমি বইখাতা খুলে বসলাম। আমরা সেই ছোটো থেকেই একই সঙ্গে, একই স্কুলে, একই ক্লাসে পড়ে এখনও একই কলেজে একই বিষয়ে ভর্তি হয়েছি। মাঝে মাঝে মনে হয়, এবার হয়তো আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে। আর একটা বছর। কারণ আমার ইচ্ছে বাইরে পড়তে যাবার। চৈতালী সেটা চায় বলে মনে হয় না। বাবা-মাকে ছেড়ে যাবার কথা ও ভাবতেই পারে না। গেলেও দু”দিনে ফিরে আসবে।

পড়তে পড়তে আমার নজর আচমকাই ওর সামনের ঘরটার দিকে পড়ল। দরজা দিয়ে সোজা দেখলে একটা ব্যালকনি মতো পেরিয়ে সোজা দেখা যায় সেই ঘর। দেখলাম ওই ঘরের দরজাটা আজকে খোলা। সাধারণত এটা বন্ধ থাকতেই দেখি। ওটা ওর ছোটো কাকার ঘর ছিল। খুব ভালো স্টুডেন্ট ছিলেন শুনেছি। কিন্তু শেষে পাগল হয়ে গেলেন। একদিন সকালে আর বেরোলেন না ঘর থেকে। খুলে দেখা গেল, গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। সেই থেকে বন্ধই থাকে ঘরটা। চৈতালীর বাবা ছোটোভাই-অন্ত প্রাণ ছিলেন। মারা যাবার পরে ওই ঘরের একটা জিনিসও ফেলেননি আর ঘরটাও ওভাবেই রেখে দিয়েছেন। মাঝে মাঝে পরিষ্কার করতে দেখেছি অবশ্য। আমি চৈতালীকে জিজ্ঞেস করলাম, “তোর কাকার ঘরটা আবার পরিষ্কার হবে বুঝি?”

“নাহ রে, ঘরটা আবার রেনোভেশান করা হবে। রঙ করানো হবে। এতদিন হয়ে গেছে। ঘরটা ওইভাবে থেকে থেকে একেবারে খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তাই শেষ অবধি ঘরের জিনিসপত্রগুলো দেখে-টেখে নিয়ে, কাকার স্মৃতির যা কিছু আছে রেখে দিয়ে, বাকি ফেলে দেওয়া হবে।”

“তোর বাবা তো “না” বলেছিলেন প্রথমে।”

“হ্যাঁ, কিন্তু ক”দিন আর এভাবে ফেলে রাখা যাবে, বল?”

“তা ঠিক।”

আমি আবার পড়ায় মন দিলাম। জিনিসগুলো ফেলে দেওয়া হবে জেনে মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল। একজন মানুষ যিনি আজ আর নেই তার কত প্রিয় জিনিস তো থাকতেই পারে যেগুলো অন্যের কাছে তেমন দরকারি না। সেগুলোও কি ফেলে দেওয়া হবে? ওর কাকা খুব ভালো কবিতা লিখতেন, খুব ভালো ছাত্রও ছিলেন, অনেক বিষয়ে বিশাল জ্ঞান ছিল তাঁর। সেগুলো চৈতালীর মুখেই অনেকবার শুনেছি। সেই খাতাগুলো, লেখাগুলো যদি ফেলে দেওয়া হয়, কেমন লাগবে? অবশ্য, চৈতালীর বাবা নিশ্চয় ভাইয়ের প্রিয় জিনিস ফেলতে দেবেন না। তবুও আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। কে জানে কেন! কবিতা আমারও খুব প্রিয় জিনিস। তাই কি?

সেদিন দুপুরে ওর বাড়িতেই থেকে গেলাম। একেবারে সন্ধের দিকে যখন ফিরব, একবার উঁকি মেরে দেখলাম ওই ঘরটা। এখনও জিনিসগুলো বার করা হয়নি, তেমনই অগোছালো হয়ে পড়ে আছে যেমন ওর কাকা মারা যাবার সময় ছিল। আমি দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ঘরটা দেখছি, চৈতালী ওর ঘর থেকে বেরিয়ে কীসব বলতে বলতে আসছে, ঠিক এমন সময় আমার জিনসের পকেটে মোবাইলটা বেজে উঠল। মেসেজ এসেছে। আমি বার করে দেখতে গিয়েই অবাক হয়ে গেলাম। ওখানে লেখা, “ওয়েলকাম ব্যাক, তীর্থ”। তীর্থ? কে তীর্থ? আমি অবাক হয়ে গেলাম।

।। সর্বনাশের সংকেত ।।

মোবাইলটা পাবার পর থেকে বেশ কিছুদিন কেটে গিয়েছিল। সেই যে প্রথমদিন রাতে “ওয়েলকাম ব্যাক, তাতিয়ানা” ফোনটা খুলতেই স্ক্রিনের ওপর ফুটে উঠেছিল, সেটার পরে আর কোনও কিছু ঘটেনি। আমিও ব্যাপারটাকে নতুন ফোনের একটা কারসাজি বলেই মনে করেছিলাম। কিন্তু আজকে এই মেসেজটা পেয়ে আমার মনে হল ব্যাপারটা এত সোজা না। বিশেষ করে যখন অদ্ভুত ঘটনা আমার সঙ্গে আগেও ঘটেছে। তাই এত সহজে ঝেড়ে ফেলতে পারলাম না। মেসেজটা খুঁটিয়ে দেখলাম। নাহ, এই মেসেজটুকু ছাড়া আর কোনও কিছু নেই। এমনকি নম্বরের জায়গাটা ফাঁকা। মানে এটা কোন নম্বর থেকে এসেছে, বা আদৌ কোনও নম্বর থেকে এসেছে কিনা সেটা জানার উপায় নেই। কম্পিউটার বা অন্য কিছু থেকে মেসেজ করলেও কিছু না কিছু একটা নম্বর আসবেই – এটাই নিয়ম।

হঠাৎ একটা ফোন এলো। মোবাইলটা হাতেই ধরা ছিল। তাই ঝট করে রিসিভ করে ফেললাম। বললাম “হ্যালো”। কোনও শব্দ নেই ওপাশ থেকে। আমি আবার “হ্যালো” বললাম। নাহ, এবারেও কিছু হল না। মোবাইলটা এরপর কান থেকে সরিয়ে দেখতে গিয়ে চমকে উঠলাম। মোবাইলে কোনও চিহ্নই নেই যে একটা ফোন এসেছিল। ফোনটা যেমন সাধারণ অবস্থায় থাকে তেমন হয়ে আছে। আমি তাড়াতাড়ি কল লিস্টটা চেক করলাম। আশ্চর্য! ফোনটা যে এসেছিল তার কোনও চিহ্ন এখানেও নেই। মানে সে মিসড কল হোক বা রিসিভড কল, তার কোনও চিহ্ন তো থাকবেই। কিন্তু না, কিছু নেই। আমি হতভম্বের মতো বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। কী হচ্ছে এসব। আমি মনে করতে পারলাম না যখন ফোনটা আমি ধরতে গেলাম তখন কোনও নম্বর আদৌ স্ক্রিনে ফুটে উঠেছিল কিনা। আসলে রিং হতেই আমি ফোনটা ধরে ফেলি। কারণ মোবাইলটা হাতের মুঠোতেই ধরা ছিল। ভালো করে লক্ষ্য করলে কিছু বোঝা যেত হয়তো। কিন্তু সত্যিই কোনও নম্বর ফুটে ওঠেনি নাকি?

আমি আর বেশি কিছু ভাবলাম না। কাল কলেজে টেস্ট আছে। আজকের পড়াটা মাথায় রাখা দরকার সবার আগে। এ.এম. স্যার খুব টাফ কোশ্চেন করেন। আমি আলোটা নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। বেশিক্ষণ লাগেনি ঘুম আসতে। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে মনে হল, কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলছে আমার মাথার মধ্যে। কাদের চিৎকার শুনতে পাচ্ছি, কারা যেন আমায় কিছু বলতে চাইছে। যদিও আওয়াজ হচ্ছে খুব মৃদু ভাবে, এ যেন আমার মাথার মধ্যে, বলা ভালো, আমার অবচেতনে, কান পেতে শুনলে তবেই মৃদু সেই স্বরগুলো শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। আমার ঘুম আচমকাই ভেঙে গেল। আর ঘুমটা ভাঙতেই সব শব্দ বন্ধ হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। আমি উঠে একটু জল খেলাম। কী মনে হতে ফোনটাকে চেক করে নিলাম একবার। নাহ, কিছু না। আর কিছু হয়নি। তখনই আমার মনে পড়ল এটা নিশ্চয় ওই সিনেমাটা দেখার ফল। সেখানেও এই একইরকম ঘটনা ঘটেছিল ওই ছেলেটার সঙ্গে, মাথার ভেতর যে হাজারো আওয়াজ শুনতে পেত। আমি ওটা নিয়ে বেশি ভেবেছিলাম বলেই অবচেতনে স্বপ্ন হিসেবে ফিরে এসেছে। ভাবতেই, মন আর মাথা হালকা হল একটু। আমি আবার শুয়ে পড়লাম। ঘুমে আর কোনও সমস্যা হল না।

পরদিনটা শুরু হল খুব ভালোভাবে। পরীক্ষার হলে খসখস করে লিখছিলাম আমি। হাতের মধ্যে পেনটা এমনভাবে ছুটছিল যেন একটা ঘোড়া আচমকাই ছাড়া পেয়েছে অনেকদিন বন্দি থাকার পর। লিখতে লিখতে আমার একটা ঘোর চলে এসেছিল। মনে হচ্ছিল, আহ্, এত আনন্দ আর কীসে আছে? আমি ঝড়ের মতো সমস্ত প্রশ্নগুলো শেষ করতে লাগলাম। আমার মনে একটা সন্দেহ ছিল যে শেষের দিকের কোশ্চেনগুলো আদৌ পারব কিনা – কিন্তু এখন দেখছি যেই ভাবতে যাচ্ছি, তখনি কে যেন মনের মধ্যে বলে উঠছে কোন প্রশ্নটা কীভাবে উত্তর করতে হবে। এমনকি অঙ্কগুলোও কী সহজে একটুও না ভেবেই প্রায় হয়ে গেল। দারুণ একটা ছন্দে লেখা চলতে লাগল। তখনি হঠাৎ আমার পিছনের বেঞ্চ থেকে একটা খোঁচা খেলাম। আমার তন্ময় ভাবটা ঝট্ করে কেটে গেল। মনটা ভরে গেল বিরক্তিতে। ঘুরে দেখি, সুকান্ত ওর কোশ্চেন পেপারটা তুলে দেখিয়ে, আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর জিজ্ঞেস করছে। বলল, “কী করে করলি দেখা।” আমার মাথায় কেন কে জানে হঠাৎ আগুন চড়ে গেল। আমি বুঝতে পারলাম না ঠিক কী হল, তার আগেই মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, “পড়ে আসিসনি নাকি? না পারলে বসে থাক। ডিস্টার্ব করিস না তো।” দেখলাম সুকান্তর মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কথাটা শুনেই হতভম্ব হয়ে মুখটা নিচু করে নিল ও। আমিও ঘাবড়ে গেলাম। এটা কী বললাম আমি? পরীক্ষা হলে তো এইরকম টুকটাক হয়ই। আর সুকান্ত নিজেই ভালো ছেলে, হয়তো এটা পড়া হয়নি তাই জিজ্ঞেস করেছিল, সে তো আগেও করেছে অনেক আমাকে, আমিও যে করিনি তা না, তাহলে হঠাৎ আমার মুখ থেকে কী বেরিয়ে গেল এটা? আমি তখনই কিছু বলতে পারলাম না আর। ক্লাসে স্যার গার্ড দিচ্ছেন। আমি সামনে ঘুরে ফের লেখা শুরু করলাম। পরীক্ষা শেষ হল ভালোভাবেই। কিন্তু মাথার ভিতর এই ঘটনাটা ঘুরতে লাগল আমার। আমার মনে হল, খুব অন্যায় কাজ করলাম আমি।

golpobhingrohiderhaterputul2-medium

পরীক্ষা শেষে বেরোতেই চৈতালী পিছন থেকে এসে ধরল আমায়। আমাকে জিজ্ঞেস করল, “কত করলি?”

“সবই করেছি। তবে দু’নম্বর ঠিক সিওর না।”

“বলিস কী! এত শক্ত কোশ্চেনে ফুল আনসার করেছিস? সর্বনাশ। আমি তো অর্ধেকই পারিনি।”

কোশ্চেন সত্যি শক্ত ছিল। কিন্তু আমি কী করে পারলাম এত! এটা নয় যে দারুণ ভালো পড়া ছিল। কাল যখন চৈতালীর বাড়িতে বসে প্র্যাকটিস করছিলাম তখনই দেখেছি যে পারছি, তবে শক্ত কোশ্চেন সব করে আসব এটা অসম্ভব ছিল।

পাশে চৈতালী বকবক করে চলেছে। ওর সিট একেবারে অন্যদিকে ছিল, সেখানেও কেউই কিছু পারেনি নাকি, এটা-সেটা, আরও কত কী। কিন্তু আমার মনটা খারাপ হয়েছিল এত ভালো পরীক্ষার পরও। একটা কারণ সুকান্তকে ওটা বলার জন্য। অন্যটা কিছুটা আলাদা। আমার মনে হচ্ছিল সব কোশ্চেন আমি উত্তর করিনি, করেছে আমার ভিতরে থাকা কেউ। সেটা যেন আমি না। কেউ আমাকে পাশ থেকে বসে বসে উত্তরগুলো বলে দিচ্ছিল।

“বাবা বলেছে, কাকার লেখাগুলো তোকে পড়তে দেবে। আমি তোকে বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসব। কী রে শুনলি?”

নাহ, আমি শুনতে পাইনি ভালো করে। যেন আবছা শুনলাম আবছা দেখার মতো। তাই অন্যমনস্কতা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “বল্ বল্।”

“বাবা বলেছে, আমার ছোটোকাকার লেখাগুলো, কবিতা আর অন্যান্য যা কিছু আছে, ঘর থেকে পাওয়া গেছে তোকে পড়তে দেবে। তুই পড়ে বলিস কোনটা কেমন। সেগুলো তাহলে বাবা চেষ্টা করবে পাবলিশ্ করা যায় কিনা।”

“আমি কী বুঝি এসবের?” আমি অবাক হয়ে বললাম।

“বুঝিস না বলিস না। কত গল্প, কবিতা, গুচ্ছের বই পড়িস সেটা আমিও জানি আর আমার বাড়িতেও জানে। তাই বাবা ঠিক করেছে ওগুলো তোকে দিলে, তুই দেখে বলতে পারবি লেখাগুলো কেমন। তারপর বাবার ইচ্ছে ভালো ভালো লেখাগুলো যদি বই হিসেবে বের করা যায়। ছোটোকাকা বেঁচে থাকতে তো আর হল না।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কেন? তোর কাকা কখনও কিছু পাবলিশ করেনি?”

“করেছে। তবে কোনও বইটই তো নেই। সবই ম্যাগাজিনে। সেগুলো কোথায় কে জানে। আর শেষে যা হল।”

আমরা আমাদের বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে প্রায় গেটের কাছে চলে এসেছিলাম। চৈতালী বলল, “অথচ কত ব্রাইট ফিউচার ছিল বল তো ছোটোকাকার। গ্রাজুয়েশনে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকেও দারুণ রেজাল্ট করেছিল। এছাড়াও ক্রিকেট খেলত এত ভালো, ছবি আঁকত, কবিতা লেখা, তারপর কত পড়াশোনা। বাবা বলে আমরা যা সারা জন্মে পড়ে শেষ করতে পারব না কাকা ওই ক’দিনেই শেষ করেছিল। কিন্তু শেষে কী হল।”

এই কথাগুলো আমি আগেও শুনেছি। যতবার শুনি মনটা খারাপ হয়ে ওঠে। এত সম্ভাবনা নিয়ে মানুষ কী করে শেষ হয়ে যায়? এটা কত দুঃখের তা বোঝানোও যাবে না। উনি আমাদের কলেজেরই ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। শুনেছি কলেজে পড়তে পড়তেই ওর কাকার মধ্যে এই অস্বাভাবিকতা স্পষ্ট ভাবে দেখা যায়। শেষে ভয়ানক হয়ে উঠেছিলেন। মানে উন্মাদনার চূড়ান্ত। কিন্তু চৈতালীর বাবা এত ভালোবাসতেন যে ওঁকে বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা করাতেন, অ্যাসাইলামে দেবার কথা ভাবতেই পারেননি। আমি চৈতালীর বাড়ি গিয়ে যতবার দেখেছি ওঁকে, তেমন কিছু পাগলামি করতে দেখিনি। বরং মাঝে মাঝে জানলায় বসে থাকতে দেখেছি, মনে হত একটা দুঃখী মানুষ চোখে জল নিয়ে বসে আছেন। ওই ঘরের জানালাটা চৈতালীর বাড়ি ঢোকার পথ থেকে দেখা যেত। ওদের সেই বাগানের ঠিক পিছনে।

আমার আচমকা কী মনে হতেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, “চৈতালী তোর কাকার নাম কী ছিল রে? ভুলে গেছি …।”

“তীর্থ মজুমদার।”

শুনেই আমার শরীরের ভিতরটা আচমকাই কেঁপে উঠল। তখনই আমার চোখটা সুকান্তর দিকে পড়ল। গেটের পাশেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেহবুবের সঙ্গে কথা বলছিল ও। আমার চোখে চোখ পড়তেই চোখটা বিরক্তি দেখিয়ে সরিয়ে নিল। আমার বুকের ভিতর একটা অজানা আশঙ্কা কামড়ে ধরল যেন। এসব কী হচ্ছে আমার সঙ্গে?

।। আমি এক অন্য মানুষ ।।

সত্যি কী হচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না। আমার নিজের আবেগের ওপর যেন আমার নিজেরই কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। আচমকা এমনভাবে সেটা বেরিয়ে আসছে যে মনে হচ্ছে সে আমি না, আমি এভাবে কথা বলি না, বলতে চাইও না, এইরকম কিছু করতেও চাই না, কিন্তু করে ফেলছি। সেবার সুকান্তর সঙ্গে ঘটনাটা ঘটার পর থেকে এটা আরও অনেকবার হয়েছে।

সেদিন বাসে তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া বেঁধে গেল কন্ডাকটারের সঙ্গে। সামান্য টিকিট নিয়ে, খুচরো নিয়ে। এমন তো আগেও কতবার হয়েছে যে আমার কাছে খুচরো ছিল না, কন্ডাকটার সেই নিয়ে বিরক্তি দেখিয়েছে, শেষে ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু সেদিন কেন কী জানি ভিতর থেকে একটা রাগ আচমকা উঠে লোকটাকে আঘাত করতে চাইল। নানা কথা শুনিয়ে দিলাম। লোকটাও ছাড়ার পাত্র না। সেই নিয়ে বিশ্রি ঝগড়া। আমি আগে ঝগড়া থেকে শত হাত দূরে থাকতাম। কেউ কোথাও ঝগড়া করলেই ছোটো থেকে আমার বুকের ভেতরে যেন কেমন একটা করে। আমার মা বলত বড্ড ভিতু তুই। এটা ভয় না আসলে, কেমন কষ্ট হত মাথার মধ্যে। মনে হয় সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে মাথার ভেতর। আর সেদিন একটা উৎসাহ পাচ্ছিলাম যেন ভেতর থেকে, সেই ঝগড়া করার সময়। মনে হচ্ছিল লোকটাকে খুব আঘাত করতে পারলে আরও ভালো লাগবে, হয়তো এই মুহূর্তে মেরে ফেলতে পারলেও…।

কলেজেও এই ঘটনা ঘটল। সুকান্ত আর আমার সঙ্গে কথা বলে না। কিন্তু রূপসা, শান্তনু, জয়ব্রত, নার্গিস এদের সঙ্গে আমার যেরকম আলাপ ছিল সেটা হঠাৎ একটা ঘটনায় নষ্ট হয়ে গেল। সেদিন তাড়াতাড়ি করে কলেজ থেকে বেরোতে যাচ্ছি, পরের দিন প্র্যাকটিকাল লেখা বাকি ছিল। ওরা সবাই আড্ডা মারছিল লাইব্রেরির সামনে বসে। শেষ ক্লাসটা করেনি তার মানে, ঠিক লক্ষ্য করিনি। আমি লাইব্রেরির পাশ দিয়েই যাচ্ছিলাম। আমাকে দেখতে পেয়ে রূপসা বলল, “এই তাতিয়ানা, কফিহাউস যাবি। আমরা যাচ্ছি। যাবি তো চল।”

নার্গিস বলল, “হ্যাঁ, তুই গেলে খুব মজা হবে।”

ওর কথাগুলোই খুব আধোআধো, সেই মুহূর্তে আরও বেশি সেরকম লাগল।

জয় কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল, “তোদের মতো ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বসে বসে আড্ডা মারা আর কফি হাউসে গিয়ে ফাঁকিবাজি করার কোনও শখ আমার নেই।” কথাটা শুনেই চমকে উঠল ওরা। আমার দিক থেকে এত রূঢ় আচরণ কেউই কখনও দেখেনি। আমি কথাটা বলে আর দাঁড়ালাম না। হনহন করে বেরিয়ে এসে বাস ধরে নিলাম মোড়টা থেকে। আমার কেন কে জানে একটা আনন্দ হল এই কথাটা বলে। যেমন আগেরবার অনুতপ্ত হয়েছিলাম সুকান্তর ঘটনায়, তেমন আর হল না। আমার মনে হল আমি কোনও অন্যায় করিনি। অনুতপ্ত হবার তো কোনও কারণই নেই। ওরা খারাপ, ফাঁকিবাজ সব, ওদের কাছে পড়াশোনার কী মূল্য আছে! একটা উত্তেজনা হল ভেতরে ভেতরে।

কিছু টুকটাক ব্যাপার আরও ঘটল। কখনও ক্যান্টিনের মালিক চয়নদার সঙ্গে, কখনও বাসে কোনও যাত্রীর সঙ্গে। মানুষের ব্যবহারে যেন বিরক্ত হয়ে উঠছি। মনে হচ্ছে এদের দেখতে না হলে শান্তি হয়। এরা আমার শত্রু।

এইসবের কারণ কি তাহলে এই ফোনগুলো? কেন জানি না আমার আন্দাজ বলছে, বরং বলা ভালো আমি নিশ্চিত যে এদের কোনও সম্পর্ক নিশ্চয় আছে। প্রথমবার ফোন আসার পর থেকে আরও দু”বার ফোন এসেছে। আমি ভালো করে দেখে নিয়েছিলাম যে মোবাইলের স্ক্রিনে কোনও নম্বর ওঠেনি আদৌ। কেবল “কলিং” শব্দটা দেখাচ্ছিল। রিসিভ করার পর দেখলাম কোনও শব্দ আসছে না। আমি “হ্যালো”, “হ্যালো” করলাম। কিন্তু আবার যে কে সেই। কিন্তু একটা অদ্ভুত ঘটনা হচ্ছে, যে কারণে আমি বুঝতে পারছি এগুলো সব সম্পর্কিত। আমার মাথার ভেতর আবার সেই কত কত ফিসফাস, মৃদু চিৎকার, হাসি, কান্না, সব মেশানো কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি, যার কোনও নির্দিষ্ট মানে নেই। মনে হচ্ছে কারা যেন কথা বলছে, আমাকে নির্দেশ করছে কিছু, অথচ কোন ভাষায় তা আমি বুঝতে পারছি না। আমি পরে ভেবে দেখেছি, এই দুটো ফোনই এসেছিল যেদিন ওই বাস কন্ডাক্টার আর বন্ধুদের সঙ্গে ওই ঘটনাগুলো ঘটে। ফোন এলেই আমার মাথায় এই ফিসফিসটা আবার শুরু হয়। আমি আরও ক্রুদ্ধ, রুক্ষ, হিংস্র একপ্রকার জীব হয়ে উঠি।

আজ এ.এম. স্যারের সেই টেস্টের রেজাল্ট বেরোবে। আমরা সবাই ক্লাসে বসেছিলাম। চৈতালী আমার পাশে। কাল ও আমার বাড়ি এসে ওর কাকার লেখার বান্ডিল রেখে গেছে। আমাকে নাকি ওসব পড়ে জানাতে হবে কেমন। দেখেই মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল। আমার কোনও কাজ নেই নাকি? আমি কি তোর মতো গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াই? পড়াশোনা নেই? বলতে বলতে স্যার এলেন। চৈতালী বলল, “গড্, সেভ মি। রক্ষা করো, ভগবান।” স্যার সবার খাতাগুলো দিলেন একে একে। সবাই দেখা যাচ্ছে তিরিশে দশের নিচে। কেবল তন্বী পনেরো পেয়েছে দেখলাম। ওর দিকে তাকাতেই আমার দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকাল। ভাবটা এমন, দেখি এবার তুই কত পাস এই শক্ত কোশ্চেনে। আমার গা একেবারে জ্বলে গেল। মেয়েটা আমাকে যেদিন থেকে ক্লাসে ফার্স্ট হচ্ছি, সেদিন থেকে হিংসে করে আসছে। ভালোভাবে কথা বলে না, ঠেকরে ঠেকরে উত্তর দেয়। ও নাকি স্কুলে পড়ার সময় কোনওদিন সেকেন্ড হয়নি। তাই এত রেলা? আজ আমার ফিরে ওকে হিংসা করতে ইচ্ছে করল।

আমার রোল নম্বর আসতেই আমি খাতা পেলাম। আর তখনই অবাক হয়ে গেলাম। তিরিশে তিরিশ পেয়েছি আমি! স্যার একটা প্রশংসার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন আর ক্লাসে সেটা ঘোষণা করলেন। আর তখনই আমার চোখাচোখি হল তন্বীর সাথে। আমি অবজ্ঞার বাঁকাহাসি দিতেই ও চোখ সরিয়ে নিল। নিশ্চিতভাবে ও বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে এত শক্ত কোশ্চেনে কেউ ফুল মার্কস পেতে পারে। একটা অদ্ভুত অহঙ্কার যেন আমায় পেয়ে বসল। আহ, দেখ আমি কী আর তুই কী!

তবে নম্বরটা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না আমি নিজেও। এটা কী করে সম্ভব হল! যে দু’নম্বর আমি ভুল হবে ভেবেছিলাম সেটা অবধি পুরোপুরি ঠিক। আমি বেঞ্চে স্থির হয়ে বসলাম। আমার মাথার ভেতর অনেক কিছু চলছিল। না, না, না, এটা… এটা হতই। এই ক’দিনে আমার মধ্যে কেবল একটা খারাপ পরিবর্তনই হয়নি, হয়েছে ভালো পরিবর্তনও। হ্যাঁ, আমি আগের থেকে অনেক তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে উঠেছি। আমি শেষ কয়েক সপ্তাহ পড়তে গিয়ে দেখেছি কিছু আটকাচ্ছে না, যা পড়ছি একবার সামান্য প্রচেষ্টায় সবই মুখস্থ হয়ে যাচ্ছে। এমনকি যা কিছু পড়া হয়নি সেগুলো পড়তে গেলেও মনে হচ্ছে যে আমি এগুলোও জানি, পড়েছি কখনও। খাতায় যা লিখেছি সেগুলো যে সবই ঠিক হবে সন্দেহ কী!

কিছুক্ষণ পরে ক্লাস শেষ হয়ে গেল। আমি আর চৈতালী বেরিয়ে আসছিলাম। চৈতালীর অস্তিত্বের কথা এতক্ষণ আমার মনেই ছিল না। মনটা খুশি ছিল, সেইসঙ্গে দ্বিধায় ছিল, চিন্তায় ছিল। চৈতালী অনেকক্ষণ ধরেই বকবক করে যাচ্ছে, সেটা কানেও আসছিল কিন্তু কোনও মনোযোগ দিইনি ওর কথায়। ও মাত্র পাঁচ পেয়েছে। আমি কী আর বলব! শুনছিলাম। এমন সময় ব্যাগের ভেতর মোবাইল বেজে উঠল। আমি সেটা বের করতেই দেখি সেই “অজানা” ফোন এসেছে। আমি সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দোনামোনা করে ফোনটা ধরলাম। আবার সেই ব্যাপার – কোনও শব্দ নেই। কিন্তু হঠাৎ মনে হল, নাহ, নাহ, শব্দ পাচ্ছি। হ্যাঁ, পাচ্ছি, পাচ্ছি, এই প্রথমবার শব্দ পাচ্ছি। ফিসফিস করে কথা বলছে কেউ। ঠিক যেমন শব্দ আমি মাথার ভেতর শুনতে পাই, সেটাই আরও একটু জোরে। আমি গভীর উৎকণ্ঠা আর মনোযোগে শব্দগুলোকে শুনতে চেষ্টা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরে ফোনটা নিজে থেকেই কেটে গেল – ঠিক যেমন হয়। আমি মোবাইলটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখে চৈতালীর দিকে তাকাতেই ও জিজ্ঞেস করল, “কার ফোন?”

আমি সংক্ষেপে বললাম, “রং নাম্বার।”

চৈতালী শুনে আর গুরুত্ব দিল না। ও নিজের পরীক্ষা খারাপ নিয়েই কথা বলে যাচ্ছিল। আমি নিজের মনে চিন্তা করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলাম। আমার মাথার মধ্যে সেই শব্দগুলো আবার শুরু হয়েছে। হঠাৎ আমার মধ্যে একটা বিরক্তি জেগে উঠল। চৈতালী সেই এক কথা এখনও ফেনিয়ে চলেছে। পড়াশোনা না করে দশটা অবধি ঘুমোলে কী করে আমার মতো নম্বর পাবে ও? কথাটা দুম করে ওর মুখের ওপর বলে দিলাম। শুধু তাই না বললাম, “তাতে আর তোর চিন্তা কী? তোর বাবা-মার আদরে আতুপুতু করে বড়ো হয়েছিস, ফেল কর আর পাশই কর, তোর কী এসে যাবে?” কথাটা বলার সময় নিজের ক্রূর মুখটা নিজেই দেখতে পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল ওকে খুব আঘাত করতে পারলে দারুণ মজা হয়, শান্তি হয়। চৈতালী স্তম্ভিত হয়ে গেল প্রথমে, তারপর কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। গলায় কথাটা আটকে গেছে নিশ্চয়। আমি আর দেরি করলাম না। ওকে পিছনে রেখে সিঁড়ি দিয়ে হুড়মুড় করে নামতে লাগলাম। নামতে লাগলাম নিচে।

ওর থেকে দূরে এসে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এত দিনের বন্ধুত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার কোনও চিন্তা হল না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বাস পেয়ে গেলাম। মনটা তাজা লাগছিল। মনে হচ্ছিল, আহ, আমি হারাতে পারি সবাইকে। আমার ওপরে কে আছে? কে তন্বী? আর চৈতালীই বা কে? কাকে, কেন দরকার হবে আমার? আমি একাই থাকতে পারি। আমি একাই সবার থেকে সেরা। নিকুচি করেছে এদের। জানালার পাশের সিটটায় বসতে ঠাণ্ডা হাওয়া চোখে-মুখে এসে লাগল। এতদিন ধরে ভাবছিলাম আর একবার ফোন এলেই আমি দাদাকে জানাব। কারণ এটা নিশ্চয় সেই ভিনগ্রহীদের কোনও ব্যাপার। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার সব দ্বিধা দূর হয়ে গেল। যদি সেই ফোন আসার ফলে, আমার মাথায় কিছু চলার ফলে আমি সবার সেরা হয়ে উঠি, সবাইকে হারাতে পারি, কেন আমি সেটা কাউকে জানিয়ে নষ্ট করব? কেন এই সুযোগ ছেড়ে দেব? আমার মন খুশিতে হাসতে লাগল। আমার মনে হল সারা পৃথিবী আমার হাতের মুঠোয়, আজকে না হলেও, কাল চলে আসবে ঠিকই।

।। প্রোফেসরের বক্তব্য ।।

ঘরটা বেশ ঠাণ্ডা। পুরনো দিনের কিছুটা স্যাঁতস্যাঁতে ঘর। আমি একটা চেয়ারের ওপর বসে বসে ঘরের অসংখ্য বইগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম। এত বই! শুধু ইংরেজি সাহিত্য না, আরও অনেক বিষয়ের বইও আছে দেখছি। আমি বিহ্বল হয়ে দেখছিলাম। মনের ভেতর একটা লোভ হচ্ছিল যদি এগুলো পাওয়া যায়। মনে হচ্ছিল যদি এগুলোকে লুঠ করে নিতে পারি তো ভালো হয়। কথাটা মনে আসতেই আমি জোর করে ভাবনাটা মাথা থেকে সরাতে চাইলাম। নাহ, আবার ভুল হচ্ছে আমার। ভাবতে ভাবতেই দরজার সামনে একটা ছায়া দেখা গেল। একজন বৃদ্ধ মানুষ এসে ঢুকলেন। আমি তাঁকে সম্মান জানিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। তিনি স্মিত হেসে আমাকে বসতে বললেন। এতদিন অধ্যাপনা করার পরে ক্লাসে ঢুকে ছাত্রছাত্রীদের অভিবাদনের এই নিয়মটা তাঁর নিশ্চয় অভ্যাস হয়ে গেছে। তাই ব্যাপারটা ক্লাসের মধ্যে যেমন ভাবে ঘটে, ঠিক তেমন মনে হল আমার।

প্রোফেসর বাগচীকে আমি আগে কোনওদিন দেখিনি। সেইবার দাদা আর প্রোফেসর খাসনবীশ তাঁর কাছে এসেছিলেন মেসেজের অর্থ উদ্ধারের জন্য কিন্তু আমি আসিনি। তিনি এই কয়েক বছরে রিটায়ার করেছেন। একটু বেশিই বয়স্ক লাগছে। অন্তত যে বয়েসটা আমি আন্দাজ করে এসেছিলাম তার তুলনায়। সমস্ত চুল পাকা, একটু কুঁজো হয়ে হাঁটেন। তবে চোখের প্রখর ঔজ্জ্বল্য মোটা ফ্রেমের চশমার মধ্যে দিয়েও বোঝা যায়।

আমি নিজের পরিচয় দিলাম। তিনি আমার দাদা আর প্রোফেসর খাসনবীশের খবর জিজ্ঞেস করলেন। টুকটাক কথা হবার পর আমি যে আসল প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করব বলে এসেছি সেটা বললাম। আমার এখন জানার খুব প্রয়োজন চৈতালীর কাকার সম্পর্কে। প্রোফেসর বাগচী নিশ্চয় তাঁর ক্লাসের সেই ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রকে মনে রেখেছেন। নাকি আমার এই আসা ব্যর্থ হবে? আমি আমাদের কলেজের ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে খোঁজ নিতে পারতাম, কিন্তু আমার মনে হল দাদা আমার সূত্রেই যার সাথে যোগাযোগ করেছিল তাঁর সঙ্গে কথা বলে যদি কিছু জানতে পারি তো ভালো হয়। তিনি আমার অবস্থাটা আরও ভালো বুঝবেন। আমার কিছু সন্দেহ নিরসন করতে হবে। আমি প্রোফেসর বাগচীকে চৈতালীর কাকার নাম আর ব্যাচের ইয়ার উল্লেখ করে তাঁর কথা জিজ্ঞেস করলাম। প্রোফেসর প্রশ্নটা শুনে কিছুক্ষণ স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। মনে হল, তাঁর ভ্রু কুঁচকে গেল। তিনি কি মনে করতে পারছেন? তাঁর এত ছাত্রের মধ্যে?

উফ, কত দ্রুত বয়ে চলেছে এই সময়। আমার মনে হচ্ছে একেকটা দিন একেকটা ঘটনার শুরু। চৈতালীর সঙ্গে আমার আর কথা হয়নি। ও তারপর থেকে কলেজও আসেনি নিয়মিত। এলেও আমার সঙ্গে কোনও কথা হয়নি। ও হয়তো আশা করেছিল আমি ওর থেকে ক্ষমা চেয়ে নেব। কিন্তু আমি তা করিনি আর করা সম্ভবও ছিল না সেসময়। আমি এমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম যে কারও কাছে ক্ষমা চাওয়া তো দূরের কথা কথা বলতেও গা ঘিনঘিন করছিল। এটা শুধু ওর ক্ষেত্রে না, সবার ক্ষেত্রেই হচ্ছিল আমার। ক্লাসে একটা গুঞ্জনও আমি অনুভব করেছি আমার এই দুর্ব্যবহার নিয়ে। তবে তখন কিছুই এসে যায়নি সেটা আমার কাছে। এই শেষ এক সপ্তাহ আমি আর কলেজ যাইনি নিজেই। যাইনি ইচ্ছে করেই। আমার নিজের এই সমস্যার সমাধান না করতে পারলে সমাজে বাস করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না, ক্লাস করা তো দূরের কথা। বলা ভালো, আমি সমাজের পক্ষে এত ক্ষতিকারক হয়ে উঠব যে সেটাই একটা ভয়ানক ব্যাপার হবে। এখনও আমার সব অনুভূতিগুলো আয়ত্বে আসেনি আর সেটা না আসা অবধি আমার ভেতরের এই যুদ্ধ কিছুতেই থামবে না। আর আমি এই যুদ্ধে হারতেও চাই না। আমি শেষ হয়ে যেতে বা শেষ করে দিতে চাই না কিছু। আমি চাই না আমার পরিণতিও চৈতালীর কাকার মতো হোক!

চৈতালীর সাথে সেই ঘটনাটা ঘটার পরে আরও সব খারাপ কাজ করেছি আমি। আমি বুঝিনি কী হতে যাচ্ছে এর পরিণতি। আমি আরও ক্ষুরধার হয়ে উঠছিলাম একজন ছাত্রী হিসেবে আর সেই সঙ্গে আমার ব্যবহারের উপর থেকে আমার নিজের নিয়ন্ত্রণ ততই কমতে আরম্ভ করেছিল। অদ্ভুত আনন্দ আর ভয়ঙ্কর বিতৃষ্ণা আমাকে গ্রাস করছিল দিনে দিনে। আর এভাবেই একদিন সবচেয়ে খারাপ কাজটা করে ফেলি। সেদিনও বাড়ি ফিরতে দেরি হয়েছিল একটু। মনটা ভালো ছিল না, কী হচ্ছে সারাক্ষণ মাথার মধ্যে বুঝতে পারিনা, কলেজ থেকে বেরিয়ে একা একাই কফিহাউসে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম, একটা কোল্ড কফি আর কিছু ফ্রেঞ্চ ফ্রাই নিয়ে। রাস্তায়ও জ্যাম ছিল বেশ। ফলে ফিরতে দেরি হল বেশ অনেকটাই। ইতিমধ্যে মা ফোন করেছিল দু”বার। বিরক্ত লাগছিল উত্তর দিতে। কোনওমতে উত্তর দিয়ে কেটে দিয়েছিলাম। সবে ফিরেছি, দেখি বাবাও সেইমাত্র ফিরেছে অফিস থেকে আর আমার কথা জিজ্ঞেস করছে মানে আমি ফিরেছি কিনা। আমাকে দেখতে পেয়েই জিজ্ঞেস করল, কেন দেরি হল এত। শুনেই আমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল যেন। আমি কি বাচ্চা নাকি? পাঁচ বছরের মেয়ে? হারিয়ে যাব? আমার কি কোনও স্বাধীনতা থাকতে নেই? সবসময় কেন দেরি, কী হল, এসব নিয়ে প্রশ্ন কেন? মাথা গরম হয়ে গেল আর মুখ থেকে বেরিয়ে গেল এই কথাগুলো। বেশ ঝাঁঝের সঙ্গেই উত্তর দিয়েছিলাম। দেখলাম বাবা আর মা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি একমুহূর্ত আর দাঁড়ালাম না। মা পিছন থেকে ডাকছিল আমাকে দাঁড়াতে বলে। আমি শুনলাম না। হনহন করে ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। সেই রাতে বাবা আমার ঘরে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল আমি কোনও সমস্যায় আছি কিনা। বাবার ধারণা আমি নিশ্চয় কোনও সমস্যায় পড়েছিলাম বলেই রাগারাগি করে ফেলেছি। কিন্তু আমি বলে দিই সেটা না। আমার ভালো লাগে না তোমাদের এই বাড়াবাড়ি রকমের শাসন; বরং এটা বিরক্তিকর লাগে। এটাও রুক্ষ ভাবে বলি। তারপর আর কথা হয়নি বাবার সঙ্গে। বাবা অফিসের কনফারেন্সের জন্য ট্যুরে বেরিয়ে গেছে প্রায় দশদিন হল। আর ফোনও করেনি আমাকে। অন্যবার ট্যুরে গেলে বাবা খবর নেয়, আমিও ফোন করি। কিন্তু এবার সেটা হয়নি। বাবা নিশ্চয় মায়ের কাছ থেকে আমার খবর নেয়। কিন্তু অভিমান করে আমাকে ফোন করে না। বাবার সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়তো আমি। আর সেই আমিই বাবার মনটা একেবারে ভেঙে দিয়েছি সেদিন। মনে হতেই কান্না পায় এখন।

প্রোফেসর বাগচী বললেন, “আমার তীর্থকে ভালোই মনে আছে। আর সেটা এই কারণে যে ওর সঙ্গে আমার একটা ঘনিষ্ঠ ছাত্র- শিক্ষক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তবে সেটা একটা সময় অবধি।”

আমি বললাম, “একটু খুলে যদি বলেন।”

প্রোফেসর বললেন, “বলতে আমার কোনও অসুবিধে নেই। কিন্তু তুমি কেন এই কথা জিজ্ঞেস করছ ভেবেই অবাক লাগছে। ও কি তোমার আত্মীয়?”

ঠিক কথা। আমার এই কৌতূহলের কারণ অন্য কারও বোঝার কথা না আদৌ। আমি বললাম, “এটা আপনাকে এখনি আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনি জানবেন। তবে তার জন্য আমায় এই সাহায্যটুকু, প্লিজ করুন।”

আমার স্বরে মিনতি ছিল। নিস্তব্ধ ঘরে সেটা ছড়িয়ে পড়ল। এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে প্রোফেসর বললেন, “আচ্ছা।”

আমি অবাক হয়ে শুনলাম। কিন্তু এটাও ঠিক যে আমি মনে মনে যেন জানতাম আমি এটাই শুনতে পাব। আমার ভাগ্য ভালো যে আমি প্রোফেসর বাগচীর কাছে এসেছিলাম কারণ তিনি তীর্থকে এত ভালো করে চিনতেন। তিনি বললেন, তীর্থকে যখন ক্লাসে প্রথম দেখেন তখন আলাদা করে চোখে পড়েনি তাঁর। কিন্তু ধীরে ধীরে একজন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট হয়ে ওঠেন তীর্থ। কিন্তু ক্লাসে তাঁর উপস্থিতি কমতে থাকে দিনে দিনে। বিশেষ করে তৃতীয় বর্ষের শেষদিকে তীর্থকে কেউ ক্লাসেই দেখেনি। প্রোফেসরের খুব প্রিয় ছাত্র হয়েছিলেন উনি কিন্তু শেষে তাঁকেও এড়িয়ে চলতে আরম্ভ করেন। প্রোফেসর চেষ্টা করেছিলেন তাঁর সাথে যোগাযোগ রাখতে কিন্তু তিনি ক্লাসের অন্য ছাত্রছাত্রীদের কাছে জানতে পারেন যে তীর্থর সঙ্গে কারও যোগাযোগ নেই।

“আসলে তীর্থ নাকি ভয়ানক দুর্বিনীত হয়ে উঠেছিল। আমি ওর সেই রূপ দেখিনি কোনদিনই, কিন্তু আমার অন্য স্টুডেন্টরা বলে তীর্থর ব্যবহার এমন ছিল যেন ও সবাইকে ঘৃণা করে, তাচ্ছিল্য করে। আমি শেষদিকে ওকে একবারই কলেজে দেখেছিলাম, পোর্টিকোর সামনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বসেছিল ও। আমি ওকে ডাকতেই ও হুড়মুড় করে উঠে ওখান থেকে চলে যায়। আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল ও নিশ্চয় কোনও নেশায় আক্রান্ত হয়েছে। সারা গালে অপরিষ্কার দাড়ি, পোশাকেরও পরিচ্ছন্নতা নেই, চোখে কেমন একটা আচ্ছন্ন ভাব – সেটা হলে তার থেকে ওকে বার করে আনতে হবে নাহলে ওর এত ভালো কেরিয়ার নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু তা ঠিক না ভুল আমি বুঝিনি। কারণ ও এরপরও ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয় থার্ড ইয়ারে আর সেটা রেকর্ড নাম্বার নিয়ে। আর কোনওদিন যোগাযোগ হয়নি আমাদের। অথচ আমার প্রিয় ছাত্র হয়ে উঠেছিল ও কয়েকদিনেই, সেই ফার্স্ট ইয়ারের শেষ থেকে। এই ঘরে বসে অনেকদিন কাটিয়েছি দু”জনে কত বিষয় আলোচনা করে। শেষে একটু অস্বাভাবিক ও হয়ে উঠছে সেটা সন্দেহ হয়নি না – কিন্তু জিনিয়াসরা ওরকম একটু হয়ই। সত্যিই ও জিনিয়াস ছিল। মানে যা ওকে দেখেছি, কোনও সন্দেহ নেই ও তাই হত। আমিও ওর জ্ঞানে অবাক হয়ে যেতাম শেষে। কতগুলো ভাষা যে ও কীভাবে আয়ত্ব করেছিল তার কোনও হদিশ আমি পাইনি। পরে শুনি ও নাকি পাগল হয়ে গেছে। আ গ্রেট ট্র্যাজেডি…,” প্রোফেসর বাগচী এতক্ষণ কথা বলে থামলেন।

তাঁর কথা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কাঁপছিল। আমার মনে হচ্ছিল তিনি আমারই বর্তমান অবস্থার কথা যেন বলছেন। আমি বুঝলাম তিনি জানেন না যে তীর্থ মারা গেছেন কিন্তু তাঁকে আর সে কথা বললাম না। তিনি যখন জানেন না ত সেটাই বা খারাপ কী! কী প্রয়োজন মানুষকে আবার মৃত্যুসংবাদ দিয়ে দুঃখী করে। অনেকদিন পরে আমার মনে এই শুভ বুদ্ধি এলো দেখে আমার নিজেরও ভালো লাগল। আমি কি আবার সুস্থ স্বাভাবিক হতে পারছি তাহলে? আমি প্রোফেসরকে ধন্যবাদ দিয়ে উঠে পড়লাম। আর জানালাম তিনি এই কৌতূহলের কারণ শীঘ্রই জানতে পারবেন। তিনি হেসে বললেন, “বুড়ো হয়েছি। এখন চারপাশে যা দেখি তা নিয়ে খুব একটা কৌতূহল জাগে না। তবে তোমার ঘটনা সবাই জানে। আমার বিশ্বাস তুমি সেই ঘটনার সন্ধানেই এসেছিলে, তা যতই লুকিয়ে রাখ না কেন। আর তার সাথে তীর্থর নামও আসছে দেখে সত্যিই কৌতূহল হচ্ছে। জানিও, সময় হলে। তবে বিশেষ কিছু গোপন করো না বেশিদিন। হৃদয় নিতে পারে না সেটা। হয়তো তীর্থর তাই হয়েছিল।”

আমি তাঁর অনুমানক্ষমতা দেখে অবাক হয়ে গেলাম। মাথা নেড়ে বেরিয়ে আসতে আসতে আমার মনে হল সত্যিই বেশিদিন কিছু গোপন করা উচিত না। তাহলে ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যাবে। আমার সেই ডায়েরির লেখাগুলো কানের মধ্যে বাজতে লাগল। এক্ষুনি কিছু করা দরকার।

।। ডায়েরিতে যা ছিল ।।

সেদিন আমি চৈতালীর কাকার ডায়েরিগুলো একে একে খুলছিলাম। কিছু করার ছিল না তখন। আমার বিরক্ত লাগছিল নিজের ওপর আর সমস্ত মানুষের ওপর। বাবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করার পরে দু”দিন কেটে গেছিল। কিন্তু সেই তেতো স্বাদ তখনও মুখে লেগে আছে। বাবাও সেদিন সকালে ট্যুরে বেরিয়ে গেল। বাবার সঙ্গে কথাও হল না আর যাবার আগে। এটা কখনও হয় না। আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল আর ভালো লাগছিল না কিছু। হঠাৎ আমার নজরে পড়ল চৈতালীর কাকার ডায়েরিগুলোর ওপর। চৈতালীর সঙ্গে ঝামেলাটা হবার আগের দিনই ও আমায় এগুলো পড়তে দিয়ে যায়। কী মনে হল আমি ডায়েরিগুলো নিয়ে বসে পড়েছিলাম।

পাতাগুলো ওলটাতে ওলটাতে আমি বেশ অবাক হচ্ছিলাম। বেশ ভালো মানের লেখা দেখা যাচ্ছে। হাতের লেখাও মুক্তো বাঁধানো। আমি এক-এক করে প্রায় সব ডায়েরিগুলোই দেখতে লাগলাম। অনেকগুলোতে এমন সব ভাষা লেখা যেগুলো আমি জানি না। হঠাৎ এমন একটা লেখার দিকে চোখ আটকে গেল আমার। কেন জানি না মনে হল এই লেখা আমি আগেও দেখেছি। আমি স্থির হয়ে বসে ভাবতে লাগলাম, কোথায়? কোথায় দেখে থাকতে পারি? আমার মাথার ভেতর একটা ফিসফিস আবার শুরু হল। এটা হচ্ছে, সর্বক্ষণ হচ্ছে আমার মাথার ভেতর, আর আরও বেশি হচ্ছে যখন কিছু খুব মনোযোগ দিয়ে করতে যাচ্ছি, ভাবতে যাচ্ছি। আরও অনেকবার ফোন এসেছে আমার কাছে। যতবার আসছে আমি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছি, আরও ফিসফিস বেড়ে চলেছে আমার মাথার ভেতর। যেন কারা আমার মাথার ভেতরের সব জটিলতা দূর করে সব কিছু আমার জন্য সহজ করে দিচ্ছে। আমি মাথার ভেতরটা আমার যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।

হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল কী লেখা এটা। উত্তেজনায় হৃদস্পন্দন দ্রুত দ্বিগুণ হয়ে গেল। এ তো আমার পুরনো ফোনে পাওয়া সেই মেসেজটা, সেই ফিনিশিয়-সাসানিড ভাষায়। এর একটা মানেও ডঃ রাধাকৃষ্ণ বের করেছিলেন। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, চৈতালীর কাকাও ঠিক সেটাই বের করেছেন আর এর নিচে লিখে রেখেছেন। তিনি কি এত পণ্ডিত ছিলেন যে কলেজে পড়তে পড়তেই এই ভাষার সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন? আমি পাগলের মতো তার ডায়েরিটার পাতা ওলটাতে লাগলাম। আমার মাথার ভেতর ফিসফিস আরও বাড়তে লাগল। একটা ভয়াবহ সন্দেহ মনে দানা বাঁধতে লাগল। আমি দেখতে পেলাম যা যা মেসেজ সেই সময় আমার কাছে এসেছিল সব এখানে লেখা। তার নানা মানে বের করেছেন তীর্থ। আর অনেককিছু এমন হিজিবিজি ভাষায় লেখা যে আমি তার কিছু বুঝি না। আমার অস্থির লাগল। আমি কিনা এত বড়ো একটা রহস্যের সামনে বসে কিছু বুঝতে পারছি না। আমি অন্য ডায়েরিগুলো খুলতে লাগলাম। কোথায় এর আনুষঙ্গিক কিছু আছে, কোথায়?

কিছুক্ষণের মধ্যেই মিলল সেটা। একটা ডায়েরি বেরোল, লাল রেক্সিনে মোড়া, যেটায় তীর্থর দিনলিপি জাতীয় কিছু আছে। তবে ঠিক গুছিয়ে লেখা না। কারণ তারিখ কিছু লেখা নেই আর লেখাটাও কেমন একটা। আমি হুমড়ি খেয়ে পড়লাম তার ওপর। টেবিলের ল্যাম্পটা টেনে নিলাম কিছুটা। আমার পড়ার আর মনে রাখার ক্ষমতা দ্রুত বেড়ে উঠেছে কিছুদিনের মধ্যে। মনে গেঁথে যাচ্ছিল বিশেষ বিশেষ টুকরো গুলো একেবারেই।

“আজকে আবার একটা মেসেজ এসেছে…। কেন জানি না মনে হচ্ছে, এটা কোনও প্রাচীন ভাষায়। ভাবছি বাগচী স্যারকে একবার দেখাব…”

“কিছু ভালো লাগছে না। একটা অদ্ভুত ফোন আসছে বারবার। ফোনটা ধরলে কোনও শব্দ আসছে না কানে। সবচেয়ে আশ্চর্য… ফোনটা যে আসছে তার চিহ্নও বোঝানো যাচ্ছে না …। মানে সে যে কী, কী করে বোঝাই… মাথা ঝিমঝিম করছে আবার। কারা কথা বলছে? কারা?”

“আশ্চর্য ঘটনা ঘটল আজ। গোটা Macbeth একবার পড়ে মুখস্থ হয়ে গেছে। হ্যাঁ, সত্যি। সত্যি বলছি। আমি এক আশ্চর্য শক্তি পাচ্ছি। ভুলে যাওয়া যে সম্ভব সেটাই এখন আর মনে হচ্ছে না। dialog গুলো হুবহু মনে আসছে। মনে হচ্ছে মাথার ভেতর থেকে কেউ বলে দিচ্ছে আমায়… এটা কি তারাই?”

“যেই হোক, সে নিশ্চয় ঈশ্বর। আমি ঈশ্বর মানিনি কোনওদিন। কিন্তু এই আশ্চর্য বার্তা যা কোনও দূর মহাকাশ থেকে কেউ আমাকে নিয়মিত পাঠাচ্ছে, তারা নিশ্চয় ঈশ্বরতুল্য। আমি শক্তিমান হয়ে উঠছি, হয়তো সর্বশক্তিমান…।”

“নাহ, এদের আর সহজে বিশ্বাস করা যাবে না। আমার ক্লান্ত লাগছে খুব। মাথার আর মনের মধ্যে সারাক্ষণ একটা যুদ্ধ। এরা কী চায়?”

“এখন দিনে ১০ -২০ বার করে ফোন আসছে…………………।”

“কোন সুদূরের বার্তা আমার জন্য আসছে সেটা যেন টের পাচ্ছি এবার। এতদিন মাথার ভেতর আওয়াজ চলত, ঘুমোলে এখন স্বপ্নের মধ্যে একটা আগুনের পৃথিবী দেখছি।”

“কলেজে আর যাই না… ওসব পড়া আর ভালো লাগে না… মানুষও বিরক্তিকর… বাড়ির লোকগুলোও Tiring হয়ে উঠছে… মানুষকে ঘৃণা করতে ইচ্ছে করছে… একমাত্র শান্তি সব ধ্বংস করে দিলে…”

“আমাকে ওরা যেসব ভাষায় প্রথমে মেসেজ করেছিল তার অনেকগুলোই উদ্ধার করলাম। কিছুটা ফিনিশিয় আর কিছুটা সাসানিড ভাষা। হ্যাঁ, সেই প্রাচীন সাসানিড ভাষা। গ্রিক লেটারের মতো কিছু পাঠিয়েছিল সেটা মনে হয় ওদের গ্যালাক্সির গঠন। কেবল ওই ২৪ ডিজিটের সংখ্যাটার কোনও মানে পাচ্ছি না…”

“ওরা আমার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারছে… ওদের এই ব্যবস্থাটা আমি বেশ বুঝতে পারছি… প্রথমে মেসেজে, তারপর ফোনে এখন সরাসরি যোগাযোগ করছে… এখন মনে হয় আমার মস্তিষ্কের মধ্যে যেন বাস করছে ওরা… ওদের ছায়ামাখা অবয়বগুলো দেখতে পাচ্ছি আমি… আগুনের ওপর ভেসে চলেছে ওরা… চিৎকার করছে, আর্তনাদ করছে, আবার আমার মাথার ভেতর বার্তাও পাঠাচ্ছে ওদের… মনে হয় আমার মাথার ভেতর ওদের আর ওদের পৃথিবীর একটা ছোট্ট version তৈরি করছে… কিন্তু কেন… কী উদ্দেশ্য ওদের?”

“কিছু একটা হচ্ছে সন্দেহ নেই… আমি আর পারছি না… কাল চৈতিকে আমি রেগে গিয়ে হঠাৎ এক থাপ্পড় মেরেছি… চৈতি বাচ্চা মেয়ে, বড়দা বা বউদি আমায় ভালোবাসে বলে কিছুই বলেনি… কিন্তু যে চৈতি আগে আমাকে দেখলেই ছুটে কোলে আসতে চাইত সে দেখছি আজ আমাকে দেখে দৌড়ে পালাল… বাইরের মানুষের সঙ্গে আমার সব সম্পর্ক শেষ… এখন কি ঘরের পালা…”

“আমি এবার পাগল হয়ে যাব… নিজের পাগলামি খুব ভালো করে বুঝতে পারছি আমি… কী যে হচ্ছে তাঁর কোনও… নিয়ন্ত্রণ আমার নেই… ওরা কি আমাকে দাস বানাতে চায় নাকি কী চায়… আমি উগ্র হয়ে উঠছি, মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে সব ধ্বংস করে দেব… সব শেষ করে দেব…”

“ঘুমের মধ্যে দেখছি একটা জগৎ, একটা অদ্ভুত পৃথিবী, সাদা ধোঁয়ার মতো অবয়বের প্রাণী, তাদের চারপাশে আগুন জ্বলছে… তারাই কি আমার এই শক্তি প্রদান করল? তারা কি…”

“আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ… পরিত্রাণ নেই…”

আমি এই অবধি পড়ে হাঁফিয়ে উঠলাম। আমার মাথা রীতিমতো ঘুরতে লাগল। আজকে বুঝলাম কেন তাঁর ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সেই মেসেজ আমি পেয়েছিলাম। তার মানে যারা এই মেসেজ পাঠাচ্ছে তারা এখনও চায় তীর্থ মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তারা জানে না যে তিনি আর বেঁচে নেই। ঠিক, আমিও তো সেই মোবাইল নাসায় জমা দিয়ে আসার পরে এই নতুন ফোন কিনেই আমার “ওয়েলকাম ব্যাক” মেসেজ পাই। আমার একবার মনে হল তাহলে আমার এর আগের মোবাইলটা, মানে যেটা ভেঙে গেল, সেটায় কেন কোনও মেসেজ আসেনি। একটু ভাবতেই উত্তর পেলাম। সেই মোবাইলটা যে আমার ছিল না আদৌ। মায়ের ফোন, মা আমায় ব্যবহার করতে দিয়েছিল। তাই ওরা বুঝতে পারেনি কার সাথে যোগাযোগ হবে…। মাথা ঘুরতে লাগল আমার। আমার সঙ্গে যা যা ঘটেছে তাই তাই ঘটেছে চৈতালীর কাকার সঙ্গেও, তিনিও আমার মতো প্রথমে মেসেজ পান, তারপর ধীরে ধীরে সময় যত এগোয় আমারই মতো তাঁর কাছে ফোন আসতে থাকে। তিনিও মাথার ভেতর নানা শব্দ শুনতে পান, দিনে দিনে আরও ক্ষুরধার হয়ে ওঠেন। কিন্তু মানুষের প্রতি তীব্র ঘৃণা আর বিতৃষ্ণা, নিজেকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে না পারা, সব সব ঠিক আমারই মতো…।

আমি আরও একবার ডায়েরিতে ফিরে গেলাম। শেষের লেখাগুলো তেমন ভালো করে আর পড়া যাচ্ছিল না। একেবারে উন্মাদ অবস্থায় বা তার কাছাকাছি অবস্থায় পৌঁছে এই লেখাগুলো তিনি লিখেছিলেন। অসংলগ্ন, অনিয়মিত, বিকৃত অক্ষর, কিছুই প্রায় পড়া যায় না। শেষ দিকে একটা লাইন বোঝা গেল কিছুটা – “যন্ত্রণা জ্ঞানের, শক্তির, ক্ষমতার কিন্তু ধ্বংসের আরও বেশি…”।

এরপরেই কি সুইসাইড করেন তিনি? আমার পরিণতিও কি তাঁর মতো হবে? আমিও কি শেষ অবধি…? আমি টেবিলের ওপর বসেই হাউহাউ করে কেঁদে ফেললাম। কী করব আমি? কী করব?

।। আর দেরি নয় ।।

আমি চৈতালীর বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে কলিং বেল টিপলাম। কাকিমা এসে খুলে দিলেন দরজাটা। ওঁর হাসিমুখ দেখে বুঝলাম যে উনি আমার আর চৈতালীর ঝগড়ার ব্যাপারে কিছু জানেন না। আমি ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে উঠে চৈতালীর ঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালাম। আমার দারুণ অপরাধবোধ হচ্ছিল। আবার মনের ভেতর সেই যুদ্ধ শুরু হয়েছে। মনে হচ্ছে কেন আমি ক্ষমা চাইব।

ডায়েরিটা পড়ার পর থেকে আমি বুঝেছিলাম নিজেকে রক্ষা করার একটাই পথ আমার খোলা আছে। সেটা হল, প্রথমত, কোনও ফোন রিসিভ না করা, যাতে আমার ওপর আর কোনও প্রভাব তারা খাটাতে না পারে। দ্বিতীয়ত, যেটুকু প্রভাব আমার ওপর পড়েছে সেটাকে নষ্ট করা। আর সেটা করতে গেলে আমাকে যা করতে হবে – তা-ই আমি করব। এই এক সপ্তাহ আমি কলেজ না গিয়ে বেরিয়ে যেতাম বাড়ি থেকে। বসে থাকতাম হয় কোনও জায়গায় গিয়ে, সে পার্ক হোক বা মন্দির। অথবা ঘুরে বেরিয়ে ফিরে আসতাম বাড়িতে। আসলে মানুষের প্রতি বিদ্বেষভাব কাটানোর জন্য মানুষের মাঝখানে ঘুরতাম। চেষ্টা করতাম, নিজের আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ করতে। বিশেষ করে কাউকে আঘাত করা বা চেষ্টা করা খারাপ ব্যবহার করতে, যেটা আমার মধ্যে সারাক্ষণ দেখা যাচ্ছিল সেটা একদম বন্ধ করতে চেষ্টা করি। একদিন রাস্তায় একটা কুকুর হঠাৎ “ঘেউ, ঘেউ” করে তেড়ে এসেছিল, বোধহয় পাগলা কুকুর হবে। সামনে একটা আধলা ইট তুলে মারতে গিয়েও থেমে যাই। দেখি লোকজন “হাঁ” করে তাকিয়ে দেখছে আমার কাণ্ড। সামলে নিয়ে মাথাটা ঠাণ্ডা করতে চেষ্টা করি।

সেইসঙ্গে আরও একটা কাজ করি নিয়মিত ভাবে। হারতে, হ্যাঁ, জেনে-বুঝে হারতে। ভিডিও গেম খেলতে খেলতে হারতে, পড়া ইচ্ছে করে ভুলে যেতে চেষ্টা করতে। যেদিন প্রথম কলেজ যাই এইসবের পরে, দেখি একটা ক্লাস টেস্ট নিচ্ছেন কে.জি ম্যাম। আমি প্রশ্ন পেয়েই বুঝে যাই সব উত্তরই জানি। কিন্তু যা লিখি ভুল লিখে আসি ইচ্ছে করে। বুঝতে পারছিলাম একটা দ্বন্দ্ব হচ্ছে মনের ভেতর। ফিসফিস করে কারা সব উত্তর যেন বলে চলেছে। বলে চলেছে আমায় সবাইকে হারিয়ে দিতে। মনে হচ্ছিল যদি জিততে পারি সবাইকে হারিয়ে, কেনই বা হারব! কিন্তু এখানে হারাটাই যে আসলে জিত সেটা সারাক্ষণ মাথায় রেখেছিলাম। তাই পরীক্ষা দিতে দিতে যখন দেখলাম তন্বী খসখস করে লিখে পাতা ভরাচ্ছে, এক মুহূর্তের জন্য ফার্স্ট হতে না পারার কষ্ট গ্রাস করলেও, কিছু লিখিনি আর। হোক, আমার বদনাম, শূন্য পাই পাব, কিন্তু এভাবে শেষ হয়ে যাব না কোনও অজানা শক্তির হাতে।

তাই আজ সব অভিমান, “আত্মসম্মান” ভুলে ধীর পায়ে চৈতালীর ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। নাহ, ক্ষমা আমায় চাইতেই হবে। দোষ আমারই। আমি ঘরে ঢুকে দেখলাম ও জানালার রেলিঙে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। তার মানে আমাকে বাড়িতে ঢুকতে আগেই ও দেখেছে নিশ্চয়। আমি কাছে গিয়ে ওকে ডাকলাম। প্রথমে সাড়া দিল না ও। আমি আরও একবার ডেকে ওর সামনে মুখটা নিয়ে গিয়ে দেখি চৈতালীর চোখ থেকে জল পড়ছে। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম। চৈতালী কাঁদতে কাঁদতেই বলল, “যাহ্‌, আমি তোর বন্ধু নাকি? কেন এলি তুই?” আমি ওকে কোনওমতে থামালাম। ক্ষমা চেয়ে তারপর বললাম এতদিনের সমস্ত ঘটনাগুলো। সেই মেসেজগুলোও দেখালাম। চৈতালী হতবাক হয়ে শুনতে লাগল। ও বিশ্বাস করছে তো আমায়? আমি ওর চোখে চোখ রেখে বললাম, “সেদিন যে তোকে ওরকম খারাপ কথা বলেছিলাম সেটা আর কিছু না, ওই ফোনটা এসেছিল বলেই। ওই ফোনটাই আমার মাথায় আবার হিংস্রতা ঢুকিয়ে দেয়।”

চৈতালী বলল, “কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না এটা কী করে সম্ভব হচ্ছে আদৌ? কোথাকার কোন গ্রহ থেকে…”

আমি বললাম, “দেখ, আমি এই ঘটনার কিছুটা ধারণা করতে পেরেছি। তোর কাকার সঙ্গেও তো একই ব্যাপার ঘটেছিল। তিনি খুবই ইনটেলিজেন্ট হওয়ায় আরও সহজেই অনেককিছু আন্দাজ করে ফেলেছিলেন।”

“কী আন্দাজ?”

“এই মেসেজ বা ফোনগুলো কেবলমাত্র আমাদের সঙ্গে ওরা যোগাযোগ করার জন্যই পাঠায়নি, বরং আরও কোনও উদ্দেশ্য ওদের ছিল বা আছে। এই মেসেজগুলো প্রথমে এসেছে সেটা জানাজানি হয়েছে কিন্তু আর কিছু না। পরে যখন ফোন আসতে শুরু করে আর আমরা সেটা রিসিভ করতে শুরু করি তখনি আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে তারা কিছু বিশেষ জিনিস ঢুকিয়ে দেয়…।”

“কী সেটা?”

“কী বলতে পারব না, কিন্তু এমন কিছু যেটা আমাদের মস্তিষ্কের বিশেষরকম পরিবর্তন ঘটায়। আমাদের বুদ্ধিমত্তার উন্নতি ঘটে, আমরা আরও ক্ষুরধার হয়ে উঠি। কিন্তু সেই সঙ্গে আমাদের খারাপ গুণগুলোরও বৃদ্ধি ঘটতে থাকে। মানে এমন কিছু আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে প্রবেশ করে যাতে আমাদের বুদ্ধিমত্তার উন্নতির সাথে, চারিত্রিক অবিনতিও হয়, সমাজের পক্ষে আমরা ক্ষতিকর হয়ে উঠি।”

“কিন্তু এভাবে একটা ফোনের মাধ্যমে… মস্তিষ্কের…”

“ভুল ভাবছিস। এটা সাধারণ ফোন না। এর মাধ্যমে আমাদের মস্তিস্কে এমন সব তরঙ্গ হয়তো প্রবেশ করে যাতে ঠিক এই কাজটাই হয়। নিশ্চয় জানিস, মস্তিষ্কের নানা অংশে নানা কাজ হয়। অর্থাৎ কোনও অংশ বুদ্ধিমত্তা, কোনও অংশ আবেগ, কোনও অংশ নানা শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে – এই তরঙ্গ হয়তো মাথার ভেতর গিয়ে ঠিক সেই কাজটাই করত যা এটাকে করতে বলা হয়। এতে মানুষ হয়তো ক্ষমতাশালী হবে কিন্তু তাঁর সব মানবিক গুণ নষ্ট হতে থাকবে। আমার মনে হয় তোর কাকাও এটাই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন, আর তাই তাঁর বুদ্ধিবৃত্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে চারিত্রিক অবনতির পতন দেখতে পেয়ে ওই ডায়েরিতে জ্ঞানের ক্ষমতা ও ধংসের ক্ষমতার কথা লিখেছিলেন। এই দ্বন্দ্বই তাঁকে মানসিক ভারসাম্যহীন ও সামাজিকভাবে একঘরে করে তুলেছিল। শেষে তিনি কিছুতেই আর এই শক্তির বিরুদ্ধে গিয়ে স্বাভাবিক হতে পারেননি, এমনকি ডাক্তাররাও তাঁকে সুস্থ করে তুলতে পারেনি! তিনি তো কাউকে জানানইনি কী ঘটছে তাঁর সঙ্গে। শেষে তিনি আত্মহত্যা করেন। মনে হয় তিনি ভেবেছিলেন তিনি সমাজের প্রতি ক্ষতিকারক হয়ে উঠবেন, তাঁর শক্তির অপব্যবহার ধংসের কারণ হবে কিংবা এও হতে পারে যে মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতেই তিনি এই কাজ করেন, হয়তো আমারও এই পরিণতি হত কোনওদিন।

“বাপরে, এটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে আমার!”

“মনে হলেও আমার ধারণা এটাই সত্যি। তবে কয়েকটা জিনিস আমি এখনও বুঝতে পারিনি। যেমন তারা এই ফোনের মাধ্যমে এই কাজ করতে পারত কী করে? আমাদের মোবাইল ফোনের সিগন্যাল, ইনফরমেশন যা কিছু আদান প্রদান হয়, সেটা তো আমাদের স্যাটেলাইটের মাধ্যমে হয়, সেখানে ওরা কীভাবে এটাকে ব্যবহার করল। এছাড়াও তারা কি সবার মধ্যে একটা জাল বিছিয়ে রেখেছে? নাহলে তোর কাকার ঘরের সামনে এলে আমার মোবাইলে তোর কাকার নাম ফুটে উঠবে কেন! তারা কি এভাবে যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল তাদের মধ্যে একটা সংযোগের জাল ছড়িয়ে সবাইকে একসাথে বেঁধে রেখেছে? যেমন অনেকগুলো কম্পিউটার ইন্টারনেটের মাধ্যমে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।”

“ঠিক বলেছিস।”

“আর আরও বড়ো প্রশ্ন এরা কেন করত এটা। কী জন্য…। সেটা আরও অনেক বড়ো ধাঁধা।”

“সেটা কীভাবে সলভ্ হবে?”

“আজকেই দাদাকে জানাতে হবে, জানাতে হবে খাসনবীশ স্যারকেও। এটা বিজ্ঞানীদের দ্বারাই বলা সম্ভব, এভাবে ঘরে বসে সমাধান হবে না।”

চৈতালী বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বলল, “আজকে না। এখনই, তোর দাদাকে এখনই ফোন কর। আর দেরি নয়, একটুও দেরি নয়।”

।। শেষের কথা ।।

আজকে আমাদের বাড়িতে অনেকে নিমন্ত্রিত। আমি-মা-বাবা-দাদা ছাড়াও আমাদের ড্রয়িং রুমে ঘর ভর্তি করে বসে আছে চৈতালী, ওর মা-বাবা, ওর সেই সাংবাদিক মেজকাকা যিনি এতদিন দিল্লীতে ছিলেন, প্রোফেসর খাসনবীশ আর প্রোফেসর বাগচী। প্রায় সারা পৃথিবীতে ঝড় বয়ে গেছে কিছুদিন হল। ভিনগ্রহের প্রাণীর অস্তিস্ব এত ভালোভাবে জানা যায়নি আগে কোনওদিন। তারা যে আছে সে বিষয়ে আজ প্রায় সব বিজ্ঞানীই নিশ্চিত। আগেরবার যাও বা কিছুটা সন্দেহ করেছিলেন কেউ কেউ, আজ তারাও মেনে নিয়েছেন যে সেটা কোনও বানানো ব্যাপার ছিল না। ইতিমধ্যে আমার নাম আবার খবরের শিরোনামে এসেছে, আমি যে ওই মেসেজের আর ওদের কার্যকলাপের অনেকটা উদ্ধার করতে পেরেছি, সেটা ঠিক বলেই প্রমাণিত হয়েছে। আমিও আরও একবার নাসায় ঘুরে এসেছি। আমাকে সেখানে অনেক প্রশ্ন করা হয়েছে। আমি ফোন আসার আগে ও পরে কী অনুভব করতাম। সেই সময় আমার ব্যবহার কেমন ছিল, আমি কী কী পারতাম, সেই সমস্ত কিছু জিজ্ঞেস করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল। আমি সেখানে গিয়েছিলামও তাই জন্য। তাঁরা আমাকে খুব প্রশংসিত করেছেন এই বলে যে আমি যেভাবে সেই অবস্থা থেকে নিজে নিজেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পেরেছি স্রেফ নিজের মানসিক শক্তিতে, সেটা বিরাট একটা কৃতিত্ব। এছাড়া চৈতালীকেও সেখানে যেতে হয়েছিল কারণ আমার ব্যবহার ঠিক কেমন ছিল, সেটা ওর থেকে ভালো আর কেউ বলতে পারত না। তাই ওর নামও লোকে জেনে গেছে আর তাই ও ডবল খুশি।

কথা হচ্ছিল। চৈতালীর মেজকাকা ডঃ খাসনবীশকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, কীভাবে যে ওঁরা ফোন করত যদি একটু বলেন।”

সেই প্রশ্ন যেটা আমার মাথায় এসেছিল। অবশ্য সেটার একটা উত্তর আমাদের ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে নাসার তরফ থেকে। কিন্তু ইনি সেটা যে জানবেন না স্বাভাবিক।

ডঃ খাসনবীশ চেয়ারে একটু সোজা হয়ে বসে বললেন, “এটা আমাদের কাছেও খুব পরিষ্কার না। তবে যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে সেটা বুঝতে সবাই পারবেন। আচ্ছা, আপনারা নিশ্চয় সবাই “হ্যাকিং” শব্দের সঙ্গে পরিচিত। তা হ্যাকিং আমরা এতদিন ছোটো ক্ষেত্রে যেমন, কম্পিউটার বা সিস্টেম ইত্যাদির জন্যই জানি। কিন্তু যদি গোটা স্যাটেলাইটই “হ্যাক” করা যায়?”

দাদা বলল, “এটা কি সত্যিই সম্ভব স্যার? এটার সঙ্গে কি ওভাবে…”

“দেখো, কী সম্ভব আর না তা কিন্তু নির্ভর করছে আমাদের প্রযুক্তির ক্ষমতার ওপরে। আমাদের ক্ষেত্রে এটা অসম্ভব লাগতে পারে। কিন্তু হয়তো তাদের ক্ষেত্রে না। আর হ্যাকিংই হয়েছে সেটা বলছি না তো। এটা হয়তো অন্য কিছু যেটা আমরা আমাদের সীমিত জ্ঞানে খুঁজে বের করতে পারছি না। আমাদের ধারণায় হ্যাকিং বলেই ধরছি। আবার, কেন তাতিয়ানার মোবাইলে তীর্থ মজুমদারের নাম ফুটে উঠল সেটাও একটা তত্ত্ব দেয়। হতে পারে, এই পৃথিবীর যাদের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করছে বা করেছে তারা প্রত্যেকে একটা টাওয়ার, যে টাওয়ারগুলোর সঙ্গে প্রধান সিস্টেম মানে ওদের যোগাযোগ আছে আবার এগুলো নিজেদের মধ্যেও অদৃশ্য বন্ধনে যুক্ত। হতে পারে, এই পৃথিবীতেই তারা একটা সার্ভার তৈরি করেছে যার সিগন্যাল ধরার মতো ক্ষমতা কেবল এই বিশেষ টাওয়ার মানে সেই লোকগুলোর বা যে স্থানে তারা থাকে সেই স্থানেই সম্ভব হচ্ছে। লোকগুলো, তাদের মোবাইল, তাদের বাসস্থান সব এক-একটা টাওয়ার আর একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। আমরা চেষ্টা করছি দেখার যে বাকি যারা যারা মেসেজ পেয়েছিল তাদের মোবাইল বা জায়গাগুলোতে একে অপরকে নিয়ে গিয়ে, তারা একে অপরের সিগন্যাল ঠিক এভাবেই নিতে পারে কিনা। পারলে এই তত্ত্ব নিশ্চিত ভাবে প্রমাণিত হবে। প্রমাণিত হবে আমাদের পৃথিবীতেই একটা ভিনগ্রহের অদৃশ্য জাল তৈরি করা হয়েছে।”

চৈতালীর মেজকাকা মাথা নেড়ে বললেন, “স্যার, আমার কিন্তু ওদের উদ্দেশ্য কী ছিল বা আছে সেটাও ক্লিয়ার হয়নি।”

ডঃ খাসনবীশ হেসে বললেন, “হয়তো আমাদেরও না। কিন্তু একটা ছোট্ট তথ্য যেটা তীর্থ মজুমদার মানে আপনার ভাইয়ের ডায়েরি থেকে পাওয়া গেছে সেটা ফেলে দেবার মতো না।”

আমি কৌতূহলী হয়ে বললাম, “কোনটা স্যার?”

“তোমার নিশ্চয় মনে আছে যে ডায়েরিতে একজায়গায় লেখা ছিল তিনি ঘুমের মধ্যে নানা দৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন আর সেটা যেন আগুনের পৃথিবীতে কিছু অবয়ব…।”

আমি তাড়াতাড়ি বললাম, “হ্যাঁ মনে আছে তো।”

“সেটাই ক্লু। আমাদের ধারণা যেহেতু তীর্থবাবু ওদের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন তাই তিনি কেবল মাথার ভেতর আওয়াজ শোনা না, নানা ঘটনা চোখ বুজলে, হয়তো ঘুমের অবচেতনে বুঝতেও পারতেন। সেটাই তিনি দেখেছিলেন। হয়তো একটা গ্রহ, যেখানে প্রাণধারণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে, তারা চাইছে এই গ্রহের দখল নিতে। কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব? যদি এই গ্রহের অনেক মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করা যায়। হয়তো তারা আমাদের সকলের ওপর অধিকার কায়েম করতে পারে আমাদের মানসিকভাবে তাদের হাতের পুতুল বানিয়ে। এতে হয়তো তারা কোনওভাবে লাভবান হবে। তারা ওখানে থেকেও আমাদের থেকে কিছু রসদ ক্রমাগত সংগ্রহ করবে যা আমরা বুঝতে পারছি না। বা হয়তো তারা সরাসরি আমাদের শরীরের ভেতরেই বসবাস করবে যেমন পরজীবী উদ্ভিদ করে। তবে সবই অনুমান সাপেক্ষ।”

দাদা বলল, “স্যার, আরও একটা তত্ত্ব অনেকে দিচ্ছেন যে…।”

“হ্যাঁ, সেটাও আছে। তবে সেটা একটু অবিশ্বাস্য। তাঁরা বলছেন, এভাবে কিছু মানুষকে অতি ক্ষমতাশালী কিন্তু মানুষ হিসেবে নিকৃষ্ট করতে পারলে হয়তো আমাদের সমাজব্যবস্থায় একটা আঘাত আনা যাবে। এরা হয়তো একটা যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে মানবসভ্যতা ধ্বংস করে ফেলবেন একদিন আর সেদিন সেই ভিনগ্রহের প্রাণীরা দখল নেবে এই পৃথিবীর; বা তখন মানব সভ্যতা হয়তো অনেক দুর্বল, নিজেদের রক্ষা করতে পারবে না ভিনগ্রহের শত্রুর হাত থেকে। মানে ওরা সরাসরি যুদ্ধের বদলে এভাবে পরোক্ষে যুদ্ধ করে মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে হারাতে চায়।”

“এটা কি সম্ভব?” বাবা বলল।

“কেন না? একটা হিটলার বা লাদেন কি পৃথিবীর অন্তিম ঘনিয়ে আনার ভয় দেখাতে পারেনি? ভাবুন এইরকম এক”শ জন হিটলার যদি একসঙ্গে পৃথিবী শাসন করতে আসে তো কী পরিণতি হতে পারে আমাদের।”

প্রোফেসর বাগচী এতক্ষণ কিছুই বলেননি। তাঁকে সেই কথা দিয়ে এসেছিলাম যে তাঁকে সব জানাব তাই আজকে অবশ্যই তাঁকে আসতে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “কী জানো নবারুণ, আমি বিজ্ঞান বেশি কিছু বুঝি না। কিন্তু আমার মনে হয় এই যে যুদ্ধ সেটা আমাদের মধ্যে প্রতিদিন চলছে। আমরা কি শক্তির নেশায় মানবসমাজকে অগ্রাহ্য করে আরও আরও উন্নতির চেষ্টা করব নাকি আমাদের চারপাশের মানুষ, পশু, পাখি সবাইকে নিয়ে একটা উন্নত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখব? একক ক্ষমতাশালী হতে চেয়ে স্বার্থপর হব নাকি সহযোগিতা করব একটা সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে? আমি জানি না এই এলিয়েনের বিষয়ে খুব ভালোভাবে, কিন্তু তারা যদি সত্যি হয় তো ঠিক জায়গাতেই তারা আঘাত দিতে চেয়েছে। মানুষের ক্ষমতা- অক্ষমতা-স্বার্থ-ত্যাগের মতো বিষয়গুলো এত ভালো করে মানুষও বোঝেনি হয়তো।”

এরপর তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি খুব খুশি তুমি এই পরীক্ষায় জিততে পেরেছ বলে। আমার খালি তীর্থর জন্য কষ্ট হয়। সে যদি…”, প্রোফেসর এতদিন পরে নানা ঘটনায় জেনেছেন যে তীর্থ আর বেঁচে নেই। এই কথায় আমাদের সকলেরই মন ভিজে এলো। আমি আড়চোখে চৈতালীর বাবার দিকে তাকিয়ে দেখলাম তিনি মাথা নিচু করে নিয়েছেন।

রাতে শোবার আগে তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বিন্দু বিন্দু আলো ফুটে উঠছে অন্ধকার ক্যানভাস জুড়ে। কোথায় তারা যারা আমাকে তাদের হাতের পুতুল বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল, চেয়েছিল হয়তো আমারই মতো অনেককেই সেটা করতে। কোথায় লুকিয়ে দেখছে আমাদের তারা, কারাই বা তারা? এখনও কি তারা কারও না কারও সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে? নিশ্চয় বিজ্ঞানীরা এখন যাতে আর তা কারও সঙ্গে না হয় তার সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করছেন। মনে হয় আগেরবার যারা আমার মতো মেসেজ পেয়েছিল তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হবে, কে জানে কত কী হয়তো আরও অনেকদূর এগিয়েছে ভেতরে ভেতরে। যা হোক, শুনলাম কোনও একটা মুন ক্রেটারের নাম করা হতে পারে আমার নামে, আমার সম্মানে, যেহেতু আমি এই বিরাট এক আবিষ্কারে এত সহযোগিতা করলাম, তাও একবার না দু-দু”বার। আমি ঠিক করেছি আমি অনুরোধ করব আমার সঙ্গে যেন তীর্থ মজুমদারের নামটাও যোগ করা হয়। এতদিন পরে সেই মানুষটার কিছু স্মৃতি যেন থেকে যায়, তাঁর কথাও আমাদের কখনও ভুলে যাওয়া উচিত না, কখনও না।

অলঙ্করণঃ ইন্দ্রশেখর

জয়ঢাকি গল্প-উপন্যাসের লাইব্রেরি এইখানে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s