বইপড়া

পুরোনো বই

কোটাল কাহিনি

সমালোচনা করলেন পিয়ালি ব্যানার্জি

bookreviewpurono55 (Medium)

একজন পুলিশের হাতে যখন কলম,তাও শুধু পুলিশ বলা ভুল,উত্তরপ্রদেশ পুলিশের প্রথম ভারতীয় আই.জি শ্রী বিশ্বনাথ লাহিড়ী,তখন বইটা পড়তেই হয়,কারণ এমন বই সচরাচর পাওয়াই যায় না।পেলেও তথ্যের ভারে ভারি হয়ে ওঠে।

এ বইটার নাম কোটাল কাহিনী। এর ১৫৯ পাতার প্রতিটিই রোমাঞ্চকর। ছোটো ছোটো গল্পে লেখক তাঁর অভিজ্ঞতা শুনিয়েছেন সহজ ভাষায়। লেখার ভঙ্গীটি নিরপেক্ষ। তিনি যখন চাকরিতে যোগ দেন তখন ১৯২২ সাল। ব্রিটিশ শাসন ভারতে পুরোমাত্রায় কায়েম। ১৯৫৩ সালে যখন তিনি অবসর নেন তখন ভারত স্বাধীন। মুখবন্ধে লেখক নিজেই লিখছেন, “অনেক ব্যাপারে সেকালের রীতিনীতি অন্যরকমের ছিল,যা আজ ইতিহাসের বিষয় হয়ে  দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতের জন্যে সেগুলি অক্ষুণ্ণ রাখা দরকার। এই বইখানার অন্যান্য অজুহাতের মধ্যে সেও এক অজুহাত।”

আর একটা কারণে বইটা তরতরিয়ে পড়া হয়ে যায়, সেটি লেখকের ভাষায় বলি,”যতদূর সম্ভব আমি নিজেকে আড়ালে রেখে বিষয়মুখী করার চেষ্টা করেছি,কোথাও মিথ্যা রঙ চড়াবার প্রয়াস করিনি।”

হারিয়ে যাওয়া যুগের গল্প শোনানোর ইচ্ছেতেই এ বই লেখা। লেখক বলছেন, ইংরেজ শাসনের দোষ ও গুণ দুটিই সমান মাত্রায় ছিল,তবে শাসনকার্যটি তারা ভালোভাবেই জানত। তবে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে ভারতীয়দের সংখ্যা ছিল হাতে গোণা,আর নিযুক্ত হলেও তাদের কীভাবে ব্রাত্য করে রাখা হত তার বর্ণনা  চমৎকার সরসভাবে লিখেছেন। ওই কাজে “যেসব ব্রিটিশ যুবক যোগ দিত,তারা একেবারে নিরক্ষর না হলেও তেমন শিক্ষিত ছিল না,তাদের এদেশে আসার মুখ্য প্রলোভন ছিল বাঘ ভাল্লুক শিকার।”

বইটি অনেকগুলি প্রচ্ছদে ভাগ করা। সূচনায় ‘হাতেখড়ি’,তারপর সত্যযুগ,কোকেন বিক্রেতা কেরামত,পাতাল প্রবেশ,বম মহাদেব,মাধো সিং-এর পঞ্চত্বপ্রাপ্তি,সশরীরে স্বর্গারোহণ, ব্রহ্মদৈত্যের দৌরাত্ম ইত্যাদি। নামগুলো পড়লেই বোঝা যায় বেশ মজাদার গল্পের রসদ রয়েছে এতে।

চতুর রামদাস এর গল্প পডে মনে পড়ে যাচ্ছিল ক্লিন্ট ইস্টউডের বিখ্যাত মুভি ‘এসকেপ ফ্রম আলকাত্রাজ।’ সত্যি বলতে কি,প্রায় প্রতিটি গল্পেই এরকম থ্রিলার বানানো যেতে পারে ইচ্ছে করলেই। এখন তো শর্ট ফিল্মের যুগ।

বশীরের অধ:পতন গল্পে সবচেয়ে বেশি মন টানে সাবিরার কথা যে বশীরের মত ডাকাতকে  বিয়ে করতে রাজি ছিল সানন্দে এবং “সে স্বামীর সঙ্গে সমানে ঘুরে বেড়াত। কখনো হেঁটে,কখনো বাইসাইকেলে, আবার কখনো টাট্টু ঘোড়ার পিঠে বসে।

বইটির প্রথম প্রকাশ ১৯৭৯ সালে দেজ পাবলিশিং এর শ্রী সুধাংশুশেখর দের পক্ষে। এই বইটি আমি আমার বাবা মলয় কুমার ব্যানার্জির কাছ থেকে পুরস্কার পাই কোন বছর ক্লাসে ওঠার সময়,তাই এই সুযোগে বাবাকেও ধন্যবাদ দিচ্ছি। সে সময় বইটির দাম ছিল ১০ টাকা। আর প্রচ্ছদটি দেখাতে না পারার জন্যে দু:খ রইল,পোকার হাত থেকে বাঁচাতে বাঁধাইয়ের সময় ওটি ফেলে দিতে হয়েছিল। এখনকার যুগ হলে নিশ্চই ছবি তুলে রাখা যেত ফোনেই।

শেষ কথায় বলি:

বইয়ের শেষ পাতায় পুনশ্চ অংশটি আমার খুব জরুরি ও প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। লেখকের জবানিটাই তুলে দিলাম এখানেà

উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী গোবিন্দবল্লভ পন্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী দুজনেই খুব উঁচুদরের বিচক্ষণ  লোক ছিলেন,তাঁরা আমার ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখতেন আমার কাজে কখনো হস্তক্ষেপ করতেন না ফলে পুলিশের যথেষ্ট  সুনাম হয় অপরাধের সংখ্যা কমে যায় আজ কিন্তু আগেকার তুলনায় অপরাধের সংখ্যা  অনেক  বেড়ে গেছে পুলিশের কাজ অপরাধ অপরাধীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা কিন্তু তা করতে হলে তাদের কাজের সাহ স্বাধীনতা চাই অফিসাররা নিজে থেকে কাজ করার ক্ষমতা হারিয়েছে সম্বন্ধে দোষ তাঁদের যাঁরা শাসনের উচ্চশিখরে বসে শাসনপ্রণালী সম্বন্ধে তাঁদের মধ্যে অনেকেই অনভিজ্ঞ অথচ তাঁদের সব ব্যাপারেই হস্তক্ষেপ করা চাই দেখা যাক কতদিনে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে।”

 সম্পাদকীয় সংযোজনঃ

এ বইটার ই কপি সংরক্ষিত হয়েছে দিল্লির ডিজিটাল লাইব্রেরি অব ইন্ডিয়ার ইনটারনেট অর্কাইভে। সেখানে গিয়ে নীচের ঠিকানায় বইটার সব পাতাগুলোকে ছবি ফর্ম্যাটে ডাউনলোড করতে পারো। সেইখান থেকেই বইটার মলাট উদ্ধার করে সঙ্গে দিলামঃ

ডিজিটাল লাইব্রেরি অব ইন্ডিয়ায় এই বইটির লিংক