বই পড়া নতুন বই আমার বাংলা সুভাষ মুখোপাধ্যায় বর্ষা ২০১৬

আগের সংখ্যায় বইমেলা ২০১৬ তে প্রকাশিত নতুন এগারোটি বইয়ের রিভিউ

 জানাচ্ছেন তাপস মৌলিক

bookreview03 (Medium)‘পদাতিক’ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের (১২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৯ – ৮ জুলাই ২০০৩) নামডাক কবি হিসেবেই বেশি। কিন্তু তাঁর অননুকরণীয় গদ্যের মায়াজালে যে পড়েছে, সে মজেছে।

‘আমার বাংলা’ কবি সুভাষের এরকম এগারোটি গদ্যের সংকলন; বিষয় স্বাধীনতার আগের দশ বছরের অবিভক্ত বাংলা; দুর্ভিক্ষপীড়িত, রোগজ্বালায় জর্জরিত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের করাল ছায়াগ্রস্ত, ইংরেজ শাসন ও শোষণে পর্যুদস্ত, আবার সেই দমবন্ধ অবস্থাতেও স্বাধীনতা আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গে ক্ষণে ক্ষণে দাউ দাউ বিদ্রোহে জ্বলে ওঠা বাংলা। কবি নিজের চোখে যেরকম দেখেছেন, ছোটদের পড়ার মত করে বলেছেন।

লেখাগুলি প্রকাশিত হয়েছিল তখনকার ‘রংমশাল’ পত্রিকায়; প্রথম বই হয়ে বেরোয় ১৯৫১ সালে; ক’বছর আগে ফের ছাপা হয়েছে। বইটির ভূমিকায় নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন –

‘… সুভাষ পদাতিক হয়ে বাংলার পথে ঘাটে মাঠে বেরিয়েছিলেন দেশের অগণিত মানুষের পরিচয় নেবার জন্য, তাদের দুঃখ-সুখ, আনন্দ-বেদনা, আশা-আকাঙ্খাকে হৃদয়ের মধ্যে গ্রহণের জন্য, নিজের যথার্থ পরিচয় পাবার জন্য। সে সুদীর্ঘ কয়েকটি বৎসর সুভাষের অজ্ঞাতবাস, এ নির্বাসন ব্যর্থ হয়নি; পদাতিক জীবন তাঁকে নতুন ঐশ্বর্যের সন্ধান দিয়েছে, দেশের মাটির সঙ্গে পরিচয় সাধন করিয়েছে। এই তো যথার্থ আত্মপরিচয়।

 ‘আমার বাংলা’ এই পরিচয়-সাধনার ইতিহাস এবং সাধন-অভিজ্ঞতার আনন্দময় কাব্য।

দেশকে ও দেশের মানুষকে জানা, হৃদয়ের মধ্যে গ্রহণ করা – এর চেয়ে গভীরতর জীবন-উৎসের কথা আমি জানিনে। সুভাষ সেই উৎসের সন্ধান পেয়েছেন এবং তার সন্ধান আমাদের দিয়েছেন।’

বইটা পড়তে পড়তে চোখের সামনে একের পর এক টুকরো ছবির মত ভেসে ওঠে সেদিনের বাংলা, তাঁর বিচিত্র মানুষজন; মনে হয় যেন সিনেমা দেখতে বসেছি। ‘গারো পাহাড়ের নীচে’ যারা থাকে, সেই হাজং, ডালু আর গারোদের কথা; হাজং বিদ্রোহের কথা; বরাকরের কয়লাখনি অঞ্চলের কালিঝুলিমাখা বস্তি; দুর্ভিক্ষে ছারখার হয়ে যাওয়া বিক্রমপুর, জঙ্গলমহল, মেদিনীপুর; জগদ্দলের চটকল শ্রমিকদের ঘিঞ্জি দমচাপা আস্তানা – একের পর এক ছবি। আর ছবিগুলি ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে চিত্তপ্রসাদের পাতাজোড়া অসাধারণ সব অলঙ্করণ। না, সে কাহিনী রূপকথার সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা বাংলাদেশের নয়। সেদিন তাঁর বুকভরা মধু নির্মমভাবে শুষে নিয়েছিল পঞ্চাশের মন্বন্তর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, জোতদার জমিদার আর শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা।

মানুষ সহজে হার মানে না, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে রুখে দাঁড়ায়, ফুঁসে ওঠে। বাংলার মানুষও হার মানেনি। ওদিকে ‘চাটগাঁয়ের কবিওয়ালা’ রমেশ শীল তাঁর দলবল আর ঘুমভাঙানিয়া গান নিয়ে মানুষকে জাগাতে জেলায় জেলায় ছুটে বেড়ান। হুঁশ ফেরে মানুষের, যেন নুয়ে পড়া ধানের শীষগুলো বর্শার ফলকের মতো সাহসে টান হয়ে যায়। এদিকে ফি বছর অজয় আর দামোদরের সর্বগ্রাসী বন্যায় বিপর্যস্ত বর্ধমানের গ্রামের মানুষ একদিন হাজারে হাজারে বেরিয়ে আসে ঘর ছেড়ে। সরকারের মুখ চেয়ে থেকে ভাগ্যের হাতে পড়ে পড়ে মার খেতে তারা আর রাজি নয়, বন্যার মুখে তারা নিজেরাই বাঁধ বাঁধবে। ভদ্দরলোকেদেরও তারা টেনে নামায় তাদের সঙ্গে, হাতে ঝুড়ি কোদাল ধরিয়ে দেয়। গান গেয়ে তাদের উৎসাহ দিতে সেখানে পৌঁছে যান বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র। ফুটপাথে মৃত্যুর মিছিল, দাঙ্গা আর জাপানি বোমাতেও নিঃস্পৃহ, সকাল-সন্ধ্যে ঘাড় গুঁজে থাকা ‘আপিস যাও আর বাড়ি ফেরো’-র ‘কলের কলকাতা’ হঠাৎ হঠাৎ ক্ষেপে ওঠে ইংরেজদের বিরুদ্ধে, প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়ে, গর্জন করে ওঠে ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনিতে। ইতিহাস বইয়ের শুকনো পাতায় এসব ছবি লেখে না, লেখেন কবি সুভাষ। কেমন? একটু দেখা যাক –

 ‘ধর্মতলার চৌমাথা থেকে দূরে দেখা গেল একটা মিছিল। লাল, সবুজ আর তিনরঙা নিশান গিঁঠ দিয়ে বাঁধা। এগিয়ে এল মিছিল। যাবে দক্ষিণে। হঠাৎ তিনটে ছুটন্ত মিলিটারি ট্রাক রাস্তার পাশে থেমে গেল। লাফ দিয়ে নেমে পড়ল তিন গাড়ি পল্টন। রুখে দাঁড়িয়ে বুক টিপ করে তারা রাইফেল উঁচিয়ে ধরল। খবরদার! আর এক পা এগিয়েছো কি…

রুদ্ধ নিশ্বাসে দাঁড়িয়ে আছি। কী করবে মিছিলের আগের লোকগুলো? এগিয়ে যাবে? গুলির মুখে প্রাণ দেবে? ‘জয়হিন্দ’ আওয়াজ তুলে বুক টান করে লোকগুলো পা বাড়াল সামনের দিকে। কী হল? বীরপুঙ্গব পল্টনেরা যে সভয়ে সরে দাঁড়াল দুপাশে! গুলি করার হুকুম ছিল, কিন্তু সামনাসামনি দাঁড়িয়ে সাহসে কুলোয়নি তাদের।

মাঝে মাঝে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি চলছে কার্জন পার্কের দিকে।

তারই মধ্যে একটি বাচ্চা ছেলে দেখি একটা লাঠির আগায় ছেঁড়া ন্যাকড়া জড়িয়ে মশাল জ্বালিয়েছে। মশালটা নিয়ে আস্তে আস্তে সে রাস্তা পার হল। সামনে মিলিটারি ট্রাক দাঁড়ানো। তবু ভ্রূক্ষেপ নেই। কাছেই সাহেবদের একটা হোটেল। একতলার দরোজা-জানলা আঁটা। ছেলেটা হাতে মশাল নিয়ে থাম বেয়ে ওপরে উঠল। তারপর জ্বলন্ত মশালটা ছুঁড়ে ফেলে দিল ভেতরে। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। সাহেবদের ভয়ার্ত চিৎকার। তারপর ছেলেটা থাম বেয়ে আস্তে আস্তে নীচে নেমে এল। মিলিটারি লরিটার দিকে ক্রুদ্ধ চোখে একবার তাকিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে যখন সে চৌমাথায় এসে পৌঁছল, তখন লুঙ্গিপরা এক ফলওয়ালা ঝুড়ি হাতে ছুটতে ছুটতে এসে তার হাতে একটা কমলালেবু গুঁজে দিয়ে গেল। কমলালেবুটা ছাড়াচ্ছে এমন সময় পেছন দিক থেকে গুলির একটা শব্দ। ছেলেটা মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গেল।

মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মিনিটে একজন করে বুলেট-বেঁধা লোক আসছে। কাউকে কাউকে হাসপাতালে না নামিয়ে সোজা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মর্গে। যাদের আত্মীয়স্বজন আছে, তাদের ঘিরে আকাশবাতাস জুড়ে বুকফাটা চিৎকার উঠছে।

একজন ধুতিপাঞ্জাবিপরা লোক ঢুকতে চাইছিল ইমার্জেন্সির ভেতর। ভলান্টিয়াররা কিছুতেই ঢুকতে দেবে না।

-দেখুন মশাই, ভিড় বাড়াবেন না।

লোকটাও নাছোড়বান্দা – আমার দরকার আছে।

ভলান্টিয়ার ছেলেটি এবার চটে গেল। কী দরকার শুনি?

লোকটা খুব শান্তভাবে বলল, গুলি লেগেছে আমার।

গুলি লেগেছে? দেখি?

লোকটা পেছন ফিরল। পিঠের দিকে জামা আর কাপড় রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কড়ে আঙুল সমান ছ্যাঁদা হয়ে গেছে পিঠটা।

বলেননি কেন এতক্ষণ? হেঁটে এসেছেন কেন?

বলে হন্তদন্ত হয়ে ভলান্টিয়ার ছেলেটি খাটের ওপর লোকটিকে শুইয়ে ধরাধরি করে ভেতরে নিয়ে গেল।

গুলি খেয়ে লোকটি ভয় পায়নি। তার লজ্জা গুলিটা বুকে না লেগে পিঠে এসে লেগেছে বলে। পিঠে গুলি দেখে লোকে না ভেবে বসে সে ভয়ে পালাচ্ছিল।’

বইয়ের শেষে ‘হাত বাড়াও’ লেখায় কবি সুভাষ একটি ছোট্ট ছেলের কথা বলেন। বারো-তেরো বছর বয়স, কঙ্কালসার চেহারা, মাজা পড়ে গেছে, হাঁটার শক্তি নেই, তাই জানোয়ারের মতো চার পায়ে চলে, বাজারের রাস্তায় ধুলো থেকে খুঁটে খুঁটে চাল আর ছোলা খায়। শুধু তার চোখ দুটো ধক ধক করে অঙ্গারের মত জ্বলে। দুর্ভিক্ষপীড়িত মহামারী-লাঞ্ছিত পরাধীন বাংলার শৈশব। কবি ডাক দেন, হাত বাড়াও ওই ছেলেটার দিকে, ও যে উঠে দাঁড়াতে চাইছে, সাহায্য করো ওকে, না হলে জ্বলন্ত ওই চোখদুটো তোমায় যে তাড়া করে ফিরবে, শান্তি দেবে না কখনও।

আজ প্রায় সত্তর বছর আমরা স্বাধীন হয়েছি। সন্দেহ নেই এগিয়েছি অনেক। বাংলার শৈশব আজ হাঁটি হাঁটি পা পা করে নিজেই হাঁটতে শিখেছে। কিন্তু এখনও ওই ছোট্ট ছেলেটা কাজ করে চায়ের দোকানে, ইটভাঁটায়; ঘুমোয় ফুটপাথে। বাবা-মা কাজে বেরিয়ে গেলে এখনও ছোট্ট মেয়েটাকে রান্না করতে হয়, ভাইকে সামলে রাখতে হয়, স্কুলে যাবার তার সময় নেই। এখনও অনেক কাজ বাকি। চলো, আমরাও হাত বাড়াই।

বইঃ আমার বাংলা

লেখকঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়

প্রচ্ছদ চিত্র ও অলঙ্করণঃ চিত্তপ্রসাদ

প্রচ্ছদঃ খালেদ চৌধুরী; আলোকচিত্রঃ সুনীল জানা

প্রকাশকঃ নিউ এজ পাবলিশার্স, ৮/১ চিন্তামণি দাস লেন, কলকাতা ৭০০০০৯

দামঃ ৮০ টাকা (চতুর্থ সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ২০০৮)

_______