বই পড়া বইবাতিক দীপক গোস্বামী বর্ষা ২০১৬

বইবাতিক আগের পর্ব

boibatik

bookreviewbatik01‘হ য ব র ল’-তে শ্রীকাক্কেশ্বর কুচ্‌কুচে অবাক হয়ে বলেছিল: “তোমাদের দেশে সময়ের দাম নেই বুঝি ?”  সময়ের দাম কীরকম জিজ্ঞাসা করাতে কাকের জবাব: “এখানে কদিন থাকতে, তা হলে বুঝতে।  আমাদের বাজারে সময় এখন ভয়ানক মাগ্যি, একটুও বাজে খরচ করবার জো নেই।  এই তো কদিন খেটেখুটে চুরিচামারি করে খানিকটে সময় জমিয়েছিলাম, তাও তোমার সঙ্গে তর্ক করতে অর্ধেক খরচ হয়ে গেল।”  বলে সে আবার হিসেব করতে লাগল।  অবশ্য কাক্কেশ্বরের হিসাবটাও আরেক হযবরল।

কিন্তু সব কিছুতে সময় বাঁচানোটা এ যুগের একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য।  ট্রাম-বাসে না চেপে ট্যাক্সিতে গেলে সময় বাঁচে, সিঁড়ি দিয়ে না উঠে লিফটে চড়লে সময় বাঁচে,  চেয়ার থেকে না উঠে এবং পাশের ঘরে না গিয়ে ইন্টারকমে কথা বললে সময় বাঁচে, চিঠি না লিখে ই-মেল করলে সময় বাঁচে, এমনকী চ্যাটে for না লিখে 4 লিখলেও সময় বাঁচে।  ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক সময় বাঁচানোটাই আজকের দিনের মূলমত্র।  ইংরেজিতে তো প্রবাদই আছে– Time is money আর আজকের দুনিয়ায় এর বিপরীতটাও একইভাবে সত্য- money is time। 

সময় বাঁচানো আমাদেরও দরকার।  ‘গোল্ডেন রুল’-এ আগে আমরা দেখেছি যে বই ব্যবহারের জন্য।  তাই প্রত্যেক পাঠককেই তার প্রয়োজনীয় বই দিতে হবে।  একই ভাবে প্রত্যেক বইকেও তার পাঠক জুটিয়ে দিতে হবে।  এরপর পাঠকদের কথা ভেবেই রঙ্গনাথনের চতুর্থ সূত্র হল:

পাঠকের সময় সাশ্রয় করতে হবে।

কারণ পাঠকের ব্যবহারের জন্য তোমার সংগ্রহকে একদিকে যেমন আকর্ষণীয় করে তোলা দরকার, অন্যদিকে প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর সময়য়ও বাঁচানো প্রয়োজন।  সময়ের অপব্যবহার কেউই চায় না।  পাঠকের অনেক কাজের মধ্যে গ্রন্থাগার ব্যবহার করাও একটি কাজ।  সেই কাজে আমরা তাঁদের সময় বাঁচানোর যত চেষ্টা করবো, ততই তাঁরা আমাদের সংগ্রহ ব্যবহার করতে উৎসাহী হবেন।  বিপরীতভাবে, তাঁর চাহিদা মতো বই, পত্র-পত্রিকা ইত্যাদি দিতে আমরা যতই দেরি করবো, তাঁরাও ততই বিরক্ত ও অসন্তুষ্ট হবেন।  আর একজন অসন্তুষ্ট পাঠক কখনই নেহাত দায়ে না পড়লে গ্রন্থাগারে আসতে চাইবেন না।  তাই গ্রন্থাগারে এসে পাঠককে যেসব পদ্ধতিগুলো পার হতে হয়, তার প্রত্যেকটিকেই আমাদের সময় বাঁচানোর উপযোগী করে তুলতে হবে।

তার আগে গ্রন্থাগারের অবস্থানের প্রসঙ্গটা আর একবার আমরা উল্লেখ করতে পারি।   আমরা প্রথম সূত্র জানবার সময় দেখেছি গ্রন্থাগারের অবস্থানটা বই ব্যবহারের পক্ষে কতটা প্রয়োজনীয়।  একইভাবে লাইব্রেরিতে পৌঁছতে সময় বাঁচানোর জন্যও এটা খুব জরুরি।  রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার জোড়াসাঁকোতে থাকার সময় যাতায়াত যতটা সহজ ছিল, কলকাতার প্রান্তে বেলগাছিয়ায় উঠে যাবার পর নিশ্চয়ই ততটা নেই।  কারণ শহরের কেন্দ্র থেকে নতুন জায়গাটার দুরত্ব অনেক বেড়ে গেছে। স্থানীয় কিছু ছাত্রছাত্রী ছাড়া বেশির ভাগ পাঠকেরই সেখানে পৌঁছতে বেশি সময় লাগবে।  আবার অবস্থানের সঙ্গে যানবাহনের সুযোগ সুবিধারও একটা ঘনিষ্ট যোগ আছে।  পাতাল রেল হবার পর এখন দুরত্বের মাপটা মেট্রো দিয়ে করা হয়।  শ্যামবাজার থেকে কালীঘাটের দুরত্ব আগে যা ছিল সময়ের হিসাবে মেট্রোর মাধ্যমে এখন তা অর্ধেকেরও কম।  তাই অবস্থান পছন্দ করার আগে এইসব সুবিধাগুলোও দেখে নেওয়া দরকার।

অবস্থান পছন্দ করা তো পরিকল্পনা স্তরে একবারের কাজ।  কিন্তু গ্রন্থাগারে রোজকার যত কাজ আমরা করি, সেখানেও পদ্ধতিগত সিদ্ধান্তগুলো এমনভাবে নিতে হবে যাতে পাঠক বুঝতে পারেন, এতে অন্য সুবিধার সঙ্গে সময়ও সাশ্রয় হবে।  ফলে তাঁরা আমাদের কাজকর্ম সম্পর্কেও আগ্রহ বোধ করবেন।  এতে লাইব্রেরির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যও সিদ্ধ হবে।  আবার এটাই পাঠককে গ্রন্থাগারে টেনে আনার একটা অতিরিক্ত আকর্ষণ। 

bookreviewbatik02ধরা যাক, কোনও লাইব্রেরি বই কেনার জন্য কিছু টাকা জোগাড় করেছে।  তারা মেম্বারদের জানিয়ে দিল যে প্রত্যেকে যেন চারটে বই-এর নাম, তাদের লেখক ও প্রকাশকের নাম এবং দাম জানিয়ে একটা তালিকা নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে গ্রন্থাগারে জমা দেয়। বই-এর এবং তার লেখকের নামটা জানা থাকলেও এরজন্য পাঠকদের সব কাজ ফেলে প্রকাশকের নাম ও দাম জোগাড় করতে হবে, নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে লাইব্রেরিতে আসতে হবে এবং জমা দিতে হবে।  এর বদলে আমরা যদি বলতাম যে টেলিফোন বা মোবাইলে শুধু বই এবং লেখকের নাম (অন্য সব তথ্যগুলো লাইব্রেরির পক্ষে জোগাড় করা অনেক সহজ) জানালেও চলবে– তাহলে তথ্য খোঁজার ব্যাপারে পাঠকের অনেক সময় বাঁচতো।  ধরা যাক, এক সময় বইগুলো কেনা হল।  হতে পারে, এর মধ্যে বেশিরভাগই বাংলা গল্পের বই।  নিয়ম মতো বাংলা সাহিত্য বিভাগে হয়তো এই বইগুলো থাকার জায়গা পেছনের দিকের কোনও তাকে।  কিন্তু আপাতত তো সবাই এগুলো নিয়েই টানাটানি করবে।  তাই কিছুদিনের জন্যও যদি এই বইগুলোকে ‘নতুন সংযোজন’ (New Books বা New Additions) নাম দিয়ে সামনের দিকের কোনও তাকে রাখা যায়, তবে নিশ্চয়ই পাঠকদের খোঁজাখুঁজির অনেক সময় বাঁচবে।  এ দুটি নেহাতই মামুলি উদাহরণ।  এ রকম অজস্র পদ্ধতি আছে যেগুলোর মাধ্যমে ইচ্ছা করলেই পাঠকের সময় বাঁচানো যায়।

সেই রকমই একটি পদ্ধতি হচ্ছে, যথাযথ নির্দেশিকা বা প্রদর্শিকার ব্যবহার।  নির্দেশিকার অভিধানগত অর্থ– সূচিপত্র (content), তালিকা (list), নির্ঘণ্ট (index), আর প্রদর্শিকার ইংরেজি অর্থ guidebook (পথপঞ্জী)।  কিন্তু এইসব আভিধানিক অর্থে শব্দদু’টি এখানে আমরা ব্যবহার করছি না।bookreviewbatik03 ইংরেজিতে Signage বলে যে শব্দ আছে, আপাতত সেই অর্থেই শব্দদু’টি এখানে প্রয়োগ করতে হচ্ছে।  কিন্তু সাইন (Sign) মূলতঃ ছবির বা কিছু চিহ্নের মাধ্যমে কিছু তথ্য জানাবার জন্য ব্যবহার করা হয়।  যেমন যানবাহন নিয়ন্ত্রনের জন্য সর্বত্র ব্যবহার করা এই সাইন দু’টো তোমাদের খুবই পরিচিত, যার মধ্যে প্রথমটা No Entry-র চিহ্ন আর দ্বিতীয়টা School-এর।

কিন্তু আমরা যে signage-এর কথা বলতে চাইছি সেখানে শুধু এরকম চিহ্নই থাকবে না, প্রয়োজনমতো লিখিত নির্দেশও থাকবে।  যেমন–

bookreviewbatik04

এখানে প্রথম signage-এ বই ফেরত দেবার জায়গাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।  দ্বিতীয়টাকে লাইব্রেরির ভাষায় বলে Shelf guide।  এটা সচরাচর বই-এর তাক (শেলফ)-এর পাশে আটকানো থাকে।  এই নির্দেশিকায় সাহিত্য (Literature) এবং ইংরেজি সাহিত্য (English Literature)-এর বর্গ সংখ্যা দেখানো হয়েছে।  অর্থাৎ সাহিত্য এবং ইংরেজি সাহিত্যের বই এই তাকে পাওয়া যাবে।  ঠিকমতো নির্দেশিকা ব্যবহার করতে পারলে পাঠককে অনেক প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য গ্রন্থাগারের কর্মীদের কাছে বারবার যেতে হবে না।  এতে একদিকে তাঁর সময় বাঁচবে, অন্যদিকে নির্দেশিকা অনুযায়ী বইপত্র খুঁজে নিতে পারলে পাঠকের আত্মবিশ্বাস বাড়বে– তিনি সমগ্র ব্যবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।  একইভাবে সময় বাঁচবে গ্রন্থাগার কর্মীদেরও।

          এই সময় বাঁচানোর ব্যাপারে একটা কথা মনে রাখা দরকার, যার সম্পর্কে রঙ্গনাথনই আমাদের সচেতন করেছিলেন।  এখানে সময় দু’ রকম– কল্পিত বা মনগড়া সময় (Subjective time) এবং যথযথ বা বাস্তবধর্মী সময় (Objective time)।  ধরো, তোমার এক পুরনো বন্ধু দিল্লী থেকে বেড়াতে আসছে, তুমি তাকে স্টেশনে আনতে গেছ।  তখনও ট্রেন আসতে দশ মিনিট দেরি– তুমি স্টেশনে ছটফট করছ, প্লাটফর্মের একদিক থেকে অন্যদিকে পায়চারি করছ, ট্রেন ঠিক সময় স্টেশনে ঢুকলেও তোমার মনে হবে আজ বোধহয় ট্রেন আধঘণ্টা লেট করল।  আবার যেদিন সে ফিরে যাচ্ছে, সেদিন তাকে তার বার্থে বসিয়ে আধ ঘণ্টা গল্প করার পর ট্রেন ছেড়ে দিল।  আর তোমার মনে হল, ইস মাত্র পাঁচ মিনিট গল্প করতে পারলাম !  এই যে একই সময়কে কমবেশি দেখাবার চেষ্টা, এটাই মনগড়া সময়।  আর যথযথ সময়ে আধঘণ্টার অর্থ আধঘণ্টাই।  গ্রন্থাগারেও যখন পাঠক একটা পরিসেবা চেয়ে অপেক্ষা করেন তখন অপেক্ষাপর্বটা মনগড়া সময় অনুযায়ীই হয়।  আর সেই সময়টা আমরা যতটা কমাতে পারব, ততই পাঠক খুশি হবেন,  আমাদেরও সুনাম হবে।

          চতুর্থ সূত্র নিয়ে আরও  অনেক কথা বলা যায়, অনেক গল্প।  কিন্তু আপাততঃ এখানেই থামা যাক।  পরের বারে আমরা দেখব পঞ্চম সূত্র।

ক্রমশ