বনের ডায়েরি দোল দিলীপ নস্কর বসন্ত ২০১৮

দোলযাত্রা

দিলীপ নস্কর (ডেভিড)

দোলপূর্ণিমার ঠিক আগের দিন দুপুরবেলায়, শুশুনিয়া পাহাড়ের ওপর থেকে নীচের দিকে নামছি। যে রাস্তাটা ওপর থেকে সোজা এসে, কোলে-বাংলোর পাঁচিলে ধাক্কা খায়, ঠিক তার আগে ছোট্ট তিন রাস্তার মোড়ে, একটা প্যাঁচানো তেঁতুল গাছ আছে। যে গাছটাকে দেখলেই আমার, ভৌতিক ইংরেজি সিনেমার ভৌতিক গাছ বলেই মনে হয়। সেখান থেকে ডানদিকের রাস্তাটা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে, বিট অফিসকে বাঁ হাতে রেখে সোজা বড়ো রাস্তার সঙ্গে মিশেছে। আর সোজা রাস্তাটা খানিকটা গিয়ে, কোলে বাংলোকে সামনে রেখে, বাঁ দিকে বেঁকে গেছে। ঠিক সেখান থেকেই লোকটাকে সবার আগে আমি দেখতে পেলাম। আমার দিকে পেছন করে উবু হয়ে বসে কিছু একটা করছে। সন্দেহটা দূর থেকেই হয়েছিল। কাছে যেতে সন্দেহটা আরও প্রকট হল। সামনের দিকে ঘুরে, একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তাকে দেখেই আমি অবাক হয়ে গেলাম।

মনে পড়ে গেল, পনেরো ষোল বছর আগেকার একটা ঘটনার কথা। ব্যাপারটা একটু গুছিয়ে বলি। সেবারও দোলপূর্ণিমার সময় এই শুশুনিয়া পাহাড়েই, বিখ্যাত ও পাহাড় চড়িয়েদের এক দলের সঙ্গে আমিও জুটে গিয়েছিলাম। সালটা দু’হাজার এক বা দুই হবে বোধ হয়। মোট ছ’জনের দলের, এক আমি ছাড়া বাকি পাঁচজনই হল পশ্চিমবঙ্গের দুর্দান্ত নামকরা সব রক ক্লাইম্বার। তাদের তুলনায় আমি নেহাতই, মামুলি একজন পাহাড় ভ্রমণকারী। সে দলে আমার মূল কাজ ছিল, পাহাড় চড়ার সরঞ্জাম পিঠে করে বয়ে নিয়ে ওপরে তোলা, আর তাদের সঙ্গ দেয়া। এছাড়া কোনো কোনো সময়, নীচের ক্যাম্পে থেকে গিয়ে, দলের সবার জন্য রান্না করে রাখা।

যতদূর মনে পড়ে, সে রকমই কোনো এক দিন দুপুরের খাবার বলতে, শুধুই খিচুড়ি। আর সেটা রান্না করার দায়িত্ব আমারই ওপর। কারন দলের আর বাকি সবাই পাহাড়ের মাথায় রক ক্লাইম্বিং করার নেশায় ব্যস্ত। কেরোসিনের পাম্প স্টোভে, ছ’জনের খাওয়ার মতো পরিমাণের খিচুড়ি বসিয়ে দিয়েই তাঁবুর ভেতরে শুয়ে একটু গান শুনছিলাম। আওয়াজটা অনেকক্ষণ ধরেই থেকে থেকে কানে আসছিল। শুকনো পাতার ওপর হাঁটাচলার খরখরে আওয়াজ। কারা যেন তাঁবুর চারপাশে ঘোরাফেরা করছে। বেশ আরামে শুয়ে গান শুনছিলাম, কিছুতেই উঠতে ইছে করছিল না। মনে মনে খুব বিরক্ত হলাম। নাঃ, এবার উঠতেই হবে, আর যাই হোক কুকুর কিংবা গরু ছাগল হলে, আমার খিচুড়ির হাঁড়িটা উল্টে দিতে পারে। কারণ আওয়াজটা ক্রমশ আমাদের তাঁবুর দিকেই এগিয়ে আসছে। তাঁবুর বাইরে বেরিয়েই যা দেখলাম, সেটার জন্য মোটেও তৈরি ছিলাম না। নেহাতই নিরীহ একজন অর্ধউলঙ্গ মানুষ। বয়েস অনুমান ৩০-৩৫, পরনে, প্রায় এক মাসের না কাচা ছেঁড়া লুঙ্গি, খালি গা। তার সঙ্গে বছর পাঁচ ছয়ের একটি মেয়েও আছে, সেই এদিক সেদিক লাফিয়ে লাফিয়ে খেলা করে বেড়াছে।

দোলের এই সময়টা প্রচুর পরিমাণে শুকনো পাতা ঝরে জঙ্গলময় বিছিয়ে থাকে। লোকটা সেই শুকনো পাতাগুলোই কুড়িয়ে কুড়িয়ে, বিরাট এক নাইলনের সুতো দিয়ে তৈরি বস্তার মধ্যে ভর্তি করছে। আর তার সেই কাজে, বাচ্ছা মেয়েটিও, খেলার ফাঁকে ফাঁকে যতটা সম্ভব সাহায্য করছে।

দোলপূর্ণিমার রং আবীর খেলার আনন্দ-উৎসব যে এদের গায়ে কোন ভাবেই স্পর্শ করতে পারে না সেটা এদের দেখলেই বোঝা যায়। সাতপাঁচ চিন্তার মধ্যে হঠাৎ রান্নার ব্যাপারটা মনে পড়তেই তিড়িং করে লাফিয়ে উঠলাম, দৌড়িয়ে খিচুড়ির হাঁড়িটার কাছে গিয়ে, খুন্তি দিয়ে খিচুড়িটা ঘাঁটতেই দেখি, যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই, হাঁড়ির নিচের দিকে অনেকটা ধরে গেছে, পোড়ার ঠিক আগের অবস্থা, ভাগ্যিস মনে পড়েছিলো। আর একটু দেরি হলেই হয়েছিলো আর কি, আমার খিচুড়িটার অবস্থা দফারফা হয়ে যেত। হাঁড়িতে একটু জল ও প্রয়োজনীয় মশলাপাতি দিয়ে খিচুড়িটা ভালো করে খুন্তি দিয়ে ঘেঁটে, স্টোভটা নিভিয়ে হাঁড়িটা নামিয়ে একটা থালা দিয়ে ঢেকে রাখলাম। পুরো ব্যাপারটা ম্যানেজ করতে মিনিট দশেকের মত সময় পেরিয়ে গেছে। তাই ওদের দিকে আর নজর দিতে পারিনি। ফের ঘুরে তাকাতেই দেখি, লোকটা দূর থেকেই আঙুল দিয়ে, আমার তাঁবুর পেছনের দিকটায় কিছু একটা দেখাচ্ছে। আমাদের দলের কয়েকজন, কিছু শুকনো কাঠ জোগাড় করে রেখেছিল, রাতে ক্যাম্পফায়ার করবে বলে। সেখান থেকেই খানিকটা সে নিতে চায়।

হাতের ইশারায় কাছে ডাকলাম, বেশ ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এসে আমার থেকে হাত দশেক দূরে দাঁড়াল। এই প্রথমবার তাকে ভালো করে দেখার সুযোগ পেলাম। রোগা হাড় জিরজিরে চেহারা, মানুষটার পাঁজরের হাড় কখানা গোনা যাছে, দাঁতের ফাঁকে নোংরার প্রলেপ দেখে মনে হয়, দাঁত মাজাকে এরা হয়তো শৌখিন বাবুগিরি বলেই মনে করে! বাচ্চা মেয়েটিও লোকটার পেছনে এসে, যতটা সম্ভব নিজেকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। আর মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে পিটপিট করে আমাকে দেখছে, তার চেহারাও খুব একটা ভালোর দিকে নয়। পরণে একটা পুরোনো ছেঁড়া ফ্রক, তেল সাবানের অভাবে মাথার চুলগুলো উশকোখুশকো। দেখেই বোঝা যায় শরীরে যারপরনাই পুষ্টির অভাব।

লোকটাকে দেখিয়ে মেয়েটিকে জিগ্যেস করলাম, ও তোর কে হয়? খুব শান্ত ভাবে বলল, আমার বাবা, বলেই আবার বাবার পেছনে লুকিয়ে পড়ল। লোকটাকে কাছে ডেকে জিগ্যেস করলাম, কী বলছিলে? ওই কাঠগুলো নেবে, তাই তো ?

ভীষণ অপরাধ করে ফেলেছে এমন একটা ভাব নিয়ে, হালকা লাজুক হাসি হেসে বলল, যদি দেন তো ভালো হয়, তাড়াতাড়ি ঘরে যেতে পারি। বললাম নিয়ে যাও, তবে সবগুলো নিও না।

লোকটি তখন কাঠগুলো ছোটো ছোটো করে ভেঙে দড়ি দিয়ে বেঁধে একটা বোঝা বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আর তখন সেই ফাঁকে মেয়েটি আমার খিচুড়ির হাঁড়িটার চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখার চেষ্টা করছে, হাঁড়িতে কী আছে!

কী করব বুঝে উঠতে পারছি না, কিন্তু আমার মন অন্য কথা বলছে। হাঁড়ি থেকে যদি কিছুটা খিচুড়ি, মেয়েটাকে খেতে দিই, তাহলেও আমাদের এমন কিছু কম পড়ার কথা না। কিন্তু চিন্তা অন্য জায়গায়, মেয়ের সঙ্গে মেয়ের বাবাও যদি খেতে চায়? সেক্ষেত্রে অবশই আমাদের দুপুরের খাবার কম পড়বে। আর নতুন করে খিচুড়ি বানানো সম্ভবও নয়।

রোদ নেই, আকাশে হাল্কা মেঘ আছে, থেকে থেকে ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। শেষমেশ মেয়েটাকে বলেই বসলাম, একটু খিচুড়ি খাবি নাকি? আমার কথার উত্তরে হ্যাঁ বা না, কিছুই না বলে অবাক হয়ে ওর বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। আমি যে ওকে খিচুড়ি খাওয়ার কথা বলতে পারি, সেটা ওর বিশ্বাসই হচ্ছিল না। বুঝলাম, খাবে।

একটা বড়ো থালায় খিচুড়ি ঢেলে, মেয়েটাকে খেতে দিলাম। হাত ধোয়ার কোনও বালাই নেই। খিচুড়ির থালা নিয়ে ম্যাট্রেসের ওপর বসে পড়লো। কিন্তু কিছুতেই ম্যানেজ করতে পারছে না। গরম খিচুড়ি খেতে ভীষণ অসুবিধা হচ্ছে দেখে ওর বাবাকে ডাকলাম। থালাতে অনেকটাই খিচুড়ি দিয়েছি, বললাম, খিচুড়িটা ঠাণ্ডা করে মেয়েটাকে খাইয়ে দাও, তুমিও একটু খেতে পারো। ব্যস! আর দেখে কে, অদ্ভুত কায়দায় লোকটা থালার একপাশে খিচুড়িটা ঠাণ্ডা করে দিচ্ছে, আর মেয়েটা চটপট সেগুলো খেয়ে নিচ্ছে, কিছুতেই একটুও খিচুড়ি তার বাবাকে খেতে দিচ্ছে না। ভীষণ কষ্টের সঙ্গে আমি অবাক চোখে মেয়েটার খাওয়া দেখতে থাকলাম।

কতদিন যে এরা পেট ভরে খেতে পায় না, সেটা ভগবানই জানেন। দেখতে দেখতে থালা শেষ। খিচুড়ির গরমে আর ঝালে মেয়েটির নাক চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে, কী কারণে আমার চোখও, থেকে থেকে কেন যে ঝাপসা হয়ে আসছে, সেটাও একমাত্র ভগবানই জানেন।

আরও চার হাতা খিচুড়ি থালায় দিয়ে মেয়েটাকে বললাম তুই এবার উঠে পড়, বাকিটা তোর বাবা খাবে। তাঁবু থেকে এক বোতল জল এনে মেয়েটাকে দিলাম, তাতে সে পরিষ্কার করে হাতমুখ ধুলো, আর খানিকটা জল খেয়ে, শুকনো পাতার বস্তাটার ওপরে গিয়ে বসলো।

এই সুযোগে কথাটা জিগ্যেস করলাম, তুমি আর কী কাজ কর? না কি এই পাতা কুড়িয়েই তোমার সারা বছর চলে যায়? তাতে যেটা জানতে পারলাম, পাতা কুড়োনোর কাজ শীতের শেষে এই দু’মাস মাত্র, বছরের আর বাকি সময়, কখোনো কখোনো খেতখামারে জনমজুরের কাজ জোটে। বললাম, কেন, তোমাদের এখানে তো জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী আছে। সে তো শুনেছি গ্রামের গরীব বেকার মানুষদের হাতেকলমে, পাথর কেটে মূর্তি বানানোর কাজ শেখায়। তা তুমিও তো কাজ শিখে কিছু একটা করতে পারো।

কথাটা বলেই আমার নিজেকে খুব অপরাধী বলে মনে হল। কী আহাম্মকের মতোই না কথাগুলোই আমি বলে ফেলেছি। এক্ষেত্রে বেশীর ভাগ শহুরে শৌখিন ভ্রমণকারীরাই, পাহাড় নদী গ্রাম গঞ্জে ঘুরতে এসে, গরীব বা অসহায় মানুষজন কে হাতের সামনে পেলেই, তাকে গুটিকয়েক জ্ঞান বিতরণ শুরু করেন, এ আমি বহু দেখেছি। তাই মনে মনে নিজেকেই বললাম, আমিও কি শেষে জ্ঞানপাপী হয়ে গেলাম! যাই হোক, আর কথা না বাড়িয়ে, লোকটার অতি দ্রুত খাওয়ার ভঙ্গি দেখে, আরও চার হাতা খিচুড়ি তার পাতে ঢেলে দিয়ে উঠে পড়লাম।

যদিও বেশ ভালই বুঝতে পারলাম, গণ্ডগোল যা পাকানোর নিজের অজান্তেই সেটা পাকিয়ে ফেলেছি। কারণ হাঁড়িতে মেরেকেটে বড়োজোর আর চার পাঁচ জনের মতো খিচুড়ি আছে।

সেও খাওয়া শেষ করে, কাঠ-পাতার বোঝা মাথায় নিয়ে, মেয়ের হাত ধরে তার গ্রামের দিকে হাঁটা শুরু করলো। আমিও তাদের যাত্রাপথের দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকলাম। মনটা একেবারে তেতো হয়ে গেছে, কিছুই আর ভালো লাগছে না, অথচ চারিদিকের অফুরন্ত এই প্রাকৃতিক শোভার মধ্যে কী আনন্দেই না আমি তাঁবু পেতে বসে আছি। সকালবেলার দেখা, পাতাঝরা ন্যাড়া গাছগুলোর গায়ে, নতুন গজিয়ে ওঠা কচি সবুজ পাতা, আর টকটকে লাল পলাশ ফুলগুলোও এখন কেমন যেন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। বাপ মেয়ের এই ফিরে যাওয়া দেখতে দেখতে, একটা সময় আমার চোখও ঝাপসা হয়ে এলো।

হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ার আওয়াজে আমার হুঁশ ফিরে এলো। কালো মেঘে চারিদিকের আকাশ অন্ধকার করে ঘিরে ফেলেছে। শালবনের দিক থেকে প্রচণ্ড গর্জন করে ঝড় আমাদের তাঁবুর দিকে ধেয়ে আসছে। দৌড়িয়ে গিয়ে তাঁবুর ফ্ল্যাপগুলো সব বন্ধ করে, নিজের তাঁবুতে ঢুকে পড়লাম। মুষলধার বৃষ্টি, আর সঙ্গে ঝড়, বৃষ্টির সঙ্গে তাঁবুর মাথায় টুপটাপ ঢিল পড়ার আওয়াজে, যতোটা সম্ভব ছোট করে তাঁবুর চেন খুলে বাইরে দেখি, ছোট ছোট ন্যাপথলিনের দানার মতো শিল পড়ছে। একটু শীত শীত ভাব।

স্লিপিং ব্যাগটা টেনে নিয়ে সবে গায়ে দিতে যাবো, হঠাৎ কথাটা  মনে পড়তেই, ছিটকে তাঁবু থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের দিকটায় ছুটে গেলাম, কিছুটা গিয়েই প্রচণ্ড বেগে বৃষ্টির ঝাপটায় ফিরে আসতে বাধ্য হলাম। কী করবো বুঝে উঠতে পারছিনা, মাথা কাজ করছে না। একটা অজানা ভয় আমাকে ঘিরে ধরতে থাকলো, কারন ঠিক এই সময়ই আমাদের দলের বাকি সদস্যদের নীচের দিকে ফিরে আসার কথা। সারা শরীর জ্যাবজেবে ভিজে গেছে, সঙ্গে কাঁপুনি। এভাবে কতক্ষণ কেটেছে বলতে পারব না, আচমকা জঙ্গলের দিক থেকে হইচইয়ের আওয়াজে, তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে দেখি, দলের প্রতেকে ব্যাগ মাথায় যতটা সম্ভব বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে, ছুটতে ছুটতে তাঁবুর দিকে ফিরে আসছে।

প্লাস্টিক শিট দিয়ে একটা বড় কিচেন বানিয়ে ছিলাম। সবাই ভিজে ড্রেস পালটে, শুকনো জামা প্যান্ট পরার পর, প্রথমে নিজে না খেয়ে, সেখানেই সবাইকে খেতে দিলাম। দু-একজন আমাকে সমেত এক সঙ্গে খাওয়ার কথা বলতে, বললাম, তোদের দেরী দেখে আমি আগেই খেয়ে নিয়েছি।

প্রচণ্ড খিদে পাওয়াতে, তারা চেটেপুটেই হাঁড়ি খালি করে ফেলল ঝটপট, তারপর যে যার তাঁবুতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো।

খানিক পরে বৃষ্টি থেমে গেলে, আমিও জ্যাকেটটা হাতে নিয়ে তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। জঙ্গল ছেড়ে পাকা রাস্তায় উঠে বাঁদিকে শুশুনিয়ার মোড়ের দিকে হাঁটা শুরু করলাম, প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। অসময়ে মোড়ের দোকানে দুপুরের খাবার না পেয়ে, শালপাতার ঠোঙায় খানিকটা মুড়ি ও গোটা চারেক দানাদার কিনে বেরোতে যাবো,  ঠিক সেই সময়, একেবারে মুখোমুখি “বুবি পাগলির” সঙ্গে দেখা। ব্যাস! আর যায় কোথায়! পুরনো বন্ধুর মতো জড়িয়ে ধরল, কিছুতেই ছাড়বে না, প্রচুর নালিশ তার জমা হয়েছে, সেগুলো সব আকার ইঙ্গিতে সে আমাকে শোনাতে চায়।

যেমন, আজ সকালে শুশুনিয়া-দুর্গাপুর রুটের মিনিবাসের কনডাক্টর, শুশুনিয়ার এক স্টপেজ আগে ওকে নামিয়ে দিয়েছিল। আবার দত্ত মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে যে ছেলেটা চা বানায়, তার কাছে একটা আলুর চপ চেয়েছিল, সে দেয়নি, এই সব আরকি। শেষে অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে, আমার ঠোঙার অর্ধেক মুড়ি আর দুখানা দানাদার ওকে দিলাম। এমনকি ফেরার পথে আরো একবার ওর সঙ্গে দেখা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তবে ছাড়া পেলাম।

বাকি অর্ধেক খাবার খেতে খেতে, কোলে-বাংলোকে বাঁহাতে রেখে যে রাস্তাটা সোজা ঝর্নাতলার দিকে চলে গেছে, সেদিকেই গুটি গুটি পায়ে রওনা দিলাম। রাস্তায় লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে, পড়ন্ত বিকেল, একটা হাল্কা শীতের আমেজ আছে, মেঘ কেটে গেছে পশ্চিমের আকাশ গাঢ় লাল, দারুণ একটা মন ভালো করা মনোরম পরিবেশ। কিছুটা গিয়েই রাস্তার ডানপাশে একটা পলাশ গাছ পেলাম, দুপুরে ঝড়বৃষ্টি হওয়ার ফলে, গাছটার গোড়ায় প্রচুর পরিমানে পলাশ ফুল পড়ে আছে, দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে, একটা লাল রঙের গোল কার্পেটের ওপর গাছটা দাঁড়িয়ে। সেখানে আমিও দাঁড়িয়ে পড়লাম। পিছনে তাকিয়ে দেখি, পশ্চিমের আকাশে সূর্যটা প্রকাণ্ড একটা লাল রঙের থালার মত, ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে।

মানুষজন সকাল বেলায় সূর্য প্রণাম করে, আমি এই গোধূলিবেলায় অর্ধেক ডুবে যাওয়া সূর্যের দিকে তাকিয়ে, দুহাত জড়ো করে প্রণাম করলাম, আর মনে মনে বললাম, হে ভগবান আবার যদি কখোনো, কোনোদিন, এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয়, সবশেষে যদি এরকম শালপাতার ঠোঙায় একটু মুড়ি বাতাসাও জোটে, তাতেও আমি রাজি।

পুনশ্চঃ- ভাবনাজাল ছিঁড়ে যেতেই বর্তমানে ফিরলাম। বহুদিন পর আজ এরকম একটা দৃশ্যও দেখতে পাব সেটা অবশ্য আশা করিনি। আমার মতো বোকাসোকা সাধারণ মানুষের, অতি সাধারণ উপদেশেও যে, কোনও মানুষের জীবনের মোড় এভাবে ঘুরে যেতে পারে, সেটা কোনও দিন স্বপ্নেও ভাবিনি।

আমাকে দেখেই লোকটি চিনতে পারল, তার ভাষায় সে আমাকে মাস্টর বলে সম্বোধন করে বসতে বলল। তার অনুমতি নিয়েই এই লেখাটা আমি লিখলাম।

তার সঙ্গে অবশ্য আমার এমন কোনোরকম চুক্তিই হয়নি যে, তার মুখওয়ালা ছবি দেখানো যাবে, কিংবা যাবে না। শেষমেশ মনের মধ্যে বিস্তর টানাপোড়েনের পর এই ছবিটা দেওয়া গেল। ও হ্যাঁ, আর একটা কথা, সে দিনের বাবার পিছনে লুকিয়ে থাকা সেই ছোট্টো মেয়েটি, হ্যাঁ, সে এখন বিএ সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে।

অলঙ্করণ রুমেলা দাস। ফোটোগ্রাফ লেখক

   বনের ডায়েরি সব পর্ব একত্রে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s