বনের ডায়েরি নাগজিরা স্বপ্না লাহিড়ী শরৎ ২০১৬

বনের ডায়েরি

bonerdiary01 (Medium)

নাগজিরার পথে পথে

স্বপ্না লাহিড়ী

      গোন্দিয়া  স্টেশন থেকে নাগজ়িরা রাষ্ট্রীয় উদ্যানের দূরত্ব মাত্র পঞ্চাশ কিলোমিটার । আমাদের গন্তব্য আপাতত নাগজ়িরা উদ্যানের চোরখামারা গেট। নাগপুর যাবার রাস্তায়(NH 6) সাকোলি থেকে কেটে গেছে নাগজিরার পথ, প্রায় কুড়ি কিলোমিটারের মত হবে।

সদলবলে নাগজ়িরা যাবার প্রস্তাবটা এসেছিল ছোটোছেলের কাছ থেকে। আমাদের বেড়াতে যাবার  ব্যাপারে সমস্ত প্ল্যানিং সাধারণত সেই করে থাকে। তার প্ল্যানে কোনও খুঁত থাকে না। আমার এই ছেলেটির পায়ের তলায় সর্ষে আছে,সারা বছরই সে কোন না কোন জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। কাজেই তার ওপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে আমরা নিশ্চিন্ত। ইন্টারনেটে সাফারি বুকিং থেকে নিয়ে কোথায় থাকা হবে, কোন পথে যাওয়া হবে, সব তার দায়িত্বে।

একটু সময় পেলেই আমরা সদলবলে পাহাড় জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই । স্যাঙ্কচুয়ারিগুলো আমাদের বেশি টানে কারণ সেখানে পাহাড়, অপরূপ জঙ্গল আর তার সাথে নানা রকমের পাখি, প্রকৃতির কোলে স্বচ্ছন্দ ঘুরে বেড়ানো বন্য প্রাণী আর জঙ্গলের গন্ধ একসঙ্গে আর কোথায় পাওয়া যায় ?

বিলাসপুর থেকে গোন্দিয়ার দূরত্ব রেলপথে মাত্র ২৮৭ কিলোমিটারের মত । সাধারণত আমরা গাড়ি করেই ঘুরে বেড়াই তাতে নিজেদের মন মর্জি মত ঘোরা যায় কিন্তু এবার  ঠিক হল ট্রেনে করে সবাই মিলে হৈ হৈ করে যাওয়া হবে। দলের সদস্য সংখ্যা ন’জন যাদের বয়েস ছয় থেকে ছিয়াত্তর।

নির্দিষ্ট দিনে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সকাল সকাল উঠে পড়লাম ট্রেনে। ডিসেম্বর মাস, ঠাণ্ডাটাও বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে কাজেই ব্যাগ এর আকার একটু বড়ো। অবশ্য ছোটোবড়ো সবাইকার নিজের নিজের ব্যাগ বইবার অভ্যেস আছে।

ট্রেন ছাড়তেই দলের সিনিয়রমোস্ট সদস্য , আমার দিদি, বললেন “কী রে চা কই?”  আমার পুত্রবধূর স্পেশাল ব্যাগ থেকে বেরতে শুরু করল চা, বিস্কিট, কেক ও ডিমসেদ্ধ। তাঁর ভাণ্ডারে মুড়ি চানাচুর ,শুকনো মিষ্টি, ফল থেকে গাজরের হালুয়া পর্যন্ত সব আছে, এমনকি চা কফি চিনি দুধ এর স্যাশেও বাদ যায়নি। যদিও সেগুলি ক্রমশ প্রকাশ্য ছিল।

বেলা বারোটা নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম গোন্দিয়া। গাড়ি আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্যে। জিনিসপত্র তুলে আমরা এক এক করে গাড়িতে উঠছি, ও মা দিদি কই ? আমাদের সঙ্গেসঙ্গেই তো নিজের ব্যাকপ্যাকটি পিঠে বেঁধে আসছিলেন হঠাৎ কোথায় গেলেন?

ছোটো বোন বলল, “ দ্যাখ কোন কুকুরের বাচ্চা দেখতে দাঁড়িয়ে পড়েছে কি না!” দিদির কুকুর বিড়াল প্রীতি বিখ্যাত।

একটু পরেই দিদি এক বড়ো ঠোঙাভর্তি গরম গরম শিঙাড়া নিয়ে উপস্থিত। এক গাল হেসে বললেন, “এতখানি রাস্তা যেতে হবে একটু স্বাস্থ্যকর খাবার না হলে চলে?”

ঘণ্টা দুয়েক পরে আমরা পৌঁছে গেলাম চোরখামারা গেট-এ। সাকোলি থেকে প্যাকড লাঞ্চ নিয়ে নেয়া হয়েছিল। আমরা সোজা চলে গেলাম জঙ্গলের মধ্যে ফরেস্ট গেস্ট হাউসে , যেখানে আমাদের জন্যে চারখানি রুম রিজার্ভড ছিল। বাথরুম সহ দুটো দুটো প্রশস্ত রুমের এক একটা ইউনিট । সামনে লন, যেখানে পাথরের তৈরি বেঞ্চ রয়েছে বসার জন্য, তাছাড়া আছে বাচ্চাদের জন্যে দোলনা প্রভৃতি খেলাধুলার ব্যবস্থা । খানিকটা দূরে ক্যান্টিনে চা থেকে শুরু করে জলখাবার লাঞ্চ, ডিনার সব কিছুরই  ব্যবস্থা আছে। হাঁটাপথে খানিকটা দূরে একটা বেশ বড়ো পুকুর জলে টই টুম্বুর , ভারি মনোরম পরিবেশ ।

আমাদের বিকেলের সাফারি বুকড ছিল । তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া সারতে সারতেই জিপসির  হর্ন শুনতে পেলাম । একটা জিপসি তে গাইড সমেত ছ’জন এর বেশি বসতে পারে না । আমার ছোটো ছেলে দুই ক্ষুদে নাতি ও আমি একটা জিপসিতে চড়ে বসলাম আর দ্বিতীয়টিতে আমার দুই বোন, বড়ো ছেলে, পুত্রবধূ ও আমার পতিদেবতা বসলেন । আমার পুঁচকে নাতিরাও গলায় দুরবিন ও ক্যামেরা নিয়ে উঠে বসল আমার পাশে। আমাদের দুটো গাড়ির রুট আলাদা তাই একটুখানি যাবার পর আমরা আলাদা হয়ে গেলাম ।

মহারাষ্ট্রের ভান্ডারা ও গোন্দিয়া জেলার মাঝা মাঝি প্রায় 152 sq.km  বিস্তৃত নাগজ়িরার জঙ্গলটি অসাধারণ সুন্দর ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ । বনের মাঝখানে একটি নাগ দেবতা ও একটি মহাদেবের মন্দির আছে। এ ছাড়া আছে আর একটি মন্দির ঈরা বা জ়ারার। মারাঠি ভাষায় জ়ারা মানে হচ্ছে বারোমাসি জলস্রোত। একটি পাহাড়ি নদী  পঙ্গেজ়ারা পাহাড়ের কোল থেকে বেরিয়েছে। এর ধারা কখনও শুকোয় না। নাগজ়িরা নামটি আমি যত  দূর জানি, এই জ়ারার নাম থেকেই এসেছে ।

গাইড এর কাছ থেকে জানতে পারলাম , এখানে প্রায় ১৬৬ টি প্রজাতির পাখি, ৩৬ টি প্রজাতির রেপটাইল পাওয়া যায় । এ ছাড়া আছে শ্লথ বিয়ার,বারকিং ডিয়ার, মাউস ডিয়ার, জংলি কুকুর, বনের রাজা বাঘ,প্যান্থার বাইসন , হরিণ চিতল, বন্যশূকর, জংলি বিড়াল, ইন্ডিয়ান সিভেট, পাম সিভেট, নেকড়ে, শিয়াল, উড়ন্ত কাঠবিড়ালি আর আছে প্যাঙ্গোলিন। এত কিছু অবশ্য আমরা দেখতে পাইনি। এর কিছুটা দেখতে হলেও এখানে বেশ কিছু দিনের জন্যে ডেরা বাঁধতে হত। যা দেখেছি তার কথায় পরে আসছি ।                                   

আমরা চলেছি আমাদের রুট ধরে,ধীরে সুস্থে।  মেঠো রাস্তার দু’ধারে সবুজ পাতা ঘেরা বড়ো বড়ো গাছ আকাশ ছুঁতে চেষ্টা করছে, তাদের ছায়ায় ছোটো মাঝারি গাছ বেড়ে উঠেছে আর নানারকম লতা উঠছে তাদের গা বেয়ে। রাস্তার ধারে ধারে ফুলে ভরা  ছোটো ছোটো গাছ যা সাধারণত জঙ্গলে দেখা যায় না। এখানে সাল মহুয়া আমলকী দেখতে পেলাম না, তবে  গগনচুম্বি টিক-এর পাতা এত ঘন যে রোদ কষ্ট করেই নিচে নেমে আসে। সপ্তপর্ণি গাছও অনেক দেখলাম। সেদিন বিকেলে চিতল আর কয়েকটা নিলগাই ছাড়া আর বিশেষ কিছু দেখা হয়নি । নাতিরা যা দেখছে তারই ছবি মহানন্দে তুলে যাচ্ছে । 

সন্ধের মুখে আকাশ তখন সূর্যাস্তের রঙে রাঙা, পাখিরা যে যার ঘরে ফিরছে আমাদেরও ফেরার পালা। ছ’বছরের ছোটো নাতি ঘুমে ঢলে পড়েছে আমার কোলে । ভোর পাঁচটা থেকে একটুও বিশ্রাম নেয় নি বাচ্চাটা, আর পারেনি। লাল ধুলোয় ধূসরিত হয়ে যখন গেস্ট হাউস এর ক্যান্টিন এর সামনে নামলাম তখন আর কারুকে চেনা যায় না । চা বিস্কিট খেতে খেতে গল্প হতে থাকল বাকি টুরিস্টদের সঙ্গে। এই একটা জায়গায় সবাই সবাইকার সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করে। বাঘ দেখা কারুরই কপালে জোটে নি। অতএব দেখা যাক কাল কী হয়। ছোটো ছেলে রিশলু বলে দিল, সকাল পাঁচটায় চা দেবে আর ছ’টায় জিপসি আসবে। সেই মত ছোটোবড়ো সবাই তৈরি থাকবে ।

পরদিন ভোরবেলা তৈরি হয়ে বেরিয়ে দেখি বড়ো নাতি মেহেল (আমার রুম মেট) দরজার কাছে দাঁড়িয়ে উৎকর্ণ হয়ে কিছু শুনছে। আমি কাছে আসতেই ইশারায় চুপ করে শুনতে বলল । একটু পরেই  পরিষ্কার অ্যালার্ম কল শোনা গেল হরিণের। ততক্ষণে আর সবাই বেরিয়ে এসেছে, সবাই শুনেছে অ্যালার্ম কল। মনে একটু আশা হল হয়ত বাঘের দেখা মিলবে। চা দিতে এসেছিলো যে ছেলে দুটি তারা বলল ক’দিন ধরে একটা বড়ো জংলি কুকুরের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে। এরা বাঘের থেকে কম হিংস্র নয়। বাঘও এদের ভয় পায়। এদের দেখেও অ্যালার্ম কলটা দিয়ে থাকতে পারে হরিণ ।

তাড়াতাড়ি সবাই মিলে যে যার জিপসিতে চড়ে বসলাম। আগের দিন রাত্রে জলখাবারের কথা ক্যান্টিনে বলা ছিল। একটা গাড়িতে সেই প্যাকড খাবার তোলা হল। সেন্ট্রাল পয়েন্ট এ বেলা নটা নাগাদ সব গাড়িগুলো এক জায়গায় হয়। এখানে ব্রেকফাস্ট সেরে আবার বেরনো । 

গেট-এ সব ফরম্যালিটি শেষ করে আমরা গাইডসহ ঢুকলাম জঙ্গলে। কুয়াশার চাদর মোড়া জঙ্গলের ঘুম তখনও ভাল করে ভাঙেনি, রোদের ছোঁয়া পড়েনি ভিজে  মাটির পথের ওপর, গাছের পাতা থেকে এখনও শিশির পড়ছে টুপটাপ, পাখিরা ডাকতে শুরু করেছে ঘন  পাতার আড়াল থেকে । জিপসি চলছে নিজের রুট ধরে হালকা গতিতে। রঙবেরঙের পালকে সাজা কয়েকটা বুনো মুর্গি রাস্তার ধারে ধারে  ঘুরে  মাটি থেকে খুঁটে পোকামাকড় খাচ্ছে। খানিকটা দূরে যাবার পরে দেখলাম অপেক্ষাকৃত খোলা জায়গায় একদল চিতল ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ কেউ ঘাস খেতে খেতে মুখ তুলে আমাদের  দেখে নিয়ে আবার খেতে থাকল, জিপসিভর্তি মানুষ দেখা ওদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

জিপসি  হাল্কা চালে চলছিল, যাতে আশেপাশের কিছুই মিস না করি । এক রাশ সোনালি রোদ্দুর এসে পড়েছে গাছের মাথায়, একটা দুটো করে পাখি মগডালে বসে রোদের উষ্ণতা শুষে নিচ্ছে তাদের পাখনায় । ঝাঁক ঝাঁক টিয়া পাখি কলরব করতে করতে আকাশের গায়ে উড়ে বেড়াচ্ছে । কিছু ড্রংগো , ম্যাগপাই, স্টারলিং দেখলাম । কালো মাথা, লম্বা সাদা ল্যাজ পারাডাইস ফ্লাই ক্যাচার পাখিটা গাছের ডাল থেকে সাদা ঢেউ খেলিয়ে আকাশের দিকে উড়ে গেল । আরও অনেক নাম না জানা পাখির সাথেও দেখা হল ।

একটা মোড় ঘুরতেই সামনে একটা পাহাড়ি নালা রাস্তার এ পাশ থেকে ও পাশে বয়ে যাচ্ছে, ওপরে পুল বানানো । ড্রাইভার পুল এর একটু আগেই গাড়ি দাঁড় করে জানালেন এ নালাটির ধারে ধারে প্রায়ই বাঘ ঘুরে বেড়ায় । এখন অবশ্য কেউ নেই শুধু দুটো পানকৌড়ি গলা ডুবিয়ে খাবার খুঁজছে । জঙ্গল একবারে নিস্তব্ধ, পাখিরাও দূরে কোথাও চলে গেছে ।

পুল পেরিয়ে ড্রাইভার ডানদিকে রাস্তার ধারে বাঘের পায়ের ছাপ দেখালেন। তখনও হালকা ভিজে। রিশলু বলল  ছাপ দেখে মনে হচ্ছে বাঘটা আধঘণ্টা মত আগে এখান থেকে গেছে। গাইডও তাই বললেন । বাঘ খানিকটা রাস্তার ধার দিয়ে গিয়ে রাস্তা পেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকে গেছে । কোনও অ্যালার্ম কল শোনা যায়নি তাই মনে হয় সে কোথাও বিশ্রাম নিচ্ছে । আমরা সেখানে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে এগিয়ে গেলাম।   

bonerdiary04 (Medium)সেন্ট্রাল পয়েন্ট-এ একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার বেরোন হল। এখন আর রুট বাঁধা নেই, ঘুরে বেরানোর স্বাধীনতা রয়েছে । গাড়ি চলল ওপরের দিকে । ঘন গাছপালা কম হতে থাকলো ক্রমশ । এক স্বচ্ছতোয়া পাহাড়ি নদী এঁকে বেঁকে চলছে আর তাকে ঘিরে ঘন বাঁশ ঝাড় হাওয়ায় দুলছে। এখনও কোথাও কোন আওয়াজ নেই । বাঁশঝাড় পেরিয়ে গিয়ে পড়লাম ঘাসের জঙ্গলে। সরু রাস্তার দুপাশে বড়ো বড়ো এলিফ্যান্ট গ্রাস, বাঘের প্রিয় চারণভূমি । কয়েকটা নীলকণ্ঠ পাখি বসেছিল গাছের  শুকনো ডালে । আমাদের দুটো গাড়ি আগে পেছনে চলছিল । আমাদের গাইড একটা বড়ো গাছের কোটর দেখিয়ে বলল, “ওই দেখ  হর্নড প্যাঁচা” , আমি তো কিছুই দেখতে পাই নি। শুনতে পেলাম পেছনের গাড়ির গাইড বলছেন ক্যামেরা জ়ুম করে দেখুন। সত্যিই জ়ুম করে কোটরে দেখা গেলো হর্নড প্যাঁচার বাচ্চা মাঝে মাঝে মাথা বার করে ঘাড় ঘুরিয়ে চতুর্দিক দেখছে আবার মাথা ঢুকিয়ে নিচ্ছে । এই প্যাঁচাগুলো আকারে বেশ বড়ো হয় আর মাথায় দুটো “টাফ্ট” থাকে যার জন্যে এই নাম। এছাড়া আর কারোই দেখা পেলাম না। ঘন গাছ দিয়ে ঢাকা বনটা এত সুন্দর যে বাঘ দেখতে না পাওয়ার জন্যে মন খারাপ করার অবকাশই নেই ।    

জিপসি থেকে নেমে আমি বললাম আমি ঘরে যাচ্ছি, কার কী নিয়ে যেতে হবে দাও । সবার গরম জামাকাপড় নিয়ে আমি ও ছেলে মিতুন গল্প করতে করতে যাচ্ছি ঘরের দিকে, হঠাৎ চিৎকার চ্যাঁচামেচির আওয়াজে ফিরলাম ক্যান্টিনের দিকে । যা দেখলাম তাতে হো হো করে হাসা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। ক্যান্টিন এর সামনে আমাদের বাড়ির সবাই ও আন্যান্য টুরিস্টরা গোল করে চেয়ারে বসে চা আর পোহার আনন্দ নিচ্ছিলেন  নরম গরম রোদ্দুরে। সেই ফাঁকে একদল বাঁদর এসে গেছে তাদের সঙ্গে পোহার ভাগ বসাতে । একটা বাঁদর ছোটো বোন জয় এর ঘাড়ে বসে তার হাতে ধরা প্লেট থেকে এক খাবলা পোহা নিতেই এই বিপত্তি । সে তো হাউমাউ করে লাফিয়ে চেঁচিয়ে একাকার। আরও অনেকেরই এক অবস্থা, ফলে এই অর্কেস্ট্রা । সবাই দুদ্দাড় করে ক্যান্টিন এর ভেতরে ঢুকছে । আমাকে হাসতে দেখে জয় বলল, “তোর ওপরে তো আর হামলা হয়নি! তাই হাসছিস। রিশলুটা আবার ছবি নিচ্ছিল।”  

bonerdiary02 (Medium)ওকে ঠাণ্ডা করতে বললাম চল পুকুরটা দেখে আসি। যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছি, এমন সময় ক্যান্টিনের একটি ছেলে দৌড়ে এসে বলল, “ওদিকে এখন যাবেন না ম্যাডাম, ঘণ্টাখানেক আগে জংলি কুকুরের একটা দল ওখানে হরিণ শিকার করেছে ,এখনও ওরা ওখানে আছে।”

এই  জংলি কুকুর বা ঢোল (dhole,  Cuon alpinus) আমাদের সাধারণ কুকুরেরই মতই দেখতে কিন্তু ল্যাজটা বেশ মোটা , শিয়ালের মত। গায়ের রং ঘন বাদামি হয় সাধারণত, তবে কিছু শেড এর পার্থক্য থাকতে পারে । এরা দলবদ্ধভাবে থাকে এবং দলবদ্ধভাবে শিকার করে। এক একটা দলে আট দশটা থেকে কুড়ি তিরিশটা ঢোল থাকতে পারে, তবে কোন বাঁধাধরা নিয়ম নেই। এরা কুকুরের মত ডাকতে পারে না, তীক্ষ্ণ শিসের মত আওয়াজ করে দলের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে । অনেক সময় এদের আ্যলফা মেল বা আ্যলফা ফিমেল এর নেতৃত্বে শিকার করতে দেখা যায়। এরা খুব হিংস্র হয়। তেমন বুঝলে বাঘকেও ছাড়ে না । তবে বাঘ বা লেপার্ডকে ওরা যথাসাধ্য এড়িয়েই চলে। এ হেন ঢোলদের ধারে কাছে না যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ । দেখা যাক বিকেলের দিকে পুকুরটা দেখে আসা যায় কী না ।

বিকেলের সাফারিটাই এবারের মত আমাদের শেষ সাফারি। পরদিন সকালে ফিরতে হবে । একেবারে কোর এরিয়াতে খোদ বাঘের রাজত্ব টাইগার ট্রেলএ যাবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। ঘন জঙ্গলের মধ্যে  যেতে যেতে পর পর কয়েকবার হনুমানের অ্যালার্ম কল শোনা গেল । গাড়ি দৌড়ুল কল লক্ষ্য করে।

মোড় ঘুরতেই দেখা গেল একটা জিপসি দাঁড়িয়ে আছে আর বাঁ দিকের জঙ্গলে কিছু একটা দেখছে । আমরা ওদের পিছনে গিয়ে দাঁড়াতেই রিশলু হাত তুলে একটা গাছ দেখিয়ে ফিসফিস করে বলল, লেপার্ড। লেপার্ডটা তখন নিচে নামছে, আমি শুধু তার ল্যাজটাই দেখতে পেলাম। আমি মুদুমালাই এর জঙ্গলে ব্ল্যাক প্যান্থার দেখেছি কিন্তু লেপার্ড সবসময়ে আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলেছে। মনে মনে ঠিক করলাম এবার রাজস্থান এর “বেড়া” লেপার্ড স্যাঙ্কচুয়ারিতে যাবই যাব।

গাড়ি ঘুরিয়ে টাইগার ট্রেল এর রাস্তা ধরা হল । টাইগার ট্রেল, চারদিকে মাটির রাস্তা দিয়ে ঘেরা বেশ বড়ো একটা ঘন জঙ্গলের টুকরো। ট্রেল-এ  ঢোকার মুখেই শুনতে পেলাম খক খক করে অ্যালার্ম কল দিচ্ছে হনুমান। সামনের রাস্তা দিয়ে চারপাঁচটা ঢোল জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। আমদের পেছনেই আর একটা জিপসিতে ছেলে মিতুন, বৌমা ,দুই বোন ও অরূপ ছিলেন। রিশলু ঐ গাড়ির গাইডকে বলল, “তোমরা এখানেই দাঁড়িয়ে থাকো একেবারে নড়বে না , আমি ট্রেলটা একবার ঘুরে আসছি , বাঘ বেরোবে।”

bonerdiary03 (Medium)

মায়ী

আমরা তাড়াতাড়ি ঘুরে যখন ফিরছি, দেখি মিতুন জিপসিতে দাঁড়িয়ে ডান পাশের রাস্তার দিকে ইশারা করছে। বাঘটা তখন ওদের গাড়ির পাশ দিয়ে নেমে জঙ্গলের গাছ পালার আড়ালে চলে যাচ্ছে। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার ততক্ষণে গাড়ি ঘুরিয়ে ডানদিকে কেটে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল, সঙ্গে পেছনের গাড়িটাও। অ্যালার্ম কল তখনও শোনা যাচ্ছে । গাইড বললেন বাঘটা  এদিকেই আসছে । আমরা প্রায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বসে আছি । খানিকক্ষণ অপেক্ষা করার পর রিশলু নিঃশব্দে ডান হাত তুলে ইশারা করল, গাছের ফাঁক  দিয়ে বাঘটাকে দেখা যাচ্ছে তখন । নাগজিরার রাজা ধীরে সুস্থে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আমাদের দুটো  গাড়ির একেবারে পাশ ঘেঁসে প্রায় গাড়ির বনেট ছুঁয়ে রাস্তা পেরিয়ে ও পাশের গাছগুলোর ভেতর মিলিয়ে গেল । যাবার আগে একটু দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদেরকে ভালো করে দেখে নিল, ভাবটা যেন নাও “পোজ” দিলাম ছবি তোল । বাঘটা এত কাছ দিয়ে গিয়েছিল যে হাত বাড়ালেই তাকে ছোঁয়া যেত । শমীক একেবারে ধারে ছিল। আমি শুধু তাকে হালকা করে ধরেছিলাম । সে কিন্তু স্থির হয়ে বসেছিল । এদিকে সবাই তখন ছবি তুলতে ব্যস্ত, মেহেল সুদ্ধু বাদ যায় নি, একমাত্র আমি আর ছোটো নাতি ছাড়া । এত বড়ো ,এত সুন্দর বাঘ, ঝকঝক করছে গায়ের লোম, আমরা স্তব্ধ হয়ে তার সৌন্দর্য  দেখছিলাম । তবে এটা বাঘ নয় বাঘিনী ছিল,সন্তানসম্ভবা। গাইড বললেন এই বাঘিনীটি এই জঙ্গলের “মায়ী” T2। বোধ হয় ঢোলগুলোকে stalk  করছে । আমরা সবাই এত উত্তেজিত ছিলাম যে খেয়ালই ছিল না যে আমরা  খোদ নাগজ়িরার সাম্রাজ্ঞী মায়ীর  রাজত্বে বসে আছি ।    

সাফারি থেকে ফিরে ক্যান্টিনে  চায়ের কাপ নিয়ে  গাইডকে ঘীরে গোল হয়ে বসে মায়ীর  ইতিহাস শুনলাম। ২০০০ সালে এই বাঘিনীটিকে প্রথম নাগজ়িরার জঙ্গলে দেখা যায়, তখন তার নাম দেয়া হয় T2 । ক্রমে সে এই টাইগার রিজার্ভটিতে নিজের আধিপত্য জমিয়ে বসে ও এগারোটি ব্যাঘ্রশাবক প্রদান করে। সে মায়ী নামেই বেশি পরিচিত। শেষ দুটি শাবক “জয় ও বীরুর” ২০১১ সালে  জন্ম হয় ও তারা ২০১৩ সালে মায়ীর থেকে আলাদা হয়ে নিজেদের এলাকা খুঁজতে বেরিয়ে যায় । জয়, উমরেড-কাড়াণ্ডলা টাইগার রিজার্ভ এ migrate করে যায়, কিন্তু বীরুর আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। মুগ্ধ হয়ে গল্প শুনতে শুনতে কত রাত  হয়ে গিয়েছিল সেদিন কারুর খেয়ালই ছিল না।

মায়ী  এটা প্রমাণ করেছিল সেদিন যে বাঘ সত্যই  অত্যন্ত ভদ্র ও সহৃদয় প্রাণী । ছোটো নাতি শমীকও অমলেট খেতে খেতে বলল বাঘ খুব ভালো, কিচ্ছু করে না, কিন্তু বাঁদররা খুব খারাপ। ঘাড়ে উঠে পোহা খেয়ে নেয় । ক্যানটিনে সবাই হো হো  করে হেসে উঠে তার কথায় সায় দিল ।    

পুনশ্চ-

১। ফরেস্ট গেস্ট হাউসটি কোর এরিয়ায় থাকার দরুন ফরেস্ট এর নতুন নীতি অনুযায়ী এখন টুরিস্ট দের ওখানে থাকতে দেয়া হয় না । 

২ । মাসখানেক আগে একটি দুঃখের খবর পেলাম।  ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মুম্বাই সংস্করণে(৮ মে ২০১৬) শ্রী বিবেক দেশপাণ্ডের লেখা পড়ে  জানতে পারলাম , মায়ীকে সাংঘাতিকভাবে জখম হয়ে একটি জলাশয়ের পাশে পড়ে থাকতে দেখা যায় । কিছু টুরিস্ট ও বন কর্মচারি তাকে যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখে । সঙ্গে সঙ্গে তার চিকিৎসা শুরু হয় , কিন্তু জখম এত গুরুতর ছিল যে তাকে বাঁচানো যায়নি । তার পিছনের পায়ে একটা গভীর ক্ষত ছিল, খুব সম্ভবত “গৌর” জাতীয় বন্য মহিষের সঙ্গে তার লড়াই করতে  গিয়েই সে মৃত্যুবরণ করল । আমরা স্তব্ধ হয়ে গেছি।  মৃত্যুর সময় মায়ীর বয়স হয়েছিল ১৭ বছর।

মায়ীর ছবিটি লেখকের সৌজন্যে প্রাপ্ত

স্বপ্না লাহিড়ীর আগের লেখা

 

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s