বনের ডায়েরি পাখি দেখা(৩) মুনিয়াঅলোক গাঙ্গুলী বসন্ত ২০১৯

আগের পর্ব ধনেশ, মাছরাঙা

মুনিয়া

অলোক গাঙ্গুলি

‘আমার মুনিয়া পাখিটা, দুষ্টু,  ভারি দুষ্টু’, জনপ্রিয় এই বাংলা গানটির কথা মনে আছে নিশ্চয়। কাছ থেকে যারা মুনিয়া পাখি দেখেছে তারা জানে কতটা দুষ্টু মিষ্টি এই পাখি। এদের ডাক প্রায় শোনাই যায় না। আর এই সুন্দর মিষ্টি পাখিটাকে মানুষ যখন খাঁচায় বন্দি করে রাখে তখন সত্যিই ভীষণ পীড়াদায়ক মনে হয়।

একবার এক তিলে মুনিয়া (Scaly Breasted Munia) দম্পতি আমার বাড়ির সামনের লাইট পোস্টে বাসা বেঁধেছিল।  সে এক অসাধারণ দৃশ্য। বাসাটি প্রথমে এক গো শালিক দম্পতি বানিয়েছিল। তারা যখন তাদের পরিবার সমেত বাসাটিকে পরিত্যাগ করে চলে যায় তখন এই তিলে মুনিয়া দম্পতি এসে বাসার দখল নেয় এবং ধীরে ধীরে নতুন ঘাস দিয়ে আবার বাসাটিকে নতুন করে সাজায় তারা।

ভিতরে কীভাবে তারা তাদের বাড়িটাকে সুসজ্জিত করেছিল সেটা আমার খুব দেখার ইচ্ছে ছিল। অনেক উঁকি মেরে, ক্যামেরার লেন্স দিয়ে, টর্চের আলো জ্বেলে দেখার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সক্ষম হইনি।

কিছু দিন পর মুনিয়াদের সংসারের বৃদ্ধি ঘটল। তাদের ঘরের ভিতর থেকে চিঁ চিঁ করে একটা আওয়াজ শোনা গেল। বড় মুনিয়া জুটি এক এক করে মুখে করে খাবার নিয়ে এসে ছোটোদের খাওয়াতে শুরু করল।

আরো কিছু দিন পর ছোট মুনিয়ারা তাদের বাসার উপর উঠে এল। ডানা মেলতে শিখেছে। একদিন সবাই মিলে বাসা ত্যাগ করে দূরে কোথাও উড়ে গেল।

এক বছর পর তারা আবার ফিরে এল এবং একই কায়দায় সংসার পেতে বসল। একদিন বিদ্যুত সংস্থার কর্মীরা এসে কিছু সারাই করে বাসাটা ফেলে দিল। আমি বাড়ি ফিরে শুনলাম এই কান্ড, মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। যদিও বাসাটা ওই সময় ফাঁকা ছিল কিন্তু ভাবলাম এই প্রাকৃতিক ব্যাপার আর স্বচক্ষে দেখা যাবে না। এতদিন কেবল মাত্র টেলিভিশনের পর্দায় অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট অথবা ডিসকভারি, ন্যাশ্যানাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে দেখে এসেছি। কিন্তু নিজের চোখে পাখিদের সংসার করা দেখার আনন্দটা আলাদাই।

কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়ম কি মানুষের পালটাবার ক্ষমতা আছে? পরের বছর শালিকেরা এসে আবার বাসা বাঁধল আর তার দুমাসের মধ্যে এসে গেল মুনিয়ারা। এই চক্র এখানো চলছে আর এটাই আনন্দের খবর।

আমি মাঝে মধ্যেই সময় সুযোগ পেলে ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ি কাছাকাছি জলজঙ্গলের উদ্দেশে পাখির ছবি তোলার জন্য। কখন একা আবার কখন কোন পক্ষিবিশারদ দলের সঙ্গে। সেখানে অবশ্যই দেখা মেলে বহু রকমের বিরল প্রজাতির পাখির কিন্তু তার সঙ্গে মেলে কিছু পাখি দেখার পরামর্শ।

এই সব মানুষদের কাছে থাকতে পেরে অনেক তথ্য জেনেছি পাখি ও পাখি দেখার ব্যাপারে। তাদের কাছে জেনেছি যে পাখিদের বাসার ছবি না তুলতে। তাই জন্যই মুনিয়াদেরও আমি বাসার ছবি কাছে পেয়েও তুলিনি। পাখিরা বাসা বাঁধে তাদের প্রজননের সময়। সেই সময় তাদের কেউ বিরক্ত করলে তা তারা একবারে পছন্দ করে না। এই কিছুদিন আগেই খবর পাওয়া গেল যে কোন এক আলোকচিত্রকর উত্তর ২৪ পরগনার বনগ্রামের কাছে বিভূতিভূষণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য যাকে আমরা  পারমাদন বন বলেও জানি, এক শুমচা (Indian Pitta) পাখির বাসার ছবি তুলে ফেসবুকে তুলে দিয়েছিল। তারপর থেকে সেখানে চিত্রগ্রাহকদের মেলা বসে গিয়েছিল। ফলে পাখিরা বিরক্ত হয়ে সেই বাসা পরিত্যাক্ত করে অন্যত্র চলে যায়।

আমি একবার এক বুলবুলের পাখির বাসার ছবি তুলেছিলাম এর অনেক আগে। তার কিছু দিন পর ঝড়ে সেই বাসা ভেঙে গিয়েছিল আর আমার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল যখন দেখতে পেয়েছিলাম বাসাতে বুলবুলির ছানাগুলি মাটিতে পড়ে গিয়েছিল আর ওদেরকে বেড়ালে ধরে নিয়ে গেছে। তার পর থেকেই আমি পাখিদের বাসার ছবি তোলা ছেড়ে দিয়েছি।

ফিরে আসি মুনিয়ার কথায়। মুনিয়া পাখি বেশ কয়েক রকমের হয়। তার মধ্যে হল লাল মুনিয়া (Red Adavat), সর মুনিয়া (Indian Silverbill), তিলে মুনিয়া (Scaly Breasted Munia),  শাঁখারি মুনিয়া (White rumped Munia), শ্যামসুন্দর মুনিয়া (Tricoloured Munia) এবং বাদামি মুনিয়া (Chestnut Munia)। এর মধ্যে সব কটি পাখিই আমাদের এই অঞ্চলে দেখা পাওয়া যায়।

সর মুনিয়া শুকনো কৃষিক্ষেত ও ওভারহেড ইলিকট্রিক তার, হালকা পর্ণমোচি বাগান, কাঁটা-ঝোপঝাড়, ঘাসজমিযুক্ত জায়গা বেশি পছন্দ। অন্যান্য মুনিয়াদের থেকে অপেক্ষাকৃত শুষ্ক অঞ্চলে থাকতে পছন্দ করে। বাকি মুনিয়ারা জলা-জমি, উঁচু ঘাসজমি, আখ ক্ষেতের ধারের কাছে থাকতে পছন্দ করে।

এরা মোটামুটি ছোট দলে থেকে খাবারদাবার খুঁজতে থাকে। এদের খাবারের মধ্যে পোকামাকড়, ঘাসবীজ, ফুলের কুঁড়ি ইত্যাদি পড়ে।

আরো দুই ধরনের মুনিয়া পাওয়া যায়, এক হল সবুজ মুনিয়া (Green Adavat), যা কেবল মধ্য ভারতে দেখা যায় আর এক হল কালো কন্ঠি মুনিয়া (Black throated Munia) যা পাওয়া যায় দক্ষিণের কেরলে আর শ্রীলঙ্কায়। কিন্তু বাকি উপরের লেখা ছয় রকমের মুনিয়াই আমাদের এখানে দেখা মেলে। কলকাতার কাছেই রাজারহাট জলাভুমিতে গেলে এই ছয় রকমের মুনিয়া দেখা যাবে।

পুরুষ লাল মুনিয়া (Red Adavat), গাঢ় আলতা-লালের উপর ইতস্তত ছোট সাদা ফুটকিতে ভরা। ডানা, লেজ আর তলপেটের কাছে কালচে রঙ। চোখের সামনেটা কালো। ঠোঁট আর কনীনিকা টকটকে লাল । স্ত্রী লাল মুনিয়া গায়ের রঙ উপরে ধুসর চকোলেট-বাদামি, ডানায় অল্প কিছু সাদা ফুটকি, কোমরের কাছে শুধু মাত্র লাল।

সর মুনিয়া (Indian Silverbill) মোটা, ঠোঁট তেকোনা রুপোলি-ধুসর রঙের, মুখ ও গলা সাদাটে। ওপরে ফিকে নস্যি-বাদামি, ডানার ধার কালচে, কোমরের কাছটা আবার ধবধবে সাদা। নিচেও সাদাটে, তবে পেটের দু-ধারে ঘিয়ে হলুদ রঙের আবছা ডোরাকাটা ভাব চোখে পড়ে। 

তিলে মুনিয়া (Scaly Breasted Munia) – মাথা-গলা সমেত ওপরের ডানা, পিঠ, লেজ মরচে-বাদামি রঙের। ডানা আর পিঠের রঙ তুলনায় ফিকে এবং ম্যাড়ম্যাড়ে। বুকের নিচ থেকে পেট এবং পেটের দু-ধারে সাদার ওপর কালো-কালো আঁশ-ছোপ এ ভরা।

শাঁখারি মুনিয়া (White rumped Munia) – মুখ-গলা-বুক সমেত ওপরের ডানা পিঠ গাঢ় চকোলেট-বাদামি রঙের, মুখ, চোখের কাছে কালচে। পিঠে ঘিয়ে-হলদেটে রঙের সুক্ষ্ম ছিটেতে ঢাকা। পিঠের শেষভাগে সাদা রঙের বড়সড় ছাপটিও বেশ পরিষ্কার ভাবে চোখে পড়ে। মোটা তেকোণা ঠোঁটের ওপরেরটা কালচে, নিচেরটা রুপোলি-ধসরাভ।

শ্যামসুন্দর মুনিয়া (Tricoloured Munia) – মাথা, গলা আর বুকের ওপরাংশ কুচকুচে কালো। ডানা সমেত পিঠ তামাটে-বাদামি। লেজ গাঢ় তামাটে-কমলা রঙের। লেজের নিচ থেকে পেটের মাঝ বরাবর কালো। বুক আর পেটের কালোর মাঝে ধবধবে সাদা। মোটা তেকোনা ঠোঁট রুপোলি-ধুসর রঙের।

বাদামি মুনিয়া (Chestnut Munia) – মাথা, গলা আর বুকের ওপরাংশ কুচকুচে কালো। বাদবাকিটা তামাটে-বাদামি, তলপেটের কাছটা আবার কালো। লেজ গাঢ়, তামাটে-কমলা রঙের। মোটা তেকোনা ঠোঁট রুপোলি-ধুসর রঙের।

মুনিয়া পাখি   ভারত, বাংলাদেশ, ছাড়াও  দক্ষিণদক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। এছাড়া কয়েকটি দেশে পাখিটি অবমুক্ত করা হয়েছে। সারা পৃথিবীতে এক বিশাল এলাকা জুড়ে এদের আবাস, প্রায় ৭১ লক্ষ ৯০ হাজার বর্গ কিলোমিটার।  বিগত কয়েক দশক ধরে এদের সংখ্যা স্থির রয়েছে, আশঙ্কাজনক পর্যায়ে যেয়ে পৌঁছেনি। সেকারণে আই. ইউ. সি. এন. (IUCN – International Union for Conservation of Nature – Hdqrs. Gland, Switzerland) এই প্রজাতিটিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলে ঘোষণা করেছে।

এরপর আশা রাখছি যে কেউ আর এই দুষ্টু মিষ্টি পাখিটা কে চিনতে ভুল করবে না আর সু্যোগ পেলে একে অবশ্যই লেন্সবন্দি করে ফেলতে পারেন কারণ সামনে সবসময় দেখতে না পেলেও অন্তত পক্ষে সংগ্রহ করা ছবিতে তো দেখা যাবে। আর অবশ্যই সচেষ্ট থাকতে হবে যে কেউ এই সুন্দর পাখিগুলোকে খাঁচাবন্দি না করে।

কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন – বাংলার পাখপাখালি

বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s