বনের ডায়েরি পাখি দেখা বক পাখি অলোক গাঙ্গুলী বসন্ত ২০২০

আগের পর্ব ধনেশ, মাছরাঙা, মুনিয়া, কাজল পাখি , দোয়েল-কোকিল-ময়না বুলবুল

পাখি দেখা – ৭

বক পাখি

অলোক গাঙ্গুলী

এ আবার কী কথা! বক পাখি নিয়ে কিছু লেখার মানে হয়? সমানে আমাদের চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায় যে পাখি, পুকুরপাড়ে, মাঠে-ঘাটে, জলাশয় ইত্যাদি সে তো আমাদের অজানা নয়। লম্বা গলা, ঠোঁট, সাদাটে এ পাখি তো হরদম নজরে আসে। বেশ, তা নয় হল। কিন্তু খুব কাছের থেকে দেখেছি কি? তাই এবার নয় বক পাখিকে নিয়েই কিছু তথ্য জানাবার চেষ্টা করা যাক। চলতি ভাষায় বক বলা হয়ে থাকে, কিন্তু এরা মোটেই বকবক করে না। আমাদের পুরাণে বলা আছে, কংস রাজা তার ভাগ্নে কৃষ্ণকে হত্যা করার জন্য এক অসুরকে পাঠিয়েছিলেন, নাম বকাসুর। দেখতে এক বিশালাকার বক পাখির মতন। অথচ আমাদের চোখে দেখা বক পাখির মতন নিরীহ পাখি আর হয় না, অসুর হওয়া তো দূরের কথা। তবে একটা কথা আগেও লিখেছি, আবার লিখছি যে পাখিরা কিন্তু উড়ন্ত ডাইনোসরের উত্তরসূরি। কিন্তু সেই ভয়ংকর ব্যাপার যেটা স্পিলবার্গের ছায়াছবিতে আমরা দেখেছিলাম, অন্তত আমাদের ভূখণ্ডে নেই। তাই বক পাখি দেখে ভয় পাওয়ারও কিছু নেই। কখনওই সে বকাসুরের রূপ ধারণ করবে না। এইসব পাখিগুলির চলাফেরা, খাওয়ার অভ্যাস থেকে দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি প্রায় অনেকটা একরকম। তাই এদের মধ্যে যে পাখিই আমাদের চোখে পড়ে, আমরা তাকে বক বলেই জানি।
আর্ডেইডি গোত্রের অন্তর্গত লম্বা পা বিশিষ্ট জলাশয় ও উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী মৎস্যভোজী একদল জলচর পাখিকে বক বলা হয়। পৃথিবীতে স্বীকৃত মোট ৬৪ প্রজাতির বক রয়েছে। এসব বকের কিছু প্রজাতি আকৃতিভেদে বগলা (Bittern) ও বগা (Egret) নামে পরিচিত। Botaurus এবং Ixobrychus গণের সদস্যরা বগলা নামে পরিচিত, আর বগাদের শরীরে সাদার প্রাধান্য বেশি। সারা বিশ্বে বিভিন্ন প্রজাতির বকের বিস্তৃতি থাকলেও নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলে এদের বিস্তৃতি সবচেয়ে বেশি। মরু ও মেরু অঞ্চলে বক অনুপস্থিত।

ছোটো কোর্চে বক, বৈজ্ঞানিক নামঃ Egretta garzetta (Linnaeus, 1766) এই বক ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, ভারতবর্ষে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে এই বক প্রচুর দেখা যায়। তবে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের জলাশয়ের কাছেও এদের দেখা যায়। এদের গায়ের রং ধবধবে সাদা। তবে আকারে কোর্চে বকের চেয়ে ছোটো এবং

গো-বক (Cattle Egret)-এর চেয়ে সামান্য বড়ো। এদের দৈর্ঘ্য হয় প্রায় ৫৫ – ৬৬ সেন্টিমিটার এবং পাখার প্রসারণ ১০৬ সেন্টিমিটার। গড় ওজন ৩৫০ গ্রাম। এদের ঠোঁট এবং পায়ের রং কালচে। এরা সাধারণত প্রাকৃতিক জলাশয়ের নিকটবর্তী অঞ্চলে বাস করে। সমুদ্র তীরবর্তী নদী অববাহিকার অরণ্যাঞ্চল হিসাবে সুন্দরবনের নদীর ধারে এদের বিচরণ বেশি। শিকারের সময় এরা দলবদ্ধভাবে থাকে। এদের প্রধান খাদ্য মাছ। এছাড়া ব্যাঙ, নানাধরনের জলজ কীটপতঙ্গ খায়।
প্রজনন ঋতুতে এরা জোড়া বাঁধে। এই সময় এরা গাছের মগডালে বাসা তৈরি করে। স্ত্রী পাখি দুই থেকে পাঁচটি পর্যন্ত ডিম দেয়।
আমাদের অঞ্চলে সবথেকে বেশি যা দেখা যায় তা হল গোবক এবং কোঁচ বক (Indian Pond Heron)।
আরও একধরনের বক আমরা দেখে থাকি মাঠে-ঘাটে যাকে আমরা বলে থাকি শামুকখোল। ইংরেজিতে আরও বড়ো ধরনের বক আছে যাকে বলা হয়ে থাকে স্টর্ক। যেমন শামুকখোলকে বলা হয় এশিয়ান ওপেন বিল স্টর্ক। তাহলে দেখা যায় যে এই ইগরেট, স্টর্ক, হেরোন, সবই আমাদের বাংলা ভাষায় বক এককথায়। কারণ, আকার আলাদা হলেও গঠন প্রায় একরকম। তবুও এদের বাংলাতেও বিভিন্ন নাম আছে। আমরা নিত্যদিন বক পাখি দেখে থাকি বলে এদের নিয়ে খুব একটা উচ্ছ্বসিত নই। কিন্তু এই পাখির রকমফের জানতে পারলে এদের প্রতিও আগ্রহ বাড়বে।
ধানক্ষেতে অথবা মাঠে গরু-মোষের পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়ায় এই সাদা রঙের পাখি। এদের পা এবং ঠোঁটের রং হলুদ। এইসব পশুদের গায়ের থেকে এরা পোকামাকড় খুঁটে খায়, আর সারাদিন বলতে গেলে এই পশুদের কাছাকাছি থাকে। তাই এদের গোবক বলা হয়। ভারতের সর্বত্রই এদের দেখা পাওয়া যায়, এমনকি সুদূর হিমালয় অঞ্চলেও। মাঠে ও জলাশয়ের কাছে এক বককে চুপ করে মাথা গুঁজে বসে থাকতে দেখা যায়। এদের বলা হয় কোঁচ বক। লালচে মেটে রঙের উপর এদের পিঠে ও বুকে খয়েরি রঙের লম্বা লম্বা ডোরা থাকে। বর্ষার সময় পুরুষ পাখিদের ভারি সুন্দর দেখায়। পিঠে বাদামি রঙের ছোপ, ঠোঁটে নানা রঙের বাহার। ওড়ার সময় এদের ডানার নিচেটা ধবধবে সাদা রঙ দেখা যায়। অন্যান্য বকেদের মতন মাছ, শামুক, ছোটো ব্যাঙ প্রভৃতি এদের খাদ্য। এরা গাছের ওপর বাসা বাঁধে আর দল বেঁধে বিশ্রাম করে। এদেরও ভারতের সর্বত্র দেখা যায়।
অনেকটা কোঁচ বকের মতন দেখতে আরেক ধরনের বক দেখা যায় প্রায় সারা ভারত জুড়ে। এই বক পাখি হল গিয়ে ‘বাজকা’ (Black Crowned Night Heron)। নামটা শুনেই বেশ রোমাঞ্চকর মনে হয়, নাইট হেরোন, অর্থাৎ রাতচরা বক পাখি। রাতে উড়তে দেখা যায় দলে এবং বৃত্তাকারে। ওড়ার সময় ‘ওয়াক’ বা ‘কওয়াক’ শব্দের একটা ডাক শোনা যায়। এরাও দেখতে খুব সুন্দর হয়। গলা, বুক ও পেট ধূসর সাদা ও পিঠের রং গাঢ় স্লেট রঙের। মাথার ওপরে একটা ঝুঁটি থাকে। এরাও মাছ, ব্যাঙ প্রভৃতি ধরে খায়। গাছের উঁচু ডালে বাসা বাঁধে আর রাত্রিবেলায় নিঃসঙ্গভাবে বসে শিকার করে। এইসব বকেদেরকে আমি সুন্দরবন অঞ্চলে, হিমালয়, এমনকি আমার বাড়ির পেছনের মাঠে ও বেলগাছের মগডালে বাসা বাঁধতে দেখেছি।
একধরনের বক যাকে ইংরেজিতে স্টর্ক বলা হয়, আমরা চলতি কথায় বকই বলে থাকি। স্টর্কদের মধ্যে সবথেকে ছোটো প্রজাতির। মাঠে, ধানক্ষেতে, জলাজমিতে এদের দলবদ্ধ হয়ে থাকতে দেখা যায়। এদের বলা হয় শামুকখোল)। গায়ের রং হালকা ছাই আর লেজের দিকে কালো। ঠোঁটদুটি বেশ বড়ো আকারের আর মধ্যেখানে ফাঁক আছে যা দিয়ে শক্ত খাবারও ভেঙে ফেলা যায় সহজে। অনেক সময় গাছের ডালে দল বেঁধে বসে থাকতে দেখা যায়। বোলপুরে একটা গোটা গ্রামের নামই হল শামুকখোল, কারণ সেখানে প্রচুর পরিমাণে এই শামুকখোল পাখিদের দেখা যায়। এরা সমতলের স্থায়ী বাসিন্দা। পশ্চিমবাংলার রায়গঞ্জে কুলিক নদীর ধারে অনেক পরিমাণে দেখা যায়। তাছাড়া সুন্দরবন অঞ্চলেও এদের বাস আছে।
এক অদ্ভুত ধরনের বকের মতো পাখি দেখা যায় জলাজমিতে। এদের বলা হয় লাল কাঁক (Purple Heron)। শরীরের উপরের অংশ নীলচে বেগুনি, মাথা আর গলার দিকটা লালচে। এদের একাই দেখা যায় আর সমতলের সব জায়গার স্থায়ী বাসিন্দা।
সাদা কাঁক (Grey Heron) অনেকটা আচার-আচরণের দিক থেকে লাল কাঁকের মতোই। একা থাকতে পছন্দ করে। ভোরবেলায় আর গোধূলিতে শিকার ধরতে বের হয়। গায়ের রং ধূসর আর মাথায় একটা ঝুঁটি মতন আছে। অন্যান্য কাঁকদেরই মতন শামুক, মাছ, ব্যাঙ ইত্যাদি খায়। এদের শিকার ধরার কায়দা বেশ মজার। চুপ করে একজায়গায় গলা গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকে। যেই না শিকার দেখতে পায়, অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে গলা তুলে শিকার ধরে গিলে ফেলে। এর মধ্যে আমি একদিন টেলিভিশনে অ্যানিমাল প্ল্যানেটে এরকমই একটা কালো রঙের কাঁকের শিকার ধরা দেখছিলাম। আকারে আমাদের এখানকার সাদা কাঁকের মতোই, কিন্তু এই কালো কাঁক কেবলমাত্র আফ্রিকায় পাওয়া যায়। এদেরও দেখলাম অদ্ভুত প্রকার শিকার ধরার কৌশল। জলের মধ্যে বসে সম্পূর্ণ পাখনা মেলে দিয়ে নিজের আকৃতিটা গোল মতন করে নেয়, আর কী করে শিকার জলের মধ্যে দিয়ে তুলে নেয় তা আর ক্যামেরায় ধরা যায় না আর অন্য কোনও পশু বা পাখিও তা দেখতে পায় না। সাদা কাঁক সারা ভারত জুড়েই পাওয়া যায়। সমতল এবং হিমালয়ের কিছু জঙ্গলে যেমন, করবেট টাইগার রিজার্ভ ও ঋষিকেশের রাজাজি ন্যাশনাল পার্কেও দেখা যায়।
বকাসুর পুরাণে থাকতে পারে, কিন্তু একবারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না যে এরকম কোনও পাখি নেই। একধরনের রাক্ষুসে বক আছে ঠিকই, তবে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। এর নামই হল দৈত্য বক (Goliath Heron)। আমার দুর্ভাগ্য যে এখনও পর্যন্ত এই পাখির দেখা আমি পাইনি। সুন্দরবন অঞ্চলেই বেশি দেখা যায়। সেখানে গিয়েও আমি এর সন্ধান পাইনি। তবে বইতে এর সম্বন্ধে যা পড়েছি তাই লিখছি। অনেকটা লাল কাঁকের মতন দেখতে আর আকারে শকুনের চেয়ে কিছুটা বড়ো। এরা মূলত একা থাকতে পছন্দ করে। পূর্ব আফ্রিকার পাখি। সাধারণত এরা একাই থাকে। অপেক্ষায় রইলাম এই পাখির দর্শনের জন্য আবার যদি সুন্দরবন ভ্রমণে যাই। এদের খাবার তালিকায়ও সেই মাছ, শামুক ইত্যাদি। তাই দৈত্যকার হলেও এরা মানুষকে ভয়ে পেয়েই চলে।
আর যেসব বক আকারের পাখি পাওয়া যায় তার মধ্যে হল মানিকজোড় । নাম থেকেই বোঝা যায় যে এরা জোড়ায় থাকে। ডানার রং কালো, কিন্তু গলার কাছে সাদা ভাব। এখন এদের সংখ্যা অনেক কমে গেছে যথেচ্ছ হত্যার ফলে। ডানকুনি ও বানতলার ভেড়ির কাছে কিছু দেখতে পাওয়া যায় এখনও।
লোহাজঙ্ঘা বা লোহাজাঙমানিকজোড়ের চেয়ে বড়ো আকারের। গলার উপরের অংশ কালো ও নিচে সাদা, পিঠ ও ডানা কালো, পায়ের রং লাল। স্থায়ী বাসিন্দা, উত্তরবঙ্গে ও পুরুলিয়ায় দেখা যায়। জলা জায়গায় একা একা ঘুরতেও দেখা যায়।
কালোজাঙপরিযায়ী পাখি। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চলে পাওয়া যায়। এদের গায়ের রং ময়ূরকন্ঠি কালো আর চোখের পাশ থেকে ঠোঁট পর্যন্ত লাল, পেটের রং সাদা। সাধারণত একাই থাকতে পছন্দ করে এবং জলা জায়গায় শিকার ধরে। প্রজননের সময় এরা ইউরোপ ও সাইবেরিয়ার দিকে চলে যায়।
হাড়গিলে এক কুৎসিত দেখতে পাখি, নাম থেকেই বোঝা যায়। গায়ের রংও ময়লাটে সাদা, মাথা সাদা ও ন্যাড়া। গলার ঠিক নিচে হালকা গোলাপি রঙের একটা থলে আছে। এরা বলতে গেলে সবকিছু খায়—মাছ, ব্যাঙ, সরীসৃপ এমনকি মৃত প্রাণীর দেহ পর্যন্ত। এদের ঠোঁট বিশাল বড়ো আকারের। শোনা যায় যে এরা পশ্চিমবাংলার স্থায়ী বাসিন্দা নয়। অসম থেকে উড়ে এখানে আসে। এদের উত্তরবঙ্গে ও সুন্দরবনেও দেখা যায়। এদের প্রায়ই গলা গুঁজে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
মদনটাক অদ্ভুত ধরনের নাম, কারণ এদের মাথাটা ন্যাড়া আর হলুদ রঙের। ইংরেজি নাম Lesser Adjutant Stork। কিছুদিন আগে সংবাদের শিরোনামে ছিল এই পাখি। বাঁকুড়ার কোনও এক প্রত্যন্ত গ্রামে আহত অবস্থায় পায় গ্রামবাসীরা। সেবাশুশ্রূষা করে বনদপ্তরের হাতে তুলে দেয়। দেখা যাচ্ছে যে গ্রামের মানুষেরাও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে যথেষ্ট বড়ো ভূমিকা পালন করছে। শহরের মানুষদেরও কেবল ঠাণ্ডা ঘরে বসে আলোচনা করলে চলবে না। যেতে হবে জলে-জঙ্গলে বন ও প্রাণী সংরক্ষণের সচেতেনতার বৃদ্ধি ঘটাতে। এই পাখি সবকিছু খায়, যেমন মরা মাছ, ব্যাঙ, সাপ প্রভৃতি। সুন্দরবনে এদের বেশি পরিমাণে দেখা যায়।
কাস্তেচরা ঠিক অন্যান্য স্টর্কদের মতনই, আর আমরা এদেরকেও একডাকে বকই বলি হঠাৎ করে দেখতে পেলে। এরা বিভিন্ন প্রকারের হয়। ইংরেজিতে অনেকরকম নাম, যেমন Glossy Ibis (একটু কালচে চকচকে), Red Naped Ibis (কালো রঙের, কেবল মাথার ওপরে লাল), Black Headed Ibis (মাথা থেকে গলা পর্যন্ত কালো আর সারা শরীর সাদা)। ভারতবর্ষ জুড়েই এদের দেখা মেলে। খাদ্য তালিকাও সেই মাছ, শামুক ইত্যাদি। তবে এদের বিশেষত্ব হল গিয়ে এদের ঠোঁটের মধ্যে। এরকম বাঁকানো বড়ো আকারের ঠোঁট অন্য পাখিদের মধ্যে খুব একটা দেখা যায় না।
সবশেষে আসি এক বিশেষধরনের স্টর্কের বর্ণনায়। রং করা বক, গায়ে আঁকা বক, কী বলি জানি না। ইংরেজিতে পেইন্টেড স্টর্ক । ভীষণ সুন্দর দেখতে একটা পাখি। আমি এই পাখির প্রথম দেখা পাই আগ্রায় (উত্তরপ্রদেশ)। তাজমহল দেখার সময় ঠিক ওই মনুমেন্টের পেছনে দাঁড়িয়ে আমি যমুনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। যমুনায় জল তখন খুব কম। কিন্তু ওই অল্প জলেই প্রচুর পাখি। চখাচখি, সরাল, পানকৌড়ি, সাদা কাঁক (এর কথা আগেই ওপরে লিখেছি, Grey Heron) এবং লেজের কাছে গোলাপি রঙের তুলি বোলানো সেই বক, আঁকা বক অথবা পেইন্টেড স্টর্ক (Painted Stork) অথবা রাঙা মানিকজোড়। পুরো শরীরটা সাদা, ডানাদুটির পাশে কালো ছোপ ছড়িয়ে, মাথাটা কমলা রঙের, লম্বা বিশাল ঠোঁট, বাঁকানো, অনেকটা কাস্তেচরার মতন, হলুদ রঙের, পাদুটিও গোলাপি রঙের। আর সবথেকে সুন্দর যা লাগে তা হল ওর পিঠের ঠিক নিচের অংশে প্রায় লেজের কাছাকাছি গোলাপি রং, তাও তুলি দিয়ে বোলানো। কী অদ্ভুতভাবে ওকে প্রকৃতি ঈশ্বর নিজের ইচ্ছায় রঙের তুলি দিয়ে এঁকেছেন! তাই বোধহয় মানুষ ওর নাম রেখেছে পেইন্টেড স্টর্ক। এর থেকে আর ভালো নাম হয় না। একে জলা জায়গায়তেই বেশি পাওয়া যায়, প্রায় জোড়ায় আবার মাঝে মাঝে ঝাঁকেও। ক্যামেরার লেন্স থেকেও মনের ক্যামেরায় অনেক জায়গা জুড়ে এই পাখি বাস করবে।
এই লেখা পড়ার পর এবার থেকে মনে হয় বক দেখে অবহেলা আর কেউ করবে না, সে যেই বকই হোক না কেন। সবসময়ের জন্য দেখা পেলেও কখনওই বকাসুরের সাথে এদের তুলনা করা যাবে না। কারণ আগেই লিখেছি, ওরা ওই প্রকৃতির নয়। এরা মানুষের মধ্যেই থাকতে ভালোবাসে আর আমাদেরকেও ওদের যত্ন নেওয়ার মতোই মানসিকতা তৈরি করতে হবে। এই পাখিদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। এদের শিকার করা হয় মাংসের জন্য। অনেক সময় ঢোলের পাশ দিয়ে বকের পাখনা দিয়ে সাজানো থাকে। এটা ভীষণভাবে অনুচিত কাজ। দুর্গাপূজার সময় ঢুলিদের ঢোলেও মাঝে মধ্যে বকের পালকের সাজ দেখা যায়। তাদেরকে বোঝাতে হবে যে পরিবেশ ও প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হলে আমাদের আশেপাশে দেখা পাখিদের সংরক্ষণ কতটা প্রয়োজন। সচেতনতা বাড়াতে হবে সকলের মধ্যে আমাদের সাথে বেড়ে ওঠা এই পাখিদের রক্ষার্থে।

আলোকচিত্রঃ লেখক

বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s