বনের ডায়েরি পাখি দেখা মোনাল অলোক গাঙ্গুলী বর্ষা ২০২০

আগের পর্ব ধনেশ, মাছরাঙা, মুনিয়া, কাজল পাখি , দোয়েল-কোকিল-ময়না বুলবুল, বকপাখি

পাখি দেখা – ৮

মোনাল দেখার গল্প

অলোক গাঙ্গুলী

জয়ঢাক পত্রিকার পক্ষ থেকে একদিন শান্তনু জানাল যে একটা ট্রেকের কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে উত্তরাখণ্ডের তুঙ্গনাথ ও চন্দ্রশিলার দিকে। শুনেই তো মনটা কেমন চঞ্চল হয়ে উঠল। আবার হিমালয়, পাহাড়, নদী, ফুল এবং পাখি। আর পাখি বলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল যে পাখিটার ছবি সে হল গিয়ে এই উত্তরাখণ্ড রাজ্যের পাখি এবং সেখানকার কেদারনাথ অভয়ারণ্য অঞ্চলের পক্ষীরাজ পাখি অপরূপ হিমালয়ের মোনাল। এই পাখি আমি নিজের চোখে দেখার সু্যোগ হারাই কী করে। অর্থাৎ, দ্বিতীয়বার ভাববার মতন কোনও কারণ নেই। আমি পড়েছি যে এই মোনালকে তুঙ্গনাথ ও চন্দ্রশিলা যাওয়ার পথে চোপতা থেকে যেকোনও স্থানে দেখা যেতে পারে। প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম। যাওয়ার দিনক্ষণ ঠিক হল ২৫ মে, ২০১৯। আমার অফিস থেকে ছুটি পাওয়া সমস্যা নয়, কিন্তু বাড়ির লোকজনদের অনুমোদন পাওয়া এক বড়ো ব্যাপার। বাড়িতে অবশ্য জানে যে আমি একটু আধটু পাখি নিয়ে চর্চা করে থাকি; ওদের ছবি তোলা আমার নেশা আর ওদের স্বভাব, বাসস্থান ইত্যাদি জানার আগ্রহ আছে আমার। তাই বোধহয় খুব একটা আপত্তি করেনি। আমার রুকস্যাক গুছিয়ে নিলাম আর দেখে নিলাম আমার ক্যামেরার যন্ত্রপাতির কলকব্জা সব ঠিকঠাক চলছে কি না। মোনাল দেখার সু্যোগ তো সকলের হয়ে ওঠে না, কপাল করে যদি পেয়ে যাই তাহলে কেল্লা ফতে!

অবশেষে বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই দিনটি এল—২৫ মে, ২০১৯। আমাদের যাত্রা আরম্ভ হল কলকাতা স্টেশন থেকে দুর্গিয়ানা এক্সপ্রেস করে মোরাদাবাদ পর্যন্ত। ওখান থেকে ইন্টার সিটি এক্সপ্রেসে হরিদ্বার। আমাদের পরেরদিন সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে মোরাদাবাদ পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু ট্রেন এমন দেরি করল যে ইন্টার সিটি ছাড়ার সময়ের পরে গিয়ে পৌঁছলাম। কিন্তু হয়তো বাবা তুঙ্গনাথের কৃপা হবে যে ওই গাড়িও বিলম্বেই চলছিল। যথাসময়ে আমরা হরিদ্বার পৌঁছেও গেলাম। আমাদের জন্য কালি কমলি ধর্মশালাতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আগের থেকেই করা ছিল, তাই আর কোনও অসুবিধা ছাড়াই আমরা আমাদের পরেরদিনের পরিকল্পনা করে রাখলাম।

পরেরদিন ভোরবেলায় আমরা রওনা হলাম উখিমঠের উদ্দেশ্যে, প্রায় সাত ঘণ্টার যাত্রাপথ। শুনেছি ইদানীং বেশ যানজট হচ্ছে পথে, রাস্তা প্রশস্তকরণের কাজ চলছে। এই সময় হরিদ্বারে বেশ গরম, প্রায় ৪৫ ডিগ্রির কাছে তাপমাত্রা। কিন্তু এই তাপমাত্রা যে রুদ্রপ্রয়াগের মতন উচ্চতাতেও একইরকম সেটা আর কল্পনা করিনি।

তবে এইসব কিছু ভুলিয়ে রাখে পথের দু’ধারের নৈসর্গিক দৃশ্য। মাঝেমধ্যেই চোখে পড়ছে পাহাড়ের ধার ঘেঁষা বড়ো গাছে বেগুনি রঙের অপূর্ব ফুল ফুটে আছে আর পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে চঞ্চল অলকানন্দা। পরে জেনেছি এই ফুলের ইংরেজি নাম জ্যাকারান্ডা (Jacaranda) আর বাংলায় গুগল বলছে নীলকন্ঠ ফুল। পথে পড়েছে দুই প্রয়াগ, দেবপ্রয়াগ যেখানে অলকানন্দা মিলিত হয়েছে ভাগীরথীর সঙ্গে আর পরে রুদ্রপ্রয়াগ যেখানে মন্দাকিনী মিলিত হয়েছে অলকানন্দের সঙ্গে। দুই জায়গার দৃশ্যই ভারী মনোরম। এখানে বলে রাখি, আমি যে গাড়িতে ছিলাম সেই গাড়ির চালক একজন গাড়োয়ালি আর আমরা তাঁকে পণ্ডিতজি বলে সম্ভাষণ করছিলাম। বেশ হাসিখুশি আলাপি ভদ্রলোক, পথে যা আকর্ষণীয় তার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তাঁর ভুল হচ্ছিল না। তিনিই আমাদের দেবপ্রয়াগ ও রুদ্রপ্রয়াগে গাড়ি থামিয়ে সেখানকার দৃশ্য ও গল্প জানালেন। আবার রুদ্রপ্রয়াগ ছাড়ার পর এক ছোটো পাহাড়ি শহর, নাম শ্রীনগর—রুদ্রপ্রয়াগ জেলার সদর বলা চলে এই শহরকে। এখানেই অলকানন্দার মাঝে অবস্থিত ধারীদেবীর মন্দির। এই দেবীকে উত্তরাখণ্ডের চারধামের রক্ষক বলা হয়। এই মন্দির নিয়ে এক রোমহর্ষক গল্প আছে।

লোকমুখে বিশ্বাস যে ধারীদেবী চারধামের তীর্থযাত্রীদের রক্ষা করেন। কথিত আছে যে এই দেবীমূর্তি দিনে তিনবার তাঁর রূপ বদল করেন, শিশু থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত। অনেক স্থানীয়রা এই রূপ বদল নিজের চোখে দেখেছেন। ২০১৩ সালে সরকার এই মন্দির থেকে বিগ্রহ সরিয়ে এই মন্দিরকে ভেঙে এই স্থানে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত করার পরিকল্পনা নেয়। শ্রীনগর অঞ্চলের বাসিন্দারা ধারীদেবীর মন্দিরকে ধ্বংস না করার অনুরোধ জানায়, কারণ স্থানীয় বাসিন্দারা এবং ধর্মীয় সংস্থাদের বিশ্বাস যে ধারীদেবী নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করেন। কিন্তু স্থানীয়দের কোনও কথা না মেনে ১৬ জুন, ২০১৩ সালে ধারীদেবীর প্রতিমা সরিয়ে দেওয়া হয়। ঠিক এই সময় কেদারনাথে ভীষণ বৃষ্টি শুরু হয়, হাজার হাজার তীর্থযাত্রীরা আটকে যান। ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধ্বসে চারদিকে হাহাকার পড়ে যায়। লোকেদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা ধারীদেবীর মন্দির নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্যই বিপর্যয় এসেছে বলে মনে করেন। এই মন্দির ৮০০ বছর পুরনো, এটি একটি প্রাচীন সিদ্ধাপীঠ এবং ধারীদেবী মা কালীর একটি প্রতিরূপ। তাঁর মূর্তি ভয়াবহ মনে হতে পারে, কিন্তু তিনি সকলের মা যিনি চারধামকে রক্ষা করার জন্য এই রূপ ধারণ করেছেন। ১৮৮২ সালে এক উন্মাদ রাজা মন্দির ধংস করার চেষ্টা করেন এবং একইভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় তখন এই অঞ্চলে।

এখান থেকে আমরা বিকেল পাঁচটার মধ্যে উখিমঠ পৌঁছে গেলাম। স্নান-আহার সেরে আমরা সন্ধে নামার আগেই উখিমঠের শ্রী ওঙ্কারেশ্বরের মন্দির দর্শন করে এলাম। এই মন্দির শ্রী কেদারনাথ ও মধ্যমেশ্বরের শীতকালের নিবাস।

পরেরদিন ভোরবেলায় তুঙ্গনাথের উদ্দেশ্যে আমরা রওনা হলাম চোপতার দিকে। চোপতা থেকে সাড়ে চার কিলোমিটারের মতো হাঁটা পথ তুঙ্গনাথ। একদিকে সবুজ বুগিয়াল, বুগিয়াল অর্থাৎ মাঠ। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে যাওয়া বিস্তীর্ণ এক সবুজ তৃণভূমি। চোপতা, উখিমঠ, সারিগ্রাম, গোপেশ্বর—আশেপাশের বেশ কয়েক জায়গার বাসিন্দাদের কাছে তুঙ্গনাথ পুণ্যভূমি।

তুঙ্গনাথেরও ওপরে ১৩,১২৩ ফুট উচ্চতায় এই পাহাড়ের চুড়োয় আছে চন্দ্রশিলা যেখান থেকে হিমালয়ের ৩৬০ ডিগ্রি কোণে চারপাশের তুষার-ধবল শৃঙ্গ দেখা যায় সেগুলি হল চৌখাম্বা, নন্দাদেবী, নন্দাঘুন্টি, কামিট, পালকি, নীলকন্ঠ, সুদর্শন, মেরু-সুমেরু, শিবলিঙ্গ। চন্দ্রশিলার চুড়োয় একটা ছোট্ট মন্দির রয়েছে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত। গাড়োয়াল ভ্রমণের এক অন্যতম অংশ হল এই তুঙ্গনাথ-চন্দ্রশিলা যা বাঙালিদের অতি পরিচিত স্থান, সৌজন্যে অবশ্য উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর ‘হিমালয়ের পথে পথে’ গাড়োয়ালকে বাঙালিদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। এই চোপতা থেকেই আমাদের তুঙ্গনাথ ও চন্দ্রশিলা ট্রেক আরম্ভ, আর এখান থেকেই আমার মোনাল দেখার কাহিনিও শুরু হল।

চোপতাকে তুঙ্গনাথের প্রবেশদ্বার বলা হয়। একটা গেট বা দ্বার দিয়ে প্রবেশ করতে হয়। দ্বারের ওপরে অনেক ঘণ্টা বাঁধা আছে। তীর্থযাত্রীরা ওঠার আগে ঘণ্টা বাজিয়ে বাবা তুঙ্গনাথের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে যাত্রা আরম্ভ করে। দ্বারের ঠিক পাশেই একটা বোর্ডে সকল তীর্থযাত্রীদের জন্য লেখা আছে যে তারা উত্তরাখণ্ডেরর তৃতীয় কেদার দর্শনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করছেন। আমিও কোনও ব্যতিক্রম নই। বাবা তুঙ্গনাথকে এখান থেকে প্রণাম করে সকলকে সুস্থ রাখার প্রার্থনা করলাম ও আমার মনের ইচ্ছা তাঁকে জানালাম যে আমার এ-যাত্রায় যেন তাঁর ও মোনালের দর্শন থেকে বঞ্চিত না হই। এই প্রার্থনা করে জয় বাবা তুঙ্গনাথের নাম নিয়ে, ঘণ্টা বাজিয়ে, আমরা সকলেই তুঙ্গনাথ মন্দিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম।

মোনালের গল্প লেখার আগে এই রাজকীয় পাখির সম্বন্ধে দুয়েকটা কথা বলি। মোনাল ফেজেন্ট পরিবারের একটা পাখি (Pheasant), অর্থাৎ একপ্রকারের রঙিন মোরগ জাতীয় পাখি। ঘাসের ভিতর থেকে খাবার খুঁটে যখন খায় ঠিক একটা মুরগির মতোই মনে হয় চলাফেরায়।

মোনালের সঙ্গে ময়ূরের একটা বেশ সাদৃশ্য আছে, কেবল আকারে ছোটো। নেপালের জাতীয় পাখি মোনাল (Monal Pheasant)। হিন্দি ‘মুনাল’ শব্দ থেকে ‘মোনাল’ শব্দটি এসেছে। মোনাল একটি রঙিন পাখি, অনেকটা বনমোরগের মতো দেখতে। মাথা থেকে শুরু করে লেজ পর্যন্ত এই পাখির রঙ দেখার মতো, এককথায় বলতে হয়, রংধনু যেন খেলা করে তার গায়ে। তবে বুকের দিকের রঙ কালো, সাদাও হয়। হিমালয়ের পাহাড়ি অঞ্চলেই এদের বেশি দেখা যায়। এছাড়াও আফগানিস্তান, ভুটান, পাকিস্তান ও পশ্চিম চিনেও এদের পাওয়া যায়। পাহাড়ি অঞ্চলের পাখি হওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মিটার উচ্চতায় এদের দেখা মেলে। পুরুষ পাখি স্ত্রী পাখির তুলনায় বর্ণিল ও আকর্ষণীয়। এরা সাধারণত জোড়ায় বা ছোটো দলে চলাফেরা করে। পুরুষ মোনাল স্ত্রী পাখির তুলনায় বেশি আগ্রাসী। এরা বিভিন্ন স্বরে ডাকতে পারে। পুরুষ পাখি স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করতে পালক তুলে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে বিশেষ স্বরে ডাকতে থাকে। স্ত্রী মোনাল ৩ থেকে ৫টি ডিম দেয় এবং নিজেই ডিমের রক্ষণাবেক্ষণ করে। তবে ডিম থেকে বাচ্চা বের হওয়া পর্যন্ত পুরো সময় পুরুষ পাখি স্ত্রী পাখির আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে। প্রায় ৬ মাস বয়সে বাচ্চাগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং নিজেরাই খাবার খুঁজতে সক্ষম। বিভিন্ন ধরনের বীজ, উদ্ভিদ মূল, ফল এবং ছোটো ছোটো কীটপতঙ্গ এদের প্রিয় খাদ্য।

চোপতা থেকে আমরা হাঁটতে আরম্ভ করলাম। একদিকে সবুজ বুগিয়াল আর তার আরও দূরে দেখা যায় উঁচু বরফ ঢাকা পাহাড়ের চূড়া। তার মধ্যে কেদারনাথ ও চৌখম্বা চূড়া দুটি স্পষ্ট দেখা যায়। এই সবুজ বুগিয়ালেই শোনা যায় হঠাৎ করে মোনালের দেখা মিলতে পারে। তাই চড়াইয়ের পাশাপাশি আমি দেখে চলেছি বুগিয়ালের দিকেও। তবে হ্যাঁ, মোনাল এখানে না দেখা গেলেও দেখা গিয়েছে অপূর্ব রোডোডেন্ড্রন (Rhododendron), রাস্তার দু-ধারেই। তাই দেখতে দেখতে কখন যেন পৌঁছে গেলাম তৃতীয় কেদারের দ্বারে । ‘জয় বাবা তুঙ্গনাথ,’ বলে উঠলাম সকলেই।

এখানেও থাকার জন্য কালী কমলি ধর্মশালা আগে থেকেই ব্যবস্থা করা ছিল, তাই মালপত্র রেখে আমরা পাশেই একটা খাবারের দোকানে বসে বেশ আয়েশ করে গরম খিচুড়ি, আলু ভাজা, পাঁপড় আহার করলাম। এখানে কিন্তু এই মে মাসে দিনেরবেলা তাপমাত্রা প্রায় ১৫ ডিগ্রির কাছাকাছি, অর্থাৎ সে অর্থে বেশ ঠাণ্ডা আর রাতের দিকে তা নেমে গিয়ে দাড়ায় ৫ – ৬ ডিগ্রির কাছে, এখানে সেটা হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা এই সময়। খাওয়ার আগে অবশ্য আমরা মন্দিরে গিয়ে বাবা তুঙ্গনাথের দর্শন ও পুজো সেরে আসি। এই ঠাণ্ডায় সকলেই দুপুরের রোদে একটু জিরিয়ে বসে আড্ডা দিতে ব্যস্ত আর তার মধ্যেই আমি স্থানীয় মানুষের কাছে মোনাল সম্বন্ধে দুয়েকটা তথ্য জেনে নিলাম। ওরা জানাল যে মোনাল এখানে হয় সকালের দিকে নয় বিকেলে দেখা যাবে, তবে একটু চোখ খোলা রাখতে হবে। বলা যায় না, হয়তো উপরের পাহাড়ের ঢাল থেকেও নেমে আসতে পারে।

এই সময় আমি একবারের জন্য ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেছিলাম। ঠাণ্ডা বাইরে বেড়ে চলেছিল, তাই মাথার টুপির প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। ফিরে এসে দেখি আমার সঙ্গী-সাথীরা কেউ কোথাও নেই। কী করি, চুপচাপ এদিক ওদিক ঘুরে অন্যান্য সব পাহাড়ি পাখির ছবি তুলছিলাম। এক বৃদ্ধ গাড়োয়ালি ভদ্রলোক বসে ছিলেন ওখানে। তাঁর সঙ্গে আলাপ করে কিছু গল্প জানলাম। উনি এই মন্দিরের একসময় পুরোহিত ছিলেন, এখন বয়সের জন্য আর পেরে ওঠেন না, কিন্তু প্রত্যেক বছর এই সময় মন্দিরের দ্বার খোলার পর উনি এখানেই আসেন। আমার মোনাল দেখার কথা শুনে বললেন এখানেই বসে থাকতে, মোনাল সামনের পাহাড় থেকেই নেমে আসবে।

ইতিমধ্যেই আমার নাম ধরে শুনতে পেলাম কেউ ডাক দিল। দেখি ওরা ফিরে আসছে। দেবজ্যোতি এসে জানাল যে ওরা এইমাত্র নাকি থরে থরে হিমালয়ের থর দেখে এল। থর হল গিয়ে পাহাড়ি ছাগল যাকে থর বলা হয় (Himalayan Tahr), ইংরেজি উচ্চারণও থর। আমাকে নিয়ে তাই সে চলল আবার সেই জায়গায় যেখানে সেই পাহাড়ি ছাগলের দেখা মিলেছিল। আমি এইসব ব্যাপারে অত্যান্ত উৎসাহী, আর বিলম্ব নয়। তাই থর দেখতে পাহাড়ের থর পেরোতেও কোনও পরোয়া নেই।

ঠিক সেই জায়গায়তেই গিয়ে দু’জনে উপস্থিত। কোথায় থর! সব বোধহয় এতক্ষণে পাহাড়ের ঢাল ধরে নেমে গিয়েছে। একটু দেখার চেষ্টা করলাম নিচের দিকে, চোখে ক্যামেরার জুম লেন্স লাগিয়েও কিছুই চোখে পড়ল না। একটু হতাশ হলাম, এত কাছে এসে থর দেখতে পেলাম না। ততক্ষণে মাথার থেকে মোনালের চিন্তা উধাও হয়ে গেছে। আমি কেবল থর নিয়ে ভাবছিলাম। দু’জনেই মনে করলাম আর থেকে লাভ নেই, দূরে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে, এরপর শীত আরও বাড়বে, তাই ফেরাই ভালো। এই চিন্তা করে যেই না ঘুরতে চলেছি, হঠাৎ কী যেন নীলচে মতন পাহাড়ের ঢাল থেকে উঠে আসতে দেখলাম। আমাদের দু’জনেরই চক্ষুস্থির। হাত-পা শিথিল হয়ে আমরা কাঠের পুতুলের মতন দাঁড়িয়ে রইলাম। এ কী দেখি! আমরা ওই সময় মাত্র দুটি প্রাণী ছাড়া আর কোথাও কেউ নেই। আমাদের সামনে তখন আপন মনে পাহাড়ের বুগিয়ালে ঘাসের মধ্যে খাবার খুঁটে খেয়ে চলেছে আর এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে দেখছে আমার অতি আকাঙ্ক্ষিত সেই রাজকীয় পাখি, হিমালয়ের মোনাল। আমরা তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে আছি।

হঠাৎ করে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে মনে হল, এই রে! ছবি তুলতে হবে তো। কেবল মুখে সবাইকে গল্প শোনালে কেউ বিশ্বাস করবে না যে আমাদের মোনাল দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। সেইদিক থেকে দেখলে দেবজ্যোতি কিন্তু ভাগ্যবান। সে থর ও মোনাল, দুই হিমালয়ের জীবের দেখা পেল। সেদিন কিন্তু মোনাল আমাকে অনেক সময় দিয়েছে তার ছবি বিভিন্ন ভঙ্গিতে নিতে, আবার ভিডিও তুলতেও আপত্তি করেনি সে। সেদিনের সন্ধ্যায় বাবা তুঙ্গনাথ আমার ইচ্ছা পূর্ণ করেছেন। আমার চন্দ্রশিলা আসা সার্থক হয়েছে। থর না দেখতে পাওয়ার কষ্ট ভুলে গিয়েছিলাম। সেই রাতে আমার ট্যাবে সকলেই দেখল অপূর্ব মোনালের ছবি।

পরেরদিন ভোরবেলায় আমাদের চন্দ্রশিলা ট্রেক। তাই আর দেরি না করে রাতের খাওয়া সেরে নিয়ে আমরা যে যার ঘরে চলে গেলাম বিশ্রাম নিতে। কিন্তু আমার চোখে ঘুম আসছিল না। সমানে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি মোনালকে। আর সেটা আমার এত মাস পরেও হয়। চোখ বুঝলেই আমি মোনালকে দেখতে পাই। হয়তো উত্তরাখণ্ডে গেলে আবার দেখা মিলবে পিজেন্ট পরিবারের এই রাজকীয় পাখির। এই পিজেন্ট পরিবারের আরও কিছু সুন্দর পাখি আছে হিমালয় পর্বতমালায় যাদের দেখা আমি পেয়েছিলাম বিভিন্ন হিমালয় ভ্রমণের সময়। ওইসব পাখিদের নিয়ে পরের কোনও পর্বে গল্প লিখব।

ফিরে আসার পথে চামোলি ও মণ্ডল নামে এক পাহাড়ি গ্রামে বেশ কিছু অন্যান্য হিমালয় অঞ্চলের পাখিদের সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম। তার মধ্যে সাধারণ এক টিয়াপাখি পরিবারের দুর্লভ ছবি পেয়েছিলাম। কোটরে মা টিয়া তার ছানাকে খাওয়ানোর দৃশ্য। প্রথম চোখে পড়ে আমার, তারপর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করি। কাছে যাইনি আমরা, দূর থেকেই এই অসামান্য দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে রইলাম। মণ্ডলে পেয়েছিলাম পাহাড়ি হাঁড়িচাচার সাক্ষাৎ (Grey Treepie)। সব মিলে বাবা তুঙ্গনাথের কৃপায় এবার অন্তত আমার ট্রেক খুব সফল। আমার মনে একটা ভয় ছিল। বক্সা গিয়ে ধনেশের দেখা পেয়েও ছবি তুলতে পারিনি। মোনালের বেলায়ও তাই না ঘটে। কিন্তু আবার বোধহয় মহাদেব সহায়। সেজন্যেই মোনালের এমন সু্যোগ সামনে এল। পঞ্চ কেদারের বাকি কেদারে যাওয়ার সু্যোগ যদি বাবা মহাদেবের কৃপায় হয়ে ওঠে কখন, তাহলে হয়তো আরও কিছু হিমালয়ের পাখির গল্প নিয়ে উপস্থিত হতে পারব। বাবা তুঙ্গনাথের জয়! তার দর্শন আর মোনাল দেখার জন্য।

আলোকচিত্রঃ লেখক

বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s