বনের ডায়েরি মাঠার জঙ্গলে দিলীপ নস্কর (ডেভিড) বর্ষা ২০১৮

এই লেখকের আগের লেখা দোল

মাঠার জঙ্গলে

দিলীপ নস্কর(ডেভিড)

গাছটার সঠিক বয়েস কত হবে, সেটা আমার আদৌ জানা নেই। আর কত দিনই বা গাছটার আয়ু রয়েছে, সেটাও আমি বলতে পারব না। তবে হ্যাঁ, এর সঠিক আয়ু বা গাছটা আর কতদিন বেঁচে থাকবে, সেটা, চোরাই গাছপাচারকারিরা জানলেও জানতে পারে বোধহয়।

গাছটার সঙ্গে আমার পরিচয় বহুদিনের। ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বরের মিষ্টি রোদমাখা কোন এক সকালবেলায় গাছটাকে আমি প্রথম দেখি। আর পাঁচটা সাধারণ গাছের মতোই আমি তাকে দেখেছিলাম। বিশেষ ভাবে পরিচয় হয়েছিল অনেক পরে। যেমন, গাছটা না থাকলে আমি আর আমার সহপাঠী ভাই রাজীব আমাদের দুজনের জীবনের আয়ুই যে ১৯৯৮ সালের ২৩শে জানুয়ারির রাতেই থমকে যেত সে বিষয়ে কোন সন্দেহ ছিল না।

পুরুলিয়ার বলরামপুর বাজার থেকে বেরিয়ে, বরাভুম স্টেশনকে বাঁ-হাতে রেখে যে রাস্তাটা সোজা বাঘমুণ্ডী হয়ে অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে চলে গেছে, ঠিক বাঘমুণ্ডীর থেকে আন্দাজ নয় দশ কিলোমিটার আগে, রাস্তার ডানহাতে বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে পাঁচিল ঘেরা একটা ফরেস্ট রেঞ্জ অফিস আছে। যেটাকে মাঠা রেঞ্জ অফিস নামেই সবাই চেনে। এই মাঠা রেঞ্জ অফিসের ঠিক আধ কিলোমিটার আগে, বড়ো রাস্তার ডানদিক থেকে একটা মেঠো পথ বেরিয়ে, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে পাহাড়ের দিকে চলে গেছে। বড়ো পাকা রাস্তা থেকে কাঁচা রাস্তাটা বেরোনোর এই মোড়ে, একটা পাঁচমিশেলী দোকানও আছে। চাল ডাল মুদি মশলা কেরোসিন তেল ছাড়াও সকাল সন্ধে সেখানে চা-শিঙাড়া পাওয়া যায়। এই দোকানের উল্টোপারেই সেই গাছটার অবস্থান, জায়গাটা মাঠা গ্রাম ।

মাঠা গ্রাম বা মাঠা পাহাড়, পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ি মহলে বেশ পরিচিত নাম। কারণ প্রতি বছরেই শীতের সময়টা প্রচুর পাহাড়ি ক্লাব এখানে পাথরে চড়ার বা প্রকৃতি পাঠ শেখার ক্যাম্প-এর আয়োজন করে থাকেন। মাঠা ছাড়াও আরো অন্যান্য অনেক জায়গাতে এই ধরনের ক্যাম্পগুলো হয়ে থাকে। বিশেষভাবে বলতে গেলে, শুশুনিয়া, জয়চণ্ডী, বেরো, বানসা, তিলাবনি, গজাবুরু উল্লেখযোগ্য। এছাড়া পুরুলিয়া বাঁকুড়া অঞ্চলে আরো অনেক জায়গাও আছে। সেদিক থেকে মাপতে গেলে এতগুলো জায়গা থাকা সত্ত্বেও বাকিদের তুলনায় মাঠা পাহাড়শ্রেণী বা মাঠা বনাঞ্চল কিন্তু কুলিন গোত্রের মধ্যে পড়ে। অনেকগুলো পাহাড়ের মাথাসমেত অনেকটা জায়গা জুড়ে ঘন জঙ্গল নিয়ে তার বনসাম্রাজ্য। প্রচুর পরিমাণে শাল, সেগুন, মহুয়া, পলাশ, শিমুল ও আরও অন্যান্য অনেক গাছ থাকার ফলে, মাঠা পাহাড়ের বুনো গন্ধটাও বেশ তীব্র।

সেই মনমাতানো মাতাল করা বুনো গন্ধের নেশায়, বহুবার আমরা বাড়ি থেকে পালিয়ে জঙ্গলের মধ্যে তাঁবু ফেলে রাত কাটিয়েছি। বাড়িতে মায়ের কাছে কৈফিয়ত হিসাবে মিথ্যে বানিয়ে বানিয়ে অমুক ক্লাব তমুক ক্লাবের ক্যাম্পের নাম করে পার পেয়েছি।

সময়টা ১৯৯৮ সালের ২০ জানুয়ারি। আমরা তিনজন চুপি চুপি হাজির হয়েছিলাম মাঠা পাহাড়ের জঙ্গলে। তিনজন বলতে  সত্যদা, (যে এখন রিয়া মাউন্ট সাপোর্ট কোম্পানির কর্ণধার) আমি আর বর্ধমানের রাজীব মণ্ডল। এই তিনজনের দলের মধ্যে আমি নিজে বে-গুণ হলেও, বাকি দু’জন কিন্তু ভীষণ বড়োমাপের গুণী মানুষ। সত্যদা খুব ভালো মানের ক্লাইম্বার। ঠাণ্ডা মাথায় ক্যাম্প পরিচালনা করতে পারত। খুব বড়োমাপের লিডার হওয়ার সমস্তরকম গুণ তার মধ্যে ছিল। বয়েসে ছোটো হলেও রাজীব অসীম সাহসী ও তুখোড় রক ক্লাইম্বার। পরবর্তীকালে সে হিমালয়ের অনেকগুলো সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ চড়ার পরেও সম্পূর্ণ হিমালয় রেঞ্জে আড়াআড়ি পথে, পায়ে হেঁটে বিশেষ কীর্তি অর্জন করেছে।

ভগবানের অসীম কৃপায় আমার ভাগ্য কিন্তু বেশ ভাল ছিল। ওই মনমাতানো অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে, দলের ওই গুণী মানুষজনদের সঙ্গ পেয়ে, আমি নিজেকে ভীষণ ভাগ্যবান বলে মনে করতাম। মনভোলানো অনাবিল এক আনন্দ নিয়ে দলের সবার সঙ্গে ভেসে বেড়াতাম ।

সেবার আমাদের সেই ক্যাম্পে অনেকগুলো ঝঞ্ঝাট হয়েছিল। ঝামেলা কিছুতেই পিছু ছাড়ছিল না। প্রথমদিন সকালে, রেঞ্জ অফিসের পেছন দিক থেকে যে রাস্তাটা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সোজা পাহাড়ের দিকে চলে গেছে, সেদিকেই খানিকটা গিয়ে রাস্তার বাঁ দিকটায় কুয়োতলার কাছে তাঁবু পাতব ঠিক করলাম। সবে তাঁবু পেতেছি, তখনো সবকিছু গুছিয়ে উঠতে পারিনি, ব্যস! এর মধ্যেই ফরেস্টের চৌকিদার এসে হাজির, কী ব্যাপার! না আমাদের সবাইকে এখনি রেঞ্জের সাহেব ডেকেছেন। অগত্যা আমরা তিনজনই রেঞ্জ অফিসে উপস্থিত হলাম।

রেঞ্জার সাহেব কিন্তু আড়ে বহরে সব দিকেই কম। রোগা টিংটিঙে বেঁটেখাটো লোক, বয়েস কম বেশি ষাটের কাছাকাছি, কিন্তু তেজ আছে। আমাদেরকে দেখেই তিনি তিরিক্ষি মেজাজে দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠলেন, “কী পেয়েছ টা কী অ্যাঁ? তোমাদের যা ইচ্ছে তাই করবে নাকি? জঙ্গলের যেখানে সেখানে তাঁবু পেতে বসে পড়বে? তোমাদের জন্য কি এই শেষ বয়েসে এসে আমি চাকরি খোয়াবো?”

তাঁর সেই তিরিক্ষি মেজাজের সামনে পড়ে, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে, কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে থাকার পর ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে দেখি, আমাদেরকে হাজির করিয়ে দিয়েই চৌকিদার কখন কেটে পড়েছে। যাই হোক, আমাদের তরফ থেকে কোনরকম সাড়াশব্দ না পেয়ে, শেষমেশ তিনি খানিকটা ঠাণ্ডা হয়ে বললেন, “ঠিক আছে। তোমরা রেঞ্জ অফিসের এই ঘেরা জায়গার মধ্যে তাঁবু পেতে থাকতে পার। কিন্তু জঙ্গলের ভেতরে আমি কিছুতেই তোমাদের তাঁবু পেতে থাকতে দেব না। কারণ জঙ্গলের ওই জায়গার ওপর দিয়ে যে কোন মুহূর্তে হাতি নামতে পারে।”

ওঁর কথামত আমরা তিনজনেই সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে রেঞ্জ অফিস থেকে বেরিয়ে এলাম। এবং নিশ্চিতভাবেই তাঁবু তুলে রেঞ্জ অফিসের ঘেরা জায়গার দিকে আসার বদলে, সমস্ত মালপত্র রুকস্যাকে ভরে জঙ্গলের আরও ভেতরে পাহাড়ের দিকটায় পালিয়ে গেলাম, যাতে ওই তালপাতার সেপাই রেঞ্জ অফিসার, আর তার শাগরেদ পেটমোটা চৌকিদার কিছুতেই আমাদের নাগাল না পায়।

দিনের বাকি সময় তাঁবু না পেতে, জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে এ পাথরে সে পাথরে চড়ে, অবশেষে সন্ধেবেলায় পাহাড়ের নীচের দিকে ফিরে আসা গেল।

কুয়োতলার উল্টো দিকে জঙ্গলের ভেতরটায় একটা পুকুর আছে, দিনের বেলায় গ্রামের মানুষজন সেটা ব্যবহার করে, কিন্তু রাতের বেলায়, বিশেষ করে বুনো হাতির ভয়ে, ভুলেও তারা পুকুরটার ত্রিসীমানায় আসে না। পুকুরটার উত্তরপাড়ের জঙ্গলটা বেশ ঘন, রাতের অন্ধকারে চুপিচুপি টর্চ জ্বেলে, সেইখানেই তাঁবু পেতে সে-রাতের জন্য আশ্রয় নিলাম।

পরের দিন ভোর রাত্রি থেকে হাল্কা মাঝারি বৃষ্টি পড়া শুরু হল। একে শীতকাল, তার ওপর এই ঝিরিঝিরি বৃষ্টির সঙ্গে জঙ্গলের ভেতর তাঁবুতে থাকার ফলে, আমদের অ্যাডভেঞ্চার-এর অনুভূতি আর বেড়ে গেল। শেষে একনাগাড়ে দু-দিন ধরে বৃষ্টি হবার ফলে, ঘন ঝোপঝাড়ে বিষাক্ত পোকামাকড় ও সাপখোপের ভয়ে, তাঁবু তুলে আগের জায়গাতেই আবার ফিরে আসতে বাধ্য হলাম।

এর মধ্যে একদিন সকাল বেলায় দাঁত ব্রাশ করে জঙ্গলের পুকুরে মুখ ধুতে গিয়ে দেখি পুকুরঘাটে ছোটো ছোটো মাছের ঝাঁক ঘুরে বেড়াচ্ছে।

জলের তলায় গামছা পেতে তার ওপর ভাঙা বিস্কুটের টুকরো ছড়িয়ে প্রায় ঘণ্টাদেড়েকের চেষ্টায় সামান্য কিছু পুঁটিজাতীয় মাছ ধরলাম। নয় দশ বছরের দুটো বাচ্চা ছেলে, মাছ ধরার প্রথম থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আমার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছিল। ভেবেছিলাম দুপুরে চুনো মাছের ঝাল দিয়ে ভাত খাব, কিন্তু বাচ্চাদুটোর মুখের দিকে তাকিয়ে সে পরিকল্পনা বাতিল করলাম। বৃষ্টি ভেজা শীতের দিনে, পুরোনো তাপ্পি মারা হাফপ্যান্ট পরা খড়ি ওঠা খালি গায়ের বাচ্চা দুটিকে বীর সৈনিকের মতো লাগছিল। একটা বড় সেগুন পাতার ঠোঙ্গা বানিয়ে, মাছগুলো তার মধ্যে রেখেছিলাম। মাছগুলো সমেত ঠোঙাটা দেখিয়ে ছেলে দুটোকে বললাম, “মাছগুলো তোরা নিয়ে যা।”

ব্যস, আনন্দ আর দেখে কে! শীতের দিনের পরিচর্যার অভাবে গালের দুপাশের চামড়ায় অজস্র ফাটল সমেত নিষ্পাপ হাসিমাখা মুখদুটো অনেক দিন মনে থাকবে।

বিকেলের দিকে বৃষ্টি পুরোপুরি থেমে গেল; দুদিন ধরে বৃষ্টি হওয়ার ফলে, গাছের পাতাগুলো বেশ চকচকে হয়ে গেছে। জঙ্গলটাকেও বেশ ঘন ও সবুজ দেখাচ্ছে। পাহাড়ের চূড়ার দিকটায় মেঘ জমে থাকায় পাহাড়ের উচ্চতাটা বোঝা যাচ্ছে না। হঠাৎ করে দেখলে, মাঠার এই পাহাড় বনভুমিকেও হিমালয়ের পাদদেশ বা ডুয়ার্স বলে মনে হচ্ছে।

পাহাড়ের উল্টোদিকে হাইটেনশন ইলেকট্রিক তারের ওপর, এক ঝাঁক বাঁশপাতি পাখি বসে আছে। থেকে থেকে কয়েকটা পাখি হঠাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে উড়ন্ত পোকা ধরে আবার ফিরে এসে তারের ওপর বসে লেজ দোলাচ্ছে। ডুবন্ত সূর্যের ম্লান আলোয় দৃশ্যটা মনোরম লাগছিল।

বাইশ তারিখ রাতে রান্না করতে গিয়ে সত্যদা জানাল কেরোসিন তেল বাড়ন্ত। ফলে সেদ্ধ ভাত ছাড়া আর কিছুই হল না। তাই খেয়ে আমরা তিনজন তাঁবুতে শুয়ে পড়লাম। পরের দিন সকালে গরম চা-টুকুও যে জুটবে না সেটাও বেশ ভালভাবেই বুঝে গেলাম। একে তো কেরোসিন তেল শেষ, তার ওপর বৃষ্টি হওয়ার ফলে জঙ্গলের কাঠপাতাও ভিজে।

পরদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে, সত্যদা কেরোসিন তেলের খোঁজে বলরামপুরের দিকে চলে গেল। এদিকে আমি আর রাজীব দুজনেই বেশ অলস ভাবে তাঁবুতে শুয়ে আছি। কিছুতেই উঠতে ইচ্ছে করছে না।

প্রায় সকাল আটটা নাগাদ তাঁবুর বাইরে বাচ্চা ছেলেমেয়েদের আওয়াজ পেয়ে তাঁবুর চেন খুলে দেখি, বেশ ধোপদুরস্ত ভালো জামাকাপড় পরা তিন চারটে শহুরে বাচ্চা ছেলেমেয়ে, ভীষণ অবাক চোখে আমাদের তাঁবুর চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখছে। আমাদের দিকে চোখ পড়তেই দৌড়ে পালিয়ে গেলো। তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে দেখি, রেঞ্জ অফিসের পাশের আমতলায় একটা বড় বাস দাঁড়িয়ে আছে। অনেকগুলো বাচ্চা ছেলেমেয়ে মনের আনন্দে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করে খেলা করে বেড়াচ্ছে। কোনো স্কুল থেকে এসেছে, পিকনিক করবে বোধহয়।

রাজীব তখনো তাঁবুর ভেতরে শুয়ে আছে। ব্রাশ, পেস্ট নিয়ে পুকুর ঘাটের দিকে যাচ্ছি হঠাৎ পেছনে অনেকগুলো পায়ের আওয়াজের শব্দে ঘুরে দেখি, সেই পালিয়ে যাওয়া বাচ্চা ছেলেমেয়েরা দুজন দিদিমনিকে  সঙ্গে নিয়ে সটান আমাদের তাঁবুর সামনে হাজির। আমাকে সামনে পেয়ে, দিদিমনিদের একজন সরাসরি প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা আপনারা এই জঙ্গলে এভাবে তাঁবু খাটিয়ে কী করছেন? রাতেও কি এখানে ছিলেন? কেন ছিলেন? কেন জঙ্গলে এভাবে তাঁবু খাটিয়ে থাকেন?”

এইসব নানান অবাক হওয়া প্রশ্ন। আমি যতটা সম্ভব ছোটো করে গুছিয়ে বলার চেষ্টা করলাম। পাহাড় চড়ার সাথে সাথে, বনজঙ্গলে তাঁবুতে থেকে প্রকৃতি পাঠ  শেখা, এটা এক ধরনের খেলা। এটাকে অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস বলে।

এর মধ্যে দিদিমনিদের একজন তাঁবুর ভেতরে উঁকিঝুঁকি মেরে আমাদের পাহাড়ে চড়ার সরঞ্জামগুলো দেখতে থাকলেন। সবশেষে কেরোসিনে জ্বলার ছোটো পেতলের স্টোভটা দেখে ভারি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “ওইটুকু ছোটো স্টোভে আপনাদের সবার রান্না হয়?”

উত্তরে জানালাম হয়। দিদিমনিদের দুজনেই সব কিছু বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে, নিজেদের মধ্যে কীসব আলোচনা করে, শেষে আমাদের দুজনকে বললেন, “দেখুন আমরা পুরুলিয়ার একটা ইস্কুল থেকে এখানে পিকনিক করার জন্য এসেছি।” তারপর আমাদের দুজনকে অবাক করে, একটা অভিনব প্রস্তাব দিয়ে বললেন, “আপনাদের এই সব পাহাড় চড়ার সরঞ্জাম আর প্রকৃতি পাঠ সম্বন্ধে, কোনোরকম গল্প যদি আপনারা আমাদের ছাত্রছাত্রীদের বলেন, তাহলে আমাদের খুব ভালো লাগবে, তার সঙ্গে আমাদের ছাত্রছাত্রীরাও ভীষণ মজা পাবে।”

সঙ্গে অকল্পনীয় পুরস্কার হিসাবে, আমরা পিকনিকের বিশেষ অতিথি হয়ে সারাদিনের খাওয়ার নিমন্ত্রণ পেলাম।

সেদিন ২৩ জানুয়ারি। ঝকঝকে আকাশ। সারাটা দিন বেশ হইচই করে কাটল। পাহাড় চড়ার সরঞ্জাম দেখানো, ছোটো তাঁবুতে কী করে থাকতে হয় সে’সব বলা, বাচ্চা ছেলে মেয়েদেরকে নিয়ে ছোট ছোট পাথরে চড়া শেখানো, সে এক ভারি মজার ব্যাপারস্যাপার। বিকেলের দিকে দিদিমনিরা সহ সমস্ত ছেলে মেয়েদের দল, আমাদেরকে বিশেষ ধন্যবাদ ও বিদায় জানিয়ে বাসে উঠে পড়ল। এরকম পাহাড়-জঙ্গলের রোমাঞ্চকর পরিবেশে সারাদিন এক সঙ্গে কাটানোর ফলে কয়েকটা বছর ছয় সাতের বাচ্চা ছেলেমেয়ে আমাদের ভীষণ নেওটা হয়ে পড়ল। কিছুতেই ফিরে যাবে না। বায়না ধরল তারাও আমাদের সঙ্গে ওই জঙ্গলের মধ্যে তাঁবুতে রাত কাটাবে।

বাস ছাড়ার সময়, বাসের জানালার ধারে বসা কচি কচি মুখগুলোর ভেজা চোখে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানানোর দৃশ্যটা আজও স্পষ্ট চোখের সামনে ভাসে।

সন্ধের সময় মনটা ভীষণ চা চা করছে। সত্যদাকে একা তাঁবুতে রাতের রান্নার দায়িত্বে রেখে, আমি আর রাজীব তাঁবু ছেড়ে রাতের অন্ধকারে একটু চায়ের আশায় বেরিয়ে পড়লাম।

জঙ্গলের ভেতর দিয়ে মেঠো পথ ধরে, বড় রাস্তার মোড়ে সেই পাঁচমিশেলি দোকানটার সামনে হাজির হলাম। দোকান ভেতর থেকে বন্ধ, অনেক ডাকাডাকি করেও খোলানো গেলো না।

চা না পেয়ে বড় রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে, ভুশুণ্ডি মোড়ের দিকে খানিকটা এগিয়ে গেলাম। নির্জন রাতে কেন জানি না, নিজেদের অজান্তেই রাতের অন্ধকারে আমারা দুজনেই সেই নির্জন প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গেলাম। চারিদিক একেবারে নিস্তব্ধ। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকও প্রায় নেই বললেই চলে। আকাশে অজস্র তারার সঙ্গে সরু এক ফালি চাঁদও আছে। মাঝে মাঝে দূরের কোন গ্রাম থেকে ধামসা মাদলের আওয়াজ আসছে। গত দুদিন বৃষ্টি হওয়ার দরুন শীতটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে।

দু’জনের মধ্যে কথাবার্তা প্রায় নেই বললেই চলে। জ্যাকেটের চেনটা গলা অবধি টেনে দিলাম। উলেন ক্যাপ যতটা সম্ভব নিচের দিকে টেনে নামিয়ে কান দুটো পুরোটা ঢেকে দিয়েছি। পাহাড়ের দিকটায় হাল্কা কুয়াশা আছে। জঙ্গলের মধ্যে কয়েক হাজার জোনাকি পোকা ঝাঁক বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সেই নির্জন নিস্তব্ধ শীতের রাত্রে, একমাত্র একটা রাতচরা পাখি মাঝে মাঝে ডেকে উঠছে। দারুন এক মন পাগল করা অদ্ভুত শান্তির পরিবেশ। চায়ের কথা ভুলে গেলাম। মন উদাস হয়ে গেল। রাতের জঙ্গলের সেই অপরূপ মায়াবী সৌন্দর্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে থাকলাম।

মাঝে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে আমরা দুজনে কেউই টের পাইনি। হঠাৎ হাতঘড়িতে দেখি রাত দশটার কাছাকাছি বাজে। এবার তাঁবুতে ফিরতে হবে।

অনেকক্ষণ ধরে  নাম না জানা কিছু বুনোফুলের গন্ধ পাচ্ছিলাম। ফেরার সময় সেটা নিয়েই আলোচনা করতে করতে ফিরছি, ফুলটার কী নাম হতে পারে! কেমন দেখতে! ফুলের গাছটাই বা কেমন!

এসব কথা বলতে বলতে সবেমাত্র রাস্তার মোড়ের মাথায় পৌঁছেছি, হঠাৎ জোরালো আলো জ্বালিয়ে একটা সাদা এ্যাম্বাসাডার গাড়ি, ঝড়ের গতিতে আমাদের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। গাড়ির আওয়াজটা কান থেকে মিলিয়ে যেতেই, রেঞ্জ অফিসের দিকটায় একটু হাল্কা শোরগোলের আওয়াজ পেলাম।

প্রথমটায় আমরা দুজনেই বড়ো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে, ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলাম, ঘটনাটা কী। কিন্তু রেঞ্জ অফিসের দিকটায় শোরগোলের আওয়াজ ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। নিমেষের মধ্যে সেটা বাড়তে বাড়তে মাঠা গ্রামের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। কয়েকমিনিটের মধ্যেই দেখলাম, অনেক মানুষজন হাতে মশাল, লণ্ঠন নিয়ে বিরাট শোরগোল করতে করতে, রেঞ্জ অফিসের দিক থেকে আমাদের দিকে ধাওয়া করে আসছে। চিৎকার চেঁচামেচির জোর আর মশালের আলোগুলো ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। জ্যোৎস্নার সৌন্দর্য-মাখা-রাত কোথায় যে লুকিয়ে পড়লো, নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে খান খান হয়ে গেল।

ক্ষণিকের মধ্যে ঘটনাটা ঘটে যাওয়াতে আমরা দুজনেই বেশ হকচকিয়ে গেলাম। রাজীব বলল, ডেভিডদা হাতি বেরিয়েছে। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত পা ঠাণ্ডা, পিঠের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা চোরা স্রোত বয়ে গেল। ভয় পেয়ে দুজনেই এদিক-ওদিক যে কোনও একটা নিরাপদ আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করলাম।

ওদিকে সেই পাঁচমিশেলি দোকানটাও ভেতর থেকে খিল এঁটে বন্ধ করা। জঙ্গলের দিকটায় যে পালিয়ে যাব তারও উপায় নেই। কারণ বুনো হাতির দল কখন যে, কোন দিক থেকে আমাদের সামনে উপস্থিত হবে তার কোন ঠিক নেই।

শেষমেশ সামনের বড় গাছটাকে পেয়ে, সেটাতেই চড়ে বসলাম। চড়াটা কিন্তু মোটেও সহজ হয়নি। একে তো আমাদের দুজনের পায়েই জুতো, তার ওপর গাছটাও বেশ মোটা, নিচের দিকে ডালপালা প্রায় নেই বললেই চলে। একপাশ থেকে ঝুড়ি নেমেছে, হাতের নাগালের মধ্যে দু-তিনটে টিনের প্লেট, গজাল পেরেক দিয়ে গাছটার গায়ে সাঁটা, কোন বিজ্ঞাপন হবে বোধহয়, সেগুলোর সাহায্যে বহুকষ্টে গাছটার প্রায় মাঝামাঝি জায়গায় পৌঁছে গেলাম।

একটা মোটা কাণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে, প্রাণভয়ে আর একটা সরু ডাল দুহাতে শক্ত করে ধরে দুজনে দাঁড়িয়ে থাকলাম। গায়ের জ্যাকেট ছিঁড়ে ফর্দাফাই, কানের পাশ দিয়ে টপ টপ করে ঘাম পড়ছে, শরীরের বহু জায়গায় কেটেছরে রক্ত ঝরছে। ঘন ঘন নিশ্বাস আর বুকের ঢিপ ঢিপ আওয়াজ, ড্রাম পেটানো আওয়াজের মতো আমাদের কানে বাজতে থাকল।

ওদিকে ততক্ষণে গ্রামের সেই বিরাট লোকজনের দল হৈ হৈ করতে করতে মোড়ের মাথায় এসে হাজির। মশাল হাতে বহু লোক একসঙ্গে একত্রিত হয়েছে। এত লোক যে এই মাঠা গ্রামেই থাকে সেটা আগে কোনদিন দেখিনি। দিনের বেলায় তো মানুষজন প্রায় চোখেই পড়ে না।

প্রতেকের হাতেই মশাল আর লণ্ঠনের সাথে, লাঠি, বল্লম, সড়কি ছাড়াও আরো অন্যান্য অনেক গ্রাম্য অস্ত্র আছে, যেগুলো কিনা আগে কোনদিন চোখেই দেখিনি বললে চলে। চূড়ান্ত মহুয়ার নেশায়, তাদের সেই অসম্ভব ভয়ঙ্কর মারমুখি চেহারা দেখে, ভয়ে আমাদের হাত পা অসাড় হয়ে যাওয়ার জোগাড়। মনে হচ্ছে এইবার বোধহয় গাছ থেকে পড়ে যাব। মনে মনে ভগবানকে স্মরণ করছি আর ভাবছি, একবার যদি ঘুণাক্ষরেও তারা আমাদের এই গাছে লুকিয়ে থাকার ব্যাপারটা টের পায়, তাহলে গাছ থেকে নামিয়ে পিটিয়ে মেরে রাতের অন্ধকারে মাটিতে পুঁতে দিয়ে চলে যাবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

রেঞ্জ অফিসের উল্টোদিকের খড়ের চাল দেওয়া মাটির বাড়িটায় একটা আধ-পাগলা ছেলে থাকে, তার হাঁকডাকটাই সব থেকে বেশি মনে হল। নিমেষের মধ্যে কোথা থেকে একটা ৪০৭ ম্যাটাডোর ভ্যান উদয় হল। মারমুখী মানুষগুলো দুড়দাড় করে গাড়িতে উঠে, অ্যাম্বাসাডার গাড়িটা যেদিকে গেছে, সেদিকেই তীব্রগতিতে চলে গেল। বাকি লোকগুলো মোড়ের মাথায় জটলা আর গুঞ্জন করতে থাকল। গাছের ওপর থেকে নিঃশব্দে তাদের কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করতে থাকলাম। আবছা যেটা বুঝতে পারলাম, হাতি নয়। অ্যাম্বাসাডার গাড়িটা রেঞ্জ অফিসের চৌকিদারকে চাপা দিয়ে দ্রুতবেগে পালিয়ে গেছে। আঘাত খুব গুরুতর, গাড়ির চাকা চৌকিদারের পেট এবং মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে, সে বোধকরি আর বাঁচবে না।

মিনিট দশেকের মধ্যে অ্যাম্বাসাডার গাড়িটাকে ধরতে না পেরে, ৪০৭ ম্যাটাডোর ভ্যান ফিরে এলো। তারপর আরও ঘণ্টাখানেক ধরে, অ্যাম্বাসাডার গাড়ি আর তার চালককে ধরতে না পারার আফশোষে দুর্বোধ্য গ্রাম্য ভাষায় তাদের মুণ্ডপাত করতে থাকল। তারপর রাত আরো গভীর হলে, তাদের হাতের মশাল ও লণ্ঠনগুলোর আলো ধীরে ধীরে নিভে আসাতে, তারা যে যার বাড়ির রাস্তা ধরল।

রাত প্রায় বারোটা নাগাদ, গাছের তলা ও রাস্তার মোড় মানুষজনশূন্য হতে, আমরাও অতি সাবধানে ধীরে ধীরে গাছ থেকে নেমে এলাম। তারপর চুপিচুপি চোরের মতো জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আমাদের তাঁবুতে ফিরে গেলাম। শরীরের অজস্র জায়গায় ছড়ে যাওয়াতে, প্রচণ্ড ব্যথা, সঙ্গে হাল্কা জ্বর এল। জ্বর এবং চৌকিদারের দুর্ঘটনার চিন্তায় রাতে ভালো ঘুমও হল না।

পরদিন সকালে উঠে মুখ চোখ ধুয়ে, প্রথমেই রেঞ্জ অফিসের দিকটায় গেলাম। অফিসের পেছনের পাঁচিল-ভাঙা গেট দিয়ে ঢুকেই, ডান হাতে কুয়োতলার দিকে হঠাৎ চোখ পড়াতে, থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। অবাক চোখে তাকিয়ে দেখি, গতকাল রাতের সেই গাড়ি-চাপা-পরা চৌকিদার! কুয়োর পাশে বসে জলের লোটা হাতে, এক মনে গুড়াখু তামাক দিয়ে দাঁত মেজে চলেছে। চোখের ওপরের দিকে কপালে, সামান্য একটু ছড়ে যাওয়ার কালচে দাগ ছাড়া, সারা শরীরে আর কোন আঘাতের চিহ্নমাত্র নেই। গুড়াখু তামাকের কষ আর মুখের লালা মিলে, আঙুলের ফাঁক দিয়ে হাত বেয়ে কনুই ছুঁয়ে, রক্তের ধারার মতো টপ টপ করে চাতালে পড়তে থাকল। ধীর পদক্ষেপে তার সামনে এসে দাঁড়ালাম। মুখ তুলে তাকাতেই জিজ্ঞাসা করলাম, “গতকাল রাতে কী হয়েছিল?”

প্রথম দিকে সে কিছুই বলতে চায় না। শেষে আমার জেরার মুখে পরে, মুখ ধুতে ধুতে যেটা বলল, গতকাল রাতে এমন কিছুই হয়নি। চৌকিদার রাতে ডিউটি শেষ করে, দুয়ারসিনির হাট থেকে গলা অবধি মহুয়া খেয়ে সাইকেলে চড়ে রেঞ্জ অফিসের কোয়ার্টারে ফিরছিল। একটা অ্যাম্বাসাডার গাড়ি দ্রুতগতিতে তার পাশ চলে যাওয়ার ফলে সে টাল সামলাতে না পেরে রাস্তার পাশে পড়ে গেছে মাত্র। ঘটনাটা শুনে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। রাগে গা রি রি করছে।

মনে মনে ভাবছি গ্রামের এই সহজ সরল মানুষগুলো রাতের অন্ধকারে শোনা কথার ঝোঁকে এবং হুজুগের ঠেলায়, একটা সামান্য ছোটো ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের আদিম বর্বরতাকে যে কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, গতকালই সেটা নিজের চোখে দেখেছি।

বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় আরও একবার গাছটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, নিজেকে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে, গতকাল রাতে আমরা এই গাছটায় চড়ে বসেছিলাম। ভগবানকে অনেক ধন্যবাদ এবং গাছটাকে শতকোটি প্রণাম জানিয়ে, কলকাতায় ফেরার ট্রেন ধরার জন্য বরাভুম স্টেশনের দিকে রওনা দিলাম।

শেষের কথাঃ

বেশ কিছুদিন ধরেই খবরের কাগজ আর ফেসবুক খুললেই দেখতে পাছি, চারিদিকে নির্মম ভাবে বৃক্ষনিধন চলছে। মানুষ এবং সমাজের উন্নতির প্রয়োজনে গাছ কাটতে হবে বৈকি। কিন্তু তার একটা নির্দিষ্ট পরিমাপ থাকা দরকার। ফড়ের দল, যারা ভুয়ো উন্নতির কারণ দেখিয়ে, চারখানা গাছ কাটার অনুমতিপত্র আদায় করে, আর তারপর অনৈতিকভাবে চারশো গাছ কেটে রাতের অন্ধকারে পাচার করে দেয়, তারা পরিবেশ বোঝে না, বাস্তু বোঝে না, মানুষ বোঝে না, সমাজ বোঝে না, প্রকৃতির ভারসাম্য বোঝে না। এসবের কোনো মূল্যই তাদের কাছে নেই। এ লেখায় তাদের প্রতি আমার তীব্র ধিক্কার জানালাম । এইসঙ্গে আমাদের সেই রাতের প্রাণ রক্ষাকারী গাছটার ছবিটা আটকে দিলাম।          

অলঙ্করণ পিয়ালী ব্যানার্জি। ফোটোগ্রাফ লেখক

   বনের ডায়েরি সব পর্ব একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s