বনের ডায়েরি-ভারতের মানুষ ও না মানুষদের গল্প -বিস্ট অ্যান্ড মেন ইন ইন্ডিয়ার বঙ্গানুবাদ পিয়ালী চক্রবর্তী, (মূল লেখাঃ জন লকউড কিপলিং) শীত ২০১৬

bonerdiary03গাধা

বর্ষা তখন ঘোর নেমেছে  নৌকোখানি তৈরি হয়ে দোলে

নোয়ার কাছে খবর এল জীবজানোয়ার তুলতে হবে বলে

শিং, পালকে টান মেরে সব জীবজানোয়ার তুলল নোয়া টেনে

একলা গাধা দাঁড়িয়ে বলে, তোমার আদেশ নিচ্ছি না তো মেনে

মিষ্টি কথায় কাজ হল না, কাজ হল না বিশ্রি কথার হুল-এ

তখন নোয়া বেজায় রেগে শাপশাপান্ত  করল গলা খুলে

তুই নিজে, তোর জন্মদাতা, অন্নদাতা মস্ত গাধা যে সে

শয়তানে থাক সবার সাথে। বাক্য শুনে উঠল গাধা এসে

সুড়সুড়িয়ে নোয়ার নায়ে। কিন্তু তবু জাহাজ নাহি নড়ে

নেইতো হাওয়া, বউমেয়েরা নোয়ার তখন হাঁসফাঁসিয়ে মরে

খোলের ভেতর জীবজানোয়ার উল্টিয়ে চোখ মরল দলে দলে

শুনতে পেয়ে পায়ের নীচে বৃংহতি আর তিমির গভীর ডাক

নামল নোয়া খোলের ভেতর দরজাটাকে একটু করে ফাঁক

তাকিয়ে দেখে ত্রিশূল হাতে লেজ বাগিয়ে দাঁড়িয়ে শয়তান

চোখ পাকিয়ে বলল, “তোমায় জাহাজ চড়ার কে দিল ফরমান?”

বলল হেসে অতিথ, তোমার গাধার সাথে চলেই এলাম আমি

নেমন্তন্ন করলে যখন এই জাহাজের তুমিই গৃহস্বামী

গাধাদের ব্যাখ্যা করতে গেলে বলা যায় যে, একেবারে মুক্ত থেকে বন্ধ। অর্থাৎ বাঁদরের থেকেও বেশি বন্য আর মানুষের দাস দীর্ঘদিন থেকে। একটা বন্য গাধার থেকে লাগামছাড়া যেমন আর কেউ হয় না, তেমনি যখন তাকে মোট বওয়ার কাজে লাগান হয়, তার মত কষ্টের বাঁধনও কারো হয়না। কাউকে ভর্ৎসনা করে ‘গাধা’ বলা ত সেই চিরাচরিত ব্যাপার, আবার কঠিন জীবনের বোঝা বয়ে নিয়ে যাওয়াও সেই গাধার খাটুনির মত। অথচ ঘোড়াকে ঠিকঠাক চেনার আগে, এই গাধার কত দর ছিল! এমনকি অ্যাসিরিয়ান সভ্যতার প্রস্তরচিত্রে এদের দেখা যায়। একসময় রাজা, সম্রাটদের বাহক ছিল গাধা। এমনকি এখনও কায়রো, দামাস্কাস, বাগদাদে আর আরবে বেদুইনরা তো এদের সওয়ারি হয়ই, এমনকি সম্মানিত মানুষজনও এসব দেশে গাধার সওয়ারি হন।

bonerdiary01এমনকি ‘আরব্য রজনী’র গল্পতেও কিছু কথোপকথন আছে ষাঁড় আর গাধার মধ্যে। এমন লেখাও আছে যে স্বয়ং মহম্মদেরও দুটি গাধা ছিল, একজনের নাম ছিল ইয়াফুর, এমনকি সেই মহাত্মাও দুজনকে অবজ্ঞা করতেন না। কিন্তু ভারতবর্ষে শুধু যাযাবরদের, কুমোরের, ধোপার এবং আরও যারা এই ধরণের শ্রমজীবি মানুষ যাদের নিচু জাতের বলে গণ্য করা হয়, তাদেরই শুধু নিজেদের গাধা আছে। কিন্তু এই হাস্যকর হিন্দু সমাজের বিধান অনুযায়ী, গাধা যে কিনা ‘বসন্ত’ রোগের দেবী শীতলার বাহন, তারাই সবচেয়ে অবজ্ঞার পাত্র। তাই সবার অপছন্দের আর বিদ্রূপের প্রাণী হল গাধা যে কিনা একটি খুব প্রয়োজনীয়, বিবেচক আর আদরণীয় জীব। তাকে কখনই তার মালিক খেতে দেয় না। এমনকি এরকম প্রবাদ প্রচলিত আছে যে, গাধাকে খাওয়ানো পাপও নয়, পুণ্যও নয়। ভারতীয় প্রথায়, অনেকসময় ‘শূকরের সামনে মুক্তো সাজিয়ে’ দেবার মত, গাধাকেও কেক, মিষ্টিমাংস, পাউরুটি, চিনি, কেশর, ঘি, কারিপাতা এসব দেওয়া হয়। কিন্তু এটা আজ অবধি কেউ অনুধাবন করেনি যে গাধা সত্যিই এগুলো পাবার উপযুক্ত।

আবার একটু বক্রভাবে দেখলে, গাধাকে বলা হয় যে সে নাকি সবরকম ঋতুতেই খুব ভাল থাকে। খুব গরম, শুকনো ঋতুতে, যখন সে পুড়ে ফুটিফাটা জমির উপর দিয়ে হাঁটে, তখন নাকি সে আনন্দে ডাক দেয়, ভাবে যে সে এই জমির সব ঘাস খেয়ে নিয়ে মোটা হয়ে গেছে, তাই নাকি জমির এই অবস্থা। আবার খুব বর্ষার সময়, সে নাকি ডাক দিয়ে বলতে চায় ‘আমি বাবা এত জাব খেয়ে শেষ করতে পারব না।’

এই মজাটা আসলে একটা উপহাস। আর তাই গাধার মত বুদ্ধি থাকাটা মোটেই ভাল ব্যাপার নয়। আর সবচেয়ে নির্বোধ আর অকারণ বিশ্বাস হল, যে রাস্তা দিয়ে গাধা হেঁটে যায়, সেখান দিয়েও হাঁটলে হয় পায়ে খুব যন্ত্রণা হবে, নাহলে পঙ্গু হয়ে যাবে। আরবেও এমন কুসংস্কার আছে, আল মাসুদি লিখে গেছেন যে পিশাচদের পা নাকি গাধার মত হয়, অনেকটা এই চলতি বিশ্বাসের মতই। কিন্তু পূর্বের দেশের মত যে পিশাচরা এখনও বেঁচে আছে এবং তাদের নিজস্ব ইতিহাস আছে।

bonerdiary02ভারতে এই হতভাগ্য জানোয়ারের নাসারন্ধ্রটাও কেটে দেওয়া হয়। এটা খুবই যন্ত্রণাদায়ক। এটা করা হয় যাতে তার কর্কশ স্বর একটু নরম হয়। এক অদ্ভুত নিষ্ঠুর পাগলামি, যাতে করে পাইপ খেতে খেতে টমটম চড়া লোকেদের কানের আরাম হয়। অথচ এই স্বর তখন জীর্ণ আর্তনাদের মত বাতাসে একটা মনমরা সুর তৈরি করে। কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও গাধার ডাক হল ‘তীব্র এবং পরিষ্কার’, কোন হীন উপায়েই তা আটকানো যায় না। যেমন ‘দ্রোমনা’য় ভিলিয়াস স্টুয়ার্ট উল্লেখ করেছেন, প্রাচীন ইজিপ্টের এক দেওয়াল চিত্রের যেখানে একজন চালক তার গাধাকে থামানোর চেষ্টা করছে যখন সে তীব্রস্বরে ডাকার চেষ্টা করছে। ‘হাউজ অফ কমন্স’ এর স্পিকার হয়ত পরচুলা আর পোশাক পরে একটা সময় অব্দি খুব মানুষকে চিৎকার করা থেকে বিরত রাখতে পারেন, কিন্তু একটা সময় সেইসব অশ্বতুল্য গাধাদের নীরবতা ভঙ্গ হয়ে আসল আওয়াজটা বেরিয়েই আসে। ঠিক যেমন বাতাস কমে গেলে, চার্চের অর্গ্যানে খিঁচুনি হয়, আর বিকট শব্দ বেরোয়। কিন্তু এরাই আবার গাধার নাসারন্ধ্র কেটে দিতে এতটুকু ভাবেন না। এ এমন এক পদ্ধতি, যার নিষ্ঠুরতা ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। এমনকি নাসারন্ধ্রের পাশাপাশি তারা কান কেটে প্রশস্ত করে দিতেও দ্বিধা করেন না। যারা জীবজন্তুর প্রতি দয়া, ভালবাসা প্রকাশ করে থাকেন, তাদেরও জানা উচিত যে এই প্রথা কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসছে, না আছে পদক্ষেপ না আছে প্রতিবাদ।

গাধা- গর্জক, আসলে একটা ভর্ৎসনা। মুসলমানরা বিশ্বাস করে গাধা শয়তানকে দেখতে পায় যখন সে ডাকে। আসলে বলা হয় গাধাই নাকি শয়তানদের প্রধানকে নোয়ার আর্কে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। যখন হজরত নুহ (পূজনীয় নোয়াহ) আর্কে ঢোকার জন্য, পশুদের শ্রেণীবদ্ধভাবে পরিচালনা করছিলেন, তখন গাধা, তার একান্ত অনুগত, হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। ‘দাঁড়ায় না, এগিয়ে চল’, নোয়াহ বলেছিল। কিন্তু গাধা নড়েনি। তখন সেই পরম পিতা মেজাজ হারালেন, এদিকে সময় অল্প, মেঘেরা ভিড় করেছে, তখন তিনি চিৎকার করে বললেন ‘এগিয়ে যাও এবং হয়ত শয়তানও সাথে যাবে’।

তারপর যখন দরজা বন্ধ হল, নোয়াহ শয়তানকে দেখলেন ভিতরে এবং জিজ্ঞাসা করলেন সে কীভাবে এল। জবাবে শয়তান বলল ‘নিশ্চই বলব, আমি তো আপনার আমন্ত্রণেই এলাম।’

এই আখ্যানের নীতিকথা হল, ‘যখন মহাপুরুষরা মেজাজ হারান, আসলে তাঁরা পাপের দরজা খুলে ফেলেন’। কিন্তু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এই পাপের দায়, শুধুমাত্র প্রাচীন চিন্তাভাবনার কারণে  নিতে হয় সরল, নিষ্পাপ গাধাকে। আর সারাজীবন এই পাপের বোঝা বয়ে যায় হতভাগ্য পশুটি, কিন্তু অভিযোগও জানায় না। শুধু এটা লেখাই বড় কষ্টদায়ক এবং ধৈর্য রাখা কঠিন এই ভেবে যে অনবরত নিষ্ঠুরভাবে এই প্রাণীটিকে মারা হয়, আর সে তা মেনেও নেয়।    

এইভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী, গাধাদের ওপর যে অত্যাচার চলে, তাকে যেরকম বড় বড় লাঠি দিয়ে মারা হয়, ইচ্ছে করে সেই লাঠি দিয়ে গাধার মালিকের পিছনে কয়েক ঘা দিতে। প্রচন্ড জোরে যখন ঘা গুলো পড়বে, আর সে চিৎকার করবে, তখনই সে একমাত্র বুঝতে পারবে, গাধার কত লাগে। এই অদ্ভুত ব্যবহারের সত্যিই কোন ব্যাখ্যা নেই। যদিও ধার্মিক মানুষেরা বরাবর প্রচার করে এসেছেন যে, ভগবানের সৃষ্ট জীবের প্রতি দয়া দেখাতে, কিন্তু আবার তারাই লাঠি হাতে নিয়েছেন, আর ভবিষ্যতেও এভাবেই গাধারা অনাহারে, অত্যাচারে বেঁচে থাকবে। একটা লোক-কথায় আছে “কুমোরের বউয়ের মত সাহসী”, এই কথাটাই যেন গাধার ওপর অত্যাচারের মাত্রাটা বুঝিয়ে দেয়।

এক শীতের গভীর রাতে, কুমোর আর তার বউ, হঠাৎ ঘরের বাইরে মাটির পাত্র পড়ে যাবার শব্দ শুনে জেগে ওঠে। বউ বলে, “তাড়াতাড়ি ওঠ, আর গাধাটাকে তাড়াও।”

কিন্তু কুমোর তখন আরামে ঝিমোচ্ছে, দুচোখে ঘুম, সে বলে “গাধাটাকে সহ্য করে নাও”।

বলেই কম্বলটাকে মাথা অবধি জড়িয়ে নেয়। বরের এই স্বার্থপরতা দেখে, বিরক্ত হয়ে কুমোরের বউ, ঘরের মধ্যে কুমোরের যা জিনিসপত্র ছিল, ছুঁড়ে ছুঁড়ে বাইরে জন্তুটার দিকে মারতে থাকে। তারপর শুয়ে পড়ে। সকালে তারা দরজা খুলে দেখে, গাধা নয়, একটা বাঘ মরে পড়ে আছে। এমনই কুমোর আর গাধাকে নিয়ে অনেক গল্পও আছে। একবার এক পর্যটক, দুজন সুবেশ অশ্বারোহীর দেখা পেলেন আর কিছুদূর এগিয়েই দেখলে এক কুমোর একটা গাধার পিঠে চেপে যাচ্ছে। সে কুমোরকে জিজ্ঞেস করল, ওই দুজন অশ্বারোহী কারা হতে পারে। কুমোর বলল “আমরা এই তিনজন ভদ্রলোক দিল্লী যাচ্ছি”। এই কথাই প্রমাণ করে, যে একজন মানুষ তার সাথীকে নিয়ে খুশী থাকলে কতখানি অতিরঞ্জিত করে বলতে পারে।       

ক্রমশ

টাইটেল ছবিঃ সংগৃহীত

ভেতরের ছবিঃ মূল পুস্তক

বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s