বনের ডায়েরি

bonerdiarybeastandman (Medium)কাঠঠোকরা:

আর একটি পাখি যে সশব্দে ঘোষণা করে বসন্তের আগমন। বুকের কাছটায় গাঢ় লাল রং,আর সারাদিন কাঠের গুঁড়ির ওপর ঠক ঠক শব্দ মানেই কাঠঠোকরা। একইভাবে একই গতিতে সে কাঠ ফুটো করে যেতে থাকে,আর প্রত্যেকবার ঠোঁট দিয়ে মারার পর একবার ডান,একবার বাম দিকে মাথা ঘোরায়। স্যার এডুইন আর্নল্ড তাঁর লাইট অফ এশিয়া বইতে ভারতের বসন্তকাল বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “আমের বোল ধরেছে,রোদ্দুরে পাখিরা চকমক করছে আর একা একাই সবুজ রঙের হাপরের মত কঠোর পরিশ্রম করে চলেছে উচ্চকিত কাঠঠোকরা।”কিন্তু তুমি যদি জ্বরে কাবু থাক,তবে কাঠঠোকরার ঠক ঠক শুনতে শুনতে মাথা ধরবেই,সন্দেহ নেই।  

 চড়ুই

একটা পুঁচকে পাখি,এই যেখান-সেখান থেকে গলে যায়,উড়ে বেড়ায়,তা সে-ই হলো চড়াই পাখি। এই একটা পাখির খাবারের অভাব হয়না,মসজিদে দেখবে দুটো ছোটো পাত্রে একটাতে খাবার,একটাতে জল রাখা হয় ওদের জন্য। মন্দির,মসজিদে যত দর্শনার্থীরা আসেন,বেশিরভাগই গাছের তলায় খাবার আর জল রাখেন চড়ুইদের জন্য। ভারতীয় প্রবাদে বলে ভগবানের পাখি,ভগবানের মাঠ,তাই, খাও পাখি,তুমি পেট ভর্তি করে খাও।’

bonerdiarybeast02 (Medium)যদিও আসল ব্যাপারটা অন্য,রোজ মাঠ থেকে শস্য তুলে এনে ব্যবসায়ীরা তাদের নিজেদের ঘরেই রাখে। পাখিকে খাওয়ানোর মত তুচ্ছ জিনিসের পরোয়া করেনা। নিজেরটা আগে। কিন্তু আসলে চড়ুই খুব উৎপেতে পাখি। এরা বোধহয় এমন জায়গা থেকে উড়ে আসে যেখানে কিছুই পাওয়া যায় না। আর বাজ,শ্রাইক,বেজি আর বনবিড়ালের মত এরাও খুব লুটপাট করে,জিনিসপত্র নষ্ট করে। অনেকের মুখেই চড়ুইয়ের এইসব কান্ডকারখানার কথা শোনা যায়। তবে লন্ডন শহরের চড়ুই পাখিরা অপেক্ষাকৃত শান্ত স্বভাবের হয়। কিন্তু চড়ুইয়ের বাসা বাঁধার জায়গা সবসময় অন্যের বাড়ির ভিতর। যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছয় না,ঠান্ডা স্যাঁতসেঁতে ঘুলঘুলির মধ্যে, নাহলে জলের পাইপের মধ্যে। ঘরের মধ্যে ইঁদুরের চিঁ-চিঁ-র মত ডাকাডাকি, ডানা ঝাপটানো,  তারপর বাসা বানানোর সরঞ্জাম যেমন খড়কুটো এদিক ওদিক পড়ে থাকতে দেখা যায়। প্রায়ই সকালে একটা পরিচিত দৃশ্য হল,বাড়ির গৃহিনীরা হয়ত একটা চেয়ার নিয়ে বাড়ির ছাদে মারছে বা কাজের লোকটি জানলা থেকে একটা লাঠি দিয়ে খোঁচা দিচ্ছে-শূ শূ।  তবে ভারতের কোন গ্রামে, চড়ুইয়ের ডাক, গরুর হাম্বা, কাঠবিড়ালির ছটফটানি,  ঘুড়ির ওড়া, চাকার ঘড়ঘড়, গরুর গাড়ির চালকের গান, গ্রামের কুকুরের ডাক সব খুব স্বাভাবিক আর একটা গ্রামের চিত্র।  

বাজপাখির সাহায্যে শিকার 

এটি একটি প্রচলিত খেলা সিন্ধু এবং উত্তর ভারতে। এটা সাহিত্যের একটা বিষয়ও যেখানে বাজপাখিকে আলো বা খুব উজ্জ্বল রঙের চোখের, গোল বা লম্বা ডানা, সৎ অথবা অসৎ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু যাই হোক খেলাটা একটা বেশ অভিজাত খেলা। স্যার রিচার্ড বার্টন হলেন একমাত্র ইংরেজ লেখক যিনি একচেটিয়া এই বিষয়ের ওপর লিখেছেন।  বাজপাখিকে আবার সাজান হয়, মাথার ওপর নরম হরিণের চামড়া, তার ওপর রেশম, সোনালী জরির কাজ করা, দস্তানা, টোপ আর ঘন্টা সবই পাঞ্জাবে তৈরি হয়। ইউরোপে টোপের সাথে পাখির ডানা লাগান থাকে।  ভারতে তা থাকে না। আর শিকারী যখন তার পাখিকে নিয়ে বেরোয়,  একটা বড়ো রিঙ শরীরে ঝুলিয়ে পাখিটাকে নিয়ে যায়। আর একাধিক পাখি নিয়ে গেলে দুটো সমান্তরাল প্রান্তে থাকে।  বড় বড় শহরে একসাথে কতগুলো পাখি নিয়ে যায় দেখলে অবাক লাগে। এমনকি কারুর সাধ হল একটু ঘুরে বেড়াতে, তো হাতের বাজুতে বাজপাখি বসিয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

লাহোরে একবার লর্ড ডাফারিন আর ডিউক  অফ কনটের একটা সাক্ষাতের সময়,অনেক শিকারীরা এসেছিল তাদের বাজপাখি নিয়ে, তাদের সব রাজাদের বড়াই করতে। কিন্তু কর্তব্যরত কন্সটেবলরা তাদের পাখিসমেত ঢুকতে বাধা দিচ্ছিল। কারণ জায়গাটা ছিল একটি সংরক্ষণশালা, সেখানে কাচের বাক্সে বন্দি সব পাখিদের দেখলে যদি বাজপাখিগুলো উত্তেজিত হয়ে পড়ে? অবশ্য পাখিগুলোকে ঠিক করে ঢাকা দেওয়া থাকলে তাদের ঘুমন্ত বাচ্চার মত লাগত।

bonediarybeast03 (Medium)কিন্তু পাঞ্জাবে একবার বাজপাখির এই শিকার দেখতে গিয়ে একটু হতাশ হয়েছিলাম। একদিকে সুন্দর বাতাস, দূরে নীল আকাশের গায়ে সাদা স্বচ্ছ হিমালয় দেখা যাচ্ছে। হাওদা গায়ে দেওয়া হাতির দল আসছে, তাদের চওড়া কপালে নীল-সাদা প্রলেপ দেওয়া। আর একদিকে ঘোড়ার দল, বেঁধে থাকা কুকুরদের চীতকার। এদিকে বাজেরা উত্তেজিত, বারবার শেকল ভেঙে  পালানোর চেষ্টা করছে। শেষমেশ একজন পালাল এবং তাকে ধরতে কেউ ছুটল না বা বন্দুক চালাল না।

অবশ্য বাজপাখিদের ভালই শেখানো হয় এসব। আর তারা পুরস্কার হিসাবে পায় তাদেরই মারা কাক।

পাখিদের সম্পর্কে ছোটো ছোটো তথ্য

স্যান্ডপাইপার তার পিছনের দিকে ভর করে শুয়ে থাকে, কারণ সে বিশ্বাস করে যে সে এই মহাকাশকে অবলম্বন দিচ্ছে তার ওই সরু সরু পাগুলো দিয়ে। একটা সাদা-কালো মাছরাঙ্গা হঠাৎ করে হতবুদ্ধি হয়ে যায় যখন সে একভাবে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ দিশেহারার মত জলে ডুবে যায়। একধরনের দোয়েল পাখি তারা শুধু দিঘী বা পুকুরের চারপাশে জায়গা খোঁজে, যেখানে ভিজে জামাকাপড় মেলা হয়। এদের ধোপানী বলা হয়। ফ্রান্সে এই একই পাখি,একই স্বভাবের,তাকে বলা হয় ল্যাভেন্ডার।

শিয়া মুসলিমরা তাঁদের মহাপুরুষ যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাদের নিয়ে অনেক রকম গল্প বুনে থাকেন। যেমন হুসেন আর হাসান নিহত হয়েছিলেন কারবালায়। কাকেদের রাজা বা কালো ফিঙে পাখি নাকি মৃতপ্রায় ইমাম হুসেনের জন্য জল এনেছিল। আর ঘুঘু পাখি নাকি তার রক্তে ঠোঁট রাঙিয়ে উড়ে গিয়েছিল মদিনায় তার শহীদ হবার খবর দিতে।

এম এফ গ্রাউসের অনুবাদ করা তুলসীদাসের রামায়ণ পড়লে,যাঁরা হিন্দি কাব্যের মধুর স্বাদ নিতে চান,তাঁরা বুঝবেন যে কী সুন্দরভাবে রূপকের ব্যবহারে ভালবাসার সৈন্যদের বোঝানো হয়েছে। সেখানে পাখিরা তাদের চিরাচরিত পরিচয় থেকে বেরিয়ে এসেছে।

“গান গাওয়া কোকিলেরা যেন তার অপরাজেয় হাতির দল, হিরণ তার ষাঁড়, উট আর খচ্চরদের পাল, ময়ুর, চকোর আর টিয়াপাখি তার যুদ্ধের ঘোড়া, আর পায়রা আর রাজহাঁস তার আরবের ঘোড়া। তার পদাতিক সৈন্যদের মধ্যে আছে তিতির আর কোয়েল। আর এসব কিছুর হোতা হলো ভালবাসা। তাই তো শেষে বলা আছে – ‘ভালবাসার সবচেয়ে বড় শক্তি লুকিয়ে আছে নারীর মধ্যে, কেউ যদি তাকে অতিক্রম করতে পারে সে সত্যিকারের বিজয়ী।’

 

বাদুড়

bonerdiarybat (Medium)চামড়ার তৈরি ডানা নিয়ে,পা উপরে মাথা নিচে করে ঝুলে থাকে যে প্রাণীটা, তাকে কী বলে বলত? বাদুড়। ভারতে বেশি সংখ্যায় আর অনেক রকম বাদুড় দেখতে পাওয়া যায়। আর মানুষ এদের দেখলেই একটু ভয়ে ভয়ে তাকায়। এরা ভীষণ অন্ধকারপ্রিয়। কিন্তু বাদুড়কে ভালবাসতে হলে একটু বেশিই প্রকৃতিকে ভালবাসতে হবে, কারণ দূর থেকে ভয় লাগলেও, বাদুড়ের পাতার মত নাক, খুব অদ্ভুত আর সুন্দর।

সাধারণত অন্ধকার, স্যাঁতসেতে, পরিত্যক্ত বাড়িতে বাদুড় থাকে। কিন্তু এসব বাড়িতে কেউ যেতে চায় না। আর এখানেও বাদুড় ওইরকম ঘুম ঘুম ভাব করে ঝুলে থাকে।  কিন্তু একথা কেউ বলে না যে বাদুড় কত উপকারে লাগে। বাদুড় প্রচুর কীটপতঙ্গ খেয়ে নিয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখে।

বম্বে বন্দরের আশেপাশের খাঁড়িগুলোতে এক ধরণের বড় বাদুড় দেখতে পাওয়া যায় যারা শুধু ফল খায়। এরা ভাল ভাল ফল খেয়ে বেশ মোটাসোটা হয় আর মালয় আর্কিপেলাগোতে এই বাদুড় খাওয়া হয়। মাংসে কোন দুর্গন্ধ নেই, বরং অনেকটা খরগোশের মত স্বাদ। আমিও একটা বাদুড় পুষেছিলাম, সে প্রচুর কলা খেত। একদিন সে পালাতে গেছিল, পালিয়েওছিল আবার ফিরে এসেছিল। কারণ-তাকে ঘিরে ধরেছিল কয়েকটা কাক। কাক তো বাদুড় আগে কখনও দেখেনি। কারণ কাক সন্ধে হতে না হতেই ঘুমিয়ে পড়ে। আর তারপর বাদুড় বেরোয়। ঠিক অনেকটা যেমন প্রথমবার ছাতা নিয়ে বেরোনর পর জোনাস হ্যানোয়েকে ঘিরে ধরেছিল লন্ডনের রাস্তার বাচ্চারা।

মিলনের সময় অবশ্য এই বাদুড়রা সারাদিন খুব হইচই করে। এরা খুব বেশিদূরে যায়না। স্থানীয় কোন গাছে গিয়ে ঝুলে থাকে আর সারাদিন ঝগড়াঝাঁটি, মারামারি, চিৎকার করে শান্ত গ্রামের শান্তিভঙ্গ করে।  

ক্রমশ