বনের ডায়েরি

আসাম ও পূর্ব হিমালয় বায়োডাইভার্সিটি হটস্পট

bonanchollogo (Small)ভারতের পূর্ব দিকের আরেক রাজ্য আসাম। ভৌগোলিক এলাকার বিচারে এই রাজ্যও পূর্ব হিমালয় বায়োডাইভার্সিটি হটস্পটের মধ্যে পড়ে। ভারত সরকারের সাম্প্রতিকতম সমীক্ষা থেকে জানা যায় যে আসাম রাজ্যের যাবতীয় ভূ-ভাগের ৩৪.২১% অরণ্যে ঢাকা। এই বিস্তীর্ণ এলাকার বনকে নানান ভাবে ভাগ করা হয়েছে। যেমন ডাল-পাতাওয়ালা গাছের পরিমাণের ভিত্তিতে ঘন বন, মাজারি ঘন বন বা বনহীন বন্যপ্রান্তর হিসেবে ভাগ করা হয়েছে। আবার সংরক্ষণের অবস্থা অনুসারে অভয়ারণ্য, জাতীয় উদ্যান কিংবা সংরক্ষিত বনাঞ্চল।

ঘনত্বের পরিমাপ অনুসারে ঝোপ-ঝাড় আর বেশি ঘন বন সব থেকে কম এলাকায় আছে। তার থেকে বেশি আছে ঘন বন; আর তার থেকে বেশি আছে মাঝারি ঘন বন। সব থেকে বেশি আছে বন্য প্রান্তর বা ঘাসবন। এছাড়া দেখা গেছে যে চা বাগানে চা-গাছের সারির ফাঁকে ফাঁকে কাষ্ঠল গাছের সংখ্যা বেড়েছে। তাছাড়া ঝুম চাষের পরিত্যক্ত জমিতেও বন গড়ে তোলা হয়েছে। আসামের বনের এই দুটোই প্রধান শত্রু – চা বাগানের এলাকা বেড়ে বন ধ্বংস হয়ে যাওয়া, আর ঝুম চাষের জন্য বন নষ্ট হয়ে যাওয়া।

বনবিদ চ্যাম্পিয়ন ও শেঠের বর্ণনা অনুসারে আসামে আঠার রকমের বন আছে যেগুলোকে পাঁচটা গোষ্ঠীতে ফেলা যায়। এই পাঁচটা গোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম হলো নিরক্ষীয় আর্দ্র চিরহরিৎ অরণ্য, নিরক্ষীয় প্রায় চিরহরিৎ অরণ্য, নিরক্ষীয় আর্দ্র পর্ণমোচী বন, নিরক্ষীয় শুষ্ক পর্নমোচী বন আর উপ-নিরক্ষীয়  পাইন বন।

আসামে সংরক্ষিত বনের মধ্যে জাতীয় উদ্যান ৫টি, এদের মধ্যে অন্যতম অবশ্যই কাজিরাঙা, মানস, ওরাং এবং ডিব্রু-সুখাওয়া। অভয়ারণ্য সংখ্যায় ১৮টি। এদের মধ্যে  ব্যাঘ্র প্রকল্প ৩টি হলো কাজিরাঙা, মানস ও নামেরি। কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান আর মানস অভয়ারণ্য এলাকা আবার বিশ্ব হেরিটেজ পর্যায়ভুক্ত।

পুরো এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো কাজিরাঙা। কারণ এখানে বাস একশৃঙ্গ গণ্ডারের। পুরো কাজিরাঙার বাস্তুতন্ত্র এই প্রজাতির সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়াও কাজিরাঙার অপর গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি হলো পিগমি হগ। বিরল প্রজাতির এই শূকরও কাজিরাঙাতেই সীমাবদ্ধ। তাছাড়াও আছে জলের মোষ আর জলার হরিণ। তবে বুনো জলের মোষের মধ্যে সারা পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি বাস করে এখানে। পাখির বাসস্থাণ হিসেবেও এই এলাকা গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া চিতা আর রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রজননক্ষেত্র হিসেবেও এই এলাকা গুরুত্বপূর্ণ। এই এলাকা সংরক্ষিত হওয়ার কারণের মধ্যে অন্যতম হলো এই বনের হাতির পাল। তবে এতো জন্তুর আবাস হলেও পুরো বনের অধিকাংশ এলাকায় দেখা যায় লম্বা এলিফ্যান্ট গ্রাস আর নিরক্ষীয় আর্দ্র দীর্ঘপত্রী উদ্ভিদদের। তার কারণ হতে পারে যে এই এলাকায় প্রচুর জলা আর বিল আছে। তাই আছে প্রচুর জমা জল। তার কারণ এই এলাকায় ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার অংশ আর পৃথিবীর সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের এলাকাগুলির একটা।  

কাজিরাঙার অন্যতম পাখিদের মধ্যে রয়েছে নানান প্রজাতির শকুন। নানা জাতের হাঁড়িচাচা পাখিরাও এই এলাকার পক্ষীবৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। আবার এই সব বিশালদেহী পাখিদের পাশাপাশি বাস করে নীলকন্ঠ আর হুপোর মতো ছোটো পাখিরাও।

bonerdiary55 (Medium)কাজিরাঙার পশুদের সংরক্ষণের প্রয়াসের মধ্যে খানিক অপচেষ্টাও আছে। যেমন শাকাহারী পশুদের পক্ষে মাইমোসা ইনভিসা প্রজাতির একটা লতা বিষাক্ত বলে চিহ্ণিত হওয়ায়, এই লতাকে কাজিরাঙা থেকে নির্মূল করে ফেলা হয়েছে। এই কাজটা সংরক্ষণের সপক্ষে হয় নি। সংরক্ষণের উদ্দেশ্য লুপ্তপ্রায় প্রজাতির সামগ্রিক অবলুপ্তি প্রতিহত করে বাস্তুতন্ত্রকে যথা সম্ভব অপরিবর্তিত অবস্থায় ধরে রাখা যাতে বিভিন্ন প্রজাতির সাথে মানুষ নিশ্চিহ্ণ না হয়ে যায়। সেই বিভিন্ন প্রজাতি মধ্যে কয়েকটাকে টিকিয়ে রাখতে একটাকে নির্মূল করে ফেললে প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে ধরে রাখার বদলে তা বিঘ্নিত করা হয়। এই বিঘ্ন সংরক্ষণের মূলনীতির পরিপন্থী।

ডিব্রু-সুখাওয়া জাতীয় উদ্যানের নানান পশুর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্যাপ্‌ড লাঙ্গুর নামের এক জাতের হনুমান আর বুনো ঘোড়া। মানসের প্রাণীদের মুলত দুইভাগে ভাগ করা যায় – ঘাসবনের প্রাণী আর বনের প্রাণী। ঘাসবনের প্রাণীদের মধ্যে অধুনালুপ্ত পিগমি হগেরা আবার প্রচুর সংখ্যায় এই অঞ্চলে ফিরে এসেছে। এই প্রজাতিকে বনের বাইরে রেখে, এক্স সিটু সংরক্ষণের মাধ্যমে এদের প্রজনন ও সংখ্যাবৃদ্ধিতে সাহায্য করা হয়েছে। তারপর এদের প্রাকৃতিক আবাসে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।  তাছাড়াও রয়েছে বেঙ্গল ফ্লোরিকান আর জলের বুনো মোষ। মানসের বনের পশুদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্লো লরিস নামের বানর আর  মালয়ের দৈত্যাকার কাঠবেড়ালি বা কালো দৈত্যাকার কাঠবেড়ালি। অন্যান্য প্রজাতির সবই প্রায় কাজিরাঙায় পাওয়া যায়।

ওরাং জাতীয় উদ্যান একাধিক নদীর অববাহিকার অংশ। ফলে এই এলাকাও জলসমৃদ্ধ। এখানে মূলত ঘাসবনেরই প্রাচুর্য। সেই ঘাসবন নানান স্তন্যপায়ী প্রজাতির পছন্দের প্রজনন ক্ষেত্র। এই সব প্রজাতির মধ্যে এক শৃঙ্গ গণ্ডার, পিগমি হগ আর রয়েল বেঙ্গল টাইগার অন্যতম। নামেরি টাইগার রিজার্ভের বিশেষত্ব এর ঢোল বা বুনো কুকুরের দলের জন্য।

আসামের বনের বৈশিষ্ট্যই হল যে এইসব বন ছড়িয়ে রয়েছে নানান নদীর অববাহিকা জুড়ে। কোনো কোনো নদী আবার ভাবর এলাকায় অন্তঃসলিলা। আবার প্রবল বর্ষণের কারণেও এখানে মাটিতে জলের যোগান নিয়মিত। তাই ঘন বন না থাকলেও এখানে জলা আর জলার লম্বা ঘাসের বন প্রচুর। এই সব ঘাসের বনে বাঘ, গন্ডার, হরিণ ছাড়াও হাতিও লুকিয়ে থাকতে পারে। এই কারণেই আসামের ঘাসবনের বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের সাপেক্ষে এতো গুরুত্বপূর্ণ।