বনের ডায়েরি

কাল্লুর সঙ্গে দেখা

রিশলু লাহিড়ী

রাত্রে শুয়ে শুয়ে বান্ধবগড়ে আর একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। বছরতিনেক আগের কথা। আমার এক বন্ধু ও তার স্ত্রীর অনুরোধে এখানে এসেছিলাম। তখন আমার নিজস্ব জিপসি ছিল এখানে। যখনই আসতাম আমি আর আমার ড্রাইভার রাজা ঘুরতাম জঙ্গলে। তখন কোর এরিয়াতে প্রবেশ নিষেধ ছিল না। অবশ্য রুট আর সকাল বিকেলে সাফারির সময় নির্দিষ্ট ছিল।

ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ, ক্রিসমাস ছুটি কাটাতে টুরিস্টদের বেশ ভিড় । আমাদের থাকার ও পার্কে ঘোরার ব্যবস্থা করাই ছিল আগের থেকে। তিন দিন অর্থাৎ ছ’টা রাইডে যতটা দেখা যায় তাই দেখব। এই পার্কটিতে বাঘের এলাকাসাপেক্ষে সংখ্যা সবচাইতে বেশি হওয়াতে তাদের দর্শন পাওয়াটা কিছুটা সহজ।

শেষের দিন। বিকেলের রাইডে ঘুরছি। ফেরার মুখে আমরা তখন কোর এরিয়ার মাঝামঝি জায়গায় এসে পড়েছি। কয়েকটা অ্যালার্ম কলও শোনা গেছে, মানে বাঘ কাছে কিনারেই আছে। সবাই ক্যামেরা নিয়ে তৈরি। আমাদের নজর যেদিক থেকে কল এসেছিল সেই দিকে। কিন্তু কলটা ক্রমশই দূরে সরে যাচ্ছে।

এদিকে পার্ক বন্ধ হবার সময় এগিয়ে আসছে ,কাজেই আর অপেক্ষা করার উপায় নেই। ড্রাইভার রাজাকে বললাম চল ফেরা যাক। কোর এরিয়াতে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হবে না, তাছাড়া পার্ক বন্ধ হবার সময়ও হয়ে আসছে।

কয়েক ফারলং চলার পড়ে জিপটা হঠাৎ একটা আওয়াজ করে বন্ধ হয়ে গেল। রাজা বলল, “সাব আওয়াজ সে লগ রহা কুছ টুটা।”

বললাম, “দেখ বাবা একটু নেমে।”

যদিও পার্কের মধ্যে গাড়ি থেকে নামা নিষেধ থাকে কিন্তু কোন উপায় তো নেই। এখানে আটকে যাওয়া নিরাপদ নয়। রাজা গাড়িটা চেক করে বলল, “সাব ক্রস টুট গিয়া। গাড়ি নহি চলেগা।”

bonerdiarykallu02 (Medium)আমার তো মাথায় হাত! এবার কী হবে? সঙ্গে বন্ধু আর তার স্ত্রীও আছেন। একটাই বাঁচোয়া গেটে যত গাড়ি পার্কে ঢুকেছে তারা ফিরল কিনা সমস্ত গাড়ির হিসেব তারা রাখে। কোন গাড়ির ফিরতে অস্বাভাবিক দেরি দেখলে গাইড নিয়ে গাড়ি খুঁজতে বেরোয় এবং তাদেরকে খুঁজে ফেরত নিয়ে আসে। কাজেই আমি খুব একটা চিন্তিত ছিলাম না। তবুও একটা ‘তবুও’ তো ছিলই কারণ আমরা আটকে পড়েছিলাম কোর এরিয়াতে অর্থাৎ বাঘের ঘরে।

জঙ্গলে অন্ধকার ঝপ করে নেমে আসে। তার ওপরে শীতের বেলা। আমরা জিপের মধ্যে বসে আছি, হাল্কা হাল্কা কথাবার্তাও হচ্ছে, অপেক্ষা করছি কতক্ষণে পার্কের গাড়ি এসে উদ্ধার করে আমাদের। এদিকে অন্ধকার ঘন হয়ে আসছে, চারদিকের গাছগুলোকে অচেনা লাগছে। জঙ্গলে রাতের চেহারা যে কী ভয়াবহ হয় যাদের এ অভিজ্ঞতা আছে তারাই জানে। ফিসফিস করে গাইড বলল, “এটা কাল্লুর এরিয়া।”

কাল্লু বান্ধবগড়ের সব চাইতে তেজ পুরুষ বাঘ। একে আমরা বাচ্চা বয়েস থেকে দেখেছি। এখন সে পূর্ণবয়স্ক মেল টাইগার। খুবই ভদ্র, অনেক ছবি তুলেছি এর, কিন্তু তবু বন্য প্রাণীর মতিগতি বলা যায় না। আমার বন্ধুদেরকেও কাল্লুর গল্প অনেক বলেছি।

ভাবছি রাত বেড়ে চলেছে এখনও কেউ আসছে না কেন। আমার চিন্তাটা প্রকাশও করতে পারছি না পাছে আমার বন্ধুরা ঘাবড়ে গিয়ে কিছু করে বসে। রাতের আকাশে ঝকঝক করছে গ্রহ তারা নক্ষত্র, মনে হচ্ছে হাত বাড়ালেই তাদের ছুঁতে পারব। তাদের আলোয় আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে গাছপালা, রাস্তা।

হঠাৎ চোখে পড়ল সামনের রাস্তা দিয়ে বেশ বড় একটা জানোয়ার হাল্কা চালে হেঁটে আসছে। একটু কাছে আসতে বোঝা গেল ওটা একটা বাঘ আর আয়তন দেখে মনে হল কাল্লু হতে পারে।

আমার বন্ধুর স্ত্রী ঠকঠক করে কাঁপছে ভয়ে। ভয়ে আমার শরীরও ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। দিনের বেলায় বাঘ দেখেছি  কিন্তু রাতে ঝাপসা আলোতে বাঘের মুখোমুখি কোনোদিনও হই নি। ফিসফিস করে বললাম, “একেবারে চুপ করে বসে থাকো, আওয়াজ কোর না, কিচ্ছু হবে না।”

বাঘটা কাছে আসতে গাইড শুধু বললেন, “কাল্লু।”

কাল্লু হাঁটতে হাঁটতে এসে আমাদের জিপের সামনে এসে একটু থমকে দাঁড়িয়ে রাস্তা থেকে নেমে পাশের জঙ্গলে ঢুকে গেল, তারপর জিপটা পেরিয়ে পেছনের রাস্তা ধরে চলতে চলতে দূরে মিলিয়ে গেল। সেই সময় সামনে থেকে একটা গাড়ির আলো দেখা গেল, আমাদের উদ্ধার করতে রক্ষীরা এসে গেছে ।