বসন্ত স্পেশাল- আমার বাবা -চুমকি চট্টোপাধ্যায় বসন্ত ২০১৭

শতবর্ষে শ্রদ্ধার্ঘ্য

 bosontospldinesh02-medium

 “একী বাবা? তোমার চটিটা তো যে কোন মুহূর্তে ছিঁড়ে যাবে! কিনে আনি এক জোড়া?”

“আরে  ব্যস্ত হয়ো না মা। এখনো তো অর্ধেকটা ছেঁড়া বাকি। চলবে আরও কদিন। সুবিধেমত আনলেই হবে।”

স্যান্ডাকের চপ্পল। বাড়িতে পরতেন। হঠাৎই চোখে পড়ে,  ডান পায়ের পাটির ওপরের ফ্ল্যাপটা অর্ধেকের বেশি খুলে এসেছে। কিন্তু শুনলে তো কিনে আনব বলাতে কী উত্তর দিলেন।

কে পরতেন? কার কথা বলছি? 

আমি বলছি স্বর্গীয় দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা। বিবাহসূত্রে যিনি ছিলেন আমার শ্বশুরমশাই। কিন্তু এই সম্পর্কে না বিশ্বাসী ছিলেন তিনি, না আমি।  আমি ছিলাম ওঁর মেয়ে আর উনি আমার বাবা। আমার দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষদের একজন।

উনি বলতেন, “দেখ মা, মেয়েরা পারে না এমন কোন কাজ নেই। এই যে অন্য পরিবেশ থেকে বাবা-মাকে ছেড়ে তুমি আমার বাড়ি এসে কেমন সুন্দর মানিয়ে নিয়েছ, আমাকে বাবা বলে ডাকছ… এর থেকেই বোঝা যায় ‘ আ্যাডাপ্টিং কেপেবিলিটি’ মেয়েদের অসামান্য।”

আমি বললাম, “ আমার বাবাকে তো আমি ‘বাপী’ বলি তাই তোমাকে বাবা বলতে কোন বাধা নেই। যদি আমার বাবাকেও ‘বাবা’ বলতাম তাহলে তোমাকে বাবুজি বলে ডাকতাম।”

এই শুনে হো হো হো হো করে উদাত্ত হাসি হাসলেন বাবা। গলির মোড় ছাড়িয়ে সে হাসি ভেসে গেল বহুদূর। বাবার গলার স্বর এত জোরালো ছিল যে তা শোনা যেত বেশ দূর থেকে।

bosontospldinesh01বাবাকে যেমন দেখেছি তার কিছু ঝলক এখানে তোমাদের জানাচ্ছি। অমন মানুষ সম্পর্কে গুছিয়ে বলা আমার কর্ম নয়। তাই অল্প কিছু গল্পকথায় বলি কেমন?

যে ছোট্ট ঘটনার কথা প্রথমেই বলেছি তার থেকে কিছু আন্দাজ করতে পারলে কী?  নিশ্চই পেরেছ। কী সাধারণ মানের জীবনযাত্রা ছিল বাবার, না দেখলে ভাবা যায় না। আমি যখন এই পরিবারে আসি তখন স্বচ্ছল অবস্থা এদের। কিন্তু বিলাসিতার থেকে হাজার হাত দূরে থাকতেন বাবা। বিলাসিতা ছিল কেবল বই এর ক্ষেত্রে। বই কেনার সময় দাম দেখতেন না বলা যায়। ওঁর পছন্দের, প্রয়োজনের বইয়ের জন্যে উনি কিনতেনই। ওটাই একমাত্র বিলাসিতা ছিল বলা যায়।

বাড়িতে ধুতি পরতেন লুঙির মত করে।  তার ওপরে পাঞ্জাবি। গরমকালে হাতাওয়ালা গেঞ্জি পরে থাকতেন। বাইরে বেরোলে ধুতিই পরতেন তবে সঠিক পদ্ধতিতে। আর পাঞ্জাবি। শীতকালে বাড়িতে পাঞ্জাবির ওপর জহরকোট আর বাইরে বেরোলে শাল গায়ে দিতেন।  পায়ে পরতেন কালো পাম্প শু। আমি কোনদিন বাবাকে আর কোন পোশাকে দেখিনি।

ওঁর যা কিছু পরিধেয় ছিল, সেগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত পরার অবস্থায় থাকত,  উনি ব্যবহার করতেন। বলতেন, “জানো মা, একটা সময় ছিল যখন ঘরে শুয়ে আকাশের চাঁদ দেখেছি। চালে এমন ফুটো ছিল। খালি পায়ে স্কুলে গেছি। দারিদ্র কাকে বলে, মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি। তাই অপচয় করতে মন চায় না।”

দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাতেন কাগজ কলম বইপত্র নিয়ে। কী অসম্ভব পরিশ্রম করার ক্ষমতা ছিল! দেখে অবাক হতাম। ওঁর রোজকার জীবন যাপন একটু বলি তোমাদের।

bosontospldinesh01সকাল ন’টার আগে ঘুম থেকে উঠতেন না। খুব খুশি হলে তো শুনে? ভাবছ, এক্কেবারে তোমার মতো। পুরোটা জানো আগে। সকাল সাড়ে দশটা থেকে এগারোটার  মধ্যে জলখাবার খেতেন। এই প্রসঙ্গে বলি, খেতে অসম্ভব ভালোবাসতেন বাবা। এবং সেটা যে কোন বাঙালি খাবার।

জলখাবারে কী খেতেন জানো? যা খেতেন তা তোমাদের একটুও রুচবে না । কিন্তু বাবা খেতেন তৃপ্তি করে। ভেজানো ছোলা ছোট এক বাটি, দু-তিন রকম ফল কয়েক টুকরো করে। আর এক বাটি দুধ সঙ্গে মুড়ি বা খই। আর থাকত বড় কাপে চা। একটু ঠাণ্ডা করে চা খেতেন। দোক্তা দিয়ে পান খেতেন দিনে দুটো। একটা জলখাবারের পরে আর একটা দুপুরের খাবার খেয়ে।

ফল দিয়ে মা পুজো করতেন।  সেই ফলেরই কয়েক টুকরো বাড়ির সকলকে প্রসাদ হিসেবে দিতেন মা। বাবাও পেতেন সেই ভাগ। মজার কথা হচ্ছে, আমরা কপালে ঠেকিয়ে সেই প্রসাদি ফল খেতাম। বাবা কিন্তু সে সবের ধারও ধারতেন না। কারণ উনি ছিলেন পুরোপুরি নাস্তিক। বাবার কথায়, “যা আমি চোখে দেখিনি, তা আমি বিশ্বাস করি না। ভূত এবং ভগবান– এদের কারুর সঙ্গেই আমার মোলাকাত হয়নি তাই আমি এদের অস্তিত্বে বিশ্বাসী নই।”

 এমন দৃঢ়তার সঙ্গে বলতেন কথাগুলো যে আমি নিজে আস্তিক হওয়া সত্বেও ধন্দে পড়ে যেতাম। বাড়িতে কালিপুজো হয়। অবাক হয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তুমি ঈশ্বর মানো না তবে কালিপুজোয় মানা কর না কেন?”

বললেন, “তোমার মা কালীর ভোগ যে যত্ন নিয়ে রাঁধেন আর তার যে অপূর্ব স্বাদ হয়, আমি খাব বললে তো ওই রান্না হবে না।  খাবার লোভেই বারণ করি না,  বুঝলে? হাহাহাহাহা।”

খেতে অসম্ভব ভালোবাসতেন সে কথা আগেই বলেছি। তবে কোন বাছ-বিচার ছিল না। দুপুরে ভাতের সঙ্গে সাধারণ বাঙালি বাড়িতে যা রান্না হয়, ডাল, তরকারি, মাছ…সেসব তো তৃপ্তি করে খেতেনই তার সঙ্গে খেতেন বাবার স্পেশাল বাগান চচ্চড়ি। যতরকম মরসুমি সবজি সব একসঙ্গে সেদ্ধ করে নুন গোলমরিচ দিয়ে আহা বাহা করে খেতেন। আমরাও ওই অদ্ভুত ঘ্যাঁট থেকে দূরে থাকতাম। বাগান চচ্চড়ি নামটা আমার শাশুড়ি মায়ের দেওয়া ছিল।

দৃঢ়তা.. হ্যাঁ, দৃঢ়তা ছিল বাবার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কোন ধারণার বশবর্তী হয়ে কিছু মেনে নেওয়া, বা কেউ কিছু বললেই সেটা বিশ্বাস করে নেওয়া ওঁর ধাতে ছিল না। যেটা উনি যুক্তিগ্রাহ্য বলে মনে করতেন, সেটাই উনি বিশ্বাস করতেন, মানতেন। যুক্তি দিয়ে ওঁকে বোঝাতে পারলে উনি অবশ্যই তা মানতেন। আমার অনেক কথা উনি মেনে নিয়েছিলেন এভাবেই।

bosontospldinesh01একটা ঘটনা বলি। আমাদের চারতলা বাড়ির রান্না এবং খাবার ঘর ছিল চারতলায়। শোবার সব ঘরই তিনতলায়। বাবা খেতেন সবার শেষে, একা একা। কারণ জলখাবার খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়তেন আদ্যপ্রান্ত খুঁটিয়ে। দুটি বাংলা এবং একটি ইংরেজি কাগজ পড়তে তাই যথেষ্ট সময় লাগত। এরপর স্নান সেরে যখন খেতে বসতেন তখন বাড়ির বাকি সকলের লাঞ্চ কমপ্লিট। বাবাই এই নিদান দিয়েছিলেন, ওঁর জন্যে অপেক্ষা না করার।

একদিন বাবা ওপরে খাচ্ছেন। হঠাৎ আমার কানে আসে খুব জোর বিষম খাওয়ার শব্দ। আমি ছূট্টে ওপরে গিয়ে দেখি বাবা জোর বিষম খেয়েছেন। তাড়াতাড়ি হাতে নুন ঢেলে বাবার সামনে ধরি। বাবা নুন নিয়ে জিভের পেছন দিকে ঘষতে বিষমের দমক কমে। এটা একটা টোটকা। তোমরাও জেনে রাখ। চোখমুখ লাল হয়ে উঠেছিল বাবার।

“বাবা, তুমি একা একা খাও। এভাবে বিষম খেয়েছ। যদি আমি না শুনতাম বা বাড়িতে না থাকতাম তাহলে? মা ঘুমোচ্ছেন। এটা তো খুবই ভয়ের ব্যাপার!”

“হ্যাঁ মা, সেটা ঠিকই। তুমি না এলে মুশকিল ছিল।”

 “বাবা, তিনতলার পুবদিকে তো দু’খানা ঘর পড়ে আছে, ব্যবহার হয় না। ওটার একটা রান্নাঘর আর একটা খাবার ঘর করে নিলে হয় না? তাহলে অন্তত আমাদের কাছাকাছি থাকবে।”

খানিক্ষণ চুপ করে থেকে বাবা বললেন, “খুব ভালো কথা বলেছ মা। তাতে সকলেরই সুবিধে হবে। তোমার মায়েরও তো বয়েস বাড়ছে। হাঁটুতে ব্যথাও আছে। ওনাকেও আর ওপর-নীচ করতে হবে না। বাঃ, খুব ভালো প্রস্তাব। আমি কালই ত্রিদিবের সঙ্গে এবিষয় কথা বলব।”

একমাসের মধ্যে রান্না- খাওয়ার ব্যবস্থা তিন তলায় হয়েছিল। তাহলে বুঝলে তো, কথায় যদি যুক্তি থাকত তবে উনি ঠিক তার গুরুত্ব দিতেন।

bosontospldinesh01সকালে কাগজ পড়া শেষ করে নিজের কাজ নিয়ে বসতেন। বাবার কাজের টেবিল টপ টা শ্বেত পাথরের। পায়াগুলো টিক উডের। লম্বাটে টেবিল জুড়ে থাকত বাবার ফাইল, এ ফোর সাইজের কাগজ দিয়ে তৈরি প্যাড। অবশ্যই সাদা কাগজের। নানান বই আর থাকত এক গোছা ফাউন্টেন পেন। বাবা কোনদিন বল বা জেল পেনে লেখেননি। পেনগুলো সযত্নে গোছান থাকত একটা পেন্সিল বক্সে। আর ছিল চার আলমারি ভর্তি বই। ছিল কেন, এখনো আছে। তবে এখন গুগল জ্যেঠু এসে গিয়ে তাদের ব্যবহার অবশ্যই কমে গেছে।

তোমরা হয়ত ভাবছ মাত্র চার আলমারি বই? এ আর এমন বলার মতো কী? আসলে এই চার আলমারি ভর্তি হল সাধারণ জ্ঞান যাকে আমরা জেনারেল নলেজ বলে থাকি, সেই সমস্ত বই। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা থেকে শুরু করে নিউ বুক অফ নলেজ, কী নেই! এই সব বই ছিল বাবার সন্তানের মত।

বাবা ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ। পুরোপুরি সাহিত্যের ছাত্র। কিন্তু আমি দেখেছি, কী অসামান্য জ্ঞান সব বিষয়ে। কী করে জান? অদম্য জানার ইচ্ছে, তার জন্যে প্রচুর পড়া এবং আত্মস্থ করা। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই।

কিশোর ভারতীতে তখন  বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশ্নত্তোরের বিভাগ ছিল ‘ সওয়াল জবাব ‘। বাবা সেই সব প্রশ্নের উত্তর দিতেন বাণী মৌলিক নামে। অনেক বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশ্নও আসত। একটা প্রশ্ন ছিল, সিমেন্ট কেন জল পড়লে জমে যায়।

এই একটা প্রশ্নের উত্তরের জন্যে বাবা কী প্রচণ্ড পড়াশোনা করলেন। সমস্ত বই ঘেঁটে বের করলেন এর উত্তর। এবং সেই উত্তরকে সহজ ভাষায় লিখলেন কিশোর ভারতীর বন্ধুদের জন্যে। এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি।

রাত আড়াইটে তিনটে অবধি জেগে হয় পড়তেন না হয় লিখতেন বাবা। মগ্ন থাকতেন নিজের এই জগতে। আর ভালোবাসতেন কথা বলতে। কেমন কথা? যে কথা অন্যের উপকার করে, ক্ষতি নয়।

কারো কোন অসুবিধে হলে বা কেউ বিপদে পড়ে বাবাকে এসে যদি বলত, বাবা মন দিয়ে শুনতেন। তারপর সুন্দর করে বলে দিতেন সে কী করবে তার অসুবিধে বা বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে। কোন কোন সময় নিজেও ছুটে যেতেন প্রয়োজন হলে। মনেপ্রাণে ছিলেন কমিউনিস্ট। বিশ্বাস করতেন বড়লোক গরিবলোকের বিভেদ একদিন থাকবে না।

চোখের সমস্যা খুব কষ্ট দিত বাবাকে। দু-দুবার রেটিনা ডিটাচমেন্ট হয়েছিল। এক মাসের ওপর চোখে ব্যান্ডেজ থাকত। চোখের যন্ত্রণার থেকেও বেশি কষ্ট পেতেন পড়তে লিখতে পারতেন না বলে।

 আমি তখন রোজ খবরের কাগজ পড়ে শোনাতাম বাবাকে। এই প্রসঙ্গে বলি, দুটো বাংলা ও একটা ইংরেজি খবরের কাগজ আসত। সেই তিনটেরই প্রথম পাতার বাঁ দিকের কোণ থেকে শেষ পাতার ডান দিকের কোণ পর্যন্ত পড়তেন বাবা। কিন্তু আমি যখন পড়তাম তখন হেডলাইন এবং গুরুত্বপূর্ণ খবর পড়া হলেই বলতেন, “এবার তোমার ছুটি। বুড়োটা অনেক্ষণ আটকে রেখেছে তোমায়। হা হা হা হা….।” সে হাসি যেন আজও আমার কানে ভাসে।

এত স্নেহ ভালোবাসা পেয়েছি ওঁর কাছ থেকে যা আজও আমার জীবনের পরম সম্পদ হয়ে আছে। এই যে তোমাদের জানাচ্ছি কিছু কিছু কথা, অনাবিল আনন্দ পাচ্ছি। সত্যি কথা বলতে, সাংঘাতিক কিছু গল্পের বই আমি পড়তাম না। আর লেখালিখির তো কল্পনাও করিনি কোনদিন। আজ যদি এক লাইনও লিখে থাকি, সে অবদান বাবার।

তবে আমার সঙ্গে ওঁর সম্পর্ক দেখে মোটেই ভেবে নিও না যে দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এমনি নরমসরম মানুষ ছিলেন। এতটাই গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং কঠিন একটা আবরণ ছিল ওঁর চেহারায় যে বেশিরভাগ মানুষই ওঁর সামনা-সামনি হতে বা কথা বলতে রীতিমত ঘাবড়ে যেত বা ভয় পেত। আত্মীয়স্বজনদের মুখে ওঁর আরও একটা নাম ঘুরত, ” রয়াল বেঙ্গল টাইগার”।

bosontospldinesh01সেটা ১৯৯৩/৯৪ সাল হবে। নানান কারণে কিশোর ভারতী বেরোতে প্রায় মাসের শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাবার শরীর ভালো যাচ্ছে না। উনি দেখাশোনা করতে পারছেন না ওঁর মানসকন্যাকে। ক্ষতবিক্ষত হচ্ছেন ভেতরে ভেতরে। ত্রিদিব পত্র ভারতীকে প্রতিষ্ঠা দিতে লড়াই করছে। এমন এক কঠিন সময়ে একদিন বাবা আমাকে ডাকলেন, “দেখ মা, যে পরিশ্রম এবং যত্ন নিয়ে আমি কিশোর ভারতী কে প্রকাশ করে এসেছি, কিছুকাল ধরে তার বিচ্যুতি ঘটেছে নানান সমস্যায় পড়ে। এ যে আমার কী যন্ত্রণা সে বলে বোঝাতে পারব না। ত্রিদিবও পেরে উঠছে না সময় দিতে। এ অবস্থায় একমাত্র তুমিই পার সাহায্য করতে। আমার ইচ্ছে, তুমি কিশোর ভারতীর দায়িত্ব নাও। তাকে আবার তার সম্মানের জায়গা ফিরিয়ে দাও। সময়মত পত্রিকা প্রকাশ হওয়াটা খুব জরুরি।”

আমি তখন অবাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। আমি? আমি তো কিছুই জানি না কীভাবে বই তৈরি হয়! এমন একটা প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার দায়িত্ব নেব কী করে! পারব?”

“তোমাকে সব রকম পরামর্শ, সাহায্য আমি এবং ত্রিদিব করব। তুমি লেগে পড় মা।”

সরাসরি কিশোর ভারতীর অন্দরে ঢুকে পড়লাম আমি। হাতে করে কাজ শিখতে শুরু করলাম। পরের কিশোর ভারতী প্রকাশিত হল মাসের গোড়ায়। মনে পড়ছে, বাবা পত্রিকা হাতে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। মুখে স্মিত হাসি। দুটো চোখ জ্বল জ্বল করছে। মাথায় হাত দিলেন। আমার আত্মবিশ্বাস বাড়ল।

ন’বছর বাবাকে পেয়েছি আমি। পেয়েছি ওঁর অফুরাণ স্নেহ, ভালোবাসা। ছেলেকে শাসন করলেও আমাকে প্রশ্রয়ই দিতেন। আরও কত কথা মনে পড়ছে। সেসব শোনাব পরবর্তী সময়। শেষ করব অমন রাশভারী, ব্যক্তিত্ব সম্বলিত একজন মানুষের ভেতরের কেমন ছেলেমানুষি লুকিয়ে থাকত, সেই ছোট্ট ঘটনা দিয়ে।

দীঘা বেড়াতে গেছি আমরা সবাই। ভোরবেলা সমুদ্র সৈকতের দিকে হাঁটছি। বাবাও যাচ্ছেন। হঠাৎই  বাবা দৌড়তে শুরু করলেন। ধুতি পরে দৌড়োন বেশ কঠিন কাজ। আমরা সকলে “পড়ে যাবে পড়ে যাবে” করে চেঁচাচ্ছি। কিছুদূর গিয়ে একটা ছাগলছানা কোলে তুলে ফিরলেন বাবা। দুরন্ত ঈগল, নীল ঘূর্ণির মত কালজয়ী লেখকের এই ছেলেমানুষীতে হেসে উঠলাম সবাই।

বাবা ছিলেন হিমালয়ের মতো। তাকে কী এত অল্পে বর্ণনা করা যায়! একটু ছুঁয়ে গেলাম। 

ভালো থাকো তোমরা সবাই।

এরপর–দ্বিতীয় পর্ব এই লিংকে

Advertisements

9 Responses to বসন্ত স্পেশাল- আমার বাবা -চুমকি চট্টোপাধ্যায় বসন্ত ২০১৭

  1. মন ছুঁয়ে যাওয়া লেখা|

    Liked by 1 person

  2. Riju Ganguly says:

    পত্র ভারতী কার্যালয়ে বসে এই ‘গল্প হলেও সত্যি’ ঘটনাগুলো শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল৷ শুধু এক সম্পাদক নন, এক কিংবদন্তীর এই আখ্যানমালা পাঠকের কাছে তুলে ধরার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই৷

    Liked by 1 person

  3. শুভময় মিশ্র says:

    পড়ে ভাল লাগল।

    Liked by 1 person

  4. saptastar says:

    এক মহাজীবন কে এভাবে সহজ সরল ভাষায় বর্ণনা করার জন্য , আমাদের সমৃদ্ধ করার জন্য অফুরান শুভেচ্ছা তোমায়।

    Liked by 1 person

  5. সীমা ব্যানার্জ্জী-রায় says:

    অসাধারণ …আরো জানবার জন্য উন্মুখ হয়ে রইলাম।

    Like

  6. Abhijnan Roychowdhury says:

    অসাধারণ এক মানুষের উপরে এক অসাধারণ লেখা। বৌদি, তোমার এই লেখার স্টাইল সত্যি মুগ্ধ করল।

    Like

  7. Onkarnath says:

    Aro porte ichcha korche…jodio esober onekkichui amar jana…

    Like

  8. Sudipa Saha says:

    কি সুন্দর করে তুলে ধরেছ তুমি!! কাপড়ের ওপর ফুলকাটা নকশার মতো… অপূর্ব.. মন ভরে গেল…

    Like

  9. দেবব্রত দাশ (Debabrata Das) says:

    অসাধারণ লেখা চুমকি ম্যাডামের! এমন ভাবে মন ছুঁয়ে গেল যে, আমি চলে গেলাম বিগত শতাব্দীর একেবারে শেষভাগে ১৯৭৯-তে।প্রবাদপ্রতিম মানুষটি আমাকে “কিশোর ভারতী “-তে প্রথম ব্রেক দিয়েছিলেন ১৯৭৯-তেই।ডিসেম্বর-সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল আমার গল্প “কামেং নীরব কেন”।অমন একজন মানুষের সংস্পর্শে এসেছিলাম বলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি।চুমকি ম্যাডামকে আমার বিনীত অনুরোধ,তিনি যেন দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের জীবনী /জীবনের স্মরণীয় ঘটনা নিয়ে বই প্রকাশ করেন।আমি নিশ্চিত,সেই বই সমগ্র পাঠকমমহলের কাহে হবে অসামান্য প্রাপ্তি।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s