বৈজ্ঞানিকের দপ্তর বিচিত্র জীবজগত–সিংহ বিক্রম জাতবেদা মিশ্র শীত ২০১৮

বিচিত্র জীবজগত  সব পর্ব একত্রে

সিংহ বিক্রম

জাতবেদা মিশ্র

গ্রীষ্মের ঠা ঠা দুপুর। ধূ ধূ মরুভূমির ভিতর দিয়ে উটের সার চলেছে। এক-একটা সারিতে তিনটে করে উট এবং তারা পাশাপাশি প্রত্যেকের সঙ্গে বাঁধা।  মাঝেরগুলি বাদে বাকি উটদুটির পিঠে প্রচুর খালি বস্তা রাখা আছে স্তূপ করে। এমনই একটা সার চলেছে মরুভূমির একটা বিশেষ জায়গার উদ্দেশ্যে। তিনটে উটের মধ্যে মাঝখানের উটটি একটি মাদি উট যে সদ্য বাচ্চার জন্ম দিয়েছে আর পাশের উট দুটিই পুরুষ।  মাঝখানের মাদি উটগুলির পিঠে একজন করে মানুষ বসে আছে। মানুষগুলির সর্বাঙ্গ ঢাকা, রোদ থেকে বাঁচার জন্য। 

সেই কাফিলা মরুভূমির একটা জায়গায় থামল, যার আশেপাশে অনেক গর্ত এবং সেই গর্তের চারপাশে বালি রাখা ঢিপি করে। যেন সদ্য কেউ এদের জন্যেই খুঁড়ে রেখেছে।  আর তারপর শুরু হল সেই বালি বস্তায় ভরা। উপরের বালি শেষ হতেই সেই গর্তের ভিতর থেকেও ঝটপট করে তোলা হল আরো কিছু বালি। 

এত দ্রুত ভয় এবং নিঃশব্দ সতর্কতার সঙ্গে মানুষগুলো এই কাজটি করতে লাগল যেন এখুনি এখানে দত্যি-দানো বা ভয়ংকর কিছু হানা দেবে। কিছু বস্তা ভর্তি করেই সবাই হুড়মুড় করে সেই মাদি উটদের পিঠে উঠতে না উঠতেই সেই গর্তগুলোর মধ্যে একটা আলোড়ন দেখা গেল। এক অদ্ভুত ধরনের প্রাণীনী গর্তগুলো থেকে বেরিয়েই এই মানুষগুলোর দিকে তেড়ে আসতে লাগল। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তারা যথেষ্ট হিংস্র এবং এদের হাতের কাছে পেলে মোটেই ছাড়বে না।

এইবার বোঝা গেল মাঝখানে কেন সদ্য মা হওয়া উটকেই রাখা হয়েছে এবং তার পিঠেই কেন মানুষটি বসেছে।। সে তার বাচ্চার কাছে দ্রুত ফেরার জন্য প্রাণপণ দৌড়াতে লাগলো এবং তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাকি দুজন পুরুষ উটও পিঠে বস্তা নিয়ে দৌড়াল কারণ তারা পরস্পরের সঙ্গে এইজন্যেই বাঁধা।  তা সত্ত্বেও একটি দুটি পুরুষ উট পিছিয়ে পড়তেই তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই অদ্ভুত জন্তুগুলো এবং তাদের ক্ষতবিক্ষত করতে লাগল। তখন বাঁধন কেটে তাদেরকে ফেলে রেখেই বাকিরা সেখান থেকে প্রাণ হাতে করে পালাতে লাগল।

উপরে যে দৃশ্যের বর্ণনা করলাম এটি প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের পারস্য দেশের ঘটনা। ওই লোকগুলিকে মরুভূমিতে পাঠাত তখনকার রাজারাজড়া বা বড়লোক ব্যবসায়ীরা। কারণ ওই বালির মধ্যে থাকত প্রচুর সোনার গুঁড়ো। ওই বালি ছেঁকে সেখান থেকে সোনা সংগ্রহ করা হত। আর ওই অদ্ভুতদর্শন প্রাণীগুলি সিংহ-পিঁপড়ে অথবা পিঁপড়ে-সিংহ নামে পরিচিত। 

এমন অদ্ভুত প্রাণী আবার হয় নাকি?

পুরুষ সিংহ কথাটার সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। এটা বললেই বেশ তেজদ্দীপ্ত গুরুগম্ভীর কোনো পুরুষের কথা মনে হয় আমাদের। কিন্তু যদি বলি “সিংহপিঁপড়ে” অথবা Lion-ant? তাহলে বেদম হাসিই পাবে আমাদের। 
অদ্ভুৎ শুনতে হলেও, মহাভারতের সভাপর্বেও যুধিষ্ঠিরের সম্পত্তি বর্ণনা করতে গিয়ে দুর্যোধন এই পিঁপড়েদের উল্লেখ করেছেন। 
সেই যেদিন থেকে ইতিহাস লেখা সৃষ্টি হয়েছে মানে হেরোডোটাসের সময় (খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী) থেকে এই সিংহপিঁপড়েরা সারা পৃথিবী জুড়ে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিল। গল্পে, ছবিতে, সব জায়গাতেই প্রায় এদের উল্লেখ করা হয়েছে। হেরোডোটাসের লেখা অনুযায়ী পারস্য দেশের পূর্বপ্রান্তে যেখানে মরুভূমি আছে সেখানে এদের দেখা যেতো। এরা মাটি বা বালির ভিতর থাকা সোনার কণা খুঁড়ে বের করত। হেরোডোটাসের বর্ণনা অনুযায়ী,  প্রাণীগুলি কুকুরের থেকে ছোট কিন্তু শিয়ালের থেকে একটু বড়, সারা গায়ে লোম, মুখের ঠিক সামনে বড় বড় দাঁত এবং হাতে পায়ে লোমের আড়ালে ঢাকা লম্বা নখ।

তিনি এদের নাম দেন “সোনা খননকারী সিংহ-পিঁপড়ে।” আড়াই হাজার বছর আগে পারস্য দেশের সমৃদ্ধ হওয়ার পিছনেও এদের অবদান আছে বলে মনে করেন অনেকে।  এথেনা, রোম এই সমস্ত জায়গাতেও এদের নিয়ে গল্প প্রচলিত ছিল এবং স্বয়ং আলেকজান্ডারও এই দেশে আসার আগে এদের গল্প শুনেছিলেন।  পরবর্তীকালে কল্পনার রঙ চড়তে চড়তে এটি একটি শ্রুতিতে পরিণত হয়েছে। লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে কিছু আঁকা ছবিও পাওয়া যায় এদের নিয়ে যেখানে এদের পঙ্গপালের মতো পা এবং গায়ের রঙ লাল ও কালো মেশানো দেখানো হয়েছে। এইভাবেই একটি রূপকথার জন্ম হয়েছিল।

কিন্তু প্রশ্ন হল নামের সঙ্গে পিঁপড়ে কেন?

পরবর্তী কালে ঐতিহাসিকরা এর রহস্য ভেদ করেছেন। তাদের ধারনা এই রহস্য এদের নামের ভিতরেই নিহিত আছে। এদের বৈজ্ঞানিক নাম MURMEKOLEONTES.. 
গ্রীক ভাষায় MYRMEX শব্দের অর্থ পিঁপড়ে এবং LEON শব্দের অর্থ সিংহ এবং ঘটনাচক্রে এরা যে মাটি খুঁড়ত নিজেদের গর্ত বানানোর জন্য সেখান থেকে সোনা পাওয়া যেত। তাই দুই শব্দকে মিলিয়ে এবং ঘটনাগুলি তার সঙ্গে জুড়ে এক ভুল ধারনার সৃষ্টি হয় এই প্রাণী সম্পর্কে।

পরবর্তী কালে ফরাসী জাতিবিদ্যাবিৎ মিশেল পেইসেল এই রহস্য সম্পূর্ণরূপে উন্মোচন করেন। 1996 সালে NEW YORK TIMES কাগজে এই বিষয়ে সবিস্তারে একটি আর্টিকেলও ছাপা হয়। 
পেইসেল এই সিংহ-পিঁপড়েদের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন যে- এরা আসলে হিমালয়ান মারমট। পারসি ভাষায় MARMOT শব্দের অর্থ হল “MOUNTAIN ANT”.. হিমালয়ের এই মারমটরা আকারে বেশ বড় হয় ঠিক হেরোডোটাস যেমন বলেছেন, কুকুরের থেকে ছোট কিন্তু শিয়ালের থেকে বড়, গায়ে লোম ভর্তি এবং শিয়ালের মতো বড়ো লেজ, বড় বড় ধারালো দাঁত এবং নখযুক্ত থাবা। আর এরা দল বেঁধে থাকতেই পছন্দ করে।
এরা সাধারণতঃ নিরীহ ধরনের হলেও যদি এদের গর্তের আশেপাশে কোন রকম ঝামেলা বা বিরক্ত করা হয় তখন এরা সাংঘাতিক হিংস্র হয়ে উঠতে পারে ( “They can be ferocious if one tampers with their burrows, which is just what the gold-seekers did”- Michel Peissel) ঠিক যেমন সোনা শিকারীরা করত।

পেইসেল আরো গভীরে গেছেন এই ঘটনার। হেরোডোটাসের কথা অনুযায়ী দেওসাই মালভূমি অঞ্চলে সোনার ধুলো পাওয়া যেতো। মিশেল পেইসেল বলেছেন অধুনা পাকিস্তানের অন্তর্গত গিলগিট-বালিস্তান আর দেওসাই মালভূমি অঞ্চল হল সেই সিংহ পিঁপড়েদের আবাসস্থল। সেখানকার মিনেরো উপজাতিদের সঙ্গে পেইসেল বেশ কিছুদিন কাটিয়ে ছিলেন। তখন তিনি তাদের থেকে জেনেছেন যে তারা বংশানুক্রমে মারমটদের খোঁড়া মাটি ও গর্ত থেকে সোনা সংগ্রহ করত। পরবর্তীকালে পেইসেল তার লেখা বই ‘THE ANT’ GOLD  বইতে বলেছেন যে – হেরোডোটাস কোনো খোঁজ-খবর করেননি। পারসি শব্দ MARMOT  মানে MOUNTAIN ANT,পর্যটকদের মুখে শুনেই তিনি  এই গল্প রচনা করেন। হেরোডোটাস কোনদিন এই সিংহ পিঁপড়েদের দেখেছেন বলেও দাবী করেননি। এবং এইভাবেই ধীরে ধীরে একটি রূপকথার জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। 

পরবর্তী ঐতিহাসিকরা হেরোডোটাসকে যথেষ্ট হাসি ঠাট্টার বিষয় বানিয়েছেন এই সিংহ-পিঁপড়ে প্রসঙ্গে। তবে দুঃখের বিষয় হল এই মারমটরা অধুনা ভারত ও পাকিস্তানের বর্ডার অঞ্চলের বসবাসকারী হওয়ার দরুন দুই দেশের সৈন্যরাই এদের দেখলে গুলি করে মেরে ফেলে  শিকারের আনন্দ নেয়। আজকাল মানুষের দেশ নিয়েই প্রশ্ন চিহ্ন উঠছে আর বেচারা মারমটরাতো তুশ্চু প্রাণী।  তাই এরা প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।

সবই কি গল্প কথা?

রূপকথার সিংহ-পিঁপড়ের রহস্যভেদ হওয়ার পর একটাই প্রশ্ন মনে আসে। তাহলে কি শুধুই রূপকথা? সিংহ-পিঁপড়ে বলে কিছুই নেই?

রূপকথার মতো না হলেও সিংহ-পিঁপড়ে আছে বাস্তবেপ্রারম্ভিক ইওরোপীয় পন্ডিতেরা এই সিংহ-পিঁপড়েকে এক ধরনের বড় প্রজাতির পিঁপড়ে বলে উল্লেখ করেছেন। এডেলহেল (সপ্তম শতক) এবং হার্বনাস মুরস্(নবম শতক) উভয়েই বলেছেন যে-“এই সিংহ-পিঁপড়ে( LION-ANT /ANT-LION) একটি ছোট্ট প্রাণী যারা

পিঁপড়ের শত্রু। মাটিতে বা বালিতে গর্ত করে থাকে এবং শিকারের সময় সিংহের মতো আচরণ করে।”

আসলে বস্তুটি কী?

দশম শতাব্দীতে বাইজেন্টাইন পন্ডিতদের একটি আঁকা ছবি পাওয়া যায় এবং সেই ছবিটিকে  মারম্যাকিয়ন নামে চিহ্নিত করা ছিল। এই নাম থেকে বোঝা যায় যে সাধারণ পিঁপড়েদের সঙ্গে এদের কোথাও একটা মিল আছে এবং আসলে এগুলি সিংহ-পিঁপড়ের লার্ভার ছবি ছিল। ত্রয়োদশ শতকে বিজ্ঞানী টমাস ক্যানটিম্পের বলেন: এই পোকাটি পিঁপড়ে বংশজাত কিন্তু আকারে বড়ো। ছোট অবস্থায় এরা শান্ত থাকে কিন্তু যতো বড়ো হতে থাকে এরা ততো হিংস্র হতে থাকে। পিঁপড়েদের যাতায়াতের পথে এরা ঠিক সিংহের মতোই ওৎ পেতে লুকিয়ে বসে থাকে। যখন পিঁপড়েরা কিছু সংগ্রহ করে আনে তখন সেগুলোকে তাদের থেকে কেড়ে নেয়। পিঁপড়েদের অসময়ের জন্য জমানো খাবার ওদের গর্ত থেকে লুঠ করে এবং তারপর পিঁপড়েগুলোকে অব্দি খেয়ে নেয় এরা।

তাই বলে শুধু পিঁপড়ে খেয়ে থাকে নাকি?

এরা বালির মধ্যে অদ্ভুত তেকোনা এক ধরনের গর্ত তৈরি করে । তার মধ্যে ঢুকে গিয়ে এমন ভাবে মাটি খুঁড়তে থাকে যে ওদেরকে দেখা যায় না কিন্তু একটা অদ্ভুত ঘুর্ণির মতো সৃষ্টি হয়। আর বালির মধ্যে এমন ভাবে গর্তগুলো থাকে চলতে চলতে হঠাৎ করে বোঝাও যায় না। কোন হতভাগ্য পোকা ওর মধ্যে যদি একবার পা রাখে ব্যাস্। ওই ঘুর্ণি থেকে আর উঠতে পারবে না। আস্তে আস্তে ভিতরে ঢুকে যাবে আর তার শরীরের সমস্ত রস টেনে খেয়ে তাকে ছিবড়ে করে ঠিক যে পদ্ধতিতে ওদের ভিতরে টেনেছিল ঠিক সেই পদ্ধতিতে ওদের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেয় ওই সিংহ-পিঁপড়েরা। 

এই লার্ভাগুলো এতো যে খায় হাগু করে না? এই লার্ভাদের শরীরে শক্ত বর্জ্য বের করার মতো কোনো জায়গা নেই। এরা এক ধরনের তরল বর্জ্য পদার্থ বের করে শরীর থেকে। যদি কেউ এদের পোষে তবে সে বালির মধ্যে সাদা চিনির মতো এক ধরনের দানা দেখতে পাবে । ওই তরল পদার্থ আর বালি মিশে অমন দেখতে হয় ওগুলি। ওগুলোই ওদের হাগু। 

এরা হলিউডেও? 

ক্রিস্টোফার নোলানের DOODLEBUG  সিনেমাটির কথা মনে আছে? যেখানে নায়কের মেঝেময় এমন পোকা ঘুরছে মনে হতো আর দাগ থাকত।

এই অ্যান্টলায়ন লার্ভা যখন বালি বা শুকনো মাটিতে গর্ত খোঁড়ে তখন এদের পিছনের ভারি অংশ  বালিতে ঘষা লেগে লেগে লাইন লাইন ছবির মতো তৈরি হয়। তাই এদেরকে DOODLEBUG নামেও ডাকা হয়।

দেখতে কেমন আর  বাকি জীবনটাই বা কেমন?

এর লার্ভাগুলির শরীরের রং বাদামী, বড়সড় মাথা ছোট ছোট পা, সারা শরীর ছোট ছোট লোমে ঢাকা এবং চওড়া শক্ত কাঁটাদার চোয়াল।

এই লায়ন-অ্যান্ট এর লার্ভা শীতকালে জমির অনেক গভীর গর্তে ঢুকে থাকে এবং এই লার্ভা অবস্থায় প্রায় তিন বছর থাকে। এরা শুধু বালিতেই নয়, শুকনো নদীর তীর, জঙ্গল এইসব জায়গাতেও পাওয়া যায়। বড় অবস্থায় এদের অনেকটা ড্রাগনফ্লাই এর মতো দেখতে হয়। 

সিংহপিঁপড়ের লার্ভার আকার 1.5 সেন্টিমিটার হয়। পূর্ণবয়স্ক একটি সিংহপিঁপড়ে 4 সেন্টিমিটার হয়।

 বৈজ্ঞানিক নাম- MYRMELEONTOIDEA এবং শিকারী শ্রেণীভুক্ত।

এখনো অবধি এই শ্রেনীর দুই হাজার প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে।

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-সব লেখা একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s