বিচিত্র দুনিয়া একটি ঈগলের কাহিনী অরিন্দম দেবনাথ বর্ষা ২০১৭

বিচিত্র দুনিয়া–সব এপিসোড একসঙ্গে

কানাডার এক  জলার ধারের মাটিতে কয়েকদিন ধরে  পড়েছিল অসুস্থ বিশাল এক বল্ড ঈগল। সিসাজনিত বিষে আক্রান্ত ঈগলটিকে মাসখানেক ধরে চিকিৎসা করে সুস্থ করে আবার আকাশে তার নিজের সাম্রাজ্যে ফিরিয়ে দিয়েছিল ব্রুকফিল্ডের কবিকুইড ওয়াল্ডলাইফ রিহ্যাবিলিটেশান সেন্টারের কর্মীরা। জানিয়েছেন অরিন্দম দেবনাথ

আরে ওটা কী? জলকাদা মাখামাখি হয়ে অনেক দূরে কিছু একটা পড়ে আছে না জলার ধারে? চমকে গেলেন   কানাডার, নোভা স্কোটিয়া (Nova Scotia) প্রদেশের পিকটো কাউন্টির (Pictou County) বাসিন্দা পিট মারিনার।  একটু কাছে গিয়ে দেখলেন আরে সত্যিই তো,  মনে হচ্ছে একটা বড় পাখি পড়ে আছে মুখ থুবড়ে!

পিট মারিনার এগিয়ে চললেন পাখিটার দিকে। তাঁর সাড়া পেতে উড়ে গেল পাখিটা। তারপর ফুট পঁচাত্তর মত দূরত্ব মাটি ঘেঁষে উড়তে না উড়তে মুখ থুবড়ে কাদা মাটিতে পড়ল সে।

না। মারিনারের কোন ভুল হয় নি। ওটা একটা বল্ড ঈগল। দীর্ঘদিন ধরে পশুকল্যাণ কেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার সুবাদে মারিনার বুঝতে পারলেন ঈগলটা অসুস্থ। মারিনার আবার এগিয়ে গেলেন। কাছাকাছি যেতে,  ঈগলটা আবার খানিক উড়ে গিয়ে ধপ করে পড়ে গেল মাটির ওপর। পূর্ণ বয়স্ক বিশাল ঈগলটাকে যে এভাবে ধরা যাবে না সেটা স্পষ্ট হয়ে গেল মারিনারের কাছে। ফোন করলেন এক বন্ধু পশু চিকিৎসককে। 

চিকিৎসক বন্ধুটি বললেন, “পাখিটাকে ধরে ওটাকে চিকিৎসা করতে হবে।”

“ধরব কী করে?” মারিনার বললেন, “ওটা তো সামনে গেলে উড়ে যাচ্ছে। আর খানিকটা উড়ে  গেলে তো ও সামনের জলাতে গিয়ে পড়বে, তখন তো আর ধরতেও পারব না।”

“তা হলে ওটাকে গুলি করে অজ্ঞান করে ধরতে হবে।”

এদিকে সন্ধে হয়ে আসছে। রাত নেমে গেলে আর কিছুই করা যাবে না। বললেই তো আর অজ্ঞান করার গুলি বন্দুক জোগাড় করা যায় না!  পশুপ্রেমি মারিনারের কাছে পাখিটাকে ধরাটা একটা চ্যালেঞ্জ  হয়ে উঠল।

চিকিৎসক বন্ধুটি বললেন, “একটা কাজ কর। একটা কম্বল জোগাড় করে পাখিটার ওপর ছুঁড়ে ফেল। তা হলে ওটা আর উড়তে পারবে না। তারপর ওটাকে কম্বল জড়িয়ে রাখ। ঈগলটাকে দু’একবার ওড়াতে পারলে ওটা ক্লান্ত হয়ে আর উড়তে নাও পারে। তারপর দেখ চেষ্টা করে ধরতে পার কি না।”

মারিনারের বাড়ি কাছেই। তিনি একটা কম্বল নিয়ে এলেন বাড়ি থেকে। তারপর ঈগলটার কাছে যেতে পাখিটা দু একবার ডানা ঝাপটাল ঠিকই কিন্তু আর উড়তে পারল না। ওড়ার ক্ষমতা হারিয়েছে পাখিটা।  কয়েকবারের চেষ্টায়  মারিনার পাখিটাকে কম্বল বন্দী করলেন। তারপর পাখিটাকে দুহাতে তুলে বাড়ি নিয়ে এলেন। একটা বড় খাঁচা ছিল মারিনারের বাড়িতে। চিকিৎসক বন্ধুর  উপদেশ মত ঈগলটাকে কম্বলে মুড়ে খাঁচার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মারিনার খাঁচাটার কাছে গিয়ে দরজা খুলে কম্বলটাকে সরাতে ঈগলটা খাঁচার মধ্যে উঠে বসল।মারিনার আর দেরি না করে খাঁচাসুদ্ধু ঈগলটাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে গেলেন ব্রুকফিল্ডের কবিকুইড অয়াল্ডলাইফ রিহ্যাবিলিটেশান সেন্টারে (Cobequid Wildlife Rehabilitation Centre )।

ঈগলটাকে দেখে চমকে উঠেছিলেন রিহ্যাবিলিটেশান সেন্টারের ডাক্তার ও কর্মীরা। এই সেন্টারে অনেক ঈগলকে আনা হয় চিকিৎসার জন্যে, কিন্তু এত বড় ঈগল আগে কোনদিন আসেনি। ছ’কেজি চারশো গ্রাম ঈগলটার! এই মুহূর্তে  আরও সাতটা ঈগলের চিকিৎসা চলছে এই রিহ্যাবিলিটেশান সেন্টারে। কিন্তু এই ঈগলটার তুলনায় সেগুলো এক একটা লিলিপুট।

ঈগলটাকে নিয়ে যাওয়া হল এক্স-রে রুমে। সাধারণত এক্স-রে করার আগে পশুপাখিকে অজ্ঞান করে নিতে হয়। কিন্তু ঈগলটা এত নিস্তেজ ছিল যে অজ্ঞান করার প্রয়োজন হল না। এক্স-রে করে কিছু পাওয়া গেল না। কোন হাড়গোড় ভাঙেনি। কোন গুলি বা আঘাতের চিহ্নও নেই।  ঈগলটার শরীরটা একদম ঠাণ্ডা মেরে শক্ত হয়ে গেছে। রিহ্যাবিলিটেশান সেন্টারের কর্মীরা দেখলন ঈগলটার পা দুটো উকুনে ভর্তি। নখগুলো কালো হয়ে গেছে। সম্ভবত পাখিটা বেশ কয়েকদিন ধরে ওই কাদা মাটিতে পড়েছিল।

শরীর গরম করার জন্যে পাখিটাকে “হিট-ল্যাম্পের” তলায় রাখা হল। তারপর পাখিটার শরীর থেকে রক্ত নিয়ে পাঠান হল পরীক্ষাকেন্দ্রে। পাখিটার অসুস্থতার  কারণ জানা গেল অচিরেই। রিহ্যাবিলিটেশান সেন্টারের ডাক্তার যা আশঙ্কা করেছিলেন তাই ঠিক। পাখিটার রক্তে অতিমাত্রায় করলে সমস্ত শরীরকে অসাড়  করে ধীরে ধীরে সারা শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে দেবে। ফল অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু।  

প্রত্যেক বছর এই সেন্টারে চিকিৎসা করাতে যত জন্তুজানোয়ার আনা হয়, তার প্রায় পঁচিশ শতাংশের শরীরে পাওয়া যায় সীসা।  সেটা, হয় বন্দুকের সীসার ছড়রা গুলি অথবা জন্তুজানোয়ার গুলো এমন কিছু খেয়েছিল যার শরীরে সীসা ঢুকেছিল।

পাখিদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সীসার উৎস মাছ। মাছ ধরতে গিয়ে যে বঁড়শির ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে সীসা থাকে। আর উত্তর আমেরিকার ঈগলদের প্রিয় শিকার মাছ। মাছ ধরতে গিয়ে অনেক মাছ শিকারির বঁড়শি,  সুতো ছিঁড়ে চলে  যায় বড় বড় মাছের পেটে, আর সেই মাছ একসময় ভেসে ওঠে জলের ওপর। ঈগলের সহজ শিকার হয়ে ওঠে জলের ওপর ভেসে ওঠা মাছ।

আবার শিকারির সীসার গুলি খেয়ে মৃত জন্তুর মাংস অনেক সময় ঈগলের খাদ্যে পরিণত হয়। আর ঈগল এমন একটা পাখি যার শরীরে সামান্য সীসা ঢুকলেই সঙ্গে সঙ্গে সংক্রমণ শুরু হয়ে যায়।

রিহ্যাবিলিটেশান সেন্টারের কর্মীরা এক ধরনের রাসায়নিক ধীরে ধীরে ঈগলের শরীরে প্রবেশ করাতে লাগল। এই রাসায়নিকের কাজটাই হল শরীরের রক্ত বা কোষে  মিশে থাকা  সীসাকে কিডনিতে নিয়ে  ফেলা। তারপর কিডনি থেকে ওই সীসার বিষ মূত্রের সাথে শরীরের বাইরে বেরিয়ে যায়।

রাসায়নিকটা খুব দ্রুত কাজ করল ঈগলটার শরীরে।  পাখিটা চাঙ্গা হয়ে উঠতে লাগল। কিছুদিন পর রক্ত পরীক্ষা করে দেখা গেল সম্পূর্ণ সীসামুক্ত হয়েছে ঈগলটা।

এবার শুরু ঈগলটাকে আকাশে ওড়ানোর পালা। এতদিন ধরে চিকিৎসা চলার ফলে ঈগলটা খানিক কাহিল হয়ে পড়েছিল। ছোট খাঁচা থেকে একটা বিশাল হলঘরের মত খাঁচায় সরানো হল ঈগলটাকে। কয়েকদিন চুপ করে এক জায়গায় বসে থাকার পর বিশাল দুই ডানা মেলে হলঘরের মধ্যে উড়তে শুরু করল ঈগলটা।

ক’দিন ধরে বড় খাঁচার মধ্যে দাপিয়ে বেড়ানোর পর ঈগলটাকে ছোট খাঁচায় ভরে গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হল জঙ্গলে। খাঁচার দরজা খুলে দিলে,  ঈগলটা বেরিয়ে এসে রাজকীয় ভঙ্গিতে জেট প্লেনের গতিতে আকাশে উঠে মেঘের দেশে মিলিয়ে গেল। এবার ওর নিজের সাম্রাজ্য নির্বাচন করে সেখানে রাজত্ব করার পালা।

     

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s