বিচিত্র দুনিয়া চাই গো আমি রাজা হতে অরিন্দম দেবনাথ বসন্ত ২০১৮

 অরিন্দম দেবনাথ   এর সমস্ত লেখা

চাইগো আমি রাজা হতে

bichitra (1)

ইজিপ্ট ও সুদানের মাঝে আছে প্রায় ২০০০ বর্গকিলোমিটারের দাবিদারহীন এক ছোট ভূখণ্ড। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটাকে বলা হয় টেররা নলিয়াস নো বডিস ল্যান্ড। যে কেউ এই জায়গার দাবীদার হতে পারে। লিখেছেন অরিন্দম দেবনাথ 

এখনও রাজত্বটা পাকা হয়নি, কিন্তু ইন্দোরের ব্যবসায়ী সুয়েশ দীক্ষিতের আফ্রিকার ইজিপ্ট ও সুদানের মধ্যে দু হাজার বর্গ কিলোমিটার দাবিদারহীন ‘বীর তাওয়ীর (Bir Tawil) রাজা হবার সম্ভবনা আছে বিস্তর! আফ্রিকার প্রাচীন রীতি মেনে ধুধু মরুভূমির বালিতে সূর্যমুখীর বীজ ছড়িয়ে তাতে জল সিঞ্চন করে নিজের নকশা করা পতাকা তুলে রাষ্ট্রপুঞ্জে দাবিকৃত তাঁর নতুন দেশের দাবির অনেক সমর্থকও পেয়ে গেছেন সুয়েশ। এদিকে, এই খবরটা মিডিয়াতে প্রচার পেতেই ভার্জিনিয়ার মিস্টার হিটন  সোশ্যাল মিডিয়াতে একের পর এক পোস্ট দিয়ে জানাচ্ছেন তিনি এই দেশের রাজত্ব দাবি করছেন ২০১৪ সাল থেকে।

ঘটনাটা মাত্র কিছুদিন আগের। ২০১৭ সালের নভেম্বরের  গোড়ার দিকে, ইন্দোরের একটি কম্পিউটার সংস্থার চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার  ২৪ বছরের  ইঞ্জিনিয়ার সুয়েশ দীক্ষিত ইজিপ্টের রাজধানী কায়রোতে গেছিলেন একটি সফটওয়্যার ডেভলপারসদের কনফারেন্সে যোগ দিতে। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় সুয়েশ কিছুদিন আগেই জেনেছিলেন সুদান আর ইজিপ্টএর সীমানায় মরুভূমির মাঝে প্রায় দু হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের একটা জায়গা আছে, সেখানে কোন আইনের শাসন নেই, কোন স্থায়ী বাসিন্দা নেই, এমনকি সেই জমির কোন মালিকানাও নেই।

উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার অন্ধকারাছন্ন ঔপনিবেশিকতার সময় থেকেই সুদান ও ইজিপ্টএর মধ্যে সীমানা নিয়ে বিতর্ক চলে আসছিল। ১৯৫৬ সালে সুদান ব্রিটিশ শাসন মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা পেলেও দুদেশের মধ্যে সীমানা নিয়ে বিবাদ চলতেই থাকে। বিশেষত নুবিয়ান মরুঅঞ্চল থেকে রেড’সির ধারের হ্যালাইব (Hala’ib) উপত্যকা ঘিরে। হ্যালাইবা উপত্যকা হ্যালাইবা  ট্র্যাঙ্গেল নামেও পরিচিত।  মূলত ইজিপ্সিয়ান পশু চারণদার, যাযাবর আদাবা উপজাতির বাস এই হ্যালাইবাতে। আবার সুদানি ঘরানার বেজা উপজাতির লোকেরাও রেড সির ধারের এই পাহাড়ি ভূখণ্ডে পশু চড়াত। তাই ব্রিটিশ শাসনকালে এই অঞ্চলকে ব্রিটিশরা  অ্যাংলো ইজিপশিয়ান সুদান বলে ঘোষণা করেছিল সেই ১৮৯৯ সালে। তারপর দুই দেশ মিলে ২০৫৮০ বর্গকিলোমিটার জায়গা অঘোষিত ভাবে  ভাগাভাগি করে সমান্তরাল শাসন চালাতে লাগল। বিবাদ চরমে উঠল ১৯৯২ সালে, যখন একটি কানাডিয়ান তেল কোম্পানিকে সুদান এই অঞ্চলে তেল ও খনিজ সম্পদ খুঁজে বেশ করার  অনুমতি দিল। ইজিপ্টের প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারক, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে  সমস্ত সুদানি আধিকারিককে বের করে দিয়ে হ্যালাইবার ওপর ইজিপ্টের অধিকার কায়েম করল। শুরু হল এই অঞ্চলে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর আস্ফালন।

bichitra (2)

       ১৯৯৮ সালে দুই দেশ আলোচনায় বসে বিতর্কিত হ্যালাইবার অধিকার নিয়ে। ২০০০ সালের জানুয়ারিতে সুদানের সৈন্যবাহিনী সরে আসে হ্যালাইবা থেকে এবং ইজিপ্ট পুরো হ্যালাইবার কর্তৃত্ব গ্রহন করে। কিন্তু ওই অঞ্চলে বসবাসকারী  সুদানিরা ইজিপ্টের  কর্তৃত্ব মেনে নিল না। সুদানি বিদ্রোহীরা চোরাগোপ্তা লড়াই চালিয়ে যেতে লাগল অধিকার ফিরে পেতে।

কিছুদিন চুপ থাকার পর ২০১০ সালে সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমের হাসান আল বসির বললেন ‘হ্যালাইব সুদানের এবং সুদানেই থাকবে’। 

২০১৩ সালে ইজিপ্ট ও সুদানের দুই প্রেসিডেন্ট মহম্মদ মোরসি ও আল বসিরএর মধ্যে এক বৈঠকের পর গুজব ওঠে যে এইবার হ্যালাইবা ট্র্যাঙ্গেল সমস্যার সমাধান হতে চলেছে। ইজিপ্ট সুদানকে হ্যালাইবার অধিকার ফিরিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু ইজিপ্ট প্রশাসন জানাল যে হালাইবা নিয়ে কোন আলোচনাই হয় নি।

এখনও পর্যন্ত  হ্যালাইবা ট্র্যাঙ্গেল রয়ে গেছে ইজিপ্টের শাসনে আর সুদানের দাবী ওই ভূখণ্ড সুদানের।

এই হ্যালাইব ট্র্যাঙ্গেলের  পেছনেই লুকিয়ে আছে  দাবিদারহীন বীর তাওয়ীর রহস্য। পাহাড়ি উপত্যকার প্রায় গাছপালা হীন শুকনো  বীর তাওয়ীর ভূখণ্ড নিয়ে দু দেশের মানচিত্রে দু রকম দেখান আছে। সুদানের মানচিত্রে বীর তাওয়ীর ভূখণ্ডকে ইজিপ্টের অধীন, আর ইজিপ্টের মানচিত্রে  বীর তাওয়ীর ভূখণ্ডকে সুদানের বলে দেখান আছে। ২০০০ বর্গকিলোমিটার ছিট মহলের দাবী করে কোন দেশই প্রায় ২১০০০ বর্গকিলোমিটার খনিজ সম্পদে সম্ব্রদ্ধ একটা অঞ্চল দখলের লড়াই থেকে সরিয়ে নিতে রাজী নয়। বীর তাওয়ী আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী  “টেররা নলিয়াস”  – “নো বডিস ল্যান্ড”।

কোন স্থায়ী বসতি না থাকলেও মাঝে মধ্যে বেদুইনরা পাড়ি জমায় ‘নো বডিস ল্যান্ড’ বীর তাওয়ী দিয়ে। এছাড়া এই পাহাড়ি নির্জন নুবিয়ান নামের মরুতে ঘুরে বেড়ায় কিছু ভাগ্যানেসি গোল্ড প্রস্পেকটাস – স্বর্ণসন্ধানি। আর প্রায়শই এদের পিছু নেয় ডাকাতের দল। কোন রাস্তা নেই এখানে। বিশেষ টায়ার ওয়ালা গাড়ি লাগে এই মরুর দেশে ঘুরতে। না হলে ভরসা উট অথবা পায়ে হাঁটা। কিন্তু তার চাইতেও কঠিন সুদানি বা ইজিপ্সিয়ান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এই ভূখণ্ডে ঢোকার অনুমতি আদায় করা।

বীর তাওয়ীতে যাওয়ার দুটো পথ আছে।

প্রথম পথ,

সুদানের রাজধানী খারতুম থেকে ট্রেন অথবা বালির রাস্তা  ধরে জিপে করে প্রায় সাড়ে পাঁচশো পথ পাড়ি দিয়ে নীল নদের ধারের  জনপদ, একদা প্রাচীন কুশ সাম্রাজ্যের রাজধানি আবু হামাদ শহরে পৌঁছন। এই শহরের এক দিকে নীল নদ, আর এক দিকে নুবিয়ান মরুভূমি। আবু হামাদ  থেকে বীর তাওয়ীতে যাবার যাত্রা শুরু। যাত্রাটা মোটেই সুখকর নয়। এখানে শুকনো মরুঝড় বয় প্রায় সব সময়। বাতাসে মিশে থাকা বালি, দৃশ্যমানতা কখনও কখনও প্রায় শূন্যে নামিয়ে নিয়ে আসে । প্রবল বেগে বয়ে চলা গরম হাওয়া একটা বালির পাহাড় মুছে দিয়ে আর এক জায়গায় গড়ে তোলে নতুন বালিপাহাড়। এখানে বালির স্তুপের ভাঙ্গা গড়া চলে সবসময়। পথ বলে কিছু নেই। খুব কম জল মেলে এই মরুভূমিতে। কদাচিৎ কাঁটা গুল্ম দেখা যায়। উড়ন্ত বালিতে চলার চিনহ মুছে যায় নিমেষে। ইতিউতি পাহাড় আর উঁচু পাথরের স্তুপই চলার দিশা রাখার অন্যতম হাতিয়ার। পথের দিশা হারালে মরুভূমির ‘ডেথ সার্কেলে’ মৃত্যু অনিবার্য। পোড়খাওয়া মরুচারিও এই পথ মাড়াতে চায় না সহজে। আবু হামাদ থেকে কম করেও দুদিন লাগে জিপে করে বীর তাওয়ীতে পৌঁছতে। সেরকম কোন ম্যাপ নেই বীর তাওয়ীর।

দ্বিতীয় পথ,

সুদানের সীমান্তের কাছে ইজিপ্টের আবু সিম্বেল শহর হয়ে। লেক নাসের পার হয়ে  রোদে পুড়তে পুড়তে অনুর্বর বালি পাথুরময় জমির ওপর দিয়ে  লম্বা পথ পাড়ি জমিয়ে বীর তাওয়ীতে পৌঁছন। কিন্তু এখানেও ইজিপ্টের সেনাবাহিনীর অনুমতি ছাড়া তাদের সীমানা অতিক্রম করে বীর তাওয়ীতে প্রবেশ সম্ভব নয়।

bichitra (11)

বীর তাওয়ী – ‘নো বডিস ল্যান্ড’ দুই দেশের কাছেই নিষিদ্ধ অঞ্চল।

২০১৪ সালের জুন মাসে বীর তাওয়ীকে প্রচারের আলোয় নিয়ে এল সোশ্যাল মিডিয়া ‘ফেসবুক।’ ব্রিটেনের ভার্জিনিয়া প্রদেশের এক আটত্রিশ বছরের কৃষক জেরিমিয়া হিটনের এক লেখা। তিনি লিখেছিলেন যে দাবিদারহীন আফ্রিকার এক ছোট ভূখণ্ড বীর  তাওয়ীর তিনি স্বঘোষিত রাজা। এবং তার ছয় বছরের কন্যা এমিলি ওই দেশের রাজকুমারী। তার দাবির সপক্ষে তিনি বীর তাওয়ীর মাটিতে তার নিজের নকশা করা পতাকা গেড়ে তার সাথে তোলা ছবি  তিনি তুলে দিয়েছিলেন তার লেখার সাথে। পৃথিবীর সবচাইতে কঠোর প্রকৃতির অন্যতম বীর তাওয়ীর প্রায় জনমানবশূন্য, সমুদ্রতট থেকে বহুদূরে, পৃষ্ঠ-জল হীন, বালির রাজ্যে তার দাবিকৃত এবং মানবজাতির উদ্দেশে সমর্পিত এই নতুন সাম্রাজ্যের উন্নতির জন্য তিনি আড়াই লক্ষ পাউন্ডের তহবিল গড়তে সহযোগিতা করার আবেদনও করেছিলেন তার লেখায়।

অনেক বাবার মত হিটন ও তার শিশুকন্যা এমিলিকে ডাকতেন  রাজকুমারী বলে। একদিন হিটনের কন্যা তার বাবাকে প্রশ্ন করেছিল, “বাবা আমি কি সত্যি রাজকুমারী হতে পারি না?”

কন্যাকে সত্যি রাজকুমারী বানাতে হিটন ইন্টারনেট ঘেঁটে খুঁজে পেয়েছিলেন আফ্রিকার মরুভূমির মাঝে ‘নো বডিস ল্যান্ড’ বীর তাওয়ীর সন্ধান। তারপর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, ইজিপ্সিয়ান সেনার অনুমতি সংগ্রহ করে ব্রিটিশ-ইজিপ্সিয়ান চলচিত্র নির্মাতা বন্ধু ওমরকে সাথে করে ছয় বছরের কন্যার জন্মদিনে   বীর তাওয়ীতে পৌঁছে নিজের নকশা করা পতাকা তুলে ক্যামেরার সামনে নিজেকে দাবি করেছিলেন বীর তাওয়ীর রাজা বলে, ফলে তার কন্যা এমিলি হয়ে গেছিল ওই দেশের রাজকুমারী। ফেসবুকে লেখা কন্যার ইচ্ছে পুরোনে বাবার এই কঠিন যাত্রার খবর নজরে আসতে, স্থানীয় সংবাদপত্র, ‘ব্রিস্টল হেরাল্ড কুরিয়ার’ ফলাও করে ছেপেছিল হিটনের সাক্ষাৎকার। অচিরেই এই সংবাদ সারা বিশ্বের খবরের কাগজে ছাপা হল সি,এন,এন, টাইম, নিউস উইকের মত সংবাদ মাধ্যমের হাত ধরে।

হিটন ও তার বন্ধু ওমর, বীর তাওয়ীতে যাবার পরিকল্পনাটা করেছিলেন ২০১০ সালে, bichitra (1)ইজিপ্টের কায়রো শহরে বসে। উদ্দেশ্যটা ছিল এই ‘নো বডিস ল্যান্ড’ নিয়ে ছবি করার। সেই ছবির কোন ডিরেক্টর থাকবে না, কোন অভিনেতা অভিনেত্রী থাকবে না, থাকবে না কোন নির্দিষ্ট গল্প। একরাশ ছবি তুলে নিয়ে এসে, এডিটিং টেবিলে বসে তৈরি হবে সেই ছবি।সাথে জুড়ে গেছিল বীর তাওয়ীতে পৌঁছে পতাকা গেড়ে নিজেকে রাজা ঘোষণা করে কন্যাকে রাজকুমারী বানানোর স্বপ্ন।

পরিকল্পনা মত ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে সুদানের রাজধানী খারদুমে  ক্যামেরা, স্লিপিং ব্যাগ ইত্যাদি সমেত পৌঁছেছিলেন দুই বন্ধু। সংশ্লিষ্ট দফতরে বীর তাওয়ীতে যাবার আবেদন করে অপেক্ষা করতে হল কয়েকদিন। অপেক্ষার অবসরে খারদুম শহরে ছবি তুলে বেড়ালেন দুই বন্ধু। সংশ্লিষ্ট দফতরে ডাক পাওয়ার পর, দফতরে যেতেই বন্ধ ঘরে দুজনকে আলাদা আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ চলল বহুক্ষণ ধরে। হিটনরা খারুদুমে ছবি তোলা শুরু করার পরই টের পেয়েছিলেন তাদের ওপর নজরদারি শুরু হয়েছে।

ওমরের ক্যামেরায় তোলা সব ছবি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল গোয়েন্দার দল। শুধু ছবি তোলা আর একটা পতাকা পুঁতে মজা করে রাজত্ব দাবী করে মেয়েকে রাজকুমারী বানানো ছাড়া বীর তাওয়ীতে যাবার আর কোন মতলব নেই বোঝাতে কাল ঘাম ছুটে গেছিল দুজনের। শুধু তাই নয় ওমরের ভয় হচ্ছিল তার দামি ক্যামেরাটা না বাজেয়াপ্ত করে নেয় অভিবাসন দফতর।

bichitra (4)কয়েকঘণ্টা ধরে লাগাতার জিজ্ঞাসাবাদের পর অনুমতি পাওয়া গেলেও দেখা দিল আরেক সমস্যা। কোন নামি পর্যটন সংস্থাই তাদের নিয়ে যেতে রাজি হল না চোর-ডাকাত আর জঙ্গিদের আখড়া বীর তাওয়ীতে। যেখানে কোন আইনের শাসন নেই, সামরিক বাহিনীর লোকেরা এখানে কাউকে  গুলি করে মেড়ে ফেলতে পারে কোন কথা ছাড়াই।

 অনেক ঘোরাঘুরির পর এক অনামি পর্যটন সংস্থার মালিক ওবাইের সাথে আলাপ হল হিটনদের। পর্যটন সংস্থাকে সামনে রেখে ওবাই বড় শিকারের যোগাড়যন্ত্র করে দেয়। এছাড়া ওবাইএর পরিবহনের ব্যবসাও আছে। ওবাই সম্পর্কে  সব জেনে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আর কোন উপায় না থাকায় অনেক টাকার বিনিময়ে, ওবাইএর সাথে যাত্রাচুক্তি করতে বাধ্য হল হিটন ও ওমর। ওবাই একটা টয়োটা হিওক্স গাড়ি, একটা স্যাটেলাইট টেলিফোন, দুই ট্যাঙ্ক জল ও তার ভাইপো যেদোকে ড্রাইভার হিসেবে দিল।   

যেদো ঠিক ড্রাইভার নয়, সে  একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। মরুভূমিতে গাড়ি চালাতে ওস্তাদ শিক্ষিত যেদোকে ওর কাকা এই দলের সাথে জুড়ে দিয়েছিল মূলত দুই বিদেশীর সুরক্ষার জন্য। আর সেটা হিটন ও ওমর টের পেয়েছিল যখন পরদিন সকালে যাত্রা শুরুর আগে একটা গুলিভর্তি বন্দুক পাশে রেখে সুঠাম চেহারার যেদো বলেছিল, “আই অ্যাম হিয়ার টু প্রটেক্ট ইউ।”

ইন্টারনেটে বীর তাওয়ীর ইতিহাস ছাড়া আর কোন তথ্য পায়নি হিটনরা। যদিও বীর তাওয়ীর রাজত্ব দাবি,  ওদের আগেও অনেকে করেছে। কিন্তু বীর তাওয়ীর ভূখণ্ডে পৌঁছে সেখানে পতাকা গেড়ে তার দাবিদার হওয়ার কোন তথ্য নজরে আসে নি দুই বন্ধুর। প্রথমদিন মরুভূমির বালি পথ দিয়ে প্রায় তিনশো কিলোমিটার পথ পেরিয়ে আতবারা পৌঁছলেন অভিযাত্রীরা। ১৮৯৮ সালে এখানেই মাহিদি (Mahdi) বাহিনীকে হারিয়ে  সুদানের দখল নেয় ব্রিটিশরা। নীল ও আতবারা নদী বয়ে গেছে শহরের কোল ঘেঁষে। এই আতবারা শহর হল সুদান রেলের সদর দফতর। রেল সংক্রান্ত বেশ কিছু কারখানা আছে এখানে। এই নদীবন্দর শহর থেকেই অধিকাংশ আমদানি রফতানি চলে সুদানের।  

পরদিন আতবারা শহর ছেড়ে রওয়ানা হবার খানিক পর উচ্ছল যেদো একদম চুপ করে গেল। মাইলের পর মাইল লোকবসতির কোন  চিনহ নেই। নেই কোন প্রানের স্পন্দন। bichitra (8)বালি রাস্তার দু ধারে খালি বালি আর বালি। ইতি উতি কয়েকটা কাঁটা গাছের ঝোপ। প্রায় দুশো কিলোমিটার পথ পার হয়ে অভিযাত্রীরা পৌঁছলেন নীল নদের ধারের ছোট  শহর কারিমাতে। নদীর ধারে অভিযাত্রীদের নজরে এল একটা পরিত্যক্ত স্টিমার। অভিযাত্রীরা স্টিমারে উঠে ছবি তুললেন অনেক। ভেঙ্গে যাওয়া স্টিমারের গায়ের একটা ফলকে লেখা ছিল স্টিমারের যাত্রাপথ পোর্টসমাউথ, সাউথএমটন, গ্লাসগো…। এখান থেকে নজরে আসছিল কাছের জেবেল বারকেল পাহাড়  আর পাহাড়ের মাথায় উড়তে থাকা ঈগলের ঝাঁক। আরবি ‘জেবেল বারকেল’ শব্দের অর্থ পবিত্র পাহাড়। 

প্রচলিত মত অনুযায়ি ‘জেবেল বারকেল’ হল ঈশ্বরের রাজা ও বাতাস দেবতা আমুনের বাসস্থান।দূর থেকেই ৯৮ মিটার উঁচু পাহাড়ের সমতল চুড়ায় অবস্থিত অতি প্রাচীন ভাঙ্গা মন্দিরের খানিক অংশ

bichitra (4)

চোখে পড়ে। বহু শতাব্দী ধরে এই জেবেল বারকেল পাহাড় ছিল ইজিপ্টের ফারাও রাজত্বের শেষ সীমা। এই পর্যন্তই আসা যেত নদী পথে। এই পাহাড় টপকালেই শুরু ভয়ঙ্কর নুবিয়ান মরুপ্রদেশের।

আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে, খ্রিস্টপূর্ব ১৪৫০ সালে ইজিপ্সিয়ান সম্রাট থুতমোস তিন (Thutmose III ), তার নুবিয়ান মরু সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে জেবেল বারকেল পাহাড়কে ঘিরে গড়ে তুলেছিলেন ১৩ টি মন্দির ও তিনটি রাজপ্রাসাদ। আর পাহাড়ের মাথায় বানিয়েছিলেন আমুন দেবতার মন্দির। এর কিছুকাল  পরে এই  কারিমা শহর চলে আসে খুশ সাম্রাজ্যের অধীনে। খৃস্টের জন্মের আনুমানিক ২৫ বছর আগে রোমানরা, সাম্রাজ্য জয়ের লোভে আক্রমণ হানে জেবেল বারকেল’এ। জেবেল বারকেলের মূর্তি উঠিয়ে নিয়ে যায় মন্দির থেকে। কিন্তু মরুপ্রদেশে সাম্রাজ্য চালান মোটেই সুখকর নয় বুঝে পুরো শহরটাকে ধ্বংস করে দিয়ে রোমান সৈন্যের দল চলে যায়। পরবর্তীকালে রোমানদের গুঁড়িয়ে দেওয়া শহর, খুশ অধিপতি নাতাকামানি আবার খানিক গড়ে তোলেন। এই জেবেল বারকেল পাহাড়ের খানিক দুরেই পাওয়া গেছে বেশ কিছু পিরামিডের সন্ধান।

মরুভূমির প্রান্তে নীল নদের ধারের জেবেল পাহাড় ঘিরে বালির তলায় প্রায় চাপা পড়ে থাকা মন্দির ও শহরের ধ্বংসস্তূপের কথা প্রথম জানা যায় এক ইউরোপিয়ান অভিযাত্রীর লেখা থেকে ১৮২০ সালে। ১৮৬২ সালে   এক ইজিপ্সিয়ান আধিকারিক এই ধ্বংসস্তুপ থেকে পাঁচখানা শিলালিপি তুলে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কায়রো মিউসিয়ামে। ১৯১৬ জর্জ রেইসনারের নেতৃত্বে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও বোস্টনের মিউসিয়াম অফ ফাইন আর্টসের একদল বিশেষজ্ঞ প্রথম বিজ্ঞানসম্মত প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু করেন জেবেল বারকেল ঘিরে। বালি সরিয়ে পাওয়া যায় একের পর এক পাথুরে রাজপ্রাসাদ এবং মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ ও রাজকীয় সমাধি।  ২০০৩ সালে জেবেল বারকেলকে ইউনেস্কো গ্লোবাল হেরিটেজ ঘোষণা করে।   

ছবিতে গল্প তৈরি করতে বেড়োন ক্যামেরাধারীরা  এই সুযোগ হাত ছাড়া করতে চাইল না। ক্যামেরা চালু রেখে রানিং কমেন্ট্রি দিতে দিতে এবড়ো খেবড়ো পাথরের গা বেয়ে পাহাড়ে উঠতে শুরু করল তারা। আকাশ থেকে ঈগলের দল নজর করছিল অভিযাত্রীদের। পাহাড়ে উঠতে শুরু করতেই তীক্ষ্ণ শব্দে আকাশ থেকে তিরবেগে নেমে এসে অভিযাত্রীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পরে জেবেল বারকেল পাহাড়ের রক্ষক ঈগলের দল। কোন রকমে দৌড়ে পালিয়ে আসে দুই ছবি শিকারি।

সেদিন শেষ বিকেলে অভিযাত্রীরা নীল নদের ধারের ছোট সহর আবু হামাদ পৌঁছে, মরুভূমির ধারে আস্তানা গাড়লেন অভিযাত্রীরা।bichitra (5) মরুর ধারে সোনাখুঁজিয়ে সম্প্রদায়ের বাস। অভিযাত্রীদের নজরে এল খানিক দূরে মরুর বুকে সবুজ গড়ে তুলতে সৌদিআরবের সংস্থার প্রয়াস। বাইরে থেকে মাটি এনে বালির ওপর বিছিয়ে, তার ওপর জল ছিটিয়ে মরুকে কৃষির উপযুক্ত করে তুলতে চেষ্টা করছে এই সংস্থা।যদিও এখানকার আদিবাসীরা সবুজায়ণের এই কৃত্রিম চেষ্টাকে মেনে নিতে পারছে না মন থেকে।

আবু হামাদ থেকে রাস্তাবিহীন মরুভুমির ওপর দিয়ে একের পর এক বালি ঝড়ের মোকাবিলা করতে করতে টয়োটা গাড়ি চেপে রওয়ানা হবার প্রায় চল্লিশ ঘণ্টা পরে, গাড়ির পেছনের আসন থেকে, ঝলসানো দুপুরে স্যাটেলাইট ফোন দিয়ে যুক্ত গ্লোবাল পজিসানিং সিস্টেমে  চোখ রাখা ওমর   চিৎকার করে উঠল,  “আমরা সুদানের সীমানা অতিক্রম করে পৌঁছে গেছি ‘নো বডিস ল্যান্ড’ বীর তাওয়ীতে!”bichitra (7)

শোনা মাত্র গাড়ি থামিয়ে এক লাফে নেমে, যেদো আনন্দে বন্দুক থেকে গুলি ছোড়া শুরু করে দিল। একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। নির্জন প্রান্তরে গুলির আওয়াজে ভীত একটা হলদে রঙা মরু শেয়াল সামনের বড় পাথরের খাঁজ থেকে বেড়িয়ে দৌড়ে হারিয়ে গেল মরুর হলদে বালির বুকে। নাবিয়ান মরুর এই অংশে একটা কাঁটা গাছের দেখাও নেই কোথাও।কি খায় মরুর এই প্রাণীগুলো কে জানে? গাড়ি রেখে, অভিযাত্রীরা সামনের একটা ন্যাড়া পাহাড়ে উঠতে শুরু করলেন। পাহাড়ের মাথায় উঠে পতাকা পুঁতে রাজত্ব দাবী করতে হবে।

পাহাড়ে ওঠার কাজটা সহজ ছিল না। রোদে তেতে থাকা পাথরে হাত ছোঁয়ালে ফোস্কা পরে যাচ্ছে।কিন্তু রাজত্ব দাবী করতে এসে এইটুকু কষ্ট তো মেনে নিতেই হবে! জানা নেই আগে কোনদিন মানুষের পা পড়েছে কিনা এখানে। ঝোড় বাতাসে উড়তে থাকা শুকনো বালিতে গাড়ির টায়ারের দাগ প্রায় চাপা পরে গেছে। গাড়ির ওপর জমে উঠেছে পুরু বালির স্তর। ওমরের ক্যামেরায় রেকর্ড হয়ে যাচ্ছিল সব দৃশ্য।  bichitra (6)

পাহাড়ের মাথায় পৌঁছে অভিযাত্রীদের দেখলেন যেদিকে চোখ যায় শুধু বালির ঢেউ। তার মাঝে এখানে ওখানে ন্যাড়া পাহাড় শিরা উপশিরার মত জেগে আছে।বীর তাওয়ীর পাহাড়ের মাথায় পতাকা গেড়ে সাম্রাজ্য পত্তনের কয়েক ঘণ্টা পর যেদো তাগাদা লাগাল এবার ভালোয় ভালোয় চল সুদানে ঢুকে পড়ি। ডাকাতের দলের হাতে পড়লে …

বীর তায়য়ী ভূখণ্ডের আরেক দাবীদার সুয়েশ দীক্ষিতের যাত্রা পথ ছিল ইজিপ্টের দিক থেকে। ২০১৭র ৪ নভেম্বর মাসে সুয়েস কায়রো থেকে বিমানে পৌঁছেছিলেন ইজিপ্ট ও সুদানের সীমান্ত ঘেঁষা মন্দির সহর আবু সিম্বেলএ। সেখান থেকে ইজিপ্সিয়ান সামরিক বাহিনীর অনুমতি নিয়ে ৬ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে পৌঁছেছিলেন বীর তায়য়ীর মরু ভূখণ্ডে। তারপর নিজের নকশা করা পতাকা উড়িয়ে বালির বুকে সূর্যমুখী ফুলের বীজ ছড়িয়ে তাতে জল সিঞ্চন করে নিজেকে বীর তাওয়ীর রাজা বলে ঘোষণা করেন।

হিটন তার ফেসবুক পোস্টে সুয়েশের বীর তাওয়ীতে পৌঁছে পতাকা ওড়ানোর দাবিকে মিথ্যে বলে জানিয়েছেন। হিটন জানিয়েছেন “আবু সিম্বেল থেকে লেক নিশার পারাপার হবার কোন ফেরি নেই। তা ছাড়া সুয়েশ যেই গাড়ির ছবি দিয়েছেন তাতে মরুভূমিতে চলার মত টায়ার লাগানো ছিল না। গাড়ি ছিল একদম পরিষ্কার…”  bichitra (10)

বিতর্ক যাই হক, রাজত্ব দাবি করার পর বাবার বকুনিতে নিজেকে রাষ্ট্রসংঘে তাঁর দাবীকৃত ‘কিংডম অফ দীক্ষিত’এর প্রধানমন্ত্রী ও বাবাকে রাজা বলে ঘোষণা করে আপাতত ক্ষান্ত দিয়েছেন সুয়েস। এবং হিটন ও ওমরের তৈরি ছবি বিক্রি হয়েছিল অনেক দামে।

bichitra (9)

বিচিত্র দুনিয়া র সমস্ত লেখা

Advertisements

2 Responses to বিচিত্র দুনিয়া চাই গো আমি রাজা হতে অরিন্দম দেবনাথ বসন্ত ২০১৮

  1. Sudeep says:

    দারুণ দারুণ লাগলো

    Like

  2. অসাধারণএক তথ্য। বহুদিন মনে রাখার মতো।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s