বিচিত্র দুনিয়া হীরক জ্বর অরিন্দম দেবনাথ শরৎ ২০১৮

 অরিন্দম দেবনাথ   এর সমস্ত লেখা

মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা হিরে খুঁজে পাওয়ার উন্মাদনায় উত্তাল হয়ে উঠেছিল আমেরিকার এক বড় অংশ। ১৮৭১ সালের এক গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকেলে সানফ্রানসিসকোর এক ব্যাঙ্কে  হাজির হয়েছিল রোদে জলে পুড়ে তামাটে হয়ে যাওয়া দুই পুরুষ। কাঁধে চামড়ার থলে। তারপর…

ব্যাঙ্ক বন্ধ হয়ে যাবার মুখে শতচ্ছিন্ন পোশাক পরা রোদেজলে পুড়ে তামাটে হয়ে যাওয়া পেটাই চেহারার দুই মধ্যবয়সি পুরুষ এসে ঢুকল সানফ্রানসিসকোর ‘ব্যাংক অফ ক্যালিফোর্নিয়ার” অফিসে। সময়টা ১৮৭১ সালের  গ্রীষ্মকাল। একজনের কাঁধে এক শক্তপোক্ত চামড়ার থলে। এই থলেটা তারা রাখতে চায় ব্যাঙ্কের ভল্টে।

একে তো ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবার সময়, তায় চেহারায় ভয়ঙ্কর বাউন্ডুলে ছাপ। ব্যাঙ্কের লোকজন পাত্তাই দিতে চায় না।

দুইজন বারবার বলে চলেছে ব্যাগ তারা ব্যাঙ্কের ভল্টে রাখবেই। এছাড়া তাদের কাছে কোন বিকল্প নেই। কিন্তু তারা কিছুতেই ওই থলের ভেতর কী আছে জানাতে রাজি নয়! এমনকি তাদের পরিচয় জানাতেও তাদের আপত্তি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষও নাছোড়, ব্যাগে কী মাল আছে না জেনে তারা কিছুতেই ওই ব্যাগ ভল্টে রাখতে দেবে না। আর পরিচয় জানানোটা বাধ্যতামূলক।

অনেক বিতণ্ডার পর দুই আগুন্তুক তাদের পরিচয় দিল। তার দুই তুতো  ভাই।  ফিলিপ আর্নল্ড ও জন স্লাক। ভাগ্যান্বেষী খনিজ সন্ধানকারী। তারা সরাসরি আসছে “ইন্ডিয়ান কান্ট্রি” থেকে একটা অভিযান সেরে। এই ব্যাগে আছে তাদের অভিযানের সর্বস্ব। ভল্টের উপযুক্ত ভাড়া তারা তো দেবেই তাই ব্যাগে কী আছে তারা বলবে না।

তর্ক যখন প্রায় হাতাহাতির পর্যায়ে তখন ব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট র‍্যালস্টনকে দুই খ্যাপাটের কথা জানানো হল। খবরটা পেতেই তড়িঘড়ি হাজির হলেন ভদ্রলোক। অনেক বোঝানোর পর স্বয়ং ব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্টের ও উচ্চপদস্থ জনাকয়েক ব্যাঙ্ক কর্মচারীদের সামনে ঝোলা খুলতে রাজি হল দুই ভাই। কিন্তু একটাই শর্তে! ঘুণাক্ষরে এই ব্যাগের মালপত্রের কথা বাইরে প্রকাশ করা যাবে না। চরম গোপনীয়তায় গচ্ছিত রাখতে হবে এই ব্যাগের মাল।

ব্যাগ খুলতেই বেরিয়ে এল একরাশ পাথর। পাথরের গায়ে ঝলক দেওয়া  চকচকে বস্তুগুলো নাকি  না-কাটা হিরে। এছাড়াও পাথরের গায়ে সেঁটে আছে চুনি, নীলকান্তমনি, পান্না ….

উত্তেজিত আর্নল্ড বলে উঠল “বুঝতে পারছ চরম গোপনীয়তা কেন প্রয়োজন? কেন দেখাতে চাইনি ব্যাগের সম্পদ? যা দেখছ সেটা ওই খনিক্ষেত্রের  নমুনা মাত্র! মাটির সামান্য নীচে সুপ্ত আছে কুবেরের ভাণ্ডার।”  এইটুকু বলেই হুঁশ ফিরল আর্নল্ডের। শত অনুরোধেও আর কিছু বলল না সে।

ওহিওতে জন্মগ্রহণ করা ব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট  র‍্যালস্টন দুঁদে ব্যাবসাদার। হুঁশিয়ার ব্যাঙ্কার। ১৮৫৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় এসে দশ বছর নিরীক্ষণের পর তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন “ব্যাঙ্ক অফ ক্যালিফোর্নিয়া।” ১৮৭০ সালে এই ব্যাঙ্ক শুধু ক্যালিফোর্নিয়ারই নয়, সুদূর পশ্চিমের সবচাইতে বিশ্বস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বলে গণ্য হল। র‍্যালস্টন হয়ে উঠেছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার অন্যতম মান্য বাসিন্দা। ব্যাগ ব্যাঙ্কের ভল্টে রাখতে কোন দ্বিধা করেননি ভদ্রলোক। মনে তার অন্য চিন্তা শুরু হয়ে গেল। এই ধন তারা আনল কোথা থেকে?

দিন কয়েক পর থেকে আর্নল্ড ও জন বলে বেড়াতে লাগলেন যে তারা এক বিশেষ গোপনীয় মিশনে যেতে চায় এবং এর জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। এই মিশনে টাকা ঢাললে যেই পরিমাণ সম্পদ ফেরত আসবে তা অকল্পনীয়।

আর্নল্ড ও জন-এর গোপনীয় মিশন র‍্যালস্টোনের ভালই জানা ছিল। তিনি ওই পাথরের টুকরোর ক্যালিফোর্নিয়ার খ্যাতনামা রত্ন ব্যবসায়ীদের দেখিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন যে ওগুলো বিলকুল খাঁটি।

সারাবিশ্ব, বিশেষ করে আমেরিকার মানুষজন তখন রত্নজ্বরে ভুগছে। একের পর এক সোনা, রূপো, হিরের সম্ভার আবিষ্কৃত হচ্ছে। নেভাদার সিয়েরা পর্বতমালায় সোনার খোঁজ পাওয়া গেছে মাত্র বছর কুড়ি আগে। দলে দলে স্বর্ণসন্ধানিরা হামলে পড়ে সোনা বের করে চলেছে সেখান থেকে। বারো বছর আগে কলোরাডোতে পাওয়া গেছে সোনা আর রূপোর ভাণ্ডার। তার আরও আগে দক্ষিণ আফ্রিকার কিমাবারলেতে আবিষ্কৃত হয়েছে হিরের খনি। কাজেই আরো একটা নতুন মণিমানিক্যের ভাণ্ডার যে খুঁজে পাওয়া যাবে তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। তাও আবার মুখফসকে বলে ফেলা, “জমির প্রায় উপরিভাগেই ছড়িয়ে আছে এই সম্পদ!” মানে, বেশি খোঁড়াখুঁড়ির দরকার পড়বে না।

কিন্তু দুই স্বর্ণসন্ধানি কিছুতেই বলছে না যে কোথা থেকে তারা তুলে নিয়ে এসেছে এই হিরে, চুনি, পান্না আর নীলকান্তমণি। সেটাই স্বাভাবিক। কোন বোকাও ভুল করে খোঁজ দেবে না তাদের লুকোনো সম্পদ ভাণ্ডারের।   

“দুই গেঁয়ো খনি শ্রমিক” কিন্তু ব্যাগ জমা রেখে বা কথার খেই ছড়িয়েই ক্ষান্ত হল না। অর্থের যোগান চেয়ে  র‍্যালস্টোন সহ সানফ্রানসিসকো শহরের বেশ কয়েকজন সম্ভাব্য লগ্নিকারির সাথে আলোচনা চালিয়ে চলল।

কিন্তু কেউই  হীরকক্ষেত্র জরিপ না করে অজানা আর্নল্ড ও জনের মিশনে কোন অর্থ ঢালতে রাজি নয়। অনেক দর কষাকষির পর র‍্যালস্টোনের নির্বাচন করে দেওয়া দুই লোককে হিরের ভাণ্ডারে নিয়ে যেতে সম্মত হল দুই ভাই। শর্ত একটাই, ওই দুই ব্যাক্তির চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু তার আগে এক লক্ষ ডলারও চাই বলে জানাল তারা। কারণ এই অভিযান চালাতে অনেক জোগাড়যন্ত্র করতে হবে।

আমেরিকা তখন স্বর্ণজ্বরে কাঁপছে। একের পর এক আবিষ্কৃত সোনা ও রুপোর  খনিতে টাকা খাটিয়ে রাতারাতি বিত্তশালী হয়ে উঠছে একেক জন। কাজেই উত্তেজিত লগ্নিকারিদের কাছ থেকে শুধু বিশ্বাসে ভর করে এক লক্ষ ডলার পেতে দেরি হল না দুই ভাইয়ের।

একদিন দুই ব্যাক্তিকে নিয়ে ইউনিয়ন প্যাসিফিক রেলে চড়ে সানফ্রানসিসকো ছাড়ল দুই ভাই। গন্তব্য তারা জানাল না কাউকে। লগ্নিকারিরা এই চারজনের  গন্তব্য নিয়ে  নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক করে চলল। কারো মতে এই হীরকক্ষেত্র  কলোরাডোতে। কেউ বলল উটা (Utah), অ্যারিজোনা … রাওলিনস এর পশ্চিমে টেবিল রক!

দীর্ঘ ট্রেনযাত্রার পর দুইভাই চোখ বাঁধা  লগ্নি প্রতিনিধিদের ট্রেন থেকে নামিয়ে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে রওয়ানা দিল কঠিন যাত্রায়। বন্য প্রকৃতিতে  পৌঁছনর খানিক পর অবশ্য চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হল দুই প্রতিনিধির।

চারদিন লাগাতার যাত্রার পর আবার চোখে ঠুলি পড়ল দুই ব্যাক্তির। ভোরবেলা চোখ বেঁধে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হবার পর, বিকেল চারটে নাগাত ঘোড়া থেকে নামিয়ে খুলে দেওয়া হল চোখের বাঁধন। দিনটা ছিল ১৮৭২ সালের ৪ জুন।

এবার হিরে খোঁজার পালা। চারজন মিলে পাথরের পর পাথর উপড়িয়ে পেয়ে চলল পাথরের গায়ে লেগে থাকা একের পর এক হিরে ও অনান্য দামি রত্নের সম্ভার।

আবার চোখ বেঁধে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সানফ্রানসিসকো পৌঁছে উত্তেজিত দুই প্রতিনিধি ও দুই ভাই লগ্নিকারিদের কাছে উগড়ে দিলেন তাদের অভিজ্ঞতা। তুলে দিলেন তাদের সংগ্রহ। দুই প্রতিনিধির আবেগ ছিল দেখার মত। একে এই দুর্গম অভিযানে অংশগ্রহণ, তায় হিরেমানিকের খুঁজে পাওয়া। এই দুই প্রতিনিধিওতো লগ্নিকারি হতে চলেছে! সবার চোখে ধনী থেকে ধনীতর সবার স্বপ্ন।

আমেরিকানদের স্বভাবজাত অনেক বাকবিতণ্ডা ও ঘুষোঘুষির  পর সানফ্রানসিসকোর কিছু ক্ষমতাবান ধনী মিলে ঠিক করলেন এই হিরে-জহরত খুঁড়ে বার করার জন্য অর্থ সংগ্রহে একটা ‘কর্পোরেশন’ তৈরি করা হবে। আর এই কর্পোরেশনের আধা মালিকানা পাবে দুই ভাই আর্নল্ড ও জন। আর বাকি মালিকানা থাকবে শেয়ার হোল্ডারদের কাছে।

সদ্যআবিষ্কৃত এই হিরের খনির কথা এবারে আর গোপন রইল না। অজানা খনির হিরে সানফ্রানসিসকোর নামি অলঙ্কারের দোকানের কাচের বাক্সে শোভা পেতে লাগল। কিন্তু শেয়ার কেনার জন্য সেরকম হুড়োহুড়ি শুরু হল না। খানিক দ্বিধা সংশয় দুলছে বিনিয়োগকারীরা। না দেখা সম্পদ যে আছেই বা গুণমান যে ভাল তার নিশ্চয়তা কোথায়? শেয়ারের দর বাড়ানোর কৌশল ও দ্বিধা কাটানোর উপায় হিসেবে এই হিরে মুল্যায়নের জন্য পাঠান হল নিউইয়র্ক এর ‘টিফানি এন্ড কোম্পানির’ কাছে। এই সংস্থার সেরা জহুরিরা পরীক্ষা করে জানালানে ‘হিরে একদম খাঁটি’। শুধু তাই নয় পরীক্ষার জন্য আসা হিরের নমুনাদের মুল্যই কম করে দেড়লক্ষ ডলার।

‘টিফানি এন্ড কোম্পানির’ প্রতিষ্ঠাতা চার্লস টিফানিও এই মিশনে টাকা বিনিয়োগ করতে  চাইলেন। এই হীরক জ্বরে আকৃষ্ট হয়ে দলে এলেন, ১৮৬৪ সালে গৃহযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের সামরিক বাহিনীর জেনারেল ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জর্জ ম্যাক্লিয়ান ও সেইসময়কার মার্কিন সরকারের প্রতিনিধি এবং আরেক প্রাক্তন সামরিক কর্তা বেঞ্জামিন বাটলার। 

হিরের গুণমানের ব্যাপারে টিফানি কোম্পানির শিলমোহর ও স্বয়ং চার্লস টিফানির এই প্রকল্পে অর্থ ঢালা অনান্য  বিনিয়োগকারীদের সমস্ত আশঙ্কা দূর করে দিল। জন্ম নিল একশো কোটি ডলারের নতুন সংস্থা ‘সানফ্রানসিসকো এন্ড  নিউইয়র্ক মাইনিং এন্ড কমার্শিয়াল কোম্পানি।’ আর, একটি পয়সাও পকেট থেকে না বের করে হিরের খনি খুঁজে পাওয়ার মুল্যস্বরূপ এই একশো কোটি ডলারের অর্ধেক মালিকানা প্রাপ্য হল আর্নল্ড ও জনের।

নতুন সংস্থা এবার হেনরি জানিন নামক একজন নামী খনি প্রকৌশলীকে নিযুক্ত করলেন হীরক ক্ষেত্র জরিপ করার জন্য। বেশ কিছুদিন গোপনে ওই প্রত্যন্ত প্রান্তে কাটিয়ে জানিন এসে জানালেন, আশাতীত রত্ন ভাণ্ডার লুকিয়ে আছে মাটির সামান্য নীচে। পঁচিশজন খনি শ্রমিক মিলে মাসে অন্তত দশ লক্ষ ডলারের হিরে বের করতে পারবে ওই জমি থেকে। সাথে সাথে এ-ও জানালেন তিনিও খনির অংশীদার হতে ইচ্ছুক। জানিনকে তার পারিশ্রমিক হিসেবে দশ ডলার মুল্যের একহাজার শেয়ার দেওয়া হল। যদিও এর অল্প কিছুদিন পর জানিন জরুরী আর্থিক প্রয়োজনের যুক্তি দিয়ে তিরিশ হাজার ডলারে তার অংশীদারিত্ব বেচে দিয়েছিলেন।

জানিনের গোপন বিবৃতি অচিরেই ফাঁস হয়ে গেল। দলে দলে রত্ন খুঁড়িয়ের দল ঝাঁপিয়ে পড়ল ভাগ্যান্বেষণে। ঠিক যেমনি কয়েকবছর আগে ঘটেছিল কলোরাডোতে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা সোনা খুঁজিয়ের দল কলোরাডো উপত্যকার নদীনালা, পাহাড়, গুহা উথালপাতাল করে দিয়েছিল স্বর্ণসন্ধানে। সবার চোখে এক স্বপ্ন – মাটির নীচে লুকিয়ে থাকা কুবেরের ভাণ্ডার। খালি খুঁড়ে বের করার অপেক্ষা।

‘সানফ্রানসিসকো এন্ড নিউইয়র্ক মাইনিং এন্ড কমার্শিয়াল কোম্পানি’ পড়ল মহা ফাঁপরে। এই ভাগ্যান্বেষীদের হীরক ক্ষেত্র থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে এরা কিছু স্থানীয় পথপ্রদর্শক ও কুলির দল নিযুক্ত করল। যাদের কাজই হবে ঝাঁকে ঝাঁকে আসতে থাকা এই খনি খুঁড়িয়েদের আসল জায়গা থেকে অনেক দূরে নিয়ে ফেলা। স্থানীয় পথপ্রদর্শক ও কুলি ছাড়া এই জঙ্গল-পাহাড়ে নদী নালা টপকে ভারি মালপত্র নিয়ে একাকি কারো পক্ষে ওই অঞ্চলে চলাচল করা দুরহ।

এদিকে আরও প্রায় পঁচিশটা মাইনিং কোম্পানি গড়ে উঠেছে হিরে খুঁজে বের করার জন্য। তাদের সম্মিলিত অর্থের অঙ্কটাও নেহাত কম নয়। প্রায় প্রায় দুহাজার কোটি ডলার। শেয়ার কেনার লোকের অভাব নেই। একবার হিরের উৎসের খোঁজ পেলেই হল। তারপর রাতারাতি বড়লোক হওয়া আটকায় কে?  

দুই ভাই পশ্চিম আমেরিকা, বিশেষ করে অ্যারিজোনা, নিউ মেক্সিকো, উথ, কলোরাডো জুড়ে একদম ঝড় তুলে দিয়েছে। যে যেখানে পারছে সোনা, মণি-মাণিক্য খুঁজে বের করার জন্য হত্যে দিয়ে পড়ে আছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা জলের স্রোত ধরে নদীর বালি চেলে চলেছে হাজার হাজার মানুষ। হাতুড়ির আঘতে ভেঙে চলেছে পাথরের পর পাথর। খুঁড়ে চলেছে পাথুরে জমি। সবাই ভাবছে এবার তাঁর ভাগ্যই ‘শিকে’ ছিঁড়বে।

কিছুদিন আগেই ১৮৭০এর ‘সাপ্তাহিক অ্যারিজোনিয়ান’ কাগজে ফলাও করে ছাপা হয়েছে অ্যারিজোনা প্রদেশে আবিষ্কৃত মহাদেশের সর্ববৃহৎ রুপোর খনি আবিষ্কারের কথা। কাজেই প্রতিটা খবর স্বপ্নের পেছনে ছুটে বেড়ানো অভিযাত্রীদের আকাঙ্ক্ষার আগুনে ইন্ধন জুগিয়ে চলেছে। রুপোর আঙিনা ছেড়ে দলে দলে লোক পাড়ি জমাচ্ছে হিরের খোঁজে। পাশাপাশি এটাও সত্য, বিগত কয়েক বছরের মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা পাহাড়ে বেশ কয়েকটা হিরে পাওয়া গেছে। লুক্কায়িত হীরকক্ষেত্র সবাইকে চুম্বকের মত টানছে। সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকার কিম্বারলে হীরক ক্ষেত্রের সাথে অনেকাংশে মিল আছে অ্যারিজোনা ও নিউ মেক্সিকোর মরু অঞ্চলের। তাই পাহাড়, মরুভূমি, জঙ্গল কোন অঞ্চলই বাদ রাখছে না ধনাকাঙ্খীর  দল।

শেয়ার কেনা ও হিরে খোঁজার উন্মাদনা দেখে ‘সানফ্রানসিসকো এন্ড নিউইয়র্ক মাইনিং এন্ড কমার্শিয়াল কোম্পানির’ মাথারা ঠিক করল আর সাধারণ জনগণকে শেয়ার বেচা হবে না। এই শেয়ার তাঁরাই মিলেমিশে কিনে নেবেন। শুধু তাই নয় কোম্পানির পরিচালকবর্গ আর্নল্ড ও স্লাককে চাপ দিতে লাগল এই দুই ভাইয়ের অংশ বিক্রি করে দেবার জন্য। প্রচণ্ড দাবির মুখে রত্ন খুঁজে বের করা দুই ভাই তাদের অংশীদারি বেচে দিল। সঠিক অঙ্ক জানা না গেলেও আনুমানিক প্রায় ছয় লক্ষ ষাট হাজার ডলার অর্থ পেয়েছিল দুই ভাই ‘সানফ্রানসিসকো এন্ড নিউইয়র্ক মাইনিং এন্ড কমার্শিয়াল কোম্পানি’ থেকে। অর্থ নিয়ে দুই ভাই সানফ্রানসিসকো শহর ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন। ‘সানফ্রানসিসকো এন্ড নিউইয়র্ক মাইনিং এন্ড কমার্শিয়াল কোম্পানির’ মালিকরাও ঠিক এটাই চাইছিলেন। অর্থ নিয়ে বিদেয় হয়েছে দুই বুদ্ধু গেঁয়ো। এখন এই হিরের মালিক শুধু তারাই! দি ডিরেক্টরস অফ ‘সানফ্রানসিসকো এন্ড নিউইয়র্ক মাইনিং এন্ড কমার্শিয়াল কোম্পানি’।

মার্কিন সরকারের এক প্রকৌশলী তথা ভূতাত্ত্বিক ক্লারেন্স কিং বেশ কয়েকদিন ধরেই চেষ্টা করছিলেন সানফ্রানসিসকো শহরে হীরক জ্বর তোলা হীরক ক্ষেত্রের আসল অবস্থান খুঁজে বের করার। তিনি বর্ণিত অঞ্চলের সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত। তিনি তাঁর ভূতাত্ত্বিক জ্ঞানে এই অঞ্চলে হিরে জন্মাতে পারে বলে মানতে পারছিলেন না।

নিজের দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে ক্লারেন্স একদিন স্বয়ং সে এলাকায় গিয়ে ওই প্রস্তাবিত হীরকক্ষেত্র খুঁজে বের করলেন। তারপর সব দেখেশুনে একটা টেলিগ্রাম করলেন ‘সানফ্রানসিসকো এন্ড নিউইয়র্ক মাইনিং এন্ড কমার্শিয়াল কোম্পানি’তে।

টেলিগ্রামে লেখা ছিল “হীরক ক্ষেত্রের” গল্প একটা মস্ত ধাপ্পা। ওখানে হিরেটিরে কিছু নেই। তার কাছে সমস্ত ভাঁওতার প্রমান আছে। একদল বিজ্ঞ ব্যবসাদারদের ডাহা বুদ্ধু বানিয়েছে দুই ভাই।  

সদ্য গড়ে ওঠা অনেকগুলো কোম্পানির আধিকারিরা ছুটল কিং এর সাথে দেখা করতে। কিং তাদেরকে হাতে কলমে দেখিয়ে দিলেন ভাঁওতাবাজির নমুনা। প্রমান করে দিলেন ওই জমিতে ছোট ছোট গর্ত করে তাঁর মধ্যে হিরে ঢুকিয়ে আবার মাটি পাথর চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। শুধু তাই নয় জমিতে এখানে ওখানে যে সব হিরে গর্তের ভেতর ফেলে রাখা হয়েছে সেগুলোর বেশ কটা কেটে পালিশ করা। মানে বাজার থেকে কিনে আনা। ওই জমিতে খুঁজে পাওয়া হিরে সানফ্রানসিসকোতে নিয়ে এসে বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, অধিকাংশই শিল্পে ব্যবহারের অতি স্বল্পমুল্যের হিরে। এগুলো আসে দক্ষিণ আফ্রিকার হিরের খনি থেকে। অনুসন্ধানে জানা গেল আর্নল্ড ও স্ল্যাক তাদের কিছু খনি সম্পত্তি বিক্রি করে পঞ্চাশ হাজার ডলার পেয়েছিল। এবং এই টাকা দিয়ে তারা আমস্টারডাম ও লন্ডনের ডিলারদের থেকে প্রচুর দক্ষিণ আফ্রিকার ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডায়মন্ড কিনেছিল। আর ভুতলের  সামান্য নীচের বিভিন্ন স্থানে  রুবি, চুনি, নীলকান্তমণি এসব দামি পাথর ছড়িয়ে রেখেছিল অনেকটা জায়গা জুড়ে।  অনুমান, বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নেওয়া প্রথম এক লক্ষ ডলার তারা এইসব পাথর কেনবার কাজে বিনিয়োগ করেচ্ছিল। ছড়িয়ে রেখেছিল মাটিতে। যা দেখে বিনিয়োগকারীদের দুই প্রতিনিধি ভেবেছিল এই সব পাথর মাটির তলায় শুয়ে আছে কুড়িয়ে নেবার অপেক্ষায়। আক্ষরিক অর্থে বিনিয়োগকারীদের অর্থেই তাদের বোকা বানিয়েছিল ‘দুই গেঁয়ো ভাই’।

অজানা দুই ভাই অংশীদারিত্ব বেচে কেটে পড়লেও জানা যায় তথাকথিত দুই ভাইয়ের অন্যতম হীরকক্ষেত্র জুয়াচুরির মাথা আর্নল্ড মেক্সিকান যুদ্ধের এক সৈনিক ছিল। যুদ্ধ মিটে গেলে সে কুড়ি বছর ধরে বিভিন্ন খনিতে কাজ করেছে। ১৮৭০সালে সে এক ডায়মন্ড-হেড-বিড ড্রিল তৈরির কারখানায় করনিকের কাজ করত। হীরকক্ষেত্র জুয়াচুরি টাকায় সে কেনটুকি শহরে এক ব্যাঙ্ক খোলে। তারপর এক প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে বন্দুকের লড়াইতে মারাত্মকভাবে আহত হয় এবং এর কিছুদিন পর নিমুনিয়া আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।

স্লাকও মেক্সিকান যুদ্ধের এক সৈনিক ছিল। সেও দীর্ঘদিন বিভিন্ন খনিতে কাজ করেছিল। জুয়াচুরির টাকা দিয়ে সে সেন্ট লাওসে একটি ওক কাঠের বাক্স তৈরির কারখানা খোলে। মারা যাবার সময় তার সম্পত্তির পরিমান ছিল মাত্র দেড়হাজার ডলার।

দুই ধাপ্পাবাজ ভাই ছাড়া বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একমাত্র খনি প্রকৌশলী জানিন খানিক টাকা কামাতে পেরেছিল আগে শেয়ার বেচে। আর একজনও অনেক নাম-যশ করেছিলেন এই জুয়াচুরিকে কাজে লাগিয়ে। তিনি হলেন ভূতাত্ত্বিক কিং। জুয়াচুরি ধরিয়ে দিয়ে তিনি সরকারের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের প্রথম ডিরেক্টর হয়েছিলেন।এই ঘটনা লিখে তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা লেখক হয়ে ওঠেন। যদিও মাত্র উনষাট বছর বয়সে টিবি রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাবার সময় তিনি আর্থিক ঋণে জর্জরিত ছিলেন।

‘ব্যাংক অফ ক্যালিফোর্নিয়ার” ডিরেক্টর র‍্যালস্টোন তাঁর অফিস ঘরে বাধিয়ে রেখেছিলেন তার ব্যাঙ্কের ‘শেয়ার সার্টিফিকেট’, নির্বুদ্ধিতার প্রমান স্বরূপ। তিনি তাঁর ব্যাক্তিগত ও ব্যাঙ্কের গ্রাহকদের গচ্ছিত অর্থ হীরক-ক্ষেত্র খননে লাগিয়েছিলেন। ১৮৭৫ সালের ১৬ আগস্ট ‘ব্যাংক অফ ক্যালিফোর্নিয়ার’ বন্ধ হয়ে যায়। এবং তার পরদিন তিনি বাধ্য হন পদত্যাগ করতে। পদত্যাগ পত্র দাখিল করে তিনি রোজকার নিয়মমাফিক ‘সানফ্রানসিসকো বে’ সাঁতার কাটতে যান। বিকেল নাগাদ র‍্যালস্টোনের দেহ জলে ভাসতে দেখা যায়। জানা যায়নি তাঁর মৃত্যু জলে ডুবে হয়েছিল না সেটা ছিল আত্মহত্যা!

ইতিহাসের পাতায় পুরো অধ্যায়টাই বর্ণিত হয়েছে শ্রেষ্ঠ হীরক প্রতারণা বলে। দি গ্রেট ডায়মন্ড হোক্স  নামে তা ইতিহাসে বিখ্যাত।

বিচিত্র দুনিয়া র সমস্ত লেখা

Advertisements

One Response to বিচিত্র দুনিয়া হীরক জ্বর অরিন্দম দেবনাথ শরৎ ২০১৮

  1. sudeep says:

    অসাধারণ অসামান্য লেখা…রুদ্ধশ্বাসে পড়লাম..বিচিত্র দুনিয়া পেজটা আমার বুকমার্কে আছে…মাঝে মাঝেই পড়ে ফেলি এক একটা ..এইটা দারুণ লাগলো

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s