বিচিত্র দুনিয়া

 

অপরাজিত মোজদাল

দেবজ্যোতি

bichitra5501 (Medium)

উফ্‌। কানটা এখনো ঝনঝন করছে রে ! যা শব্দটা হল! জিওফ হামাগুড়ি দিতে দিতে বলে উঠল হঠাৎ।

ওই শব্দটা হল বলেই কিন্তু মিনিকাউ প্যাসেজ দিয়ে আমরা ঢুকতে পেরেছি। বিস্ফোরক দিয়ে ফাটিয়ে পথ না বানিয়ে নিলে  আসতে পারতি নাকি ওখান দিয়ে? তুই বা আমি, আমরা কেউই তো আর বব লিকি নই যে কোন যন্ত্রপাতি ছাড়াই সাপের মতন  এঁকেবেঁকে ওরকম সরু গর্ত দিয়ে ঢুকে অ্যাদ্দূর চলে আসতে পারব! দলনেতা ডেভ আগে আগে এগিয়ে যেতে যেতে চাপা গলায় মন্তব্য করল।

তা বটে। সাধে লিকিকে গুহা অভিযাত্রীরা আয়রন ম্যান বলে?

আবার খানিকক্ষণ সব চুপচাপ। ৯০০ ফিট লম্বা এই সুড়ঙ্গটা মাত্র দু ফিট চওড়া আর ১০ ইঞ্চি উঁচু। তার মধ্যে দিয়ে একটা জলধারা বয়ে চলেছে সামনের অন্ধকারের দিকে। জলধারার ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল দলটা।

শ-স-স- হঠাৎ পেছন থেকে দলের একজনের গলা ভেসে এল, গুরগুর করে একটা শব্দ হচ্ছে না?

গ্রেট ব্রিটেনের কনিস্টোন মুর অঞ্চলে দাঁড়িয়ে থাকা চুণাপাথরের একটা পাহাড়ের গায়ে এই মোজদাল গুহা। তার মুখে এসে মোজদাল বেক নামের সরু একটা নদী গুহার ভেতর সেঁধিয়ে যায়। পাঁচ মাইল দূরে ৯০০ ফিট নীচে ব্ল্যাক কেল্ড নামে একটা জলাশয়ের কাছে এসে তা ফের বের হয়ে আসে গুহার অন্ধকার ছেড়ে। তার সেই সরু ধারাটাই এখন বয়ে চলেছে  ‘ম্যারাথন ক্রল’ নামের এই সুড়ঙ্গটার মধ্যে দিয়ে।

“ধুস। যতোসব বাজে কথা। ভয় দেখাচ্ছিস নাকি আমাদের?” সাহসভরা গলায় কথাগুলো বললেও জিওফের বুকটা কেঁপে উঠল একবার। উপুড় হয়ে শোয়া অবস্থাতেই মাথা ঘুরিয়ে একবার ওপরদিকে আলো ফেলল সে। মাথার ওপরে সুড়ঙ্গের ছাদটা মাত্রই ইঞ্চিদুয়েক ওপরে।

গুরগুর, গুমগুম শব্দটা তক্ষুণি ফের ভেসে এল পেছনদিক থেকে। ডেভ একবার চমকে উঠল যেন। মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সেই গুহা অভিযানে বিরাট নামডাক হয়েছে তার। মোজদাল গুহার ভেতরে এর আগেও বেশ কয়েকটা অভিযান চালিয়েছে সে। লোকে বলে বব লিকির চেয়েও এ গুহার ব্যাপারে তার নাকি জানাশোনা অনেক বেশি।

স্থির হয়ে আওয়াজটা একবার শুনে নিল সে। শরীরের নীচে বয়ে চলা জলধারাটার শক্তি বাড়ছে একটু একটু করে। টান টের পাওয়া যাচ্ছে তার। আলোটা নিচু করে ধরে সামান্য উঁচু হয়ে ওঠা ধারাটার দিকে একবার দেখে নিল সে। তারপর চাপা গলায় বলল, “জল বাড়ছে। তাড়াতাড়ি চল, সুড়ঙ্গটা শেষ হলে একটা উঁচু জায়গা খুঁজে নিয়ে—”

কিন্তু তার গলায় আর সে জোর ছিল না। সে বুঝতে পারছিল, মাথার ওপর সামান্য দু ইঞ্চি খোলা জায়গা নিয়ে বেড়ে ওঠা জলের সঙ্গে লড়াই করবার চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। মোজদাল অবশেষে তার শিকার ধরেছে— তবু—ক্ষীণ একটা আশায় বুক বেঁধে প্রাণপণে সামনের দিকে এগিয়ে চলছিল সেই ছজন তরুণ, বিশ্বসেরা গুহা অভিযাত্রী। আর তাদের শরীরের নীচে জলের ধারাটা ক্রমশই একটু একটু করে উঠে আসছিল তাদের মাথার দিকে—-

********

সাধারণত ইয়োরডেলের অগভীর চুণাপাথরের স্তরে এত গভীর গুহা থাকবার কথা নয়। কিন্তু তবু তার বুকে কেমন করে যে মোজদালের এই সুদীর্ঘ গুহাপথ তৈরি হল সে একটা রহস্য। পাঁচ মাইল লম্বা এই গুহাপথ চলেছে মোজদাল বেক নামের গুহানদীটির ধারা ধরে ধরে। পথে প্রকৃতি তৈরি করে রেখেছেন অকল্পনীয় সব বাধা।  এখনো পর্যন্ত কোন অভিযাত্রীদলই সে পথ পুরোটা অতিক্রম করতে পারে নি। পথের সেইসব বাধাদের যে নামগুলো রাখা হয়েছে তার থেকেই তাদের চরিত্র বুঝতে বাকি থাকেনা। রয়েছে ‘ড্রাউন অর গ্লোরি’ নামের জলে ডোবা সুড়ঙ্গ, ‘হাঁটুভাঙা গলি’, দশ ইঞ্চিমাত্র উঁচু নশো ফিটের ‘ম্যারাথন ক্রল’ কিংবা তীব্র যন্ত্রণাদায়ক জলে ডোবা পাথুরে পথ উমাগোলি-র মতন সব দুর্গম বাধা।

bichitramossadale02 (2) (Medium)এতসব বাধাবিপত্তি সবার প্রথম মন টেনেছিল বব লিকির। মানুষটার জীবনে প্রধান সমস্যা ছিল আবদ্ধ জায়গায় থাকবার ভয় বা ক্লস্ট্রোফোবিয়া। সেটাকে কাটাবার জন্য লিকি বেছে নেন এই মোজদাল গুহাকে।

সেটা ১৯৪১ সাল। পেশায় এরোপ্লেন ডিজাইনার লিকিকে যুদ্ধে যেতে হয় নি বটে কিন্তু মোজদাল অভিযানের জন্য সঙ্গী বিশেষ জুটত না তাঁর। কারণ গুহা অভিযানের অধিকাংশ লোকজন তখন যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যস্ত। গুহা অভিযানের প্রযুক্তিও তখন একেবারে শিশুস্তরে রয়ে গিয়েছে। সহায়ক হিসেবে মাঝেমধ্যে এরোপ্লেন কারখানার দু একটা মেয়েকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন বটে, তবে একবার গেলে দ্বিতীয়বার সেই ভয়ানক গুহার দিকে পা বাড়াতে চাইত না তাদের কেউ। অতএব একলাএকলাই, মোমবাতি বা সাইকেলের ল্যাম্প সঙ্গে নিয়ে চলত তাঁর মোজদাল অভিযান। পাহাড়ের পেটের ভেতর এ সুড়ঙ্গ ও সুড়ঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। অভিযানের সাজসজ্জা বলতে একটা বয়লার স্যুট।

আর এমনি করেই আস্তে আস্তে গুহার ভেতরে কোথায় কী রহস্য আছে, কোনখানেই বা নদীর জল বেড়ে উঠলে খানিকক্ষণ নিরাপদ আশ্রয় জুটতে পারে তার একটা মানচিত্রমতনও গড়ে উঠেছিল তাঁর হাতে। তবে শতচেষ্টাতেও গুহাপথকে সম্পূর্ণ অতিক্রম করে তার অন্যমুখের ব্ল্যাক কেল্ড হ্রদ অবধি পৌঁছোন হয়ে ওঠেনি তাঁর। বারংবার তাঁকে হারিয়ে দিয়েছে মোজদাল। শেষ অবধি পৌঁছোবার পথ খুঁজে পান নি তার ভয়ংকর সব গলিপথ আর জলে ডোবা সুড়ঙ্গদের গোলকধাঁধায়।

ভয়ংকরের সঙ্গে বারংবার এমন মোকাবিলা করতে ছুটে যাওয়া মানুষটাকে কেউ বলত পাগল, আবার কেউ বলত লৌহমানব। অনেকেই সন্দেহ করত বব লিকি মিথ্যে বলছেন। ওই ভয়াল মৃত্যুফাঁদের মধ্যে বারেবারে ঢুকে ফের ফিরে আসা মানুষের সাধ্য নয়। তবে, লিকি মিথ্যে বলছেন কিনা তা প্রমাণ করবার জন্য গুহার ভেতরে ঢুকে তাঁর কথা যাচাই করে নেবার সাহসও ছিল না কারো।

বেশ কয়েক খেপ মোজদালের ভেতরে ঘোরাঘুরি করবার পর লিকি ক্ষান্ত দিলেন। তদ্দিনে তাঁর ক্লস্ট্রোফোবিয়ার রোগ একেবারে সারিয়ে দিয়েছে সেই ভয়াল গুহার অন্ধকার।

বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় কুড়ি বছর আর কেউ ও গুহামুখো হয় নি। সাধ করে কে মরতে যাবে। পদেপদে মৃত্যুভয়, জলে ডোবা সুড়ঙ্গ, দশ ইঞ্চি উঁচু দীর্ঘ পাথুরে গলি এইসব ছাড়া ওতে আছেটাই বা কী? অন্য অন্য গুহার মতন স্ট্যালাকটাইট স্ট্যালাগমাইটের চোখ জুড়োনো প্রাকৃতিক ভাস্কর্যটাস্কর্যের চিহ্ন মেলে না সেই মরণগুহায়। গুহা অভিযানের আর এক প্রবাদপুরুষ জিম আয়ার নিজেও কখনো মোজদালে ঢোকবার অভিযান করেন নি। বলতেন, ওই ওঁত পেতে থাকা মরণফাঁদে আমি জন্মে পা দিচ্ছি নে। ভাগ্যের এমন পরিহাস, ১৯৬৭ সালের চব্বিশে জুন তারিখে যখন ডেভ-এর নেতৃত্বে সেই ছয় অভিযাত্রীর ভয়াবহ দুর্ঘটনাটা ঘটল মোজদালে তখন উদ্ধারকারী দলের প্রধান হিসেবে এই জিম আয়ারকেই নেতৃত্ব দিতে হয়েছিল।

ষাটের দশকের শুরুতে এসে গুহা অভিযানের নতুন যন্ত্রপাতি, পোশাক আশাক বাজারে আসতে ফের একটু আধটু উৎসাহী লোকজনের দেখা মিলতে লাগল মোজদালের গুহামুখে। লিকির বয়েস তখন পঞ্চাশের কোঠায়। মাইক বুন আর পিট লিভেসে নামে দুই শক্তপোক্ত ছোকরাকে নিয়ে ফের একবার লাগলেন মোজদালের রহস্যের সন্ধানে। ১৯৬৩ সালে এক অভিযানে তাঁর দুই শিষ্য ফের তিনি যত অবধি পৌঁছোতে পেরেছিলেন সেই অবধি পৌঁছে গেল। গুহাপথের কোন সঠিক মানচিত্র না থাকায় কেবল লিকির আন্দাজে আঁকা কিছু ভুলে ভরা মানচিত্রের ওপর ভরসা করে সে কাজ করে ওঠাটাও একটা বিরাট কৃতিত্বের ব্যাপার ছিল বইকি!

এর কিছুদিন পরে ফের একদল তরুণ অভিযাত্রী এসে রিকির দরজায় কড়া নাড়ল। লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের গুহা অভিযান সঙ্ঘের এই সদস্যরা মোজদাল গুহার ভেতর দিয়ে মোজদাল বেক এর গোটা পথটাই খুঁজে বের করতে চায়। লিকি যতটুকু জানতে পেরেছেন তারও পরে বাকি থেকে যাওয়া জল কাদা আর বোল্ডারে ভরা অজানা গুহাপথটুকুতে কী রহস্য লুকিয়ে আছে তা তারা জানতে চায়। তৈরি করতে চায় গোটা গুহাটার একটা নিখুঁত মানচিত্র। কাজটা প্রায় অসম্ভব। পদে পদে অজানা বিপদের আশংকা, কিন্তু করতে পারলে তার মতন গৌরব আর কোন দুঃসাহসী অভিযানের কপালে জুটবে না। আমাদের কাহিনীর দলনেতা ডেভ বা ডেভিড অ্যাডামসন ছিলেন সেই ক্লাবেরই সদস্য।

দাবানলের মতন খবর ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। বৃটেনজোড়া গুহা অভিযাত্রী ক্লাবগুলোর তরুণ তুর্কি সদস্যরা সবাই যেতে চায় ডেভের সঙ্গে মোজদাল অভিযানে। ইতিমধ্যেই তারা অনেকেই সে গুহার মুখের দিক থেকে একটু আধটু ভেতরের দিকে ঘুরে এসেছে। তাতে গুহা নিয়ে প্রবাদপ্রতীম ভয়টাও কেটে গেছে অনেকের। সবাই ভাবছিল, মোজদাল বুঝি দেখতেই কঠিন। আসলে হয়ত বা সে তত বিপজ্জনক নয়। তাছাড়া প্রায়শই তো গুহা অভিযানে নানান বিপত্তি ঘটে। তখন বাঘা বাঘা গুহা অভিযাত্রীরা এসে উদ্ধারও করে ফেলেন বিপদে পড়া যাত্রীদের। তবে আর চিন্তা কী?

কিন্তু , মোজদালকে পদানত করবার স্বপ্নে বিভোর সেইসব তরুণেরা তখনও জানত না, অন্ধকার সেই গুহা কী ভয়াল পরিকল্পনাই না করে রেখেছে তাদের জন্য।

১৯৬৭ সালের ২৪ জুন তারিখটা ছিল শনিবার। কনিস্টোন গ্রামে আগের রাত কাটিয়ে দশজন অভিযাত্রী পায়ে পায়ে উঠে এল ‘মোজদাল স্কার’ নামে কুখ্যাত সেই গুহামুখের সামনে। ছাব্বিশ বছুরে ডেভ অ্যাডামসন তাদের নেতা। ডেভ ও তার বন্ধু জিওফ বয়র‍্যু দুজনেই লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের গুহা অভিযান সঙ্ঘের সদস্য। সঙ্গে জুটেছে ওগডেন, ক্যানিংহ্যাম, আর শেপার্ড নামে বোল্টনের হ্যাপি ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের তিন সদস্য। তাদের সঙ্গে এসেছে কলেট লর্ড নামে একটা মেয়ে। এসেছে ব্র্যাডফোর্ড পটহোল ক্লাবের সদস্য, দুই পাকা গুহা অভিযাত্রী ১৯ বছুরে কলিন ভিকার্স, বিল ফ্রেকস আর তাদের চ্যালা ১৭ বছরের মাইকেল রায়ান। আর এসেছে ডেভিড অ্যাডামসনের বাগদত্তা কনে ২২ বছরের মোরাগ ফোর্বস। পরের মাসেই তাদের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। 

ডেভ আর জিওফের পরিকল্পনা ছিল—গুহামুখে ঢোকবার পর খানিক ভেতরে গিয়ে যে মিনিকাউ প্যাসেজ নামে সরু গলিটা রয়েছে সেইটেকে বিস্ফোরক দিয়ে ফাটিয়ে প্রথমে একটু চওড়া একটা রাস্তা বের করে নেয়া। বাকিরা চলবে তাদের পেছনপেছন। হাওয়া অফিস জানিয়েছিল, সেদিন ঝড়বৃষ্টি হতে পারে।

bichitramossadale02 (1) (Medium)

গুহামুখে এসে তার চেহারা আর আকাশের রকমসকম দেখে কলেট আর মোরাগের ধাত ছেড়ে যাবার দশা। তারা তো ভেবে এসেছিল বেশ একটা সুন্দর গুহাটুহার মধ্যে ঢুকে একটু বেড়িয়েটেড়িয়ে ফিরবে। কিন্তু এ যে ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদ। অতএব তারা দুজন মানে মানে পিছু হটল। বাইরের জগতের রোদবৃষ্টিই তাদের ভালো।

ওদিকে কানিংহ্যাম আর শেপার্ডও তখন ভয় পেয়ে গেছে খানিক। প্রথমে ডেভ তাদের অনেক আশ্বাসবাণী শুনিয়ে ঠান্ডা করেছিল কোনমতে, কিন্তু মেয়েদুজন পিছিয়ে যেতে তারা একটা সুযোগ পেয়ে গেল। ইতস্তত করে বলল, “মানে যেতে তো আমরাও চাই, কিন্তু মেয়েদুটোকে এইভাবে একলা ছেড়ে দিয়ে—না হে ডেভ। তুমি অনুমতি দিলে আমরাও বাইরেই থেকে যাই বরং। মেয়েগুলোকে পৌঁছেটৌঁছে—”

তাদের দিকে তাকিয়ে ডেভ মৃদু হেসে সম্মতি দিয়ে দিল। ভিতুদের দ্বারা এমন কাজ সম্ভব নয়। তখন বোধ হয় তার চোখের আড়ালে তেমনই হাসি হেসেছিল মোজদালের মৃত্যুগুহাও। ক্যানিংহ্যাম আর শেপার্ড আজও বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন পরবর্তীকালের বহু গুহা অভিযানের নায়ক হয়ে। বেঁচে আছেন কলেট আর মোরাগও। শুধু ডেভ ও তার পাঁচ সঙ্গী—

bichitra5505 (Medium)

-কিন্তু যাক সে কথা। অভিযানের গল্পে ফিরে আসি। গোটা দলটা এবারে দু ভাগে ভাগ হয়ে গেল। ডেভের নেতৃত্বে মূল অভিযাত্রী ছজন চলল আগে আগে। আর পেছন পেছন রইল মেয়েরা, কানিংহ্যাম আর শেপার্ড। তারা মিনিকাউ অবধি গিয়ে ফিরে আসবে।

বিকেল পাঁচটা নাগাদ মিনিকাউ-এর মুখ থেকে ফিরে বাইরে বেরিয়ে এল দ্বিতীয় দলের চারজন। হিসেব অনুযায়ী মূল দলটার অভিযান সেরে ফিরতে ফিরতে মাঝরাত পেরিয়ে যাবে। বাইরে তখন  বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। পাহাড়ের মাথায় খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে বাকিদের জন্য অপেক্ষা করাটা কোন কাজের কথা নয়। কাছেই ইঙ্গলটন শহর। ঠিক হল সেইখানে ফিরে গিয়ে অপেক্ষা করবে সবাই।

মোরাগ কিন্তু বেঁকে বসল। সংকীর্ণ সেই সুড়ঙ্গের মুখে দাঁড়িয়ে সে তো দেখেছে কেমন করে ডেভ আর তার দলবল হারিয়ে গেল সেই সুড়ঙ্গের অন্ধকার মুখের মধ্যে। কাজেই যতক্ষণ না তারা ফেরে, গুহামুখ ছেড়ে মোরাগ নড়তে রাজি নয়। অতএব বাকিদের বিদায় দিয়ে কিছু দূরে দাঁড়ানো একটা পরিত্যক্ত খড় রাখবার ঘরে সে আশ্রয় নিল।  এখান থেকেই অভিযাত্রীরা ফেরা অবধি তার নজরদারি চলবে গুহামুখের ওপরে।

সন্ধে গভীর হতে বৃষ্টিটা ঝেঁপে এল। বড়ো বড়ো ফোঁটায় ঝমঝম করে বৃষ্টি চলেছে। মোরাগের বুকের ভেতর একটা অজানা ভয় দানা বেঁধে উঠছিল। মোজদাল বেক নামে যে নদীটা গিয়ে ওই গুহামুখে ঢুকেছে, বৃষ্টিতে তার জল বেড়ে উঠে যদি—

তাড়াতাড়ি বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে এসে টর্চ জ্বেলে নদীর দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল তার। ফুলে ফেঁপে উঠেছে সরু নদীটা। গুহার মুখে অনেকটা এলাকা জুড়ে অতিকায় একটা পুকুরের মতন জল জমে উঠেছে। হু হু করে সেই জল ঢুকে চলেছে গুহামুখ দিয়ে। ওর ভেতরে যে সরু সরু বিপজ্জনক সুড়ঙ্গগুলো দিয়ে এখন এগিয়ে চলেছে ডেভের দলবল, এই জল তাকে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দেয় যদি!

এক মুহূর্ত দেরি করল না আর মোরাগ। তীব্র বৃষ্টির ঝাপটাকে উপেক্ষা করে পিছল পাহাড় বেয়ে ছুটতে শুরু করল সে। একজন কাউকে খবরটা দেয়া দরকার। এক্ষুণি।

মাইলদুয়েক দূরে ইয়ার্নবেরি ফার্ম হাউসের বাসিন্দা কৃষক মিঃ রিলে রাত নটার সময় বৃষ্টির মধ্যে ছুটে আসা মেয়েটাকে দেখে প্রথমে একটু অবাকই হয়েছিলেন। তারপর তার মুখে সংক্ষেপে বিষয়টা শুনেই এক মুহূর্ত দেরি করলেন না তিনি। পুলিশ স্টেশনে ফোন করলেন সঙ্গে সঙ্গে। তার সামান্য সময়ের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল উদ্ধার অভিযান। রাত তখন রাত এগারোটা দশ।

স্থানীয় আপার হোয়ার্ফডেলের উদ্ধারকারী দলের কাছে গুহা অভিযানে বিপদে পড়া লোকজনের উদ্ধারকর্ম একটা নিয়মিত কাজ। কিন্তু মোজদালের ব্যাপার আলাদা। ও গুহাপথের কোন বিশ্বাসযোগ্য মানচিত্রই যে নেই কারো কাছে। অতএব বিপদ গুণে সেখানকার দুই উদ্ধারকারী লেন হাফ আর দে বার্চ খবর পাঠালেন “কেভ রেসকিউ অর্গানাইজেশান” নামের এক বড়োসড়ো উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানে।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই এলাকার সমস্ত গুহা অভিযাত্রী লোকজনের বাড়িতে বাড়িতে, আর সেখানকার সমস্ত রেস্তোরাঁগুলোতে ফোন বাজতে শুরু করে দিল। সংস্থার তরফে উদ্ধার অভিযানে সামিল হবার জন্য আবেদন তখন টেলিফোনের তার বেয়ে ছুটে চলেছে ইঙ্গলটন, ইয়র্কশায়ার, ল্যাঙ্কাশায়ার ডার্বিশায়ার, চেশাসয়ারের দিকে দিকেও।

এমনই একটা ফোন বেজে উঠেছিল ইঙ্গলটনের কাছে মার্টন আর্মস নামের একটা রেস্তোরাঁতেও। সেখানে কানিংহ্যাম আর শেপার্ড তখন রাতের খাওয়াদাওয়া সারছে। মোজদালের ঝড়বৃষ্টির ব্যাপারে কিছুই জানে না তখনও তারা। ফোনটা আসবার সঙ্গেসঙ্গে অভিযানের থলেটলে সঙ্গে করে তারা ফের ছুটল মোজদালের দিকে। বৃষ্টি আর থকথকে কাদার বাধা অতিক্রম করে তখন সমস্ত জায়গা থেকে মোজদালের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসছেন অসংখ্য অভিজ্ঞ গুহা অভিযাত্রী।

মোজদালে পৌঁছে একটা ভয়াবহ দৃশ্য চোখে পড়ল সবার। গুহামুখটা একেবারে তলিয়ে গেছে জলের তলায়। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে জমে থাকা জলের মধ্যে একটা জায়গায় ঘূর্ণী তুলে হুড়মুড় করে জল ঢুকে যাচ্ছে অদৃশ্য গুহামুখ দিয়ে।

প্রথমটা কিংকর্তব্যংবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সবাই। কিন্তু একটু পরেই বেশ কিছু দমকলের ইঞ্জিন, বুলডোজার আর ট্র্যাক্টর এসে হাজির হতে কাজ শুরু হতে দেরি হল না। ততক্ষণে ভোর হয়ে এসেছে। মোজদালের গুহামুখ রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছে একেবারে। শয়ে শয়ে মানুষ কোদাল, শাবল নিয়ে কিংবা খালি হাতেই মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে জলে ডোবা গুহামুখে গড়ে তুলছিল একটা অস্থায়ী বাঁধ। সত্তর গজ লম্বা , দশ ফুট উঁচু আর পনেরো ফুট মোটা সেই মাটির বাঁধের গা ঘেঁষে খোঁড়া ছ ফুট চওড়া, দশ ফুট গভীর একটা একশ গজ খাল দিয়ে ১৯ টা পাম্পের সাহায্যে জমা জল বের করে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে অন্য দিকে।

কিন্তু তবু, ট্রাক্টরে করে টেনে আনা দশ হাজার বালির বস্তা ফেলে মজবুত করে তোলা বাঁধটা সেই বিপুল জমা জলের চাপ সইতে না পেরে এখানওখান দিয়ে বারংবার ফুটো হয়ে যাচ্ছিল আর সঙ্গেসঙ্গে কয়েকশো হাত মাটি আর বালি ফেলে বন্ধ করে দিচ্ছিল তার ফাটল। আর সেই সঙ্গেসঙ্গে চলছিল অজস্র মানুষের প্রার্থনা– খাল দিয়ে জমা জল বের হয়ে গুহামুখ ভেসে ওঠা অবধি অস্থায়ী বাঁধ জলের চাপ যেন সয়ে নিতে পারে। কিন্তু, যদি তা ঘটেও, তার পর?

জিম আয়ারের বয়স তখন একচল্লিশ। বৃটেনের গুহা অভিযানের প্রবাদপুরুষ। মাত্রই এক সপ্তাহ আগে ডেভ তাঁকে বলেছিল এ অভিযানে সামিল হতে। প্রস্তাবটা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। মোজদালকে তিনি সশংক শ্রদ্ধার চোখে দেখে থাকেন। কিন্তু সেই অভিশপ্ত সকালে শত শত মানুষের সঙ্গে গুহামুখে জল সরবার জন্য অপেক্ষা করতেকরতেই তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ভয়কে জয় করে উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এলেন।

দুপুরের দিকে জল কমতে আরম্ভ করল গুহামুখে। তখনও তার মুখে খানিক জল রয়ে গিয়েছে। কিন্তু আর দেরি না করে আয়ার উদ্ধারকারী দলবল নিয়ে বুড়বুড়ি কাটতে থাকা গুহামুখ দিয়ে নেমে পড়লেন পাতালের উদ্দেশ্যে। সঙ্গে চলল হ্যাপি ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের জন রাশটন, বিপদগ্রস্ত অভিযাত্রীদলের সদস্য ওগডেনের বাল্যবন্ধু ফ্র্যাংক বার্নস আর ক্যানিংহ্যাম ও শেপার্ড। গুহার মুখে তখন ওগডেনের বাবা উদ্বিগ্ন মুখে অপেক্ষা করে চলেছেন ছেলের খবর পাবার জন্য।

সংকীর্ণ সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলল আয়ারের দলবল। সঙ্গে আলো রয়েছে। আর রয়েছে একটা টেলিফোন হ্যান্ডসেট ও তার। খানিক বাদে ‘রাফ চেম্বার’ নামে খানিক উঁচু একটা গহ্বরের মধ্যে পৌঁছে সামনের দিকে তাকিয়ে তাঁদের মেরুদণ্ডে কাঁপুনি ধরল। গহ্বরের অন্যপ্রান্তে দেখা যাচ্ছে ম্যারাথন ক্রল নামে সুড়ঙ্গটার ছোট্ট মুখ। তাতে ভরে থাকা জল তখন আস্তে আস্তে কমে আসছে। জল সরিয়ে ভেতর থেকে উঠে আসা বড়ো বড়ো হাওয়ার বুদবুদগুলোর শব্দ সেই নির্জন অন্ধকার গুহার ভেতরে যেন কোন হিংস্র জন্তুর ভয়াল ডাকের মতন শোনাচ্ছিল।

উদ্ধারকারীদের মনের মধ্যে বারংবার তখন ভেসে উঠছে, অনেক ওপরে গুহার মুখে সেই  অস্থায়ী বাঁধটার ছবি। সাক্ষাত মৃত্যুর মত বিপুল জলরাশি আটকে রয়েছে তার অন্যপারে। কিন্তু যদি আর বেশিক্ষণ তা টিকে না থাকে!? ওদিকে মরণগুহার নৈঃশব্দ আর আলোছায়াও তখন তাদের স্নায়ুকে নিয়ে খেলা শুরু করে দিয়েছে। গোটা দলটারই এই প্রথম মোজদালের ভেতরে আসা। তাদের কেউ হঠাৎ করে শুনতে পাচ্ছিল যেন দূর থেকে ভেসে আসা কারো পদধ্বনি, সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে কারো কানে ভেসে আসছিল পরিচিত কোন গলার আওয়াজ, কেউ যেন বা সেখান থেকে জলের মধ্যে ছপ ছপ করে পা ফেলে উঠে আসতে চাইছে তাদের দিকে—

খানিক বাদে জল আরও একটু কমতে তাদের সঙ্গে এসে যোগ দিলেন লন্ডন থেকে আসা টোনি ওয়ালথাম। সামনের সুড়ঙ্গের মুখ থেকেও জল সরে গেছে তখন। এইবার শুরু হল উদ্ধার অভিযানের কঠিনতম পর্ব-ম্যারাথন ক্রল অভিযান।

ম্যারাথন ক্রল সুড়ঙ্গের ভেতরটা তখনও ভেজা, স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। একটা গা শিরশির করা নৈঃশব্দ ছড়িয়ে ছিল সেখানে। বহু গুহা অভিযানের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ আয়ারের কানে সে নৈঃশব্দ কবরের নিস্তব্ধতার মতন ঠেকছিল। মনের গভীরে তিনি ততক্ষণে বুঝে গিয়েছেন, আশা নেই কোন আর।

হামাগুড়ি দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে চলল দলটা। সবার আগে রইলেন ওয়ালথাম। তিনিই প্রথম আবিষ্কার করলেন, সুড়ঙ্গের মধ্যে জড়াজড়ি করে পড়ে থাকা দুটো কাদামাখা দেহ। মৃত শরীরদুটোর ওপরে বেশি জায়গা ছিল না। সেইটুকু জায়গা দিয়ে ঘষটে ঘষটে কোনমতে আরো একটু এগোতেই আরো তিনটে শরীর নজরে এল। বাকি রইল আর একজন। তার তখনও কোন চিহ্ন নেই। গোটা উদ্ধারকারী দলটাই তখন এগিয়ে এসেছে কাছে। মোজদালের শিকার তরতাজা মানুষগুলির দেহগুলোকে ঘিরে চোখের জল ফেলছিল তারা নিঃশব্দে।

খানিক বাদে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওয়লথাম বুলেন, “চলো ফেরা যাক জিম। এরা আর কেউ বেঁচে নেই।”

জিম আয়ার সঙ্গে আনা টেলিফোন সেটটা থেকে বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন পরবর্তী নির্দেশের জন্যে। তারপর ফোনটা রেখে দিয়ে হঠাৎ আতংকিত মুখে বলে উঠলেন, “সবাই এক্ষুণি বাইরের দিকে রওনা হও। বাঁধ ভাংছে–”

সেদিন গোটা রাতটা যুদ্ধ চলল। জলের চাপে থরথর করে কাঁপছিল বাঁধটা। দুবার তা ভেঙে পড়েছিল। দুবারই শত শত হাত একসঙ্গে কাজ করে তাকে প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই সারিয়ে তুলেছিল। তার কারণ একটাই। অভিযাত্রীদের মধ্যে একজন, ওগডেন, তার তখনো খোঁজ মেলে নি। কোন গুপ্ত সুড়ঙ্গে ঢুকে গিয়ে যদি সে বেঁচে গিয়ে থাকে? যদি কোন অন্ধকার কোণে এখনো পড়ে থাকে তার অজ্ঞান শরীর! ছবিটা চোখের ওপর ভাসতেই তৎপর হয়ে উঠছিল অসংখ্য হাত। এ বাঁধকে ভাঙতে দেয়া চলবে না যতক্ষণ না ওগডেনের সন্ধান মিলছে।

কিন্তু সে অনুসন্ধানের জন্য দরকার মোজদালকে হাড়ে হাড়ে চেনে এমন কোন অভিযাত্রীর। এইবার ফের খবর গেল বব লিকির কাছে। ছাব্বিশ বছর বাদে, তিপ্পান্ন বছরের লিকি ফের একবার মোজদালের মোকাবিলায় নামলেন। সঙ্গে পেলেন পুরোন শাগরেদ ফ্রাংক বার্নসকে। দুজন মিলে পাঁচটি মৃতদেহকে অতিক্রম করে ঢুকে গেলেন গুহার আরো বহু গভীরে। পুরোনো স্মৃতিকে ঘেঁটে ঘেঁটে তুলে এনে ওগডেনকে খুঁজতে থাকলেন গুহার সেইসব গোপন কন্দরে, যার সন্ধান জানেন শুধু তিনি নিজে।

কিন্তু তারপর ফের একবার বাঁধ ভাঙবার উপক্রম হতে খালি হাতে ফিরে আসতে হল তাঁকেও। সেই ছিল লিকির শেষ গুহা অভিযান। সোমবার আর মঙ্গলবার জুড়ে ফের একবার চিরুণি তল্লাশি চালানো হল গুহার ভেতরে। কিন্তু ওগডেনের সন্ধান মিলল না। সবাই যখন হাল ছেড়ে দিতে বসেছে, তখন ওগডেনের পুরোনো বন্ধু ব্রায়ান বোর্ডম্যান একটা শেষ চেষ্টা করবার জন্য গুহায় নামলেন পাঁচজন সঙ্গীকে নিয়ে।

এইবার ভাগ্য প্রসন্ন হল। পাঁচটি মৃতদেহ পেরিয়ে খানিক এগিয়ে তিনি দেখেন কাদার মধ্যে কিছু একটা চকচক করছে। তুলে দেখা গেল সেটা ওগডেনের আংটি। সঙ্গেসঙ্গেই সেইখানে স্থির হয়ে গেলেন ব্রায়ান। উঠে দাঁড়াবার জায়গা বলাবাহুল্য সেখানে নেই। শুয়েশুয়েই এদিক ওদিক চোখ চালাতে চালাতে নজরে এল, সুড়ঙ্গের ওপর দিকে তাঁর মাথার কাছে একটা ফাটলের মধ্যে থেকে একটা বুটপরা পা বের হয়ে আছে। ফাটলটা ভীষণ সরু। একটা হাত তার মধ্যে গলে কিনা সন্দেহ। বাঁচবার আকুল আশায় তার মধ্যেই নিজের গোটা শরীরটা ঠেলে ঢুকিয়ে দিয়েছিল ওগডেন। বাতাসের শেষতম বিন্দুটুকুকে শুষে নিয়ে বেঁচে থাকবার জন্য কী নিদারুণ যন্ত্রণাই সে সহ্য করেছিল ওই ফাটলটুকুর মধ্যে অতবড়ো শরীরটাকে গুঁজে দিতে গিয়ে!

**********

শরীরগুলো অত সংকীর্ণ জায়গা থেকে বের করে আনবার কোন উপায় ছিল না। ব্রায়ানরা বের হয়ে আসতে তার মুখ দেখেই বাইরে দাঁড়ানো ওগডেনের বাবা বুঝে গেলেন ছেলের পরিণতি কী হয়েছে। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।  দুঃসাহসী ছয় জোয়ানের একজনকেও রেহাই দেয়নি রাক্ষুসে মোজদাল।

বৃষ্টি থামবার কোন লক্ষণ দেখা গেল না তার পরের দিনও। মৃতদেহদের বের করে আনবার উপায় না থাকায় মৃতদের পরিবার পুলিশ কর্তৃপক্ষ ও অন্য অভিযাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে করোনার আদেশ দিলেন মোজদালের গুহাকে একটি সমাধিক্ষেত্রে হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, আর চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হবে তার মুখ।

দুর্ঘটনার চারদিন পরে পুলিশের রিপোর্টের শেষ লাইনে লেখা রইল, “নিশ্চিত ব্যর্থতার কথা জেনেবুঝেও এত মানুষ কোনদিন এত নিঃস্বার্থভাবে কাউকে উদ্ধার করবার কাজ করেন নি।”

মোরাগ ফোর্বস সারাটা জীবন সেই রাতটাকে ভুলতে পারেন নি। আজও তা দুঃস্বপ্নের মত তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ওগডেনের বাবা মা, ছেলের শেষ আশ্রয়ের কথা মাথায় রেখে তাঁদের বাড়ির নাম বদলে রেখেছেন ‘মোজদাল।’ আজও প্রতিই বছর ফ্র্যাংক বার্নস সেই দিনটিতে মোজদালের সামনে এসে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে যান বন্ধুদের প্রতি।

এ ঘটনার চল্লিশতম বর্ষপূর্তির দিন মোজদালের মরণগুহার মুখে একটি ফুলের তোড়া রেখে গিয়েছিলেন এক প্রৌঢ়া। তাতে লেখা ছিল, “প্রিয় জিওফ বয়র‍্যু, গত চল্লিশটা বছর ধরে তুমি আমার মনের মধ্যে বেঁচে আছ। ভালো থেকো।” তিনি জুডিথ, জিওফের স্ত্রী। বিয়ের এক বছরের মাথায় তাঁর দুঃসাহসী জিওফ হারিয়ে গিয়েছিলেন মোজদালের করাল গ্রাসে।

১৯৭০ সালে ডেভদের বন্ধুরা সরকারী অনুমতি নিয়ে ফের একবার মোজদালের ভেতরে গিয়ে ঢুকেছিলেন। দীর্ঘ এক কষ্টকর অভিযান করে বন্ধুদের দেহাবশেষ তুলে নিয়ে রেখে এসেছিলেন একটা উঁচু গহ্বরের ভেতরে, যাতে আর কখনও কোন বন্যার জল তাঁদের স্পর্শ করতে না পারে। সে গহ্বরের নাম রাখা হয়েছে “শেষ আশ্রয়”।

মোজদালের বন্ধ গুহা, এক ভয়াল কবরখানার মত আজও একা একা শুয়ে আছে তার অপরাজিত সুড়ঙ্গকে বুকে ধরে। মানুষ চাঁদের বুকে পা রেখেছে, কিন্তু মোজদাল আজও অপরাজিত।