বিচিত্র দুনিয়া

বড়দিনের বারবেলা-অরিন্দম দেবনাথ

বয়েজ লাইফ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সত্যি ঘটনা, বলেছেন অরিন্দম দেবনাথ।

bichitra01 (Small)

বরফে ঢেকে থাকা সিঁড়ির ধাপগুলো খুব সন্তর্পণে উঠে, দরজায় চাবিটা ঢুকিয়ে কোন শব্দ না করে দরজাটা খোলার চেষ্টা করছিল কোস্ট গার্ডের লেফটেন্যান্ট স্কিপ এলেন। কী যে হল! তালাটা খুলছে না কেন? সব কি বরফে জমে গেল নাকি? তুষারঝড়  আর তুষারপাত হয়ে চলেছে। এই ভরা দুর্যোগে বাড়ির সবাইকে চমকে দিতে নিঃসাড়ে ঘরে ঢুকতে চাইছিল স্কিপ। সবাই চমকেই যাবে, কেননা গতকালই বাড়িতে টেলিগ্রাম করেছিল স্কিপ বড়োদিনে বাড়িতে আসতে পারবে না বলে। বহু কষ্টে ছুটি ম্যানেজ করে, হাইওয়ের বরফ ভর্তি পথ পার হয়ে , প্রায় এক কোমর  তুষার ভরা ড্রাইভওয়ে হেঁটে পার হয়ে দুয়ারে পৌঁছে – এখন ঘরে ঢোকার চাবিটাই সাথ দিচ্ছে না। কাউকে না কাউকে ডাকাই যায়, কিন্তু তাহলে স্কিপের আসাটা আর সারপ্রাইজ হবে না।

আঙুলগুলো সব জমে গেছে। ওহ ক্রিসমাস এর আবহাওয়া বটে! চারদিকে শুধুই সাদা। হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। অবশেষে চাবিটা খুলল। ধাক্কা মেরে দরজাটা খুলে, ভেতরে ঢুকে তাড়াতাড়ি দরজাটা বন্ধ করে দিল স্কিপ। একটু ও ঠাণ্ডা যেন ঘরে ঢুকে ভেতরের গরমটাকে না কমায়।

“হে হে সবাই উঠে পড়ো। আমি এসে গেছি। মা, বাবা, কে – তাড়াতাড়ি ওঠ, আর দেভকে বল, যদি এখুনি ও লেপের তলা থেকে বের না হয় তা  হলে আমি এক তাল বরফ নিয়ে আসছি।”

‘কে’ হল স্কিপ এর ছোটোবোন, আর দেভ হল বড়োভাই।

কিন্তু,  কী হল? কারো কোন সাড়া নেই কেন!? মা তো এই সময় রান্নাঘরে থাকে! মেহগনি কাঠের হাতল লাগানো সাদা ধবধবে মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে গিয়ে, স্কিপের তুষারভর্তি জুতোতে ধাক্কা খেল একটা পড়ে থাকা টেলিগ্রামের কাগজ। হাতে তুলে স্কিপ বুঝল, এটা কেউ খুলে দেখে নি।

তাড়াতাড়ি টেলিগ্রামটা খুলে স্কিপ বুঝল, এটা গতকাল পাঠানো তারই টেলিগ্রাম। যাতে লেখা আছে ক্রিসমাসে সে আসতে পারছে না। গতকালই এটা পোস্টাল ডিপার্টমেন্ট ডেলিভারি করেছে বিকাল চারটের সময়। তার মানে—

“মা, বাবা—,” চিৎকার করতে করতে এক এক বারে দুটো করে সিঁড়ি টপকাচ্ছিল স্কিপ। দোতলায় উঠে দেখে মা বাবার ঘর খালি। বিছানা দেখে বোঝা যাচ্ছে কেউ ব্যবহার করেনি বিছানা। একদম পরিপাটি করে সাজানো। স্কিপ ছুটল বোন এর ঘরের দিকে। নাঃ। ওখানেও কেউ নেই। ঘর খালি। এইবারে দেভ এর ঘর। স্কিপ এর বড় ভাই দেভ বিদ্যুৎ দফতরের বড়ো ইঞ্জিনিয়ার।  সে ঘরও খালি। বিছানার ওপর পরিপাটি করে স্নো ব্লাঙ্কেট সাজানো। তার ওপর পড়ে রয়েছে পাট পাট করে ভাঁজ করা জামা কাপড়। রান্না ঘরে গিয়ে স্কিপ দেখল, কেক বানানোর সমস্ত সরঞ্জাম পড়ে রয়েছে। অথচ মা নেই।

পাগলের মত অবস্থা স্কিপের। ক্রিসমাসের দিন, ঘরে কেউ নেই, ভাবতে পারছে না স্কিপ। মা বাবা বোন দাদা এক সাথে বেপাত্তা! কোন দুর্ঘটনা ঘটে নি তো? স্কিপের বাবা অ্যালেন এক জন নাম করা ডাক্তার। স্কিপ ফোন তুলে সোজা ফোন করল হাসপাতালে। দু বার ফোনটা বাজলো কিন্তু কেউ ফোনটা ধরল না। তৃতীয়বার ফোন করলো স্কিপ। এবার কেউ ফোনটা তুলল।

“হ্যালো— “না সরি। ডাক্তার অ্যালেন হাসপাতাল নেই। কখন আসবেন জানা নেই।”

উত্তেজনায় স্কিপ নিজের পরিচয় দিতে ভুলে গেছিলো। এইবার সে বলল, “আমি ডাক্তার অ্যালেন এর ছোট ছেলে স্কিপ  বলছি। উনি কোথায় আছেন বলতে পারেন?”

“ওঃ স্কিপ! হ্যাঁ হ্যাঁ ডাক্তার অ্যালেন প্রায় আপনার কথা বলেন। আপনি কোস্ট গার্ড এর হেলিকপ্টার পাইলট তো!”

“হ্যাঁ ঠিক বলেছেন, কিন্তু উনি কোথায় আছেন বলতে পারেন?”

“ওঃ অবশ্যই, উনি কাল একটি এমারজেন্সি কলে বাইরে গেছেন। সেখানে যমজ বাচ্চার সুস্থ প্রসব করিয়েছেন। এতটাই এমারজেন্সি ছিল যে মাকে হাসপাতালে আনা সম্ভব ছিল না, ওদিকে ভদ্রমহিলার স্বামী বাড়ি নেই। তারপর ওখানে আটকে গেছেন। তুষারধ্বসে সব রাস্তা বন্ধ। আর টেলিফোন কাজ করছে না ওখানে। টেলিফোনের তার ছিঁড়ে গেছে।”

স্কিপ ফোনটা নামিয়ে রেখে ভাবতে বসল, বাবা না হয় বাইরে , কিন্তু মা , কে আর দেভ কোথায়?

এবারে সে ফোন করল দেভ এর অফিসে। ফোন বাজতে কেউ একজন সেটা তুলে ঘুম জড়ানো গলায় বলল, “কোথায় তার ছিঁড়েছে বলুন?”

স্কিপ বলল, “না না সে সব কিছু নয়। আপনাদের সিনিয়র এঞ্জিনিয়ার দেভের সাথে একটু কথা বলাতে পারেন?”

“সরি। কাজে বাইরে আছেন।”

“আপনাদের ত রেডিও ফোন আছে, ওনাকে একটা খবর দেবেন প্লিজ, যে উনি যেন একবার বাড়িতে ফোনে যোগাযোগ করেন। জরুরি। আমি ওনার ভাই স্কিপ বলছি।”

চট জলদি উত্তর দিল অপারেটর, “হাই  স্কিপ, আমি জো। তোমার সাথে একসঙ্গে হাইস্কুলে পড়েছি। একটু লাইনটা ধরো তো! দেখছি।”

খানিক পরে উত্তর দিল জো, “সরি স্কিপ, দেভের সঙ্গে এখুনি যোগাযোগ করা যাছে না। ওদের গাড়ি থেকে রেডিও উত্তর এসেছে, দেভ গাড়ি থেকে অনেক দূরে উপত্যকার মাঝে  কাজে ব্যস্ত। তুষার জমে সব হাই টেনশন লাইনগুলো বিকল হয়ে গেছে। দেভ ব্যস্ত তার থেকে বরফ সরাতে। ভাল কথা স্কিপ, তোমার মা কি ফিল টেলর এর কোন খবর পেয়েছেন? ফিল হল আমার কাকার হেলিকপ্টার পাইলট। দুদিন ধরে ফিল এর কোন খোঁজ নেই।”

স্কিপ জিজ্ঞেস করল, “তুমি জান আমার মা কোথায়?”

“সম্ভবত ফিল এর বাড়িতে। তোমার মা মাঝে মাঝে ফিল এর মা হারা বাচ্চাদুটোকে দেখাশোনা করেন।”

খানিকটা স্বস্তি পেল স্কিপ। মায়ের একটা খোঁজ তো পাওয়া গেল!

“ঠিক আছে জো,  ফিল টেলরকে খোঁজার জন্য আমার কোন সাহায্য লাগলে বোলো।”

টেলিফোন ডিরেক্টরি ঘেঁটে ফিল টেলর এর বাড়ির নম্বর খুঁজতে শুরু করল স্কিপ। আচমকা টেলিফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা তুলে মায়ের গলা শুনতে পেল স্কিপ।

“হ্যালো স্কিপ!”

“মা, আমি আজ সকালে  এসে দেখলাম কেউ বাড়িতে নেই। বাবা আর দেভ এর খোঁজ পেয়েছি কিন্তু ‘কে’ কোথায় জানি না।”

“কে তোর বাবার সাথে আছে। স্কুলে পড়ানোর সাথে সাথে স্কুলবাসও চালায় জানিস তো। শেষ বাচ্চাটাকে নামানোর পর জানতে পারে তোর বাবার এক জন নার্স লাগবে। কে হাত লাগাতে তোর বাবার কাছে যায় আর তার পর ল্যান্ড স্লাইড। সব ওখানে আটকে।”

“কিন্তু তুমি এখনও ফিল এর বাড়িতে কেন মা?”

“আর বলিস না। কাল দুপুরে ফোন করে বাচ্চাদুটো জানায় , ফিল বলে গেছে ও ক্রিসমাসে বাচ্চাদের জন্যে হরিণ শিকার করতে গেছে। দুপুরের মধ্যে ফিরবে। ফেরেনি, বাচ্চা দুটো ভয়ে আমাকে ফোন করে। শীতে কাঁপতে কাঁপতে। কারণ ফার্নেস কাজ করছে না। কী করব? চলে এলাম তাই। বাচ্চাদুটোকে ছেড়ে আর যেতে পারি নি। এদিকে ফিলও ফেরেনি। এই তুষারঝড়ে কোথায় আটকে গেছে কে জানে?”

ফোনটা হঠাৎ  করে কেটে গেল। কোন আওয়াজ নেই। ডেড! কী করবে ভাবছে স্কিপ। বাইরের অবস্থাটা দেখবে বলে দরজাটা খুলে বাইরে বেরোতে কানে এল দূরে হাইওয়েতে গাড়ির আওয়াজ। একটা গাড়ি এসে থামল। আর তার থেকে একটা দশাসই চেহারার মানুষ নেমে এল। বরফ ভেঙে আসতে লাগল তাদের বাড়ি লক্ষ করে।

স্কিপ প্রথমে ভেবেছিল ওঁর বাবা ডাক্তার অ্যালেন। আনন্দে চিৎকার করে উঠল সে, “হাই বাবা !” কিন্তু ভুলটা ভাঙল অচিরেই। লোকটা ডাক্তার অ্যালেন নয়। অন্য কেউ!

“লেফটেন্যান্ট অ্যালেন?” লোকটা দূর থেকে জিজ্ঞেস করল।

স্কিপ মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ আমি লেফটেন্যান্ট অ্যালেন।”

লোকটা বরফ ভেঙে উঠে এল বারান্দায়। গ্লাভস থেকে হাত বের করে এগিয়ে দিল, “আমি র‍্যাডক্লিফ। আমার ভাইপো জো বিদ্যুৎ দফতরে কাজ করে। ও একটু আগে আমাকে ফোন করে তোমার কথা বলল। ভাবলাম এই বরফ ভেঙে কারখানা যাবার  পথে তোমার সাথে একবার একটু কথা বলে যাই।”

“আসুন , ভেতরে আসুন,” স্কিপ বলল, “আপনি কি কাঠের ব্যবসা করেন?”

“একদম ঠিক।” উত্তরটা দিয়ে খানিক চুপ করে রইলেন ভদ্রলোক। স্কিপ বুঝতে পারছিল না কী বলবে। একবার ভাবল বলবে নাকি কোন সাহায্য লাগবে কিনা? তারপর ভাবল, দেখি না ভদ্রলোক কী বলেন। খানিকক্ষণ হাতদুটো ঘষে গরম করে নিয়ে ভদ্রলোক বললেন, “তুমি কি এই দুর্যোগে আমার কোম্পানির হেলিকপ্টারটা নিয়ে উড়তে পারবে?”

স্কিপ বলল, “আমি ভেবেছিলাম ফিল টেলর ওই হেলিকপ্টার নিয়ে উড়তে গিয়ে এই দুর্যোগে হারিয়ে গেছে!”

“না, না। কাল ফিল ছুটিতে ছিল। ও গাড়িতে করে বেরিয়েছিল। তারপর আর ফেরেনি। কোন খবরও নেই।”

স্কিপ খানিক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, “যাক! কোন বড়োরকমের খোঁজাখুঁজি করতে হবে না তবে। গাড়িটাকে হাইওয়ের ধারেই কোথাও একটা খুঁজে পাওয়া যাবে। ভদ্রলোক স্কিপের দিকে তাকিয়ে ছিলেন এক দৃষ্টিতে। বললেন, “আমার একজন পাইলট দরকার কয়েক ঘন্টার জন্যে। দেখ যদি এই দুর্যোগে ওড়া সম্ভব হয়।”

স্কিপ খানিক ভাবল। এই দুর্যোগে ওঁর কমান্ডার উড়তে অনুমতি দিতেন না নিশ্চয়ই।

“খুব জরুরি কি?”

“না ঠিক তা নয়। আসলে  আমি আমার লোকেদের জঙ্গলে আনানেওয়া করার জন্যে একটা হেলিকপ্টার কিনেছি। এতে করে ওদের কষ্টটাও কমে, আর সময়টাও বাঁচে। আমার অনেক কাঠুরে এখন জঙ্গলে। ওদের কথা দিয়েছিলাম বড়োদিনে ওদের বাড়ি আনার ব্যবস্থা করব। কিন্তু এই দুর্যোগে… ওদিকে আমার পাইলটও নিখোঁজ।”

স্কিপ খানিক ভাবল, নিখোঁজ বাবা আর মাহারা দুটো বাচ্চাকে সঙ্গ দিতে মা এই দুর্যোগে বাড়ির বাইরে। দাদা পাহাড়ের মাথায় এই দুর্যোগে ইলেকট্রিক তার থেকে বরফ পরিষ্কার করতে ব্যস্ত। বাবা অনেক দূরে দুটো বাচ্চা প্রসব করিয়ে দুর্যোগে আটকে গেছেন, বোনও সেখানে আটকে রয়েছে। আর সে কিনা কোস্টগার্ড এর অভিজ্ঞ পাইলট হয়ে বাড়িতে বসে থাকবে? হতেই পারে না। সে-ও বেরোবে। যা হবে পরে দেখা যাবে। বলল “চল, দেখা যাক কী করা যায়। আগে হেলিকপ্টারটা দেখা যাক।”

দরজা খুলে বাইরে বেরোতে স্কিপ দেখল বরফ পড়ার কোন বিরাম নেই। হাওয়াও চলছে উল্টোপাল্টা। এই দুর্যোগে সান্তাও তার স্লেজ নিয়ে বেরোত না!

র‍্যাডক্লিফের সাথে তার করাত কলে এল স্কিপ। ওখানে হ্যাঙারে রাখা আছে হেলিকপ্টারটা। এঞ্জিন চালু করে স্কিপ বুঝল খুব ভাল অবস্থায় আছে যন্ত্রটা। খুব যত্ন নেওয়া হয়।

এবারে সে ব্যস্ত হয়ে পড়ল আবহাওয়া দফতরের রিপোর্ট দেখতে। তারা বলছে হাওয়ার তেজ কমতে পারে। র‍্যাডক্লিফ তার বিশাল তর্জনীটা ম্যাপের ওপর রেখে স্কিপকে গন্তব্য বোঝাতে লাগল, “আমরা ওদেরকে জঙ্গলের ক্যাম্প থেকে তুলব আর এক এক করে বাড়িতে নামিয়ে দেব। কোন অসুবিধা হবে না তো?”

“ওদের জন্য সত্যি একটা আনন্দদায়ক দিন হবে,” জবাব দিল স্কিপ। হেলিকপটারটাকে খানিক গড়িয়ে এগিয়ে নিয়ে এল স্কিপ। চাকার নিচে স্কি লাগিয়ে পরীক্ষা করে দেখে নিল। তারপর রোটরটা চালু করল। ব্লাপ ব্লাপ আওয়াজ করে হেলিকপ্টার এর মাথার ওপরে ব্লেডগুলো ঘুরতে শুরু করল। থ্রটল একটু ঘোরাতে ব্লেডগুলো ঘোরার গতি হল মিনিটে দু’শোবার। স্কিপ বাঁ হাত দিয়ে পিচ লিভারটা ওপরের দিকে তুলল। হেলিকপ্টারটা মাটি থেকে আকাশে উড়ল। সঙ্গেসঙ্গেই একটা আচমকা হাওয়ার ঝাপটায় কেঁপে উঠল হেলিকপ্টারটা।

“তোমার এই হেলিকপ্টারটা দারুণ,”স্কিপ বলল ।  

“দারুণ হাত তোমার লেফটেন্যান্ট,” জবাব দিল র‍্যাডক্লিফ।

আকাশে উড়ে স্কিপ টের পেল যা ভেবেছিল তার থেকেও বেশি বরফ জমে আছে চারপাশে। নিচের কিছু প্রায় বোঝা যাচ্ছে না। বিশাল উঁচু বরফে ঢাকা গাছগুলোর ওপর দিয়ে হাইওয়েকে নিশানা রেখে স্কিপ আস্তে আস্তে উড়বার চেষ্টা করল প্রথমে। কিন্তু বরফে ঢাকা হাইওয়ে ঠিক বোঝা যাছে না। বাকি রইল ইলেকট্রিক হাই টেনশান লাইন। সেটাকে লক্ষ করে স্কিপ উড়তে লাগল। র‍্যাডক্লিফ বারে বারে সাবধান করতে লাগল স্কিপকে, কারণ হাওয়ার চাপ এড়াতে স্কিপ চাইছিল যতটা নিচু দিয়ে সম্ভব উড়তে। আর একটা কারণ অবশ্য ছিল যেটা সে র‍্যাডক্লিফকে বলেনি। ওর বড় ভাই দেভ এই উপত্যকার মাঝে ইলেকট্রিক লাইন থেকে বরফ পরিষ্কার করাচ্ছে। সে  চাইছিল দাদাকে একটু সাহায্য করতে। ইলেকট্রিক তারগুলোকে যদি হাওয়া দিয়ে একটু জোরে দোলানো যায় তা হলে বরফগুলো ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ে যাবে। সত্যি সত্যি হেলিকপ্টারের পাখার হাওয়ায় পরিষ্কার হচ্ছিল তার নীচ দিয়ে উল্টোদিকে ছুটে চলা তারগুলো।

একটুক্ষণের মধ্যেই স্কিপের মতলবটা ভালই বুঝতে পারল র‍্যাডক্লিফ। হা হা করে হেসে উঠল সে, “দারুণ মাথা ত তোমার লেফটেন্যান্ট! দেখ যদি কারেন্টটা আসে! আমি আমার ছেলের জন্যে একটা ইলেক্ট্রিক ট্রেন কিনে রেখেছি বড়দিনের উপহার হিসেবে, কারেন্ট না থাকলে সেটা চালাব কী করে?”

হেলিকপ্টারের পাখার হাওয়ায় ইলেকট্রিক তারগুলো দুলছিল আর মাঝে মাঝে একটার সাথে আর একটা তার ঠেকে যাওয়ায় তা থেকে আগুনের স্ফুলিঙ্গ বেরোচ্ছিল। ইলেকট্রিক ফিরে আসার লক্ষণ।

“এবার কীভাবে তোমার ক্যাম্পে পৌঁছব বল। তোমার লোকেদের কাছে তাড়াতাড়ি পৌঁছোনোটা জরুরি আবহাওয়া আরও খারাপ হবার আগে,” বলল স্কিপ।

“প্রথমে উপত্যকাটা পার হও। তারপর অনেক উঁচু উঁচু গাছ দেখতে পাবে। সেগুলো পার হয়ে আমার কাঠ চেরাই কল,” র‍্যাডক্লিফ বলল।

স্কিপ বলল, “তোমার পাইলটকে না খুঁজে পাওয়া গেলে কী করবে? বাচ্চাদুটো থাকবে কার কাছে? কেউ কি জানে ও কোথায় যেতে পারে?”

“না কেউ জানে না। গতকাল থেকে পুলিশ, স্কাউট, কাঠুরে সবাই মিলে ওঁর খোঁজ করে চলেছে। কোন সন্ধান নেই। জাস্ট ভ্যানিশ! ও এমনিতেই একটু চুপচাপ তারপর গত বছর ওঁর স্ত্রী মারা যাবার পর আরও চুপ হয়ে গেছে। বাজারে অনেক ধার হয়ে গেছিল, আমি আর তোমার বাবা ওকে সাহায্যও করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কারো সাহায্য ও নেয় নি। নিজেই ধার শোধ করে দেবে বলেছিল,” র‍্যাডক্লিফ জবাব দিল।

ঘ্যাঁট ঘ্যাঁট আওয়াজ করে হেলিকপ্টারটা উপত্যকা পার হয়ে বড়ো গাছগুলোর মাথা ডিঙোতেই দেখা গেল ধোঁয়ার স্তম্ভ। র‍্যাডক্লিফ বলল, “হেলিকপ্টারের আওয়াজ পেয়ে আমার লোকেরা ধোঁয়া দিয়েছে।”

খানিক বাদে ওপর থেকে দেখা গেল বিশাল কাঠের বাড়ি। ওটা র‍্যাডক্লিফের কাঠচেরাই  কারখানা। কাঠুরের দল ভিড় করে দাঁড়িয়ে কারখানার সামনে। নিচের থেকে ভেসে আসছিল চিৎকার। সবাই একসাথে কী বলছে বোঝা যাচ্ছিল না।

স্কিপ কোথায় নামবে জানতে চাইছিল। নীচ থেকে কাঠুরের দল টের পেল এটা তাদের হেলিকপ্টার পাইলট ফিল নয়, অন্য কেউ। একজন নীচ থেকে দেখাতে লাগল কোথায় নামতে হবে। একটা সমতল হেলিপ্যাড। বরফে ঢাকা। স্কি লাগানো হেলিকপ্টারটা টুক করে নেমে পড়ল বরফের মাঝে। বরফ পড়েই চলেছে। হাওয়া থামারও কোন লক্ষণ নেই। কাঠুরের দল উঠে পড়ল হেলিকপ্টারে। র‍্যাডক্লিফ পরিচয় করিয়ে দিল স্কিপ এর সাথে। সবাই জানতে চাইল ফিল তাদের হেলিকপ্টার চালক কোথায়? র‍্যাডক্লিফ জানাল গতকাল স্নো স্লাইড এর পর থেকে ফিল এর কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ও বাচ্চাদের জন্যে হরিণ শিকার করতে বেরিয়েছিল বরফ পড়ার আগে।

খানিক বাদে র‍্যাডক্লিফ এক কাঠুরের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী হল জেরি? এত কী ভাবছ?”

জেরি বলল, “টেলিফোন কাজ করছে না। জানো তো, আমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। যমজ সন্তান হবে। কী করছে কে জানে!”

“তোমার স্ত্রী কি ডক্টর অ্যালেনের তত্ত্বাবধানে ছিল?” স্কিপ বলল, “ডক্টর অ্যালেন আমার বাবা।”

জেরি বলল, “তাই তোমাকে দেখে মনে হচ্ছিল কোথায় দেখেছি! তোমাকে একদম ডক্টর অ্যালেন এর মত দেখতে! ঠিক তাই, ডক্টর অ্যালেন আমার স্ত্রীকে চিকিৎসা করছিলেন!”

স্কিপ বলল, “তোমার যমজ সন্তান হয়েছে। আমার বাবা আর বোন তোমার বাড়িতেই আছে। তোমাকে নামিয়ে আমি বাবা আর বোনকে হেলিকপ্টারে তুলে নেব। কিন্তু ফিল কোথায় গিয়ে থাকতে পারে আন্দাজ করতে পারো?”

“জানি। দু’দিন আগে ফিল আমার নতুন বন্দুকটা ধার নিয়েছে হরিণ শিকারের জন্য। কিন্তু খুব কঠিন জায়গা। বরফ না থাকলেও গাড়িতে যাওয়া খুব বিপদজনক। খুব খাড়াই, আর কঠিন কঠিন বাঁক।”

র‍্যাডক্লিফ বলল, “জায়গাটা কোথায় দেখাতে পারবে?”

স্কিপ তার পায়ের ওপর রাখা ম্যাপটা দেখাল। এর ওপর দেখাতে পারবে। জেরি  বলল, “ম্যাপ লাগবে না। ওতে পাবে না। ওই যে ওই উপত্যকার ওপর খাড়া ন্যাড়া জায়গাটা দেখতে পাচ্ছো, ওখান থেকে তিন কিলোমিটার মত দূর। কিন্তু ফিল হেলিকপ্টার নিয়ে ওখানে যেতে ভয় পেত।”

স্কিপ বলল, “ঠিক আছে। তোমাদের নামিয়ে দিয়ে আমি আবার আসছি। জেরির তো এখন বাচ্চাদের কাছে আগে পৌঁছোনোটা জরুরি।”

“মোটেই না,” বলে উঠল জেরি, “চল আগে ফিল কে খুঁজে বের করি।”

ব্লাপ ব্লাপ করে হেলিকপ্টার উড়ে চলল। প্রচণ্ড হাওয়া তাকে বেসামাল করে দিচ্ছে। এটা কোস্ট গার্ডের হেলিকপ্টার নয়। সাধারণ যাত্রী পরিবহন এর হেলিকপ্টার। কোস্ট গার্ড এর পাইলট স্কিপের কাছে একে নিরাপদে উড়িয়ে নিয়ে চলা সত্যি এক বিশাল চ্যালেঞ্জ! নিচে কিছু দেখা যাচ্ছে না। শুধু বরফ আর বরফ। খুব বেশি নিচে নামা যাচ্ছে না গাছের জন্যে। সব যাত্রীরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। ব্লাপ ব্লাপ করে হেলিকপ্টার উড়ছে।

“কোন ধারণা আছে ঠিক কোনখানে থাকতে পারে ফিল?” সামনের দিকে চোখ রেখেই স্কিপ জেরিকে জিজ্ঞেস করল।

“না।”

এমন সময় নীচের দিক থেকে দুম করে একটা আওয়াজ পাওয়া গেল। গুলির শব্দ।

bichitra02 (Small)স্কিপ গোল হয়ে সে জায়গাটার ওপরে চক্কর দিতে লাগল। খানিক বাদে আবার গুলির আওয়াজ তারপর আরেকটা –

দেখা গেল বরফের ওপর একটা গাড়ির ছাদ শুধু জেগে আছে আর তার ওপর দাঁড়িয়ে ফিল পাগলের মত হাত নেড়ে যাচ্ছে। হেলিকপ্টারটা গাড়ির ওপরের আকাশে নিয়ে এল স্কিপ। নামানোর জায়গা নেই।

অতএব যন্ত্রটাকে যতটা সম্ভব মাটির কাছাকাছি নিয়ে এল স্কিপ। মাটির সামান্য ওপরে স্থির হয়ে উড়ছিল হেলিকপটার। কাজটা কঠিন। “ওঃ! এটাই ত কোস্ট গার্ডের উপযুক্ত কাজ!” মনে মনে বলল সে।  দু’জন কাঠুরে হেলিকপ্টারের দরজা দিয়ে ঝুলে পরে ফিলকে ধরে টেনে তুলল ভেতরে। অজ্ঞান হয়ে গেছে ফিল। সমস্ত শরীর ঠাণ্ডা। দুজন মিলে ফিলকে ম্যাসাজ করতে লাগল। হেলিকপ্টার ততক্ষণে উড়ে চলেছে জেরির বাড়ির দিকে।

খানিক পরে চোখ মেলল ফিল। স্কিপ বলল, “হাই, আমি স্কিপ,  ডক্টর অ্যালেনের  ছোটো ছেলে। তোমার বাচ্চারা ভাল আছে, আমার মা তোমার বাড়িতে তোমার বাচ্চাদের কাছে আছে। তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আমি মাকে তুলে নেব। হরিণ তো শিকার হল না, কাল বাচ্চাদের নিয়ে আমাদের বাড়িতে ডিনারে এসো। তোমার বন্ধুরাও সবাই থাকবে সেখানে। সপরিবারে। সবাই মিলে একসাথে হইহুল্লোড় করব।”

সব কাঠুরেরা একসাথে আনন্দে চিৎকার করে উঠল। স্কিপ শিস দিয়ে গেয়ে উঠল কোস্ট গার্ডদের গান “সেম্পের পারাতুস … ”

জয়ঢাকে প্রকাশিত বিচিত্র দুনিয়ার সমস্ত লেখা একসাথে এইখানে