বিদেশী গল্প ইংরিজি গল্প-ফাদার ম্যাকক্লেসফিল্ডের কাহিনি রবার্ট হিউ বেনসন অনু অমিত দেবনাথ শীত ২০১৬

bideshiingriji01এ গল্প আমরা শুনেছিলাম মঁসিয়ে ম্যাক্সওয়েলের এক ডিনার পার্টিতে। আগের দিন নাকি তাঁর সঙ্গে এক ফাদারের আলাপ হয়েছে, কথায় কথায় তিনিই এ ঘটনার একটু আভাস দিয়েছিলেন। ঘটনার সামান্য একটু শুনেই অবশ্য তাঁর মনে হয়েছিল ব্যাপারটা চমকপ্রদ। দুঃখের বিষয়, ফাদার আগামীকালই লন্ডন ফিরে যাচ্ছেন। তাই তাঁকে আজকের ডিনার পার্টিতে আসার জন্য তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন ফাদার যদি ঘটনাটা আমাদের শোনান। প্রথমে রাজি না হলেও পরে তিনি রাজি হয়েছেন এবং আজ তিনি আসছেন ডিনার পার্টিতে যোগ দিতে। তখনই হয়ত আমাদের সৌভাগ্য হতে পারে ঘটনাটা শোনার। “আশা করি, বন্ধুগণ, সন্ধেটা আমাদের ভালই কাটবে,”বললেন মঁসিয়ে ম্যাক্সওয়েল।

খাওয়ার একটু আগে আগেই এলেন ফাদার ম্যাকক্লেসফিল্ড। প্রথম দর্শনে তাঁকে মনে হয় রুক্ষ, সাদামাটা চেহারার, বাঁকানো নাক, ধূসর চুল। খাওয়ার সময়টাতে তিনি বিশেষ কথাটথা বলেননি। কিন্তু তারপর তিনি যখন তাঁর জন্য নির্দিষ্ট চেয়ারটাতে বসে, কারোর দিকেই বিশেষ না তাকিয়ে, খানিকটা আবেগহীন গলায় বলতে শুরু করলেন, তখন কিন্তু, কেন জানি না, ব্যাপারটা বেশ জমে গেল।

“আমি একটি মেয়েকে জানতাম, যে ক্যাথলিক হওয়া সত্ত্বেও এক প্রোটেস্ট্যান্ট ভদ্রলোককে বিয়ে করেছিল এবং লোকটার বয়স মেয়েটার বয়সের তিনগুণ। আমি বারণ করেছিলাম, কিন্তু সে শোনেনি। এসব ক্ষেত্রে যা হয় আর কি। তাই হল অবশ্য। সে আমাকে চিঠি লিখতে শুরু করল, দুঃখে ভরা সে সব চিঠি। আর সে সব চিঠির মধ্যে প্রধান বক্তব্যই হল যে তার স্বামী ঘোর নাস্তিক, ধর্মেকর্মে তার মোটেই মতিগতি নেই এবং সে আত্মার অবিনশ্বরতাতেও মোটেই বিশ্বাস করে না।

“বিয়ের দু’বছরের মধ্যেই তার স্বামী মারা যায়, ষাট বছর বয়সে। যদিও তার স্বাস্থ্যটাস্থ্য তখনও বেশ ভালই ছিল। কিন্তু মৃত্যু তো অবশ্যম্ভাবী, তাকে মেনে নিতেই হয়।

“ঘটনা হল, লোকটি যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন মেয়েটি আমাকে খবর দেয় এবং আমি সেখানে গিয়ে বেশ কয়েকবার, অন্তত বারছয়েক হবে, তার স্বামীর সঙ্গে কথাবার্তা বলি, বোঝানোর চেষ্টা করি। বলা বাহুল্য, কোনটাই ফলপ্রসূ হয়নি। তার একটাই বক্তব্য, এভাবে শেষ হয়ে যাওয়াটা সে কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না। তার যদি কোন সন্তান থাকত, তা হলেও একটা কথা ছিল যে তার রক্তধারা থেকে যাচ্ছে এই পৃথিবীতে তারই উত্তরসূরির মাধ্যমে, কিন্তু তার যেহেতু কোন আত্মীয়স্বজনও নেই, সেক্ষেত্রে এভাবে চলে যাওয়াটা তার কাছে অসহ্য ঠেকছে।”

ফাদার ম্যাকক্লেসফিল্ড সশব্দে একবার নাক টেনে হাত দুটো জড়ো করে আবার শুরু করলেন।

          “আমাকে একটা কথা বলতেই হচ্ছে যে তার শেষ শয্যাটা – সে বড় সুখের সময় নয়। একে তার বয়স হয়েছিল, কিন্তু শরীর যথেষ্ট সমর্থ থাকায় ভোগসুখের ইচ্ছেও রয়েছে – সব মিলিয়ে সে এক বিচ্ছিরি কান্ড। সে তারপর গোরস্থান নিয়ে বকরবকর শুরু করল – ওটা খুব খারাপ জায়গা, মাটির তলায় কেঁচো ভর্তি ইত্যাদি ইত্যাদি নানারকম হাবিজাবি – যা শুনে তার কচি বউয়ের ধাত ছেড়ে যাওয়ার যোগাড় হল। এসব কথা শুনে আমার মনে হল ও বোধহয় ব্যক্তিগত জীবনেও বিশেষ সুবিধের ছিল না।

“শেষ সময়টা সহ্য করাই মুশকিল হয়ে দাঁড়াল। লোকটার বিছানার চারপাশে মশারি টাঙানো ছিল, সেগুলো খামচে ধরতে লাগলো সে, তার সঙ্গে ডাক ছেড়ে চিৎকার, সেগুলোর সবই মৃত্যু আর অন্ধকার সম্পর্কে। এরকম একটা লোককে মেয়েটা যে কী দেখে বিয়ে করেছিল কে জানে! মৃত্যুর ঠিক আগে সে সটান খাড়া হয়ে বসল বিছানায়, বিছানার ঠিক উল্টোদিকে খোলা জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইল বাইরের দিকে, আতঙ্কিত চোখে।

 “এখানে বলে রাখা ভাল, এই যে জানলাটা, এর ঠিক নিচে একটা হাঁটাপথ আছে, দুদিকে লরেল গাছ, তার ঝরা পাতায় পথটা ছেয়ে রয়েছে, আর গাছগুলোর ডালপালা এমনভাবে ছড়ানো যে গ্রীষ্মকালেও রাস্তাটা বেশ অন্ধকার অন্ধকার, আর রাস্তাটা সোজা গিয়ে শেষ হয়েছে গির্জা সংলগ্ন গোরস্থানের গেটটায়।”

 ফাদার ম্যাকক্লেসফিল্ড আরেকবার নাক টানলেন। তারপর আবার শুরু করলেন, আমাদের কারো দিকে না তাকিয়ে।

“তারপর লোকটা মারা গেল। তাকে কফিনে করে সেই রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হল সেই গোরস্থানে, কবর দেওয়া হল।

“তখন তার বউয়ের, সেই মেয়েটির মনের অবস্থা দেখে আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম। এ অবস্থায় মেয়েটিকে একা ছেড়ে যাওয়া যায় না। স্বামীর এরকম মৃত্যু দেখে সে নিদারুণ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু সে বাড়ি ছেড়েও যেতে চাইছে না, বলছে স্বামীর মৃত্যুর পরপরই চলে গেলে সেটা স্বামীর প্রতি অসম্মান করা হবে। সে তখন করল কী, দিনে দুবার করে সেই কবরের সামনে যেতে লাগল প্রার্থনা করার জন্য, কিন্তু কখনোই জানলার নিচের সেই লরেল গাছের রাস্তাটা দিয়ে যেত না, হয় বাগান দিয়ে ঘুরে যেত, আর সেই রাস্তা দিয়েই ফিরত, না হলে বাগানের আরেকটা রাস্তা আছে, সেই রাস্তা দিয়ে যেত।

“এ ব্যাপারটা চলল দিন তিন চারেক। লোকটা মারা গেছিল এক শনিবার, মাসটা জুলাই, সময় রাত আটটা নাগাদ।

 “আমি ঠিক করেছিলাম পরের শনিবারই চলে যাব, কারণ গির্জায় আমার সহকারী যে, সে কয়েকদিন দিব্যি চালিয়ে নিতে পারলেও আমিই চাইছিলাম না আরেকটা দ্বিতীয় রবিবারের প্রার্থনার ভারটা ওর কাঁধে চাপাতে।

“হল কি, শুক্কুরবার দুপুরে লাঞ্চের সময়ে, মেয়েটির বোন এল সেই বাড়িতে কয়েকদিন থাকবে বলে। আর সেই দিনই মেয়েটা বলল যে তার ঘুম হচ্ছে না, হচ্ছে না মানে হচ্ছেই না, কারণ ওর শোওয়ার ঘরটা হচ্ছে সেটা, যেখানে ওর স্বামী মারা গেছিল। আমি ওকে অনেক বোঝালাম, সাহস দেওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। তখন আমি বললাম যে ঠিক আছে, আমিই শোব ঐ ঘরে, আমার কোন অসুবিধে হবে না।

মেয়েটা আমাকে কিছুতেই ঐ ঘরে শুতে দেবে না, আর আমিও শোবই। বাধ্য হয়ে হাল ছেড়ে দিল সে। আমার জিনিসপত্র সব নিয়ে আসা হল ঐ ঘরে ঐ দিনই বিকেলের মধ্যে।

 “ঐ দিন রাত পৌনে আটটা নাগাদ আমি আমার নতুন ঘরে গিয়ে আলখাল্লাটা চড়াচ্ছি ডিনারে যাব বলে, এমন সময় একটা ঘটনা ঘটল। তার আগে ঘরটা সম্বন্ধে একটু বলে নেওয়া দরকার।

“বাইরের গাছগুলোর জন্য ঘরটা সবসময় খুব অন্ধকার থাকে। খাটের চারটে ছত্রী, মশারির জন্যে, টেবিল চেয়ার, আলমারি, যেখানে লোকটার জামাকাপড় থাকত এবং এখনও থাকে।

 “আমি গায়ে পোশাকটা চড়িয়ে জানলার ধারে গেলাম বাইরেটা একবার দেখতে। তখন সূর্য ডুব গেছে, কিন্তু বাইরে যথেষ্ট আলো রয়েছে। নিচেই সেই লরেল গাছের রাস্তা, যেটা মনে হচ্ছে একটা সবুজ রঙের টানেল, যার দুপাশে রয়েছে ঘাসের লন।

 “এখান দিয়ে সোজা গোরস্থানের গেটটা দেখা যাচ্ছিল, যেটা এখান থেকে মোটামুটি একশো গজ দূরে। রাস্তার দুপাশে, আগেই বলেছি, লরেল আর লেবু গাছের সারি।

“দেখলাম, কে যেন একটা আসছে। হেঁটে। যদিও – প্রথম দেখাতে মনে হল, লোকটা মাতাল। দেখলাম বেশ কয়েকবার লোকটা হোঁচট খেল। লোকটা যখন গজ পঞ্চাশেক দূরে, তখন দেখলাম ও একটা গাছের ডাল আঁকড়ে ধরল, যেন পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচতে চেষ্টা করছে। তারপর আবার ডালটা ছেড়ে দিল, আবার হাঁটতে লাগল ধীরে ধীরে, একবার রাস্তার এদিক, আবার ওদিক, টলমল করতে করতে। মনে হল ও বাড়িতেই আসতে চাইছে।

 “আমি অবাক হয়ে গেলাম লোকটাকে দেখে। পোশাকে আশাকে যথেষ্ট ভদ্রলোক। এই লোক মাতাল হয় কি করে! লোকটার মাথায় সাদা হ্যাট, ধূসর কোট, ধূসর ট্রাউজার, পায়ে সাদা মোজা।

 “তারপর আমার মনে হল লোকটা অসুস্থ। তাই আরো ভাল করে নজর করতে লাগলাম, ভাবলাম নিচে যাব কিনা।

“যখন লোকটা কুড়ি গজ দূরে, তখন সে একবার মুখ তুলল; আমি দেখে অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে গেলাম যে এই লোকটার সঙ্গে, আমরা যাকে গত সোমবার কবর দিলাম, তার সঙ্গে অদ্ভুত মিল। লোকটা যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেখানটা বেশ অন্ধকার, পরমুহূর্তেই সে মুখটা নামিয়ে নিল, হাত দুটো ছুঁড়েই চিৎপাত হয়ে পড়ে গেল।

 “আমি রীতিমত চমকে গেছিলাম দৃশ্যটা দেখে। এ কি কান্ড! জানলা দিয়ে ঝুঁকে পড়ে চিৎকার করলাম সেদিকে তাকিয়ে। দেখতে পাচ্ছিলাম লোকটা হাত পা ছুঁড়ছে, যেন ওর খিঁচুনি লেগেছে, আর শুনতে পাচ্ছিলাম লোকটার হাঁচোরপাঁচোর করা শরীরের চাপ লেগে শুকনো পাতার মুড়মুড়িয়ে ভাঙার শব্দ।

          “তখন আমি, এক মুহূর্তও দেরি না করে নিচে নেমে দৌড়োলাম সেদিকে।”

ফাদার ম্যাকক্লেসফিল্ড একটু থামলেন। তারপর বললেন, “বন্ধুগণ, যখন আমি সেখানে গেলাম, দেখলাম সেখানে কোন বুড়ো মানুষ কেন, কেউই নেই। সেখানে কিছু একটা হয়েছিল বোঝা যাচ্ছে, কারণ শুকনো পাতাগুলো দুমড়ে মুচড়ে রয়েছে, কিন্তু আর কিচ্ছু নেই।”

এতক্ষণ সবাই চুপ করে শুনছিলাম। কিন্তু কেউ কিছু বলার আগেই ফাদার আবার তাঁর কথা শুরু করলেন।

“অবশ্যই আমি এই ঘটনার কথা কাউকে কিছুই বলিনি। রোজকার মতই খাওয়াদাওয়া করলাম, তারপর খানিকক্ষণ ধূমপান করলাম প্রার্থনা সেরে, তারপর শুতে গেলাম। আমি খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিলাম না অবশ্যই, কিন্তু আমি ভয়ও পাইনি।

“ঘরে ঢুকে আমি আগে সব বাতিগুলো জ্বালালাম, তারপর ঘরে একটা বড় আলমারি আছে, সেটা খুলে তার ড্রয়ারগুলো দেখলাম। নিচের দিক থেকে তিন নম্বর ড্রয়ার খুলতেই দেখলাম সেখানে একটা ধূসর কোট আর ধূসর ট্রাউজার রয়েছে। ওপরের দিকের ড্রয়ারে রয়েছে বেশ কয়েকজোড়া সাদা পায়ের মোজা। ওপরের শেলফে একটা সাদা হ্যাট। এটা হল প্রথম ঘটনা।”

 “আপনি কি ওখানেই ঘুমোলেন, ফাদার?”কে যেন জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ হ্যাঁ,”বললেন ফাদার, “ঘুমোব না কেন। না ঘুমোনোর তো কোন কারণ ঘটেনি। যদিও প্রথম দু তিন ঘন্টা আমার ঘুমই আসেনি, ঘুমিয়েছি তারপর, কিন্তু তবুও আমার ক্লান্ত লাগছিল না। ব্রেকফাস্টে এসেছিলাম অন্যান্য দিনের মতই।

 “যাই হোক, আমি ব্যাপারটা নিয়ে অনেক ভাবনা চিন্তা করলাম, তারপর আমার সহকারীকে টেলিগ্রাম করে দিলাম যে আমি এখন যাচ্ছি না, যাওয়াটা একটু পিছিয়ে দিতে হচ্ছে। এক্ষুনি এখান থেকে চলে যাওয়াটা ঠিক হবে না।”

ফাদার ম্যাকক্লেসফিল্ড চেয়ারে একটু নড়েচড়ে বসলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন সেই একঘেঁয়ে গম্ভীর সুরে।

“রোববার আমরা গেলাম একটা চার্চে, ওখান থেকে মাইল ছয়েক দূরে। সেখানে একটু প্রার্থনা করলাম। সোমবার বিকেল পর্যন্ত আর কিছু ঘটেনি।

“সেই সোমবার আমি আবার জানলা দিয়ে উঁকি মারলাম, তখন সন্ধ্যে, সময় এই পৌনে আটটা। একই ঘটনা আমি আগের শনিবার আর রবিবারেও করেছিলাম। যাই হোক, সেদিন যখন উঁকি মারলাম, দেখলাম চারিদিক একেবারে শান্ত, তারপরই শুনতে পেলাম গির্জার গোরস্থানের গেটটা কে যেন খুলল, তারপর দেখতে পেলাম একটা লোক আসছে।

bideshiingriji02“কিন্তু প্রায় একই সময়ে আমি খেয়াল করলাম, এটা সেই আগের লোকটা নয়। এক ঝলক দেখে মনে হল, লোকটা সম্ভবত কোন রক্ষী গোছের কেউ, কারণ লোকটার হাতে একটা বন্দুক; তারপর দেখলাম লোকটা গেট খুলে ভেতরে ঢুকল, তার সঙ্গে সঙ্গে একটা কুকুর, লাফাতে লাফাতে তার মালিকের পাশে পাশে আসছে এই বাড়ির দিকেই।

“যখন কুকুরটা বাড়ির থেকে পঞ্চাশ গজ মত দূরে, তখন হঠাৎ লোকটা থেমে গিয়ে কি যেন একটা তাক করল।

“আমি দেখলাম, লোকটা বন্দুক তাক করে পা টিপে টিপে এগোচ্ছে; কিন্তু লোকটা এগিয়ে এলেও কুকুরটা আস্তে আস্তে পিছিয়ে যাচ্ছে। আমি তখন ভুলেই গেছিলাম আমি ওখানে কি জন্য দাঁড়িয়ে আছি। আমি এক মনে দেখছিলাম – ঠিক তার পরেই দেখলাম, কি যেন একটা – আসলে গাছের ডালের জন্য জায়গাটা যথেষ্ট আঁধার আঁধার, – সে জন্য পরিষ্কার বুঝতে না পারলেও মনে হল খরগোশের আকারের কিছু একটা যেন লরেলের ঝোপ থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল, রাস্তার এদিক থেকে ওদিকে যেতে লাগল প্রচন্ড গতিতে।

“জন্তুটার থেকে আমার দূরত্ব যখন কুড়ি গজ মত, তখন লোকটা গুলি চালাল। জন্তুটা পাক খেতে খেতে গিয়ে পড়ল শুকনো পাতার ওপর, ছটফট করছিল জিনিসটা, চিৎকার করতে করতে। সে এক বীভৎস ব্যাপার। কিন্তু আমার কাছে যেটা সবচেয়ে আশ্চর্য ঠেকল, তা হল কুকুরটার আচরণ। কুকুরটা সামনে এলই না। শুনতে পেলাম লোকটার পায়ে লেগে কি যেন একটা ভাঙল, তারপর দেখলাম কুকুরটা যত জোরে পারে গির্জার গোরস্থানটার দিকে ছুটছে।

“লোকটা এবার ছুটে এল আমার দিকেই, কিন্তু খরগোশ বা সেই জন্তুটার চিৎকার ততক্ষণে থেমে গেছে, এবং আমি আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, লোকটা ঠিক সেই জায়গাটাতেই এল, যেখানে জন্তুটা ছটফট করছিল, এবং ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখে দাঁড়িয়ে রইল।

“আমি জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে লোকটাকে ডাকলাম।

““তোমার সামনে, ভাই,”আমি বললাম, “ওটাকে মেরে ফেল, যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাক।”

“লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে আবার নিচের দিকে দেখল। তারপর বলল, “কিন্তু কোথায় গেল বলুন তো? আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।”

“অথচ আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম, লোকটার এক্কেবারে সামনেই জন্তুটা ছটফট করছে।

“তখন আমি নেমে সেখানে গেলাম।

“লোকটা তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, ভ্যাবলা মুখে, কিন্তু সেখানে কিচ্ছু নেই। শুধু শুকনো পাতাগুলো দুমড়ে মুচড়ে আছে, তলায় দেখা যাচ্ছে ভেজা মাটি।

“লোকটা বলল যে এটা একটা বিরাট সাইজের খরগোশ, ওর ওপর নির্দেশ আছে বাগানের ভেতরের সব খরগোশ মেরে ফেলতে হবে। তারপর সে আমার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকাল। বলল, “আপনি কি সত্যিই এটা দেখেছিলেন, স্যার?”

“আমি বললাম, খুব পরিষ্কার না হলেও, আমার মনে হয়েছিল এটা খরগোশই হবে।

“লোকটা বলল, ওটা একটা খরগোশই বটে, কিন্তু রঙটা রূপোলী-ধূসর আর সাদা পা। “আমি স্যার, জীবনে এরকম খরগোশ দেখিনি।”

“আরো তাজ্জব ব্যাপার, কোন কুকুর জায়গাটার ধারে কাছে ঘেঁষল না। ওর নিজের কুকুরটা তো পালিয়েছেই, আমি রান্নাঘরের কুকুরের ঘর থেকে একটা রিট্রিভার কুকুর নিয়ে এলাম, কিন্তু আমি জীবনে কোন কুকুরকে এরকম ভয় পেতে দেখিনি। যখন ওটাকে আমরা টেনে হিঁচড়ে আনার চেষ্টা করছি, তখন ওটা আমাদেরই এমন দাঁত খিঁচিয়ে কামড়াতে এল যে আমরা ওকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম এবং বাতাসের চেয়েও দ্রুত গতিতে সে গিয়ে ঢুকে পড়ল নিজের খাঁচায়। টেরিয়ারের ক্ষেত্রেও তাই হল।

“যাই হোক, ততক্ষণে খাওয়ার ঘন্টা বেজে গেছে। আমি গিয়ে বললাম আমার কেন দেরি হল, কিন্তু আমি কাউকে খরগোশের রঙটা বলিনি। এই হল দ্বিতীয় ঘটনা।”

ফাদার ম্যাকক্লেসফিল্ড থেমে, নিজের মনেই একটু হাসলেন। তাঁর বলার ভঙ্গিটা এতই আকর্ষক লাগছিল যে আমরা এক মুহূর্তের জন্যও অন্যমনস্ক হতে পারছিলাম না। এবং আমরা কেউ কিছু বলার আগেই তিনি আবার শুরু করলেন।

“সেই দিনের পর থেকে সপ্তাহের অন্যান্য দিনগুলোতেও রোজই আমি ঐ সময়টায় জানলার কাছে যেতাম, কিন্তু শুক্রবার পর্যন্ত কোন কিছুই ঘটেনি। পরদিন আমি লন্ডন ফিরে যাব। সদ্য বিধবা মেয়েটি তখন অনেকটাই সামলে নিয়েছে, এবং কয়েকদিন পর একটু ঘুরে আসার প্ল্যানও করেছে।

“শুক্রবার সন্ধ্যেয়, আমি একটু আগে আগেই পোশাক পরে রোজকার মত জানলার কাছে না গিয়ে, সরাসরি নিচের রাস্তাটায় গিয়ে দাঁড়ালাম, তখন আটটা বাজতে মিনিট কুড়ি বাকি।

“সেদিন সন্ধ্যেটা অস্বাভাবিক গুমোট, একদম হাওয়া দিচ্ছিল না, আর অন্যান্য দিনের তুলনায় চারদিকটা বেশি অন্ধকার ঠেকছিল।

“আমি রাস্তাটা ধরে গেট অবধি গিয়ে আবার ফিরছিলাম, কিন্তু কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল, সেটা কি কারণে বলতে পারব না। তবে একটু স্বস্তি পেলাম, যখন দেখলাম সেই মেয়েটি হঠাৎই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল, রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি তাই দেখে তার দিকে এগোলাম। মেয়েটা প্রথমে আমাকে দেখে চমকে উঠেছিল, তারপর হাসল। বলল, “আমি ভেবেছিলাম, বোধহয় অন্য কেউ। ফাদার, আমি মন ঠিক করে ফেলেছি। চলেই যাব। কাল একটু শহরে যেতে হবে, চলে যাব সোমবার। আমার সঙ্গে আমার বোনও যাবে।”

““বাঃ, ভাল খবর,”আমি বললাম, তারপর আমরা আবার সেই রাস্তার দিকে হাঁটতে লাগলাম। কিন্তু একটুখানি গিয়েই সে দাঁড়িয়ে পড়ল, মনে হল তার আর এগোনোর ইচ্ছে নেই।

““চলো, রাস্তাটার শেষ অবধি যাই, তারপর আবার ঘুরে আসা যাবে, ততক্ষণে ডিনারের সময়ও হয়ে যাবে,”আমি বললাম।

“সে কোন কথা বলল না, তবে আমার সঙ্গে এল। আমরা একেবারে সেই গেট অবধি গেলাম, আবার ফিরতে লাগলাম।

“আমার মনে হয় না আমাদের দুজনের কেউ কোন কথা বলেছিলাম বলে; আমার সেই অস্বস্তিটা খুব বেড়ে গেছিল, তবুও হাঁটতে লাগলাম।

 “আমরা যখন রাস্তাটার মাঝামাঝি পর্যন্ত এসেছি, তখন মনে হল যেন পেছনের গেটটায় একটা আওয়াজ হল। তক্ষুনি আমি পেছন ফিরলাম, গেটে কাউকে দেখব আশা করে, কিন্তু সেখানে কেউ ছিল না।

“তারপর, মাথার ওপর গাছের পাতাগুলো নড়তে লাগল। অথচ এইমাত্রও কোথাও কোন বাতাস বইছিল না। কেন জানি না, আমি আচমকাই মেয়েটার হাত ধরে তাকে রাস্তার এক ধারে সরিয়ে দিলাম। আমরা এখন রাস্তার ডান দিকে, এখান থেকে লরেল গাছগুলোর দূরত্ব ফুটখানেকও নয়।

“ও-ও কিছু বলেনি, আমিও না, কিন্তু আমার ধারণা, আমরা দুজনেই আশা করেছিলাম কাউকে দেখব বলে।

“হাওয়া বন্ধ হয়ে গেল আচমকাই, আবার বইতে শুরু করল, তবে খুবই ধীর লয়ে, আর বাতাসটা বইছিল গোরস্থানের দিক থেকেই। শুনতে পেলাম মাথার ওপর গাছের পাতার নড়াচড়া, পায়ের নিচে শুকনো পাতার ঝুরুঝুরু শব্দ।

“তারপর আমার নজরে পড়ল এমন একটা জিনিস, যেটা সবাই কোন না কোন সময় দেখেছে। তবুও আমি বা মেয়েটি, কেউই ওটার থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারছিলাম না। জিনিসটা একটা গাছের ডালের ডগার কয়েকটা পাতা, হাওয়ায় ঘুরতে ঘুরতে, লুটোপুটি খেতে খেতে সেটা রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছিল। আর হাওয়াটাও অদ্ভুতরকম ভাবে বইছিল, তাতে পাতাগুলো একবার রাস্তার এদিকে যাচ্ছিল, আবার ওদিকে। তারপর এটা একেবারে আমাদের কাছে এসে গেল, আমি আমার হাতে, মুখে, বাতাসের স্পর্শ পেলাম। তারপর গাছের একটা পাতা আমার চিবুক ছুঁয়ে গেল। আমি শুধু একটা কথাই বলব, যে আমি কেঁপে উঠেছিলাম, যেন কোন ব্যাঙ আমাকে ছুঁয়ে গেল। তারপর এটা চলে যেতে লাগল।

“তখন, বুঝতেই পারছেন, চারদিকে বেশ অন্ধকার, কিন্তু আমার মনে হল, হাওয়াটা যেন আচমকাই থেমে গেল এবং সেই পাতাগুলো কয়েকটা পাক খেয়ে রাস্তার শেষ প্রান্তে গিয়ে পড়ে গেল।

“আমরা সেখানে কয়েক মুহূর্ত একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, তারপর যখন আমার সম্বিত ফিরল, দেখলাম সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে স্থির দৃষ্টিতে, কিন্তু দুজনের কেউই একটি কথাও বললাম না।

“আমরা সেদিন আর সেই রাস্তা ধরে বাড়ি ফিরিনি। ও রাস্তাটা এড়িয়ে, বাগানের পথ ধরে আমরা সেদিন বাড়ি ফিরেছিলাম।

“পরদিন আমরা সবাই এগারোটার ট্রেন ধরে ফিরে এসেছিলাম ও বাড়ি থেকে।

“এই হল ঘটনা, ভদ্রমহোদয়গণ।”

রবার্ট হিউ বেনসন (Robert Hugh Benson) (১৮৭১-১৯১৪); ইংল্যান্ড। রোমান ক্যাথলিক চার্চের যাজক ছিলেন। বহু ভুত ও হরর গল্প লিখেছেন। “লর্ড অব দ্য ওয়ারল্ড”তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। “ফাদার ম্যাকক্লেসফিল্ডের কাহিনি”( Father Macclesfield’s Tale )  প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯০৭ সালে। 

অমিত দেবনাথ -এর সমস্ত গল্পের সংগ্রহ এই লিংকে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s